Muslim99Muslim99
← Tafsir library

4. An-Nisaa

The Women · Medinan · 176 ayahs

سُورَةُ النِّسَاءِ

Reading Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation

Ayahs 21–30 of 176

21

وَكَيْفَ تَأْخُذُونَهُۥ وَقَدْ أَفْضَىٰ بَعْضُكُمْ إِلَىٰ بَعْضٍۢ وَأَخَذْنَ مِنكُم مِّيثَٰقًا غَلِيظًۭا

তোমরা কিরূপে তা গ্রহণ করতে পার, অথচ তোমাদের একজন অন্য জনের কাছে গমন এবং নারীরা তোমাদের কাছে থেকে সুদৃঢ় অঙ্গীকার গ্রহণ করেছে।

কিরূপে তোমরা তা গ্রহণ করবে, যখন তোমরা পরস্পর মিলিত হয়েছ[১] এবং তারা তোমাদের নিকট থেকে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি নিয়েছে?[২]

[১] 'অথচ তোমরা পরস্পর মিলিত হয়েছ' এর অর্থ, সহবাস করা। মহান আল্লাহ এটাকে ইঙ্গিতে বর্ণনা করেছেন।

[২] 'দৃঢ় প্রতিশ্রুতি' বলতে সেই প্রতিশ্রুতি যা বিবাহের সময় পুরুষের কাছ থেকে নেওয়া হয়। আর তা হল, 'হয় তোমরা তাদেরকে নিয়ে ভালভাবে জীবন-যাপন করবে, না হয় সদ্ভাবে তাদেরকে বর্জন করবে।'

22

وَلَا تَنكِحُوا۟ مَا نَكَحَ ءَابَآؤُكُم مِّنَ ٱلنِّسَآءِ إِلَّا مَا قَدْ سَلَفَ ۚ إِنَّهُۥ كَانَ فَٰحِشَةًۭ وَمَقْتًۭا وَسَآءَ سَبِيلًا

যে নারীকে তোমাদের পিতা-পিতামহ বিবাহ করেছে তোমরা তাদের বিবাহ করো না। কিন্তু যা বিগত হয়ে গেছে। এটা অশ্লীল, গযবের কাজ এবং নিকৃষ্ট আচরণ।

নারীদের মধ্যে যাদেরকে তোমাদের পিতৃপুরুষ বিবাহ করেছে, তোমরা তাদেরকে বিবাহ করো না,[১] অবশ্য যা অতীতে হয়ে গেছে (তা ধর্তব্য নয়)। নিশ্চয় তা অশ্লীল, ক্রোধজনক ও নিকৃষ্ট আচরণ।

[১] ইসলামের পূর্বে জাহেলী যুগে সৎ বেটা নিজের বাপের স্ত্রী (অর্থাৎ, সৎ মা)-কে বিবাহ করে নিত। এই কাজ থেকে বাধা দেওয়া হচ্ছে। কারণ, এটা বড়ই নির্লজ্জতার কাজ। [وَلا تَنْكِحُوا مَا نَكَحَ آبَاؤُكُمْ] আয়াতের সাধারণ অর্থ এমন মহিলার সাথেও বিবাহ নিষেধ ঘোষণা করছে, যাকে তার পিতা বিবাহ করেছে এবং সহবাসের পূর্বেই তালাক দিয়ে দিয়েছে। ইবনে আববাস (রাঃ) থেকেও এই উক্তিই বর্ণিত হয়েছে। উলামাগণের মতও এটাই। (তাফসীরে ত্বাবারী)

23

حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ أُمَّهَٰتُكُمْ وَبَنَاتُكُمْ وَأَخَوَٰتُكُمْ وَعَمَّٰتُكُمْ وَخَٰلَٰتُكُمْ وَبَنَاتُ ٱلْأَخِ وَبَنَاتُ ٱلْأُخْتِ وَأُمَّهَٰتُكُمُ ٱلَّٰتِىٓ أَرْضَعْنَكُمْ وَأَخَوَٰتُكُم مِّنَ ٱلرَّضَٰعَةِ وَأُمَّهَٰتُ نِسَآئِكُمْ وَرَبَٰٓئِبُكُمُ ٱلَّٰتِى فِى حُجُورِكُم مِّن نِّسَآئِكُمُ ٱلَّٰتِى دَخَلْتُم بِهِنَّ فَإِن لَّمْ تَكُونُوا۟ دَخَلْتُم بِهِنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ وَحَلَٰٓئِلُ أَبْنَآئِكُمُ ٱلَّذِينَ مِنْ أَصْلَٰبِكُمْ وَأَن تَجْمَعُوا۟ بَيْنَ ٱلْأُخْتَيْنِ إِلَّا مَا قَدْ سَلَفَ ۗ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ غَفُورًۭا رَّحِيمًۭا

