Muslim99Muslim99
← Tafsir library

5. Al-Maaida

The Table · Medinan · 120 ayahs

سُورَةُ المَائـِدَةِ

Reading Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation

Ayahs 1–10 of 120

بِسْمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ

1

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ أَوْفُوا۟ بِٱلْعُقُودِ ۚ أُحِلَّتْ لَكُم بَهِيمَةُ ٱلْأَنْعَٰمِ إِلَّا مَا يُتْلَىٰ عَلَيْكُمْ غَيْرَ مُحِلِّى ٱلصَّيْدِ وَأَنتُمْ حُرُمٌ ۗ إِنَّ ٱللَّهَ يَحْكُمُ مَا يُرِيدُ

মুমিনগণ, তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ন কর। তোমাদের জন্য চতুষ্পদ জন্তু হালাল করা হয়েছে, যা তোমাদের কাছে বিবৃত হবে তা ব্যতীত। কিন্তু এহরাম বাধাঁ অবস্থায় শিকারকে হালাল মনে করো না! নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা যা ইচ্ছা করেন, নির্দেশ দেন।

হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা অঙ্গীকার (ও চুক্তিসমূহ) পূর্ণ কর।[১] যে সব জন্তুর কথা তোমাদের উপর পাঠ করা হচ্ছে[২] তা ছাড়া (ক্ষুরবিশিষ্ট) চতুষ্পদ জন্তু তোমাদের জন্য বৈধ করা হল,[৩] তবে ইহরাম অবস্থায় শিকারকে বৈধ মনে করবে না। নিশ্চয় আল্লাহ নিজ ইচ্ছামত আদেশ প্রদান করে থাকেন।

[১] 'عقود' এটা 'عقد' এর বহুবচন। যার আভিধানিক অর্থ গিরা লাগানো। এ শব্দ কোন বস্তু (দড়ি, সূতা, চুল ইত্যাদি)-তে গিরা বাঁধার অর্থেও ব্যবহার হয়; যেমন অঙ্গীকার ও চুক্তি করার অর্থেও ব্যবহার হয়। এখানে এর অর্থ, আল্লাহ প্রদত্ত বিধি-বিধান যা মানুষের উপর আরোপ করা হয়েছে। অনুরূপ লোকেরা ব্যবহারিক জীবনে নিজেদের মধ্যে যে অঙ্গীকার ও চুক্তি করে, তাকেও বুঝানো হয়েছে। উভয়ই পালন ও পূর্ণ করা আবশ্যিক।[২] بهيمة চতুষ্পদ জন্তুকে বলা হয়। بهم ـ إبهام ধাতু থেকে এর উৎপত্তি। কেউ কেউ বলেন, এদের বাকশক্তি, জ্ঞান ও বোধশক্তিতে যেহেতু إبهام (রুদ্ধতা) আছে, তার জন্য এদেরকে بهيمة বলা হয়েছে। أَنْعاَمٌ উট, গরু, ছাগল ও ভেঁড়া বা দুম্বাকে বলা হয়। কেননা এদের গতি ও চালচলনে نعومة (নম্রতা) থাকে। بهيمة الأنعام (চতুষ্পদ জন্তু) নর ও মাদী মিলে আট প্রকার; যা সূরা আনআম ৬:১৪৩ নং আয়াতে বিস্তারিত আকারে বর্ণিত হয়েছে। এ ছাড়া যে সব পশুকে অহ্শী, জংলী, বন্য বা বুনো বলা হয়; যেমন হরিণ, নীল গাই ইত্যাদি, যেগুলো সাধারণতঃ শিকার করা হয়, সেগুলোও বৈধ। কিন্তু ইহরাম অবস্থায় এগুলো ও অন্যান্য পাখী শিকার করা নিষেধ। সুন্নাহতে বর্ণিত নীতি অনুসারে যে পশু শিকারী দাঁতবিশিষ্ট এবং যে পাখী শিকারী নখবিশিষ্ট নয় তা হালাল। যেমন সূরা বাক্বারার ২:১৭৩ নং আয়াতের টীকায় এর বিস্তারিত বিবরণ উল্লিখিত হয়েছে। শিকারী দাঁতবিশিষ্ট পশু বলতে সেই পশু উদ্দিষ্ট, যে তার শিকারী বা ছেদক দাঁত দ্বারা শিকার ধরে ও ফেড়ে খায়; যেমন বাঘ (সিংহ, চিতা, নেকড়ে), কুকুর প্রভৃতি। আর শিকারী নখবিশিষ্ট পাখী বলতে সেই পাখী উদ্দিষ্ট, যে তার ধারালো নখর দ্বারা শিকার ধরে; যেমন শকুনি, বাজ, ঈগল, চিল, কাক ইত্যাদি।[৩] এর বিস্তারিত বিবরণ ৫:৩ নং আয়াতে আসছে।

2

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ لَا تُحِلُّوا۟ شَعَٰٓئِرَ ٱللَّهِ وَلَا ٱلشَّهْرَ ٱلْحَرَامَ وَلَا ٱلْهَدْىَ وَلَا ٱلْقَلَٰٓئِدَ وَلَآ ءَآمِّينَ ٱلْبَيْتَ ٱلْحَرَامَ يَبْتَغُونَ فَضْلًۭا مِّن رَّبِّهِمْ وَرِضْوَٰنًۭا ۚ وَإِذَا حَلَلْتُمْ فَٱصْطَادُوا۟ ۚ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَـَٔانُ قَوْمٍ أَن صَدُّوكُمْ عَنِ ٱلْمَسْجِدِ ٱلْحَرَامِ أَن تَعْتَدُوا۟ ۘ وَتَعَاوَنُوا۟ عَلَى ٱلْبِرِّ وَٱلتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا۟ عَلَى ٱلْإِثْمِ وَٱلْعُدْوَٰنِ ۚ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ ۖ إِنَّ ٱللَّهَ شَدِيدُ ٱلْعِقَابِ

