Muslim99Muslim99
← Tafsir library

6. Al-An'aam

The Cattle · Meccan · 165 ayahs

سُورَةُ الأَنۡعَامِ

Reading Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation

Ayahs 71–80 of 165

71

قُلْ أَنَدْعُوا۟ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَا لَا يَنفَعُنَا وَلَا يَضُرُّنَا وَنُرَدُّ عَلَىٰٓ أَعْقَابِنَا بَعْدَ إِذْ هَدَىٰنَا ٱللَّهُ كَٱلَّذِى ٱسْتَهْوَتْهُ ٱلشَّيَٰطِينُ فِى ٱلْأَرْضِ حَيْرَانَ لَهُۥٓ أَصْحَٰبٌۭ يَدْعُونَهُۥٓ إِلَى ٱلْهُدَى ٱئْتِنَا ۗ قُلْ إِنَّ هُدَى ٱللَّهِ هُوَ ٱلْهُدَىٰ ۖ وَأُمِرْنَا لِنُسْلِمَ لِرَبِّ ٱلْعَٰلَمِينَ

আপনি বলে দিনঃ আমরা কি আল্লাহ ব্যতীত এমন বস্তুকে আহবান করব, যে আমাদের উপকার করতে পারে না এবং ক্ষতিও করতে পারে না এবং আমরা কি পশ্চাৎপদে ফিরে যাব, এরপর যে, আল্লাহ আমাদেরকে পথ প্রদর্শন করেছেন? ঐ ব্যক্তির মত, যাকে শয়তানরা বনভুমিতে বিপথগামী করে দিয়েছে-সে উদভ্রান্ত হয়ে ঘোরাফেরা করছে। তার সহচররা তাকে পথের দিকে ডেকে বলছেঃ আস, আমাদের কাছে। আপনি বলে দিনঃ নিশ্চয় আল্লাহর পথই সুপথ। আমরা আদিষ্ট হয়েছি যাতে স্বীয় পালনকর্তা আজ্ঞাবহ হয়ে যাই।

বল, ‘আল্লাহ ব্যতীত আমরা কি এমন কিছুকে ডাকব, যা আমাদের কোন উপকার কিংবা অপকার করতে পারে না? আল্লাহ আমাদেরকে সৎপথ প্রদর্শনের পর আমরা কি সেই ব্যক্তির ন্যায় পূর্বাবস্থায় ফিরে যাব, যাকে শয়তান পৃথিবীতে পথ ভুলিয়ে হয়রান করেছে? যদিও তার সহচরগণ তাকে আহবান করে বলে, সঠিক পথের দিকে আমাদের নিকট এস।’[১] বল, ‘আল্লাহর পথই পথ[২] এবং আমরা বিশ্বজগতের প্রতিপালকের নিকট আত্মসমর্পণ করতে আদিষ্ট হয়েছি।

[১] এখানে এমন লোকদের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন, যারা ঈমান আনার পর কুফরীর দিকে এবং তাওহীদের পর শিরকের দিকে ফিরে যায়। এদের দৃষ্টান্ত ঠিক এই রকম যে, এক ব্যক্তি তার সেই সাথীদের সাথছাড়া হয়ে যায়, যারা সোজা ও সঠিক পথে যাচ্ছিল। আর সঙ্গচ্যুত হয়ে এই ব্যক্তি বনে-জঙ্গলে চঞ্চল ও অস্থির অবস্থায় ঘুরে বেড়ায়। এদিকে তার সাথীরা তাকে ডাকে, কিন্তু চাঞ্চল্যের কারণে সে কিছুই শুনতে পায় না। অথবা শয়তান জ্বিনদের কুহকে পড়ার কারণে সঠিক পথের দিকে ফিরে আসা তার পক্ষে সম্ভব হয় না।

