Muslim99Muslim99
← Tafsir library

7. Al-A'raaf

The Heights · Meccan · 206 ayahs

سُورَةُ الأَعۡرَافِ

Reading Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation

Ayahs 51–60 of 206

51

ٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُوا۟ دِينَهُمْ لَهْوًۭا وَلَعِبًۭا وَغَرَّتْهُمُ ٱلْحَيَوٰةُ ٱلدُّنْيَا ۚ فَٱلْيَوْمَ نَنسَىٰهُمْ كَمَا نَسُوا۟ لِقَآءَ يَوْمِهِمْ هَٰذَا وَمَا كَانُوا۟ بِـَٔايَٰتِنَا يَجْحَدُونَ

তারা স্বীয় ধর্মকে তামাশা ও খেলা বানিয়ে নিয়েছিল এবং পার্থিব জীবন তাদের কে ধোকায় ফেলে রেখেছিল। অতএব, আমি আজকে তাদেরকে ভুলে যাব; যেমন তারা এ দিনের সাক্ষাৎকে ভুলে গিয়েছিল এবং যেমন তারা আয়াতসমূহকে অবিশ্বাস করত।

যারা তাদের ধর্মকে ক্রীড়া-কৌতুকরূপে গ্রহণ করেছিল এবং পার্থিব জীবন যাদেরকে প্রতারিত করেছিল। সুতরাং আজ আমি তাদেরকে বিস্মৃত হব, যেভাবে তারা তাদের এ দিনের সাক্ষাৎকে ভুলেছিল এবং যেভাবে তারা আমার নিদর্শনসমূহকে অস্বীকার করেছিল। [১]

[১] হাদীসে এসেছে যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা এই শ্রেণীর বান্দাকে বলবেন, "আমি কি তোমাকে স্ত্রী ও সন্তানাদি দিইনি? তোমাকে মান-সম্মান দানে ধন্য করিনি? উট এবং ঘোড়াকে তোমার অধীনস্থ করে দিইনি? তুমি কি নেতৃত্ব দান করে মানুষদের কাছ থেকে কর আদায় করতে না?" সে বলবে, অবশ্যই করতাম। হে আল্লাহ! এ সব কথাই সঠিক। মহান আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করবেন, "আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে হবে এ কথা কি তুমি বিশ্বাস করতে? সে বলবে, না। তখন মহান আল্লাহ বলবেন, "যেভাবে তুমি আমাকে ভুলে ছিলে, আজ আমিও তোমাকে ভুলে যাচ্ছি।" (মুসলিমঃ যুহ্দ অধ্যায়) কুরআন কারীমের এই আয়াত থেকে এ কথাও জানা গেল যে, দ্বীনকে খেল-তামাশারূপে তারাই গ্রহণ করে, যারা দুনিয়ার প্রতারণায় নিমজ্জিত থাকে। এই ধরনের মানুষের অন্তর থেকে যেহেতু আখেরাতের চিন্তা এবং আল্লাহর ভয়-ভীতি বিলুপ্ত হয়ে যায়, তাই তারা দ্বীনের মধ্যেও নিজের পক্ষ হতে যা চায়, তাই বৃদ্ধি করে নেয় এবং দ্বীনের যে অংশটাকে চায়, তা বাদ দিয়ে দেয় অথবা সেটাকে খেল-তামাশা মনে করে নেয়। কাজেই দ্বীনের মধ্যে নিজের পক্ষ হতে বিদআতের সংযোজন করে সেটাকেই প্রকৃত দ্বীনের গুরুত্ব দেওয়া (যেমন, বিদআতীদের অভ্যাস) হল অতি বড় অপরাধ। কেননা, এতে দ্বীন হয়ে যায় খেল-তামাশার জিনিস এবং দ্বীনের যাবতীয় বিধি-বিধান ও ফরয কার্যাদির উপর আমল করার গুরুত্ব খতম হয়ে যায়।

Al-A'raaf 7:51Listen in Qur'an →
52

وَلَقَدْ جِئْنَٰهُم بِكِتَٰبٍۢ فَصَّلْنَٰهُ عَلَىٰ عِلْمٍ هُدًۭى وَرَحْمَةًۭ لِّقَوْمٍۢ يُؤْمِنُونَ

