أُو۟لَٰٓئِكَ مَأْوَىٰهُمْ جَهَنَّمُ وَلَا يَجِدُونَ عَنْهَا مَحِيصًۭا
তাদের বাসস্থান জাহান্নাম। তারা সেখান থেকে কোথাও পালাবার জায়গা পাবে না।
এ সকল লোকের বাসস্থান জাহান্নাম। তা হতে তারা নিষ্কৃতির উপায় পাবে না।
سُورَةُ النِّسَاءِ
Reading Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation
Ayahs 121–130 of 176
أُو۟لَٰٓئِكَ مَأْوَىٰهُمْ جَهَنَّمُ وَلَا يَجِدُونَ عَنْهَا مَحِيصًۭا
তাদের বাসস্থান জাহান্নাম। তারা সেখান থেকে কোথাও পালাবার জায়গা পাবে না।
এ সকল লোকের বাসস্থান জাহান্নাম। তা হতে তারা নিষ্কৃতির উপায় পাবে না।
وَٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ وَعَمِلُوا۟ ٱلصَّٰلِحَٰتِ سَنُدْخِلُهُمْ جَنَّٰتٍۢ تَجْرِى مِن تَحْتِهَا ٱلْأَنْهَٰرُ خَٰلِدِينَ فِيهَآ أَبَدًۭا ۖ وَعْدَ ٱللَّهِ حَقًّۭا ۚ وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ ٱللَّهِ قِيلًۭا
যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং সৎকর্ম করেছে, আমি তাদেরকে উদ্যানসমূহে প্রবিষ্ট করাব, যেগুলোর তলদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত হয়। তারা চিরকাল তথায় অবস্থান করবে। আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সত্য সত্য। আল্লাহর চাইতে অধিক সত্যবাদী কে?
যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, তাদেরকে বেহেশ্তে প্রবেশাধিকার দান করব; যার পাদদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। আর কে আছে আল্লাহ অপেক্ষা অধিক সত্যবাদী? [১]
[১] শয়তানের প্রতিশ্রুতি তো নিছক ধোকা-প্রতারণা বৈ কিছু নয়। পক্ষান্তরে আল্লাহর অঙ্গীকার যা তিনি ঈমানদারদের সাথে করেছেন তা সত্য ও যথার্থ। আল্লাহর চেয়ে অধিক সত্যবাদী কে হতে পারে? কিন্তু মানুষের ব্যাপার বড়ই বিস্ময়কর। এরা সত্যকে গ্রাহ্য কমই করে এবং মিথ্যার পিছনেই এরা বেশী চলে। তাই তো শয়তানী জিনিসের প্রচলন অতি ব্যাপক। পক্ষান্তরে আল্লাহর কর্ম সম্পাদন করার মানুষ প্রত্যেক যুগে এবং প্রত্যেক স্থানে কমই থেকেছে ও কমই পাওয়া যায়। [وَقَلِيلٌ مِنْ عِبَادِيَ الشَّكُورُ] "আমার কৃতজ্ঞ বান্দা কমই হয়।" (সাবাঃ ১৩)
لَّيْسَ بِأَمَانِيِّكُمْ وَلَآ أَمَانِىِّ أَهْلِ ٱلْكِتَٰبِ ۗ مَن يَعْمَلْ سُوٓءًۭا يُجْزَ بِهِۦ وَلَا يَجِدْ لَهُۥ مِن دُونِ ٱللَّهِ وَلِيًّۭا وَلَا نَصِيرًۭا
তোমাদের আশার উপর ও ভিত্তি নয় এবং আহলে-কিতাবদের আশার উপরও না। যে কেউ মন্দ কাজ করবে, সে তার শাস্তি পাবে এবং সে আল্লাহ ছাড়া নিজের কোন সমর্থক বা সাহায্যকারী পাবে না।
(শেষ পরিণতি) তোমাদের আশার উপর, আর না ঐশীগ্রন্থধারীদের মনস্কামনার উপর নির্ভর করে। (বরং) যে মন্দ কাজ করবে, সে তার প্রতিফল পাবে এবং আল্লাহ ভিন্ন সে তার জন্য কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাবে না।
