Muslim99Muslim99
← Tafsir library

4. An-Nisaa

The Women · Medinan · 176 ayahs

سُورَةُ النِّسَاءِ

Reading Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation

Ayahs 41–50 of 176

41

فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِن كُلِّ أُمَّةٍۭ بِشَهِيدٍۢ وَجِئْنَا بِكَ عَلَىٰ هَٰٓؤُلَآءِ شَهِيدًۭا

আর তখন কি অবস্থা দাঁড়াবে, যখন আমি ডেকে আনব প্রতিটি উম্মতের মধ্য থেকে অবস্থা বর্ণনাকারী এবং আপনাকে ডাকব তাদের উপর অবস্থা বর্ণনাকারীরূপে।

তখন তাদের কি অবস্থা হবে, যখন প্রত্যেক সম্প্রদায় থেকে একজন সাক্ষী (নবী) উপস্থিত করব এবং তোমাকেও তাদের সাক্ষীরূপে উপস্থিত করব? [১]

[১] প্রত্যেক উম্মতের মধ্য থেকে তাদের পয়গম্বর আল্লাহর নিকট সাক্ষ্য দিয়ে বলবেন যে, হে আল্লাহ! আমি তোমার বার্তা আমার জাতির নিকট পৌঁছে দিয়েছি। তারা মানেনি, তাতে আমার কি দোষ? অতঃপর তাদের উপর নবী করীম (সাঃ) সাক্ষ্য দেবেন যে, হে আল্লাহ! এই নবীরা সকলে সত্যবাদী। তিনি (সাঃ) এই সাক্ষ্য সেই কুরআনের ভিত্তিতে দিবেন, যা তাঁর উপর অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং যাতে বিগত নবীগণ ও তাঁদের জাতির ইতিবৃত্ত প্রয়োজনানুযায়ী বর্ণিত হয়েছে। এটা হবে এক কঠিন মুহূর্ত। এর কল্পনা শরীরে কম্পন সৃষ্টি করে দেয়। হাদীসে এসেছে যে, একদা রসূল (সাঃ) আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কাছ থেকে কুরআন শোনার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। তিনি কুরআন শুনাতে শুনাতে যখন এই আয়াতে এসে পৌঁছলেন, তখন রসূল (সাঃ) বললেন, থামো, যথেষ্ট হয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, আমি দেখলাম তাঁর দু'চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছে। (সহীহ বুখারী) কিছু লোক বলে থাকে, সাক্ষ্য সেই দিতে পারবে, যে সবকিছু স্বচক্ষে দেখবে। এই জন্যই তারা 'শাহীদ' এর অর্থ করেঃ উপস্থিত ও প্রত্যক্ষদর্শী এবং এইভাবে নবী করীম (সাঃ)-এর ব্যাপারে বুঝায় যে তিনি 'হাযির-নাযির' (সর্বত্র উপস্থিত এবং সব কিছুই দেখেন।) কিন্তু নবী করীম (সাঃ)-কে 'হাযির-নাযির' মনে করলে তাঁকে আল্লাহর গুণে শরীক করা হবে। আর এটা হল শিরক। কেননা, 'হাযির-নাযির' হওয়া কেবলমাত্র আল্লাহ তাআলার গুণ। 'শাহীদ' শব্দ থেকে 'হাযির-নাযির' হওয়া প্রমাণ করার কথা অতি দুর্বল। কারণ, নিশ্চিত জ্ঞানের ভিত্তিতেও সাক্ষ্য দেওয়া যায়। আর কুরআনে বর্ণিত ঘটনাদির চেয়ে অধিক নিশ্চিত জ্ঞান আর কিসের মাধ্যমে হতে পারে? এই নিশ্চিত জ্ঞানের ভিত্তিতেই মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর উম্মতকেও কুরআন [شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ] "বিশ্বের সমস্ত মানুষের সাক্ষী হবে" বলেছে। যদি সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য 'হাযির-নাযির' হওয়া জরুরী হয়, তাহলে মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর সকল উম্মতকে 'হাযির-নাযির' বলে বিশ্বাস করতে হবে। মোট কথা, রসূল (সাঃ)-এর ব্যাপারে এই ধরনের বিশ্বাস রাখা শিরক ও ভিত্তিহীন। أَعَاذَنَا اللهُ مِنْهُ

