Muslim99Muslim99
← Tafsir library

6. Al-An'aam

The Cattle · Meccan · 165 ayahs

سُورَةُ الأَنۡعَامِ

Reading Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation

Ayahs 151–160 of 165

151

۞ قُلْ تَعَالَوْا۟ أَتْلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمْ عَلَيْكُمْ ۖ أَلَّا تُشْرِكُوا۟ بِهِۦ شَيْـًۭٔا ۖ وَبِٱلْوَٰلِدَيْنِ إِحْسَٰنًۭا ۖ وَلَا تَقْتُلُوٓا۟ أَوْلَٰدَكُم مِّنْ إِمْلَٰقٍۢ ۖ نَّحْنُ نَرْزُقُكُمْ وَإِيَّاهُمْ ۖ وَلَا تَقْرَبُوا۟ ٱلْفَوَٰحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ ۖ وَلَا تَقْتُلُوا۟ ٱلنَّفْسَ ٱلَّتِى حَرَّمَ ٱللَّهُ إِلَّا بِٱلْحَقِّ ۚ ذَٰلِكُمْ وَصَّىٰكُم بِهِۦ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ

আপনি বলুনঃ এস, আমি তোমাদেরকে ঐসব বিষয় পাঠ করে শুনাই, যেগুলো তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্যে হারাম করেছেন। তাএই যে, আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে অংশীদার করো না, পিতা-মাতার সাথে সদয় ব্যবহার করো স্বীয় সন্তানদেরকে দারিদ্রে?480; কারণে হত্যা করো না, আমি তোমাদেরকে ও তাদেরকে আহার দেই, নির্লজ্জতার কাছেও যেয়ো না, প্রকাশ্য হোক কিংবা অপ্রকাশ্য, যাকে হত্যা করা আল্লাহ হারাম করেছেন, তাকে হত্যা করো না; কিন্তু ন্যায়ভাবে। তোমাদেরকে এ নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা বুঝ।

বল, এসো, তোমাদের জন্য তোমাদের প্রতিপালক যা নিষিদ্ধ করেছেন তা তোমাদেরকে পড়ে শোনাই।[১] তা এইঃ তোমরা কোন কিছুকে তাঁর অংশী করবে না,[২] মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে,[৩] দারিদ্রে্র কারণে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না।[৪] আমিই তোমাদেরকে ও তাদেরকে জীবিকা দিয়ে থাকি। প্রকাশ্যে হোক কিংবা গোপনে হোক, অশ্লীল আচরণের নিকটবর্তীও হয়ো না এবং আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতীত[৫] তাকে হত্যা করো না। তোমাদেরকে তিনি এ নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা অনুধাবন কর।

[১] অর্থাৎ, সেগুলো নয়, যেগুলো তোমরা আল্লাহর অবতীর্ণকৃত কোন দলীল ছাড়া কেবল নিজেদের ভ্রান্ত খেয়াল এবং অমূলক ধারণার ভিত্তিতে হারাম গণ্য করেছ। বরং হারাম হল সেই জিনিসগুলো, যেগুলোকে তোমাদের প্রতিপালক হারাম ঘোষণা করেছেন। কারণ, তোমাদের স্রষ্টা এবং আহারদাতা তিনিই এবং প্রতিটি জিনিসের জ্ঞানও তাঁরই কাছে। কাজেই এ অধিকারও তাঁরই যে, তিনি যে জিনিসটা চান হালাল এবং যে জিনিসটা চান হারাম করেন। সুতরাং আমি তোমাদেরকে এই জিনিসগুলোর বিশদ বিবরণ দিচ্ছি, যার তাকীদ তোমাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে এসেছে।