আমি তাদের কাছে গ্রন্থ পৌছিয়েছি, যা আমি স্বীয় জ্ঞানে বিস্তারিত বর্ণনা করেছি, যা পথপ্রদর্শক এবং মুমিনদের জন্যে রহমত।

অবশ্যই তাদের নিকট আমি এমন এক কিতাব আনয়ন করেছি; যেটিকে জ্ঞান দ্বারা বিশদভাবে বিবৃত করেছি[১] এবং যা হল বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য পথনির্দেশ ও করুণা।

[১] এ কথা মহান আল্লাহ জাহান্নামীদের দিকে ইঙ্গিত করে বলছেন যে, আমি তো আমার পূর্ণ জ্ঞানের আলোকে এমন কিতাব তাদের নিকট প্রেরণ করেছি যাতে প্রতিটি জিনিসকে খুলে খুলে বর্ণনা করে দিয়েছি। তারা এ থেকে উপকৃত না হয়ে থাকলে সেটা তাদের দুর্ভাগ্য। তাছাড়া যারা এই কিতাবের উপর ঈমান এনেছে, তারা হিদায়াত এবং আমার করুণা লাভে ধন্য হয়েছে। সুতরাং {وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِيْنَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُوْلًا} "যতক্ষণ না রসূল প্রেরণ করে হুজ্জত পরিপূর্ণ করি ততক্ষণ পর্যন্ত আমি আযাব দিই না।" এই নীতি অনুযায়ী সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।

Al-A'raaf 7:52Listen in Qur'an →
53

هَلْ يَنظُرُونَ إِلَّا تَأْوِيلَهُۥ ۚ يَوْمَ يَأْتِى تَأْوِيلُهُۥ يَقُولُ ٱلَّذِينَ نَسُوهُ مِن قَبْلُ قَدْ جَآءَتْ رُسُلُ رَبِّنَا بِٱلْحَقِّ فَهَل لَّنَا مِن شُفَعَآءَ فَيَشْفَعُوا۟ لَنَآ أَوْ نُرَدُّ فَنَعْمَلَ غَيْرَ ٱلَّذِى كُنَّا نَعْمَلُ ۚ قَدْ خَسِرُوٓا۟ أَنفُسَهُمْ وَضَلَّ عَنْهُم مَّا كَانُوا۟ يَفْتَرُونَ

তারা কি এখন এ অপেক্ষায়ই আছে যে, এর বিষয়বস্তু প্রকাশিত হোক? যেদিন এর বিষয়বস্তু প্রকাশিত হবে, সেদিন পূর্বে যারা একে ভূলে গিয়েছিল, তারা বলবেঃ বাস্তবিকই আমাদের প্রতিপালকের পয়গম্বরগণ সত্যসহ আগমন করেছিলেন। অতএব, আমাদের জন্যে কোন সুপারিশকারী আছে কি যে, সুপারিশ করবে অথবা আমাদেরকে পুনঃ প্রেরণ করা হলে আমরা পূর্বে যা করতাম তার বিপরীত কাজ করে আসতাম। নিশ্চয় তারা নিজেদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তারা মনগড়া যা বলত, তা উধাও হয়ে যাবে।

তারা শুধু ওর পরিণাম (সংবাদ-সত্যতা বা কিয়ামতের) প্রতীক্ষা করছে।[১] যেদিন ওর পরিণাম বাস্তবায়িত হবে, সেদিন যারা পূর্বে ওর কথা ভুলে গিয়েছিল, তারা বলবে, ‘আমাদের প্রতিপালকের রসূলগণ তো সত্য এনেছিলেন, আমাদের কি এমন কোন সুপারিশকারী আছে, যে আমাদের জন্য সুপারিশ করবে অথবা আমাদেরকে কি পুনরায় ফিরিয়ে দেওয়া হবে, যাতে আমরা পূর্বে যা করতাম, তা হতে ভিন্ন কিছু করতে পারি?’ তারা নিজেরা নিজেদের ক্ষতি করেছে এবং তারা যে মিথ্যা রচনা করত তাও অন্তর্হিত হয়েছে।[২]