তোমাদের জন্যে হারাম করা হয়েছে তোমাদের মাতা, তোমাদের কন্যা, তোমাদের বোন, তোমাদের ফুফু, তোমাদের খালা, ভ্রাতৃকণ্যা; ভগিনীকণ্যা তোমাদের সে মাতা, যারা তোমাদেরকে স্তন্যপান করিয়েছে, তোমাদের দুধ-বোন, তোমাদের স্ত্রীদের মাতা, তোমরা যাদের সাথে সহবাস করেছ সে স্ত্রীদের কন্যা যারা তোমাদের লালন-পালনে আছে। যদি তাদের সাথে সহবাস না করে থাক, তবে এ বিবাহে তোমাদের কোন গোনাহ নেই। তোমাদের ঔরসজাত পুত্রদের স্ত্রী এবং দুই বোনকে একত্রে বিবাহ করা; কিন্তু যা অতীত হয়ে গেছে। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাকরী, দয়ালু।

তোমাদের জন্য হারাম (নিষিদ্ধ) করা হয়েছে তোমাদের মাতাগণ, কন্যাগণ, ভগিনীগণ, ফুফুগণ, ভ্রাতুষ্পুত্রীগণ, ভাগিনেয়ীগণ, দুগ্ধ-মাতাগণ, দুগ্ধ-ভগিনীগণ, শাশুড়িগণ ও তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যার সাথে সহবাস হয়েছে, তার পূর্ব স্বামীর ঔরসে তার গর্ভজাত কন্যাগণ, যারা তোমাদের অভিভাবকত্বে আছে, তবে যদি তাদের (কন্যাদের মাতার) সাথে সহবাস না হয়ে থাকে, তাহলে তোমাদের (বিবাহে) কোন দোষ নেই। আর তোমাদের জন্য তোমাদের ঔরসজাত পুত্রের স্ত্রীকে (হারাম করা হয়েছে। হারাম করা হয়েছে) দুই ভগিনীকে একত্রে বিবাহ করা; কিন্তু যা গত হয়ে গেছে, তা (ধর্তব্য নয়)। নিশ্চয় আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।[১]

[১] যে মহিলাদের সাথে বিবাহ হারাম এখানে তার বিস্তারিত আলোচনা করা হচ্ছে। এদের মধ্যে সাত প্রকার নারী বংশীয় সম্পর্কের কারণে হারাম। আর সাত প্রকার নারী দুধ সম্পর্কের কারণে হারাম এবং চার প্রকার নারী বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে হারাম। এ ছাড়া হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, ফুফু-ভাইঝি অথবা খালা-বুনঝি উভয়কে একত্রে বিবাহ করা হারাম। বংশীয় সম্পর্কের কারণে যারা হারাম তারা হলঃ মায়েরা, মেয়েরা, বোনেরা, ফুফুরা, খালারা এবং ভাইঝি ও ভাগ্নীরা। আর দুধ সম্পর্কের কারণে যারা হারাম তারা হল, দুধমায়েরা, দুধ মেয়েরা, দুধ বোনেরা, দুধ ফুফুরা, দুধ খালারা এবং দুধ ভাইঝি ও ভাগ্নীরা। বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে যারা হারাম তারা হল, শাশুড়ী, সৎ মেয়ে (যে স্ত্রীর সাথে সহবাস করেছে তার প্রথম স্বামীর মেয়েরা) এবং পুত্রবধু ও দুই বোনকে একত্রে বিবাহ করা। এ ছাড়া পিতার স্ত্রীও হারাম (যার কথা পূর্বে এসেছে)। আর হাদীস অনুযায়ী স্ত্রী যতক্ষণ পর্যন্ত বিবাহ বন্ধনে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার (স্ত্রীর) ফুফু, খালা এবং তার ভাইঝি ও ভাগ্নীর সাথে বিবাহ হারাম।