[২] أَلاَّ تُشْرِكُوْا এর পূর্বে أَوْصَاكُمْ ঊহ্য আছে। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তাঁর সাথে তোমরা অন্য কাউকে অংশীদার স্থাপন করো না। শিরক হল সব চেয়ে বড় পাপ। (তওবা ছাড়া) এ পাপের কোন ক্ষমা নেই। মুশরিকের উপর জান্নাত হারাম এবং জাহান্নাম ওয়াজিব। কুরআন মাজীদে এ বিষয়টিকে বিভিন্নভাবে বারবার বর্ণনা করা হয়েছে এবং নবী করীম (সাঃ)ও বহু হাদীসে এর বিশ্লেষণ সুস্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা করেছেন। তা সত্ত্বেও বাস্তব এটাই যে, মানুষ শয়তানের চক্রান্তে পড়ে ব্যাপকহারে শিরকী কাজ সম্পাদন করে চলেছে।

[৩] অর্থাৎ, মাতা-পিতার সাথে অসদ্ব্যবহার করবে না। মহান আল্লাহর তাওহীদ (একত্বতা) এবং তাঁর আনুগত্যের পর এখানেও (এবং কুরআনের অন্য অনেক স্থানেও) পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর এ থেকে এ কথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, প্রতিপালকের আনুগত্যের পর পিতা-মাতার আনুগত্য করার গুরুত্ব অপরিসীম। যদি কেউ এই 'রুবূবিয়্যাতে সুগরা' (পিতা-মাতার আনুগত্য ও তাদের সাথে সদ্ব্যবহারের) দাবীসমূহ পূরণ না করে, তবে সে 'রুবূবিয়্যাতে কুবরা' (আল্লাহর আনুগত্যের) দাবীসমূহ পূরণ করতেও অসফল হবে।

[৪] জাহেলী যুগের এই জঘন্য কাজ বর্তমানে জন্ম-নিয়ন্ত্রণের নামে সারা পৃথিবীতে অতি ধুমধামের সাথে চলছে। আল্লাহ এ থেকে আমাদেরকে হিফাযত করুন!

[৫] অর্থাৎ, খুনের বদলে খুন। আর তা কেবল বৈধই নয়, বরং নিহতের উত্তরাধিকারী যদি মাফ করে না দেয়, তবে এ হত্যা অতি জরুরী। মহান আল্লাহ বলেন, {وَلَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيَاةٌ} "ক্বিসাসে রয়েছে তোমাদের জন্য জীবন।" (সূরা বাক্বারাহ ২:১৭৯)

Al-An'aam 6:151Listen in Qur'an →
152

وَلَا تَقْرَبُوا۟ مَالَ ٱلْيَتِيمِ إِلَّا بِٱلَّتِى هِىَ أَحْسَنُ حَتَّىٰ يَبْلُغَ أَشُدَّهُۥ ۖ وَأَوْفُوا۟ ٱلْكَيْلَ وَٱلْمِيزَانَ بِٱلْقِسْطِ ۖ لَا نُكَلِّفُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا ۖ وَإِذَا قُلْتُمْ فَٱعْدِلُوا۟ وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَىٰ ۖ وَبِعَهْدِ ٱللَّهِ أَوْفُوا۟ ۚ ذَٰلِكُمْ وَصَّىٰكُم بِهِۦ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ

এতীমদের ধনসম্পদের কাছেও যেয়ো না; কিন্তু উত্তম পন্থায় যে পর্যন্ত সে বয়ঃপ্রাপ্ত না হয়। ওজন ও মাপ পূর্ণ কর ন্যায় সহকারে। আমি কাউকে তার সাধ্যের অতীত কষ্ট দেই না। যখন তোমরা কথা বল, তখন সুবিচার কর, যদিও সে আত্নীয়ও হয়। আল্লাহর অঙ্গীকার পূর্ণ কর।

পিতৃহীন বয়ঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সৎ উদ্দেশ্য ছাড়া তার সম্পত্তির নিকটবর্তী হয়ো না[১] এবং পরিমাপ ও ওজন ন্যায়ভাবে পুরাপুরি প্রদান কর।[২] আমি কাউকেও তার সাধ্যাতীত ভার অর্পণ করি না।[৩] আর যখন তোমরা কথা বলবে, তখন স্বজনের বিরুদ্ধে হলেও ন্যায় কথা বল এবং আল্লাহকে প্রদত্ত অঙ্গীকার পূর্ণ কর। এভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।