[১] تأويل শব্দের অর্থ হল, কোন জিনিসের প্রকৃত স্বরূপ, বাস্তব রূপ ও তার পরিণাম। অর্থাৎ, আল্লাহর কিতাবের মাধ্যমে প্রতিশ্রুতি, শাস্তি এবং জান্নাত ও জাহান্নামের বিবরণ তো দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এরা এই দুনিয়ার পরিণাম স্বচক্ষে দেখার অপেক্ষায় ছিল। অতএব এখন সে পরিণাম (কিয়ামত) তাদের সামনে এসে গেছে।

[২] অর্থাৎ, এরা যে পরিণামের অপেক্ষায় ছিল, তা তাদের সামনে উপস্থিত হয়ে যাওয়ার পর সত্যের স্বীকারোক্তি অথবা পুনরায় দুনিয়াতে প্রেরিত হওয়ার আশা প্রকাশ এবং কোন সুপারিশকারীর খোঁজ করা ইত্যাদি সবই হবে নিষ্ফল। সেই উপাস্যগুলোও তাদের থেকে অদৃশ্য হয়ে যাবে, আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদের তারা পূজা করত। তারা না তাদের সাহায্য করতে পারবে, না সুপারিশ করতে, আর না জাহান্নামের আযাব থেকে নিষ্কৃতি দিতে পারবে।

Al-A'raaf 7:53Listen in Qur'an →
54

إِنَّ رَبَّكُمُ ٱللَّهُ ٱلَّذِى خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضَ فِى سِتَّةِ أَيَّامٍۢ ثُمَّ ٱسْتَوَىٰ عَلَى ٱلْعَرْشِ يُغْشِى ٱلَّيْلَ ٱلنَّهَارَ يَطْلُبُهُۥ حَثِيثًۭا وَٱلشَّمْسَ وَٱلْقَمَرَ وَٱلنُّجُومَ مُسَخَّرَٰتٍۭ بِأَمْرِهِۦٓ ۗ أَلَا لَهُ ٱلْخَلْقُ وَٱلْأَمْرُ ۗ تَبَارَكَ ٱللَّهُ رَبُّ ٱلْعَٰلَمِينَ

নিশ্চয় তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ। তিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আরশের উপর অধিষ্টিত হয়েছেন। তিনি পরিয়ে দেন রাতের উপর দিনকে এমতাবস্থায় যে, দিন দৌড়ে রাতের পিছনে আসে। তিনি সৃষ্টি করেছেন সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্র দৌড় স্বীয় আদেশের অনুগামী। শুনে রেখ, তাঁরই কাজ সৃষ্টি করা এবং আদেশ দান করা। আল্লাহ, বরকতময় যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক।

নিশ্চয় তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেন,[১] অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হন।[২] তিনিই দিবসকে রাত্রি দ্বারা আচ্ছাদিত করেন; ওদের একে অন্যকে দ্রুতগতিতে অনুসরণ করে।[৩] আর (সৃষ্টি করেছেন) সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্ররাজিকে, যা তাঁরই আজ্ঞাধীন। জেনে রাখ, সৃষ্টি করা এবং নির্দেশদান তাঁরই কাজ। তিনি মহিমময় বিশ্ব প্রতিপালক।

