Muslim99Muslim99
← Tafsir library

7. Al-A'raaf

The Heights · Meccan · 206 ayahs

سُورَةُ الأَعۡرَافِ

Reading Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation

Ayahs 171–180 of 206

171

۞ وَإِذْ نَتَقْنَا ٱلْجَبَلَ فَوْقَهُمْ كَأَنَّهُۥ ظُلَّةٌۭ وَظَنُّوٓا۟ أَنَّهُۥ وَاقِعٌۢ بِهِمْ خُذُوا۟ مَآ ءَاتَيْنَٰكُم بِقُوَّةٍۢ وَٱذْكُرُوا۟ مَا فِيهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

আর যখন আমি তুলে ধরলাম পাহাড়কে তাদের উপরে সামিয়ানার মত এবং তারা ভয় করতে লাগল যে, সেটি তাদের উপর পড়বে, তখন আমি বললাম, ধর, যা আমি তোমাদের দিয়েছি, দৃঢ়ভাবে এবং স্মরণ রেখো যা তাতে রয়েছে, যেন তোমরা বাঁচতে পার।

এবং আরো স্মরণ কর, আমি পর্বতকে তাদের ঊর্ধ্বে স্থাপন করি, আর তা ছিল যেন একখন্ড ছায়াদার মেঘ। তারা মনে করল যে, ঐটি তাদের উপর পড়ে যাবে। (বললাম,) আমি যা দিলাম তা দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং ওতে যা আছে তা স্মরণ কর, যাতে তোমরা সাবধান হও। [১]

[১] এটি সেই সময়ের ঘটনা, যখন মূসা (আঃ) তাদের নিকট তাওরাত নিয়ে এলেন ও তার আদেশ-নিষেধ পড়ে শোনালেন, তখন তারা অভ্যাস মত তার উপর আমল করতে অস্বীকৃতি জানাল এবং তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল। যার ফলে মহান আল্লাহ পাহাড়কে তাদের উপর তুলে ধরলেন যে, তোমাদেরকে পাহাড় চাপা দিয়ে শেষ করে দেওয়া হবে। যার ভয়ে তারা তাওরাতের উপর আমল করার অঙ্গীকার করল। কেউ কেউ বলেন, পাহাড় তাদের উপর তোলার ঘটনা তাদেরই দাবী অনুসারে ঘটেছিল। যখন তারা বলেছিল, আমরা তাওরাতের উপর তখনই আমল করব যখন মহান আল্লাহ আমাদের মাথার উপর পাহাড়কে তুলে দেখাবেন। তবে প্রথম কথাটিই বেশি সঠিক বলে মনে হয়। (আর আল্লাহই অধিক জানেন।) এখানে সাধারণ পাহাড় তুলে ধরার কথা বলা হয়েছে, পাহাড়ের কোন নাম নেওয়া হয়নি। কিন্তু এর পূর্বে সূরা বাক্বারার ২:৬৩ ও ২:৯৩ নং আয়াতে দুই জায়গায় এই ঘটনার উল্লেখ হয়েছে এবং সেখানে পরিষ্কারভাবে ত্বূর পাহাড়ের কথাই বলা হয়েছে।

Al-A'raaf 7:171Listen in Qur'an →
172

وَإِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِنۢ بَنِىٓ ءَادَمَ مِن ظُهُورِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَأَشْهَدَهُمْ عَلَىٰٓ أَنفُسِهِمْ أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ ۖ قَالُوا۟ بَلَىٰ ۛ شَهِدْنَآ ۛ أَن تَقُولُوا۟ يَوْمَ ٱلْقِيَٰمَةِ إِنَّا كُنَّا عَنْ هَٰذَا غَٰفِلِينَ

আর যখন তোমার পালনকর্তা বনী আদমের পৃষ্টদেশ থেকে বের করলেন তাদের সন্তানদেরকে এবং নিজের উপর তাদেরকে প্রতিজ্ঞা করালেন, আমি কি তোমাদের পালনকর্তা নই ? তারা বলল, অবশ্যই, আমরা অঙ্গীকার করছি। আবার না কেয়ামতের দিন বলতে শুরু কর যে, এ বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না।

