Muslim99Muslim99
← Tafsir library

4. An-Nisaa

The Women · Medinan · 176 ayahs

سُورَةُ النِّسَاءِ

Reading Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation

Ayahs 151–160 of 176

151

أُو۟لَٰٓئِكَ هُمُ ٱلْكَٰفِرُونَ حَقًّۭا ۚ وَأَعْتَدْنَا لِلْكَٰفِرِينَ عَذَابًۭا مُّهِينًۭا

প্রকৃতপক্ষে এরাই সত্য প্রত্যাখ্যাকারী। আর যারা সত্য প্রত্যাখ্যানকারী তাদের জন্য তৈরী করে রেখেছি অপমানজনক আযাব।

তারাই হল প্রকৃতপক্ষে অবিশ্বাসী।[১] আর আমি অবিশ্বাসীদের জন্য লাঞ্ছনাকর শাস্তি প্রস্তুত রেখেছি।

[১] আহলে কিতাবদের সম্পর্কে প্রথমেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, তারা কিছু নবীগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, আর কিছু নবীগণকে অমান্য করে। যেমন, ইয়াহুদীরা ঈসা (আঃ) ও মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর প্রতি এবং খ্রিষ্টানরা মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, নবীগণের মধ্যে পার্থক্যকারীগণ (ঈমানদার নয়); বরং পুরোপুরি কাফের।

An-Nisaa 4:151Listen in Qur'an →
152

وَٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ بِٱللَّهِ وَرُسُلِهِۦ وَلَمْ يُفَرِّقُوا۟ بَيْنَ أَحَدٍۢ مِّنْهُمْ أُو۟لَٰٓئِكَ سَوْفَ يُؤْتِيهِمْ أُجُورَهُمْ ۗ وَكَانَ ٱللَّهُ غَفُورًۭا رَّحِيمًۭا

আর যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর উপর, তাঁর রসূলের উপর এবং তাঁদের কারও প্রতি ঈমান আনতে গিয়ে কাউকে বাদ দেয়নি, শীঘ্রই তাদেরকে প্রাপ্য সওয়াব দান করা হবে। বস্তুতঃ আল্লাহ ক্ষমাশীল দয়ালু।

পক্ষান্তরে যারা আল্লাহ এবং তাঁর রসূলগণে বিশ্বাস করে এবং তাদের কোন একজনের সাথে অন্য জনের পার্থক্য করে না, তাদেরকেই তিনি পুরস্কার দেবেন।[১] আর আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

[১] এই আয়াতে ঈমানদারদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে যে, তাঁরা সকল নবীগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে। যেমনটি মুসলিমরা কোন নবীকে অমান্য করে না। কুরআন কারীমের উপরোক্ত স্পষ্ট ঘোষণায় ঐ সব বিভ্রান্ত লোকদের মতবাদ খন্ডন করা হয়েছে, যারা বলে, 'সব ধর্ম সমান।' যারা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি উদারতা প্রদর্শন করতে গিয়ে নিজেদের ধর্মমত ও ধর্মীয় বিশ্বাসকে বিজাতির পদমূলে 'উৎসর্গ' দিতে চায়। যারা কুরআনের স্পষ্ট বিধানকে উপেক্ষা করে অন্যান্য ধর্মানুসারীদেরকে বুঝাতে চায় যে, ইসলামই একমাত্র মুক্তির সনদ নয়, বরং অমুসলিমরাও তাদের নিজ নিজ ধর্মে-কর্মে স্থির থেকে পরকালে পরিত্রাণ লাভ করতে পারে! অথচ কুরআনের এই আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপনের সাথে সাথে মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা জরুরী। সুতরাং কেউ যদি শেষ রসূলের রিসালতকে অমান্য করে, তাহলে আল্লাহর উপর তার ঈমান গ্রহণযোগ্য হবে না। (আরো দেখুন সূরা বাক্বারার ২:৬২ নং আয়াতের টীকা)