وَمَن يَعْمَلْ مِنَ ٱلصَّٰلِحَٰتِ مِن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤْمِنٌۭ فَأُو۟لَٰٓئِكَ يَدْخُلُونَ ٱلْجَنَّةَ وَلَا يُظْلَمُونَ نَقِيرًۭا
যে লোক পুরুষ হোক কিংবা নারী, কোন সৎকর্ম করে এবং বিশ্বাসী হয়, তবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রাপ্য তিল পরিমাণ ও নষ্ট হবে না।
আর পুরুষই হোক অথবা নারীই হোক, যারাই বিশ্বাসী হয়ে সৎকাজ করবে, তারাই জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি (খেজুরের আঁটির পিঠে) বিন্দু পরিমাণও যুলুম করা হবে না। [১]
[১] যেমন পূর্বে আলোচনা হয়েছে যে, ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানরা নিজেদের ব্যাপারে সুধারণার বড় আত্মপ্রবঞ্চনায় লিপ্ত ছিল। এখানে মহান আল্লাহ তাদের সেই সুধারণার পর্দা ফাঁস করে বলেন যে, আখেরাতের সফলতা কেবল আশা ও আকাঙ্ক্ষায় পাওয়া যাবে না। তার জন্য তো ঈমান এবং নেক আমলের সম্বল প্রয়োজন। পক্ষান্তরে আমলনামা যদি মন্দ কাজে পরিপূর্ণ থাকে, তাহলে যেভাবেই হোক না কেন তার শাস্তি ভোগ করতেই হবে। সেখানে এমন কোন বন্ধু অথবা সাহায্যকারী হবে না যে মন্দ কাজের শাস্তি থেকে বাঁচিয়ে নিতে পারবে। আলোচ্য আয়াতে ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের সাথে সাথে মহান আল্লাহ ঈমানদারদেরকেও সম্বোধন করেছেন, যাতে তারা যেন তাদের মত বৃথা সুধারণা এবং আমলশূন্য আশা ও আকাঙ্ক্ষা থেকে নিজেদেরকে সুদূরে রাখে। কিন্তু অনুতাপের বিষয় যে, এই সতর্কতা সত্ত্বেও মুসলিমরা সেই খামখেয়ালীর মধ্যে পতিত হয়ে পড়েছে যার মধ্যে পতিত ছিল পূর্বের জাতিসমূহ। বর্তমানে বে-আমল ও বদ-আমল মুসলিমদের আলামত ও চিহ্ন হয়ে গেছে, আর তা সত্ত্বেও তারা নিজেদেরকে উম্মতে মারহুমা (রহমপ্রাপ্ত উম্মত) বলে দাবী করছে! هَدَانَا اللهُ تَعَالَى
وَمَنْ أَحْسَنُ دِينًۭا مِّمَّنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُۥ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌۭ وَٱتَّبَعَ مِلَّةَ إِبْرَٰهِيمَ حَنِيفًۭا ۗ وَٱتَّخَذَ ٱللَّهُ إِبْرَٰهِيمَ خَلِيلًۭا
যে আল্লাহর নির্দেশের সামনে মস্তক অবনত করে সৎকাজে নিয়োজিত থাকে এবং ইব্রাহীমের ধর্ম অনুসরণ করে, যিনি একনিষ্ঠ ছিলেন, তার চাইতে উত্তম ধর্ম কার? আল্লাহ ইব্রাহীমকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন।
আর তার অপেক্ষা ধর্মে কে উত্তম, যে বিশুদ্ধ (তওহীদবাদী) হয়ে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করে এবং একনিষ্ঠভাবে ইব্রাহীমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ করে? আর আল্লাহ ইব্রাহীমকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন। [১]
