Muslim99Muslim99
← Tafsir library

6. Al-An'aam

The Cattle · Meccan · 165 ayahs

سُورَةُ الأَنۡعَامِ

Reading Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation

Ayahs 141–150 of 165

141

۞ وَهُوَ ٱلَّذِىٓ أَنشَأَ جَنَّٰتٍۢ مَّعْرُوشَٰتٍۢ وَغَيْرَ مَعْرُوشَٰتٍۢ وَٱلنَّخْلَ وَٱلزَّرْعَ مُخْتَلِفًا أُكُلُهُۥ وَٱلزَّيْتُونَ وَٱلرُّمَّانَ مُتَشَٰبِهًۭا وَغَيْرَ مُتَشَٰبِهٍۢ ۚ كُلُوا۟ مِن ثَمَرِهِۦٓ إِذَآ أَثْمَرَ وَءَاتُوا۟ حَقَّهُۥ يَوْمَ حَصَادِهِۦ ۖ وَلَا تُسْرِفُوٓا۟ ۚ إِنَّهُۥ لَا يُحِبُّ ٱلْمُسْرِفِينَ

তিনিই উদ্যান সমূহ সৃষ্টি করেছে-তাও, যা মাচার উপর তুলে দেয়া হয়, এবং যা মাচার উপর তোলা হয় না এবং খর্জুর বৃক্ষ ও শস্যক্ষেত্র যেসবের স্বাদবিশিষ্ট এবং যয়তুন ও আনার সৃষ্টি করেছেন-একে অন্যের সাদৃশ্যশীল এবং সাদৃশ্যহীন। এগুলোর ফল খাও, যখন ফলন্ত হয় এবং হক দান কর কর্তনের সময়ে এবং অপব্যয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপব্যয়ীদেরকে পছন্দ করেন না।

তিনিই গুল্মলতা ও বৃক্ষরাজিবিশিষ্ট উদ্যানসমূহ সৃষ্টি করেছেন এবং খেজুর বৃক্ষ, বিভিন্ন স্বাদবিশিষ্ট খাদ্যশস্য,[১] যয়তুন ও ডালিম সৃষ্টি করেছেন ঐগুলি একে অন্যের সদৃশ এবং বিসদৃশও।[২] যখন তা ফলবান হয়, তখন তা আহার কর। আর ফসল তোলার দিনে ওর দেয় (হক) প্রদান কর[৩] এবং অপচয় করো না।[৪] কারণ, তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না।[৫]

[১] مَعْرُوْشَاتٍ এর মূল ধাতু হল, عَرْشٌ যার অর্থ, উঁচু করা ও উঠানো। আর معروشات থেকে এখানে বুঝানো হয়েছে কোন কোন গাছের লতাগুলোকে, যেগুলোকে মাচান ইত্যাদির উপরে চড়ানো হয়। যেমন, আঙ্গুর এবং কোন কোন সবজি গাছের লতা। আর غير معروشات হল এমন লতাগাছ, যা মাচান ইত্যাদির উপরে চড়ানো হয় না, বরং তা জমির উপরেই বাড়তে থাকে। যেমন, তরমুজ, শসা ইত্যাদি গাছ। অথবা সেই সব গুঁড়ি বিশিষ্ট গাছ, যা লতা আকারে হয় না। এই সমস্ত গুল্মলতা, বৃক্ষরাজি, খেজুর গাছ এবং ফসলাদি যাদের স্বাদ একে অপর থেকে ভিন্ন এবং যয়তুন ও ডালিম ইত্যাদি সব কিছুর স্রষ্টা মহান আল্লাহ।

[২] এর জন্য দ্রষ্টব্য ৯৯নং আয়াতের টীকা।

[৩] অর্থাৎ, জমি থেকে ফসল কেটে ঝরিয়ে এবং ফলাদি গাছ থেকে যখন পেড়ে নাও, তখন সৃষ্টিকর্তার অধিকার আদায় করে দাও। এই অধিকার থেকে কেউ বুঝিয়েছেন, নফল সাদাকা। আবার কেউ বুঝিয়েছেন, ওয়াজিব সাদাকা। অর্থাৎ, 'ওশর' তথা দশভাগের এক ভাগ (যদি জমি প্রকৃতির পানিতে আবাদ হয়)। অথবা 'নিসফ উশুর' তথা বিশভাগের এক ভাগ (যদি জমি কুঁয়া, নলকূপ অথবা নদী ইত্যাদি থেকে তোলা পানি দ্বারা আবাদ করা হয়)।