An-Nisaa 4:152Listen in Qur'an →
153

يَسْـَٔلُكَ أَهْلُ ٱلْكِتَٰبِ أَن تُنَزِّلَ عَلَيْهِمْ كِتَٰبًۭا مِّنَ ٱلسَّمَآءِ ۚ فَقَدْ سَأَلُوا۟ مُوسَىٰٓ أَكْبَرَ مِن ذَٰلِكَ فَقَالُوٓا۟ أَرِنَا ٱللَّهَ جَهْرَةًۭ فَأَخَذَتْهُمُ ٱلصَّٰعِقَةُ بِظُلْمِهِمْ ۚ ثُمَّ ٱتَّخَذُوا۟ ٱلْعِجْلَ مِنۢ بَعْدِ مَا جَآءَتْهُمُ ٱلْبَيِّنَٰتُ فَعَفَوْنَا عَن ذَٰلِكَ ۚ وَءَاتَيْنَا مُوسَىٰ سُلْطَٰنًۭا مُّبِينًۭا

আপনার নিকট আহলে-কিতাবরা আবেদন জানায় যে, আপনি তাদের উপর আসমান থেকে লিখিত কিতাব অবতীর্ণ করিয়ে নিয়ে আসুন। বস্তুতঃ এরা মূসার কাছে এর চেয়েও বড় জিনিস চেয়েছে। বলেছে, একেবারে সামনাসামনিভাবে আমাদের আল্লাহকে দেখিয়ে দাও। অতএব, তাদের উপর বজ্রপাত হয়েছে তাদের পাপের দরুন; অতঃপর তাদের নিকট সুস্পষ্ট প্রমাণ-নিদর্শন প্রকাশিত হবার পরেও তারা গো-বৎসকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছিল; তাও আমি ক্ষমা করে দিয়েছিলাম এবং আমি মূসাকে প্রকৃষ্ট প্রভাব দান করেছিলাম।

গ্রন্থধারিগণ তোমাকে তাদের জন্য আকাশ থেকে কোন কিতাব (ধর্মগ্রন্থ) অবতীর্ণ করতে বলে,[১] কিন্তু তারা মূসার কাছে এর থেকেও বড় দাবী করেছিল; তারা বলেছিল, ‘প্রকাশ্যে আমাদেরকে আল্লাহ দেখাও।’ তাদের সীমালংঘনের জন্য তারা বজ্রাহত হয়েছিল। অতঃপর স্পষ্ট প্রমাণ তাদের নিকট প্রকাশ হওয়ার পরও তারা গো-বৎসকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছিল, এটাও আমি ক্ষমা করেছিলাম। এবং মূসাকে প্রদান করেছিলাম সুস্পষ্ট প্রমাণ (ও প্রভাব)।

[১] অর্থাৎ, যেমন মূসা ত্বুর পাহাড়ে গিয়ে ফলকের উপর লিখিত তাওরাত নিয়ে এসেছিল, তেমনি তুমিও আসমানে গিয়ে লিখিত কুরআন নিয়ে এস। তাদের এ দাবী নিছক শত্রুতা, হঠকারিতা ও হঠধর্মিতার উপর ভিত্তি করে ছিল।

An-Nisaa 4:153Listen in Qur'an →
154

وَرَفَعْنَا فَوْقَهُمُ ٱلطُّورَ بِمِيثَٰقِهِمْ وَقُلْنَا لَهُمُ ٱدْخُلُوا۟ ٱلْبَابَ سُجَّدًۭا وَقُلْنَا لَهُمْ لَا تَعْدُوا۟ فِى ٱلسَّبْتِ وَأَخَذْنَا مِنْهُم مِّيثَٰقًا غَلِيظًۭا

আর তাদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নেবার উদ্দেশ্যে আমি তাদের উপর তূর পর্বতকে তুলে ধরেছিলাম এবং তাদেরকে বলেছিলাম, অবনত মস্তকে দরজায় ঢোক। আর বলেছিলাম, শনিবার দিন সীমালংঘন করো না। এভাবে তাদের কাছ থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়েছিলাম।