[১] এখানে সফলতার একটি মান-নির্ণায়ক এবং আদর্শ পেশ করা হচ্ছে। মান-নির্ণায়ক হল, নিজেকে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করা, সৎকাজে নিরত থাকা এবং ইবরাহীমী ধর্মের অনুসরণ করা। আর আদর্শ ইবরাহীম (আঃ); যাঁকে আল্লাহ তাআলা নিজের খলীল বানিয়ে ছিলেন। খলীলের অর্থ হল, যার অন্তরে মহান আল্লাহর ভালোবাসা এমনভাবে বদ্ধমূল হয়ে যায় যে, তাতে আর কারো জন্য স্থান থাকে না। 'খালীল' فَعِيل এর ওজনে; যার অর্থ فاعل কর্তৃপদ। যেমন, 'আলীম' 'আলেম' অর্থে ব্যবহার হয়। কেউ বলেছেন, এর অর্থঃ مفعول (কর্মপদ)-এর। যেমন, 'হাবীব' 'মাহবুব' অর্থে ব্যবহার হয়। আর ইবরাহীম (আঃ) অবশ্যই আল্লাহর 'মুহিব্ব' (প্রেমিক) এবং তাঁর 'মাহবুব' (প্রিয়) দুই-ই ছিলেন। (ফাতহুল ক্বাদীর) নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, "আল্লাহ আমাকেও খলীল বানিয়েছেন, যেভাবে তিনি ইবরাহীম (আঃ)-কে খলীল বানিয়েছিলেন।" (সহীহ মুসলিম, মসজিদ অধ্যায়ঃ)
وَلِلَّهِ مَا فِى ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَمَا فِى ٱلْأَرْضِ ۚ وَكَانَ ٱللَّهُ بِكُلِّ شَىْءٍۢ مُّحِيطًۭا
যা কিছু নভোন্ডলে আছে এবং যা কিছু ভুমন্ডলে আছে, সব আল্লাহরই। সব বস্তু আল্লাহর মুষ্ঠি বলয়ে।
আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সব আল্লাহরই এবং সব কিছুকে আল্লাহ (নিজ জ্ঞান দ্বারা) পরিবেষ্টন করে আছেন।
وَيَسْتَفْتُونَكَ فِى ٱلنِّسَآءِ ۖ قُلِ ٱللَّهُ يُفْتِيكُمْ فِيهِنَّ وَمَا يُتْلَىٰ عَلَيْكُمْ فِى ٱلْكِتَٰبِ فِى يَتَٰمَى ٱلنِّسَآءِ ٱلَّٰتِى لَا تُؤْتُونَهُنَّ مَا كُتِبَ لَهُنَّ وَتَرْغَبُونَ أَن تَنكِحُوهُنَّ وَٱلْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ ٱلْوِلْدَٰنِ وَأَن تَقُومُوا۟ لِلْيَتَٰمَىٰ بِٱلْقِسْطِ ۚ وَمَا تَفْعَلُوا۟ مِنْ خَيْرٍۢ فَإِنَّ ٱللَّهَ كَانَ بِهِۦ عَلِيمًۭا
তারা আপনার কাছে নারীদের বিবাহের অনুমতি চায়। বলে দিনঃ আল্লাহ তোমাদেরকে তাদের সম্পর্কে অনুমতি দেন এবং কোরআনে তোমাদেরকে যা যা পাট করে শুনানো হয়, তা ঐ সব পিতৃহীনা-নারীদের বিধান, যাদের কে তোমরা নির্ধারিত অধিকার প্রদান কর না অথচ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করার বাসনা রাখ। আর অক্ষম শিশুদের বিধান এই যে, এতীমদের জন্যে ইনসাফের উপর কায়েম থাক। তোমরা যা ভাল কাজ করবে, তা আল্লাহ জানেন।
লোকে তোমার নিকট নারীদের বিধান জানতে চায়।[১] বল, আল্লাহ তোমাদেরকে তাদের সম্বন্ধে বিধান জানাচ্ছেন। এবং যা কিতাবে তোমাদেরকে পাঠ করে শোনানো হয়, তা ঐ সকল পিতৃহীন নারীদের বিধান, যাদের নির্ধারিত প্রাপ্য তোমরা প্রদান কর না[২] অথচ তোমরা তাদেরকে বিবাহ করতে আগ্রহী (নও)।[৩] আর অসহায় শিশুদের[৪] সম্বন্ধে বিধান এই যে, ন্যায়পরায়ণতার সাথে তোমরা পিতৃহীনদের তত্ত্বাবধান কর। [৫] এবং তোমরা যে কোন সৎকাজ কর, আল্লাহ সে সম্বন্ধে পরিজ্ঞাত আছেন।