42

يَوْمَئِذٍۢ يَوَدُّ ٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ وَعَصَوُا۟ ٱلرَّسُولَ لَوْ تُسَوَّىٰ بِهِمُ ٱلْأَرْضُ وَلَا يَكْتُمُونَ ٱللَّهَ حَدِيثًۭا

সেদিন কামনা করবে সে সমস্ত লোক, যারা কাফের হয়েছিল এবং রসূলের নাফরমানী করেছিল, যেন যমীনের সাথে মিশে যায়। কিন্তু গোপন করতে পারবে না আল্লাহর নিকট কোন বিষয়।

যারা অবিশ্বাস করেছে এবং রসূলের অবাধ্য হয়েছে, তারা সেদিন কামনা করবে যে, যদি তারা মাটির সাথে মিশে যেত! এবং তারা (সেদিন) আল্লাহ হতে কোন কথাই গোপন করতে পারবে না।

43

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ لَا تَقْرَبُوا۟ ٱلصَّلَوٰةَ وَأَنتُمْ سُكَٰرَىٰ حَتَّىٰ تَعْلَمُوا۟ مَا تَقُولُونَ وَلَا جُنُبًا إِلَّا عَابِرِى سَبِيلٍ حَتَّىٰ تَغْتَسِلُوا۟ ۚ وَإِن كُنتُم مَّرْضَىٰٓ أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ أَوْ جَآءَ أَحَدٌۭ مِّنكُم مِّنَ ٱلْغَآئِطِ أَوْ لَٰمَسْتُمُ ٱلنِّسَآءَ فَلَمْ تَجِدُوا۟ مَآءًۭ فَتَيَمَّمُوا۟ صَعِيدًۭا طَيِّبًۭا فَٱمْسَحُوا۟ بِوُجُوهِكُمْ وَأَيْدِيكُمْ ۗ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَفُوًّا غَفُورًا

হে ঈমাণদারগণ! তোমরা যখন নেশাগ্রস্ত থাক, তখন নামাযের ধারে-কাছেও যেওনা, যতক্ষণ না বুঝতে সক্ষম হও যা কিছু তোমরা বলছ, আর (নামাযের কাছে যেও না) ফরয গোসলের আবস্থায়ও যতক্ষণ না গোসল করে নাও। কিন্তু মুসাফির অবস্থার কথা স্বতন্ত্র আর যদি তোমরা অসুস্থ হয়ে থাক কিংবা সফরে থাক অথবা তোমাদের মধ্য থেকে কেউ যদি প্রস্রাব-পায়খানা থেকে এসে থাকে কিংবা নারী গমন করে থাকে, কিন্তু পরে যদি পানিপ্রাপ্তি সম্ভব না হয়, তবে পাক-পবিত্র মাটির দ্বারা তায়াম্মুম করে নাও-তাতে মুখমন্ডল ও হাতকে ঘষে নাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা ক্ষমাশীল।

হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা নেশার অবস্থায় নামাযের নিকটবর্তী হয়ো না,[১] যতক্ষণ না তোমরা কি বলছ, তা বুঝতে পার এবং অপবিত্র অবস্থাতেও নয়, যদি তোমরা পথচারী না হও,[২] যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা গোসল কর।[৩] আর যদি তোমরা অসুস্থ হও অথবা সফরে থাক অথবা তোমাদের কেউ পায়খানা (শৌচস্থান) হতে আসে অথবা তোমরা নারী-সম্ভোগ কর এবং পানি না পাও, তাহলে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম কর; (তা) মুখে ও হাতে বুলিয়ে নাও।[৪] নিশ্চয় আল্লাহ পরম মার্জনাকারী, অত্যন্ত ক্ষমাশীল।