আর তাদের অঙ্গীকার নেবার সময় তূর পর্বতকে তাদের উপর উচ্চ করে ধরেছিলাম এবং তাদেরকে বলেছিলাম, ‘নতশিরে (নগরের) দ্বার প্রবেশ কর’ এবং তাদেরকে বলেছিলাম, ‘শনিবারে (বিশ্রামের দিন মাছ ধরে) সীমালংঘন করো না’ এবং তাদের নিকট থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়েছিলাম।

An-Nisaa 4:154Listen in Qur'an →
155

فَبِمَا نَقْضِهِم مِّيثَٰقَهُمْ وَكُفْرِهِم بِـَٔايَٰتِ ٱللَّهِ وَقَتْلِهِمُ ٱلْأَنۢبِيَآءَ بِغَيْرِ حَقٍّۢ وَقَوْلِهِمْ قُلُوبُنَا غُلْفٌۢ ۚ بَلْ طَبَعَ ٱللَّهُ عَلَيْهَا بِكُفْرِهِمْ فَلَا يُؤْمِنُونَ إِلَّا قَلِيلًۭا

অতএব, তারা যে শাস্তিপ্রাপ্ত হয়েছিল, তা ছিল তাদেরই অঙ্গীকার ভঙ্গর জন্য এবং অন্যায়ভাবে রসূলগণকে হত্যা করার কারণে এবং তাদের এই উক্তির দরুন যে, আমাদের হৃদয় আচ্ছন্ন। অবশ্য তা নয়, বরং কুফরীর কারণে স্বয়ং আল্লাহ তাদের অন্তরের উপর মোহর এঁটে দিয়েছেন। ফলে এরা ঈমান আনে না কিন্তু অতি অল্পসংখ্যক।

(তারা অভিশপ্ত হয়েছিল) কারণ, তারা তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছিল, আল্লাহর আয়াতসমূহকে অবিশ্বাস করেছিল, নবীগণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছিল[১] এবং বলেছিল, ‘আমাদের হৃদয় আচ্ছাদিত।’ বরং তাদের অবিশ্বাসের জন্য আল্লাহই তাদের (হৃদয়ে) মোহর মেরে দিয়েছেন, ফলে তাদের অল্প সংখ্যকই বিশ্বাস করে।

[১] প্রকৃত বাক্য এই রকম হবে; (فَبِنَقْضِهِمْ مِيْثَاقَهُمْ لَعَنَّاهُم) অর্থাৎ আমি তাদেরকে অঙ্গীকার ভঙ্গ, আল্লাহর নিদর্শনাবলীকে অস্বীকার ও অন্যায়ভাবে নবীগণকে হত্যা করার কারণে অভিশপ্ত করেছিলাম বা শাস্তি দিয়েছিলাম।

An-Nisaa 4:155Listen in Qur'an →
156

وَبِكُفْرِهِمْ وَقَوْلِهِمْ عَلَىٰ مَرْيَمَ بُهْتَٰنًا عَظِيمًۭا

আর তাদের কুফরী এবং মরিয়মের প্রতি মহা অপবাদ আরোপ করার কারণে।

এবং তারা তাদের অবিশ্বাসের জন্য ও মারয়্যামের প্রতি জঘন্য অপবাদ আরোপ করার জন্য (অভিশপ্ত হয়েছিল)। [১]

[১] এই আয়াতের লক্ষার্থ হল, ইউসুফ নাজ্জার (যোসেফ) নামক একজন লোকের সঙ্গে মারয়্যাম ('আলাইহাস্ সালাম)-এর ব্যভিচারের যে মিথ্যা অপবাদ আরোপ করা হয়েছিল তার খন্ডন। আজও কিছু তথাকথিত তত্ত্বানুসন্ধানী এই মস্তবড় মিথ্যা অপবাদকে একটি 'প্রামাণ্য সত্য' বলে বিশ্বাস করে এবং ইউসুফ নাজ্জারকে ঈসা (আঃ)-এর পিতা প্রমাণ করার অপচেষ্টা করে। (نَعُوْذُبِاللهِ) এমনকি তারা ঈসা (আঃ)-এর অলৌকিক জন্মকেও অস্বীকার করে।

