Muslim99Muslim99
← Tafsir library

7. Al-A'raaf

The Heights · Meccan · 206 ayahs

سُورَةُ الأَعۡرَافِ

Reading Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation

Ayahs 31–40 of 206

31

۞ يَٰبَنِىٓ ءَادَمَ خُذُوا۟ زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍۢ وَكُلُوا۟ وَٱشْرَبُوا۟ وَلَا تُسْرِفُوٓا۟ ۚ إِنَّهُۥ لَا يُحِبُّ ٱلْمُسْرِفِينَ

হে বনী-আদম! তোমরা প্রত্যেক নামাযের সময় সাজসজ্জা পরিধান করে নাও, খাও ও পান কর এবং অপব্যয় করো না। তিনি অপব্যয়ীদেরকে পছন্দ করেন না।

হে আদমের বংশধরগণ! তোমরা প্রত্যেক নামাযের সময় সুন্দর পরিচ্ছদ পরিধান কর।[১] পানাহার কর, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না। [২]

[১] আয়াতে زِينَة (সৌন্দর্য) বলতে পোশাক বুঝানো হয়েছে। এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণও হল মুশরিকদের উলঙ্গ তাওয়াফ করা। তাই তাদেরকে বলা হল, পোশাক পরে আল্লাহর ইবাদত ও তাওয়াফ কর।

[২] إِسْرَافٌ (অপচয় করা) প্রত্যেক জিনিসেই এমন কি পানাহারেও অপছন্দনীয়। একটি হাদীসে নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, "যা ইচ্ছা খাও, যা ইচ্ছা পরিধান কর। তবে দু'টি জিনিস থেকে অবশ্যই বেঁচে থাক। অপচয় ও অহংকার থেকে।" (বুখারী, লিবাস অধ্যায়) কোন কোন সালাফের উক্তি হল, মহান আল্লাহ{وَكُلُوْا وَاشْرَبُوْا وَلاَ تُسْرِفُوْا} (পানাহার কর এবং অপচয় করো না) এই অর্ধেক আয়াতে সমস্ত চিকিৎসা-বিদ্যাকে একত্রিত করে দিয়েছেন। (ইবনে কাসীর) কেউ কেউ বলেছেন, زِينَة হল এমন পোশাক, যা সৌন্দর্যের জন্য পরা হয়। তাঁদের এই উক্তি অনুযায়ী নামাযে ও তাওয়াফে সাজ-সজ্জা করার নির্দেশও পাওয়া যায়। পক্ষান্তরে এই আয়াত দ্বারা নামাযে লজ্জাস্থান ঢাকা ওয়াজেব হওয়ার কথাও প্রমাণ করা হয়েছে। বরং হাদীসসমূহের আলোকে লজ্জাস্থান (পুরুষের নাভি থেকে নিয়ে হাঁটু পর্যন্ত অংশকে) ঢাকা প্রত্যেক অবস্থায় জরুরী। এমন কি মানুষ নির্জনে একাকী থাকলেও। (ফাতহুল ক্বাদীর) জুমআহ এবং ঈদের দিনে সুগন্ধি ব্যবহার করাও মুস্তাহাব। কেননা, এটাও زِينَة তথা সাজ-সজ্জারই অংশ। (ইবনে কাসীর)

Al-A'raaf 7:31Listen in Qur'an →
32

قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ ٱللَّهِ ٱلَّتِىٓ أَخْرَجَ لِعِبَادِهِۦ وَٱلطَّيِّبَٰتِ مِنَ ٱلرِّزْقِ ۚ قُلْ هِىَ لِلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ فِى ٱلْحَيَوٰةِ ٱلدُّنْيَا خَالِصَةًۭ يَوْمَ ٱلْقِيَٰمَةِ ۗ كَذَٰلِكَ نُفَصِّلُ ٱلْءَايَٰتِ لِقَوْمٍۢ يَعْلَمُونَ

আপনি বলুনঃ আল্লাহর সাজ-সজ্জাকে, যা তিনি বান্দাদের জন্যে সৃষ্টি করেছেন এবং পবিত্র খাদ্রবস্তুসমূহকে কে হারাম করেছে? আপনি বলুনঃ এসব নেয়ামত আসলে পার্থিব জীবনে মুমিনদের জন্যে এবং কিয়ামতের দিন খাঁটিভাবে তাদেরই জন্যে। এমনিভাবে আমি আয়াতসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা করি তাদের জন্যে যারা বুঝে।

