Muslim99Muslim99
← Tafsir library

4. An-Nisaa

The Women · Medinan · 176 ayahs

سُورَةُ النِّسَاءِ

Reading Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation

Ayahs 31–40 of 176

31

إِن تَجْتَنِبُوا۟ كَبَآئِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ نُكَفِّرْ عَنكُمْ سَيِّـَٔاتِكُمْ وَنُدْخِلْكُم مُّدْخَلًۭا كَرِيمًۭا

যেগুলো সম্পর্কে তোমাদের নিষেধ করা হয়েছে যদি তোমরা সেসব বড় গোনাহ গুলো থেকে বেঁচে থাকতে পার। তবে আমি তোমাদের ক্রটি-বিচ্যুতিগুলো ক্ষমা করে দেব এবং সম্মান জনক স্থানে তোমাদের প্রবেশ করার।

তোমাদেরকে যা নিষেধ করা হয়েছে, তার মধ্যে যা গুরুতর (পাপ) তা থেকে বিরত থাকলে[১] আমি তোমাদের লঘুতর পাপগুলিকে মোচন করে দেব এবং তোমাদেরকে সম্মানজনক স্থানে প্রবেশাধিকার দান করব।

[১] কাবীরা তথা মহাপাপের সংজ্ঞায় মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন, মহাপাপ হল এমন পাপ, যার জন্য দন্ড বা শাস্তি নির্দিষ্ট আছে। কেউ বলেছেন, তা হল এমন পাপ, যার উপর কুরআন ও হাদীসে কঠোর ধমক অথবা লানত এসেছে। আবার কেউ বলেছেন, যে সমস্ত কাজ থেকে আল্লাহ ও তাঁর রসূল বাধা দান করেছেন সে সমস্ত কাজ করলে কাবীরা গুনাহ হবে। বস্তুতঃ উল্লিখিত যে কথাই কোন পাপে পাওয়া যাবে, তা কাবীরা গুনাহ বিবেচিত হবে। হাদীসসমূহে বিভিন্ন কাবীরা গুনাহের কথা উল্লেখ হয়েছে। কোন কোন আলেম তো কাবীরা গুনাহগুলো একটি কিতাবে একত্রিত করে দিয়েছেন। যেমন, ইমাম যাহাবীর 'আল-কাবায়ের', ইমাম হায়তামীর 'আয্যাওয়াজের আ'ন ইকতিরাফিল কাবায়ের' ইত্যাদি। এখানে একটি নীতিকথা বলা হল যে, যে মুসলিম কাবীরা গুনাহ যেমন, শিরক, পিতা-মাতার অবাধ্যতা এবং মিথ্যা কথা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকবে, আমি তার স্বাগীরা গুনাহ মাফ করে দিব। সূরা নাজম ৫৩:৩১ নং আয়াতেও এই বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। তবে সেখানে স্বাগীরা গুনাহ মাফের জন্য কাবীরা গুনাহের সাথে সাথে নির্লজ্জকর কাজ থেকেও বিরত থাকা জরুরী বলা হয়েছে। এ ছাড়াও অব্যাহতভাবে স্বাগীরা গুনাহ করতে থাকলে, তা কাবীরা গুনাহে পরিণত হয়ে যায়। অনুরূপ কাবীরা গুনাহ থেকে বিরত থাকার সাথে সাথে ইসলামের বিধি-বিধান ও তার ফরয কার্যাদি পালন করা এবং সৎ কর্মসমূহের প্রতি যত্ন নেওয়াও অতীব জরুরী। সাহাবায়ে কেরামগণ শরীয়তের এই লক্ষ্য বুঝে নিয়েছিলেন। তাই তাঁরা কেবল ক্ষমার অঙ্গীকারের উপরেই ভরসা করে বসে ছিলেন না, বরং আল্লাহর ক্ষমা ও তাঁর রহমত সুনিশ্চিতভাবে পাওয়ার জন্য উল্লিখিত সমূহ বিষয়ের প্রতি যত্ন নিয়েছিলেন। আর আমাদের ঝুলি তো আমল শূন্য, কিন্তু অন্তর আমাদের আশা-ভরসায় পরিপূর্ণ।