[৪] অথবা এর অর্থঃ সীমালংঘন করো না। কারণ, তিনি সীমালংঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না। অর্থাৎ, সাদাকা-খয়রাত করার ব্যাপারেও সীমালঙ্ঘন করো না। এমন যেন না হয় যে, (সমস্ত মাল ব্যয় করে দাও, ফলে) আগামী কাল তুমিই অভাবী হয়ে যাও। কেউ কেউ বলেছেন, এর সম্পর্ক হল শাসকদের সাথে। অর্থাৎ, সাদাকা ও যাকাত আদায়ের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করো না। তবে ইমাম ইবনে কাসীর বলেন, আয়াতের পূর্বাপর প্রসঙ্গ থেকে এ অর্থই সঠিক বলে মনে হচ্ছে যে, পানাহারের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না। কেননা, অতি ভোজনে জ্ঞান-বুদ্ধি ও স্বাস্থ্য উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। 'ইসরাফ'-এর এই সমস্ত অর্থই সব সব স্থানে সঠিক। কাজেই সমস্ত অর্থই উদ্দেশ্য হতে পারে। অন্যান্য বহু জায়গায় আল্লাহ তাআলা পানাহারের ব্যাপারে অপচয় করতে যে নিষেধ করেছেন, তা থেকে এ কথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, পানাহারের ব্যাপারেও মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা জরুরী এবং তার ব্যতিক্রম করা আল্লাহর অবাধ্যতা বলে গণ্য হয়। বর্তমানে মুসলিমরা অপচয় করাকে নিজেদের ধন-সম্পদ প্রকাশ করার নিদর্শন বানিয়ে নিয়েছে। সুতরাং إِنَّا للهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُوْنَ

[৫] তাই কোন জিনিসের ব্যাপারেই সীমাতিক্রম বা অপচয় করা পছন্দনীয় নয়। না সাদাকা-খয়রাত দেওয়ার ব্যাপারে, আর না অন্য কোন জিনিসের ব্যাপারে। প্রত্যেক ব্যাপারে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করাই বাঞ্ছনীয় ও পছন্দনীয়; বরং তার তাকীদ করা হয়েছে।

Al-An'aam 6:141Listen in Qur'an →
142

وَمِنَ ٱلْأَنْعَٰمِ حَمُولَةًۭ وَفَرْشًۭا ۚ كُلُوا۟ مِمَّا رَزَقَكُمُ ٱللَّهُ وَلَا تَتَّبِعُوا۟ خُطُوَٰتِ ٱلشَّيْطَٰنِ ۚ إِنَّهُۥ لَكُمْ عَدُوٌّۭ مُّبِينٌۭ

তিনি সৃষ্টি করেছেন চতুষ্পদ জন্তুর মধ্যে বোঝা বহনকারীকে এবং খর্বাকৃতিকে। আল্লাহ তোমাদেরকে যা কিছু দিয়েছেন, তা থেকে খাও এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।

আর (সৃষ্টি করেছেন) গবাদি পশুর মধ্যে কিছু ভারবাহী ও কিছু ক্ষুদ্রাকার পশু।[১] আল্লাহ যা জীবিকারূপে তোমাদেরকে দান করেছেন, তা আহার কর[২] এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না।[৩] নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।

[১] حُمُوْلَةٌ (ভারবাহী, বোঝা বহনকারী) বলতে উট, বলদ এবং গাধা ও খচ্চর ইত্যাদিকে বুঝানো হয়েছে। যা বাহন ও বোঝা বহনের কাজে আসে। আর فَرْشًا খর্বাকৃতির জীব-জন্তু। যেমন, ছাগল-ভেড়া ইত্যাদি। যার দুধ তোমরা পান কর এবং তার গোশত খাও।

[২] অর্থাৎ, ফল, ফসলাদি এবং চতুষ্পদ জীব-জন্তুর মধ্য থেকে। এগুলোকে আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের জন্য সেগুলোকে আহার্য বানিয়েছেন।

[৩] যেভাবে মুশরিকরা তার (শয়তানের) অনুসরণ করেছিল এবং হালাল পশুগুলোকেও নিজেদের উপর হারাম করে নিয়েছিল। অর্থাৎ, আল্লাহর হালাল করা জিনিসকে হারাম করা এবং তাঁর হারাম করা জিনিসকে হালাল করা, আসলে শয়তানের আনুগত্য করা।