An-Nisaa 4:156Listen in Qur'an →
157

وَقَوْلِهِمْ إِنَّا قَتَلْنَا ٱلْمَسِيحَ عِيسَى ٱبْنَ مَرْيَمَ رَسُولَ ٱللَّهِ وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَٰكِن شُبِّهَ لَهُمْ ۚ وَإِنَّ ٱلَّذِينَ ٱخْتَلَفُوا۟ فِيهِ لَفِى شَكٍّۢ مِّنْهُ ۚ مَا لَهُم بِهِۦ مِنْ عِلْمٍ إِلَّا ٱتِّبَاعَ ٱلظَّنِّ ۚ وَمَا قَتَلُوهُ يَقِينًۢا

আর তাদের একথা বলার কারণে যে, আমরা মরিয়ম পুত্র ঈসা মসীহকে হত্যা করেছি যিনি ছিলেন আল্লাহর রসূল। অথচ তারা না তাঁকে হত্যা করেছে, আর না শুলীতে চড়িয়েছে, বরং তারা এরূপ ধাঁধায় পতিত হয়েছিল। বস্তুতঃ তারা এ ব্যাপারে নানা রকম কথা বলে, তারা এক্ষেত্রে সন্দেহের মাঝে পড়ে আছে, শুধুমাত্র অনুমান করা ছাড়া তারা এ বিষয়ে কোন খবরই রাখে না। আর নিশ্চয়ই তাঁকে তারা হত্যা করেনি।

আর ‘আমরা আল্লাহর রসূল মারয়্যাম-পুত্র ঈসা মসীহকে হত্যা করেছি’ তাদের এ উক্তির জন্য (অভিশপ্ত হয়েছিল)। অথচ তারা তাকে হত্যা করেনি এবং ক্রুসবিদ্ধও করেনি,[১] বরং তাদের জন্য (অন্য একজনকে ঈসার) আকৃতি দান করা হয়েছিল।[২] নিঃসন্দেহে যারা তার সম্বন্ধে মতভেদ করেছিল, বস্তুতঃ তারা এ সম্বন্ধে সংশয়যুক্ত ছিল এবং অনুমানের অনুসরণ ছাড়া এ সম্পর্কে তাদের কোন জ্ঞানই ছিল না।[৩] আর এ নিশ্চিত যে, তারা তাকে হত্যা করেনি।