[১] যে ইয়াতীমের দেখা-শোনার দায়িত্ব তোমাদের উপর আসবে, তার সর্বপ্রকার কল্যাণ কামনা করা তোমাদের উপর ফরয। আর এই কল্যাণ কামনা করার দাবী হল যে, সে যে মাল উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত হয়েছে, চাহে তা স্থাবর হোক অথবা অস্থাবর, সে নিজে তা সংরক্ষণ করার যোগ্যতা রাখে না, কাজেই তার এই মালকে সেই পর্যন্ত পূর্ণ নিষ্ঠার সাথে হিফাযত করবে, যে পর্যন্ত না সে সাবালকত্বের এবং ভাল-মন্দ বুঝার মত বয়সে পৌঁছে যায়। এ রকম যেন না হয় যে, দেখা-শোনার দায়িত্ব গ্রহণের নামে তার ভাল-মন্দ বোধ জ্ঞান আসার পূর্বেই তার সমস্ত মালকে নিঃশেষ করে দাও।

[২] ওজনে ও মাপে কম করা, নেওয়ার সময় পুরো মেপে নেওয়া, কিন্তু দেওয়ার সময় এ রকম না করে দাঁড়ি মেরে অপরকে কম দেওয়া হল অতি নীচ এবং জঘন্য চরিত্রের কাজ। শুআইব (আঃ)-এর জাতির মধ্যে চারিত্রিক এই রোগই বিদ্যমান ছিল, যা তাদের ধ্বংসের কারণসমূহের মূল ও প্রধান কারণ ছিল।

[৩] এখানে এ কথা বলার উদ্দেশ্য হল, যে কথাগুলোর উপর তাকীদ করলাম, সেগুলো এমন নয় যে, তার উপর আমল করা বড়ই কষ্টকর। যদি এমন হত, তাহলে আমি তার নির্দেশই দিতাম না। কারণ, সাধ্যের ঊর্ধ্বে আমি কারো উপর দায়িত্ব চাপাই না। কাজেই যদি আখেরাতের মুক্তি এবং দুনিয়াতেও সম্মান লাভে ধন্য হতে চাও, তবে আল্লাহর এই বিধানগুলোর উপর আমল কর এবং সেগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না।

Al-An'aam 6:152Listen in Qur'an →
153

وَأَنَّ هَٰذَا صِرَٰطِى مُسْتَقِيمًۭا فَٱتَّبِعُوهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعُوا۟ ٱلسُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَن سَبِيلِهِۦ ۚ ذَٰلِكُمْ وَصَّىٰكُم بِهِۦ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

তোমাদেরকে এ নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। নিশ্চিত এটি আমার সরল পথ। অতএব, এ পথে চল এবং অন্যান্য পথে চলো না। তা হলে সেসব পথ তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিবে। তোমাদেরকে এ নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তোমরা সংযত হও।

নিশ্চয়ই এটি আমার সরল পথ।[১] সুতরাং এরই অনুসরণ কর[২] এবং ভিন্ন পথ অনুসরণ করো না, করলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ হতে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে। এভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন তোমরা সাবধান হও।

