Muslim99Muslim99
← Tafsir library

4. An-Nisaa

The Women · Medinan · 176 ayahs

سُورَةُ النِّسَاءِ

Reading Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation

Ayahs 51–60 of 176

51

أَلَمْ تَرَ إِلَى ٱلَّذِينَ أُوتُوا۟ نَصِيبًۭا مِّنَ ٱلْكِتَٰبِ يُؤْمِنُونَ بِٱلْجِبْتِ وَٱلطَّٰغُوتِ وَيَقُولُونَ لِلَّذِينَ كَفَرُوا۟ هَٰٓؤُلَآءِ أَهْدَىٰ مِنَ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ سَبِيلًا

তুমি কি তাদেরকে দেখনি, যারা কিতাবের কিছু অংশ প্রাপ্ত হয়েছে, যারা মান্য করে প্রতিমা ও শয়তানকে এবং কাফেরদেরকে বলে যে, এরা মুসলমানদের তুলনায় অধিকতর সরল সঠিক পথে রয়েছে।

তুমি কি তাদেরকে দেখনি, যাদেরকে কিতাবের এক অংশ দেওয়া হয়েছিল? তারা জিব্‌ত (শয়তান, শিরক, যাদু প্রভৃতি) ও তাগূত (বাতিল উপাস্যে) বিশ্বাস করে এবং অবিশ্বাসী (কাফের)দের সম্বন্ধে বলে যে, এদের পথ বিশ্বাসী (মুমিন)দের অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর। [১]

[১] এই আয়াতে ইয়াহুদীদের আর এক কর্মের প্রতি বিস্ময় প্রকাশ করা হচ্ছে। তারা কিতাবধারী হওয়া সত্ত্বেও 'জিব্ত' (শয়তান, মূর্তি, গণক অথবা যাদুকর) এবং 'তাগূত' (মিথ্যা উপাস্য)-এর উপর বিশ্বাস রাখে এবং মক্কার কাফেরদেরকে মুসলিমদের চেয়ে বেশী হিদায়াতপ্রাপ্ত মনে করে। উল্লিখিত সব অর্থেই 'জিব্ত' শব্দ ব্যবহার হয়। একটি হাদীসে এসেছে যে, "পাখি উড়িয়ে এবং রেখা টেনে শুভাশুভ নির্ণয় করা হল জিবতের (প্রতি ঈমানের) অন্তর্ভুক্ত।" (আবূ দাউদ) অর্থাৎ, এগুলো সব শয়তানী কাজ। ইয়াহুদীদের মধ্যে এর প্রচলন ছিল ব্যাপক। 'তাগূত'এর একটি অর্থ শয়তানও করা হয়েছে। আসলে বাতিল মা'বুদের পূজা করার অর্থই হল শয়তানের আনুগত্য করা। কাজেই শয়তান অবশ্যই তাগূতের মধ্যে শামিল।

52

أُو۟لَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ لَعَنَهُمُ ٱللَّهُ ۖ وَمَن يَلْعَنِ ٱللَّهُ فَلَن تَجِدَ لَهُۥ نَصِيرًا

এরা হলো সে সমস্ত লোক, যাদের উপর লা’নত করেছেন আল্লাহ তা’আলা স্বয়ং। বস্তুতঃ আল্লাহ যার উপর লা’নত করেন তুমি তার কোন সাহায্যকারী খুঁজে পাবে না।

এরাই তো তারা, যাদেরকে আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন। আর আল্লাহ যাকে অভিসম্পাত করেন, তুমি কখনো তার জন্য কোন সাহায্যকারী পাবে না।

53

أَمْ لَهُمْ نَصِيبٌۭ مِّنَ ٱلْمُلْكِ فَإِذًۭا لَّا يُؤْتُونَ ٱلنَّاسَ نَقِيرًا

তাদের কাছে কি রাজ্যের কোন অংশ আছে? তাহলে যে এরা কাউকেও একটি তিল পরিমাণও দেবে না।

তবে কি (আল্লাহর) রাজ্যে তাদের কোন অংশ আছে? (যদি থাকত) তাহলে তো তারা লোককে (খেজুরের আঁটির পিঠে) বিন্দু পরিমাণও দান করত না। [১]

