Muslim99Muslim99
← Tafsir library

8. Al-Anfaal

The Spoils of War · Medinan · 75 ayahs

سُورَةُ الأَنفَالِ

Reading Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation

Ayahs 61–70 of 75

61

۞ وَإِن جَنَحُوا۟ لِلسَّلْمِ فَٱجْنَحْ لَهَا وَتَوَكَّلْ عَلَى ٱللَّهِ ۚ إِنَّهُۥ هُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلْعَلِيمُ

আর যদি তারা সন্ধি করতে আগ্রহ প্রকাশ করে, তাহলে তুমিও সে দিকেই আগ্রহী হও এবং আল্লাহর উপর ভরসা কর। নিঃসন্দেহে তিনি শ্রবণকারী; পরিজ্ঞাত।

আর যদি তারা সন্ধির আগ্রহ প্রকাশ করে, তাহলে তুমিও সন্ধির জন্য আগ্রহী হও এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখ। [১] নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।

[১] অর্থাৎ, যদি যুদ্ধের পরিবর্তে আপোসে সন্ধি অধিক ফলপ্রসূ ও যুক্তিসঙ্গত হয় এবং শত্রুরাও তাতে আগ্রহ প্রকাশ করে, তাহলে তাতে কোন দোষ নেই। পক্ষান্তরে যদি সন্ধি থেকে শত্রুদের উদ্দেশ্য ধোঁকা ও প্রতারণা হয়, তবুও ঘাবড়ানোর কোন প্রয়োজন নেই, আল্লাহর উপর ভরসা রাখো। নিশ্চয় তিনি তোমাকে শত্রুর চক্রান্ত হতে নিরাপদে রাখবেন। আর তিনি একাই তোমার জন্য যথেষ্ট হবেন। কিন্তু সন্ধির এই অনুমতি এমন চূড়ান্ত অবস্থায় হবে, যখন মুসলিমরা দুর্বল হবে এবং সন্ধিতেই ইসলাম ও মুসলিমদের কল্যাণ নিহিত থাকবে। পরন্তু অবস্থা যদি এর বিপরীত হয়; অর্থাৎ, মুসলিমরা শক্তিশালী ও যুদ্ধ উপকরণের দিক দিয়ে সমৃদ্ধ হয় এবং কাফেরদল দুর্বল ও পরাজেয় বলে বুঝা যায়, তাহলে এই অবস্থাতে সন্ধির পরিবর্তে কাফেরদের শক্তি ও প্রতাপ ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলা জরুরী। মহান আল্লাহ বলেন, "সুতরাং তোমরা হীনবল হয়ো না এবং সন্ধির প্রস্তাব করো না। তোমরাই প্রবল; আল্লাহ তোমাদের সঙ্গে আছেন। তিনি তোমাদের কর্মফল কখনো নষ্ট করবেন না।" (সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:৩৫ আয়াত) আরো এক জায়গায় তিনি বলেন, "এবং তোমরা তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে থাক, যতক্ষণ না ফিৎনা দূর হয় এবং আল্লাহর ধর্ম সামগ্রিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।" (সূরা আনফাল ৮:৩৯ আয়াত)

Al-Anfaal 8:61Listen in Qur'an →
62

وَإِن يُرِيدُوٓا۟ أَن يَخْدَعُوكَ فَإِنَّ حَسْبَكَ ٱللَّهُ ۚ هُوَ ٱلَّذِىٓ أَيَّدَكَ بِنَصْرِهِۦ وَبِٱلْمُؤْمِنِينَ

পক্ষান্তরে তারা যদি তোমাকে প্রতারণা করতে চায়, তবে তোমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনিই তোমাকে শক্তি যুগিয়েছেন স্বীয় সাহায্যে ও মুসলমানদের মাধ্যমে।

পক্ষান্তরে যদি তারা তোমাকে প্রতারিত করতে চায়, তাহলে তোমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনি তোমাকে স্বীয় সাহায্য ও বিশ্বাসিগণ দ্বারা শক্তিশালী করেছেন।

Al-Anfaal 8:62Listen in Qur'an →
63

وَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِهِمْ ۚ لَوْ أَنفَقْتَ مَا فِى ٱلْأَرْضِ جَمِيعًۭا مَّآ أَلَّفْتَ بَيْنَ قُلُوبِهِمْ وَلَٰكِنَّ ٱللَّهَ أَلَّفَ بَيْنَهُمْ ۚ إِنَّهُۥ عَزِيزٌ حَكِيمٌۭ