32

وَلَا تَتَمَنَّوْا۟ مَا فَضَّلَ ٱللَّهُ بِهِۦ بَعْضَكُمْ عَلَىٰ بَعْضٍۢ ۚ لِّلرِّجَالِ نَصِيبٌۭ مِّمَّا ٱكْتَسَبُوا۟ ۖ وَلِلنِّسَآءِ نَصِيبٌۭ مِّمَّا ٱكْتَسَبْنَ ۚ وَسْـَٔلُوا۟ ٱللَّهَ مِن فَضْلِهِۦٓ ۗ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ بِكُلِّ شَىْءٍ عَلِيمًۭا

আর তোমরা আকাঙ্ক্ষা করো না এমন সব বিষয়ে যাতে আল্লাহ তা’আলা তোমাদের একের উপর অপরের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। পুরুষ যা অর্জন করে সেটা তার অংশ এবং নারী যা অর্জন করে সেটা তার অংশ। আর আল্লাহর কাছে তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা কর। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা’আলা সর্ব বিষয়ে জ্ঞাত।

যা দিয়ে আল্লাহ তোমাদের কাউকেও কারোর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন, তোমরা তার লালসা করো না। পুরুষগণ যা অর্জন করে, তা তাদের প্রাপ্য অংশ এবং নারীগণ যা অর্জন করে, তা তাদের প্রাপ্য অংশ। তোমরা আল্লাহর কাছে তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা কর। [১] নিশ্চয় আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ।

[১] এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, উম্মে সালামা (রাঃ) আরজি পেশ করলেন যে, পুরুষরা জিহাদে অংশ গ্রহণ করে শাহাদাত লাভে ধন্য হন, কিন্তু আমরা মহিলারা এই ফযীলতপূর্ণ কাজ থেকে বঞ্চিতা। আমাদের মীরাসও পুরুষদের অর্ধেক। এই কথার ভিত্তিতে এই আয়াত নাযিল হয়। (মুসনাদ আহমাদ ৬/৩২২) মহান আল্লাহর এই উক্তির অর্থ হল, তিনি তাঁর কৌশল অনুযায়ী পুরুষদেরকে শারীরিক যে শক্তি দান করেছেন এবং যে শক্তির ভিত্তিতে তারা জিহাদে অংশ গ্রহণ করে, এটা তাদের জন্য আল্লাহর বিশেষ দান। এগুলো দেখে নারীদেরকে পুরুষদের যোগ্যতাধীনের কাজ করার আশা করা উচিত নয়। অবশ্যই তাদের আল্লাহর আনুগত্য ও নেকীর কাজে বড়ই আগ্রহের সাথে অংশ গ্রহণ করা উচিত। তারা ভাল কাজ যা কিছু করবে পুরুষের ন্যায় তার পুরো পুরো প্রতিদান তারাও পাবে। এ ছাড়া তাদের উচিত, আল্লাহ নিকট তাঁর অনুগ্রহ কামনা করা। কারণ, নারী-পুরুষের মধ্যে কর্মদক্ষতা, যোগ্যতা এবং শক্তিমত্তার যে ব্যবধান, তা হল মহাশক্তিমান আল্লাহর এমন অটল ফায়সালা, যা কেবল কামনা করলেই পরিবর্তন হয়ে যায় না। তবে তাঁর অনুগ্রহে শ্রম ও উপার্জনের যে ঘাটতি, তা দূর হয়ে যেতে পারে।