[১] এখানে জিজ্ঞাসাসূচক বাক্যটি অস্বীকৃতিসূচক। অর্থাৎ, তাঁর রাজ্যে তাদের কোন অংশ নেই। এতে তাদের কোন অংশ থাকলে এই ইয়াহুদীরা এত কৃপণ কেন যে, তারা মানুষকে বিশেষ করে মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে একটি 'নাক্বীর' পরিমাণও কিছু দেয় না। আর نَقِيْرٌ (নাক্বীর) বলা হয় খেজুরের আঁটির পিঠের বিন্দুকে। (ইবনে কাসীর)

54

أَمْ يَحْسُدُونَ ٱلنَّاسَ عَلَىٰ مَآ ءَاتَىٰهُمُ ٱللَّهُ مِن فَضْلِهِۦ ۖ فَقَدْ ءَاتَيْنَآ ءَالَ إِبْرَٰهِيمَ ٱلْكِتَٰبَ وَٱلْحِكْمَةَ وَءَاتَيْنَٰهُم مُّلْكًا عَظِيمًۭا

নাকি যাকিছু আল্লাহ তাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহে দান করেছেন সে বিষয়ের জন্য মানুষকে হিংসা করে। অবশ্যই আমি ইব্রাহীমের বংশধরদেরকে কিতাব ও হেকমত দান করেছিলাম আর তাদেরকে দান করেছিলাম বিশাল রাজ্য।

অথবা আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে মানুষকে যা দিয়েছেন, সে জন্য কি তারা তাদের হিংসা করে?[১] ইব্রাহীমের বংশধরকেও তো ধর্মগ্রন্থ ও প্রজ্ঞা প্রদান করেছিলাম এবং তাদেরকে বিশাল রাজ্য দান করেছিলাম।

[১] اَم (নাকি, অথবা) بَل (বরং) অর্থেও ব্যবহার হতে পারে। অর্থাৎ, বরং এরা এই বলে হিংসা করে যে, মহান আল্লাহ বানী-ইসরাঈলদেরকে বাদ দিয়ে অন্যদের মধ্য থেকে (সর্বশেষ) নবী কেন বানালেন? আর এ কথা বিদিত যে, নবুঅত হল আল্লাহর সব থেকে বড় অনুগ্রহ।

55

فَمِنْهُم مَّنْ ءَامَنَ بِهِۦ وَمِنْهُم مَّن صَدَّ عَنْهُ ۚ وَكَفَىٰ بِجَهَنَّمَ سَعِيرًا

অতঃপর তাদের কেউ তাকে মান্য করেছে আবার কেউ তার কাছ থেকে দূরে সরে রয়েছে। বস্তুতঃ (তাদের জন্য) দোযখের শিখায়িত আগুনই যথেষ্ট।

অতঃপর তাদের কিছু লোক তাতে বিশ্বাস করেছে এবং কিছু তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।[১] বস্তুতঃ দগ্ধ করার জন্য জাহান্নামই যথেষ্ট।

[১] অর্থাৎ, ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশধর বানী-ইস্রাঈলদেরকে আমি নবুঅত এবং বিশাল রাজত্ব ও বাদশাহীও দিয়েছি। তা সত্ত্বেও ইয়াহুদীদের সমস্ত লোক তাঁদের উপর ঈমান আনেনি। কিছু লোক ঈমান এনেছিল এবং কিছু লোক ঈমান আনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। অর্থাৎ, হে মুহাম্মাদ! এদের আপনার নবুঅতের উপর ঈমান না আনা কোন নতুন কথা নয়। ওদের ইতিহাস তো নবীদেরকে মিথ্যাজ্ঞান করায় পরিপূর্ণ; এমন কি নিজেদের বংশোদ্ভূত নবীদের উপরও ঈমান আনেনি। কেউ কেউ آمَنَ بِهِ তে 'হি' সর্বনাম থেকে নবী করীম (সাঃ)-কে বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ, এই ইয়াহুদীদের মধ্য থেকে কিছু সংখ্যক মানুষ নবী করীম (সাঃ)-এর উপর ঈমান এনেছে এবং কিছু সংখ্যক মানুষ অস্বীকার করেছে। নবুঅতের এই অস্বীকারকারীদের পরিণাম হল জাহান্নাম।