[২] অর্থাৎ, কুফরী ও শিরক অবলম্বন করে যে ভ্রষ্ট হয়ে গেছে, সে পথহারা পথিকের মত হিদায়াতের দিকে আসতে পারে না। তবে হ্যাঁ, আল্লাহ তাআলা যদি তার জন্য হিদায়াত নির্ধারণ করে থাকেন, তবে অবশ্যই আল্লাহর তাওফীকে সে সঠিক পথ পেয়ে যাবে। কেননা, হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত করা তাঁরই কাজ। যেমন, অন্যত্র বহু স্থানে বলা হয়েছে।{فَإِنَّ اللهَ لا يَهْدِي مَنْ يُضِلُّ وَمَا لَهُمْ مِنْ نَاصِرِينَ} "অবশ্যই আল্লাহ তাকে হিদায়াত দেন না, যাকে তিনি ভ্রষ্ট করেন এবং তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী হবে না।" (সূরা নাহল ১৬:৩৭) তবে এই হিদায়াত দান ও ভ্রষ্ট করা সেই নিয়ম-নীতি অনুযায়ী হয়, যা মহান আল্লাহ এর জন্য নির্দিষ্ট করেছেন। এমন নয় যে, কোন বিচার-বিবেচনা ছাড়াই তিনি যাকে চান ভ্রষ্ট করে দেন এবং যাকে চান হিদায়াত দান করেন। আর এর বিশ্লেষণ বহু স্থানে করা হয়েছে।

Al-An'aam 6:71Listen in Qur'an →
72

وَأَنْ أَقِيمُوا۟ ٱلصَّلَوٰةَ وَٱتَّقُوهُ ۚ وَهُوَ ٱلَّذِىٓ إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ

এবং তা এই যে, নামায কায়েম কর এবং তাঁকে ভয় কর। তাঁর সামনেই তোমরা একত্রিত হবে।

তোমরা নামায কায়েম কর এবং তাঁকে ভয় কর।[১] আর তাঁরই নিকট তোমাদেরকে সমবেত করা হবে।’

[১] وَأَنْ أَقِيْمُوْا এর সংযোগ হল لِنُسْلِمَ এর সাথে। অর্থাৎ, আমাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, আমরা যেন বিশ্বের প্রতিপালকের অনুগত হয়ে যাই। আর আমরা যেন নামায কায়েম করি এবং তাঁকে ভয় করি। আনুগত্য স্বীকার করে নেওয়ার পর সবচেয়ে বড় নির্দেশ নামায প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশই দেওয়া হয়েছে। এতে নামাযের গুরুত্ব সুস্পষ্ট হয়ে যায়। আর এর পর রয়েছে আল্লাহভীরুতার নির্দেশ। কারণ, নামাযের প্রতি যত্নবান হওয়া আল্লাহভীরুতা ও নম্রতা ব্যতীত সম্ভব নয়। তিনি বলেন, {وَإِنَّهَا لَكَبِيرَةٌ إِلَّا عَلَى الْخَاشِعِينَ} বিনীতগণ ব্যতীত আর সকলের নিকট নিশ্চিতভাবে এ কঠিন। (সূরা বাক্বারাহ ২:৪৫)

Al-An'aam 6:72Listen in Qur'an →
73

وَهُوَ ٱلَّذِى خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضَ بِٱلْحَقِّ ۖ وَيَوْمَ يَقُولُ كُن فَيَكُونُ ۚ قَوْلُهُ ٱلْحَقُّ ۚ وَلَهُ ٱلْمُلْكُ يَوْمَ يُنفَخُ فِى ٱلصُّورِ ۚ عَٰلِمُ ٱلْغَيْبِ وَٱلشَّهَٰدَةِ ۚ وَهُوَ ٱلْحَكِيمُ ٱلْخَبِيرُ

তিনিই সঠিকভাবে নভোমন্ডল সৃষ্টি করেছেন। যেদিন তিনি বলবেনঃ হয়ে যা, অতঃপর হয়ে যাবে। তাঁর কথা সত্য। যেদিন শিঙ্গায় ফুৎকার করা হবে, সেদিন তাঁরই আধিপত্য হবে। তিনি অদৃশ্য বিষয়ে এবং প্রত্যক্ষ বিষয়ে জ্ঞাত। তিনিই প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ।

তিনি যথাবিধি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন।[১] আর যেদিন[২] তিনি বলবেন, ‘হও’ সেদিন তা হয়ে যাবে। তাঁর কথাই সত্য। যেদিন শিঙ্গায়[৩] ফুৎকার দেওয়া হবে সেদিনকার কর্তৃত্ব তো তাঁরই। অদৃশ্য ও দৃশ্য সব কিছু সম্বন্ধে তিনি পরিজ্ঞাত এবং তিনি প্রজ্ঞাময়, সবিশেষ অবহিত।