হে মুমিনগণ! হালাল মনে করো না আল্লাহর নিদর্শনসমূহ এবং সম্মানিত মাসসমূহকে এবং হরমে কুরবানীর জন্যে নির্দিষ্ট জন্তুকে এবং ঐসব জন্তুকে, যাদের গলায় কন্ঠাভরণ রয়েছে এবং ঐসব লোককে যারা সম্মানিত গৃহ অভিমুখে যাচ্ছে, যারা স্বীয় পালনকর্তার অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে। যখন তোমরা এহরাম থেকে বের হয়ে আস, তখন শিকার কর। যারা পবিত্র মসজিদ থেকে তোমাদেরকে বাধা প্রদান করেছিল, সেই সম্প্রদায়ের শুত্রুতা যেন তোমাদেরকে সীমালঙ্ঘনে প্ররোচিত না করে। সৎকর্ম ও খোদাভীতিতে একে অন্যের সাহায্য কর। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা কঠোর শাস্তিদাতা।

হে বিশ্বাসীগণ! আল্লাহর নিদর্শনের,[১] পবিত্র মাসের,[২] হজ্জে যবেহযোগ্য কুরবানীর পশু, গলদেশে কিছু বেঁধে চিহ্নিত করে কুরবানীর জন্য কা’বায় প্রেরিত পশুর[৩] এবং নিজ প্রতিপালকের অনুগ্রহ ও সন্তোষ লাভের আশায় পবিত্র গৃহ-অভিমুখীদের[৪] পবিত্রতার অবমাননা করো না। যখন তোমরা ইহরাম-মুক্ত হবে তখন শিকার করতে পার।[৫] তোমাদেরকে পবিত্র মসজিদে বাধা দেবার ফলে কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদেরকে যেন কখনই সীমালংঘনে প্ররোচিত না করে।[৬] সৎ কাজ ও আত্মসংযমে তোমরা পরস্পর সহযোগিতা কর এবং পাপ ও সীমালংঘনের কাজে একে অন্যের সাহায্য করো না।[৭] আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে অতি কঠোর।

[১] شعائر শব্দটি شعيرة এর বহুবচন। যার ভাবার্থ, আল্লাহর পক্ষ থেকে নিষিদ্ধ ও সম্মানীয় বস্তুসমূহ। (অর্থাৎ, যাদের মর্যাদা ও সম্মান আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত)। কিছু উলামাগণ মনে করেন যে, এই মর্যাদাযোগ্য ও সম্মানীয় বস্তুগুলি ব্যাপক। কিছু উলামাগণের নিকট হজ্জ ও উমরার ইবাদত ও স্থানসমূহ উদ্দিষ্ট। অর্থাৎ, তার অমর্যাদা ও অসম্মান করো না। অনুরূপ হজ্জ ও উমরাহ পালনের ব্যাপারে অপরকে বাধা দিয়ো না। কেননা এটাও এক প্রকার অমর্যাদা ও অসম্মান প্রদর্শন।[২] الشهر الحرام একবচন বলে শ্রেণী উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, নিষিদ্ধ, পবিত্র বা সম্মানীয় শ্রেণীর চারটি মাস (অর্থাৎ, রজব, যুল-ক্বা'দাহ, যুল-হিজ্জাহ ও মুহার্রম) এই মাসগুলির মর্যাদা ও সম্মান রক্ষা কর এবং তাতে যুদ্ধ-বিগ্রহ করো না। কেউ কেউ মনে করেন যে, নিষিদ্ধ ও সম্মানীয় মাস শুধু যুল-হিজ্জাহ মাস। আবার কেউ মনে করেন যে, উক্ত নির্দেশ কুরআনের এই আয়াত {فَاقْتُلُواْ الْمُشْرِكِينَ حَيْثُ وَجَدتُّمُوهُمْ} (অর্থাৎ, মুশরিকদেরকে যখন যেথায় পাবে হত্যা কর) দ্বারা রহিত হয়ে গেছে। অথচ রহিত মনে করার কোন প্রয়োজনই হয় না। কারণ, উভয় নির্দেশ নিজ নিজ জায়গায় বহাল আছে; উভয়ের মধ্যে কোন রকম পরস্পরবিরোধ নেই।[৩] هَدْيٌ হাদ্ঈ ঐ পশুকে বলা হয়, যাকে কুরবানী দেওয়ার জন্য হাজীগণ সঙ্গে করে হারামে নিয়ে যেতেন । قلائد শব্দটি قلادة শব্দের বহুবচন। যার অর্থ গলায় ঝুলানো কিছু। আর এখানে হজ্জ ও উমরাহর সময় কুরবানীযোগ্য পশুকে বুঝানো হয়েছে, যাদের গলায় আলামত ও চিহ্নের জন্য জুতা বা ফিতা বেঁধে দেওয়া হত। (যাতে লোকে বুঝতে পারে যে, এটা কুরবানীর পশু)। সুতরাং قلائد এর ভাবার্থ হল, ঐ সমস্ত পশু, যেগুলিকে কুরবানী করার জন্য মক্কার হারামে নিয়ে যাওয়া হয়। এটা 'হাদঈ'র অতিরিক্ত তাকীদ। উদ্দেশ্য হল, ঐ সমস্ত পশুকে কেউ যেন ছিনতাই না করে এবং হারাম পর্যন্ত পৌঁছনোর ব্যাপারে কেউ যেন কোন প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি না করে।[৪] অর্থাৎ, হজ্জ ও উমরাহর নিয়তে কিংবা ব্যবসা বাণিজ্য ও কর্মের উদ্দেশ্যে হারামের যাত্রীদের জন্য প্রতিবন্ধকতা ও সঙ্কীর্ণতার সৃষ্টি করো না। কোন কোন ভাষ্যকারের মন্তব্য হল, এই বিধান ঐ সময়ের জন্য ছিল, যখন মুসলমান ও মুশরিকগণ একত্রে হজ্জ ও উমরাহ পালন করত। কিন্তু যখন এই আয়াত অবতীর্ণ হল; {إِنَّمَا الْمُشْرِكُونَ نَجَسٌ فَلَا يَقْرَبُوا الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ بَعْدَ عَامِهِمْ هَذَا} অর্থাৎ, মুশরিকরা অপবিত্র, সুতরাং তারা যেন এ বছরের পর মাসজিদুল হারামের নিকটবর্তী না হয়। (সূরা তাওবা ৯:২৮ নং আয়াত) তখন এই আয়াত মুশরিকদের ক্ষেত্রে রহিত বা মানসুখ হয়ে গেল। আবার কোন কোন ভাষ্যকারের মতে এই আয়াতের বিধান রহিত নয় এবং এই হুকুম বা বিধান মুসলমানদের জন্য প্রযোজ্য। (অর্থাৎ, তোমরা হারামের মুসলিম যাত্রীদের জন্য প্রতিবন্ধকতার প্রাচীর খাড়া করো না।) (ফাতহুল ক্বাদীর)[৫] আলোচ্য আয়াতে আজ্ঞাসূচক ক্রিয়াটি অনুমতি বা জায়েযের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ; যখন ইহরাম খুলে দেবে (অর্থাৎ হালাল হয়ে যাবে), তখন তোমাদের জন্য শিকার করা বৈধ।[৬] অর্থাৎ; মুশরিকরা তোমাদেরকে ৬ষ্ঠ হিজরীতে মসজিদে হারামে যেতে বাধা প্রদান করেছিল। কিন্তু তাদের বাধাদানের কারণে তোমরা তাদের সাথে সীমালংঘনমূলক ও …