[১] هَذَا (এটি) বলতে কুরআনে মাজীদ অথবা দ্বীন ইসলাম বা সেই বিধি-বিধানগুলোকে বুঝানো হয়েছে, যা বিশেষভাবে এই সূরাতে উল্লেখ করা হয়েছে। আর তা হল, তাওহীদ, রিসালাত ও পরকাল। এগুলোই হল এমন তিনটি মূল নীতি, যার চতুর্দিকে দ্বীনের চাকা ঘুরছে। অতএব যে অর্থই নেওয়া হোক না কেন উদ্দেশ্য সবের একই।[২] صراط مستقيم কে একবচন শব্দে বর্ণনা করা হয়েছে। কেননা, আল্লাহর অথবা কুরআনের কিংবা রসূলের পথ একটাই, একাধিক নয়। অতএব, অনুসরণ কেবল এই একটি পথেরই করতে হবে, অন্য পথের নয়। আর এটাই হল মুসলিম উম্মার ঐক্যের ভিত্তি। এই সরল পথ থেকে দূরে সরে পড়ার কারণে এই উম্মত বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। অথচ তাদেরকে তাকীদ করা হয়েছে যে, "অন্য পথগুলোতে চলো না। কারণ সেসব পথ তোমাদেরকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে।" অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন, {أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ} "দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত কর এবং তাতে অনৈক্য সৃষ্টি করো না।" (সূরা শূরা ৪২:১৩) দ্বীনে মতভেদ ও অনৈক্য সৃষ্টি করার কোনই অনুমতি নেই। এই কথাটাকেই নবী করীম (সাঃ) এইভাবে বিশ্লেষণ করেছেন, একদা তিনি তাঁর হাত দিয়ে একটি রেখা টানলেন এবং বললেন, "এটা হল আল্লাহর সরল পথ।" আরো কিছু রেখা তার ডান ও বাম পাশে টানলেন এবং বললেন, "এগুলো হল অন্য কিছু পথ, যার উপর শয়তান বসে আছে এবং সে এই পথগুলোর দিকে মানুষকে আহবান করছে।" অতঃপর তিনি এই (وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا) আয়াত পাঠ করলেন। (মুসনাদ আহমাদ) এমন কি সুনান ইবনে মাজাতে এ কথা সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, তিনি ডানে ও বামে দু'টো করে রেখা টানলেন। অর্থাৎ, সর্বমোট চারটি রেখা টানলেন এবং সেগুলোকে শয়তানের পথ বললেন।

Al-An'aam 6:153Listen in Qur'an →
154

ثُمَّ ءَاتَيْنَا مُوسَى ٱلْكِتَٰبَ تَمَامًا عَلَى ٱلَّذِىٓ أَحْسَنَ وَتَفْصِيلًۭا لِّكُلِّ شَىْءٍۢ وَهُدًۭى وَرَحْمَةًۭ لَّعَلَّهُم بِلِقَآءِ رَبِّهِمْ يُؤْمِنُونَ

অতঃপর আমি মূসাকে গ্রন্থ দিয়েছি, সৎকর্মীদের প্রতি নেয়ামতপূর্ণ করার জন্যে, প্রত্যেক বস্তুর বিশদ বিবরণের জন্যে, হোদায়াতের জন্যে এবং করুণার জন্যে-যাতে তারা স্বীয় পালনকর্তার সাথে সাক্ষাতে বিশ্বাসী হয়।

আর মূসাকে কিতাব দিয়েছিলাম যা সৎকর্মপরায়ণের জন্য পূর্ণাঙ্গ; যা সমস্ত কিছুর বিশদ বিবরণ, পথনির্দেশ এবং দয়াস্বরূপ;[১] যাতে তারা তাদের প্রতিপালকের সাক্ষাৎ সম্বন্ধে বিশ্বাস করে।

[১] কুরআন কারীমের এটি একটি বর্ণনাভঙ্গি, যার বহু স্থানে পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। অর্থাৎ, যেখানে কুরআনের কথা আছে, সেখানে তাওরাতের এবং যেখানে তাওরাতের কথা আছে, সেখানে কুরআনের কথাও আছে। এর বেশ কয়েকটি দৃষ্টান্ত হাফেয ইবনে কাসীর উল্লেখ করেছেন। এই নিয়মানুযায়ী এখানে তাওরাত এবং তার বৈশিষ্ট্যের কথা বর্ণনা করে বলা হচ্ছে যে, সেটাও (তাওরাতও) তার যুগের এক সর্বাঙ্গীন কিতাব ছিল। তাতে তাদের দ্বীনের প্রয়োজনীয় সমস্ত বিষয়ের বিশদ বর্ণনা ছিল এবং তা হিদায়াত ও রহমতের উৎসও ছিল।