[১] অর্থাৎ, তিনি যথা উদ্দেশ্যে ও মহান লক্ষ্যে তা সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ, এগুলোকে অনর্থক-লাভহীন (খেল-তামাশার জন্য) সৃষ্টি করেননি। বরং এক বিশেষ উদ্দেশ্যে বিশ্বজাহান সৃষ্টি করেছেন। আর তা হল, সেই আল্লাহকে স্মরণ এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা, যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন।

[২] يَوْمَ তে জবর এসেছে وَاذْكُرُوا অথবা واتَّقُوا ঊহ্য ক্রিয়ার কারণে। অর্থাৎ, সেই দিনকে স্মরণ কর অথবা সেই দিনকে ভয় কর, যেদিন তাঁর كُنْ (হও) শব্দ দ্বারা তিনি যা চাইবেন, তা-ই হয়ে যাবে। এর দ্বারা যে কথাটির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, তা হল এই যে, হিসাব-কিতাবের এই কঠিন মুহূর্তগুলোও অতি সত্বর পার হয়ে যাবে। তবে কার জন্যে? ঈমানদারদের জন্যে। অন্যদেরকে তো এ দিনটা হাজার বছর অথবা পঞ্চাশ হাজার বছরের মত ভারী মনে হবে।

[৩] صُوْرٌ বলতে সেই শিঙ্গাকে বুঝানো হয়েছে, যার ব্যাপারে হাদীসে এসেছে যে, ইস্রাফীল ফিরিশতা (আঃ) সেটাকে মুখে নিয়ে মস্তক নত করে আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁকে বলা হবে, তুমি তাতে ফুঁ দাও। (ইবনে কাসীর) আবূ দাউদ এবং তিরমিযীতে আছে যে, "সূর একটি বাঁশি, যাতে ফুঁ দেওয়া হবে। (হাদীস নং ৪৭৪২-৩২৪৪) কোন কোন উলামার মতে শিঙ্গা তিনবার ফুঁকা হবে। نَفْخَةُ الصَّعْق (যাতে সমস্ত মানুষ অজ্ঞান হয়ে যাবে)। نَفْخَةُ الفَنَاء (যাতে সমস্ত মানুষ ধ্বংস হয়ে যাবে)। نَفْخَةُ الإِنْشَاء (যাতে সমস্ত মানুষ পুনর্জীবিত হয়ে যাবে)। আবার কোন কোন আলেম শেষোক্ত দু'টি ফুঁকের কথাই বলেছেন। আর আল্লাহই ভালো জানেন।

Al-An'aam 6:73Listen in Qur'an →
74

۞ وَإِذْ قَالَ إِبْرَٰهِيمُ لِأَبِيهِ ءَازَرَ أَتَتَّخِذُ أَصْنَامًا ءَالِهَةً ۖ إِنِّىٓ أَرَىٰكَ وَقَوْمَكَ فِى ضَلَٰلٍۢ مُّبِينٍۢ

স্মরণ কর, যখন ইব্রাহীম পিতা আযরকে বললেনঃ তুমি কি প্রতিমা সমূহকে উপাস্য মনে কর? আমি দেখতে পাচ্ছি যে, তুমি ও তোমার সম্প্রদায় প্রকাশ্য পথভ্রষ্ট।

স্মরণ কর, ইব্রাহীম তার পিতা আযরকে[১] বলেছিল, আপনি কি মূর্তিসমূহকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেন? আমি তো আপনাকে ও আপনার সম্প্রদায়কে সুস্পষ্ট ভ্রান্তিতে দেখছি।

[১] ঐতিহাসিকগণ ইবরাহীম (আঃ)-এর পিতার দু'টি নাম উল্লেখ করেছেন। আযর এবং তারেখ। হতে পারে দ্বিতীয় নামটি আসলে তার উপাধি। আবার কেউ বলেছেন, আযর ইবরাহীম (আঃ)-এর চাচার নাম। তবে এটা সঠিক নয়, কেননা, কুরআন আযরকে ইবরাহীম (আঃ)-এর পিতা হিসাবে উল্লেখ করেছে। অতএব এটাই ঠিক।

Al-An'aam 6:74Listen in Qur'an →
75

وَكَذَٰلِكَ نُرِىٓ إِبْرَٰهِيمَ مَلَكُوتَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضِ وَلِيَكُونَ مِنَ ٱلْمُوقِنِينَ