33

وَلِكُلٍّۢ جَعَلْنَا مَوَٰلِىَ مِمَّا تَرَكَ ٱلْوَٰلِدَانِ وَٱلْأَقْرَبُونَ ۚ وَٱلَّذِينَ عَقَدَتْ أَيْمَٰنُكُمْ فَـَٔاتُوهُمْ نَصِيبَهُمْ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَلَىٰ كُلِّ شَىْءٍۢ شَهِيدًا

পিতা-মাতা এবং নিকটাত্নীয়গণ যা ত্যাগ করে যান সেসবের জন্যই আমি উত্তরাধিকারী নির্ধারণ করে দিয়েছি। আর যাদের সাথে তোমরা অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়েছ তাদের প্রাপ্য দিয়ে দাও। আল্লাহ তা’আলা নিঃসন্দেহে সব কিছুই প্রত্যক্ষ করেন।

(নারী-পুরুষ) সকলের জন্যই পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তির আমি উত্তরাধিকারী করেছি।[১] আর যাদের সাথে তোমরা অঙ্গীকারবদ্ধ তাদের (প্রাপ্য) অংশ তাদেরকে প্রদান কর। [২] নিঃসন্দেহে আল্লাহ সর্ব বিষয়ের প্রত্যক্ষদর্শী।

[১] مَوَالِيْ 'মাওয়ালী' হলمَوْلَى 'মাওলা'র বহুবচন। কয়েকটি অর্থে এটি ব্যবহার হয়। যেমন, বন্ধু, স্বাধীন করা ক্রীতদাস, চাচাতো ভাই এবং প্রতিবেশী। এখানে এর অর্থ হল ওয়ারেস বা উত্তরাধিকারী। অর্থাৎ, প্রত্যেক নারী-পুরুষের ত্যক্ত সম্পদের ওয়ারেস হবে তার পিতা-মাতা এবং অন্যান্য নিকটাত্মীয়রা।