3

حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ ٱلْمَيْتَةُ وَٱلدَّمُ وَلَحْمُ ٱلْخِنزِيرِ وَمَآ أُهِلَّ لِغَيْرِ ٱللَّهِ بِهِۦ وَٱلْمُنْخَنِقَةُ وَٱلْمَوْقُوذَةُ وَٱلْمُتَرَدِّيَةُ وَٱلنَّطِيحَةُ وَمَآ أَكَلَ ٱلسَّبُعُ إِلَّا مَا ذَكَّيْتُمْ وَمَا ذُبِحَ عَلَى ٱلنُّصُبِ وَأَن تَسْتَقْسِمُوا۟ بِٱلْأَزْلَٰمِ ۚ ذَٰلِكُمْ فِسْقٌ ۗ ٱلْيَوْمَ يَئِسَ ٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ مِن دِينِكُمْ فَلَا تَخْشَوْهُمْ وَٱخْشَوْنِ ۚ ٱلْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِى وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلْإِسْلَٰمَ دِينًۭا ۚ فَمَنِ ٱضْطُرَّ فِى مَخْمَصَةٍ غَيْرَ مُتَجَانِفٍۢ لِّإِثْمٍۢ ۙ فَإِنَّ ٱللَّهَ غَفُورٌۭ رَّحِيمٌۭ

তোমাদের জন্যে হারাম করা হয়েছে মৃত জীব, রক্ত, শুকরের মাংস, যেসব জন্তু আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গকৃত হয়, যা কন্ঠরোধে মারা যায়, যা আঘাত লেগে মারা যায়, যা উচ্চ স্থান থেকে পতনের ফলে মারা যা, যা শিং এর আঘাতে মারা যায় এবং যাকে হিংস্র জন্তু ভক্ষণ করেছে, কিন্তু যাকে তোমরা যবেহ করেছ। যে জন্তু যজ্ঞবেদীতে যবেহ করা হয় এবং যা ভাগ্য নির্ধারক শর দ্বারা বন্টন করা হয়। এসব গোনাহর কাজ। আজ কাফেররা তোমাদের দ্বীন থেকে নিরাশ হয়ে গেছে। অতএব তাদেরকে ভয় করো না বরং আমাকে ভয় কর। আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্নাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম। অতএব যে ব্যাক্তি তীব্র ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়ে; কিন্তু কোন গোনাহর প্রতি প্রবণতা না থাকে, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা ক্ষমাশীল।

তোমাদের জন্য হারাম (অবৈধ) করা হয়েছে মৃত পশু, রক্ত ও শূকর-গোশত, আল্লাহ ভিন্ন অন্যের নামে উৎসর্গীকৃত পশু,[১] শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত জন্তু,[২] ধারবিহীন কিছু দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মৃত জন্তু,[৩] পতনে মৃত জন্তু,[৪] শৃঙ্গাঘাতে মৃত জন্তু[৫] এবং হিংস্র পশুর খাওয়া জন্তু;[৬] তবে তোমরা যা যবেহ দ্বারা পবিত্র করেছ তা ছাড়া।[৭] আর যা মূর্তি পূজার বেদীর উপর বলি দেওয়া হয় তা[৮] এবং জুয়ার তীর দ্বারা ভাগ্য নির্ণয় করা,[৯] এ সব পাপকার্য। আজ অবিশ্বাসীগণ তোমাদের ধর্মের বিরুদ্ধাচরণে হতাশ হয়েছে। সুতরাং তাদেরকে ভয় করো না, শুধু আমাকে ভয় কর। আজ তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম (ইসলাম) পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের ধর্ম হিসাবে মনোনীত করলাম। তবে যদি কেউ ক্ষুধার তাড়নায় (নিষিদ্ধ জিনিষ খেতে) বাধ্য হয়; কিন্তু ইচ্ছা করে পাপের দিকে ঝুঁকে না, তাহলে (তার জন্য) আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [১০]