আমি এরূপ ভাবেই ইব্রাহীমকে নভোমন্ডল ও ভুমন্ডলের অত্যাশ্চর্য বস্তুসমূহ দেখাতে লাগলাম-যাতে সে দৃঢ় বিশ্বাসী হয়ে যায়।

এভাবে ইব্রাহীমকে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর রাজত্ব প্রদর্শন করি, যাতে সে নিশ্চিত বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়। [১]

[১] مَلَكُوْتٌ 'মুবালাগা' (আধিক্যবোধক) শব্দ। যেমন, رَغْبَةٌ থেকে رَغَبُوتٌ আর رَهْبَةٌ থেকে رَهَبُوتٌ ইত্যাদি। এর অর্থ, রাজত্ব, উদ্দেশ্য সৃষ্টিকুল। অথবা আল্লাহর প্রতিপালকত্ব ও উপাস্যত্ব। অর্থাৎ, আমি তাঁকে তা দেখালাম এবং তা জানার তাওফীক দিলাম। কিংবা অর্থ হল, আরশ থেকে নিয়ে পৃথিবীর শেষ সীমানা পর্যন্ত আমি ইবরাহীম (আঃ)-এর জন্য উপস্থাপন ও প্রকাশ করলাম এবং তাঁকে তা দেখালাম। (ফাতহুল ক্বাদীর)

Al-An'aam 6:75Listen in Qur'an →
76

فَلَمَّا جَنَّ عَلَيْهِ ٱلَّيْلُ رَءَا كَوْكَبًۭا ۖ قَالَ هَٰذَا رَبِّى ۖ فَلَمَّآ أَفَلَ قَالَ لَآ أُحِبُّ ٱلْءَافِلِينَ

অনন্তর যখন রজনীর অন্ধকার তার উপর সমাচ্ছন্ন হল, তখন সে একটি তারকা দেখতে পেল, বললঃ ইহা আমার প্রতিপালক। অতঃপর যখন তা অস্তমিত হল তখন বললঃ আমি অস্তগামীদেরকে ভালবাসি না।

অতঃপর রাতের অন্ধকার যখন তাকে আচ্ছন্ন করল, তখন সে নক্ষত্র দেখে বলল, ‘ঐটিই আমার প্রতিপালক।’ অতঃপর যখন ঐটি অস্তমিত হল, তখন সে বলল, ‘যা অস্তমিত হয় তা আমি পছন্দ করি না।’ [১]

[১] অর্থাৎ, অস্তগামী উপাস্যদেরকে পছন্দ করি না। কারণ, অস্ত যাওয়া হল, অবস্থার পরিবর্তন ঘটার দলীল এবং তা হল, ধ্বংস হওয়ার দলীল। আর ধ্বংসশীল কখনো উপাস্য হতে পারে না।

Al-An'aam 6:76Listen in Qur'an →
77

فَلَمَّا رَءَا ٱلْقَمَرَ بَازِغًۭا قَالَ هَٰذَا رَبِّى ۖ فَلَمَّآ أَفَلَ قَالَ لَئِن لَّمْ يَهْدِنِى رَبِّى لَأَكُونَنَّ مِنَ ٱلْقَوْمِ ٱلضَّآلِّينَ

অতঃপর যখন চন্দ্রকে ঝলমল করতে দেখল, বললঃ এটি আমার প্রতিপালক। অনন্তর যখন তা অদৃশ্য হয়ে গেল, তখন বলল যদি আমার প্রতিপালক আমাকে পথ-প্রদর্শন না করেন, তবে অবশ্যই আমি বিভ্রান্ত সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।

অতঃপর যখন সে চন্দ্রকে সমুজ্জ্বল দেখল, তখন বলল, ‘এটি আমার প্রতিপালক।’ যখন সেটি অস্তমিত হল, তখন সে বলল, ‘আমাকে আমার প্রতিপালক সৎপথ প্রদর্শন না করলে, আমি অবশ্যই পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হব।’

Al-An'aam 6:77Listen in Qur'an →
78

فَلَمَّا رَءَا ٱلشَّمْسَ بَازِغَةًۭ قَالَ هَٰذَا رَبِّى هَٰذَآ أَكْبَرُ ۖ فَلَمَّآ أَفَلَتْ قَالَ يَٰقَوْمِ إِنِّى بَرِىٓءٌۭ مِّمَّا تُشْرِكُونَ