বল, ‘আল্লাহ স্বীয় দাসদের জন্য যে সব সুশোভন বস্তু ও পবিত্র জীবিকা সৃষ্টি করেছেন, তা কে নিষিদ্ধ করেছে?’ বল, ‘পার্থিব জীবনে বিশেষ করে কিয়ামতের দিনে এ সমস্ত তাদের জন্য, যারা বিশ্বাস করে।’[১] এরূপে আমি জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শনসমূহ বিশদভাবে বিবৃত করি।

[১] মুশরিকরা যেভাবে তাওয়াফ করার সময় পোশাক পরিধান করাকে অপছন্দনীয় মনে করেছিল, অনুরূপ কিছু হালাল জিনিসকেও আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে হারাম করে নিয়েছিল। (যেমন, অনেক সূফীবাদে বিশ্বাসী ব্যক্তিরাও করে থাকে)। আর অনেক হালাল জিনিসকে নিজেদের প্রতিমাদের নামে উৎসর্গ করার কারণে সেগুলোকেও হারাম মনে করত। মহান আল্লাহ বললেন, মানুষের সাজ-সজ্জার জন্য (যেমন, পোশাক ইত্যাদি) এবং পানাহারের জন্য অনেক উৎকৃষ্ট জিনিস বানিয়েছি, সেগুলোকে কে হারাম করেছে? অর্থ হল, মানুষের হারাম করে নেওয়ার কারণে আল্লাহর হালাল করা জিনিস হারাম হয়ে যাবে না। বরং সেগুলো হালালই থাকবে। এই হালাল ও পবিত্র জিনিসগুলো আসলে আল্লাহ ঈমানদারদের জন্য সৃষ্টি করেছেন, যদিও কাফেররাও তা থেকে উপকারিতা এবং তৃপ্তি লাভ করে থাকে। বরং অনেক সময় পার্থিব সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য লাভ করার ব্যাপারে তাদেরকে মুসলিমদের চেয়েও বেশী সফল দেখা যায়। তবে তা অপরের অসীলায় এবং সাময়িকভাবে। এতে আল্লাহ তাআলার সৃষ্টিগত ইচ্ছা ও হিকমতও আছে। কিয়ামতের দিন এ নিয়ামতসমূহ কেবল ঈমানদারদের জন্য হবে। কেননা, কাফেরদের উপর যেভাবে জান্নাত হারাম হবে, অনুরূপভাবে জান্নাতের যাবতীয় খাদ্য-পানিও তাদের জন্য হারাম হবে।

Al-A'raaf 7:32Listen in Qur'an →
33

قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّىَ ٱلْفَوَٰحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَٱلْإِثْمَ وَٱلْبَغْىَ بِغَيْرِ ٱلْحَقِّ وَأَن تُشْرِكُوا۟ بِٱللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِۦ سُلْطَٰنًۭا وَأَن تَقُولُوا۟ عَلَى ٱللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ

আপনি বলে দিনঃ আমার পালনকর্তা কেবলমাত্র অশ্লীল বিষয়সমূহ হারাম করেছেন যা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য এবং হারাম করেছেন গোনাহ, অন্যায়-অত্যাচার আল্লাহর সাথে এমন বস্তুকে অংশীদার করা, তিনি যার কোন, সনদ অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লাহর প্রতি এমন কথা আরোপ করা, যা তোমরা জান না।

বল, ‘আমার প্রতিপালক নিষিদ্ধ করেছেন প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতাকে,[১] পাপাচারকে ও অসংগত বিদ্রোহকে[২] এবং কোন কিছুকে আল্লাহর অংশী করাকে, যার কোন দলীল তিনি প্রেরণ করেননি এবং আল্লাহ সম্বন্ধে এমন কিছু বলাকে (নিষিদ্ধ করেছেন) যে সম্পর্কে তোমাদের কোন জ্ঞান নেই।’