Al-An'aam 6:142Listen in Qur'an →
143

ثَمَٰنِيَةَ أَزْوَٰجٍۢ ۖ مِّنَ ٱلضَّأْنِ ٱثْنَيْنِ وَمِنَ ٱلْمَعْزِ ٱثْنَيْنِ ۗ قُلْ ءَآلذَّكَرَيْنِ حَرَّمَ أَمِ ٱلْأُنثَيَيْنِ أَمَّا ٱشْتَمَلَتْ عَلَيْهِ أَرْحَامُ ٱلْأُنثَيَيْنِ ۖ نَبِّـُٔونِى بِعِلْمٍ إِن كُنتُمْ صَٰدِقِينَ

সৃষ্টি করেছেন আটটি নর ও মাদী। ভেড়ার মধ্যে দুই প্রকার ও ছাগলের মধ্যে দুই প্রকার। জিজ্ঞেস করুন, তিনি কি উভয় নর হারাম করেছেন, না উভয় মাদীকে ? না যা উভয় মাদীর পেটে আছে? তোমরা আমাকে প্রমাণসহ বল, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।

(তিনি সৃষ্টি করেছেন) আট প্রকার[১] পশুঃ মেষ হতে দু’টি ও ছাগল হতে দু’টি।[২] বল, নর দু’টি কিংবা মাদি দু’টিই কি তিনি নিষিদ্ধ করেছেন অথবা মাদি দু’টির গর্ভে যা আছে তা? [৩] যদি তোমরা সত্যবাদী হও তাহলে প্রমাণসহ আমাকে জানাও। [৪]

[১] অর্থাৎ, أَنْشأَ ثَمَانِيَةَ أَزْوَاجِ (সেই আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন আটটি নর ও মাদী)। أَزْوَاجٌ হল زَوْجٌ-এর বহুবচন। একই জাতের নর ও মাদীকে زوج (জোড়া, যুগল) বলা হয় এবং এই উভয়ের এক একটিকেও زوج বলা হয়। কেননা, প্রত্যেকে অপরের জন্য জোড়া। কুরআনের এই স্থানে أزواج (জোড়া-জোড়া) أفراد (এক একটি প্রকার) অর্থে ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ, আট প্রকার জন্তু আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। যারা আপোসে পরস্পরের জোড়া। এখানে 'আট জোড়া সৃষ্টি করেছি' অর্থে ব্যবহার হয়নি। কেননা, এই অর্থে আটের পরিবর্তে ১৬ হয়ে যাবে, যা আয়াতের পরবর্তী অংশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

[২] এটা হল, ثَمَانِيَةَ এর বদল (পূর্বের বিশেষ্যের ব্যাখ্যাকারী)। আর দু'প্রকার বলতে, নর ও মাদী। অর্থাৎ, ভেড়া থেকে নর ও মাদী এবং ছাগল থেকেও নর ও মাদী সৃষ্টি করেছেন। (দুম্বা ভেড়ার মধ্যেই শামিল।)

[৩] মুশরিকরা যে নিজের পক্ষ থেকেই কোন কোন পশুকে হারাম করে নিত, সে ব্যাপারে মহান আল্লাহ জিজ্ঞাসা করছেন যে, আল্লাহ তাআলা কি ঐ পশুগুলোর নর অথবা মাদী কিংবা সেই বাচ্চাকে হারাম করেছেন, যা মাদীর পেটে থাকে? অর্থ হল, আল্লাহ কোন কিছুই হারাম করেননি।

[৪] তোমাদের কাছে হারাম সাব্যস্ত করার কোন সুনিশ্চিত দলীল থাকলে নিয়ে এসে দেখাও যে, بَحِيْرَةٍ، سَآئِبَةٍ، وَصِيْلَةٍ এবং حَامٍ ইত্যাদি এই সুনিশ্চিত দলীলের ভিত্তিতে হারাম।