অতঃপর যখন সূর্যকে চকচক করতে দেখল, বললঃ এটি আমার পালনকর্তা, এটি বৃহত্তর। অতপর যখন তা ডুবে গেল, তখন বলল হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা যেসব বিষয়কে শরীক কর, আমি ওসব থেকে মুক্ত।

অতঃপর যখন সে সূর্যকে প্রদীপ্ত দেখল, তখন বলল, ‘এটি[১] আমার প্রতিপালক, এটি সর্ববৃহৎ।’ যখন সেটিও অস্তমিত হল, তখন সে বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যাকে আল্লাহর অংশী কর, তা থেকে আমি নির্লিপ্ত।[২]

[১] شَمْسٌ (সূর্য) আরবীতে স্ত্রীলিঙ্গ, অথচ 'ইসমে ইশারা' অব্যয় (পুংলিঙ্গ) ব্যবহার হয়েছে। কারণ, এ থেকে লক্ষ্য হল, الطالع অর্থাৎ, উদীয়মান এই সূর্য আমার প্রতিপালক। কেননা, এটাই সব থেকে বড়। যেমন, সূর্য-পূজারীরা ভুল বুঝে এর পূজা করে। আকাশে অবস্থিত গ্রহ-নক্ষত্রসমূহের মধ্যে (মানুষের চোখে) সূর্যই হল সব চেয়ে বড়, সর্বাধিক দীপ্তিমান এবং মানব জীবনের স্থায়িত্ব ও স্থিতিশীলতার জন্য এর গুরুত্ব ও উপকারিতা যে কত, তা বর্ণনা ও বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন হয় না। এই জন্যই বস্তুপূজারীদের মাঝে সূর্যের পূজা সাধারণভাবে বিদ্যমান থেকেছে। ইবরাহীম (আঃ) অতি সূক্ষ্ণভাবে চাঁদ ও সূর্য-পূজারীদের জন্য তাদের উপাস্যদের অযোগ্যতার কথা সুস্পষ্ট করেন।

[২] অর্থাৎ, সেই সমস্ত জিনিসের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই, যেগুলোকে তোমরা আল্লাহর শরীক নির্ণয় করেছ এবং যেগুলোর তোমরা পূজাও করছ। কারণ, এদের মধ্যে পরিবর্তন সূচিত হয়। কখনো উদয় হয়, আবার কখনো অস্ত যায়। আর এ থেকে প্রমাণ হয় যে, এরা সৃষ্টি এবং এদের স্রষ্টা এমন কেউ আছেন, যাঁর নির্দেশের এরা আওতাধীন। আর এরা যখন নিজেরাই সৃষ্টি এবং অন্য কারো আওতাধীন, তখন কারো ইষ্টানিষ্টের উপর কিভাবে ক্ষমতা রাখতে পারে?

** প্রসিদ্ধি আছে যে, সে যুগের বাদশাহ নমরূদ তার একটি স্বপ্ন এবং জ্যোতিষীদের ব্যাখ্যার আলোকে নবজাত শিশুদের হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিল। ইবরাহীম (আঃ) সে যুগেই জন্ম গ্রহণ করেন। তাই তাঁকে একটি গুহার মধ্যে গোপন রাখা হয়েছিল, যাতে নমরূদ ও তার কর্মচারীদের হাতে হত্যা হওয়া থেকে বেঁচে যান। সেই গুহাতে যখন তাঁর বিবেক-বুদ্ধির উন্মেষ ঘটল এবং তিনি তারা, চাঁদ ও সূর্য দেখলেন, তখন স্বীয় মনের এই প্রভাবগত খেয়াল ব্যক্ত করলেন। কিন্তু গুহা সম্পর্কীয় এ কথার কোন ভিত্তি নেই। কুরআনের ভাষা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, তিনি তাঁর জাতির সাথে কথোপকথনের সময় এই ধরনের কথা (অভিনয়ছলে) বলেছিলেন। এই কারণেই পরিশেষে (হুজ্জত পেশ করে) জাতিকে সম্বোধন করে বললেন, আমি তোমাদের নির্ধারিত শরীক থেকে মুক্ত। আর এই কথোপকথনের উদ্দেশ্যই ছিল, জাতিকে তাদের বাতিল উপাস্যগুলোর প্রকৃত অবস্থার রহস্য উদ্ঘাটন করা। (এই জন্য অনেকে বলেছেন, ইবরাহীম (আঃ) প্রশ্নবোধক শব্দে বলেছিলেন, 'এটি আমার প্রতিপালক?')