[১] এখান থেকে ঐ সমস্ত নিষিদ্ধ বা হারামকৃত (পশুর) ব্যাপারে আলোচনা শুরু হচ্ছে, যার ইঙ্গিত সূরার প্রারম্ভে দেওয়া হয়েছে। আয়াতের এই অংশটুকু সূরা বাক্বারাতে উল্লেখ হয়েছে। (দেখুন আয়াত নং ২:১৭৩)[২] যাকে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে অথবা নিজেই কোনভাবে ফাঁস লাগা অবস্থায় শবাসরুদ্ধ হয়ে মৃত্যু বরণ করেছে, উভয় অবস্থায় এই মৃত (পশু ভক্ষণ) করা হারাম।[৩] অর্থাৎ, পাথর অথবা লাঠি অথবা অন্য কোন জিনিস দ্বারা আঘাত করার কারণে বিনা যবেহতে মারা গেছে। জাহেলী যুগে এই সমস্ত পশুকে (হালাল মনে করে) ভক্ষণ করা হত। ইসলামী শরীয়তে তা নিষেধ করে দেওয়া হয়ছে। বন্দুকের শিকার; বন্দুক দ্বারা শিকার করা হয়েছে এমন পশুর ব্যাপারে উলামাদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। ইমাম শাওকানী (রঃ) বন্দুক দ্বারা শিকার করা পশুর ব্যাপারে একটি হাদীস থেকে প্রমাণ উল্লেখ করে তা হালাল বলেছেন। অর্থাৎ (শিকারী) যদি 'বিসমিল্লাহ' বলে গুলি ছুঁড়ে এবং যবেহ করার পূর্বেই শিকার মারা যায়, তাহলে তাঁর মতানুসারে তা ভক্ষণ করা বৈধ। (ফাতহুল ক্বাদীর) (অন্য মতে, যে বন্দুকের গুলি শিকারের দেহ ভেদ করে যায়, চামড়া কেটে ফেলে রক্তপাত ঘটায় সে বন্দুকের শিকার হালাল। পক্ষান্তরে ভেদ না করে কেবল আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মারা গেলে তা খাওয়া বৈধ নয়।) (সিলসিলাহ সহীহাহ ৫/৫১১)[৪] (ঐ পশু) যে কোনভাবে পড়ে অথবা কেউ পাহাড় বা অন্য কোন উঁচু জায়গা থেকে ধাক্কা মারার কারণে পড়ে গিয়ে মারা যায়।[৫] نطيحة , منطوحة ঐ পশুকে বলা হয়; যাকে অন্য পশু শিং দ্বারা ধাক্কা মেরেছে বা শিং-লড়ায়ে বিনা যবাইয়ে তার মৃত্যু হয়েছে।[৬] অর্থাৎ সিংহ, চিতা ও নেকড়ে বাঘ ইত্যাদি (শিকারী বা ছেদক দাঁতবিশিষ্ট) হিংস্রজন্তু যদি কোন শিকারকে নিজে খাওয়ার উদ্দেশ্যে ধরার ফলে মৃত্যু হয়েছে (এমন পশু)। জাহেলী যুগে এই ধরণের মৃত জানোয়ার খাওয়া হত। (কিন্ত ইসলাম এই ধরণের মৃত পশু খাওয়া হারাম করে দিয়েছে।)[৭] অধিকাংশ মুফাসসিরগণের নিকটে এই ব্যতিক্রম পূর্বে উল্লিখিত শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত জন্তু, ধারবিহীন কিছু দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মৃত জন্তু, পতনে মৃত জন্তু, শৃঙ্গাঘাতে মৃত জন্তু এবং হিংস্র পশুর খাওয়া জন্তুর ব্যাপারে। অর্থাৎ, ব্যতিক্রম হল, যদি ঐ সকল পশুকে তোমরা এমন অবস্থায় পাও যে, তার মৃত্যু হয়নি; এখনো জীবিত আছে, তারপর তাকে শরয়ী পদ্ধতিতে যবেহ কর, তাহলে তোমাদের জন্য (ঐ পশু) খাওয়া বৈধ হবে। জীবিত থাকার চিহ্ন হল, যবেহ করার সময় যেন তার হাত-পা নড়ে ওঠে। কিন্তু ছুরি চালানোর সময় যদি এই অবস্থা না হয়, তাহলে জানতে হবে সে পশুটি মৃত। যবেহর শরয়ী পদ্ধতি হল, 'বিসমিল্লাহ' বলে ধারালো ছুরি দ্বারা এমনভাবে তার গলায় পেঁচাতে হবে যেন তার সমস্ত মোটা শিরাগুলি কেটে যায়। যবেহ ছাড়াও শরীয়তে 'নহর' করা বৈধ; যার পদ্ধতি হল, পশু দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় সিনায় ছুরি (বা বর্শা) দ্বারা আঘাত করতে হবে; যাতে তার কণ্ঠনালী ও রক্তবাহী বিশেষ শিরা কেটে যায় এবং সমস্ত রক্ত প্রবাহিত হয়ে যায়।[৮] মুশরিকগণ …

4

يَسْـَٔلُونَكَ مَاذَآ أُحِلَّ لَهُمْ ۖ قُلْ أُحِلَّ لَكُمُ ٱلطَّيِّبَٰتُ ۙ وَمَا عَلَّمْتُم مِّنَ ٱلْجَوَارِحِ مُكَلِّبِينَ تُعَلِّمُونَهُنَّ مِمَّا عَلَّمَكُمُ ٱللَّهُ ۖ فَكُلُوا۟ مِمَّآ أَمْسَكْنَ عَلَيْكُمْ وَٱذْكُرُوا۟ ٱسْمَ ٱللَّهِ عَلَيْهِ ۖ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ سَرِيعُ ٱلْحِسَابِ