[২] এই আয়াত রহিত, না রহিত নয় এ ব্যাপারে মুফাসসিরদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইবনে জারীর প্রভৃতি মুফাসসিরগণ এটিকে রহিত মানেন না এবং أَيْمَانُكُمْ (অঙ্গীকার বা চুক্তি) বলতে এমন শপথ ও অঙ্গীকারকে বুঝিয়েছেন যা একে অপরের সাহায্যের জন্য ইসলামের পূর্বে দুই ব্যক্তি অথবা দু'টি গোত্রের মধ্যে করা হয়েছে এবং ইসলামের পরেও তা বহাল আছে। نَصِيْبَهُمْ (অংশ) বলতে উক্ত শপথ ও অঙ্গীকার রক্ষা স্বরূপ পরস্পরের সাহায্য-সহযোগিতায় অংশগ্রহণ করাকে বুঝানো হয়েছে। আর ইবনে কাসীর এবং অন্য কিছু মুফাসসিরদের নিকট এ আয়াত রহিত। কেননা, أَيْمَانُكُمْ (অঙ্গীকার বা চুক্তি) বলতে তাঁদের নিকট সেই অঙ্গীকার, যা হিজরতের পর আনসারী ও মুহাজির সাহাবাগণের মাঝে ভ্রাতৃত্ব স্থাপনের মাধ্যমে হয়েছিল। এতে একজন মুহাজির সাহাবী আনসারী সাহাবীর মালের তাঁর আত্মীয়দের পরিবর্তে ওয়ারেস হতেন, কিন্তু এটা যেহেতু কেবল সাময়িক ব্যবস্থা স্বরূপ ছিল, তাই পরে [وَأُولُوا الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بِبَعْضٍ فِي كِتَابِ اللهِ] "যারা আত্মীয়, আল্লাহর বিধান মতে তারা পরস্পরের বেশী হকদার।" (আনফালঃ ৭৫) আয়াত নাযিল করে তা রহিত করে দিলেন। [فَآتُوهُمْ نَصِيبَهُمْ ] (তাদের (প্রাপ্য) অংশ তাদেরকে প্রদান কর) এর অর্থ বন্ধুত্ব, ভালবাসা ও এক অপরের সহযোগিতা; অনুরূপ অসীয়ত স্বরূপ কিছু দেওয়াও এর মধ্যে শামিল। বন্ধুত্বের বন্ধন এবং শপথ, অঙ্গীকার বা চুক্তিবন্ধন অথবা ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের ফলে ওয়ারেস হওয়ার কথা এখন আর ধারণাই করা যাবে না। আলেমদের একটি দল এ থেকে এমন দুই ব্যক্তিকে বুঝিয়েছেন, যাদের কমপক্ষে একজনের কোন ওয়ারেসই নেই। তারা পরস্পর এই চুক্তি করে যে, আমি তোমার বন্ধু। কোন অপরাধ করে ফেললে তুমি আমার সাহায্য করো। আর আমাকে হত্যা করা হলে, আমার রক্তপণ তুমি নিয়ে নিও। ফলে এই ওয়ারেসহীন ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার মাল উক্ত ব্যক্তি নিয়ে নেবে। তবে শর্ত হল, সত্যিকারেই যেন তার কোন ওয়ারেস না থাকে। অন্য একদল আলেম আয়াতের আরো এক অর্থ বর্ণনা করেছেন; তাঁরা বলেন, [وَالَّذِينَ عَقَدَتْ أَيْمَانُكُمْ] (যাদের সাথে তোমরা অঙ্গীকারবদ্ধ) থেকে স্ত্রী ও স্বামীকে বুঝানো হয়েছে এবং এর সম্পর্ক হল, الأَقْرَبُوْنَ (আত্মীয়-স্বজন) এর সাথে। অর্থ দাঁড়াবে, পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন এবং যাদের সাথে তোমরা অঙ্গীকারবদ্ধ (অর্থাৎ, স্বামী-স্ত্রী), তারা যা কিছু ছেড়ে যাবে, তাদের হকদার (ওয়ারেস) আমি নির্দিষ্ট করে দিয়েছি। অতএব এই হকদারদেরকে তাদের প্রাপ্য অংশ দিয়ে দাও। অর্থাৎ, পূর্বের আয়াতে বিস্তারিতভাবে মীরাসের অংশ নির্দিষ্ট করা হয়েছে, এখানে সংক্ষিপ্তাকারে তার প্রতি আরো একটু তাকীদ করা হয়েছে।

34

ٱلرِّجَالُ قَوَّٰمُونَ عَلَى ٱلنِّسَآءِ بِمَا فَضَّلَ ٱللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍۢ وَبِمَآ أَنفَقُوا۟ مِنْ أَمْوَٰلِهِمْ ۚ فَٱلصَّٰلِحَٰتُ قَٰنِتَٰتٌ حَٰفِظَٰتٌۭ لِّلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ ٱللَّهُ ۚ وَٱلَّٰتِى تَخَافُونَ نُشُوزَهُنَّ فَعِظُوهُنَّ وَٱهْجُرُوهُنَّ فِى ٱلْمَضَاجِعِ وَٱضْرِبُوهُنَّ ۖ فَإِنْ أَطَعْنَكُمْ فَلَا تَبْغُوا۟ عَلَيْهِنَّ سَبِيلًا ۗ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَلِيًّۭا كَبِيرًۭا

পুরুষেরা নারীদের উপর কৃর্তত্বশীল এ জন্য যে, আল্লাহ একের উপর অন্যের বৈশিষ্ট্য দান করেছেন এবং এ জন্য যে, তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে। সে মতে নেককার স্ত্রীলোকগণ হয় অনুগতা এবং আল্লাহ যা হেফাযতযোগ্য করে দিয়েছেন লোক চক্ষুর অন্তরালেও তার হেফাযত করে। আর যাদের মধ্যে অবাধ্যতার আশঙ্কা কর তাদের সদুপদেশ দাও, তাদের শয্যা ত্যাগ কর এবং প্রহার কর। যদি তাতে তারা বাধ্য হয়ে যায়, তবে আর তাদের জন্য অন্য কোন পথ অনুসন্ধান করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সবার উপর শ্রেষ্ঠ।