[১] মহিলাদের ব্যাপারে যেসব জিজ্ঞাসাবাদ হত, এখান থেকে সেসবের উত্তর শুরু হচ্ছে।[২] وَمَا يُتْلَى عَلَيْكُمْ এর সম্পর্ক হল, اللهُ يُفْتِيْكُمْ এর সাথে। অর্থাৎ, মহান আল্লাহ তাদের কথা তুলে ধরেছেন এবং তাঁর কিতাবের সেই আয়াতগুলোতেও তাদের কথা আলোচিত হয়েছে যা ইতিপূর্বে ইয়াতীম মেয়েদের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে; অর্থাৎ, সূরা নিসার ৪:৩নং আয়াত। যাতে এমন লোকদেরকে অবিচার করা থেকে বাধা দান করা হয়েছে, যারা ইয়াতীম মেয়েকে তার সৌন্দর্যের কারণে বিবাহ তো করে নিত, কিন্তু তাকে তার মত মেয়েদের সমপরিমাণ মোহর দিত না।[৩] এর দুইভাবে তর্জমা করা হয়েছে। এক فِي অব্যয় ঊহ্য ধরে নিয়ে, (অর্থাৎ, তোমরা তাদেরকে বিবাহ করতে আগ্রহী)। এর দ্বিতীয় অর্থ করা হয়েছে عَنْ অব্যয় ঊহ্য ধরে। অর্থাৎ, تَرْغَبُوْنَ عَنْ أَنْ تَنْكِحُوهُنَّ (তোমরা তাদেরকে বিবাহ করতে আগ্রহী নও)। رَغِبَ এর সাথে عَنْ এলে তার অর্থ হয় বিমুখ হওয়া ও কোন আগ্রহ না থাকা। যেমন, [وَمَنْ يَرْغَبُ عَنْ مِلَّةِ اِبْرَاهِبْمَ] আয়াতে রয়েছে। অর্থাৎ, (ইয়াতীম মেয়েদের) দ্বিতীয় অবস্থার কথা বলা হয়েছে যে, কখনো কোন ইয়াতীম মেয়ে কুশ্রী হয়, ফলে তার অভিভাবক বা তার সাথে শরীক অন্য ওয়ারেসরা তাকে বিবাহ করতে পছন্দ করে না এবং অন্য কোথাও তার বিবাহও দেয় না; যাতে অন্য কোন ব্যক্তি যেন তার বিষয়-সম্পত্তিতে শরীক হতে না পারে। তাই মহান আল্লাহ প্রথম অবস্থার মত যুলুমের এই দ্বিতীয় অবস্থাকেও নিষিদ্ধ করে দেন।[৪] এর সংযোগ হল يَتَامَى النِّسَاء এর সাথে। অর্থাৎ, (وَمَا يُتْلَى عَلَيْكُمْ فِي يَتَامَى النِّسَاءِ وَفِي المُسْتَضْعَفِيْنَ مِنَ الْوِلْدَانِ) "পিতৃহীনা নারীদের ব্যাপারে তোমাদের যা যা পাঠ করে শুনানো হয় (অর্থাৎ, সূরা নিসার ৪:৩ নং আয়াত) এবং অসহায় শিশুদের ব্যাপারে যা পড়ে শুনানো হয়। আর যা পাঠ করে শুনানো হয়, তা হল কুরআনের এই নির্দেশ [يُوْصِيْكُمُ اللهُ فِي اَولاَدِكُمْ] যাতে ছেলেদের সাথে মেয়েদেরকেও অংশীদার নিযুক্ত করা হয়েছে। অথচ জাহেলী যুগে কেবল ছেলেদেরকেই অংশীদার মনে করা হত। আর ছোট অসহায় শিশুরা এবং মহিলারা মীরাস থেকে বঞ্চিত হত। শরীয়ত তাদের সকলকে অংশীদার বানিয়েছে।[৫] এর সংযোগও يَتَامَى النِّسَاء এর সাথে। অর্থাৎ, আল্লাহর কিতাবের এ নির্দেশও তোমাদেরকে পড়ে শুনানো হচ্ছে যে, তোমরা ইয়াতীমদের সাথে ন্যায়পরায়ণতাপূর্ণ আচরণ করো। ইয়াতীম মেয়ে সুশ্রী হোক অথবা কুশ্রী হোক, উভয় অবস্থাতে তাদের সাথে সুবিচার করো। (পূর্বে এর বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।)
وَإِنِ ٱمْرَأَةٌ خَافَتْ مِنۢ بَعْلِهَا نُشُوزًا أَوْ إِعْرَاضًۭا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَآ أَن يُصْلِحَا بَيْنَهُمَا صُلْحًۭا ۚ وَٱلصُّلْحُ خَيْرٌۭ ۗ وَأُحْضِرَتِ ٱلْأَنفُسُ ٱلشُّحَّ ۚ وَإِن تُحْسِنُوا۟ وَتَتَّقُوا۟ فَإِنَّ ٱللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًۭا
যদি কোন নারী স্বীয় স্বামীর পক্ষ থেকে অসদাচরণ কিংবা উপেক্ষার আশংকা করে, তবে পরস্পর কোন মীমাংসা করে নিলে তাদের উভয়ের কোন গোনাহ নাই। মীমাংসা উত্তম। মনের সামনে লোভ বিদ্যমান আছে। যদি তোমরা উত্তম কাজ কর এবং খোদাভীরু হও, তবে, আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।
যদি কোন স্ত্রী তার স্বামীর দুর্ব্যবহার ও উপেক্ষার আশংকা করে, তাহলে তারা আপোস-নিষ্পত্তি করতে চাইলে তাদের কোন দোষ নেই।[১] বস্তুতঃ আপোস করা অতি উত্তম। কিন্তু মানুষের মন লালসার প্রতি আসক্ত।[২] আর যদি তোমরা সৎকর্মপরায়ণ ও সংযমশীল হও, তাহলে তোমরা যা কর, আল্লাহ তার সংবাদ রাখেন।
[১] স্বামী যদি কোন কারণে নিজের স্ত্রীকে পছন্দ না করে এবং তার থেকে দূরে থাকা ও তাকে উপেক্ষা করার রীতি অবলম্বন করে অথবা একাধিক স্ত্রী থাকা অবস্থায় যার শ্রী কম তাকে উপেক্ষা করে, এমতাবস্থায় স্ত্রী যদি তার প্রাপ্য অধিকার (মোহর অথবা ভরণ-পোষণ বা নিজের পালা থেকে) কিছু ত্যাগ করে স্বামীর সাথে মীমাংসা, সন্ধি ও আপোস করে নেয়, তাহলে তাতে স্বামী-স্ত্রীর কারোর কোন গুনাহ নেই। কেননা, (ত্বালাকের পথ গ্রহণ না করে) আপোস করাই উত্তম। সকল মু'মিনদের মাতা সাওদা (রাঃ) বার্ধক্যে পৌঁছে গেলে তিনি তাঁর পালা আয়েশা (রাঃ) কে দান করে দিয়েছিলেন এবং এটাকে রসূল (সাঃ) গ্রহণও করে নিয়েছিলেন।
(সহীহ বুখারী ও মুসলিম, বিবাহ অধ্যায়)
[২]) شُح কৃপণতা ও লোভ-লালসাকে বলে। এখানে এর অর্থ হল, নিজ নিজ স্বার্থ যা প্রত্যেকের কাছে প্রিয়। অর্থাৎ, প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ স্বার্থের খাতিরে কৃপণতা ও লোভ প্রকাশ করে থাকে।
وَلَن تَسْتَطِيعُوٓا۟ أَن تَعْدِلُوا۟ بَيْنَ ٱلنِّسَآءِ وَلَوْ حَرَصْتُمْ ۖ فَلَا تَمِيلُوا۟ كُلَّ ٱلْمَيْلِ فَتَذَرُوهَا كَٱلْمُعَلَّقَةِ ۚ وَإِن تُصْلِحُوا۟ وَتَتَّقُوا۟ فَإِنَّ ٱللَّهَ كَانَ غَفُورًۭا رَّحِيمًۭا
তোমরা কখনও নারীদেরকে সমান রাখতে পারবে না, যদিও এর আকাঙ্ক্ষী হও। অতএব, সম্পূর্ণ ঝুঁকেও পড়ো না যে, একজনকে ফেলে রাখ দোদুল্যমান অবস্থায়। যদি সংশোধন কর এবং খোদাভীরু হও, তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়।
তোমরা যতই সাগ্রহে চেষ্টা কর না কেন, স্ত্রীদের মাঝে তোমরা কখনই ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখতে পারবে না। তবে তোমরা কোন এক জনের দিকে সম্পূর্ণভাবে ঝুঁকে পড়ো না এবং অপরকে ঝোলানো অবস্থায় ছেড়ে দিও না।[১] আর যদি তোমরা নিজেদের সংশোধন কর ও সংযমী হও, তবে নিশ্চয় আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