তারা আপনাকে জিজ্ঞেস করে যে, কি বস্তু তাদের জন্যে হালাল? বলে দিন, তোমাদের জন্যে পবিত্র বস্তুসমূহ হালাল করা হয়েছে। যেসব শিকারী জন্তুকে তোমরা প্রশিক্ষণ দান কর শিকারের প্রতি প্রেরণের জন্যে এবং ওদেরকে ঐ পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দাও, যা আল্লাহ তোমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন। এমন শিকারী জন্তু যে শিকারকে তোমাদের জন্যে ধরে রাখে, তা খাও এবং তার উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ কর। আল্লাহকে ভয় করতে থাক। নিশ্চয় আল্লাহ সত্ত্বর হিসাব গ্রহণকারী।

লোকে তোমাকে প্রশ্ন করে, তাদের জন্য কী কী বৈধ করা হয়েছে? বল, সমস্ত ভাল (পবিত্র) জিনিস তোমাদের জন্য বৈধ করা হয়েছে[১] এবং শিকারী পশুপক্ষী যেগুলোকে তোমরা শিকার শিক্ষা দিয়েছ; যেভাবে আল্লাহ তোমাদের শিক্ষা দিয়েছেন[২] -ঐ (শিক্ষা দেওয়া পশুপক্ষী)গুলো যা তোমাদের জন্য ধরে আনে তা ভক্ষণ কর এবং (তাদেরকে শিকারের জন্য পাঠানোর সময়) আল্লাহর নাম নাও।[৩] আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ হিসাব গ্রহণে অত্যন্ত তৎপর।

[১] এখানে ঐ সমস্ত জিনিসের কথা উল্লেখ হয়েছে, যেগুলি বৈধ বা হালাল। শরীয়তের একটি মূলনীতি হল, প্রত্যেক হালাল জিনিস পবিত্র ও উপাদেয়। আর প্রত্যেক হারাম জিনিস নোংরা ও অপবিত্র।

[২] جَوَارِحٌ শব্দটি جاَرِحٌ শব্দের বহুবচন, যা উপার্জনকারী অর্থে ব্যবহার হয়। এখানে এর ভাবার্থ হল, শিকারী কুকুর, বাজপাখী, শিকরে পাখী, চিতা এবং অন্যান্য শিকারী পাখী ও হিংস্রজন্তু। مكلبين এর সারমর্ম হল; শিকারের উপর ছাড়ার পূর্বে যাকে শিকার সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। যেমন, যখন শিকার করার জন্যে তাকে প্রেরণ করা হবে, তখন সে দৌড়ে যাবে। আবার যখন তাকে থামতে বলা হবে, তখন সে থেমে যাবে। যখন তাকে ডাকা হবে, তখন সে (কাল বিলম্ব না করে) ফিরে আসবে।

[৩] (উপরে উল্লিখিত) এই শিক্ষিত শিকারী জন্তুর শিকার করা পশু-পাখী দুটি শর্ত সাপেক্ষে খাওয়া হালাল বা বৈধ। (ক) শিকারে প্রেরণ করার পূর্বে 'বিসমিল্লাহ' বলতে হবে। (খ) শিকারী পশু শিকার করা জিনিস (পশু বা পাখী) মালিকের জন্য রেখে দিবে এবং তার অপেক্ষা করবে; নিজে তা ভক্ষণ করবে না। যদিও সে শিকারকৃত পশু বা পাখীকে মেরে ফেলেছে, তবুও তা খাওয়া হালাল এই শর্তে যে, সে যেন শিকারের ব্যাপারে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হয় এবং তাকে প্রেরণ করার সময় তার সাথে অন্য কোন পশু শরীক না থাকে। (সহীহ বুখারী 'যবেহ' অধ্যায় ও মুসলিম 'শিকার' অধ্যায়)

5

ٱلْيَوْمَ أُحِلَّ لَكُمُ ٱلطَّيِّبَٰتُ ۖ وَطَعَامُ ٱلَّذِينَ أُوتُوا۟ ٱلْكِتَٰبَ حِلٌّۭ لَّكُمْ وَطَعَامُكُمْ حِلٌّۭ لَّهُمْ ۖ وَٱلْمُحْصَنَٰتُ مِنَ ٱلْمُؤْمِنَٰتِ وَٱلْمُحْصَنَٰتُ مِنَ ٱلَّذِينَ أُوتُوا۟ ٱلْكِتَٰبَ مِن قَبْلِكُمْ إِذَآ ءَاتَيْتُمُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ مُحْصِنِينَ غَيْرَ مُسَٰفِحِينَ وَلَا مُتَّخِذِىٓ أَخْدَانٍۢ ۗ وَمَن يَكْفُرْ بِٱلْإِيمَٰنِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُۥ وَهُوَ فِى ٱلْءَاخِرَةِ مِنَ ٱلْخَٰسِرِينَ

