Muslim99Muslim99
← Tafsir library

7. Al-A'raaf

The Heights · Meccan · 206 ayahs

سُورَةُ الأَعۡرَافِ

Reading Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation

Ayahs 151–160 of 206

151

قَالَ رَبِّ ٱغْفِرْ لِى وَلِأَخِى وَأَدْخِلْنَا فِى رَحْمَتِكَ ۖ وَأَنتَ أَرْحَمُ ٱلرَّٰحِمِينَ

মূসা বললেন, হে আমার পরওয়ারদেগার, ক্ষমা কর আমাকে আর আমার ভাইকে এবং আমাদেরকে তোমার রহমতের অন্তর্ভুক্ত কর। তুমি যে সর্বাধিক করুণাময়।

মূসা বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ও আমার ভাইকে ক্ষমা করে দাও এবং আমাদেরকে তোমার করুণায় আশ্রয় দান কর। আর তুমিই সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।’

Al-A'raaf 7:151Listen in Qur'an →
152

إِنَّ ٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُوا۟ ٱلْعِجْلَ سَيَنَالُهُمْ غَضَبٌۭ مِّن رَّبِّهِمْ وَذِلَّةٌۭ فِى ٱلْحَيَوٰةِ ٱلدُّنْيَا ۚ وَكَذَٰلِكَ نَجْزِى ٱلْمُفْتَرِينَ

অবশ্য যারা গোবৎসকে উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে, তাদের উপর তাদের পরওয়ারদেগারের পক্ষ থেকে পার্থিব এ জীবনেই গযব ও লাঞ্জনা এসে পড়বে। এমনি আমি অপবাদ আরোপকারীদেরকে শাস্তি দিয়ে থাকি।

(আল্লাহ বললেন,) নিশ্চয় যারা গোবৎসকে (উপাস্যরূপে) গ্রহণ করেছে অচিরেই পার্থিব জীবনে তাদের উপর তাদের প্রতিপালকের ক্রোধ ও লাঞ্ছনা আসবে।[১] আর এভাবে আমি অপবাদ রচনাকারীদেরকে প্রতিফল দিয়ে থাকি। [২]

[১] আল্লাহর গযব (ক্রোধ) এই ছিল যে, তাদের তওবার জন্য হত্যা আবশ্যিক করা হল। আর এর পূর্বে তারা যতদিন জীবিত থাকল লাঞ্ছনা ও অপমানের উপযুক্ত বলে গণ্য হল।[২] এই শাস্তি শুধুমাত্র তাদের জন্য নয়; বরং যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা রচনা করে, আমি তাদেরকে এই শাস্তিই দিয়ে থাকি।

Al-A'raaf 7:152Listen in Qur'an →
153

وَٱلَّذِينَ عَمِلُوا۟ ٱلسَّيِّـَٔاتِ ثُمَّ تَابُوا۟ مِنۢ بَعْدِهَا وَءَامَنُوٓا۟ إِنَّ رَبَّكَ مِنۢ بَعْدِهَا لَغَفُورٌۭ رَّحِيمٌۭ

আর যারা মন্দ কাজ করে, তারপরে তওবা করে নেয় এবং ঈমান নিয়ে আসে, তবে নিশ্চয়ই তোমার পরওয়ারদেগার তওবার পর অবশ্য ক্ষমাকারী, করুণাময়।

পক্ষান্তরে যারা অসৎকাজ করে, অতঃপর তারা পরে তওবা করে ও ঈমান আনে (তাদের জন্য) এসব কিছুর পরেও তোমার প্রতিপালক নিশ্চয়ই চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।[১]

[১] হ্যাঁ, যারা তওবা করে, আল্লাহ তাদের জন্য চরম ক্ষমাশীল পরম দয়াবান। জানা গেল যে, তওবার কারণে সকল গোনাহ মাফ হয়ে যায়। তবে শর্ত এই যে, তওবা বিশুদ্ধ হতে হবে।

Al-A'raaf 7:153Listen in Qur'an →
154

وَلَمَّا سَكَتَ عَن مُّوسَى ٱلْغَضَبُ أَخَذَ ٱلْأَلْوَاحَ ۖ وَفِى نُسْخَتِهَا هُدًۭى وَرَحْمَةٌۭ لِّلَّذِينَ هُمْ لِرَبِّهِمْ يَرْهَبُونَ