[১] এই নির্দেশ ছিল ঐ সময়ে, যখন মদ হারাম হওয়ার কথা তখনো নাযিল হয়নি। কোন এক খাবার দাওয়াতে মদ পানের পর নামাযে দাঁড়ালে নেশার ঘোরে ইমাম সাহেব কুরআন পড়তে ভুল করেন। (বিস্তারিত জানার জন্য দ্রষ্টব্যঃ তিরমিযী, তাফসীর সূরা নিসা) ফলে এই আয়াত অবতীর্ণ করে বলা হয় যে, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামায পড়ো না। অর্থাৎ, তখন কেবল নামাযের নিকটবর্তী সময়ে মদপান করতে নিষেধ করা হয়। মদপানের পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা ও তার হারাম হওয়ার নির্দেশ পরে নাযিল হয়। (এটা হল মদের ব্যাপারে দ্বিতীয় নির্দেশ যা শর্ত-সাপেক্ষ।)

[২] এর অর্থ এই নয় যে, পথে বা সফরে থাকা অবস্থায় পানি না পাওয়া গেলে অপবিত্র অবস্থাতেই নামায পড়ে নাও (যেমন অনেকে মনে করে), বরং অধিকাংশ উলামাদের নিকট এর অর্থ হল, অপবিত্র অবস্থায় তোমরা মসজিদে বসো না, তবে মসজিদ হয়ে কোথাও যাওয়ার দরকার হলে যেতে পার। কোন কোন সাহাবীর ঘর এমন ছিল যে, সেখানে মসজিদের সীমানা হয়ে যাওয়া ছাড়া তাঁদের কোন উপায় ছিল না। আর এই কারণেই মসজিদ-সীমানার ভিতর হয়ে অতিক্রম করে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। (ইবনে কাসীর) মুসাফিরের বিধান তো পরে আসবে।

[৩] অর্থাৎ, অপবিত্র অবস্থাতেও নামায পড়বে না। কারণ, নামাযের জন্য পবিত্রতা অত্যাবশ্যক।

[৪] এখানের যাদের জন্য তায়াম্মুম বিধেয়, তাদের কথা বলা হচ্ছেঃ (ক) অসুস্থ ব্যক্তি বলতে এমন রোগীকে বুঝানো হয়েছে, যে ওযু করলে ক্ষতি অথবা রোগ বৃদ্ধির আশঙ্কা করে। (খ) সফর বা মুসাফির সাধারণ শব্দ তাতে সফর লম্বা হোক বা সংক্ষিপ্ত; পানি না পেলে তায়াম্মুম করার অনুমতি আছে। পানি না পাওয়া গেলে তায়াম্মুম করার অনুমতি তো গৃহবাসী (অমুসাফির)-এরও আছে, কিন্তু রোগী ও মুসাফিরের এই ধরনের প্রয়োজন সাধারণতঃ বেশী দেখা দেয়, তাই বিশেষ করে তাদের জন্য এই অনুমতির কথা বর্ণনা করা হয়েছে। (গ) পেশাব-পায়খানার প্রয়োজন পূরণকারী এবং (ঘ) স্ত্রীর সাথে সহবাসকারীও যদি পানি না পায়, তাহলে তাদের জন্যও তায়াম্মুম করে নামায পড়ার অনুমতি আছে। আর তায়াম্মুম করার নিয়ম হল, পবিত্র মাটিতে একবার হাত দু'টিকে মেরে উভয় হাতকে কবজি পর্যন্ত বুলিয়ে নিয়ে (কনুই পর্যন্ত নয়) মুখে বুলিয়ে নিবে। নবী করীম (সাঃ) তায়াম্মুম সম্পর্কে বলেছেন, "উভয় হাত এবং মুখমন্ডলের জন্য একবার মাটিতে মারতে হবে।" (মুসনাদ আহমাদ ৪/২৬৩) [صَعِيْدًا طَيِّبًا] এর অর্থ হল, পবিত্র মাটি। মাটি থেকে উৎপন্ন প্রতিটি জিনিস নয়, যেমন অনেকে মনে করে। হাদীসে এটা আরো পরিষ্কার করে বলে দেওয়া হয়েছেঃ((جُعِلَتْ تُرْبَتُهَا لَنَا طَهُوْرًا إِذَا لَمْ نَجِدِ المَاءَ)) "পানি না পাওয়া গেলে যমীনের মাটিকে আমাদের জন্য পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম বানিয়ে দেওয়া হয়েছে।" (মুসলিম ৫২২নং)