[১] এই ছয় দিন হল, রবিবার, সোমবার, মঙ্গলবার, বুধবার এবং বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার। জুমআর দিনেই আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে। শনিবারের দিন সম্পর্কে বলা হয় যে, এ দিনে কোন কিছু সৃষ্টি করা হয় নি। এই জন্যই এ দিনকে يوم السبت (শনিবারের দিন) বলা হয়। কারণ, سبت এর অর্থ ছিন্ন করা। অর্থাৎ, এ দিনে সৃষ্টি করার কাজ ছিন্ন বা শেষ ছিল। অতঃপর এই দিনগুলোর মধ্যে কোন্ দিন বুঝানো হয়েছে? আমাদের দুনিয়ার এই দিন, যা সূর্যোদয় থেকে আরম্ভ হয়ে সূর্যাস্ত গেলে শেষ হয়ে যায়? নাকি এ দিন হাজার বছরের সমান দিন? যেভাবে আল্লাহর নিকট দিনের গণনা হয় সেই দিন, না যেভাবে কিয়ামতের দিনের ব্যাপারে আসে সেই দিন? বাহ্যতঃ দ্বিতীয় এই উক্তিই সর্বাধিক সঠিক মনে হচ্ছে। কারণ, প্রথমতঃ সে সময় চাঁদ ও সূর্যের এই নিয়মই ছিল না। আসমান ও যমীন সৃষ্টির পরই এ নিয়ম চালু হয়েছে। দ্বিতীয়তঃ এটা ঊর্ধ্ব জগতের ব্যাপার যার দুনিয়ার রাত-দিনের সাথে কোন সম্পর্ক নেই। কাজেই এই দিনের প্রকৃতার্থ মহান আল্লাহই বেশী ভাল জানেন। আমরা নিশ্চয়তার সাথে কিছু বলতে পারি না। তাছাড়া মহান আল্লাহ তো كُنْ শব্দ দ্বারা সব কিছুই সৃষ্টি করতে পারতেন, তা সত্ত্বেও তিনি প্রতিটি জিনিসকে পৃথক পৃথকভাবে পর্যায়ক্রমে বানিয়েছেন কেন? এরও যুক্তি ও কৌশলগত ব্যাপারে তিনিই সর্বাধিক জ্ঞাত। তবে কোন কোন আলেম এর একটি যৌক্তিকতা সম্পর্কে বলেছেন যে, এতে মানুষকে ধীর-স্থিরতার সাথে শান্তভাবে এবং পর্যায়ক্রমে কার্যাদি সম্পাদন করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। আর আল্লাহই অধিক জানেন।

[২] اسْتِوَآءٌ এর অর্থ হল, উপরে ওঠা, সমাসীন হওয়া। সালাফগণ কোন ধরণ নির্ণয় ও সাদৃশ্য স্থাপন ছাড়াই এই অর্থই করেছেন। অর্থাৎ, মহান আল্লাহ আরশের উপর সমাসীন ও অধিষ্ঠিত। তবে কিভাবে এবং কোন্ ধরনের তা আমরা না বর্ণনা করতে পারব, আর না কারো সাথে তার সাদৃশ্য স্থাপন করতে পারব। নাঈম ইবনে হাম্মাদের উক্তি হল, "যে ব্যক্তি আল্লাহকে তাঁর সৃষ্টির সাথে তুলনা করল, সে কুফরী করল এবং যে ব্যক্তি আল্লাহর নিজের ব্যাপারে বর্ণিত কোন কথাকে অস্বীকার করল, সেও কুফরী করল।" অতএব আল্লাহ সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহর অথবা তাঁর রসূলের বর্ণিত কথাকে বর্ণনা করা সাদৃশ্য স্থাপন করা নয়। কাজেই আল্লাহ সম্পর্কে যে কথাগুলো কুরআন ও হাদীসের আলোকে প্রমাণিত, কোন অপব্যাখ্যা, ধরণ-গঠন নির্ণয় এবং সাদৃশ্য স্থাপন করা ছাড়াই তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করা জরুরী। (ইবনে কাসীর)

[৩] حَثِيْثًا এর অর্থ হল, অতি দ্রুত গতিতে। অর্থাৎ, একটির পর দ্বিতীয়টি দ্রুত চলে আসে। দিনের আলো এলে রাতের অন্ধকার সঙ্গে সঙ্গেই নিঃশেষ হয়ে যায় এবং রাত এলে দিনের আলোও নিভে যায়। ফলে দূরে ও কাছে সর্বত্র কালো অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ে।

Al-A'raaf 7:54Listen in Qur'an →
55

ٱدْعُوا۟ رَبَّكُمْ تَضَرُّعًۭا وَخُفْيَةً ۚ إِنَّهُۥ لَا يُحِبُّ ٱلْمُعْتَدِينَ

তোমরা স্বীয় প্রতিপালককে ডাক, কাকুতি-মিনতি করে এবং সংগোপনে। তিনি সীমা অতিক্রমকারীদেরকে পছন্দ করেন না।

তোমরা কাকুতি-মিনতি সহকারে ও সংগোপনে তোমাদের প্রতিপালককে ডাক, নিশ্চয় তিনি সীমালংঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না।

Al-A'raaf 7:55Listen in Qur'an →
56

وَلَا تُفْسِدُوا۟ فِى ٱلْأَرْضِ بَعْدَ إِصْلَٰحِهَا وَٱدْعُوهُ خَوْفًۭا وَطَمَعًا ۚ إِنَّ رَحْمَتَ ٱللَّهِ قَرِيبٌۭ مِّنَ ٱلْمُحْسِنِينَ