মায়েরা বলতে মায়ের মা (নানী), মায়ের দাদী এবং বাপের মা (দাদী) ও দাদীর মা ও তার দাদী এইভাবে পর্যায়ক্রমে যত আসবে সকলেই মায়ের আওতায় পড়বে। আর মেয়ের আওতায় পড়বে, পুতনীরা, নাতনীরা এবং পুতনী ও নাতনীদের মেয়েরা। ব্যভিচারের মাধ্যমে জন্ম লাভকারিণী বেটি মেয়ের মধ্যে শামিল হবে কি না এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। তিন ইমাম তাকে মেয়ের মধ্যেই শামিল করেছেন এবং তার সাথে বিবাহ হারাম মনে করেছেন। তবে ইমাম শাফেয়ী বলেছেন, সে বিধিসম্মত মেয়ে নয়। কাজেই যেভাবে সে [يُوصِيكُمُ اللهُ فِي أَوْلادِكُمْ] (মহান আল্লাহ তোমাদেরকে ত্যক্ত সম্পদ সন্তানদের মধ্যে বণ্টন করার নির্দেশ দিচ্ছেন।) সন্তানের অন্তর্ভুক্ত নয় এবং সকলের ঐক্যমতে সে ওয়ারিস হয় না, অনুরূপ সে এই আয়াতেও মেয়ের মধ্যে শামিল হবে না। আর আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত। (ইবনে কাসীর) বোনের পর্যায়ে পড়বে সহোদরা বোন, বৈপিত্রেয়ী বোন এবং বৈমাত্রেয়ী বোন সকলেই। ফুফুর মধ্যে বাপের, নানার এবং দাদার তিন প্রকার বোনরা শামিল। খালার অন্তর্ভুক্ত হল, মায়ের এবং নানী ও দাদীর তিন প্রকারের বোনরা। ভাইঝি বলতে তিন প্রকার (সহোদর, বৈপিত্রেয় ও বৈমাত্রেয়) ভাইদের আপন মেয়ে এবং তাদের মেয়েদের মেয়ে সকলেই শামিল। ভাগ্নীর পর্যায়ে পড়ে তিন প্রকার বোনদের আপন মেয়ে এবং তাদের মেয়েদের মেয়ে।

দুধ সম্পর্কের কারণে যারা হারাম তারা হল, দুধ মা, যার দুধ আপনি দুধ পানের নির্দিষ্ট সময়ে (অর্থাৎ, দু'বছরের মধ্যেই) পান করেছেন। দুধ বোন, সেই মহিলা যাকে আপনার আপন মা অথবা দুধমা দুধ পান করিয়েছে। আপনার সাথেই পান করিয়ে থাক অথবা আপনার আগেই কিংবা আপনার পরে আপনার অন্য ভাই-বোনদের সাথে পান করিয়ে থাক। অনুরূপ যে মহিলার আপন মা অথবা দুধমা আপনাকে দুধ পান করিয়েছে, যদিও বিভিন্ন সময়ে পান করিয়ে থাকে। দুধ পানের কারণে সেই সমস্ত সম্পর্ক হারাম হয়ে যাবে, যা বংশীয় কারণে হারাম হয়। অর্থাৎ, দুধ মায়ের বংশীয় ও দুধ সম্পর্কের সন্তানরা দুধ পানকারীর ভাই-বোন, এই মায়ের স্বামী তার পিতা, এই পিতার বোনরা তার ফুফু, এই মায়ের বোনরা তার খালা, এবং এই মায়ের স্বামীর ভায়েরা তার চাচা হয়ে যাবে। আর দুধ পানকারী শিশুর বংশীয় …