[১] প্রকাশ্য অশ্লীলতা বলতে কেউ কেউ বেশ্যালয় গিয়ে ব্যভিচার এবং গোপন অশ্লীলতা বলতে কোন 'গার্ল্ ফ্রেন্ড' বা অবৈধ প্রেমিকার সাথে বিশেষ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত করাকে বুঝিয়েছেন। আবার কেউ বলেছেন, প্রকাশ্য অশ্লীলতা হল, যাদের সাথে বিবাহ হারাম, তাদেরকে বিবাহ করা। সঠিক কথা হল, এটা কোন একটি জিনিসের সাথে নির্দিষ্ট নয়, বরং এটা ব্যাপক, যাতে সকল প্রকার প্রকাশ্য নির্লজ্জতা শামিল। (যেমন, ভিডিও, ভিসিআর, ভিসিপি, সিডি প্লেয়ার বা টিভির মাধ্যমে সিনেমা, নাটক, অশ্লীল ফিল্ম, অশ্লীল পত্র-পত্রিকা, নাচ-গানের আসর, মহিলাদের পর্দাহীনতা, পুরুষদের সাথে তাদের অবাধ মেলা-মেশা এবং বিবাহ-শাদীর দেশাচার ও লৌকিকতায় নির্লজ্জতার ব্যাপক প্রদর্শন ইত্যাদি সবই প্রকাশ্য অশ্লীলতার আওতাভুক্ত।) أَعَاذَنَا اللهُ مِنْهَا।

[২] পাপ হল আল্লাহর অবাধ্যতার নাম। একটি হাদীসে নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, "পাপ হল সেই জিনিস, যা তোমার অন্তরে খটকা ও উদ্বেগ সৃষ্টি করে এবং মানুষ জেনে নিক -এ কথা তুমি অপছন্দ কর।" (মুসলিম, বির্র অধ্যায়) কেউ কেউ বলেছেন, পাপ হল এমন জিনিস, যার প্রতিক্রিয়া পাপী পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে। আর বিদ্রোহ তথা অন্যায় হল এমন জিনিস, যার প্রতিক্রিয়া অপর পর্যন্তও পৌঁছে থাকে। এখানে بغي শব্দের সাথে بغير الحق লাগানোর অর্থ হল, অসংগত ও অযথা যুলুম ও অত্যাচার করা। যেমন, মানুষের অধিকার হরণ করা, কারো সম্পদ আত্মসাৎ করে নেওয়া, অন্যায়ভাবে মার-ধর করা এবং গালাগালি করে বেইজ্জত করা ইত্যাদি।

Al-A'raaf 7:33Listen in Qur'an →
34

وَلِكُلِّ أُمَّةٍ أَجَلٌۭ ۖ فَإِذَا جَآءَ أَجَلُهُمْ لَا يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةًۭ ۖ وَلَا يَسْتَقْدِمُونَ

প্রত্যেক সম্প্রদায়ের একটি মেয়াদ রয়েছে। যখন তাদের মেয়াদ এসে যাবে, তখন তারা না এক মুহুর্ত পিছে যেতে পারবে, আর না এগিয়ে আসতে পারবে।

আর প্রত্যেক জাতির এক নির্দিষ্ট সময় আছে।[১] সুতরাং যখন তাদের সময় আসবে, তখন তারা মুহূর্তকালও বিলম্ব বা ত্বরা করতে পারবে না।

[১] 'নির্দিষ্ট সময় বা মেয়াদ' বলতে আমল করার সেই অবসর ও সুযোগ, যা মহান আল্লাহ পরীক্ষা করার জন্য প্রত্যেককে দান করেন। তিনি দেখতে চান যে, সে এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার প্রতি যত্ন নেয়, না তার অবাধ্যতা ও ধৃষ্টতা আরো বেড়ে যায়। এই অবসর কখনো কখনো তার পুরো জীবন পর্যন্ত প্রসারিত থাকে। অর্থাৎ, পার্থিব জীবনে আল্লাহ তাকে পাকড়াও করেন না। বরং কেবল আখেরাতেই তিনি শাস্তি দেবেন। তার নির্দিষ্ট মেয়াদ হল কিয়ামতেরই দিন। আর যাকে দুনিয়াতে তিনি শাস্তি দেন, তার নির্দিষ্ট মেয়াদ তখনই হয়, যখন তাকে পাকড়াও করেন।