আর প্রীতি সঞ্চার করেছেন তাদের অন্তরে। যদি তুমি সেসব কিছু ব্যয় করে ফেলতে, যা কিছু যমীনের বুকে রয়েছে, তাদের মনে প্রীতি সঞ্চার করতে পারতে না। কিন্তু আল্লাহ তাদের মনে প্রীতি সঞ্চার করেছেন। নিঃসন্দেহে তিনি পরাক্রমশালী, সুকৌশলী।

এবং তিনি ওদের পরস্পরের হৃদয়ের মধ্যে প্রীতি স্থাপন করেছেন, পৃথিবীর যাবতীয় সম্পদ ব্যয় করলেও তুমি তাদের হৃদয়ের মধ্যে প্রীতি স্থাপন করতে পারতে না, কিন্তু আল্লাহ তাদের মধ্যে প্রীতি স্থাপন করেছেন। [১] নিশ্চয়ই তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

[১] এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা নবী (সাঃ) এবং মু'মিনদের উপর যে অনুগ্রহ করেছেন তার মধ্যে একটি অনুগ্রহ উল্লেখ করেছেন। আর সেটা হল এই যে, তিনি মু'মিনদের দ্বারা নবী (সাঃ)-এর সাহায্য করলেন; তাঁরা নবীর হাত, বাহু, পৃষ্ঠপোষক ও সাহায্যকারী হয়ে গেলেন। আর মু'মিনদের প্রতি এই অনুগ্রহ করেছেন যে, তাঁদের মাঝে প্রথম দিকে যে শত্রুতা ছিল তিনি তাকে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যে পরিণত করে দিলেন। প্রথম দিকে তাঁরা একে অপরের রক্তপিপাসু ছিলেন। কিন্তু এখন একে অপরের জন্য প্রাণ কুরবানী দিতে প্রস্তুত হয়ে গেলেন। প্রথম দিকে তাঁরা একে অপরের প্রাণের শত্রু ছিলেন, এখন তাঁরা একে অন্যের জন্য দয়া ও স্নেহশীল হয়ে গেলেন। বহু যুগের আপোসের পুরাতন শত্রুতাকে এমনভাবে নিশ্চিহ্ন করে তাদের মাঝে সম্প্রীতি সৃষ্টি করে দেওয়া আল্লাহর বিশেষ মেহেরবানী এবং তাঁর কুদরত ও ইচ্ছাশক্তির প্রকৃষ্ট নমুনা ছিল। নতুবা এ এমন একটা কাজ ছিল যে, তার জন্য পৃথিবীর সমপরিমাণ ধনভান্ডার ব্যয় করলেও এই অভীষ্ট রত্ন লাভ হতো না। আল্লাহ তাআলা উক্ত অনুগ্রহের কথা সূরা আলে ইমরান ৩:১০৩নং আয়াতে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন "তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদের হৃদয়ে প্রীতির সঞ্চার করেন। ফলে তোমরা তাঁর অনুগ্রহে পরস্পর ভাই-ভাই হয়ে গেলে।" আর নবী (সাঃ)ও হুনাইনের যুদ্ধে গনীমতের মাল বণ্টনের সময় আনসারদেরকে লক্ষ্য করে দেওয়া এক ভাষণে বললেন, "হে আনসারদল! এ কথা কি সত্য নয় যে, তোমরা ভ্রষ্ট ছিলে, অতঃপর আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদেরকে হিদায়াত দান করলেন। তোমরা অভাবী ছিলে, আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদেরকে অভাবমুক্ত করে দিলেন। আর তোমরা পরস্পর বিচ্ছিন্ন ছিলে, আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করে দিলেন?" নবী (সাঃ)-এর প্রত্যেক কথার উত্তরে আনসারগণ বললেন, 'আল্লাহ ও তাঁর রসূল অধিক অনুগ্রহশীল।'

(বুখারীঃ মাগাযী অধ্যায়, তায়েফ যুদ্ধ পরিচ্ছেদ, মুসলিমঃ যাকাত অধ্যায়)

Al-Anfaal 8:63Listen in Qur'an →
64

يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِىُّ حَسْبُكَ ٱللَّهُ وَمَنِ ٱتَّبَعَكَ مِنَ ٱلْمُؤْمِنِينَ

হে নবী, আপনার জন্য এবং যেসব মুসলমান আপনার সাথে রয়েছে তাদের সবার জন্য আল্লাহ যথেষ্ট।