পুরুষ নারীর কর্তা। কারণ, আল্লাহ তাদের এককে অপরের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং এ জন্য যে পুরুষ (তাদের জন্য) ধন ব্যয় করে।[১] সুতরাং পুণ্যময়ী নারীরা অনুগতা এবং পুরুষের অনুপস্থিতিতে লোক-চক্ষুর অন্তরালে (স্বামীর ধন ও নিজেদের ইজ্জত) রক্ষাকারিণী; আল্লাহর হিফাযতে (তওফীকে) তারা তা হিফাযত করে। আর স্ত্রীদের মধ্যে যাদের অবাধ্যতার তোমরা আশংকা কর, তাদেরকে সদুপদেশ দাও, তাদের শয্যা ত্যাগ কর এবং তাদেরকে প্রহার কর। অতঃপর যদি তারা তোমাদের অনুগতা হয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে অন্য কোন পথ অন্বেষণ করো না। [২] নিশ্চয় আল্লাহ সুউচ্চ, সুমহান।

[১] এই আয়াতে পুরুষদের কর্তৃত্ব ও দায়িত্বশীলতার দু'টি কারণ বলা হয়েছে। প্রথমটি হল, আল্লাহ প্রদত্তঃ যেমন, পুরুষোচিত শক্তি ও সাহস এবং মেধাগত যোগ্যতায় পুরুষ সৃষ্টিগতভাবেই নারীর তুলনায় অনেক বেশী। দ্বিতীয়টি হল সব-উপার্জিতঃ এই দায়িত্ব শরীয়ত পুরুষের উপর চাপিয়েছে। মহিলাদেরকে তাদের প্রাকৃতিক দুর্বলতার কারণে এবং তাদের সতীত্ব, শ্লীলতা এবং পবিত্রতার হিফাযতের জন্য ইসলাম বিশেষ করে তাদের জন্য অতীব জরুরী যে বিধি-বিধান প্রণয়ন করেছে সেই কারণেও উপার্জনের ঝামেলা থেকে তাদেরকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। মহিলাদের নেতৃত্ব দানের বিরুদ্ধে কুরআন কারীমের এটা এক অকাট্য দলীল। এর সমর্থন সহীহ বুখারীর সেই হাদীস দ্বারাও হয়, যাতে নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, "এমন জাতি কখনোও সফলকাম হবে না, যে জাতি তাদের নেতৃত্বের দায়িত্বভার কোন মহিলার উপর অর্পণ করবে।"

[২] স্ত্রী অবাধ্য হলে সর্বপ্রথম তাকে সদুপদেশ ও নসীহতের মাধ্যমে বুঝাতে হবে। দ্বিতীয়তঃ সাময়িকভাবে তার সংসর্গ থেকে পৃথক হতে হবে। বুদ্ধিমতী মহিলার জন্য এটা বড় সতর্কতার বিষয়। কিন্তু এতেও যদি সে না বুঝে, তাহলে হাল্কাভাবে প্রহার করার অনুমতি আছে। তবে এই প্রহার যেন হিংস্রতা ও অত্যাচারের পর্যায়ে না পৌঁছে; যেমন অনেক মূর্খ লোকের স্বভাব। মহান আল্লাহ এবং তাঁর রসূল (সাঃ) এই যুলমের অনুমতি কাউকে দেননি। 'অতঃপর যদি তারা তোমাদের অনুগতা হয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে অন্য কোন পথ অন্বেষণ করো না' অর্থাৎ, তাহলে আর মারধর করো না, তাদের উপর সংকীর্ণতা সৃষ্টি করো না অথবা তাদেরকে তালাক দিও না। অর্থাৎ, তালাক হল একেবারে শেষ ধাপ; যখন আর কোন উপায় থাকবে না, তখন তার প্রয়োগ হবে। কিন্তু বহু স্বামী তাদের এই অধিকারকে বড় অন্যায়ভাবে ব্যবহার করে থাকে। ফলে সামান্য ও তুচ্ছ কারণে তালাক দিয়ে নিজের, স্ত্রীর এবং সন্তানদের জীবন নষ্ট করে থাকে।