তারপর যখন মূসার রাগ পড়ে গেল, তখন তিনি তখতীগুলো তুলে নিলেন। আর যা কিছু তাতে লেখা ছিল, তা ছিল সে সমস্ত লোকের জন্য হেদায়েত ও রহমত যারা নিজেদের পরওয়ারদেগারকে ভয় করে।

মূসার ক্রোধ যখন প্রশমিত হল, তখন সে ফলকগুলি তুলে নিল। যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে, তাদের জন্য ওর প্রতিলিপিতে[১] ছিল পথ-নির্দেশ ও করুণা। [২]

[১] نُسخَة শব্দটি فُعلَة এর ওজনে منسوخ এর অর্থে (কপি, প্রতিলিপি)। আসল ও নকল উভয় কপিকেই نسخة বলা হয়। এখানে আসল ফলককে বুঝানো হয়েছে, যাতে তাওরাত লিখিত ছিল। অথবা নকলকৃত কপিকে বুঝানো হয়েছে, যা ফলকগুলিকে সজোরে ফেলে দেওয়ার ফলে ভেঙ্গে যাওয়ার পর নকল করা হয়েছিল। তবে প্রথমটিই সঠিক বলে মনে হয়। কেননা পরবর্তিতে বলা হচ্ছে যে, মূসা (আঃ) উক্ত ফলকগুলি তুলে নেন। যাতে বুঝা যায় যে, ফলকগুলি ভেঙ্গে যায়নি। যাই হোক, এখানে উদ্দেশ্য তার বিষয়-বস্তু।

[২] তাওরাতকেও কুরআনের মত ঐসকল লোকেদের জন্য পথনির্দেশ ও করুণা বলে গণ্য করা হয়েছে, যারা আল্লাহকে ভয় করে। কারণ আসমানী কিতাব থেকে উপকৃত এই শ্রেণীর লোকেরাই হয়ে থাকে। আর অন্যরা যেহেতু সত্য শোনা থেকে নিজেদের কানকে ও সত্য দেখা হতে নিজেদের চোখকে বন্ধ রাখে, সেহেতু তারা সাধারণতঃ এর উপকার হতে বঞ্চিত থাকে।

Al-A'raaf 7:154Listen in Qur'an →
155

وَٱخْتَارَ مُوسَىٰ قَوْمَهُۥ سَبْعِينَ رَجُلًۭا لِّمِيقَٰتِنَا ۖ فَلَمَّآ أَخَذَتْهُمُ ٱلرَّجْفَةُ قَالَ رَبِّ لَوْ شِئْتَ أَهْلَكْتَهُم مِّن قَبْلُ وَإِيَّٰىَ ۖ أَتُهْلِكُنَا بِمَا فَعَلَ ٱلسُّفَهَآءُ مِنَّآ ۖ إِنْ هِىَ إِلَّا فِتْنَتُكَ تُضِلُّ بِهَا مَن تَشَآءُ وَتَهْدِى مَن تَشَآءُ ۖ أَنتَ وَلِيُّنَا فَٱغْفِرْ لَنَا وَٱرْحَمْنَا ۖ وَأَنتَ خَيْرُ ٱلْغَٰفِرِينَ

আর মূসা বেছে নিলেন নিজের সম্প্রদায় থেকে সত্তর জন লোক আমার প্রতিশ্রুত সময়ের জন্য। তারপর যখন তাদেরকে ভূমিকম্প পাকড়াও করল, তখন বললেন, হে আমার পরওয়ারদেগার, তুমি যদি ইচ্ছা করতে, তবে তাদেরকে আগেই ধ্বংস করে দিতে এবং আমাকেও। আমাদেরকে কি সে কর্মের কারণে ধ্বংস করছ, যা আমার সম্প্রদায়ের নির্বোধ লোকেরা করেছে? এসবই তোমার পরীক্ষা; তুমি যাকে ইচ্ছা এতে পথ ভ্রষ্ট করবে এবং যাকে ইচ্ছা সরলপথে রাখবে। তুমি যে আমাদের রক্ষক-সুতরাং আমাদেরকে ক্ষমা করে দাও এবং আমাদের উপর করুনা কর। তাছাড়া তুমিই তো সর্বাধিক ক্ষমাকারী।