স্মরণ কর, যখন তোমার প্রতিপালক আদম সন্তানের পৃষ্ঠদেশ হতে তাদের সন্তান-সন্ততি বাহির করেন এবং তাদের নিজেদের সম্বন্ধে স্বীকারোক্তি গ্রহণ করেন এবং বলেন, ‘আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?’ তারা বলে, ‘নিশ্চয়ই। আমরা সাক্ষী রইলাম।’[১] (এ স্বীকৃতি গ্রহণ) এ জন্য যে, তোমরা যেন কিয়ামতের দিন না বল, ‘আমরা তো এ বিষয়ে জানতাম না।’

[১] এটিকে 'আলাসতু' অঙ্গীকার বলা হয় যা ألست بربكم হতে তৈরী। এই অঙ্গীকার আদম (আঃ)-এর সৃষ্টির পর তাঁর সৃষ্টজাত সকল সন্তানের নিকট হতে নেওয়া হয়েছিল। একটি সহীহ হাদীসে এভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, আরাফার দিনে নু'মান নামক জায়গায় মহান আল্লাহ আদম-সন্তান হতে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন। আদম (আঃ)-এর সকল সন্তানকে তার পৃষ্ঠদেশ হতে বের করলেন এবং তাদেরকে নিজের সামনে (পিঁপড়ের আকারে) ছড়িয়ে দিলেন ও তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'আমি কি তোমাদের রব (প্রভু) নই।' সকলে বলেছিল, بَلَى شَهِدنَا অবশ্যই, আমরা সকলেই আপনার রব হওয়ার সাক্ষ্য দিচ্ছি। (মুসনাদে আহমাদ, হাকেম ২/৫৪৪, সিলসিলাহ সহীহাহ ১৬২৩নং) ইমাম শাওকানী এ হাদীসটি সম্পর্কে বলেন, এর সূত্রে কোন প্রকার ত্রুটি নেই। ইমাম শাওকানী আরো বলেন, তখনকার জগৎকে 'আলামুয যার্র' (পিপীলিকা জগৎ) বলা হয়। এটিই এর সঠিক ও যথার্থ ব্যাখ্যা। এর থেকে সরে যাওয়া ও অন্য অর্থ নেওয়া সঠিক নয়। কারণ, এটি আল্লাহর রসূলের হাদীস ও সাহাবাদের উক্তি দ্বারা প্রমাণিত। সুতরাং এটিকে 'মাজায' (রূপক বা ভাবগত) অর্থে ব্যবহার করাও উচিত নয়। মোটকথা, আল্লাহর রব হওয়ার সাক্ষ্য প্রত্যেক মানুষের প্রকৃতিতে সন্নিবিষ্ট আছে। এই ভাবার্থকেই আল্লাহর রসূল (সাঃ) এইভাবে বর্ণনা করেছেন, "প্রতিটি শিশু (ইসলামী ধর্মবোধের) প্রকৃতি নিয়ে জন্ম নেয়। পরে তার মাতা-পিতা তাকে ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান বা অগ্নিপূজক বানিয়ে নেয়। যেমন জন্তুর বাচ্চা সম্পূর্ণ জন্ম হয়, তার নাক ও কান কাটা থাকে না।" (বুখারীঃ জানাযা অধ্যায়, মুসলিমঃ তকদীর অধ্যায়) সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় রয়েছে, মহান আল্লাহ বলেন, 'আমি আমার বান্দাদেরকে একনিষ্ঠ (একমাত্র ইসলামের প্রতি অনুগত) রূপে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর শয়তান তাদেরকে ইসলামী প্রকৃতি হতে পথভ্রষ্ট করে দেয়।' (মুসলিমঃ জানাযা অধ্যায়) এই প্রকৃতিই আল্লাহর একত্ব ও তাঁর অবতীর্ণকৃত শরীয়ত। যা এখন ইসলাম নামে সংরক্ষিত।

Al-A'raaf 7:172Listen in Qur'an →
173

أَوْ تَقُولُوٓا۟ إِنَّمَآ أَشْرَكَ ءَابَآؤُنَا مِن قَبْلُ وَكُنَّا ذُرِّيَّةًۭ مِّنۢ بَعْدِهِمْ ۖ أَفَتُهْلِكُنَا بِمَا فَعَلَ ٱلْمُبْطِلُونَ

অথবা বলতে শুরু কর যে, অংশীদারিত্বের প্রথা তো আমাদের বাপ-দাদারা উদ্ভাবন করেছিল আমাদের পূর্বেই। আর আমরা হলাম তাদের পশ্চাৎবর্তী সন্তান-সন্ততি। তাহলে কি সে কর্মের জন্য আমাদেরকে ধ্বংস করবেন, যা পথভ্রষ্টরা করেছে?