35

وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَٱبْعَثُوا۟ حَكَمًۭا مِّنْ أَهْلِهِۦ وَحَكَمًۭا مِّنْ أَهْلِهَآ إِن يُرِيدَآ إِصْلَٰحًۭا يُوَفِّقِ ٱللَّهُ بَيْنَهُمَآ ۗ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَلِيمًا خَبِيرًۭا

যদি তাদের মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ হওয়ার মত পরিস্থিতিরই আশঙ্কা কর, তবে স্বামীর পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন সালিস নিযুক্ত করবে। তারা উভয়ের মীমাংসা চাইলে আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছু অবহিত।

আর যদি উভয়ের মধ্যে বিরোধ আশংকা কর, তাহলে তোমরা ওর (স্বামীর) পরিবার হতে একজন এবং এর (স্ত্রীর) পরিবার হতে একজন সালিস নিযুক্ত কর; [১] যদি তারা উভয়ে নিষ্পত্তির ইচ্ছা রাখে, তাহলে আল্লাহ তাদের মধ্যে মীমাংসার অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি করে দেবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবিশেষ অবহিত।

[১] উল্লিখিত তিনটি ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরও যদি কোন ফল না হয়, তাহলে এটা হল চতুর্থ ব্যবস্থা। এ ব্যাপারে বলা হল যে, দু'জন বিচারক নিষ্ঠাবান ও আন্তরিকতাপূর্ণ হলে, তাদের সংশোধনের প্রচেষ্টা অবশ্যই ফলপ্রসূ হবে। আর যদি তাদের প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ না হয়, তাহলে তালাকের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেওয়ার অধিকার তাদের আছে, না নেই? এ ব্যাপারে আলেমদের মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, এ অধিকার শর্তসাপেক্ষ; অর্থাৎ, তাতে শাসনকর্তৃপক্ষের আদেশ অথবা স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটানোর ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের অনুমতি থাকতে হবে। তবে অধিকাংশ উলামার নিকট কোন শর্ত ছাড়াই তাদের এ অধিকার আছে।

(বিস্তারিত জানার জন্য দ্রষ্টব্যঃ তাফসীর ত্বাবারী, ফাতহুল ক্বাদীর এবং ইবনে কাসীর)

36

۞ وَٱعْبُدُوا۟ ٱللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا۟ بِهِۦ شَيْـًۭٔا ۖ وَبِٱلْوَٰلِدَيْنِ إِحْسَٰنًۭا وَبِذِى ٱلْقُرْبَىٰ وَٱلْيَتَٰمَىٰ وَٱلْمَسَٰكِينِ وَٱلْجَارِ ذِى ٱلْقُرْبَىٰ وَٱلْجَارِ ٱلْجُنُبِ وَٱلصَّاحِبِ بِٱلْجَنۢبِ وَٱبْنِ ٱلسَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَٰنُكُمْ ۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يُحِبُّ مَن كَانَ مُخْتَالًۭا فَخُورًا

আর উপাসনা কর আল্লাহর, শরীক করো না তাঁর সাথে অপর কাউকে। পিতা-মাতার সাথে সৎ ও সদয় ব্যবহার কর এবং নিকটাত্নীয়, এতীম-মিসকীন, প্রতিবেশী, অসহায় মুসাফির এবং নিজের দাস-দাসীর প্রতিও। নিশ্চয়ই আল্লাহ পছন্দ করেন না দাম্ভিক-গর্বিতজনকে।