পৃথিবীকে কুসংস্কারমুক্ত ও ঠিক করার পর তাতে অনর্থ সৃষ্টি করো না। তাঁকে আহবান কর ভয় ও আশা সহকারে। নিশ্চয় আল্লাহর করুণা সৎকর্মশীলদের নিকটবর্তী।

পৃথিবীতে শান্তি স্থাপনের পর ওতে বিপর্যয় ঘটায়ো না এবং তাঁকে ভয় ও আশার সঙ্গে আহবান কর। নিশ্চয় আল্লাহর করুণা সৎকর্মপরায়ণদের নিকটবর্তী। [১]

[১] এই আয়াতগুলোতে চারটি জিনিসের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। (ক) আল্লাহর কাছে কাকুতি-মিনতি সহকারে এবং গোপনে দু'আ করা। যেমন, হাদীসেও এসেছে যে, "হে লোক সকল! তোমরা নিজের উপর দয়ার্দ্র হও। কেননা, তোমরা কোন বধির ও অনুপস্থিতকে ডাকছ না, বরং তোমরা ডাকছ এমন সত্তাকে যিনি সব কিছু শোনেন এবং দেখেন।" (বুখারীঃ দু'আ অধ্যায়, মুসলিমঃ জান্নাত অধ্যায়) (খ) দু'আতে বাড়াবাড়ি না করা। অর্থাৎ, নিজের যোগ্যতা ও মর্যাদার ঊর্ধ্বে যেন দু'আ না করা হয়। (অনুপযুক্ত কিছু চাওয়া না হয়।) (গ) শান্তি প্রতিষ্ঠার পর ফাসাদ বা অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করা। অর্থাৎ, আল্লাহর অবাধ্যতা করে ফাসাদ সৃষ্টি করার কাজে যেন অংশ না নেওয়া হয়। (ঘ) আল্লাহর শাস্তির ভয় যেন অন্তরে থাকে এবং তাঁর দয়ার আশাও। এইভাবে যারা দু'আ করে, তারাই হল সৎকর্মশীল। আর অবশ্যই আল্লাহর রহমত সৎকর্মশীলদের অতি নিকটবর্তী।

Al-A'raaf 7:56Listen in Qur'an →
57

وَهُوَ ٱلَّذِى يُرْسِلُ ٱلرِّيَٰحَ بُشْرًۢا بَيْنَ يَدَىْ رَحْمَتِهِۦ ۖ حَتَّىٰٓ إِذَآ أَقَلَّتْ سَحَابًۭا ثِقَالًۭا سُقْنَٰهُ لِبَلَدٍۢ مَّيِّتٍۢ فَأَنزَلْنَا بِهِ ٱلْمَآءَ فَأَخْرَجْنَا بِهِۦ مِن كُلِّ ٱلثَّمَرَٰتِ ۚ كَذَٰلِكَ نُخْرِجُ ٱلْمَوْتَىٰ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ

তিনিই বৃষ্টির পূর্বে সুসংবাদবাহী বায়ু পাঠিয়ে দেন। এমনকি যখন বায়ুরাশি পানিপূর্ন মেঘমালা বয়ে আনে, তখন আমি এ মেঘমালাকে একটি মৃত শহরের দিকে হঁ্যাকিয়ে দেই। অতঃপর এ মেঘ থেকে বৃষ্টি ধারা বর্ষণ করি। অতঃপর পানি দ্বারা সব রকমের ফল উৎপন্ন করি। এমনি ভাবে মৃতদেরকে বের করব-যাতে তোমরা চিন্তা কর।

তিনিই স্বীয় করুণার (বৃষ্টির) প্রাক্কালে বাতাসকে সুসংবাদবাহীরূপে প্রেরণ করেন।[১] শেষ পর্যন্ত উক্ত বাতাস যখন (পানি-ভরা) ভারী মেঘমালা বহন করে আনে,[২] তখন কোন নির্জীব ভূখন্ডের দিকে আমি তা প্রেরণ করি, অতঃপর তা থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করি। তারপর তা দিয়ে সর্ববিধ ফলমূল উৎপাদন করি।[৩] এভাবেই আমি মৃতকে জীবিত করে থাকি। যাতে তোমরা শিক্ষালাভ করতে পার। [৪]