Al-A'raaf 7:34Listen in Qur'an →
35

يَٰبَنِىٓ ءَادَمَ إِمَّا يَأْتِيَنَّكُمْ رُسُلٌۭ مِّنكُمْ يَقُصُّونَ عَلَيْكُمْ ءَايَٰتِى ۙ فَمَنِ ٱتَّقَىٰ وَأَصْلَحَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ

হে বনী-আদম, যদি তোমাদের কাছে তোমাদেরই মধ্য থেকে পয়গম্বর আগমন করে তোমাদেরকে আমার আয়াত সমূহ শুনায়, তবে যে ব্যক্তি সংযত হয় এবং সৎকাজ অবলম্বন করে, তাদের কোন আশঙ্কা নেই এবং তারা দুঃখিত হবে না।

হে মানবজাতি! যখন তোমাদের মধ্য হতে কোন রসূল তোমাদের নিকট এসে আমার নিদর্শনসমূহ বিবৃত করে, তখন যারা সাবধান হবে এবং নিজেকে সংশোধন করবে, তাদের কোন ভয় থাকবে না এবং তারা দুঃখিতও হবে না। [১]

[১] এ আয়াতে সেই ঈমানদারদের সুন্দর পরিণামের কথা বর্ণনা করা হয়েছে, যাঁরা আল্লাহভীরুতা এবং নেক আমলের সাজে সজ্জিত হন। কুরআন ঈমানের সাথে সাথে অধিকাংশ স্থানে নেক আমলের কথা অবশ্যই উল্লেখ করেছে। যা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহর নিকট সেই ঈমানই গ্রহণযোগ্য যার সাথে নেক আমলও থাকে।

Al-A'raaf 7:35Listen in Qur'an →
36

وَٱلَّذِينَ كَذَّبُوا۟ بِـَٔايَٰتِنَا وَٱسْتَكْبَرُوا۟ عَنْهَآ أُو۟لَٰٓئِكَ أَصْحَٰبُ ٱلنَّارِ ۖ هُمْ فِيهَا خَٰلِدُونَ

যারা আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা বলবে এবং তা থেকে অহংকার করবে, তারাই দোযখী এবং তথায় চিরকাল থাকবে।

আর যারা আমার নিদর্শনসমূহকে মিথ্যা মনে করেছে এবং অহংকারে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তারাই দোযখবাসী; সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। [১]

[১] এতে ঈমানদারদের বিপরীত সেই লোকদের মন্দ পরিণামের কথা বর্ণনা করা হয়েছে, যারা আল্লাহর বিধানসমূহকে মিথ্যাজ্ঞান করে এবং তার সামনে অহংকার প্রদর্শন করে। ঈমানদার ও কাফের উভয়ের পরিণাম বর্ণনা করার উদ্দেশ্য হল, যাতে মানুষ এমন আচরণকে অবলম্বন করে, যার পরিণাম সুন্দর এবং এমন আচরণ থেকে বেঁচে থাকে, যার পরিণাম মন্দ।

Al-A'raaf 7:36Listen in Qur'an →
37

فَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ ٱفْتَرَىٰ عَلَى ٱللَّهِ كَذِبًا أَوْ كَذَّبَ بِـَٔايَٰتِهِۦٓ ۚ أُو۟لَٰٓئِكَ يَنَالُهُمْ نَصِيبُهُم مِّنَ ٱلْكِتَٰبِ ۖ حَتَّىٰٓ إِذَا جَآءَتْهُمْ رُسُلُنَا يَتَوَفَّوْنَهُمْ قَالُوٓا۟ أَيْنَ مَا كُنتُمْ تَدْعُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ ۖ قَالُوا۟ ضَلُّوا۟ عَنَّا وَشَهِدُوا۟ عَلَىٰٓ أَنفُسِهِمْ أَنَّهُمْ كَانُوا۟ كَٰفِرِينَ

অতঃপর ঐ ব্যক্তির চাইতে অধিক জালেম কে, যে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে অথবা তার নির্দেশাবলীকে মিথ্যা বলে? তারা তাদের গ্রন্থে লিখিত অংশ পেয়ে যাবে। এমন কি, যখন তাদের কাছে আমার প্রেরিত ফেরশতারা প্রাণ নেওয়ার জন্যে পৌছে, তখন তারা বলে; তারা কোথায় গেল, যাদের কে তোমরা আল্লাহ ব্যতীত আহবান করতে? তারা উত্তর দেবেঃ আমাদের কাছ থেকে উধাও হয়ে গেছে, তারা নিজেদের সম্পর্কে স্বীকার করবে যে, তারা অবশ্যই কাফের ছিল।