হে নবী! তোমার জন্য ও তোমার অনুসারী বিশ্বাসিগণের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।

Al-Anfaal 8:64Listen in Qur'an →
65

يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِىُّ حَرِّضِ ٱلْمُؤْمِنِينَ عَلَى ٱلْقِتَالِ ۚ إِن يَكُن مِّنكُمْ عِشْرُونَ صَٰبِرُونَ يَغْلِبُوا۟ مِا۟ئَتَيْنِ ۚ وَإِن يَكُن مِّنكُم مِّا۟ئَةٌۭ يَغْلِبُوٓا۟ أَلْفًۭا مِّنَ ٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌۭ لَّا يَفْقَهُونَ

হে নবী, আপনি মুসলমানগণকে উৎসাহিত করুন জেহাদের জন্য। তোমাদের মধ্যে যদি বিশ জন দৃঢ়পদ ব্যক্তি থাকে, তবে জয়ী হবে দু’শর মোকাবেলায়। আর যদি তোমাদের মধ্যে থাকে একশ লোক, তবে জয়ী হবে হাজার কাফেরের উপর থেকে তার কারণ ওরা জ্ঞানহীন।

হে নবী! বিশ্বাসীদেরকে যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ কর,[১] তোমাদের মধ্যে কুড়িজন ধৈর্যশীল থাকলে তারা দু’শ জনের উপর বিজয়ী হবে এবং তোমাদের মধ্যে একশ’ জন থাকলে এক হাজার অবিশ্বাসীর উপর বিজয়ী হবে। [২] কারণ তারা এমন এক সম্প্রদায় যাদের বোধশক্তি নেই।

[১] تحريض শব্দের অর্থ হল উদ্বুদ্ধকরণে অতিরঞ্জন করা। অর্থাৎ, খুব বেশী উদ্বুদ্ধ করা, আগ্রহ ও উৎসাহ সৃষ্টি করা। কেননা, এই নির্দেশ মোতাবেক নবী (সাঃ) যুদ্ধের পূর্বে সাহাবাদেরকে জিহাদের জন্য অতিশয় উদ্বুদ্ধ করতেন এবং তার মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব বর্ণনা করতেন। যেমন, বদর যুদ্ধের সময় যখন মুশরিকরা নিজেদের ভারী সংখ্যা নিয়ে যথেষ্ট পরিমাণ যুদ্ধসামগ্রীসহ ময়দানে উপস্থিত হল, তখন নবী (সাঃ) বললেন, "এমন জান্নাতে যাবার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও, যার প্রস্থ আকাশ-পৃথিবী সমান।" এক সাহাবী উমাইর বিন হুমাম (রাঃ) বললেন, 'জান্নাতের প্রস্থ আকাশ-পৃথিবী সমান? হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন, "হ্যাঁ!" তা শুনে তিনি 'ওহো' বললেন। অর্থাৎ, খুশী প্রকাশ করলেন এবং এই আশা ব্যক্ত করলেন যে, 'আমিও জান্নাতবাসীদের অন্তর্ভুক্ত হতে চাই।' তিনি বললেন, "তুমি তাদের একজন হবে।" অতএব তিনি নিজের তরবারির খাপকে ভেঙ্গে ফেললেন এবং কিছু খেজুর বের করে খেতে লাগলেন। খেতে খেতে অবশিষ্ট খেজুর তিনি মাটিতে ফেলে দিয়ে বললেন, 'এগুলি খাবার জন্য জীবিত থাকলে সে জীবন তো বড় দীর্ঘ জীবন!' অতঃপর তিনি জিহাদ করার জন্য বীরত্বের সাথে সামনের দিকে অগ্রসর হলেন। পরিশেষে তিনি কাফেরদের সাথে লড়তে লড়তে শহীদ হয়ে গেলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হন। (মুসলিমঃ ইমারাহ অধ্যায়)

[২] এটা মুসলিমদের জন্য সুসংবাদ যে, তোমাদের মধ্যে দৃঢ়তার সাথে যুদ্ধকারী ২০ জন যোদ্ধা ২০০ জন কাফের সৈন্যের বিরুদ্ধে এবং ১০০ জন যোদ্ধা তাদের এক হাজার সৈন্যের বিরুদ্ধে যথেষ্ট হয়ে বিজয়ী থাকবে।