Al-An'aam 6:143Listen in Qur'an →
144

وَمِنَ ٱلْإِبِلِ ٱثْنَيْنِ وَمِنَ ٱلْبَقَرِ ٱثْنَيْنِ ۗ قُلْ ءَآلذَّكَرَيْنِ حَرَّمَ أَمِ ٱلْأُنثَيَيْنِ أَمَّا ٱشْتَمَلَتْ عَلَيْهِ أَرْحَامُ ٱلْأُنثَيَيْنِ ۖ أَمْ كُنتُمْ شُهَدَآءَ إِذْ وَصَّىٰكُمُ ٱللَّهُ بِهَٰذَا ۚ فَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ ٱفْتَرَىٰ عَلَى ٱللَّهِ كَذِبًۭا لِّيُضِلَّ ٱلنَّاسَ بِغَيْرِ عِلْمٍ ۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهْدِى ٱلْقَوْمَ ٱلظَّٰلِمِينَ

সৃষ্টি করেছেন উটের মধ্যে দুই প্রকার এবং গরুর মধ্যে দুই প্রকার। আপনি জিজ্ঞেস করুনঃ তিনি কি উভয় নর হারাম করেছেন, না উভয় মাদীকে, না যা উভয় মাদীর পেটে আছে? তোমরা কি উপস্থিত ছিলে, যখন আল্লাহ এ নির্দেশ দিয়েছিলেন? অতএব সে ব্যক্তি অপেক্ষা বেশী অত্যচারী কে, যে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা ধারণা পোষন করে যাতে করে মানুষকে বিনা প্রমাণে পথভ্রষ্ট করতে পারে? নিশ্চয় আল্লাহ অত্যাচারী সম্প্রদায়কে পথপ্রদর্শন করেন না।

এবং উট হতে দু’টি ও গরু হতে দু’টি।[১] বল, নর দু’টি কিংবা মাদি দু’টিই কি তিনি নিষিদ্ধ করেছেন অথবা মাদি দু’টির গর্ভে যা আছে তা? আল্লাহ যখন এ সব নির্দেশ দান করেন, তখন কি তোমরা উপস্থিত ছিলে?[২] সুতরাং যে ব্যক্তি অজ্ঞানতাবশতঃ মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনা করে, তার চেয়ে বড় যালেম আর কে?[৩] নিশ্চয় আল্লাহ সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।

[১] এটাও ثَمَانِيَةَ থেকে 'বদল'। আর এখানেও দুই প্রকার বলতে নর ও মাদী বুঝানো হয়েছে এবং এইভাবে আট প্রকার পূর্ণ হয়ে গেল।

[২] অর্থাৎ, কিছু পশুকে যে তোমরা হারাম গণ্য কর, (এবং মনে কর যে, এগুলিকে আল্লাহ হারাম করেছেন।) তাহলে যখন আল্লাহ এগুলোর হারাম হওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন, তখন তোমরা কি তাঁর কাছে উপস্থিত ছিলে? অর্থ হল, আল্লাহ তো এগুলোর হারাম হওয়ার ব্যাপারে কোন নির্দেশ দেননি, বরং এ সব তোমাদের মনগড়া এবং এইভাবে তোমরা আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ করে থাক।

[৩] অর্থাৎ, সেই হল সব চেয়ে বড় যালেম। হাদীসে আছে রসূল (সাঃ) বলেছেন, "আমি আমর ইবনে লুহাইকে জাহান্নামে তার নাড়ীভুঁড়ি টেনে নিয়ে বেড়াতে দেখলাম। এই ব্যক্তিই সর্বপ্রথম প্রতিমার নামে وصيلة এবং حام ইত্যাদি পশু উৎসর্গ করার প্রথা চালু করেছিল।" (বুখারী, মুসলিম, জান্নাত অধ্যায়) ইমাম ইবনে কাসীর বলেন, আমর ইবনে লুহাই খুযাআহ গোত্রের একজন সর্দার ছিল। জুরহুম গোত্রের পর এ লোকই কা'বা-গৃহের মতোয়াল্লী ছিল। এই ব্যক্তি সর্বপ্রথম ইবরাহীম (আঃ)-এর দ্বীনে পরিবর্তন সাধন করে এবং হিজাযে প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করে মানুষদেরকে তার ইবাদত করার দাওয়াত দেয়। সেই সাথে সে শিরকীয় অনেক প্রথার প্রচলন করে। (ইবনে কাসীর) যাই হোক, আয়াতের উদ্দেশ্য হল, মহান আল্লাহ উল্লেখিত আট প্রকার পশু সৃষ্টি করে বান্দাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। এগুলোর মধ্য থেকে কোন কোন পশুকে হারাম করে নিলে আল্লাহর এই অনুগ্রহকে প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং শিরকীয় কাজ সম্পাদন করাও হয়।