Al-An'aam 6:78Listen in Qur'an →
79

إِنِّى وَجَّهْتُ وَجْهِىَ لِلَّذِى فَطَرَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضَ حَنِيفًۭا ۖ وَمَآ أَنَا۠ مِنَ ٱلْمُشْرِكِينَ

আমি এক মুখী হয়ে স্বীয় আনন ঐ সত্তার দিকে করেছি, যিনি নভোমন্ডল ও ভুমন্ডল সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরেক নই।

নিশ্চয়ই আমি একনিষ্ঠভাবে তাঁর দিকে মুখ[১] ফিরাচ্ছি, যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই।’

[১] মুখমন্ডল বা চেহারার উল্লেখ এই জন্য করেছেন যে, চেহারাই হল মানুষের আসল পরিচয়ের জায়গা। আর এ থেকে লক্ষ্য হয় ব্যক্তি। অর্থাৎ, আমার ইবাদত ও তাওহীদের উদ্দেশ্য হল মহান আল্লাহ; যিনি আসমান ও যমীনের স্রষ্টা।

Al-An'aam 6:79Listen in Qur'an →
80

وَحَآجَّهُۥ قَوْمُهُۥ ۚ قَالَ أَتُحَٰٓجُّوٓنِّى فِى ٱللَّهِ وَقَدْ هَدَىٰنِ ۚ وَلَآ أَخَافُ مَا تُشْرِكُونَ بِهِۦٓ إِلَّآ أَن يَشَآءَ رَبِّى شَيْـًۭٔا ۗ وَسِعَ رَبِّى كُلَّ شَىْءٍ عِلْمًا ۗ أَفَلَا تَتَذَكَّرُونَ

তাঁর সাথে তার সম্প্রদায় বিতর্ক করল। সে বললঃ তোমরা কি আমার সাথে আল্লাহর একত্ববাদ সম্পর্কে বিতর্ক করছ; অথচ তিনি আমাকে পথ প্রদর্শন করেছেন। তোমরা যাদেরকে শরীক কর, আমি তাদেরকে ভয় করি না তবে আমার পালকর্তাই যদি কোন কষ্ট দিতে চান। আমার পালনকর্তাই প্রত্যেক বস্তুকে স্বীয় জ্ঞান দ্বারা বেষ্টন করে আছেন। তোমরা কি চিন্তা কর না ?

তার সম্প্রদায় তার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হল।[১] সে বলল, ‘তোমরা কি আল্লাহ সম্বন্ধে আমার সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হবে? তিনি তো আমাকে সৎপথে পরিচালিত করেছেন। আমার প্রতিপালক অন্যবিধ ইচ্ছা না করলে, তোমরা যাকে তাঁর অংশী কর, তাকে আমি ভয় করি না। সবকিছুই আমার প্রতিপালকের জ্ঞানায়ত্ত। তবে কি তোমরা অনুধাবন কর না?

[১] জাতিরা যখন তাওহীদের এ ওয়ায-নসীহত শুনলো যাতে তাদের বাতিল উপাস্যগুলোর খন্ডনও ছিল, তখন তারাও তাদের প্রমাণাদি পেশ করতে আরম্ভ করল। আর এ থেকে জানা যায় যে, মুশরিকরাও তাদের শিরকের উপর কোন কোন দলীল বানিয়ে রাখত। বর্তমানেও এ জিনিস লক্ষ্য করা যায়। শিরকীয় আকীদা পোষণকারী যত দল আছে, সকলেই তাদের জনতাকে সন্তুষ্ট করা ও রাখার জন্য এমন 'অবলম্বন' খুঁজে রেখেছে, যাকে তারা 'দলীল' মনে করে অথবা যার মাধ্যমে কমসে-কম মিথ্যার জালে বন্দী জনগণকে ঐ জালেই ফাঁসিয়ে রাখা সম্ভব হয়।

Al-An'aam 6:80Listen in Qur'an →

Commentary: Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation. Qur'an text and translation via AlQuran Cloud.