আজ তোমাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহ হালাল করা হল। আহলে কিতাবদের খাদ্য তোমাদের জন্যে হালাল এবং তোমাদের খাদ্য তাদের জন্য হালাল। তোমাদের জন্যে হালাল সতী-সাধ্বী মুসলমান নারী এবং তাদের সতী-সাধ্বী নারী, যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তোমাদের পূর্বে, যখন তোমরা তাদেরকে মোহরানা প্রদান কর তাদেরকে স্ত্রী করার জন্যে, কামবাসনা চরিতার্থ করার জন্যে কিংবা গুপ্ত প্রেমে লিপ্ত হওয়ার জন্যে নয়। যে ব্যক্তি বিশ্বাসের বিষয় অবিশ্বাস করে, তার শ্রম বিফলে যাবে এবং পরকালে সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আজ তোমাদের জন্য সমস্ত ভাল জিনিস বৈধ করা হল, যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে, তাদের (যবেহকৃত) খাদ্যদ্রব্য তোমাদের জন্য বৈধ[১] ও তোমাদের (যবেহকৃত) খাদ্যদ্রব্য তাদের জন্য বৈধ এবং বিশ্বাসী সচ্চরিত্রা নারীগণ ও তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে, তাদের সচ্চরিত্রা নারীগণ (তোমাদের জন্য বৈধ করা হল);[২] যদি তোমরা তাদেরকে মোহর প্রদান করে বিবাহ কর, প্রকাশ্য ব্যভিচার অথবা উপপত্নীরূপে গ্রহণ করার জন্য নয়। আর যে কেউ ঈমানকে অস্বীকার করবে তার কর্ম নিষ্ফল এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।

[১] আহলে কিতাবদের যবেহকৃত সেই পশু হালাল বা বৈধ যার রক্ত প্রবাহিত করা হয়েছে। অন্যথা তাদের মেশিন দ্বারা যবেহকৃত পশু হালাল নয়। কেননা তাতে রক্ত প্রবাহিত হওয়ার যে শর্ত রয়েছে তা বিলুপ্ত।

[২] এখানে আহলে কিতাবদের (ঈয়াহুদী ও খ্রিষ্টান) মহিলাকে বিবাহ করার অনুমতি দেওয়ার সাথে সাথে প্রথমতঃ এই শর্ত লাগানো হয়েছে যে, তাকে পবিত্রা (সতী) হতে হবে; যে শর্ত আজকাল অধিকাংশ আহলে কিতাবদের মহিলাদের মধ্যে পাওয়া যায় না। দ্বিতীয়তঃ আয়াতের শেষে বলা হয়েছে যে, যারা ঈমানের সাথে কুফরী (অস্বীকার) করে, তাদের আমল নষ্ট হয়ে যায়। এখানে সতর্ক করা উদ্দেশ্য যে, এমন মহিলাকে বিবাহ করার ফলে যদি ঈমান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে খুবই ক্ষতির (সম্পদ) ক্রয় করা হবে। বর্তমানে আহলে কিতাবদের মহিলাদের বিবাহ করার ফলে ঈমান যে চরমতম ক্ষতির শিকার হবে, তা বর্ণনা করার অপেক্ষা রাখে না। অথচ ঈমান বাঁচানো ফরয কর্তব্য। একটি অনুমতিপ্রাপ্ত কর্মের জন্য ফরয কর্মকে বিপদ ও ক্ষতির সম্মুখীন করা যেতে পারে না। কেননা এই অনুমতিপ্রাপ্ত কর্মটি ততক্ষণ পর্যন্ত কর্মে বাস্তবায়ন করা যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত উপরে উল্লিখিত দু'টি জিনিস (অসতীত্ব ও ঈমানের সাথে কুফরী) বিলুপ্ত না হয়েছে। এ ছাড়া অধুনা কালের আহলে কিতাবরা তাদের ধর্মীয় ব্যাপারে অসচেতন; বরং সম্পর্কহীন ও বিদ্রোহী। এর পরিপ্রেক্ষিতে তারা কি আসলেই আহলে কিতাবের মধ্যে গণ্য হবে? (আল্লাহই ভালো জানেন।)

6

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ إِذَا قُمْتُمْ إِلَى ٱلصَّلَوٰةِ فَٱغْسِلُوا۟ وُجُوهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى ٱلْمَرَافِقِ وَٱمْسَحُوا۟ بِرُءُوسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى ٱلْكَعْبَيْنِ ۚ وَإِن كُنتُمْ جُنُبًۭا فَٱطَّهَّرُوا۟ ۚ وَإِن كُنتُم مَّرْضَىٰٓ أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ أَوْ جَآءَ أَحَدٌۭ مِّنكُم مِّنَ ٱلْغَآئِطِ أَوْ لَٰمَسْتُمُ ٱلنِّسَآءَ فَلَمْ تَجِدُوا۟ مَآءًۭ فَتَيَمَّمُوا۟ صَعِيدًۭا طَيِّبًۭا فَٱمْسَحُوا۟ بِوُجُوهِكُمْ وَأَيْدِيكُم مِّنْهُ ۚ مَا يُرِيدُ ٱللَّهُ لِيَجْعَلَ عَلَيْكُم مِّنْ حَرَجٍۢ وَلَٰكِن يُرِيدُ لِيُطَهِّرَكُمْ وَلِيُتِمَّ نِعْمَتَهُۥ عَلَيْكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ

হে মুমিনগণ, যখন তোমরা নামাযের জন্যে উঠ, তখন স্বীয় মুখমন্ডল ও হস্তসমূহ কনুই পর্যন্ত ধৌত কর, মাথা মুছেহ কর এবং পদযুগল গিটসহ। যদি তোমরা অপবিত্র হও তবে সারা দেহ পবিত্র করে নাও এবং যদি তোমরা রুগ্ন হও, অথবা প্রবাসে থাক অথবা তোমাদের কেউ প্রসাব-পায়খানা সেরে আসে অথবা তোমরা স্ত্রীদের সাথে সহবাস কর, অতঃপর পানি না পাও, তবে তোমরা পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করে নাও-অর্থাৎ, স্বীয় মুখ-মন্ডল ও হস্তদ্বয় মাটি দ্বারা মুছে ফেল। আল্লাহ তোমাদেরকে অসুবিধায় ফেলতে চান না; কিন্তু তোমাদেরকে পবিত্র রাখতে চান এবং তোমাদের প্রতি স্বীয় নেয়ামত পূর্ণ করতে চান-যাতে তোমরা কৃতজ্ঞাতা প্রকাশ কর।