44

أَلَمْ تَرَ إِلَى ٱلَّذِينَ أُوتُوا۟ نَصِيبًۭا مِّنَ ٱلْكِتَٰبِ يَشْتَرُونَ ٱلضَّلَٰلَةَ وَيُرِيدُونَ أَن تَضِلُّوا۟ ٱلسَّبِيلَ

তুমি কি ওদের দেখনি, যারা কিতাবের কিছু অংশ প্রাপ্ত হয়েছে, (অথচ) তারা পথভ্রষ্টতা খরিদ করে এবং কামনা করে, যাতে তোমরাও আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত হয়ে যাও।

তুমি কি তাদেরকে দেখনি, যাদেরকে কিতাবের এক অংশ দেওয়া হয়েছে? তারা বিভ্রান্তি ক্রয় করে এবং চায় যে, তোমরাও পথভ্রষ্ট হও।

45

وَٱللَّهُ أَعْلَمُ بِأَعْدَآئِكُمْ ۚ وَكَفَىٰ بِٱللَّهِ وَلِيًّۭا وَكَفَىٰ بِٱللَّهِ نَصِيرًۭا

অথচ আল্লাহ তোমাদের শত্রুদেরকে যথার্থই জানেন। আর অভিভাবক হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট এবং সাহায্যকারী হিসাবেও আল্লাহই যথেষ্ট।

বস্তুতঃ আল্লাহ তোমাদের শত্রুদেরকে ভালভাবে জানেন। আর অভিভাবক হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট এবং সাহায্যকারী হিসাবেও আল্লাহই যথেষ্ট।

46

مِّنَ ٱلَّذِينَ هَادُوا۟ يُحَرِّفُونَ ٱلْكَلِمَ عَن مَّوَاضِعِهِۦ وَيَقُولُونَ سَمِعْنَا وَعَصَيْنَا وَٱسْمَعْ غَيْرَ مُسْمَعٍۢ وَرَٰعِنَا لَيًّۢا بِأَلْسِنَتِهِمْ وَطَعْنًۭا فِى ٱلدِّينِ ۚ وَلَوْ أَنَّهُمْ قَالُوا۟ سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا وَٱسْمَعْ وَٱنظُرْنَا لَكَانَ خَيْرًۭا لَّهُمْ وَأَقْوَمَ وَلَٰكِن لَّعَنَهُمُ ٱللَّهُ بِكُفْرِهِمْ فَلَا يُؤْمِنُونَ إِلَّا قَلِيلًۭا

কোন কোন ইহুদী তার লক্ষ্য থেকে কথার মোড় ঘুড়িয়ে নেয় এবং বলে, আমরা শুনেছি কিন্তু অমান্য করছি। তারা আরো বলে, শোন, না শোনার মত। মুখ বাঁকিয়ে দ্বীনের প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শনের উদ্দেশে বলে, রায়েনা’ (আমাদের রাখাল)। অথচ যদি তারা বলত যে, আমরা শুনেছি ও মান্য করেছি এবং (যদি বলত, ) শোন এবং আমাদের প্রতি লক্ষ্য রাখ, তবে তাই ছিল তাদের জন্য উত্তম আর সেটাই ছিল যথার্থ ও সঠিক। কিন্তু আল্লাহ তাদের প্রতি অভিসম্পাত করেছেন তাদের কুফরীর দরুন। অতএব, তারা ঈমান আনছে না, কিন্তু অতি অল্পসংখ্যক।