Al-An'aam 6:144Listen in Qur'an →
145

قُل لَّآ أَجِدُ فِى مَآ أُوحِىَ إِلَىَّ مُحَرَّمًا عَلَىٰ طَاعِمٍۢ يَطْعَمُهُۥٓ إِلَّآ أَن يَكُونَ مَيْتَةً أَوْ دَمًۭا مَّسْفُوحًا أَوْ لَحْمَ خِنزِيرٍۢ فَإِنَّهُۥ رِجْسٌ أَوْ فِسْقًا أُهِلَّ لِغَيْرِ ٱللَّهِ بِهِۦ ۚ فَمَنِ ٱضْطُرَّ غَيْرَ بَاغٍۢ وَلَا عَادٍۢ فَإِنَّ رَبَّكَ غَفُورٌۭ رَّحِيمٌۭ

আপনি বলে দিনঃ যা কিছু বিধান ওহীর মাধ্যমে আমার কাছে পৌঁছেছে, তন্মধ্যে আমি কোন হারাম খাদ্য পাই না কোন ভক্ষণকারীর জন্যে, যা সে ভক্ষণ করে; কিন্তু মৃত অথবা প্রবাহিত রক্ত অথবা শুকরের মাংস এটা অপবিত্র অথবা অবৈধ; যবেহ করা জন্তু যা আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গ করা হয়। অতপর যে ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়ে এমতাবস্থায় যে অবাধ্যতা করে না এবং সীমালঙ্গন করে না, নিশ্চয় আপনার পালনকর্তা ক্ষমাশীল দয়ালু।

বল, আমার প্রতি যে প্রত্যাদেশ হয়েছে, তাতে আহারকারী যা আহার করে, তার মধ্যে আমি কিছুই নিষিদ্ধ পাই না। তবে মৃতপ্রাণী, বহমান রক্ত ও শূকরের গোশত; কেননা তা অপবিত্র। অথবা (যবেহকালে) আল্লাহ ছাড়া অন্যের নাম নেওয়ার কারণে যা অবৈধ।[১] তবে কেউ অবাধ্য না হয়ে এবং সীমালংঘন না করে তা গ্রহণে বাধ্য হলে, তোমার প্রতিপালক অবশ্যই চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

[১] এই আয়াতে যে চারটি হারাম জিনিসের কথা উল্লেখ হয়েছে তার প্রয়োজনীয় বিশ্লেষণ সূরা বাক্বারার ২:১৭৩ নং আয়াতের টীকায় অতিবাহিত হয়েছে। এখানে যে বিষয়টির উপর অতিরিক্ত আলোকপাতের প্রয়োজন তা হল এই যে, এই চারটি হারাম জিনিসকে 'কালিমা হাসর' তথা সীমিতকারী বাক্য দ্বারা উল্লেখ করা হয়েছে। যার দ্বারা বাহ্যতঃ এটাই প্রতীয়মান হয় যে, এই চার প্রকার পশু ব্যতীত অন্য সব পশুই হালাল। অথচ বাস্তবে কিন্তু এই চার প্রকার পশু ছাড়াও আরো কিছু পশু শরীয়তে হারাম। তাহলে এখানে সীমিতকারী বাক্য দ্বারা কেন উল্লেখ করা হয়েছে? প্রকৃত ব্যাপার হল, এর পূর্ব থেকে মুশরিকদের জাহেলী যুগের চাল-চলন এবং তার খন্ডনের কথা চলে আসছে এবং এরই মধ্যে সেই পশুগুলোর কথাও এসেছে, যেগুলো তারা নিজেদের পক্ষ থেকেই হারাম করে নিয়েছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বলা হচ্ছে যে, আমার প্রতি যে অহী করা হয়েছে তাতে এর উদ্দেশ্য হল, মুশরিকদের হারাম করে নেওয়া পশুগুলোর হালাল ঘোষণা দেওয়া। অর্থাৎ, সেগুলো হারাম নয়। কারণ, মহান আল্লাহ হারাম যে জিনিসগুলোর উল্লেখ করেছেন, তাতে তো এগুলো শামিলই নয়। যদি এগুলো হারাম হত, তবে আল্লাহ তাআলা এগুলোর উল্লেখ অবশ্যই করতেন। ইমাম শাওকানী এর বিশ্লেষণ এইভাবে করেছেন যে, এই আয়াত মক্কী হলে, তবে অবশ্যই এই সীমাবদ্ধতা মেনে নেওয়ার যোগ্য ছিল। কিন্তু যেহেতু কুরআনই সূরা মায়েদায় আরো কিছু হারাম জিনিস উল্লেখ করেছে এবং নবী করীম (সাঃ) ও কিছু হারাম জিনিস বর্ণনা করেছেন। অতএব, সেগুলোও এর মধ্যে শামিল হবে। এ ছাড়াও নবী করীম (সাঃ) পাখী ও হিংস্র জীবজন্তুর হালাল ও হারাম হওয়ার দু'টি মূল নীতি বর্ণনা করে দিয়েছেন, যার বিশ্লেষণও উল্লেখিত সূরার টীকায় বিদ্যমান রয়েছে। أَوْ فِسْقًا-এর সংযোগ হল لَحْمَ خِنْزِيْرٍ-এর সাথে। আর এ কারণেই যবর এসেছে। অর্থ হল, أَيْ:ذُبِحَ عَلَى الأَصْنَامِ "সেই পশু যা প্রতিমার নামে অথবা তাদের আস্তানায় তাদের নৈকট্য লাভের জন্য যবেহ করা হয়।" অর্থাৎ, এই ধরনের পশুগুলো আল্লাহর নামে যবেহ করা হলেও তা হারাম হবে। কেননা, এ থেকে আল্লাহর নৈকট্য নয়, বরং গায়রুল্লাহর নৈকট্য লাভ উদ্দেশ্য হয়। فسق হল আল্লাহর আনুগত্য থেকে বেরিয়ে যাওয়ার নাম। প্রতিপালক কেবল তাঁরই নামে এবং তাঁরই নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে যবেহ করার নির্দেশ দিয়েছেন। যদি এ রকম না করা হয়, তবে তা-ই হল 'ফিসক্ব' (অবাধ্যাচরণ) ও শিরক।