[১] স্বীয় উলূহিয়্যাত (উপাস্যত্ব) এবং রুবূবিয়্যাত (প্রতিপালকত্ব)এর প্রমাণে মহান আল্লাহ আরো দলীলাদি বর্ণনা করে তার মাধ্যমে তিনি আবারও মৃতদেরকে জীবিত করার কথা সুসাব্যস্ত করছেন। بُشْرًا হল بَشِيْرٌ-এর বহুবচন। আর এখানে رَحْمَةٌ বলতে مَطَرٌ (বৃষ্টি) বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, বৃষ্টি বর্ষণের পূর্বে (সুসংবাদবাহীরূপে) তিনি এমন শীতল হাওয়া প্রেরণ করেন, যা হয় বৃষ্টি বর্ষণের পূর্বাভাস।

[২] ভারী মেঘমালা বলতে পানিতে পরিপূর্ণ মেঘ।

[৩] সর্ববিধ ফল, যেগুলোর রঙ, স্বাদ, সুগন্ধ এবং আকার-আকৃতি একে অন্য থেকে ভিন্ন।

[৪] যেভাবে আমি পানির মাধ্যমে মৃত যমীনের মধ্যে সজীবতা সৃষ্টি করি এবং সে (যমীন) বিভিন্ন প্রকারের উদ্ভিদ, ফসল ও ফল-মূল উৎপাদন করে, ঠিক এইভাবে কিয়ামতের দিন মৃত মানুষগুলোকে যারা মাটির সাথে মিশে মাটি হয়ে যাবে তাদেরকেও আমি পুনরায় জীবিত করব এবং তাদের হিসাব নেব।

Al-A'raaf 7:57Listen in Qur'an →
58

وَٱلْبَلَدُ ٱلطَّيِّبُ يَخْرُجُ نَبَاتُهُۥ بِإِذْنِ رَبِّهِۦ ۖ وَٱلَّذِى خَبُثَ لَا يَخْرُجُ إِلَّا نَكِدًۭا ۚ كَذَٰلِكَ نُصَرِّفُ ٱلْءَايَٰتِ لِقَوْمٍۢ يَشْكُرُونَ

যে শহর উৎকৃষ্ট, তার ফসল তার প্রতিপালকের নির্দেশে উৎপন্ন হয় এবং যা নিকৃষ্ট তাতে অল্পই ফসল উৎপন্ন হয়। এমনিভাবে আমি আয়াতসমূহ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বর্ণনা করি কৃতজ্ঞ সম্প্রদায়ের জন্যে।

উৎকৃষ্ট ভূমি তার প্রতিপালকের নির্দেশে ফসল উৎপন্ন করে এবং যা নিকৃষ্ট তাতে কঠিন পরিশ্রম ব্যতীত কিছুই জন্মায় না।[১] এভাবে কৃতজ্ঞ সম্প্রদায়ের জন্য আমি নিদর্শনসমূহ বিভিন্নভাবে বিবৃত করে থাকি।