[১] এই আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইয়াহুদীরা ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করতে বা শূলে চড়াতে (ক্রুসবিদ্ধ করতে) কোনটিতেই সফল হয়নি যেমনটি তাঁদের উদ্দেশ্য, পরিকল্পনা ও অভিপ্রায় ছিল। এ প্রসঙ্গে সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা সূরা আলে-ইমরানের ৩:৫৫ নং আয়াতের টীকায় বর্ণনা করা হয়েছে।[২] এর ব্যাখ্যা হলো, যখন ঈসা (আঃ) ইয়াহুদীদের হত্যা করার চক্রান্তের কথা জানতে পারলেন, তখন তাঁর ভক্ত ও সহচরবৃন্দকে এক স্থানে সমবেত করলেন, যাদের সংখ্যা ১২ অথবা ১৭ ছিল। এবং তাঁদেরকে বললেন, তোমাদের মধ্যে কে আমার স্থানে নিহত হুতে প্রস্তুত আছ? যাকে আল্লাহ তা'আলা আমার মত আকার-আকৃতি দান করবেন। তাঁদের মধ্যে একজন যুবক প্রস্তুত হয়ে গেলেন। সুতরাং ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর নির্দেশে আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হল। এরপর ইয়াহুদীরা এসে ঐ যুবককে নিয়ে গেল এবং ক্রুসবিদ্ধ করল, যাঁকে মহান আল্লাহ ঈসা (আঃ)-এর মত আকৃতি দান করেছিলেন। আর ইয়াহুদীদের ধারণা হল যে, তারা ঈসাকেই ক্রুসবিদ্ধ করতে কৃতকার্য ও সক্ষম হয়েছে। অথচ তিনি ঐ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন না; বরং তাঁকে জীবিত অবস্থায় সশরীরে নিরাপদে আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। (ফাতহুল ক্বাদীর, ইবনে কাসীর)[৩] ঈসা (আঃ)-এর মত আকৃতিবিশিষ্ট লোকটিকে হত্যা করার পর ইয়াহুদীদের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়; একদল বলে, ঈসাকে হত্যা করা হয়েছে। অন্য একদল বলে, ক্রুসবিদ্ধ ব্যক্তি ঈসা নয়; বরং অন্য কোন ব্যক্তি। এরা ঈসা (আঃ)-কে হত্যা ও ক্রুসবিদ্ধ করার কথা অস্বীকার করে। আবার অন্য একদল বলে, তারা ঈসা (আঃ)-কে আসমানে চড়তে স্বচক্ষে দেখেছে। কিছু মুফাসসির বলেন, উক্ত মতভেদ থেকে উদ্দেশ্য হল, স্বয়ং নাসারাদের নাস্তরিয়া নামক একটি ফির্কা বলে যে, ঈসা (আঃ)-কে তাঁর মানবিক দেহ হিসাবে ক্রুসবিদ্ধ করা হয়েছে; কিন্তু ঈশ্বর হিসাবে নয়। আবার মালকানিয়া নামক একটি ফির্কা বলে, মানবিক ও ঐশ্বরিক উভয়ভাবেই তাঁকে হত্যা ও ক্রুসবিদ্ধ করা হয়েছে। (ফাতহুল ক্বাদীর) যাই হোক তারা মতবিরোধ, সংশয় ও সন্দেহের শিকার।

An-Nisaa 4:157Listen in Qur'an →
158

بَل رَّفَعَهُ ٱللَّهُ إِلَيْهِ ۚ وَكَانَ ٱللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًۭا

বরং তাঁকে উঠিয়ে নিয়েছেন আল্লাহ তা’আলা নিজের কাছে। আর আল্লাহ হচ্ছেন মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

বরং আল্লাহ তাকে তাঁর নিকট তুলে নিয়েছেন[১] এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।[২]

[১] এই আয়াত দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ তাআলা নিজের অলৌকিক শক্তি দ্বারা ঈসা (আঃ)-কে জীবিত অবস্থায় সশরীরে আসমানে তুলে নিয়েছেন। বহুধা সূত্রে বর্ণিত হাদীসেও এ কথা প্রমাণিত আছে। এ সকল হাদীস হাদীসের সমস্ত গ্রন্থ ছাড়াও বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। সে সব হাদীসে ঈসা (আঃ)-কে আসমানে তুলে নেওয়া ছাড়াও পুনরায় প্রলয় দিবসের প্রাক্কালে পৃথিবীতে তাঁর অবতরণ এবং আরো বহু কথা তাঁর ব্যাপারে উল্লেখ করা হয়েছে। ইমাম ইবনে কাসীর (রহঃ) এই সমস্ত হাদীসগুলিকে বর্ণনা করার পর শেষে লিখেছেন যে, উল্লিখিত হাদীসগুলি রসূল (সাঃ) হতে বহুধা সূত্রে প্রমাণিত। এই হাদীসগুলির বর্ণনাকারীগণ হলেনঃ আবু হুরাইরাহ, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, উসমান বিন আবুল আ'স, আবু উমামা, নাওয়াস বিন সামআন, আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আ'স, মুজাম্মে' বিন জারিয়াহ, আবূ সারীহাহ এবং হুযাইফা বিন উসায়েদ (রাঃ) প্রমুখ সাহাবাবৃন্দ। এই সমস্ত হাদীসে তিনি কোথায় ও কিভাবে অবতরণ করবেন তা উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি দিমাশকের মিনারা শারক্বিয়াতে ফজরের নামাজের ইকামতের সময় অবতরণ করবেন। তিনি শূকর হত্যা করবেন, ক্রুস ভেঙ্গে ফেলবেন ও জিযিয়া কর বাতিল করে দিবেন। তাঁর শাসনামলে পৃথিবীর সমস্ত মানুষ মুসলমান হয়ে যাবে। তিনিই দাজ্জালকে হত্যা করবেন, তাঁর যুগেই ইয়া'জুজ ও মা'জুজ ও তাদের ফিতনা-ফাসাদের প্রকাশ ঘটবে এবং তাঁর বদ্দুআতে তারা বিনাশ ও ধ্বংস হয়ে যাবে।