Al-Anfaal 8:65Listen in Qur'an →
66

ٱلْـَٰٔنَ خَفَّفَ ٱللَّهُ عَنكُمْ وَعَلِمَ أَنَّ فِيكُمْ ضَعْفًۭا ۚ فَإِن يَكُن مِّنكُم مِّا۟ئَةٌۭ صَابِرَةٌۭ يَغْلِبُوا۟ مِا۟ئَتَيْنِ ۚ وَإِن يَكُن مِّنكُمْ أَلْفٌۭ يَغْلِبُوٓا۟ أَلْفَيْنِ بِإِذْنِ ٱللَّهِ ۗ وَٱللَّهُ مَعَ ٱلصَّٰبِرِينَ

এখন বোঝা হালকা করে দিয়েছেন আল্লাহ তা’আলা তোমাদের উপর এবং তিনি জেনে নিয়েছেন যে, তোমাদের মধ্য দূর্বলতা রয়েছে। কাজেই তোমাদের মধ্যে যদি দৃঢ়চিত্ত একশ লোক বিদ্যমান থাকে, তবে জয়ী হবে দু’শর উপর। আর যদি তোমরা এক হাজার হও তবে আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী জয়ী হবে দু’হাজারের উপর আর আল্লাহ রয়েছেন দৃঢ়চিত্ত লোকদের সাথে।

আল্লাহ এখন তোমাদের ভার লাঘব করলেন। তিনি অবগত আছেন যে, তোমাদের মধ্যে দুর্বলতা আছে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে একশ’ জন ধৈর্যশীল থাকলে তারা দু’শ জনের উপর বিজয়ী হবে। আর তোমাদের মধ্যে এক হাজার থাকলে আল্লাহর অনুজ্ঞাক্রমে তারা দু’ হাজারের উপর বিজয়ী হবে। [১] বস্তুতঃ আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথেই থাকেন। [২]

[১] পূর্বের হুকুম সাহাবাদের উপর ভারী মনে হল। কেননা, এর অর্থ ছিল ১ জন মুসলিম ১০ জন কাফের, ২০ জন মুসলিম ২০০ কাফের এবং ১০০ জন মুসলিম ১০০০ জন কাফেরের মোকাবেলার জন্য যথেষ্ট। আর তার মানেই হল কাফেরদের তুলনায় মুসলিমদের সংখ্যা অনুরূপ (১০ গুণ কম) হলে জিহাদ করা ফরয এবং তা ত্যাগ করা কোন প্রকারে বৈধ নয়। সুতরাং আল্লাহ তাআলা এই সংখ্যাকে হালকা করে ১/১০ থেকে কম করে ১/২ (অর্থাৎ আধা-আধি) সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দিলেন। (বুখারীঃ তফসীর সূরা আনফাল) এখন এই তুলনামূলক উক্ত সংখ্যা হলে জিহাদ ফরয; তার থেকে কম হলে ফরয নয়।

[২] এই বলে সবর ও অবিচলতার গুরুত্ব বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর মদদ লাভ করার জন্য উভয়ের প্রতি যত্ন নেওয়া জরুরী।

Al-Anfaal 8:66Listen in Qur'an →
67

مَا كَانَ لِنَبِىٍّ أَن يَكُونَ لَهُۥٓ أَسْرَىٰ حَتَّىٰ يُثْخِنَ فِى ٱلْأَرْضِ ۚ تُرِيدُونَ عَرَضَ ٱلدُّنْيَا وَٱللَّهُ يُرِيدُ ٱلْءَاخِرَةَ ۗ وَٱللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌۭ

নবীর পক্ষে উচিত নয় বন্দীদিগকে নিজের কাছে রাখা, যতক্ষণ না দেশময় প্রচুর রক্তপাত ঘটাবে। তোমরা পার্থিব সম্পদ কামনা কর, অথচ আল্লাহ চান আখেরাত। আর আল্লাহ হচ্ছেন পরাক্রমশালী হেকমতওয়ালা।

দেশে সম্পূর্ণভাবে শত্রু নিপাত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোন নবীর জন্য সঙ্গত নয়। তোমরা কামনা কর পার্থিব সম্পদ এবং আল্লাহ চান পরলোকের কল্যাণ। [১] আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