Al-An'aam 6:154Listen in Qur'an →
155

وَهَٰذَا كِتَٰبٌ أَنزَلْنَٰهُ مُبَارَكٌۭ فَٱتَّبِعُوهُ وَٱتَّقُوا۟ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ

এটি এমন একটি গ্রন্থ, যা আমি অবতীর্ণ করেছি, খুব মঙ্গলময়, অতএব, এর অনুসরণ কর এবং ভয় কর-যাতে তোমরা করুণাপ্রাপ্ত হও।

এ কিতাব (কুরআন) আমি অবতরণ করেছি যা কল্যাণময়।[১] সুতরাং ওর অনুসরণ কর এবং সাবধান হও, হয়তো তোমাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করা হবে।

[১] এ থেকে বুঝানো হয়েছে কুরআন কারীমকে, যাতে দ্বীন ও দুনিয়ার যাবতীয় বরকত ও সমূহ কল্যাণ বিদ্যমান রয়েছে।

Al-An'aam 6:155Listen in Qur'an →
156

أَن تَقُولُوٓا۟ إِنَّمَآ أُنزِلَ ٱلْكِتَٰبُ عَلَىٰ طَآئِفَتَيْنِ مِن قَبْلِنَا وَإِن كُنَّا عَن دِرَاسَتِهِمْ لَغَٰفِلِينَ

এ জন্যে যে, কখনও তোমরা বলতে শুরু করঃ গ্রন্থ তো কেবল আমাদের পূর্ববর্তী দু'সম্প্রদায়ের প্রতিই অবতীর্ণ হয়েছে এবং আমরা সেগুলোর পাঠ ও পঠন সম্পর্কে কিছুই জানতাম না।

যেন তোমরা না বলতে পার যে,[১] কিতাব তো শুধু আমাদের পূর্বে দুই সম্প্রদায়ের প্রতিই অবতীর্ণ করা হয়েছিল। আর আমরা তাদের পঠন-পাঠন সম্বন্ধে তো অজ্ঞই ছিলাম। [২]

[১] অর্থাৎ, এই কুরআন এই জন্য অবতীর্ণ করা হয়েছে, যাতে তোমরা এ কথা না বলো। দু'টি সম্প্রদায় বলতে ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানকে বুঝানো হয়েছে।

[২] কারণ, তা আমাদের ভাষায় ছিল না। তাই মহান আল্লাহ কুরআন কারীমকে আরবী ভাষায় অবতীর্ণ করে এই ওজর-বাহানার পথ রুদ্ধ করে দিলেন।

Al-An'aam 6:156Listen in Qur'an →
157

أَوْ تَقُولُوا۟ لَوْ أَنَّآ أُنزِلَ عَلَيْنَا ٱلْكِتَٰبُ لَكُنَّآ أَهْدَىٰ مِنْهُمْ ۚ فَقَدْ جَآءَكُم بَيِّنَةٌۭ مِّن رَّبِّكُمْ وَهُدًۭى وَرَحْمَةٌۭ ۚ فَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّن كَذَّبَ بِـَٔايَٰتِ ٱللَّهِ وَصَدَفَ عَنْهَا ۗ سَنَجْزِى ٱلَّذِينَ يَصْدِفُونَ عَنْ ءَايَٰتِنَا سُوٓءَ ٱلْعَذَابِ بِمَا كَانُوا۟ يَصْدِفُونَ

কিংবা বলতে শুরু করঃ যদি আমাদের প্রতি কোন গ্রন্থ অবতীর্ণ হত, আমরা এদের চাইতে অধিক পথপ্রাপ্ত হতাম। অতএব, তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে সুষ্পষ্ট প্রমাণ, হেদায়েত ও রহমত এসে গেছে। অতঃপর সে ব্যক্তির চাইতে অধিক অনাচারী কে হবে, যে আল্লাহর আয়াত সমূহকে মিথ্যা বলে এবং গা বাঁচিয়ে চলে। অতি সত্ত্বর আমি তাদেরকে শাস্তি দেব। যারা আমার আয়াত সমূহ থেকে গা বাঁচিয়ে চলে-জঘন্য শাস্তি তাদের গা বাঁচানোর কারণে।