কিংবা তোমরা যেন না বল, ‘আমাদের পূর্বপুরুষগণই তো আমাদের পূর্বে অংশী-স্থাপন করেছে। আর আমরা তো তাদের পরবর্তী বংশধর, তবে কি মিথ্যাশ্রয়ীদের কৃতকর্মের জন্য তুমি আমাদেরকে ধ্বংস করবে?’ [১]

[১] অর্থাৎ, আমি অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি এবং নিজ প্রতিপালক হওয়ার সাক্ষ্য এই জন্যই নিয়েছিলাম, যাতে তোমরা কোন ওজর পেশ করতে না পার যে, আমরা তো অনবগত ছিলাম কিম্বা আমাদের পূর্বপুরুষেরা শির্কে লিপ্ত ছিল। এই ওজর কিয়ামত দিবসে মহান আল্লাহ শুনবেন না।

Al-A'raaf 7:173Listen in Qur'an →
174

وَكَذَٰلِكَ نُفَصِّلُ ٱلْءَايَٰتِ وَلَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ

বস্তুতঃ এভাবে আমি বিষয়সমূহ সবিস্তারে বর্ণনা করি, যাতে তারা ফিরে আসে।

আর এভাবে নিদর্শনসমূহ আমি বিবৃত করি, যাতে তারা প্রত্যাবর্তন করে।

Al-A'raaf 7:174Listen in Qur'an →
175

وَٱتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ ٱلَّذِىٓ ءَاتَيْنَٰهُ ءَايَٰتِنَا فَٱنسَلَخَ مِنْهَا فَأَتْبَعَهُ ٱلشَّيْطَٰنُ فَكَانَ مِنَ ٱلْغَاوِينَ

আর আপনি তাদেরকে শুনিয়ে দিন, সে লোকের অবস্থা, যাকে আমি নিজের নিদর্শনসমূহ দান করেছিলাম, অথচ সে তা পরিহার করে বেরিয়ে গেছে। আর তার পেছনে লেগেছে শয়তান, ফলে সে পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে পড়েছে।

তাদেরকে ঐ ব্যক্তির বৃত্তান্ত পড়ে শোনাও, যাকে আমি আমার আয়াতসমূহ দান করেছিলাম, অতঃপর সে সেগুলিকে বর্জন করে, তারপর শয়তান তার পিছনে লাগে, ফলে সে বিপথগামীদের অন্তর্ভুক্ত হয়। [১]

[১] ব্যাখ্যাকারীগণ এটিকে এক নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য বলেছেন, যে আল্লাহর কিতাবের জ্ঞান রাখত; কিন্তু পরে পার্থিব ভোগ-বিলাস ও শয়তানের পিছে পড়ে পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। তবে নির্দিষ্ট ব্যক্তি কে ছিল? তা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়। অতএব এ ব্যাপারে কষ্ট করার প্রয়োজন নেই। এটি সাধারণ ব্যাপার, এমন মানুষ প্রত্যেক জাতি ও প্রত্যেক যুগে জন্ম নেয়। যে ব্যক্তিই এ রকম হবে তাকে এর দলভুক্ত করা হবে।

Al-A'raaf 7:175Listen in Qur'an →
176

وَلَوْ شِئْنَا لَرَفَعْنَٰهُ بِهَا وَلَٰكِنَّهُۥٓ أَخْلَدَ إِلَى ٱلْأَرْضِ وَٱتَّبَعَ هَوَىٰهُ ۚ فَمَثَلُهُۥ كَمَثَلِ ٱلْكَلْبِ إِن تَحْمِلْ عَلَيْهِ يَلْهَثْ أَوْ تَتْرُكْهُ يَلْهَث ۚ ذَّٰلِكَ مَثَلُ ٱلْقَوْمِ ٱلَّذِينَ كَذَّبُوا۟ بِـَٔايَٰتِنَا ۚ فَٱقْصُصِ ٱلْقَصَصَ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ

অবশ্য আমি ইচ্ছা করলে তার মর্যাদা বাড়িয়ে দিতাম সে সকল নিদর্শনসমূহের দৌলতে। কিন্তু সে যে অধঃপতিত এবং নিজের রিপুর অনুগামী হয়ে রইল। সুতরাং তার অবস্থা হল কুকুরের মত; যদি তাকে তাড়া কর তবুও হাঁপাবে আর যদি ছেড়ে দাও তবুও হাঁপাবে। এ হল সেসব লোকের উদাহরণ; যারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে আমার নিদর্শনসমূহকে। অতএব, আপনি বিবৃত করুন এসব কাহিনী, যাতে তারা চিন্তা করে।

আমি ইচ্ছা করলে ঐ (আয়াতসমূহ) দ্বারা তাকে উচ্চ মর্যাদা দান করতাম, কিন্তু সে দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হয় এবং নিজ কামনা-বাসনার অনুসরণ করে। তার উদাহরণ কুকুরের মত, ওকে তুমি তাড়া করলে সে জিভ বের করে হাঁপায় এবং তুমি ওকে এমনি ছেড়ে দিলেও সে জিভ বের করে হাঁপাতে থাকে।[১] যে সম্প্রদায় আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা মনে করে, তাদের উদাহরণ এটা। সুতরাং তুমি কাহিনী বিবৃত কর, যাতে তারা চিন্তা করে। [২]

[১] لهث বলা হয় ক্লান্তি ও পিপাসার কারণে জিহ্বা বের হয়ে আসা। কিন্তু কুকুরের অভ্যাস এই যে, তাকে আপনি ধমক দেন, তাড়িয়ে দেন অথবা তাকে নিজ অবস্থায় ছেড়ে দেন, সকল অবস্থাতেই সে ঘেউ ঘেউ করতে থাকবে। অনুরূপ তার পেট পূর্ণ থাক বা খালি, সুস্থ থাক বা অসুস্থ, ক্লান্ত থাক বা তাজা, সব সময় সে জিভ বের করে হাঁপাতে থাকবে। অনুরূপ অবস্থা ঐ ব্যক্তির; তাকে উপদেশ দাও বা না দাও, তার অবস্থা একই থাকবে এবং পৃথিবীর সুখ-সম্পদের জন্য সে লালায়িত থাকবে।

[২] এবং এই প্রকার লোকদেরকে দেখে শিক্ষা গ্রহণ করে ভ্রষ্টতা থেকে দূরে থাকে ও সত্যকে গ্রহণ করে।

Al-A'raaf 7:176Listen in Qur'an →
177

سَآءَ مَثَلًا ٱلْقَوْمُ ٱلَّذِينَ كَذَّبُوا۟ بِـَٔايَٰتِنَا وَأَنفُسَهُمْ كَانُوا۟ يَظْلِمُونَ

তাদের উদাহরণ অতি নিকৃষ্ট, যারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে আমার আয়াত সমূহকে এবং তারা নিজেদেরই ক্ষতি সাধন করেছে।

যে সম্প্রদায় আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা বলে ও নিজেদের প্রতি অনাচার করে, তাদের উদাহরণ কত নিকৃষ্ট! [১]

[১] مثلًا আরবী ব্যাকরণে তামীয। আসল বাক্যটি এরূপ হবে, سًاء مَثَلًا مَثَلُ القَومِ الَّذِينَ كّذَّبوا بِآيَاتِنَا

Al-A'raaf 7:177Listen in Qur'an →
178

مَن يَهْدِ ٱللَّهُ فَهُوَ ٱلْمُهْتَدِى ۖ وَمَن يُضْلِلْ فَأُو۟لَٰٓئِكَ هُمُ ٱلْخَٰسِرُونَ

যাকে আল্লাহ পথ দেখাবেন, সেই পথপ্রাপ্ত হবে। আর যাকে তিনি পথ ভ্রষ্ট করবেন, সে হবে ক্ষতিগ্রস্ত।

আল্লাহ যাকে পথ দেখান, সেই পথ পায় এবং যাদেরকে তিনি বিপথগামী করেন, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত। [১]

[১] এটি আল্লাহর একটি ইচ্ছাগত নিয়ম, যা এর পূর্বে দু-তিন বার স্পষ্টভাবে অলোচিত হয়েছে।