[২] অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা মহাপরাক্রমশালী ও বিজয়ী, তাঁর ইচ্ছাকে কেউ রদ্দ করতে পারে না। যে তাঁর আশ্রয়ে চলে আসবে, তার বিরুদ্ধে যে যতই ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত করুক না কেন, তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। তিনি হচ্ছেন মহাপ্রজ্ঞাময়, তাঁর প্রতিটি কাজের ভিতরে হিকমত, যুক্তি ও নিগূঢ় রহস্য বিদ্যমান রয়েছে।

An-Nisaa 4:158Listen in Qur'an →
159

وَإِن مِّنْ أَهْلِ ٱلْكِتَٰبِ إِلَّا لَيُؤْمِنَنَّ بِهِۦ قَبْلَ مَوْتِهِۦ ۖ وَيَوْمَ ٱلْقِيَٰمَةِ يَكُونُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًۭا

আর আহলে-কিতাবদের মধ্যে যত শ্রেণী রয়েছে তারা সবাই ঈমান আনবে ঈসার উপর তাদের মৃত্যুর পূর্বে। আর কেয়ামতের দিন তাদের জন্য সাক্ষীর উপর সাক্ষী উপস্থিত হবে।

ঐশীগ্রন্থধারীদের প্রত্যেকেই তার মৃত্যুর পূর্বে তাকে (ঈসাকে) বিশ্বাস করবেই[১] এবং কিয়ামতের দিন সে (ঈসা) তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী হবে। [২]