যে ব্যক্তি আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনা করে, কিম্বা তাঁর নিদর্শনসমূহকে মিথ্যা মনে করে, তার অপেক্ষা বড় অত্যাচারী আর কে? তাদের ভাগ্যলিপিতে লিখিত নির্ধারিত অংশ তাদের নিকট পৌঁছবে।[১] পরিশেষে যখন আমার প্রেরিত (ফিরিশতা)রা প্রাণ হরণের জন্য তাদের নিকট আসবে ও জিজ্ঞাসা করবে, ‘আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে তোমরা ডাকতে তারা কোথায়?’ তারা বলবে, ‘তারা উধাও হয়েছে।’ এবং তারা স্বীকার করবে যে, তারা অবিশ্বাসী ছিল।

[১] এর বিভিন্ন অর্থ বর্ণনা করা হয়েছে। একটি অর্থ আমল, রুযী এবং বয়স করা হয়েছে। অর্থাৎ, তাদের ভাগ্যে যে রুযী নির্ধারিত আছে তা পরিপূর্ণ করে নেওয়ার এবং যত বয়স নির্ধারিত আছে তা সম্পূর্ণ করার পর অবশেষে মৃত্যু বরণ করতেই হবে। প্রায় এই অর্থেরই আয়াত এটাও, {إِنَّ الَّذِينَ يَفْتَرُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ لا يُفْلِحُونَ، مَتَاعٌ فِي الدُّنْيَا ثُمَّ إِلَيْنَا مَرْجِعُهُمْ} অর্থাৎ, তুমি বলে দাও, যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা রচনা করে, তারা সফলকাম হবে না। (ওদের জন্য) দুনিয়ায় কিছু সুখ-সম্ভোগ রয়েছে। তারপর আমারই দিকে তাদেরকে ফিরে আসতে হবে। (সূরা ইউনুস ১০:৬৯-৭০)

Al-A'raaf 7:37Listen in Qur'an →
38

قَالَ ٱدْخُلُوا۟ فِىٓ أُمَمٍۢ قَدْ خَلَتْ مِن قَبْلِكُم مِّنَ ٱلْجِنِّ وَٱلْإِنسِ فِى ٱلنَّارِ ۖ كُلَّمَا دَخَلَتْ أُمَّةٌۭ لَّعَنَتْ أُخْتَهَا ۖ حَتَّىٰٓ إِذَا ٱدَّارَكُوا۟ فِيهَا جَمِيعًۭا قَالَتْ أُخْرَىٰهُمْ لِأُولَىٰهُمْ رَبَّنَا هَٰٓؤُلَآءِ أَضَلُّونَا فَـَٔاتِهِمْ عَذَابًۭا ضِعْفًۭا مِّنَ ٱلنَّارِ ۖ قَالَ لِكُلٍّۢ ضِعْفٌۭ وَلَٰكِن لَّا تَعْلَمُونَ

আল্লাহ বলবেনঃ তোমাদের পূর্বে জিন ও মানবের যেসব সম্প্রদায় চলে গেছে, তাদের সাথে তোমরাও দোযখে যাও। যখন এক সম্প্রদায় প্রবেশ করবে; তখন অন্য সম্প্রদায়কে অভিসম্পাত করবে। এমনকি, যখন তাতে সবাই পতিত হবে, তখন পরবর্তীরা পূর্ববর্তীদের সম্পর্কে বলবেঃ হে আমাদের প্রতিপালক এরাই আমাদেরকে বিপথগামী করেছিল। অতএব, আপনি তাদেরকে দ্বিগুণ শাস্তি দিন। আল্লাহ বলবেন প্রত্যেকেরই দ্বিগুণ; তোমরা জান না।