Al-A'raaf 7:178Listen in Qur'an →
179

وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيرًۭا مِّنَ ٱلْجِنِّ وَٱلْإِنسِ ۖ لَهُمْ قُلُوبٌۭ لَّا يَفْقَهُونَ بِهَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌۭ لَّا يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ ءَاذَانٌۭ لَّا يَسْمَعُونَ بِهَآ ۚ أُو۟لَٰٓئِكَ كَٱلْأَنْعَٰمِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ ۚ أُو۟لَٰٓئِكَ هُمُ ٱلْغَٰفِلُونَ

আর আমি সৃষ্টি করেছি দোযখের জন্য বহু জ্বিন ও মানুষ। তাদের অন্তর রয়েছে, তার দ্বারা বিবেচনা করে না, তাদের চোখ রয়েছে, তার দ্বারা দেখে না, আর তাদের কান রয়েছে, তার দ্বারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত; বরং তাদের চেয়েও নিকৃষ্টতর। তারাই হল গাফেল, শৈথিল্যপরায়ণ।

আর আমি তো বহু জ্বিন ও মানুষকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি;[১] তাদের হৃদয় আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না, তাদের চক্ষু আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা দর্শন করে না এবং তাদের কর্ণ আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা শ্রবণ করে না। এরা চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায়; বরং তা অপেক্ষাও অধিক বিভ্রান্ত![২] তারাই হল উদাসীন।

[১] এর সম্পর্ক তকদীরের সাথে। অর্থাৎ, প্রত্যেক মানুষ ও জ্বিনের ব্যাপারে আল্লাহর জানা ছিল যে, পৃথিবীতে গিয়ে তারা ভাল করবে না মন্দ করবে, সেই মত তিনি লিখে দিয়েছেন। এখানে ঐ সকল দোযখবাসীদের কথা উল্লিখিত হয়েছে, যারা আল্লাহর পূর্বজ্ঞান অনুযায়ী দোযখবাসী হওয়ারই কাজ করবে। পরবর্তীতে তাদের আরো কিছু গুণের কথা বলা হয়েছে যে, যাদের মধ্যে এ সকল জিনিস এভাবে পাওয়া যাবে, যার বর্ণনা এখানে দেওয়া হয়েছে, জানতে হবে তাদের পরিণাম হবে মন্দ।

[২] অর্থাৎ, অন্তর, চোখ, কান এগুলি মহান আল্লাহ এই জন্য দান করেছেন, যাতে মানুষ তার দ্বারা উপকৃত হয়ে নিজ প্রভুকে চিনতে পারে, তার নিদর্শনসমূহ লক্ষ্য করে এবং সত্যের বাণী মন দিয়ে শোনে। কিন্তু যে ব্যক্তি ঐ সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা উপকার নেয় না, যেন উপকার না নেওয়ার কারণে সে পশুর মত; বরং তার থেকেও অধম। কারণ পশুরা নিজের লাভ- নোকসান কিছুটা বুঝে। উপকারী জিনিস হতে উপকার নেয় এবং ক্ষতিকারক জিনিস হতে দূরে থাকে। কিন্তু আল্লাহর হিদায়াত হতে বিমুখতা প্রকাশকারী ব্যক্তির মধ্যে এই পার্থক্য করার শক্তিই শেষ হয়ে যায় যে, কোনটি তার জন্য লাভদায়ক, আর কোনটি ক্ষতিকারক। আর সেই কারণেই পরবর্তী বাক্যে তাদেরকে গাফিল বা উদাসীন বলা হয়েছে।

Al-A'raaf 7:179Listen in Qur'an →
180

وَلِلَّهِ ٱلْأَسْمَآءُ ٱلْحُسْنَىٰ فَٱدْعُوهُ بِهَا ۖ وَذَرُوا۟ ٱلَّذِينَ يُلْحِدُونَ فِىٓ أَسْمَٰٓئِهِۦ ۚ سَيُجْزَوْنَ مَا كَانُوا۟ يَعْمَلُونَ

আর আল্লাহর জন্য রয়েছে সব উত্তম নাম। কাজেই সে নাম ধরেই তাঁকে ডাক। আর তাদেরকে বর্জন কর, যারা তাঁর নামের ব্যাপারে বাঁকা পথে চলে। তারা নিজেদের কৃতকর্মের ফল শীঘ্রই পাবে।