হে বিশ্বাসীগণ! যখন তোমরা নামাযের জন্য প্রস্তুত হবে, তখন তোমরা তোমাদের মুখমন্ডল ও কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত কর[১] এবং তোমাদের মাথা মাসাহ কর[২] এবং পা গ্রন্থি পর্যন্ত ধৌত কর।[৩] আর যদি তোমরা অপবিত্র থাক, তাহলে বিশেষভাবে (গোসল করে) পবিত্র হও।[৪] যদি তোমরা পীড়িত হও অথবা সফরে থাক অথবা তোমাদের কেউ প্রস্রাব-পায়খানা হতে আগমন করে, অথবা তোমরা স্ত্রী-সহবাস কর এবং পানি না পাও, তাহলে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম কর; তা দিয়ে তোমাদের মুখমন্ডল ও হস্তদ্বয় মাসাহ কর।[৫] আল্লাহ তোমাদেরকে কোন প্রকার কষ্ট দিতে চান না,[৬] বরং তিনি তোমাদেরকে পবিত্র করতে চান ও তোমাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করতে চান,[৭] যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর।

[১] 'মুখমন্ডল ধৌত কর' অর্থাৎ, একবার, দুইবার অথবা তিনবার করে দুই হাত কব্জি পর্যন্ত ধৌত করা, কুল্লী করা বা কুলকুচা করা অতঃপর নাকের ভিতরে পানি টেনে নিয়ে নাক ঝাড়ার পর -- যেমনটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। মুখমন্ডল ধৌত করার পর দুই হাত (আঙ্গুলের ডগা হতে) কনুইসহ ধৌত করতে হবে।[২] পুরো মাথা মাসাহ করতে হবে। যেমনটি হাদীস থেকে প্রমাণিত যে, (দুই হাতকে ভিজিয়ে আঙ্গুলগুলিকে মুখোমুখি করে) মাথার সামনের দিক থেকে (যেখান থেকে চুল গজানো শুরু হয়েছে সেখান) থেকে পিছন দিক (গর্দানের চুল যেখানে শেষ হয়েছে সেখান) পর্যন্ত, তারপর সেখান থেকে শুরু করে সামনের দিকে নিয়ে এসে যেখান থেকে শুরু করেছিল সে পর্যন্ত মাসাহ করতে হবে। ঐ সঙ্গে কানও মাসাহ করতে হবে। যদি মাথার উপর পাগড়ি বা শিরস্ত্রাণ থাকে, তাহলে হাদীসের নির্দেশানুসারে মোজার উপর মাসাহর মত তার উপরেও মাসাহ বৈধ। (মুসলিমঃ পবিত্রতা অধ্যায়) মাসাহ সংক্রান্ত বর্ণিত হাদীসে একবার মাসাহ করাই যথেষ্ট বলা হয়েছে।[৩] أَرْجُلَكُمْ এর সংযোগ وُجُوهَكُمْ এর সঙ্গে, যার ভাবার্থ হচ্ছে; পায়ের গাঁট বা গোড়ালির উপরের হাড় পর্যন্ত ধৌত কর। পক্ষান্তরে পায়ে যদি চামড়া বা কাপড়ের মোজা থাকে (এবং তা যদি ওযু থাকা অবস্থায় পরিধান করা হয়), তাহলে হাদীসের নির্দেশানুসারে পা ধোয়ার পরিবর্তে মোজার উপর নিয়মিত মাসাহ করা বৈধ।আনুষঙ্গিক বিষয়াবলীঃ (ক) ওযু থাকলে পুনরায় ওযু করা জরুরী নয়। তবে প্রত্যেক নামাযের জন্য নতুনভাবে ওযু করা উত্তম। (খ) ওযু করার পূর্বে নিয়ত করা ফরয। (গ) ওযু করার পূর্বে 'বিসমিল্লাহ' বলা জরুরী। (ঘ) দাঁড়ি ঘন বা জমাট হলে তা খেলাল করতে হবে। (ঙ) ওযুর অঙ্গগুলিকে পর্যায়ক্রমে ধৌত করতে হবে। (চ) একটি অঙ্গ ধোয়ার পর দ্বিতীয় অঙ্গ ধোওয়ায় যেন দেরী না হয়; বরং একের পর এক যেন নিরবচ্ছিন্নভাবে ধৌত করা হয়। (ছ) ওযুর অঙ্গগুলির মধ্যে কোন অঙ্গ যেন শুষ্ক না থেকে যায়, কেননা শুষ্ক থাকলে ওযু হবে না। (জ) ওযুর কোন অঙ্গকে তিনবারের বেশী যেন ধোওয়া না হয়, কারণ এটা সুন্নতের পরিপন্থী। (তাফসীরে ইবনে কাসীর, ফাতহুল ক্বাদীর ও আইসারুত তাফাসীর)[৪] অপবিত্রতা; ঐ অপবিত্রতাকে বুঝানো হয়েছে, যা স্বপ্নদোষ অথবা স্ত্রী সহবাস (বা যৌনতৃপ্তির সাথে বীর্যপাতের) ফলে হয়। আর একই বিধান মহিলাদের মাসিক ও (প্রসবোত্তর) নিফাসজনিত অপবিত্রতারও। যখন মহিলার মাসিক বা নিফাস বন্ধ হয়ে যাবে, তখন পবিত্রতা অর্জনের জন্য গোসল করা জরুরী। গোসলের পানি না পাওয়া গেলে তায়াম্মুম করা বিধেয়; যেমনটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। (ফাতহুল ক্বাদীর ও আইসারুতর তাফাসীর)[৫] আয়াতের এই অংশের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা এবং তায়াম্মুমের পদ্ধতি সূরা নিসার ৪:৪৩ নং আয়াতে উল্লেখ হয়েছে। সহীহ বুখারীতে এই আয়াতের শানে নুযূল (অবতীর্ণ হওয়ার কারণ) সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে, কোন এক সফরে আয়েশা (রাঃ) এর গলার হার বাইদা নামক স্থানে হারিয়ে যায়। তা খোঁজার জন্য তাঁদেরকে সেখানে থামতে হয়। ফজরের নামাযের জন্য তাঁদের নিকট পানি ছিল না এবং অনুসন্ধান করার পরও তাঁরা পানি সংগ্রহ করতে পারলেন না। এমতাবস্থায় (আল্লাহ তাআলা) এই আয়াত অবতীর্ণ করলেন, যাতে তায়াম্মুম করার অনুমতি দেওয়া হল। উসাইদ বিন হুযাইর (রাঃ) এই …