Al-An'aam 6:145Listen in Qur'an →
146

وَعَلَى ٱلَّذِينَ هَادُوا۟ حَرَّمْنَا كُلَّ ذِى ظُفُرٍۢ ۖ وَمِنَ ٱلْبَقَرِ وَٱلْغَنَمِ حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ شُحُومَهُمَآ إِلَّا مَا حَمَلَتْ ظُهُورُهُمَآ أَوِ ٱلْحَوَايَآ أَوْ مَا ٱخْتَلَطَ بِعَظْمٍۢ ۚ ذَٰلِكَ جَزَيْنَٰهُم بِبَغْيِهِمْ ۖ وَإِنَّا لَصَٰدِقُونَ

ইহুদীদের জন্যে আমি প্রত্যেক নখবিশিষ্ট জন্তু হারাম করেছিলাম এবং ছাগল ও গরু থেকে এতদুভয়ের চর্বি আমি তাদের জন্যে হারাম করেছিলাম, কিন্তু ঐ চর্বি, যা পৃষ্টে কিংবা অন্ত্রে সংযুক্ত থাকে অথবা অস্থির সাথে মিলিত থাকে। তাদের অবাধ্যতার কারণে আমি তাদেরকে এ শাস্তি দিয়েছিলাম। আর আমি অবশ্যই সত্যবাদী।

ইয়াহুদীদের জন্য নখযুক্ত সমস্ত পশু নিষিদ্ধ করেছিলাম[১] এবং গরু ও ছাগলের চর্বিও তাদের জন্য নিষিদ্ধ করেছিলাম। তবে এগুলির পৃষ্ঠদেশের অথবা অন্ত্র কিংবা অস্থিসংলগ্ন চর্বি নিষিদ্ধ ছিল না।[২] তাদের অবাধ্যতার দরুন আমি তাদেরকে এ প্রতিফল দিয়েছিলাম।[৩] নিশ্চয়ই আমি সত্যবাদী।[৪]

[১] নখবিশিষ্ট পশু বলতে এমন পা-বিশিষ্ট পশু, যার আঙ্গুলগুলো ফাঁক-ফাঁক অর্থাৎ, পৃথক পৃথক নয়। যেমন, উট, উটপাখী, হাঁস, রাজহাঁস ইত্যাদি। এই ধরনের সমস্ত পশু-পাখী হারাম ছিল। অর্থাৎ, কেবল সেই পশু ও পাখী তাদের জন্য হালাল ছিল যাদের পায়ের ক্ষুর বা আঙ্গুল ফাঁক ফাঁক হত।