কিংবা যেন তোমরা না বলতে পার যে, ‘যদি কিতাব আমাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হত, তাহলে আমরা তো তাদের অপেক্ষা অধিক সৎপথপ্রাপ্ত হতাম।’ এখন তো তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে স্পষ্ট প্রমাণ, পথ নির্দেশ ও করুণা এসেছে।[১] অতঃপর যে কেউ আল্লাহর নিদর্শনকে প্রত্যাখ্যান করবে এবং তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার চেয়ে বড় যালেম আর কে?[২] যারা আমার নিদর্শনসমূহ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাদের এ আচরণের জন্য আমি তাদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তি দেব।

[১] সুতরাং এ বাহানাও তোমরা করতে পারবে না।

[২] অর্থাৎ, হিদায়াত ও রহমতের এই কিতাব অবতীর্ণ হওয়ার পর এখন যে ব্যক্তি হিদায়াতের (ইসলামের) পথ অবলম্বন করে রহমতের অধিকারী হয় না, বরং মিথ্যাজ্ঞান ও বিমুখতার পথ অবলম্বন করে, তার চেয়ে বড় যালিম আর কে? صَدَفَ এর অর্থ মুখ ফিরিয়ে নেওয়া এবং অপরকে বাধা দেওয়াও করা হয়েছে।

Al-An'aam 6:157Listen in Qur'an →
158

هَلْ يَنظُرُونَ إِلَّآ أَن تَأْتِيَهُمُ ٱلْمَلَٰٓئِكَةُ أَوْ يَأْتِىَ رَبُّكَ أَوْ يَأْتِىَ بَعْضُ ءَايَٰتِ رَبِّكَ ۗ يَوْمَ يَأْتِى بَعْضُ ءَايَٰتِ رَبِّكَ لَا يَنفَعُ نَفْسًا إِيمَٰنُهَا لَمْ تَكُنْ ءَامَنَتْ مِن قَبْلُ أَوْ كَسَبَتْ فِىٓ إِيمَٰنِهَا خَيْرًۭا ۗ قُلِ ٱنتَظِرُوٓا۟ إِنَّا مُنتَظِرُونَ

তারা শুধু এ বিষয়ের দিকে চেয়ে আছে যে, তাদের কাছে ফেরেশতা আগমন করবে কিংবা আপনার পালনকর্তা আগমন করবেন অথবা আপনার পালনকর্তার কোন নির্দেশ আসবে। যেদিন আপনার পালনকর্তার কোন নিদর্শন আসবে, সেদিন এমন কোন ব্যক্তির বিশ্বাস স্থাপন তার জন্যে ফলপ্রসূ হবে না, যে পূর্ব থেকে বিশ্বাস স্থাপন করেনি কিংবা স্বীয় বিশ্বাস অনুযায়ী কোনরূপ সৎকর্ম করেনি। আপনি বলে দিনঃ তোমরা পথের দিকে চেয়ে থাক, আমরাও পথে দিকে তাকিয়ে রইলাম।

তারা কি এরই প্রতীক্ষা করে যে, তাদের নিকট ফিরিশতা আসবে কিংবা তোমার প্রতিপালক আসবেন কিংবা তোমার প্রতিপালকের কিছু নিদর্শন আসবে?[১] যেদিন তোমার প্রতিপালকের কিছু নিদর্শন আসবে, সেদিন সে ব্যক্তির বিশ্বাস কোন কাজে আসবে না, যে ব্যক্তি পূর্বে বিশ্বাস স্থাপন করেনি[২] কিংবা স্বীয় বিশ্বাস সহ কল্যাণ অর্জন (সৎকর্ম) করেনি।[৩] বল, ‘তোমরা প্রতীক্ষা কর, আমরাও প্রতীক্ষা করছি।’ [৪]