উত্তম নামসমূহ আল্লাহরই। সুতরাং তোমরা সে সব নামেই তাকে ডাকো।[১] আর যারা তাঁর নাম সম্বন্ধে বক্রপথ অবলম্বন করে[২] তাদেরকে বর্জন কর, তাদের কৃতকর্মের ফল তাদেরকে দেওয়া হবে।

[১] حُسنى শব্দটি أحسَن শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ। আল্লাহর ঐ সুন্দর নামসমূহ বলতে যে নামগুলোতে বিভিন্ন গুণের; তাঁর মহানুভবতা, মাহাত্ম্য ও শক্তি ইত্যাদি প্রকাশ পায়। সহীহায়নে তার সংখ্যা নিরানব্বই; এক কম একশত বলা হয়েছে। আরো বলা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি তা গণনা করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর আল্লাহ তাআলা বেজোড়, তিনি বেজোড় পছন্দ করেন। (বুখারী দু'আ অধ্যায়, মুসলিম যিকর অধ্যায়) গণনা করার অর্থ , তার উপর ঈমান আনা বা তা গোনা এবং এক একটি ইখলাসের সাথে বর্কতের জন্য পাঠ করা, তা মুখস্থ করা, তার অর্থ বুঝা এবং সেই সব গুণে গুণান্বিত হওয়া। (মিরকাত, মিশকাতের ব্যাখ্যাগ্রন্থ) কোন কোন হাদীসে উক্ত ৯৯ নামের উল্লেখ এসেছে। কিন্তু সে হাদীসগুলি দুর্বল। উলামাগণ সেগুলিকে বর্ণনাকারীর নিজের তরফ হতে বাড়ানো জিনিস বলেছেন; তা হাদীসের অংশ নয়। সেই সাথে উলামাগণ এটাও বলেছেন, যে, আল্লাহর নামের সংখ্যা নিরানব্বইয়ের মধ্যেই সীমিত নয়; বরং তারও অধিক। (ইবনে কাসীর, ফাতহুল ক্বাদীর)

[২] إلحاد (ইলহাদ) এর অর্থ হল এক দিকে ঝুঁকে পড়া। আর এর থেকে 'লাহাদ' এসেছে। লাহাদ ঐ কবরকে বলা হয় যার একদিক খনন করা হয়। দ্বীনের মধ্যে ইলহাদ হল, বক্রপথ অবলম্বন করা বা ধর্মত্যাগী হওয়া। আল্লাহর নামসমূহে বক্রপথ অবলম্বন করা তিনভাবে হতে পারে। (ক) আল্লাহর নামের পরিবর্তন করা, যেমন মুশরিকরা করত। উদাহরণ স্বরূপ মহান আল্লাহর সাত্ত্বিক নাম 'আল্লাহ' থেকে তারা তাদের এক মূর্তির নামকরণ করেছিল 'লাত', আল্লাহর গুণবাচক নাম, 'আযীয' হতে 'উয্যা' নামকরণ করেছিল। (খ) আল্লাহর নামে মনগড়া অতিরিক্ত বা সংযোজন করা, যার আদেশ তিনি দেননি। (গ) তাঁর নাম কম করে দেওয়া; যেমন, তাঁকে একটি নির্দিষ্ট নামেই ডাকা এবং অন্যান্য গুণবাচক নামে ডাকাকে খারাপ মনে করা। (ফাতহুল ক্বাদীর) আল্লাহর নামসমুহে 'বক্রপথ অবলম্বন' করার একটি অর্থ এটাও হতে পারে যে, তার তা'বীল (অপব্যাখ্যা) করা অথবা তা অর্থহীন বা নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া অথবা তার উপমা বা সদৃশ বর্ণনা করা। (আয়সারুত তাফাসীর) যেমন মু'তাযিলা, মুআত্তিলা, মুশাবিবহা ইত্যাদি পথভ্রষ্ট দলগুলোর আচরণ। মহান আল্লাহ এসব থেকে দূরে থাকার ও বাঁচার আদেশ করেছেন।

Al-A'raaf 7:180Listen in Qur'an →

Commentary: Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation. Qur'an text and translation via AlQuran Cloud.