আর মূসা আপন সম্প্রদায় হতে সত্তর জন লোককে আমার প্রতিশ্রুতির সময়ে সমবেত হওয়ার জন্য মনোনীত করল। তারা যখন ভূমিকম্প দ্বারা আক্রান্ত হল[১] তখন মূসা বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি ইচ্ছা করলে পূর্বেই তো এদেরকে এবং আমাকেও ধ্বংস করতে পারতে। আমাদের মধ্যে যারা নির্বোধ তাদের কর্মদোষে কি তুমি আমাদেরকে ধ্বংস করবে? এতো শুধু তোমার পরীক্ষা, যা দিয়ে তুমি যাকে ইচ্ছা বিপথগামী কর এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত কর। তুমিই তো আমাদের অভিভাবক। সুতরাং আমাদেরকে ক্ষমা কর ও আমাদের প্রতি দয়া কর এবং তুমিই সর্বশ্রেষ্ঠ ক্ষমাশীল। [২]

[১] ঐ সত্তরজন ব্যক্তির বিস্তারিত আলোচনা পরবর্তী টীকায় হবে। এখানে এটা বলা হচ্ছে যে, মূসা (আঃ) নিজ জাতির সত্তরজন ব্যক্তিকে নির্বাচিত করলেন এবং তাদেরকে ত্বূর পাহাড়ে নিয়ে গেলেন; যেখানে তাদেরকে ধ্বংস করে দেওয়া হল। যার কারণে মূসা (আঃ) বললেন,----।[২] বানী ইস্রাঈলের এই সত্তরজন ব্যক্তি কারা ছিল? এ সম্পর্কে মুফাসসিরদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। একটি মত হল যে, যখন মূসা (আঃ) তাদেরকে তাওরাতের আহকাম শুনালেন, তারা বলল, 'আমরা কেমন করে বিশ্বাস করব যে, এই কিতাব সত্যিই আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে? যতক্ষণ আমরা আল্লাহকে স্বয়ং কথা বলতে না শুনব, ততক্ষণ এটাকে মানব না।' সুতরাং তিনি সত্তরজন ব্যক্তিকে বেছে নিলেন এবং তাদেরকে ত্বূর পাহাড়ে নিয়ে গেলেন। সেখানে মহান আল্লাহ মূসা (আঃ)-এর সাথে কথোপকথন করলেন, যা তারাও শুনল। কিন্তু তারা একটি নতুন দাবী করে বসল যে, যতক্ষণ আমরা নিজ চোখে আল্লাহকে না দেখব, ঈমান আনব না। দ্বিতীয় মত হল, এই সত্তরজন ব্যক্তি হল তারা, যাদেরকে পূর্ণ জাতির তরফ হতে বাছুর-পূজার মহাপাপ থেকে তওবা করার জন্য ত্বূর পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আর সেখানে গিয়ে তারা আল্লাহকে দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করল। তৃতীয় মত হল, এই সত্তরজন ব্যক্তি বানী ইস্রাঈলকে বাছূর-পূজা করতে দেখেছিল, কিন্তু তারা তাদেরকে নিষেধ করেনি। চতুর্থ মত হল, এই সত্তরজন ব্যক্তি যাদেরকে মহান আল্লাহর আদেশে নির্বাচন করে ত্বূর পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে গিয়ে তারা আল্লাহর নিকট দু'আ করে। যার মধ্যে একটি দু'আ ছিল 'হে আল্লাহ! আমাদেরকে এমন কিছু দান কর, যা এর পূর্বে কাউকে দান করা হয়নি। আর না পরবর্তীতে কাউকে দান করা হবে।' মহান আল্লাহর এই দু'আ পছন্দ হল না। যার কারণে তাদেরকে ভূমিকম্প দ্বারা ধ্বংস করা হল। অধিকাংশ মুফাসসিরগণ দ্বিতীয় মতকে গ্রহণ করেছেন এবং ঐ ঘটনাকে সেই ঘটনা বলে নির্ধারিত করেছেন, যা সূরা বাক্বারার ২:৫৫ নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। যেখানে তাদের উপর বিদ্যুৎ (বজ্র) রূপে মৃত্যু নেমে এসেছিল। আর এখানে ভূমিকম্পন দ্বারা মৃত্যুর কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, হতে পারে দুই আযাবই তাদের উপর এসেছিল; আকাশ হতে বজ্র ও পৃথিবী হতে ভূমিকম্প। যাই হোক, মূসা (আঃ) দু'আ ও দরখাস্ত করে বললেন, তাদের জন্য যদি ধ্বংসই অবধারিত ছিল, তাহলে এর পূর্বে যখন তারা বাছুর-পূজায় নিমগ্ন ছিল, তখনই ধ্বংস করতেন।---' সুতরাং তার ফলে মহান আল্লাহ তাদেরকে পুনর্জীবন দান করলেন।