[১] কুরআন কারীম অবতীর্ণ করে এবং মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে রসূল হিসাবে প্রেরণ করে আমি হুজ্জত (অকাট্য প্রমাণ) কায়েম করে দিয়েছি। এখনও যদি তারা ভ্রষ্টতা থেকে ফিরে না আসে, তবে কি তারা এই অপেক্ষায় আছে যে, তাদের কাছে ফিরিশতা আসুক, অর্থাৎ, তাদের জান কবজ করার জন্য, তখন তারা ঈমান আনবে? অথবা তোমার প্রতিপালক তাদের কাছে আসুক অর্থাৎ, কিয়ামত সংঘটিত হোক এবং তাদেরকে আল্লাহর সামনে হাজির করা হোক, তখন তারা ঈমান আনবে? কিংবা তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে কোন বৃহৎ নিদর্শন আসুক, যেমন কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার পূর্বে সূর্যের পশ্চিম দিক থেকে উদয় হওয়া, এই ধরনের বড় নিদর্শন দেখে তারা ঈমান আনবে? পরের বাক্যে এ কথা পরিষ্কার করে দেওয়া হচ্ছে যে, যদি তারা এই অপেক্ষায় থেকে থাকে, তাহলে তারা বিরাট মূর্খতা প্রদর্শন করছে। কেননা, মহা নিদর্শন প্রকাশ হওয়ার পর কাফেরের ঈমান এবং পাপী ও অবাধ্যজনদের তওবা কবুল করা হবে না। সহীহ হাদীসে নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, "ততক্ষণ পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সূর্য (পূর্ব দিকের পরিবর্তে) পশ্চিম দিক হতে উদয় হবে। আর যখন এ রকম হবে এবং মানুষ তাকে পশ্চিম দিক থেকে উদিত হতে দেখবে, তখন সকলে ঈমান নিয়ে আসবে।" অতঃপর তিনি (সাঃ) এই আয়াত তেলাঅত করলেন, {لا يَنْفَعُ نَفْسًا إِيمَانُهَا لَمْ تَكُنْ آمَنَتْ مِنْ قَبْلُ} অর্থাৎ, তখন ঈমান আনা কারো উপকারে আসবে না, যে পূর্ব থেকে ঈমান আনেনি। (বুখারী, তাফসীর সূরা আনআম)[২] অর্থাৎ, কাফেরের ঈমান ফলপ্রসূ অর্থাৎ, গৃহীত হবে না।[৩] এর অর্থ হল, কোন পাপী মু'মিন পাপসমূহ থেকে তওবা করলে তখন তার তওবা কবুল করা হবে না এবং এরপর নেক আমলও গৃহীত হবে না। যেমন, বহু হাদীস দ্বারাও এ কথা প্রমাণিত।[৪] এটা তাদের জন্য ধমক, যারা ঈমান আনে না এবং তওবা করে না। এই বিষয়টি কুরআন কারীমের সূরা মুহাম্মাদের ৪৭:১৮ এবং সূরা মু'মিনের ৪০:৮৪-৮৫ নং আয়াতেও বর্ণিত হয়েছে।

Al-An'aam 6:158Listen in Qur'an →
159

إِنَّ ٱلَّذِينَ فَرَّقُوا۟ دِينَهُمْ وَكَانُوا۟ شِيَعًۭا لَّسْتَ مِنْهُمْ فِى شَىْءٍ ۚ إِنَّمَآ أَمْرُهُمْ إِلَى ٱللَّهِ ثُمَّ يُنَبِّئُهُم بِمَا كَانُوا۟ يَفْعَلُونَ

নিশ্চয় যারা স্বীয় ধর্মকে খন্ড-বিখন্ড করেছে এবং অনেক দল হয়ে গেছে, তাদের সাথে আপনার কোন সম্পর্ক নেই। তাদের ব্যাপার আল্লাহ তা'আয়ালার নিকট সমর্পিত। অতঃপর তিনি বলে দেবেন যা কিছু তারা করে থাকে।