24

۞ وَٱلْمُحْصَنَٰتُ مِنَ ٱلنِّسَآءِ إِلَّا مَا مَلَكَتْ أَيْمَٰنُكُمْ ۖ كِتَٰبَ ٱللَّهِ عَلَيْكُمْ ۚ وَأُحِلَّ لَكُم مَّا وَرَآءَ ذَٰلِكُمْ أَن تَبْتَغُوا۟ بِأَمْوَٰلِكُم مُّحْصِنِينَ غَيْرَ مُسَٰفِحِينَ ۚ فَمَا ٱسْتَمْتَعْتُم بِهِۦ مِنْهُنَّ فَـَٔاتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ فَرِيضَةًۭ ۚ وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِيمَا تَرَٰضَيْتُم بِهِۦ مِنۢ بَعْدِ ٱلْفَرِيضَةِ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًۭا

এবং নারীদের মধ্যে তাদের ছাড়া সকল সধবা স্ত্রীলোক তোমাদের জন্যে নিষিদ্ধ; তোমাদের দক্ষিণ হস্ত যাদের মালিক হয়ে যায়-এটা তোমাদের জন্য আল্লাহর হুকুম। এদেরকে ছাড়া তোমাদের জন্যে সব নারী হালাল করা হয়েছে, শর্ত এই যে, তোমরা তাদেরকে স্বীয় অর্থের বিনিময়ে তলব করবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করার জন্য-ব্যভিচারের জন্য নয়। অনন্তর তাদের মধ্যে যাকে তোমরা ভোগ করবে, তাকে তার নির্ধারিত হক দান কর। তোমাদের কোন গোনাহ হবে না যদি নির্ধারণের পর তোমরা পরস্পরে সম্মত হও। নিশ্চয় আল্লাহ সুবিজ্ঞ, রহস্যবিদ।

নারীদের মধ্যে তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসী[১] ব্যতীত সকল সধবা তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ, তোমাদের জন্য এ হল আল্লাহর বিধান। উল্লিখিত নারীগণ ব্যতীত আর সকলকে বিবাহ করা তোমাদের জন্য বৈধ করা হল; এই শর্তে যে, তোমরা তাদেরকে নিজ সম্পদের বিনিময়ে বিবাহের মাধ্যমে গ্রহণ করবে, অবৈধ যৌন-সম্পর্কের মাধ্যমে নয়।[২] অতঃপর তোমরা তাদের মধ্যে যাদের (মাধ্যমে দাম্পত্যসুখ) উপভোগ করবে, তাদেরকে নির্ধারিত মোহর অর্পণ কর।[৩] মোহর নির্ধারণের পর কোন বিষয়ে পরস্পর রাযী হলে তাতে তোমাদের কোন দোষ হবে না।[৪] নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।

[১] কুরআন কারীমে إِحْصَانٌ শব্দটি চারটি অর্থে ব্যবহার হয়েছে। যথা, (ক) বিবাহ (খ) স্বাধীনতা (গ) সতীত্ব এবং (ঘ) ইসলাম। এই দিক দিয়ে مُحْصَنَات এর হবে চারটি অর্থঃ (ক) বিবাহিতা মহিলাগণ (খ) স্বাধীন মহিলাগণ (গ) সতী-সাধ্বী মহিলাগণ এবং (ঘ) মুসলিম মহিলাগণ। এখানে প্রথম অর্থকে বুঝানো হয়েছে। আয়াতের শানে নুযুল (অবতীর্ণ হওয়ার কারণ) সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, যখন কোন কোন যুদ্ধে কাফেরদের মহিলারা মুসলিমদের হাতে বন্দিনী হল, তখন ঐ সকল মহিলারা বিবাহিতা হওয়ার কারণে মুসলিমরা তাদের সাথে সহবাস করার ব্যাপারে ঘৃণা অনুভব করল। অতঃপর নবী করীম (সাঃ)-কে সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)-গণ এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে এই আয়াত অবতীর্ণ হল। (ইবনে কাসীর) এ থেকে জানা গেল যে, যুদ্ধলব্ধ কাফের মহিলারা মুসলিমদের হাতে বন্দিনী হয়ে এলে, তাদের সাথে সহবাস করা জায়েয, যদিও তারা বিবাহিতা হয়। তবে গর্ভমুক্ত কি না সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া জরুরী। অর্থাৎ, এক মাসিক দেখার পর অথবা গর্ভবতী হলে প্রসবের পর (নিফাস বন্ধ হলে তবেই) তার সাথে সহবাস করা যাবে।