[১] এ অর্থ ছাড়া এটি দৃষ্টান্তও হতে পারে। الْبَلَدُ الطَّيِّبُ (উৎকৃষ্ট ভূমি) এর অর্থ বুদ্ধিমান এবং الْبَلَدُ الْخَبِيْثُ (নিকৃষ্ট ভূমি)এর অর্থ স্থূলবুদ্ধি। ওয়ায-নসীহত গ্রহণকারী অন্তর এবং এর বিপরীত অন্তর। মু'মিনের অন্তর অথবা মুনাফিকের অন্তর। অথবা পাক-পবিত্র মানুষ ও নাপাক-অপবিত্র মানুষ। পাক-পবিত্র ও ওয়ায-নসীহত গ্রহণকারী মু'মিনের অন্তর হল বৃষ্টিকে গ্রহণকারী যমীনের মত। আল্লাহর আয়াতসমূহ শুনে তাদের ঈমান ও নেক আমলে আরো দৃঢ়তা সৃষ্টি হয়। পক্ষান্তরে অন্য অন্তর এর বিপরীত লবণাক্ত যমীনের মত হয়; যা বৃষ্টির পানি গ্রহণই করে না, আবার করলেও নামমাত্র, যার দ্বারা ফসলাদিও অতি অল্প নগণ্য হয়। এই বিষয়টাকেই একটি হাদীসে এইভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। রসূল (সাঃ) বলেছেন, "যে জ্ঞান ও হিদায়াত দিয়ে মহান আল্লাহ আমাকে প্রেরণ করেছেন, তার দৃষ্টান্ত মাটির উপর মুষলধারায় বর্ষিত প্রচুর বৃষ্টির মত। যে ভূমি পরিষ্কার ও ঊর্বর হয়, তা ঐ পানি গ্রহণ করে অনেক ঘাস ও ফল-ফসল উৎপন্ন করে। আর ভূমির কিছু অংশ শক্ত, যা ঐ পানি ধরে রাখে। আল্লাহ তার সাহায্যে মানব-জাতির কল্যাণ করেন। মানুষ তা নিজেরা পান করে, পশুদেরকে পান করায় এবং সেচের মাধ্যমে ফসল উৎপন্ন করে। আর তার কিছু অংশ পাথুরে থাকে, যা বৃষ্টির পানি ধরে রাখে না এবং ঘাসও উৎপন্ন করে না। এটাই হচ্ছে সেই ব্যক্তির দৃষ্টান্ত যে আল্লাহর দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করে এবং আল্লাহ আমাকে যা দিয়ে পাঠিয়েছেন, তার দ্বারা সে লাভবান হয়। সে নিজে শিক্ষা করে এবং অপরকেও শিক্ষা দেয়। আর এটা সেই লোকেরও দৃষ্টান্ত, যে কিছুই শিখে না এবং যে হিদায়াত দিয়ে আল্লাহ আমাকে পাঠিয়েছেন, তাও সে গ্রহণ করে না।" (বুখারী, ইলম অধ্যায়)

Al-A'raaf 7:58Listen in Qur'an →
59

لَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوحًا إِلَىٰ قَوْمِهِۦ فَقَالَ يَٰقَوْمِ ٱعْبُدُوا۟ ٱللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَٰهٍ غَيْرُهُۥٓ إِنِّىٓ أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍۢ

নিশ্চয় আমি নূহকে তার সম্প্রদায়ের প্রতি পাঠিয়েছি। সে বললঃ হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর এবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন উপাস্য নেই। আমি তোমাদের জন্যে একটি মহাদিবসের শাস্তির আশঙ্কা করি।

অবশ্যই আমি নূহকে তার সম্প্রদায়ের নিকট পাঠিয়েছিলাম এবং সে বলেছিল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা (কেবল) আল্লাহর উপাসনা কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন (সত্যিকার) উপাস্য নেই। আমি তোমাদের জন্য মহাদিনের শাস্তির আশংকা করছি।’

Al-A'raaf 7:59Listen in Qur'an →
60

قَالَ ٱلْمَلَأُ مِن قَوْمِهِۦٓ إِنَّا لَنَرَىٰكَ فِى ضَلَٰلٍۢ مُّبِينٍۢ

তার সম্প্রদায়ের সর্দাররা বললঃ আমরা তোমাকে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতার মাঝে দেখতে পাচ্ছি।

তার সম্প্রদায়ের প্রধানগণ বলেছিল, ‘আমরা তো তোমাকে স্পষ্ট বিভ্রান্তির মধ্যে দেখছি।’ [১]

[১] শিরক মানুষের বিবেক-বুদ্ধিকে এমনভাবে নষ্ট করে দেয় যে, মানুষ হিদায়াতকে ভ্রষ্টতা এবং ভ্রষ্টতাকে হিদায়াত মনে করে। নূহ (আঃ)-এর জাতির অন্তরের অবস্থাও এই হয়েছিল। তিনি তাদেরকে আল্লাহর যে তাওহীদের দাওয়াত দিচ্ছিলেন, সেটাকে -নাঊযু বিল্লাহ -- তারা ভ্রষ্টতা মনে করল। কবি বলেছেন, 'যা ভালো ছিল না, তা ধীরে ধীরে ভালো হয়ে গেল। এইভাবেই জাতির বিবেক দাসত্বে পরিণত হয়।'

Al-A'raaf 7:60Listen in Qur'an →

Commentary: Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation. Qur'an text and translation via AlQuran Cloud.