56

إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ بِـَٔايَٰتِنَا سَوْفَ نُصْلِيهِمْ نَارًۭا كُلَّمَا نَضِجَتْ جُلُودُهُم بَدَّلْنَٰهُمْ جُلُودًا غَيْرَهَا لِيَذُوقُوا۟ ٱلْعَذَابَ ۗ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَزِيزًا حَكِيمًۭا

এতে সন্দেহ নেই যে, আমার নিদর্শন সমুহের প্রতি যেসব লোক অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করবে, আমি তাদেরকে আগুনে নিক্ষেপ করব। তাদের চামড়াগুলো যখন জ্বলে-পুড়ে যাবে, তখন আবার আমি তা পালটে দেব অন্য চামড়া দিয়ে, যাতে তারা আযাব আস্বাদন করতে থাকে। নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, হেকমতের অধিকারী।

নিশ্চয় যারা আমার আয়াতসমূহকে অবিশ্বাস করে তাদেরকে আমি অচিরেই আগুনে প্রবিষ্ট করব।[১] যখনই তাদের চর্ম দগ্ধ হবে, তখনই ওর স্থলে নূতন চর্ম সৃষ্টি করব, যাতে তারা শাস্তি ভোগ করতে থাকে।[২] নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

[১] অর্থাৎ, জাহান্নামে কেবল কিতাবধারীদের অস্বীকারকারীরাই যাবে না, বরং অন্য সমস্ত কাফেরদের ঠিকানাও হবে জাহান্নাম।

[২] এখানে রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি ও আযাবের ভয়াবহতা, তাঁর বিরতিহীনতা এবং তার একাধারে অব্যাহত থাকার বর্ণনা। কোন কোন সাহাবী থেকে বর্ণিত উক্তিতে এসেছে যে, চামড়ার এই পরিবর্তনের কাজ দিনে কয়েক শতবার হবে। (যেহেতু উষ্ণতা ও দগ্ধের জ্বালা ত্বকেই বেশী অনূভূত হয়, তাই মহান আল্লাহর এই ব্যবস্থা।) বিভিন্ন হাদীসের বর্ণনায় এসেছে যে, জাহান্নামীরা জাহান্নামে এত মোটা হয়ে যাবে যে, তাদের এক কাঁধ হতে অন্য কাঁধের দূরত্ব হবে দ্রুতগামী সওয়ারীর তিন দিনের পথ। তাদের চামড়ার স্থূলতা হবে সত্তর হাত এবং চোয়ালের দাঁত হবে উহুদ পাহাড়ের মত।

57

وَٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ وَعَمِلُوا۟ ٱلصَّٰلِحَٰتِ سَنُدْخِلُهُمْ جَنَّٰتٍۢ تَجْرِى مِن تَحْتِهَا ٱلْأَنْهَٰرُ خَٰلِدِينَ فِيهَآ أَبَدًۭا ۖ لَّهُمْ فِيهَآ أَزْوَٰجٌۭ مُّطَهَّرَةٌۭ ۖ وَنُدْخِلُهُمْ ظِلًّۭا ظَلِيلًا

আর যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, অবশ্য আমি প্রবিষ্ট করাব তাদেরকে জান্নাতে, যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নহর সমূহ। সেখানে তারা থাকবে অনন্তকাল। সেখানে তাদের জন্য থাকবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন স্ত্রীগণ। তাদেরকে আমি প্রবিষ্ট করব ঘন ছায়া নীড়ে।