ক্রীতদাসীদের মাসআলাঃ কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময় দাস-দাসীর রাখার প্রথা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। কুরআন এ প্রথাকে উচ্ছেদ তো করেনি, তবে তাদের ব্যাপারে এমন কৌশল ও যুক্তিময় পথ অবলম্বন করা হয়, যাতে তারা খুব বেশী বেশী সুযোগ-সুবিধা অর্জন করতে পারে এবং দাস-প্রথার প্রবণতা হ্রাস পায়। দু'টি মাধ্যমে এই প্রথা প্রচলিত ছিল। প্রথমটি হল, কোন কোন গোত্র এমন ছিল যাদের পুরুষ ও নারীকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ক্রয়-বিক্রয় করা হত। এই ক্রীত নর-নারীকেই ক্রীতদাস ও দাসী বলা হয়। মনিবের অধিকার হত তাদের দ্বারা সর্ব প্রকার ফয়দা ও উপকার অর্জন করা। আর দ্বিতীয়টি হল, যুদ্ধে বন্দী হওয়ার মাধ্যমে। কাফেরদের বন্দী মহিলাদেরকে মুসলিম যোদ্ধাদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হত এবং তারা দাসী হয়ে তাঁদের সাথে জীবন-যাপন করত। বন্দিনীদের জন্য এটাই ছিল উত্তম ব্যবস্থা। কারণ, তাদেরকে যদি সমাজে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেওয়া হত, তাহলে তাদের মাধ্যমে ফিৎনা-ফাসাদ সৃষ্টি হত। (বিস্তারিত জানার জন্য দ্রষ্টব্যঃ মৌলানা সাঈদ আহমদ আকবার আবাদী রচিত বই 'আররিক্কু ফীল ইসলাম' (ইসলামে দাসত্বের তাৎপর্য) মোট কথা হল, (স্বামীর বিবাহ বন্ধনে থাকা অবস্থায়) সধবা মুসলিম মহিলাদেরকে বিবাহ করা যেমন হারাম, তেমনি সধবা কাফের মহিলারাদেরকেও বিবাহ করা হারাম, তবে যদি তারা মুসলিমদের অধিকারে এসে যায়, তাহলে তারা গর্ভমুক্ত কি না এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁদের জন্য (যৌন-সংসর্গ) হালাল হবে।

[২] অর্থাৎ, কুরআন ও হাদীসে যে মহিলাদের সাথে বিবাহ করা হারাম বলে ঘোষিত হয়েছে, তাদেরকে ছাড়া অন্য মহিলাদেরকে বিবাহ করা জায়েয চারটি শর্তের ভিত্তিতে। (ক) তলব করতে হবে। অর্থাৎ, উভয় পক্ষের মধ্যে ইজাব ও কবুল (প্রস্তাব ও গ্রহণ) হতে হবে (এক পক্ষ প্রস্তাব দিবে এবং অপর পক্ষ কবুল করবে)। (খ) দেনমোহর আদায় করতে হবে। (গ) তাকে সব সময়ের জন্য বিবাহ বন্ধনে রাখা উদ্দেশ্য হবে, কেবল কাম-প্রবৃত্তি চরিতার্থ করাই লক্ষ্য হবে না। (যেমন, ব্যভিচারে অথবা শীয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত মুতআ' তথা কেবল যৌনক্ষুধা নিবারণের লক্ষ্যে কয়েক দিন বা কয়েক ঘণ্টার জন্য সাময়িকভাবে চুক্তিবিবাহ হয়ে থাকে)। (ঘ) গোপন প্রেমের মাধ্যমে যেন না হয়, বরং সাক্ষীর …