Al-A'raaf 7:155Listen in Qur'an →
156

۞ وَٱكْتُبْ لَنَا فِى هَٰذِهِ ٱلدُّنْيَا حَسَنَةًۭ وَفِى ٱلْءَاخِرَةِ إِنَّا هُدْنَآ إِلَيْكَ ۚ قَالَ عَذَابِىٓ أُصِيبُ بِهِۦ مَنْ أَشَآءُ ۖ وَرَحْمَتِى وَسِعَتْ كُلَّ شَىْءٍۢ ۚ فَسَأَكْتُبُهَا لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ وَيُؤْتُونَ ٱلزَّكَوٰةَ وَٱلَّذِينَ هُم بِـَٔايَٰتِنَا يُؤْمِنُونَ

আর পৃথিবীতে এবং আখেরাতে আমাদের জন্য কল্যাণ লিখে দাও। আমরা তোমার দিকে প্রত্যাবর্তন করছি। আল্লাহ তা’আলা বললেন, আমার আযাব তারই উপর পরিব্যাপ্ত। সুতরাং তা তাদের জন্য লিখে দেব যারা ভয় রাখে, যাকাত দান করে এবং যারা আমার আয়তসমুহের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে।

এবং আমাদের জন্য ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ নির্ধারণ কর, আমরা তোমার নিকট প্রত্যাবর্তন করছি।’[১] আল্লাহ বললেন, আমার শাস্তি যাকে ইচ্ছা দিয়ে থাকি, আর আমার দয়া তা তো প্রত্যেক বস্তুতে পরিব্যাপ্ত।[২] সুতরাং আমি তা (দয়া) তাদের জন্য নির্ধারিত করব যারা সাবধান হয়, যাকাত দেয় ও আমার নিদর্শনসমূহে বিশ্বাস করে।

[১] অর্থাৎ, তওবা করছি।

[২] এটি মহান আল্লাহর করুণার পরিব্যাপ্তিই বটে যে, পৃথিবীতে সৎ-অসৎ মু'মিন-কাফের সবাই আল্লাহর করুণা হতে উপকৃত হচ্ছে। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, "আল্লাহর করুণার একশত অংশ আছে। তার মধ্যে একটি অংশ পৃথিবীতে অবতীর্ণ করেছেন। যার কারণে সৃষ্টি এক অপরের প্রতি দয়া প্রদর্শন করে থাকে; এমনকি পশুরাও নিজ নিজ বাচ্চার উপর মায়া করে নিজেদের পা তুলে নেয়। আর তিনি করুণার ৯৯ ভাগ অংশ নিজের কাছে রেখেছেন।" (মুসলিম ২১০৮, ইবনে মাজাহ ৪২৯৩নং)

Al-A'raaf 7:156Listen in Qur'an →
157

ٱلَّذِينَ يَتَّبِعُونَ ٱلرَّسُولَ ٱلنَّبِىَّ ٱلْأُمِّىَّ ٱلَّذِى يَجِدُونَهُۥ مَكْتُوبًا عِندَهُمْ فِى ٱلتَّوْرَىٰةِ وَٱلْإِنجِيلِ يَأْمُرُهُم بِٱلْمَعْرُوفِ وَيَنْهَىٰهُمْ عَنِ ٱلْمُنكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ ٱلطَّيِّبَٰتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ ٱلْخَبَٰٓئِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَٱلْأَغْلَٰلَ ٱلَّتِى كَانَتْ عَلَيْهِمْ ۚ فَٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ بِهِۦ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَٱتَّبَعُوا۟ ٱلنُّورَ ٱلَّذِىٓ أُنزِلَ مَعَهُۥٓ ۙ أُو۟لَٰٓئِكَ هُمُ ٱلْمُفْلِحُونَ