ইয়াহুদীদের কিছু লোক (তাওরাতের) বাক্যাবলী বিকৃত করে এবং (মুহাম্মাদকে) বলে, ‘আমরা (তোমার কথা) শুনলাম ও অমান্য করলাম’ এবং ‘শোন! যেন শোনা না হয়।’[১] আর নিজেদের জিহ্বা কুঞ্চিত করে এবং ধর্মের প্রতি তাচ্ছিল্য করে বলে, ‘রায়িনা’। কিন্তু তারা যদি বলত, ‘শুনলাম ও মান্য করলাম’ এবং ‘শোন ও উনযুরনা (আমাদের খেয়াল কর)’ তবে তা তাদের জন্য উত্তম ও সুসঙ্গত হত। কিন্তু তাদের অবিশ্বাসের জন্য আল্লাহ তাদেরকে অভিসম্পাত করেছেন। অতএব, তাদের অল্পসংখক লোকই বিশ্বাস করবে। [২]

[১] ইয়াহুদীদের বহু ধৃষ্টতা ও বদমায়েশির মধ্যে একটা এটাও ছিল যে, তারা 'আমরা শুনলাম' বলার সাথে সাথেই বলে দিত যে, 'অমান্য করলাম।' অর্থাৎ, আমরা তোমার আনুগত্য করব না। এটা মনে মনে বলত অথবা নিজেদের সঙ্গী-সাথীদেরকে বলত বা অতি বড় অভদ্রতা ও বাহাদুরী দেখিয়ে সামনা-সামনিই বলে দিত। অনুরূপ غَيْرَ مُسْمَعٍ অর্থাৎ, তোমার কথা যেন শোনা না হয়, বদ্দুআ করে এ রকম বলত। অর্থাৎ, তোমার কথা যেন গৃহীত না হয়। আর رَاعِنَا সম্পর্কে জানার জন্য দ্রষ্টব্যঃ সূরা বাক্বারার ২:১০৪ নং আয়াতের টীকা।[২] অর্থাৎ, তাদের মধ্যে ঈমান আনয়নকারী লোকের সংখ্যা খুবই নগণ্য হবে। পূর্বে আলোচিত হয়েছে যে, ইয়াহুদীদের মধ্য থেকে ঈমান আনয়নকারীদের সংখ্যা দশ পর্যন্তও পৌঁছেনি। অথবা এর অর্থ হল, তারা অনেক অল্প বিষয়ের উপর ঈমান আনবে। অথচ ফলপ্রসূ ঈমানের দাবী হল, সমস্ত বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা।

47

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ أُوتُوا۟ ٱلْكِتَٰبَ ءَامِنُوا۟ بِمَا نَزَّلْنَا مُصَدِّقًۭا لِّمَا مَعَكُم مِّن قَبْلِ أَن نَّطْمِسَ وُجُوهًۭا فَنَرُدَّهَا عَلَىٰٓ أَدْبَارِهَآ أَوْ نَلْعَنَهُمْ كَمَا لَعَنَّآ أَصْحَٰبَ ٱلسَّبْتِ ۚ وَكَانَ أَمْرُ ٱللَّهِ مَفْعُولًا

হে আসমানী গ্রন্থের অধিকারীবৃন্দ! যা কিছু আমি অবতীর্ণ করেছি তার উপর বিশ্বাস স্থাপন কর, যা সে গ্রন্থের সত্যায়ন করে এবং যা তোমাদের নিকট রয়েছে পূর্ব থেকে। (বিশ্বাস স্থাপন কর) এমন হওয়ার আগেই যে, আমি মুছে দেব অনেক চেহারাকে এবং অতঃপর সেগুলোকে ঘুরিয়ে দেব পশ্চাৎ দিকে কিংবা অভিসম্পাত করব তাদের প্রতি যেমন করে অভিসম্পাত করেছি আছহাবে-সাবতের উপর। আর আল্লাহর নির্দেশ অবশ্যই কার্যকর হবে।