[১] বদর যুদ্ধে ৭০ জন কাফের মারা পড়ল এবং ৭০ জন বন্দী হল। এটা কাফের ও মুসলিমদের প্রথম যুদ্ধ ছিল। এই জন্য যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে কি ধরনের আচরণ করা যেতে পারে এ ব্যাপারে পূর্ণরূপে কোন বিধান স্পষ্ট ছিল না। সুতরাং নবী (সাঃ) সেই ৭০ জন বন্দীদের ব্যাপারে সাহাবাদের সঙ্গে পরামর্শ করলেন যে, কি করা যাবে? তাদেরকে হত্যা করা হবে, না কিছু মুক্তিপণ (বিনিময়) নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হবে? বৈধতা হিসাবে এই দু'টি রায়ই সঠিক ছিল। সেই জন্য উক্ত দু'টি রায় নিয়ে বিবেক-বিবেচনা ও চিন্তা-ভাবনা করতে লাগলেন। কিন্তু কখনো কখনো বৈধতা ও অবৈধতা থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে কাল-পাত্র ও পরিস্থিতি বুঝে অধিকতর উত্তম পন্থা অবলম্বন করার প্রয়োজন হয়। এখানেও অধিকতর কল্যাণকর পন্থা অবলম্বন করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বৈধতাকে সামনে রেখে অপেক্ষাকৃত কমতর কল্যাণকর পন্থা অবলম্বন করা হল। যে ব্যাপারে সতর্ক করে আল্লাহ তাআলার তরফ হতে ভৎর্সনাস্বরূপ আয়াত অবতীর্ণ হল। উমার (রাঃ) প্রভৃতিগণ নবী (সাঃ)-কে এই পরামর্শ দিলেন যে, কুফরের শক্তি ও প্রতাপকে ভেঙ্গে ফেলা দরকার আছে। এই জন্য বন্দীদেরকে হত্যা করা হোক। কেননা, এরা হল কুফর ও কাফেরদের প্রধান ও সম্মানিত ব্যক্তি। এরা মুক্তি পেলে ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে অধিকরূপে চক্রান্ত চালাবে। পক্ষান্তরে আবু বাকর (রাঃ) প্রভৃতিগণ উমার (রাঃ)-এর রায়ের বিপরীত রায় পেশ করলেন যে, তাদের কাছ থেকে মুক্তিপণ (বিনিময়) নিয়ে তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হোক। আর ঐ মাল দ্বারা আগামী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হোক। নবী (সাঃ) এই রায়কে প্রাধান্য দিলেন। তখন এ ব্যাপারে আয়াত অবতীর্ণ হল, {حَتَّى يُثْخِنَ فِي الأَرْض}। এর মতলব হল যদি দেশে কুফরের আধিপত্য হয় (যেমন, সেই সময় আরবে কুফরের আধিপত্য ছিল), তাহলে এ অবস্থায় বন্দী কাফেরদেরকে হত্যা করে তাদের শক্তির মাথাকে চূর্ণ করে ফেলা আবশ্যক। সুতরাং তোমরা এই সূক্ষ্ম নীতিকে দৃষ্টিচ্যুত করে যে মুক্তিপণ (বিনিময়) গ্রহণ করলে, তার মানে হল অধিকতর উত্তম পন্থা বর্জন করে অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের পন্থা অবলম্বন করলে; যা তোমাদের ভুল এখতিয়ার। পরবর্তীতে যখন কুফরের প্রভাব কম হয়ে গেল, তখন বন্দীদের ব্যাপার সেই সমসাময়িক রাষ্ট্রনেতার ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেওয়া হল। তিনি চাইলে তাদেরকে হত্যা করবেন, নতুবা মুক্তিপণ নিয়ে মুক্ত করে দেবেন। কিম্বা মুসলিম বন্দীদের বিনিময়ে তাদেরকে মুক্ত করবেন। অথবা চাইলে তাদেরকে দাস বানিয়ে রাখবেন। অবস্থা ও পরিস্থিতি সমীক্ষা করে উক্ত কোন একটি পন্থা অবলম্বন করা বৈধ হবে।

Al-Anfaal 8:67Listen in Qur'an →
68

لَّوْلَا كِتَٰبٌۭ مِّنَ ٱللَّهِ سَبَقَ لَمَسَّكُمْ فِيمَآ أَخَذْتُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌۭ

যদি একটি বিষয় না হত যা পূর্ব থেকেই আল্লাহ লিখে রেখেছেন, তাহলে তোমরা যা গ্রহণ করছ সেজন্য বিরাট আযাব এসে পৌছাত।

আল্লাহর পূর্ব বিধান (লিপিবদ্ধ) না থাকলে[১] তোমরা যা গ্রহণ করেছ, তার জন্য তোমাদের উপর মহাশাস্তি আপতিত হত।