সেসমস্ত লোক, যারা আনুগত্য অবলম্বন করে এ রসূলের, যিনি উম্মী নবী, যাঁর সম্পর্কে তারা নিজেদের কাছে রক্ষিত তওরাত ও ইঞ্জিলে লেখা দেখতে পায়, তিনি তাদেরকে নির্দেশ দেন সৎকর্মের, বারণ করেন অসৎকর্ম থেকে; তাদের জন্য যাবতীয় পবিত্র বস্তু হালাল ঘোষনা করেন ও নিষিদ্ধ করেন হারাম বস্তুসমূহ এবং তাদের উপর থেকে সে বোঝা নামিয়ে দেন এবং বন্দীত্ব অপসারণ করেন যা তাদের উপর বিদ্যমান ছিল। সুতরাং যেসব লোক তাঁর উপর ঈমান এনেছে, তাঁর সাহচর্য অবলম্বন করেছে, তাঁকে সাহায্য করেছে এবং সে নূরের অনুসরণ করেছে যা তার সাথে অবতীর্ণ করা হয়েছে, শুধুমাত্র তারাই নিজেদের উদ্দেশ্য সফলতা অর্জন করতে পেরেছে।

যারা নিরক্ষর রসূল ও নবীর অনুসরণ করে, যার উল্লেখ তওরাত ও ইঞ্জীল যা তাদের নিকট আছে তাতে লিপিবদ্ধ পায়,[১] যে তাদেরকে সৎকাজের নির্দেশ দেয় ও অসৎকাজে নিষেধ করে,[২] যে তাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহকে বৈধ করে ও অপবিত্র বস্তুসমূহকে অবৈধ করে এবং যে তাদের ভার ও বন্ধন[৩] যা তাদের উপর ছিল (তা হতে) তাদেরকে মুক্ত করে। সুতরাং যারা তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, তাকে সম্মান করে, তাকে সাহায্য করে এবং যে আলো তার সাথে অবতীর্ণ করা হয়েছে, তার অনুসরণ করে তারাই হবে সফলকাম। [৪]

[১] এই আয়াত ঐ বিষয়কে স্পষ্ট করার জন্য একটি অকাট্য প্রমাণ যে, মুহাম্মাদী রিসালতের উপর ঈমান আনা ছাড়া পরকালে পরিত্রাণ সম্ভব নয়। আর ঐ ঈমানই ঈমান বলে গণ্য, যা বিস্তারিতভাবে মুহাম্মাদ (সাঃ) বর্ণনা করেছেন। এই আয়াত থেকে 'সব ধর্ম সমান' ধারণা সমূলে উৎপাটিত হয়।[২] সৎকর্ম তাই, যাকে শরীয়ত সৎ বলেছে এবং অসৎকর্ম তাই, যাকে শরীয়ত অসৎ বলে গণ্য করেছে।[৩] এই বোঝা ও বন্ধন যা পূর্বের শরীয়তে বিদ্যমান ছিল। যেমন, প্রাণের পরিবর্তে প্রাণ হত্যা আবশ্যিক ছিল। (রক্তপণ বা ক্ষমার কোন পথ ছিল না।) কাপড়ে অপবিত্রতা লেগে গেলে তা কেটে ফেলা জরুরী ছিল। ইসলাম শুধুমাত্র ধোয়ার আদেশ দিয়েছে। যেমন, প্রাণ হত্যার অপরাধে রক্তপণ ও ক্ষমা করার অনুমতিও রয়েছে ইত্যাদি। নবী (সাঃ)-ও ইরশাদ করেছেন যে, আমি সহজ একনিষ্ঠ ধর্ম দিয়ে প্রেরিত হয়েছি। (মুসনাদে আহমাদ) কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, এই জাতি নিজ থেকে অনেক আচার ও প্রথার বোঝা নিজেদের উপর চাপিয়ে নিয়েছে এবং জাহেলিয়াতের বন্ধন নিজেদের গলায় বেঁধে নিয়েছে, যার ফলে বিবাহ ও মৃত্যু উভয়ই আমাদের জন্য আযাব বনে গেছে। আল্লাহ এ জাতিকে হিদায়াত করুন। আমীন।[৪] এর শেষের শব্দগুলো থেকে একথা স্পষ্ট হয় যে, সাফল্য তারাই লাভ করবে যারা মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর প্রতি ঈমান আনবে ও তাঁর অনুসরণ করবে। আর যারা মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর প্রতি ঈমান আনবে না, তারা সফলতা লাভ করবে না, বরং তারা ক্ষতিগ্রস্ত ও অসফল হবে। সাফল্য বলতে পরকালের সাফল্যকে বুঝানো হয়েছে। এটা সম্ভব যে, কোন জাতি মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে বিশ্বাস করে না, তা সত্ত্বেও তারা পৃথিবীর সম্পদ ও ভোগবিলাস লাভে বড় সফল। যেমন বর্তমান যুগে পাশ্চাত্য, ইউরোপ ও অন্যান্য জাতির অবস্থা। তারা খ্রিষ্টান, ইয়াহুদী ও কাফের-মুশরিক হওয়া সত্ত্বেও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে বড় উন্নত। কিন্তু তাদের পার্থিব এ উন্নতি সাময়িকভাবে তাদের পরীক্ষার জন্য। ওটি তাদের পরকালের সাফল্যের মাপকাঠি নয়। অনুরূপ واتَّبَعُوا النُّورَ الَّذِي أُنزِلَ مَعَه (এবং যে আলো তার সাথে অবতীর্ণ করা হয়েছে তার অনুসরণ করে) থেকে এ কথা পরিষ্কার হয় যে, সূরা মাইদার ৫:১৫ নং আয়াতে 'নূর' জ্যোতি বা আলো বলতে কুরআনকে বুঝানো হয়েছে। (যেমন সেখানেও সুস্পষ্ট করা হয়েছে। কারণ যে নূর তাঁর সাথে অবতীর্ণ হয়েছে তা কুরআন মাজীদ। সেই জন্য এই 'নূর' হতে নবী (সাঃ)-এর সত্তা অর্থ হতে পারে না। হ্যাঁ, এ কথা স্বতন্ত্র যে, তাঁর গুণাবলীর মধ্যে একটি গুণ নূর, যার দ্বারা কুফর ও শিরকের অন্ধকার দূরীভূত হয়েছে। কিন্তু 'নূর' তাঁর গুণ বলে তিনি 'আল্লাহর নূর' হতে পারেন না; যেমন বিদআতীরা (জাল হাদীস দ্বারা) প্রমাণ করতে চায়। (বিস্তারিত দেখুন সূরা মাইদার ৫:১৫নং আয়াতের টীকা)