25

وَمَن لَّمْ يَسْتَطِعْ مِنكُمْ طَوْلًا أَن يَنكِحَ ٱلْمُحْصَنَٰتِ ٱلْمُؤْمِنَٰتِ فَمِن مَّا مَلَكَتْ أَيْمَٰنُكُم مِّن فَتَيَٰتِكُمُ ٱلْمُؤْمِنَٰتِ ۚ وَٱللَّهُ أَعْلَمُ بِإِيمَٰنِكُم ۚ بَعْضُكُم مِّنۢ بَعْضٍۢ ۚ فَٱنكِحُوهُنَّ بِإِذْنِ أَهْلِهِنَّ وَءَاتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ بِٱلْمَعْرُوفِ مُحْصَنَٰتٍ غَيْرَ مُسَٰفِحَٰتٍۢ وَلَا مُتَّخِذَٰتِ أَخْدَانٍۢ ۚ فَإِذَآ أُحْصِنَّ فَإِنْ أَتَيْنَ بِفَٰحِشَةٍۢ فَعَلَيْهِنَّ نِصْفُ مَا عَلَى ٱلْمُحْصَنَٰتِ مِنَ ٱلْعَذَابِ ۚ ذَٰلِكَ لِمَنْ خَشِىَ ٱلْعَنَتَ مِنكُمْ ۚ وَأَن تَصْبِرُوا۟ خَيْرٌۭ لَّكُمْ ۗ وَٱللَّهُ غَفُورٌۭ رَّحِيمٌۭ

আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি স্বাধীন মুসলমান নারীকে বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে না, সে তোমাদের অধিকারভুক্ত মুসলিম ক্রীতদাসীদেরকে বিয়ে করবে। আল্লাহ তোমাদের ঈমান সম্পর্কে ভালোভাবে জ্ঞাত রয়েছেন। তোমরা পরস্পর এক, অতএব, তাদেরকে তাদের মালিকের অনুমতিক্রমে বিয়ে কর এবং নিয়ম অনুযায়ী তাদেরকে মোহরানা প্রদান কর এমতাবস্থায় যে, তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে-ব্যভিচারিণী কিংবা উপ-পতি গ্রহণকারিণী হবে না। অতঃপর যখন তারা বিবাহ বন্ধনে এসে যায়, তখন যদি কোন অশ্লীল কাজ করে, তবে তাদেরকে স্বাধীন নারীদের অর্ধেক শাস্তি ভোগ করতে হবে। এ ব্যবস্থা তাদের জন্যে, তোমাদের মধ্যে যারা ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার ব্যাপারে ভয় করে। আর যদি সবর কর, তবে তা তোমাদের জন্যে উত্তম। আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়।

আর তোমাদের মধ্যে কারো স্বাধীনা বিশ্বাসী (মুমিন) নারীকে বিবাহ করার সামর্থ্য না থাকলে, তোমরা তোমাদের অধিকারভুক্ত বিশ্বাসী (মুমিন) যুবতী বিবাহ করবে। আর আল্লাহ তোমাদের বিশ্বাস (ঈমান) সম্বন্ধে খুব ভালোরূপে পরিজ্ঞাত। তোমরা একে অপরে সমান। সুতরাং তারা (প্রকাশ্যে) ব্যভিচারিণী অথবা (গোপনে) উপপতি গ্রহণকারিণী না হয়ে সচ্চরিত্রা হলে, তাদের মালিকের অনুমতিক্রমে তাদেরকে বিবাহ কর[১] এবং ন্যায়সঙ্গতভাবে তাদেরকে তাদের মোহর প্রদান কর। অতঃপর বিবাহিতা হয়ে যদি তারা ব্যভিচার করে, তাহলে তাদের শাস্তি (অবিবাহিতা) স্বাধীন নারীর অর্ধেক।[২] এ (দাসী-বিবাহের বিধান) তাদের জন্য, যারা তোমাদের মধ্যে (কষ্ট ও) ব্যভিচারকে ভয় করে। আর যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর, তাহলে তাতে তোমাদের মঙ্গল রয়েছে। আল্লাহ মহা ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। [৩]

[১] এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ক্রীতদাসীদের মালিক বা মনিবই তাদের ওলী ও অভিভাবক। কাজেই মনিবের অনুমতি ব্যতীত তার বিবাহ হতে পারে না। অনুরূপ ক্রীতদাসও তার মালিকের অনুমতি ছাড়া কোথাও বিয়ে করতে পারে না।