[২] অর্থাৎ, যে চর্বি গরু অথবা ছাগলের পিঠে হয় (অথবা দুম্বার লেজে হয়) কিংবা যা নাড়ীভুঁড়ির সাথে মিশে থাকে। চর্বির এই পরিমাণটুকু হালাল ছিল।

[৩] এই জিনিসগুলো শাস্তি স্বরূপ আমি তাদের উপর হারাম করেছিলাম। অর্থাৎ, ইয়াহুদীদের এ দাবী সঠিক নয় যে, এ জিনিসগুলো ইয়াকূব (আঃ) নিজের উপর হারাম করে নিয়েছিলেন এবং আমরা তো তাঁরই অনুসরণে এগুলোকে হারাম মনে করি।

[৪] এর অর্থ হল, ইয়াহুদীরা অবশ্যই তাদের উল্লেখিত দাবীতে মিথ্যুক।

Al-An'aam 6:146Listen in Qur'an →
147

فَإِن كَذَّبُوكَ فَقُل رَّبُّكُمْ ذُو رَحْمَةٍۢ وَٰسِعَةٍۢ وَلَا يُرَدُّ بَأْسُهُۥ عَنِ ٱلْقَوْمِ ٱلْمُجْرِمِينَ

যদি তারা আপনাকে মিথ্যবাদী বলে, তবে বলে দিনঃ তোমার প্রতিপালক সুপ্রশস্ত করুণার মালিক। তাঁর শাস্তি অপরাধীদের উপর থেকে টলবে না।

তবুও যদি তারা তোমাকে মিথ্যাজ্ঞান করে তাহলে বল, ‘তোমাদের প্রতিপালক ব্যাপক করুণাময়।[১] আর অপরাধী সম্প্রদায়ের উপর হতে তাঁর শাস্তি রদ হয় না।’[২]

[১] এই কারণেই মিথ্যাজ্ঞান সত্ত্বেও শাস্তি দেওয়ার ব্যাপারে তিনি তাড়াহুড়া করেন না।

[২] অর্থাৎ, অবকাশ দেওয়ার অর্থ এই নয় যে, আল্লাহর শাস্তি থেকে সব সময়ের জন্য সুরক্ষিত থাকবে। তিনি যখনই শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন, তখন তা কেউ রোধ করতে পারবে না।

Al-An'aam 6:147Listen in Qur'an →
148

سَيَقُولُ ٱلَّذِينَ أَشْرَكُوا۟ لَوْ شَآءَ ٱللَّهُ مَآ أَشْرَكْنَا وَلَآ ءَابَآؤُنَا وَلَا حَرَّمْنَا مِن شَىْءٍۢ ۚ كَذَٰلِكَ كَذَّبَ ٱلَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ حَتَّىٰ ذَاقُوا۟ بَأْسَنَا ۗ قُلْ هَلْ عِندَكُم مِّنْ عِلْمٍۢ فَتُخْرِجُوهُ لَنَآ ۖ إِن تَتَّبِعُونَ إِلَّا ٱلظَّنَّ وَإِنْ أَنتُمْ إِلَّا تَخْرُصُونَ

এখন মুশরেকরা বলবেঃ যদি আল্লাহ ইচ্ছা করতেন, তবে না আমরা শিরক করতাম, না আমাদের বাপ দাদারা এবং না আমরা কোন বস্তুকে হারাম করতাম। এমনিভাবে তাদের পূর্ববর্তীরা মিথ্যারোপ করেছে, এমন কি তারা আমার শাস্তি আস্বাদন করেছে। আপনি বলুনঃ তোমাদের কাছে কি কোন প্রমাণ আছে যা আমাদেরকে দেখাতে পার। তোমরা শুধুমাত্র আন্দাজের অনুসরণ কর এবং তোমরা শুধু অনুমান করে কথা বল।