[১] এ ব্যাপারে তাফসীরবিদদের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে যে, এই লিপিবদ্ধ বিধান কি ছিল? কেউ বলেন, তাতে গনীমতের মাল হালাল হওয়ার কথা লেখা ছিল। অর্থাৎ, যেহেতু লিপিবদ্ধ তকদীর এই ছিল যে, মুসলিমদের জন্য গনীমতের মাল হালাল হবে। এই জন্য তোমরা মুক্তিপণ নিয়ে এক বৈধ কাজ করেছ। যদি এমন না হত তাহলে মুক্তিপণ নেওয়ার কারণে তোমাদের উপর বড় ধরনের আযাব আসত। কেউ কেউ বলেছেন, তাতে বদর যুদ্ধে মুজাহিদদের জন্য ক্ষমা ঘোষণার কথা লিপিবদ্ধ ছিল। আবার কেউ কেউ বলেন, রসূল (সাঃ)-এর বর্তমানে আযাব না আসার কথা লিপিবদ্ধ ছিল ইত্যাদি।

(এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানার জন্য ফাতহুল ক্বাদীর দ্রষ্টব্য)

Al-Anfaal 8:68Listen in Qur'an →
69

فَكُلُوا۟ مِمَّا غَنِمْتُمْ حَلَٰلًۭا طَيِّبًۭا ۚ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ غَفُورٌۭ رَّحِيمٌۭ

সুতরাং তোমরা খাও গনীমত হিসাবে তোমরা যে পরিচ্ছন্ন ও হালাল বস্তু অর্জন করেছ তা থেকে। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, মেহেরবান।

যুদ্ধে তোমরা যা কিছু (গনীমত) লাভ করেছ, তা বৈধ ও পবিত্ররূপে ভোগ কর। [১] আর আল্লাহকে ভয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

[১] এখানে গনীমতের মাল হালাল ও পবিত্র হওয়ার কথা উল্লেখ করে মুক্তিপণ গ্রহণ করার বৈধতা ঘোষণা করা হয়েছে। যাতে এ কথার সমর্থন হয় যে, 'লিপিবদ্ধ' বিধানে সম্ভবতঃ গনীমতের মাল হালাল হওয়ার কথাই ছিল।

Al-Anfaal 8:69Listen in Qur'an →
70

يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِىُّ قُل لِّمَن فِىٓ أَيْدِيكُم مِّنَ ٱلْأَسْرَىٰٓ إِن يَعْلَمِ ٱللَّهُ فِى قُلُوبِكُمْ خَيْرًۭا يُؤْتِكُمْ خَيْرًۭا مِّمَّآ أُخِذَ مِنكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ۗ وَٱللَّهُ غَفُورٌۭ رَّحِيمٌۭ

হে নবী, তাদেরকে বলে দাও, যারা তোমার হাতে বন্দী হয়ে আছে যে, আল্লাহ যদি তোমাদের অন্তরে কোন রকম মঙ্গলচিন্তা রয়েছে বলে জানেন, তবে তোমাদেরকে তার চেয়ে বহুগুণ বেশী দান করবেন যা তোমাদের কাছ থেকে বিনিময়ে নেয়া হয়েছে। তাছাড়া তোমাদেরকে তিনি ক্ষমা করে দিবেন। বস্তুতঃ আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়।

হে নবী! তোমাদের করায়ত্ত যুদ্ধবন্দীদেরকে বল, ‘আল্লাহ যদি তোমাদের হৃদয়ে ভাল কিছু[১] দেখেন, তাহলে তোমাদের নিকট হতে (মুক্তিপণ হিসাবে) যা নেওয়া হয়েছে, তা অপেক্ষা উত্তম কিছু তিনি তোমাদেরকে দান করবেন[২] এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’

[১] অর্থাৎ, ঈমান ও ইসলাম আনয়নের সংকল্প এবং তা গ্রহণ করার আগ্রহ।

[২] অর্থাৎ, যে মুক্তিপণ তোমাদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে এ থেকে উত্তম জিনিস তোমাদের ইসলাম আনয়ন করার পর আল্লাহ তোমাদেরকে দান করবেন। সুতরাং পরবর্তীতে এমনটিই ঘটেছিল। আব্বাস (রাঃ) এবং আরো অন্যান্য জন যাঁরা সেই বন্দীদলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন তাঁরা মুসলমান হয়ে গেলেন। মহান আল্লাহ তাঁদেরকে পার্থিব জীবনে মাল-ধনের প্রাচুর্য দান করলেন।

Al-Anfaal 8:70Listen in Qur'an →

Commentary: Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation. Qur'an text and translation via AlQuran Cloud.