[১] আলোচ্য আয়াতে (قبل موته) এর মধ্যে هُ (তার) সর্বনামটি থেকে কিছু মুফাসসিরগণের মতে খ্রিষ্টানকে বুঝানো হয়েছে। এমতাবস্থায় আয়াতের ব্যাখ্যা এই যে, প্রত্যেক খ্রিষ্টানই নিজ অন্তিম মুহূর্তে ঈসা (আঃ)-এর নবুঅতের সত্যতা উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে এবং তাঁর প্রতি ঈমান আনবে। কিন্তু সেই মুহূর্তের ঈমান তাদের আদৌ কোন উপকারে আসবে না। দ্বিতীয় ব্যাখ্যা যা সালাফ ও বহু মুফাসসির কর্তৃক সমর্থিত, তা হলো موته (তার মৃত্যু) শব্দের সর্বনামে ঈসা (আঃ)-এর মৃত্যুর দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এমতাবস্থায় আয়াতের অর্থ হবে, যখন তিনি দ্বিতীয়বার দুনিয়াতে অবতরণ করবেন এবং দাজ্জালকে হত্যা করার পর, ইসলামের প্রচার ও প্রসার কাজে মগ্ন হবেন এবং ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে যারা তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করবে, তাদেরকে নিধন ও নিশ্চিহ্ন করবেন, সর্বত্র ইসলামের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম হবে। অবশিষ্ট আহলে কিতাবরা ঈসা (আঃ)-এর মৃত্যুর পূর্বেই তাঁর প্রতি যথাযথ ঈমান আনবে। সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত, রসূল (সাঃ) বলেছেন, "যাঁর হাতে আমার জীবন আছে সেই সত্তার কসম! অবশ্যই এমন এক দিন আসবে, যেদিন তোমাদের মধ্যে ঈসা ইবনে মারয়্যাম একজন ন্যায়পরায়ণ শাসকরূপে অবতরণ করবেন, ক্রুস ভেঙ্গে চুরমার করবেন, শূকর নিধন করবেন, জিযিয়া কর বাতিল করবেন, মাল-সম্পদ এত বেশী হবে যে, (দান বা সাদকা) গ্রহণ করার মত লোক থাকবে না। সেই সময় একটি সিজদাহ্ দুনিয়া এবং তার মধ্যে যা কিছু রয়েছে তার থেকেও উত্তম হবে।" (অর্থাৎ, কিয়ামত নিকটে জানার কারণে ইবাদত মানুষের কাছে অতি প্রিয় হবে।) এ হাদীস বর্ণনার পর আবু হুরাইরাহ (রাঃ) বললেন, তোমরা ইচ্ছা করলে, কুরআন কারীমের এ আয়াত পাঠ করতে পার, (وَإِنْ مِّنْ أَهْلِ الْكِتَابِ إِلاَّ لَيُؤْمِنََنَّ بِهِ قَبْلَ مَوْتِه) অর্থাৎ, আহলে কিতাবদের মধ্যে প্রত্যেকে নিজ মৃত্যুর পূর্বে অবশ্যই তাঁর প্রতি ঈমান আনবে। (বুখারীঃ কিতাবুল আম্বিয়া) এই হাদীস এত অধিক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, তার ফলে তা 'মুতাওয়াতির' হাদীসের পর্যায়ভুক্ত। আর এই 'মুতাওয়াতির' শুদ্ধ বর্ণনার ভিত্তিতেই আহলে সুন্নাহর সর্বসম্মত আকীদাহ মতে ঈসা (আঃ) আসমানে জীবিত আছেন এবং কিয়ামতের প্রাক্কালে তিনি দুনিয়াতে আসবেন, দাজ্জালকে হত্যা করবেন, সমস্ত ধর্মের অবসান ঘটাবেন, সর্বত্র ইসলামের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করবেন। ইয়া'জুজ ও মা'জুজ তাঁর সময়েই প্রকাশ হবে এবং তাঁর বদ্দুআর কারণে ইয়া'জুজ ও মা'জুজের ফিতনার অবসান ঘটবে।[২] এই সাক্ষ্য তাঁর প্রথম জীবন সম্পর্কিত হবে, যেমন আল্লাহ্ সূরা মায়েদায় উল্লেখ করেছেন, {وَكُنتُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا مَّا دُمْتُ فِيهِمْ} অর্থাৎ, যতদিন আমি তাদের মধ্যে ছিলাম ততদিন আমি ছিলাম তাদের ক্রিয়াকলাপের সাক্ষী। (৫:১১৭)

An-Nisaa 4:159Listen in Qur'an →
160

فَبِظُلْمٍۢ مِّنَ ٱلَّذِينَ هَادُوا۟ حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ طَيِّبَٰتٍ أُحِلَّتْ لَهُمْ وَبِصَدِّهِمْ عَن سَبِيلِ ٱللَّهِ كَثِيرًۭا

বস্তুতঃ ইহুদীদের জন্য আমি হারাম করে দিয়েছি বহু পূত-পবিত্র বস্তু যা তাদের জন্য হালাল ছিল-তাদের পাপের কারণে এবং আল্লাহর পথে অধিক পরিমাণে বাধা দানের দরুন।

বহু পবিত্র জিনিস যা ইহুদীদের জন্য বৈধ ছিল, তা আমি তাদের জন্য অবৈধ করেছি তাদের সীমালংঘনের জন্য এবং আল্লাহর পথে অনেককে বাধা দেবার জন্য। [১]

[১] অর্থাৎ তাদের অপরাধ ও অপকর্মের কারণে শাস্তি স্বরূপ বহু বৈধ জিনিসকে অবৈধ করে দিয়েছি। (বিস্তারিত বিবরণ সূরা আনআম ৬:১৪৬ আয়াতে আছে।)

An-Nisaa 4:160Listen in Qur'an →

Commentary: Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation. Qur'an text and translation via AlQuran Cloud.