আর যারা বিশ্বাস করে ও ভাল কাজ করে[১] তাদেরকে বেহেশ্তে প্রবেশ করাব; যার পাদদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে, সেখানে তাদের জন্য পবিত্র সঙ্গিনী আছে এবং তাদেরকে চিরস্নিগ্ধ ঘন ছায়ায় স্থান দান করব। [২]

[১] কাফেরদের বিপরীত ঈমানদারদের জন্য জান্নাতে নিরবচ্ছিন্ন যে নিয়ামত হবে এই আয়াতে তার আলোচনা করা হচ্ছে। তবে ঈমানদার বলতে এমন ঈমানদার ব্যক্তিবর্গ যাদের থাকবে অধিকহারে সৎকর্মের সম্বল। - جَعَلَنَا اللهُ مِنْهُم - মহান আল্লাহ কুরআন মাজীদের প্রত্যেক স্থানে ঈমানের সাথে সাথে সৎকর্মের কথা উল্লেখ করে এ কথা পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, এরা (ঈমান ও সৎকর্ম) আপোসে একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। নেক আমল ছাড়া ঈমান হল ঐরূপ, যেরূপ সুবাসবিহীন ফুল এবং ফলবিহীন গাছ। সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) এবং ইসলামের স্বর্ণযুগের মুসলিমরা এ কথা অনুধাবন করে নিয়েছিলেন। তাই তাঁদের জীবন ছিল ঈমানের ফল আমল দ্বারা পরিপূর্ণ। সে যুগে আমলবিহীন বা মন্দ আমলের সাথে ঈমানের কথা কল্পনাই করা যেত না। পক্ষান্তরে বর্তমানে কেবল মৌখিক জমা-খরচের নাম হয়েছে ঈমান। ঈমানের দাবীদারদের ঝুলি নেক আমল থেকে খালি।-هَدَانَا اللهُ تَعَالى- আবার অনেকে সততা, আমানতদারী, দয়া-দাক্ষিণ্য এবং অপরের দুঃখ মোচনের কাজ সহ আরো অনেক নৈতিকতার এমন কাজ করে, যা সৎকর্মের অন্তর্ভুক্ত; কিন্তু ঈমানের মূলধন থেকে সে বঞ্চিত থাকে। ফলে তার এই কর্মসমূহ দুনিয়াতে তার প্রসিদ্ধি এবং সুনামের মাধ্যম সাব্যস্ত হলেও আখেরাতে আল্লাহর নিকট তার কোন মূল্য থাকবে না। কারণ, নেক আমলকে আল্লাহর নিকট লাভদায়ক সাব্যস্তকারী ঈমানই তার মধ্যে নেই। বরং তার নেক আমলের ভিত্তি ছিল পার্থিব স্বার্থ অথবা জাতিগত অভ্যাস ও নৈতিকতা।

[২] চিরস্নিগ্ধ ঘন এবং পবিত্র ছায়া বলতে পরিপূর্ণ আরামকে বুঝানো হয়েছে। একটি হাদীসে এসেছে যে, "জান্নাতে একটি গাছ আছে; যার ছায়া এত সুদীর্ঘ যে, এক সওয়ার শত বছর চলার পরও তা অতিক্রম করতে পারবে না। এটা হল, 'শাজারাতুল খুলদ' (চিরস্থায়িত্বের গাছ)।"

(মুসনাদ আহমদ ২/৪৫৫ এর মূল অংশ বুখারীতে জান্নাতের বিবরণ অধ্যায় রয়েছে।)

58

۞ إِنَّ ٱللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا۟ ٱلْأَمَٰنَٰتِ إِلَىٰٓ أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُم بَيْنَ ٱلنَّاسِ أَن تَحْكُمُوا۟ بِٱلْعَدْلِ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُم بِهِۦٓ ۗ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ سَمِيعًۢا بَصِيرًۭا

নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদিগকে নির্দেশ দেন যে, তোমরা যেন প্রাপ্য আমানতসমূহ প্রাপকদের নিকট পৌছে দাও। আর যখন তোমরা মানুষের কোন বিচার-মীমাংসা করতে আরম্ভ কর, তখন মীমাংসা কর ন্যায় ভিত্তিক। আল্লাহ তোমাদিগকে সদুপদেশ দান করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ শ্রবণকারী, দর্শনকারী।

নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, আমানত তার মালিককে প্রত্যর্পণ করবে।[১] আর যখন তোমরা মানুষের মধ্যে বিচার-কার্য পরিচালনা করবে, তখন ন্যায়পরায়ণতার সাথে বিচার করবে।[২] আল্লাহ তোমাদেরকে যে উপদেশ দেন, তা কত উৎকৃষ্ট![৩] নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।

[১] অধিকাংশ মুফাসসিরীনদের নিকট এই আয়াত উসমান বিন ত্বালহা (রাঃ)-এর ব্যাপারে নাযিল হয়েছে। তিনি বংশগতভাবেই কা'বা শরীফের তত্ত্বাবধায়ক এবং তার চাবি-রক্ষক ছিলেন। তিনি হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। মক্কা বিজয়ের পর রসূল (সাঃ) কা'বা শরীফে উপস্থিত হয়ে তওয়াফ ইত্যাদি সেরে নিয়ে উসমান বিন ত্বালহা (রাঃ)-কে ডেকে পাঠালেন। অতঃপর তাঁর হাতে কা'বা শরীফের চাবি হস্তান্তর করে বললেন, এগুলো তোমার চাবি। আজকের দিন হল, অঙ্গীকার পূরণ ও পুণ্যের দিন। (ইবনে কাসীর) কোন বিশেষ কারণে আয়াত অবতীর্ণ হলেও তার নির্দেশ সাধারণ এবং এতে সাধারণ ব্যক্তিবর্গ ও শাসকশ্রেণী উভয়কেই সম্বোধন করা হয়েছে। উভয়কে তাকীদ করা হয়েছে যে, আমানতসমূহ তাদের প্রাপকদের নিকট পৌঁছে দাও। এতে প্রথমতঃ এমন আমানতও শামিল যা কারো কাছে হিফাযতের জন্য রাখা হয়। এতে খিয়ানত না করে চাওয়ার সময় হিফাযতের সাথে যেন তা ফিরিয়ে দেওয়া হয়। দ্বিতীয়তঃ পদ ও দায়িত্ব যোগ্য লোকদেরকেই যেন দেওয়া হয়। কেবল রাজনৈতিক ভিত্তিতে অথবা বংশ, দেশ ও জাতিগত ভিত্তিতে কিংবা আত্মীয়তা ও কোটা ভিত্তিক নিয়মে পদ ও দায়িত্ব দেওয়া এই আয়াতের পরিপন্থী।

[২] এতে বিশেষ করে শাসকদেরকে ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখার এবং সুবিচার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একটি হাদীসে এসেছে যে, "বিচারক যতক্ষণ পর্যন্ত যুলুম করে না, ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তার সাথে থাকেন। অতঃপর সে যখন যুলুম শুরু করে দেয়, তখন আল্লাহ তাকে তার নিজের উপর ছেড়ে দেন।" (ইবনে মাজা)

[৩] অর্থাৎ, আমানতসমূহ তাদের প্রাপকদেরকে ফিরিয়ে দেওয়া এবং ন্যায়পরায়ণতা ও সুবিচার বজায় রাখার উপদেশ।

59

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ أَطِيعُوا۟ ٱللَّهَ وَأَطِيعُوا۟ ٱلرَّسُولَ وَأُو۟لِى ٱلْأَمْرِ مِنكُمْ ۖ فَإِن تَنَٰزَعْتُمْ فِى شَىْءٍۢ فَرُدُّوهُ إِلَى ٱللَّهِ وَٱلرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلْيَوْمِ ٱلْءَاخِرِ ۚ ذَٰلِكَ خَيْرٌۭ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا

হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর নির্দেশ মান্য কর, নির্দেশ মান্য কর রসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা বিচারক তাদের। তারপর যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হয়ে পড়, তাহলে তা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি প্রত্যর্পণ কর-যদি তোমরা আল্লাহ ও কেয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাসী হয়ে থাক। আর এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে উত্তম।

হে বিশ্বাসিগণ! যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস কর, তাহলে তোমরা আল্লাহর অনুগত হও, রসূল ও তোমাদের নেতৃবর্গ (ও উলামা)দের অনুগত হও।[১] আর যদি কোন বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটে, তাহলে সে বিষয়কে আল্লাহ ও রসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও। এটিই হল উত্তম এবং পরিণামে প্রকৃষ্টতর।[২]

[১] اُولُو الأمر (উলুল আম্র) বলতে কেউ বলেছেন, নেতা ও শাসকগণ। কেউ বলেছেন, উলামা ও ফুক্বাহাগণ। অর্থের দিক দিয়ে উভয় শ্রেণীর মান্যবরদেরকেই বুঝানো যেতে পারে। উদ্দেশ্য এই যে, প্রকৃত আনুগত্য তো আল্লাহর প্রাপ্য। কারণ তিনি বলেছেন, أَلاَ لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ] "জেনে রাখো, সৃষ্টি করা এবং নির্দেশদান তাঁরই কাজ।" (আ'রাফঃ ৫৪) [اِنِ الْحُكْمُ إلاَّ للهِ] "বিধান দেওয়ার অধিকার শুধু আল্লাহরই।" (ইউসুফঃ ৪০) কিন্তু রসূল (সাঃ) যেহেতু মহান আল্লাহর ইচ্ছার এক নিষ্ঠাবান প্রকাশক এবং তাঁর সন্তুষ্টির পথগুলো (মানুষের কাছে) তুলে ধরার ব্যাপারে তিনি তাঁর প্রতিনিধি, এ জন্যই মহান আল্লাহর স্বীয় আনুগত্যের সাথে সাথে রসূল (সাঃ)-এর আনুগত্য করাকেও ওয়াজেব করে দেন এবং বলেন যে, রসূলের আনুগত্য করলে প্রকৃতপক্ষে তাঁরই আনুগত্য করা হয়। [مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ] "যে ব্যক্তি রসূলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহর আনুগত্য করল।" (নিসাঃ ৮০) এ থেকে এ কথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, হাদীসও কুরআনের মত দ্বীনের দলীল। এ ছাড়া আমীর ও শাসকের আনুগত্য করাও জরুরী। কারণ, হয় তাঁরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নির্দেশের বাস্তবায়ন করেন অথবা সকল মানুষের কল্যাণ সাধনের ব্যবস্থাপনা ও তার রক্ষণাবেক্ষণ করেন। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আমীর ও শাসকের আনুগত্য করা জরুরী হলেও তা একেবারে শর্তহীনভাবে নয়, বরং তা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্যের শর্তসাপেক্ষ। আর এই কারণেই أَطِيْعُوا الله এর পরই أَطِيْعُوا الرَّسُوْل বলেছেন। কেননা, এই উভয় আনুগত্যই স্বতন্ত্র ও ওয়াজেব। পক্ষান্তরে وَأَطِيْعُوا أُولِي الأَمْر বলেননি, কারণ উলুল আম্র বা শাসকদের আনুগত্য স্বতন্ত্র নয়। আর হাদীসে বলা হয়েছে যে, ((لا طَاعَةَ لِمَخْلُوْقٍ فِي مَعْصِيَةِ الخَالِقِ)) "আল্লাহর অবাধ্যাচরণে কোন সৃষ্টির আনুগত্য নেই।" (মিশকাত ৩৬৯৬, আল্লামা আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।) মুসলিম শরীফের বর্ণনায় এসেছে, "আল্লাহর অবাধ্যতায় কোন আনুগত্য নেই।" (মুসলিম ১৮৪০নং) বুখারীর বর্ণনায় এসেছে, ((إِنَّمَا الطَّاعَةُ فِي المَعْرُوْفِ)) "আনুগত্য হবে কেবল ভালো কাজে।" (বুখারী ৭১৪৫) 'শাসকের কথা শুনতে হবে ও তাঁর আনুগত্য করতে হবে যতক্ষণ না (আল্লাহ ও তাঁর রসূলের) অবাধ্যতা হবে।' আলেম-উলামার ব্যাপারটাও অনুরূপ। (যদি তাঁদেরকে শাসকদের মধ্যে শামিল করা হয়) অর্থাৎ, তাঁদের আনুগত্য এই জন্যই করতে হবে যে, তাঁরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের যাবতীয় বিধি-বিধান বর্ণনা করেন এবং তাঁর দ্বীনের জন্য পথ-প্রদর্শকের কাজ করেন। বুঝা গেল যে, দ্বীনি বিষয়ে এবং দ্বীন সম্পর্কীয় কার্যকলাপে আলেম-উলামা শাসকদের মতই এমন কেন্দ্রীয়-মর্যাদাসম্পন্ন যে, জনসাধারণ তাঁদের প্রতি রুজু করে থাকে। তবে তাঁদের আনুগত্য ততক্ষণ পর্যন্ত করা যাবে, যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁরা জনসাধারণকে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের কথা শুনাবেন। কিন্তু তাদের বিপথগামী (বা কুরআন ও সুন্নাহর বিপরীতগামী) হওয়ার কথা স্পষ্ট হলে তাঁদের আনুগত্য করা যাবে না। বরং এই অবস্থায় তাঁদের আনুগত্য করলে বড় অপরাধ ও গুনাহ হবে।