অবশ্যই যারা ধর্ম সম্বন্ধে নানা মতের সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে[১] তাদের কোন কাজের দায়িত্ব তোমার নেই, তাদের বিষয় আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত। তিনিই তাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে তাদেরকে অবহিত করবেন।

[১] এ থেকে কেউ কেউ ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের বুঝিয়েছেন। তারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত ছিল। কেউ কেউ এ থেকে মুশরিকদের বুঝিয়েছেন। কিছু মুশরিক ফিরিশতাদের, কিছু তারকারাজির এবং কিছু বিভিন্ন মূর্তির পূজা করত। তবে এ আয়াত ব্যাপক। কাফের ও মুশরিকরা সহ সেই সমস্ত লোকই এর আওতাভুক্ত, যারা আল্লাহর দ্বীন এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর তরীকা ত্যাগ করে অন্য দ্বীন বা তরীকা গ্রহণ করে বিচ্ছিন্নতা ও দলাদলির পথ অবলম্বন করে। شِيَعًا এর অর্থ, বিভিন্ন দল। আর এ কথা এমন সকল সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, যারা দ্বীনের ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ ছিল পরে তাদের বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ নিজেদের বুযুর্গদের মতকেই নির্ভরযোগ্য এবং সেটাকেই শেষ সিদ্ধান্ত গণ্য করে নিজেদের পথ পৃথক করে নিয়েছে, যদিও সে মত সত্য ও সঠিকতার বিপরীত। (ফাতহুল ক্বাদীর)

Al-An'aam 6:159Listen in Qur'an →
160

مَن جَآءَ بِٱلْحَسَنَةِ فَلَهُۥ عَشْرُ أَمْثَالِهَا ۖ وَمَن جَآءَ بِٱلسَّيِّئَةِ فَلَا يُجْزَىٰٓ إِلَّا مِثْلَهَا وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ

যে একটি সৎকর্ম করবে, সে তার দশগুণ পাবে এবং যে, একটি মন্দ কাজ করবে, সে তার সমান শাস্তিই পাবে। বস্তুতঃ তাদের প্রতি জুলুম করা হবে না।

কেউ সৎকাজ করলে, সে তার দশগুণ (প্রতিদান) পাবে[১] এবং কেউ অসৎকাজ করলে, তাকে শুধু তার সমপরিমাণ প্রতিফলই দেওয়া হবে।[২] আর তারা অত্যাচারিত হবে না।

[১] এটা হল আল্লাহ তাআলার সেই দয়া ও অনুগ্রহের বর্ণনা, যা ঈমানদারদের উপর তিনি করবেন। আর তা হল, একটি নেকীর বিনিময় তিনি দশটি নেকী দ্বারা দেবেন। আর এটা হল কমসে কম প্রতিদান। তাছাড়া কুরআন ও হাদীস থেকে প্রমাণিত যে, কোন কোন নেকীর প্রতিদান কয়েক শ' এমন কি কয়েক হাজার গুণ পর্যন্ত দেওয়া হবে।

[২] অর্থাৎ, যে পাপমূহের শাস্তি নির্ধারিত নয় এবং যেগুলো করার পর পাপী তা থেকে তওবাও করেনি অথবা তার পুণ্যের হার পাপের তুলনায় কম হবে কিংবা আল্লাহ তাঁর বিশেষ অনুগ্রহে তা ক্ষমা করবেন না, (কেননা, এই সমস্ত অবস্থায় প্রতিদানের নীতি প্রয়োগ করা হবে না) তখন আল্লাহ এই পাপের দরুন শাস্তি দেবেন এবং তা পাপের সমপরিমাণই দেবেন।

Al-An'aam 6:160Listen in Qur'an →

Commentary: Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation. Qur'an text and translation via AlQuran Cloud.