আল্লাহ বলবেন, তোমাদের পূর্বে যে জ্বিন ও মানবদল[১] গত হয়েছে তাদের সাথে তোমরা দোযখে প্রবেশ কর। যখনই কোন দল তাতে প্রবেশ করবে, তখনই অপর দলকে তারা অভিসম্পাত করবে।[২] পরিশেষে যখন সকলে ওতে একত্র হবে,[৩] তখন তাদের পরবর্তীরা পূর্ববর্তীদের সম্পর্কে বলবে,[৪] ‘হে আমাদের প্রতিপালক! ওরাই আমাদেরকে বিভ্রান্ত করেছিল, সুতরাং তুমি ওদেরকে দোযখের দ্বিগুণ শাস্তি দাও।’[৫] আল্লাহ বলবেন, ‘প্রত্যেকের জন্য দ্বিগুণ রয়েছে;[৬] কিন্তু তোমরা জান না।’

[১] أُمَمٌ হল أُمَّةٌ এর বহুবচন। উদ্দেশ্য এমন ফির্ক্বা ও দলসমূহ, যারা কুফরী, বিরোধিতা, শিরক ও মিথ্যাজ্ঞান করার ব্যাপারে একই রকম হবে। فِيْ অর্থ مَعَ ও হতে পারে। অর্থাৎ, তোমাদের পূর্বে মানুষ ও জ্বিনদের দল তোমাদের মতই এখানে এসেছে তাদের সাথে জাহান্নামে প্রবেশ করে যাও অথবা তাদের মধ্যে শামিল হয়ে যাও।[২]{لَعَنَتْ أُخْتَهَا} তার অনুরূপ দলকে অভিশাপ করবে। أُخْتٌ বোনকে বলা হয়। একটি দল (উম্মত)-কে অপর দলের (উম্মতের) দ্বীনের দিক দিয়ে অথবা ভ্রষ্টতার দিক দিয়ে অনুরূপ হওয়ার কারণে বোন বলা হয়েছে। অর্থাৎ, উভয়েই একটি ভুল মতাদর্শের অনুসারী অথবা ভ্রষ্ট ছিল। কিংবা জাহান্নামের সাথী হওয়ার কারণে তাদেরকে একে অপরের বোন গণ্য করা হয়েছে।[৩] ادَّارَكُوْا এর অর্থ হল, تَدَارَكُوْا যখন পরস্পর মিলিত হবে এবং পরস্পর একত্রিত হবে।[৪] أُخْرَى (পরবর্তী দল) বলতে যারা পরে প্রবেশ করবে। আর أُوْلَى (পূর্ববর্তী দল) বলতে তাদের আগে যারা প্রবেশ করবে। অথবা أُخْرَى বলতে أَتْبَاعٌ (অনুসারীগণ) এবং أُوْلَى বলতে مَتْبُوْعٌ অনুসৃত নেতা ও সর্দারদেরকে বুঝানো হয়েছে। এদের অপরাধ যেহেতু অনেক বেশী, কারণ তারা নিজেরা সত্য পথ থেকে তো সরে ছিলই, অপরকেও প্রচেষ্টা করে দূরে রেখেছিল, তাই এরা অনুসারীদের পূর্বেই জাহান্নামে প্রবেশ করবে।[৫] যেমন অন্য এক স্থানে বলা হয়েছে, জাহান্নামীরা বলবে, {رَبَّنَا إِنَّا أَطَعْنَا سَادَتَنَا وَكُبَرَاءَنَا فَأَضَلُّونَا السَّبِيلا، رَبَّنَا آتِهِمْ ضِعْفَيْنِ مِنَ الْعَذَابِ وَالْعَنْهُمْ لَعْنًا كَبِيرًا} অর্থাৎ, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আমাদের নেতা ও বড়দের কথা মেনেছিলাম, অতঃপর তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল। হে আমাদের পালনকর্তা! তাদেরকে তুমি দ্বিগুণ শাস্তি দাও এবং মহা অভিসম্পাত কর।"(সূরা আহ্যাব ৩৩:৬৭-৬৮)[৬] অর্থাৎ, এখন আর একে অপরকে দোষারোপ করে এবং একে অপরের উপর অপবাদ দিয়ে কোন লাভ হবে না। তোমরা সকলেই বড় অপরাধী এবং তোমরা সকলেই দ্বিগুণ শাস্তি পাওয়ার যোগ্য। অনুসারী ও অনুসৃতদের পারস্পরিক এ কথোপকথন সূরা সাবার ৩৪:৩১-৩২ নং আয়াতেও বর্ণিত হয়েছে।