যারা অংশী স্থাপন করেছে তারা অচিরেই বলবে, ‘আল্লাহ যদি ইচ্ছা করতেন, তাহলে আমরা ও আমাদের পূর্বপুরুষেরা অংশী স্থাপন করতাম না এবং কোন কিছুই নিষিদ্ধও করতাম না।’[১] এভাবে তাদের পূর্ববর্তীগণও মিথ্যা মনে করেছিল, অবশেষে তারা আমার শাস্তি ভোগ করেছিল।[২] বল, ‘তোমাদের নিকট কোন যুক্তি আছে কি? থাকলে আমাদের নিকট তা পেশ কর।[৩] তোমরা শুধু ধারণারই অনুসরণ কর এবং শুধু অনুমানভিত্তিক কথাই বলে থাক।’

[১] এটা হল সেই ভুলই, যা আল্লাহর ইচ্ছা এবং তাঁর সন্তুষ্টি উভয়কে একই অর্থের মনে করা হয়ে থাকে। অথচ উভয়ের অর্থ ভিন্ন ভিন্ন। আর এর বিশ্লেষণ পূর্বে হয়ে গেছে।

[২] মহান আল্লাহ এই ভুল ধারণা এইভাবে দূর করলেন যে, যদি এই শিরক আল্লাহর সন্তুষ্টির আলোকে ছিল, তবে তাদের উপর আযাব কেন এল? আল্লাহর আযাব প্রমাণ করে যে, তাঁর ইচ্ছা এবং তাঁর সন্তুষ্টি একে অপর থেকে ভিন্ন জিনিস।

[৩] নিজেদের দাবীর উপর তোমাদের কাছে কোন দলীল থাকলে পেশ কর! কিন্তু তাদের কাছে দলীল কোথায়? তাদের কাছে তো খেয়াল ও ধারণা ছাড়া আর কিছুই নেই।

Al-An'aam 6:148Listen in Qur'an →
149

قُلْ فَلِلَّهِ ٱلْحُجَّةُ ٱلْبَٰلِغَةُ ۖ فَلَوْ شَآءَ لَهَدَىٰكُمْ أَجْمَعِينَ

আপনি বলে দিনঃ অতএব, পরিপূর্ন যুক্তি আল্লাহরই। তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদের সবাইকে পথ প্রদর্শন করতেন।

বল, ‘চূড়ান্ত প্রমাণ তো আল্লাহরই। তিনি যদি ইচ্ছা করতেন, তাহলে তোমাদের সকলকে সৎপথে পরিচালিত করতেন।’

Al-An'aam 6:149Listen in Qur'an →
150

قُلْ هَلُمَّ شُهَدَآءَكُمُ ٱلَّذِينَ يَشْهَدُونَ أَنَّ ٱللَّهَ حَرَّمَ هَٰذَا ۖ فَإِن شَهِدُوا۟ فَلَا تَشْهَدْ مَعَهُمْ ۚ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَآءَ ٱلَّذِينَ كَذَّبُوا۟ بِـَٔايَٰتِنَا وَٱلَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِٱلْءَاخِرَةِ وَهُم بِرَبِّهِمْ يَعْدِلُونَ

আপনি বলুনঃ তোমাদের সাক্ষীদেরকে আন, যারা সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ তা’আলা এগুলো হারাম করেছেন। যদি তারা সাক্ষ্য দেয়, তবে আপনি এ সাক্ষ্য গ্রহণ করবেন না এবং তাদের কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না, যারা আমার নির্দেশাবলীকে মিথ্যা বলে, যারা পরকালে বিশ্বাস করে না এবং যারা স্বীয় প্রতিপালকের সমতুল্য অংশীদার করে।

বল, ‘তোমরা তোমাদের সাক্ষীদেরকে হাজির কর যারা সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ এ নিষিদ্ধ করেছেন।’[১] অতঃপর তারা সাক্ষ্য দিলেও তুমি তাদের সাথে সাক্ষ্য দিও না।[২] যারা আমার আয়াত (বাক্যাবলী)কে মিথ্যা মনে করেছে, যারা পরকালে বিশ্বাস করে না এবং প্রতিপালকের সমকক্ষ দাঁড় করায়, তুমি তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করো না।[৩]

[১] অর্থাৎ, যে পশুগুলোকে মুশরিকরা হারাম করে নিয়েছিল।

[২] কারণ, তাদের কাছে মিথ্যা এবং মিথ্যা অপবাদ ছাড়া আর কিছুই নেই।

[৩] অর্থাৎ, তাঁর সমতুল্য নির্ধারণ করে শিরক করে।

Al-An'aam 6:150Listen in Qur'an →

Commentary: Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation. Qur'an text and translation via AlQuran Cloud.