[২] অর্থাৎ, ক্রীতদাসীদেরকে ১০০ বেত্রাঘাতের পরিবর্তে (অর্ধেক অর্থাৎ) পঞ্চাশ চাবুক মারা হবে। অর্থাৎ, তাদের জন্য রজম (প্রস্তরাঘাতে হত্যা) করার শাস্তি নেই, কারণ তা অর্ধেক হয় না। আর অবিবাহিতা ক্রীতদাসীকে শিক্ষামূলক কিছু শাস্তি দেওয়া হবে।

(বিস্তারিত জানার জন্য দ্রষ্টব্যঃ তাফসীরে ইবনে কাসীর)

[৩] অর্থাৎ, এই ক্রীতদাসীদেরকে বিবাহ করার অনুমতি কেবল তাদের জন্য রয়েছে, যারা নিজেদের যৌবনের যৌন উত্তেজনা আয়ত্তে রাখার শক্তি রাখে না এবং ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করে। যদি এ রকম আশঙ্কা না থাকে, তাহলে সেই পর্যন্ত ধৈর্য ধরাই উত্তম, যে পর্যন্ত না স্বাধীন মহিলাকে বিবাহ করার সামর্থ্য লাভ হয়।

26

يُرِيدُ ٱللَّهُ لِيُبَيِّنَ لَكُمْ وَيَهْدِيَكُمْ سُنَنَ ٱلَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ وَيَتُوبَ عَلَيْكُمْ ۗ وَٱللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌۭ

আল্লাহ তোমাদের জন্যে সব কিছু পরিষ্কার বর্ণনা করে দিতে চান, তোমাদের পূর্ববর্তীদের পথ প্রদর্শন করতে চান। এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করতে চান, আল্লাহ মহাজ্ঞানী রহস্যবিদ।

আল্লাহ (তাঁর বিধান) তোমাদের নিকট বিশদভাবে বিবৃত করতে, তোমাদেরকে তোমাদের পূর্ববর্তীদের আদর্শে পরিচালনা করতে এবং তোমাদের তওবা কবুল করতে চান। বস্তুতঃ আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।

27

وَٱللَّهُ يُرِيدُ أَن يَتُوبَ عَلَيْكُمْ وَيُرِيدُ ٱلَّذِينَ يَتَّبِعُونَ ٱلشَّهَوَٰتِ أَن تَمِيلُوا۟ مَيْلًا عَظِيمًۭا

আল্লাহ তোমাদের প্রতি ক্ষমাশীল হতে চান, এবং যারা কামনা-বাসনার অনুসারী, তারা চায় যে, তোমরা পথ থেকে অনেক দূরে বিচ্যুত হয়ে পড়।

আল্লাহ তোমাদের তওবা কবুল করতে চান। আর যারা প্রবৃত্তির অনুসারী তারা চায় যে, তোমরা ভীষণভাবে পথচ্যুত হও। [১]

[১] أَنْ تَمِيْلُوْا অর্থাৎ, ন্যায় ছেড়ে অন্যায়ের দিকে ঝুঁকে পড়া। পথচ্যুত হওয়া।

28

يُرِيدُ ٱللَّهُ أَن يُخَفِّفَ عَنكُمْ ۚ وَخُلِقَ ٱلْإِنسَٰنُ ضَعِيفًۭا

আল্লাহ তোমাদের বোঝা হালকা করতে চান। মানুষ দুর্বল সৃজিত হয়েছে।

আল্লাহ তোমাদের ভার লঘু করতে চান। আর মানুষ সৃষ্টিগতভাবেই দুর্বল। [১]

[১] এই দুর্বলতার কারণে তার পাপে লিপ্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা বেশী। এই কারণে মহান আল্লাহ তার জন্য সম্ভবপর সুবিধাসমূহের ব্যবস্থা করেছেন। আর সেই সুবিধার একটি হল, ক্রীতদাসীকে বিয়ে করার অনুমতি দেওয়া। কেউ কেউ বলেছেন, এই দুর্বলতার সম্পর্ক হল মহিলাদের সাথে। অর্থাৎ, মহিলার ব্যাপারে পুরুষ নিতান্তই দুর্বল। আর এই কারণেই মহিলা কম বুদ্ধি সত্ত্বেও পুরুষকে সহজেই নিজের জালে ফাঁসিয়ে নিতে পারে।