Al-A'raaf 7:38Listen in Qur'an →
39

وَقَالَتْ أُولَىٰهُمْ لِأُخْرَىٰهُمْ فَمَا كَانَ لَكُمْ عَلَيْنَا مِن فَضْلٍۢ فَذُوقُوا۟ ٱلْعَذَابَ بِمَا كُنتُمْ تَكْسِبُونَ

পূর্ববর্তীরা পরবর্তীদেরকে বলবেঃ তাহলে আমাদের উপর তোমাদের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই অতএব, শাস্তি আস্বাদন কর স্বীয় কর্মের কারণে।

আর তাদের পূর্ববর্তীরা তাদের পরবর্তীদেরকে বলবে, ‘আমাদের উপর তোমাদের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই, সুতরাং তোমরা নিজেদের কৃতকর্মের ফল ভোগ করতে থাক।’

Al-A'raaf 7:39Listen in Qur'an →
40

إِنَّ ٱلَّذِينَ كَذَّبُوا۟ بِـَٔايَٰتِنَا وَٱسْتَكْبَرُوا۟ عَنْهَا لَا تُفَتَّحُ لَهُمْ أَبْوَٰبُ ٱلسَّمَآءِ وَلَا يَدْخُلُونَ ٱلْجَنَّةَ حَتَّىٰ يَلِجَ ٱلْجَمَلُ فِى سَمِّ ٱلْخِيَاطِ ۚ وَكَذَٰلِكَ نَجْزِى ٱلْمُجْرِمِينَ

নিশ্চয়ই যারা আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা বলেছে এবং এগুলো থেকে অহংকার করেছে, তাদের জন্যে আকাশের দ্বার উম্মুক্ত করা হবে না এবং তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। যে পর্যন্ত না সূচের ছিদ্র দিয়ে উট প্রবেশ করে। আমি এমনিভাবে পাপীদেরকে শাস্তি প্রদান করি।

অবশ্যই যারা আমার নিদর্শনাবলীকে মিথ্যা বলে এবং অহংকারে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাদের জন্য আকাশের দ্বার উন্মুক্ত করা হবে না[১] এবং তারা বেহেশ্তেও প্রবেশ করতে পারবে না যতক্ষণ না সূচের ছিদ্রপথে উট প্রবেশ করে।[২] এরূপে আমি অপরাধীদেরকে প্রতিফল দিয়ে থাকি।

[১] এ থেকে কেউ কেউ আমল, কেউ কেউ আত্মা এবং কেউ কেউ দু'আ বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ, তাদের আমল অথবা আত্মা অথবা দু'আর জন্য আসমানের দরজা খোলা হয় না। অর্থাৎ, আমল ও দু'আ কবুল হয় না এবং আত্মাকে যমীনে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। (যেমন, মুসনাদ আহমাদে বর্ণিত একটি হাদীস থেকেও জানা যায়।) ইমাম শাওকানী বলেন, তিনটি জিনিসই উদ্দেশ্য হতে পারে।

[২] অসম্ভাব্য জিনিসের সাথে এখানে শর্ত লাগানো হয়েছে। যেমন সূচের ছিদ্রে উট প্রবেশ করা অসম্ভব, তেমনি কাফেরদের জান্নাতে প্রবেশ করাও অসম্ভব। উটের দৃষ্টান্ত পেশ করা হয়েছে এই জন্য যে, তা আরবদের নিকট সর্বাধিক পরিচিত এবং দৈহিক গঠনে একটি বড় পশু। আর সূচের ছিদ্র এত সূক্ষ্ণ ও সংকীর্ণ যে তার তুলনা নেই। এই দু'টি জিনিসের উল্লেখ অসম্ভব জিনিসের সাথে শর্ত লাগানোর অর্থকে আরো বেশী পরিষ্কার করে দিল। আর অসম্ভব জিনিসের সাথে শর্ত বলতে, এমন জিনিসের সাথে শর্ত লাগানো যা সম্ভবই নয়। যেমন, উট সূচের ছিদ্রে প্রবেশ করতেই পারে না। এখন কোন জিনিসের সংঘটিত হওয়াকে উটের সূচের ছিদ্রে প্রবেশ করার সাথে শর্ত লাগানো হলে, সেটাই হয় অসম্ভব জিনিসের সাথে শর্ত লাগানো।

Al-A'raaf 7:40Listen in Qur'an →

Commentary: Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation. Qur'an text and translation via AlQuran Cloud.