হে গ্রন্থধারিগণ! তোমরা তোমাদের নিকট যা আছে তার সমর্থনরূপে আমি যা অবতীর্ণ করেছি তাতে বিশ্বাস স্থাপন কর, এর পূর্বে যে, আমি বহু লোকের মুখমন্ডল বিকৃত করে পিছনের দিকে ফিরিয়ে দেব[১] অথবা শনিবার অমান্যকারীদেরকে যেরূপ অভিসম্পাত করেছিলাম, সেরূপ তাদেরকে অভিসম্পাত করব। [২] বস্তুতঃ আল্লাহর আদেশ কার্যকর হয়েই থাকে। [৩]

[১] অর্থাৎ, আল্লাহ ইচ্ছা করলে তোমাদেরকে তোমাদের কর্মের কারণে এই শাস্তি দিতে পারেন।[২] শনিবারের এ ঘটনা সূরা আ'রাফ ৭:১৬৩ নং আয়াতে আসবে। সামান্য ইঙ্গিত পূর্বে (সূরা বাক্বারাহ ২:৬৫ নং আয়াতে)ও করা হয়েছে। অর্থাৎ, তোমরাও তাদের মত অভিশপ্ত গণ্য হতে পার।[৩] অর্থাৎ, যখন তিনি কোন কিছুর আদেশ করেন, তখন না কেউ তাঁর বিরোধিতা করতে পারে, আর না কেউ তাঁকে বাধা দিতে পারে।

48

إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِۦ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَآءُ ۚ وَمَن يُشْرِكْ بِٱللَّهِ فَقَدِ ٱفْتَرَىٰٓ إِثْمًا عَظِيمًا

নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে লোক তাঁর সাথে শরীক করে। তিনি ক্ষমা করেন এর নিম্ন পর্যায়ের পাপ, যার জন্য তিনি ইচ্ছা করেন। আর যে লোক অংশীদার সাব্যস্ত করল আল্লাহর সাথে, সে যেন অপবাদ আরোপ করল।

নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে অংশী (শিরক) করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যার জন্য ইচ্ছা ক্ষমা করে দেন। [১] আর যে কেউ আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপন (শিরক) করে, সে এক মহাপাপ করে। [২]

[১] অর্থাৎ, এমন অপরাধ ও গুনাহ, যা থেকে তওবা না করেই মু'মিন মারা গেছে। আল্লাহ তাআলা কারো জন্য চাইলে কোন প্রকারের শাস্তি না দিয়েই তাকে ক্ষমা করে দেবেন এবং অনেককে শাস্তি দেওয়ার পর ক্ষমা করবেন। আবার অনেককে নবী করীম (সাঃ)-এর সুপারিশে ক্ষমা করবেন। কিন্তু আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করার অপরাধ কোন অবস্থাতেই মাফ হবে না। কেননা, মুশরিকের উপর তিনি জান্নাতকে হারাম করে দিয়েছেন।

[২] অন্যত্র বলেছেন, [إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ] "শিরক হল সব চেয়ে বড় অন্যায়।" (লুকমানঃ ১৩) হাদীসেও শিরককে সব থেকে বড় পাপ গণ্য করা হয়েছে। أَكْبَرُ الْكَبَائِرِ الشِّرْكُ بِاللهِ ...।

49

أَلَمْ تَرَ إِلَى ٱلَّذِينَ يُزَكُّونَ أَنفُسَهُم ۚ بَلِ ٱللَّهُ يُزَكِّى مَن يَشَآءُ وَلَا يُظْلَمُونَ فَتِيلًا