তোমরা আল্লাহর উপাসনা কর ও কোন কিছুকে তাঁর অংশী করো না এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন, অভাবগ্রস্ত, আত্মীয় ও অনাত্মীয় প্রতিবেশী, [১] সঙ্গী-সাথী,[২] পথচারী এবং তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের[৩] প্রতি সদ্ব্যবহার কর। নিশ্চয় আল্লাহ আত্মম্ভরী দাম্ভিককে ভালবাসেন না। [৪]

[১] الْجَارِ الْجُنُبِ (অনাত্মীয় প্রতিবেশী) আত্মীয় প্রতিবেশীর বিপরীতার্থক শব্দ হিসাবে ব্যবহার হয়েছে। এর অর্থ হল, এমন প্রতিবেশী যার সাথে আত্মীয়তার কোন সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ, প্রতিবেশীর সাথে প্রতিবেশী হওয়ার কারণে উত্তম ব্যবহার করো। তাতে সে আত্মীয় হোক অথবা না হোক। অনুরূপ হাদীসেও এর প্রতি বড়ই তাকীদ করা হয়েছে।

[২] এ থেকে সফর-সঙ্গী, সহকর্মী, স্ত্রী এবং এমন ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে, যে কোন লাভের আশায় কারো সাথে নৈকট্য ও ওঠা-বসার সম্পর্ক গড়ে তোলে। বরং এর আওতায় এমন লোকও আসতে পারে, যারা জ্ঞানচর্চা এবং কোন কাজ শেখার জন্য অথবা কোন ব্যবসা বা পেশার খাতিরে আপনার কাছে ওঠা-বসার সুযোগ লাভ করেছে। (ফাতহুল ক্বাদীর)

[৩] এতে ঘরের দাস-দাসী, ভৃত্য-চাকর, দোকানের এবং কারখানা ও মিলের কর্মচারীরাও এসে যায়। ক্রীতদাস-দাসীদের সাথে সদ্ব্যবহার করার বড়ই তাকীদ অনেক হাদীস এসেছে।

[৪] দাম্ভিকতা ও অহংকারকে মহান আল্লাহ চরম ঘৃণা করেন। এমন কি একটি হাদীসে এসেছে যে, "এমন ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ অহংকার থাকবে।" (মুসলিম ৯১নং) এখানে বিশেষ করে অহংকারের নিন্দা করার উদ্দেশ্য হল, আল্লাহ তাআলার ইবাদত এবং যাদের সাথে সদ্ব্যবহার করার তাকীদ করা হয়েছে, এর উপর আমল কেবল সেই ব্যক্তির পক্ষে করা সম্ভব, যার অন্তর অহংকার থেকে খালি। দাম্ভিক প্রকৃতার্থে না ইবাদতের হক আদায় করতে পারবে, না আপনজন ও অপরজনদের সাথে সদ্ব্যবহার করতে পারবে।

37

ٱلَّذِينَ يَبْخَلُونَ وَيَأْمُرُونَ ٱلنَّاسَ بِٱلْبُخْلِ وَيَكْتُمُونَ مَآ ءَاتَىٰهُمُ ٱللَّهُ مِن فَضْلِهِۦ ۗ وَأَعْتَدْنَا لِلْكَٰفِرِينَ عَذَابًۭا مُّهِينًۭا

যারা নিজেরাও কার্পন্য করে এবং অন্যকেও কৃপণতা শিক্ষা দেয় আর গোপন করে সে সব বিষয় যা আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে দান করেছেন স্বীয় অনুগ্রহে-বস্তুতঃ তৈরী করে রেখেছি কাফেরদের জন্য অপমান জনক আযাব।