7

وَٱذْكُرُوا۟ نِعْمَةَ ٱللَّهِ عَلَيْكُمْ وَمِيثَٰقَهُ ٱلَّذِى وَاثَقَكُم بِهِۦٓ إِذْ قُلْتُمْ سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا ۖ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ عَلِيمٌۢ بِذَاتِ ٱلصُّدُورِ

তোমরা আল্লাহর নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, যা তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে এবং ঐ অঙ্গীকারকেও যা তোমাদের কাছ থেকে নিয়েছেন, যখন তোমরা বলেছিলেঃ আমরা শুনলাম এবং মেনে নিলাম। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ অন্তরের বিষয় সম্পর্কে পুরোপুরি খবর রাখেন।

তোমাদের প্রতি আল্লাহর নিয়ামতকে স্মরণ কর এবং সেই অঙ্গীকারকেও তোমরা স্মরণ কর, যার দ্বারা তিনি তোমাদেরকে আবদ্ধ করেছিলেন, যখন তোমরা বলেছিলে, ‘শ্রবণ করলাম ও মান্য করলাম।’ আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ অন্তরে যা আছে, সে সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত।

8

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ كُونُوا۟ قَوَّٰمِينَ لِلَّهِ شُهَدَآءَ بِٱلْقِسْطِ ۖ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَـَٔانُ قَوْمٍ عَلَىٰٓ أَلَّا تَعْدِلُوا۟ ۚ ٱعْدِلُوا۟ هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَىٰ ۖ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ خَبِيرٌۢ بِمَا تَعْمَلُونَ

হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে ন্যায় সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে এবং কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনও ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করো না। সুবিচার কর এটাই খোদাভীতির অধিক নিকটবর্তী। আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কর, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে খুব জ্ঞাত।

হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে (হকের উপর) দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত (এবং) ন্যায়পরায়ণতার সাথে সাক্ষ্যদাতা হও।[১] কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদেরকে যেন কখনও সুবিচার না করাতে প্ররোচিত না করে।[২] সুবিচার কর, এটা আত্মসংযমের নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কর, আল্লাহ তার খবর রাখেন।

[১] প্রথম অংশের ব্যাখ্যা সূরা নিসার ৪:১৩৫ নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। নবী (সাঃ)-এর নিকট ন্যায্য সাক্ষীর কত বড় গুরুত্ব ছিল, তা এই ঘটনার দ্বারা অনুমান করা যায়। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, নু'মান বিন বাশীর (রাঃ) বলেন, আমার পিতা আমাকে কিছু হাদিয়া (দান) দিলেন, তা দেখে আমার মাতা বললেন, 'এই হাদিয়া বা দানের উপর যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি আল্লাহর রসূল (সাঃ)-কে সাক্ষী না রাখবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি সন্তুষ্ট হব না।' সুতরাং আমার পিতা রসূলে কারীম (সাঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে, (ঘটনা বর্ণনা করলেন।) তখন রসূল (সাঃ) জিজ্ঞাসা করলেন; "তুমি তোমার সমস্ত সন্তানদেরকে অনুরূপভাবে হাদিয়া বা উপঢৌকন দিয়েছ কি?" প্রতি উত্তরে (আমার আব্বা) বললেন, 'না।' অতঃপর রসূল (সাঃ) বললেন, "আল্লাহকে ভয় কর এবং সন্তানদের মাঝে সমদৃষ্টিসম্পন্ন সুবিচার কর।" তিনি আরো বললেন, "আমি যুলুমের (অন্যায়ের) সাক্ষী হতে পারব না।" (সহীহ বুখারী ও মুসলিম / কিতাবুল হিবা বা দানপত্র নামক অধ্যায়)[২] এ অংশের ব্যাখ্যা সূরা মায়িদার ৫:২ নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে।

9

وَعَدَ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ وَعَمِلُوا۟ ٱلصَّٰلِحَٰتِ ۙ لَهُم مَّغْفِرَةٌۭ وَأَجْرٌ عَظِيمٌۭ

যারা বিশ্বাস স্থাপন করে, এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে, আল্লাহ তা˦#2503;দরকে ক্ষমা ও মহান প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাদের জন্য ক্ষমা এবং মহাপুরস্কার আছে।

10

وَٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ وَكَذَّبُوا۟ بِـَٔايَٰتِنَآ أُو۟لَٰٓئِكَ أَصْحَٰبُ ٱلْجَحِيمِ

যারা অবিশ্বাস করে এবং আমার নিদর্শনাবলীকে মিথ্যা বলে, তার দোযখী।

আর যারা অবিশ্বাস করে এবং আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যাজ্ঞান করে, তারাই জাহান্নামের অধিবাসী।

Al-Maaida 5:10Listen in Qur'an →

Commentary: Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation. Qur'an text and translation via AlQuran Cloud.