[২] আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে দেওয়ার অর্থ, কুরআনের দিকে রুজু করা এবং এখন রসূলের দিকে ফিরিয়ে দেওয়ার অর্থ হল, (সহীহ) হাদীসের দিকে রুজু করা। বিবাদী সমস্যার সমাধানের জন্য এটা হল অতি উত্তম এক মৌলিক নীতি। আর এই মৌলিক নীতি থেকে এ কথাও পরিষ্কার হয়ে যায় যে, তৃতীয় কোন ব্যক্তিত্বের আনুগত্য ওয়াজেব নয়। যেমন, ব্যক্তি অনুকরণ অথবা নির্দিষ্ট করে কারো অন্ধানুকরণ করার সমর্থকরা তৃতীয় আর এক আনুগত্যকে জরুরী সাব্যস্ত করেছে। আর কুরআনের আয়াতের প্রকাশ্য বিরোধী …

60

أَلَمْ تَرَ إِلَى ٱلَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ ءَامَنُوا۟ بِمَآ أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَآ أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَن يَتَحَاكَمُوٓا۟ إِلَى ٱلطَّٰغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوٓا۟ أَن يَكْفُرُوا۟ بِهِۦ وَيُرِيدُ ٱلشَّيْطَٰنُ أَن يُضِلَّهُمْ ضَلَٰلًۢا بَعِيدًۭا

আপনি কি তাদেরকে দেখেননি, যারা দাবী করে যে, যা আপনার প্রতি অবর্তীর্ণ হয়েছে আমরা সে বিষয়ের উপর ঈমান এনেছি এবং আপনার পূর্বে যা অবর্তীণ হয়েছে। তারা বিরোধীয় বিষয়কে শয়তানের দিকে নিয়ে যেতে চায়, অথচ তাদের প্রতি নির্দেশ হয়েছে, যাতে তারা ওকে মান্য না করে। পক্ষান্তরে শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়।

তুমি কি তাদেরকে দেখনি, যারা ধারণা (ও দাবী) করে যে, তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং তোমার পূর্বে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তাতে তারা বিশ্বাস করে? অথচ তারা তাগূতের কাছে বিচারপ্রার্থী হতে চায়; যদিও তা প্রত্যাখ্যান করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর শয়তান তাদেরকে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট করতে চায়।

Commentary: Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation. Qur'an text and translation via AlQuran Cloud.