[১] এটা এক দ্বিতীয় অবস্থা। কোন ব্যক্তির একাধিক স্ত্রী থাকলে আন্তরিক সম্পর্ক ও ভালোবাসায় সে সবার সাথে এক রকম আচরণ করতে পারবে না। কেননা, ভালোবাসা হল অন্তরের কাজ যা কারো এখতিয়ারাধীন নয়। এমনকি নবী করীম (সাঃ)-এরও তাঁর স্ত্রীদের মধ্যে আয়েশা (রাযীআল্লাহু আনহা)র প্রতি সব চেয়ে বেশী ভালোবাসা ছিল। চাওয়া সত্ত্বেও সুবিচার না করতে পারার অর্থই হল, আন্তরিক টান এবং ভালোবাসায় অসমতা। আন্তরিক এই ভালোবাসা যদি বাহ্যিক অধিকারসমূহে সমতা বজায় রাখার পথে বাধা না হয়, তাহলে তা আল্লাহর নিকট পাকড়াও যোগ্য হবে না। যেমন নবী করীম (সাঃ) এর অতি উত্তম দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ লোক আন্তরিক এই ভালোবাসার কারণে অন্য স্ত্রীদের অধিকারসমূহ আদায়ের ব্যাপারে ত্রুটি করে এবং যার প্রতি বেশী ভালোবাসা বাহ্যিকভাবে তার মত অন্য স্ত্রীদের অধিকার আদায় না করে তাদেরকে দোদুল্যমান অবস্থায় ছেড়ে রাখে; না তাদেরকে তালাক দেয়, আর না স্ত্রীত্বের অধিকারসমূহ আদায় করে। এটা অতি বড় যুলুম; যা থেকে এখানে নিষেধ করা হয়েছে। আর নবী করীম (সাঃ) বলেন, "যে ব্যক্তির কাছে দু'জন স্ত্রী আছে, সে যদি কোন একজনের প্রতি ঝুঁকে পড়ে (অর্থাৎ, অপরজনকে একেবারে ত্যাগ করে রাখে), তাহলে সে কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় উপস্থিত হবে যে, তার দেহের অর্ধাংশ ঝুঁকে থাকবে।" (তিরমিযী, বিবাহ অধ্যায়)
وَإِن يَتَفَرَّقَا يُغْنِ ٱللَّهُ كُلًّۭا مِّن سَعَتِهِۦ ۚ وَكَانَ ٱللَّهُ وَٰسِعًا حَكِيمًۭا
যদি উভয়েই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে আল্লাহ স্বীয় প্রশস্ততা দ্বারা প্রত্যেককে অমুখাপেক্ষী করে দিবেন। আল্লাহ সুপ্রশস্ত, প্রজ্ঞাময়।
এবং যদি তারা পরস্পর পৃথক হয়ে যায়, তাহলে আল্লাহ তাঁর প্রাচুর্য দ্বারা তাদের প্রত্যেককে অভাবমুক্ত করবেন। [১] বস্তুতঃ আল্লাহ প্রাচুর্যময়, প্রজ্ঞাময়।
[১] এখানে তৃতীয় অবস্থার কথা বলা হচ্ছে যে, প্রচেষ্টা সত্ত্বেও যদি বনিবনাও না হয়, তাহলে তারা তালাকের মাধ্যমে পরস্পর থেকে পৃথক হয়ে যাবে। হতে পারে তালাকের পর পুরুষ তার চাহিদার গুণের নারী এবং মহিলা তার চাহিদার গুণের পুরুষ পেয়ে যাবে। ইসলামে তালাককে চরম ঘৃণা করা হয়েছে। একটি হাদীসে এসেছে যে, ((أَبْغَضُ الحَلاَلِ إِلَى اللهِ الطَّلاَقُ)) অর্থাৎ, তালাক আল্লাহর নিকট সর্বাধিক ঘৃণিত হালাল বস্তু। (আবূ দাঊদ) তা সত্ত্বেও আল্লাহ তাতে অনুমতি দিয়েছেন। কারণ, কোন কোন সময় পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে যে, তালাক ব্যতীত অন্য কোন উপায় থাকে না এবং তাদের উভয় পক্ষের মঙ্গল একে অপর থেকে পৃথক হওয়ার মধ্যেই থাকে। উল্লিখিত হাদীস সনদের দিক দিয়ে দুর্বল হলেও কুরআন ও হাদীসের উক্তির দ্বারা এ কথা পরিষ্কার হয় যে, এ (তালাকের) অধিকার তখনই কার্যকরী করা উচিত, যখন কোনভাবেই বনিবনাও সম্ভব হবে না।
দ্রষ্টব্যঃ উল্লিখিত হাদীস (أَبْغَضُ الحَلاَل...)কে আল্লামা আলবানী দুর্বল বলেছেন। (ইরওয়াউল গালীলঃ ২০৪০নং) তবে শরয়ী কোন কারণ ছাড়া তালাক দেওয়া যে অপছন্দনীয় তাতে কোন সন্দেহ নেই।
Commentary: Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation. Qur'an text and translation via AlQuran Cloud.