তুমি কি তাদেকে দেখনি, যারা নিজেদেরকে পূত-পবিত্র বলে থাকে অথচ পবিত্র করেন আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকেই? বস্তুতঃ তাদের উপর সুতা পরিমাণ অন্যায়ও হবে না।

তুমি কি তাদেরকে দেখনি যারা নিজেদেরকে পবিত্র মনে করে? অথচ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পবিত্র করে থাকেন। আর তাদের প্রতি খেজুরের আঁটির ফাটলে সুতো বরাবর (সামান্য পরিমাণ)ও যুলুম করা হবে না। [১]

[১] ইয়াহুদীরা নিজ মুখেই নিজেদের বড়াই ও প্রশংসা করত। যেমন তারা বলত, আমরা আল্লাহর পুত্র এবং তাঁর প্রিয়পাত্র ইত্যাদি। আল্লাহ বললেন, কাউকে প্রশংসাভাজন ও পবিত্র করণের কাজও আল্লাহর এবং কে পবিত্র তা তিনিই জানেন।فَتِيْل খেজুরের আঁটির ফাটলে অতি সূক্ষ্ণ ও পাতলা সুতোর মত যে অংশ থাকে সেটাকেই 'ফাতীল' বলা হয়। অর্থাৎ, এইটুকু সামান্য পরিমাণ যুলুমও করা হবে না।

50

ٱنظُرْ كَيْفَ يَفْتَرُونَ عَلَى ٱللَّهِ ٱلْكَذِبَ ۖ وَكَفَىٰ بِهِۦٓ إِثْمًۭا مُّبِينًا

লক্ষ্য কর, কেমন করে তারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে, অথচ এই প্রকাশ্য পাপই যথেষ্ট।

দেখ! তারা আল্লাহ সম্বন্ধে কিরূপ মিথ্যা উদ্ভাবন করছে। [১] আর প্রকাশ্য পাপ হিসাবে এটিই যথেষ্ট। [২]

[১] অর্থাৎ, নিজেদের পবিত্রতার দাবী করে।[২] অর্থাৎ, তাদের পবিত্র হওয়ার দাবী তাদের মিথ্যুক হওয়ার জন্য যথেষ্ট। কুরআনে কারীমের এই আয়াত এবং তার শানে নুযুলের বর্ণনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, একে অপরের প্রশংসা করা বিশেষ করে আত্মপ্রশংসা করার দাবী করা ঠিক ও জায়েয নয়। এই কথাটাকেই মহান আল্লাহ কুরআনের অন্যত্র এইভাবে বলেছেন, [فَلا تُزَكُّوا أَنْفُسَكُمْ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنِ اتَّقَى] (النجم: ৩২) "অতএব তোমরা আত্মপ্রশংসা করো না। আল্লাহই ভাল জানেন তোমাদের মধ্যে আল্লাহভীরু কে?" (সূরা নাজম ৫৩:৩২) মিকদাদ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে এসেছে যে, নবী করীম (সাঃ) আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমরা যেন মুখোমুখি প্রশংসাকারীদের মুখে ধুলো ছিটিয়ে দিই।" (মুসলিম ৩০০২নং) অপর এক হাদীসে এসেছে যে, রসূল (সাঃ) এক ব্যক্তিকে অপরজনের মুখোমুখি প্রশংসা করতে দেখলে বললেন, হায় হায়! তুমি তোমার সঙ্গীর গর্দান কেটে ফেললে।" তিনি বলেন, "তোমাদের মধ্যে যদি কাউকে একান্তই তার সঙ্গীর প্রশংসা করতে হয়, তাহলে সে যেন বলে, আমি ওকে এইরূপ মনে করি। আর আল্লাহর জ্ঞানের উপর কারো প্রশংসা করি না।" (বুখারী ২৬৬২নং)

Commentary: Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation. Qur'an text and translation via AlQuran Cloud.