যারা কৃপণতা করে এবং লোককে কৃপণতার নির্দেশ দেয় এবং আল্লাহ নিজ অনুগ্রহ হতে তাদেরকে যা দান করেছেন তা গোপন করে, (আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন না।) আর আমি অবিশ্বাসীদের জন্য লাঞ্ছনাকর শাস্তি প্রস্ত্তত করে রেখেছি।

38

وَٱلَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَٰلَهُمْ رِئَآءَ ٱلنَّاسِ وَلَا يُؤْمِنُونَ بِٱللَّهِ وَلَا بِٱلْيَوْمِ ٱلْءَاخِرِ ۗ وَمَن يَكُنِ ٱلشَّيْطَٰنُ لَهُۥ قَرِينًۭا فَسَآءَ قَرِينًۭا

আর সে সমস্ত লোক যারা ব্যয় করে স্বীয় ধন-সম্পদ লোক-দেখানোর উদ্দেশে এবং যারা আল্লাহর উপর ঈমান আনে না, ঈমান আনে না কেয়ামত দিবসের প্রতি এবং শয়তান যার সাথী হয় সে হল নিকৃষ্টতর সাথী।

আর যারা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে তাদের ধনসম্পদ খরচ করে এবং আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে না, (আল্লাহ তাদেরকেও ভালবাসেন না।) [১] আর শয়তান কারো সঙ্গী হলে, সে সঙ্গী কত মন্দ!

[১] কৃপণতা (অর্থাৎ, আল্লাহর পথে ব্যয় না করা) অথবা লোক দেখানো ও সুনাম লাভের জন্য ব্যয় করা; এই উভয় কাজই আল্লাহর নিকট অতি ঘৃণিত। আর এ কাজ নিন্দিত হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, এখানে কুরআনের আয়াতে এই উভয় কাজকে কাফেরদের অভ্যাস এবং এমন লোকদের স্বভাব বলা হয়েছে, যারা আখেরাতে বিশ্বাসী নয় ও যারা শয়তানের সাথী।

39

وَمَاذَا عَلَيْهِمْ لَوْ ءَامَنُوا۟ بِٱللَّهِ وَٱلْيَوْمِ ٱلْءَاخِرِ وَأَنفَقُوا۟ مِمَّا رَزَقَهُمُ ٱللَّهُ ۚ وَكَانَ ٱللَّهُ بِهِمْ عَلِيمًا

আর কিই বা ক্ষতি হত তাদের যদি তারা ঈমান আনত আল্লাহর উপর কেয়ামত দিবসের উপর এবং যদি ব্যয় করত আল্লাহ প্রদত্ত রিযিক থেকে! অথচ আল্লাহ, তাদের ব্যাপারে যথার্থভাবেই অবগত।

তারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করলে এবং আল্লাহ তাদেরকে যা প্রদান করেছেন, তা থেকে (সৎ কাজে) ব্যয় করলে, তাদের কি ক্ষতি হত? আর আল্লাহ তাদেরকে ভালোভাবেই জানেন।

40

إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَظْلِمُ مِثْقَالَ ذَرَّةٍۢ ۖ وَإِن تَكُ حَسَنَةًۭ يُضَٰعِفْهَا وَيُؤْتِ مِن لَّدُنْهُ أَجْرًا عَظِيمًۭا

নিশ্চয়ই আল্লাহ কারো প্রাপ্য হক বিন্দু-বিসর্গও রাখেন না; আর যদি তা সৎকর্ম হয়, তবে তাকে দ্বিগুণ করে দেন এবং নিজের পক্ষ থেকে বিপুল সওয়াব দান করেন।

নিশ্চয় আল্লাহ অণু পরিমাণও যুলুম করেন না এবং তা পুণ্যকার্য হলে, আল্লাহ তাকে বহুগুণে বর্ধিত করেন এবং আল্লাহ তাঁর নিকট হতে মহাপুরস্কার প্রদান করেন।

Commentary: Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation. Qur'an text and translation via AlQuran Cloud.