29

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ لَا تَأْكُلُوٓا۟ أَمْوَٰلَكُم بَيْنَكُم بِٱلْبَٰطِلِ إِلَّآ أَن تَكُونَ تِجَٰرَةً عَن تَرَاضٍۢ مِّنكُمْ ۚ وَلَا تَقْتُلُوٓا۟ أَنفُسَكُمْ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًۭا

হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। কেবলমাত্র তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয় তা বৈধ। আর তোমরা নিজেদের কাউকে হত্যা করো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা’আলা তোমাদের প্রতি দয়ালু।

হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না। [১] তবে তোমাদের পরস্পর সম্মতিক্রমে ব্যবসার মাধ্যমে (গ্রহণ করলে তা বৈধ)।[২] আর নিজেদেরকে হত্যা করো না;[৩] নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।

[১] بِالْبَاطِلِ (অন্যায়ভাবে)এর মধ্যে ধোঁকা-প্রতারণা এবং জাল-জুয়াচুরি, ছল-চাতুরী ও ভেজাল মিশ্রিত করা সহ এমন সব ব্যবসা ও অর্থ উপার্জনের পদ্ধতিও শামিল, যা শরীয়ত কর্তৃক নিষিদ্ধ। যেমন, জুয়া, সুদ ইত্যাদি। অনুরূপ নিষিদ্ধ হারাম জিনিসের ব্যবসা করাও অন্যায়ভাবে পরের মাল ভক্ষণ করার শামিল। যেমন, বিনা প্রয়োজনের ছবি তোলা, গান-বাজনা বা ফিল্ম তথা অশ্লীল ছবির ক্যাসেট, সিডি বা তার প্লেয়ার যন্ত্র ইত্যাদি তৈরী করা, বিক্রি করা এবং মেরামত করা সব কিছুই নাজায়েয।

[২] এর জন্যও শর্ত হল, এই আদান-প্রদান হালাল জিনিসের হতে হবে। হারাম জিনিসের ব্যবসা আপোসে সম্মতিক্রমে হলেও তা হারাম হবে। তাছাড়া আপোসের সম্মতিতে 'খিয়ারে মজলিস'-এর বিষয়ও এসে যায়। অর্থাৎ, যতক্ষণ তারা একে অপর থেকে পৃথক না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ক্রয়-বিক্রয় বানচাল করার অধিকার থাকবে। যেমন হাদীসে এসেছে, ((البَيْعَانِ بِالْخِيَارِ مَالَمْ يَتَفَرَّقاَ)) "ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের ততক্ষণ পর্যন্ত (ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যাপারে) এখতিয়ার থাকে, যতক্ষণ না তারা একে অপর থেকে পৃথক হয়।" (বুখারী, মুসলিম)

[৩] এর অর্থ আত্মহত্যাও হতে পারে, যা মহাপাপ। আর পাপ করাও হতে পারে, কেননা তাও ধ্বংসের কারণ হয়। আবার কোন মুসলিমকে হত্যা করাও হতে পারে। কারণ, সকল মুসলিম একটি দেহের মত। কাজেই কোন মুসলিমকে হত্যা করা মানেই নিজেকে হত্যা করা।

30

وَمَن يَفْعَلْ ذَٰلِكَ عُدْوَٰنًۭا وَظُلْمًۭا فَسَوْفَ نُصْلِيهِ نَارًۭا ۚ وَكَانَ ذَٰلِكَ عَلَى ٱللَّهِ يَسِيرًا

আর যে কেউ সীমালঙ্ঘন কিংবা জুলুমের বশবর্তী হয়ে এরূপ করবে, তাকে খুব শীঘ্রই আগুনে নিক্ষেপ করা হবে। এটা আল্লাহর পক্ষে খুবই সহজসাধ্য।

পরন্ত যে কেউ সীমালংঘন করে অন্যায়ভাবে তা করবে,[১] আমি অচিরেই তাকে অগ্নিদগ্ধ করব এবং তা আল্লাহর পক্ষে সহজসাধ্য।

[১] অর্থাৎ, জেনে-শুনে সীমালঙ্ঘন করে অন্যায়ভাবে নিষিদ্ধ কাজ করবে।

Commentary: Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation. Qur'an text and translation via AlQuran Cloud.