Al-A'raaf 7:157Listen in Qur'an →
158

قُلْ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ إِنِّى رَسُولُ ٱللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا ٱلَّذِى لَهُۥ مُلْكُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضِ ۖ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ يُحْىِۦ وَيُمِيتُ ۖ فَـَٔامِنُوا۟ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِ ٱلنَّبِىِّ ٱلْأُمِّىِّ ٱلَّذِى يُؤْمِنُ بِٱللَّهِ وَكَلِمَٰتِهِۦ وَٱتَّبِعُوهُ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ

বলে দাও, হে মানব মন্ডলী। তোমাদের সবার প্রতি আমি আল্লাহ প্রেরিত রসূল, সমগ্র আসমান ও যমীনে তার রাজত্ব। একমাত্র তাঁকে ছাড়া আর কারো উপাসনা নয়। তিনি জীবন ও মৃত্যু দান করেন। সুতরাং তোমরা সবাই বিশ্বাস স্থাপন করো আল্লাহর উপর তাঁর প্রেরিত উম্মী নবীর উপর, যিনি বিশ্বাস রাখেন আল্লাহর এবং তাঁর সমস্ত কালামের উপর। তাঁর অনুসরণ কর যাতে সরল পথপ্রাপ্ত হতে পার।

বল, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের সকলের জন্য সেই আল্লাহর (প্রেরিত) রসূল; যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্বের অধিকারী, তিনি ব্যতীত অন্য কোন (সত্য) উপাস্য নেই, তিনিই জীবিত করেন ও মৃত্যু ঘটান। সুতরাং আল্লাহর প্রতি ও তাঁর রসূল নিরক্ষর নবীর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর; যে আল্লাহ ও তাঁর বাণীতে বিশ্বাস করে, এবং তোমরা তার অনুসরণ কর, যাতে তোমরা পথ পাও।’ [১]

[১] এই আয়াতও মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর রিসালাত সার্বজনীন রিসালাত প্রমাণিত হওয়ার জন্য স্পষ্ট। এতে মহান আল্লাহ নবী (সাঃ)-কে আদেশ করেছেন, যেন তিনি ঘোষণা করে দেন যে, 'হে বিশ্বের মানুষ! আমি তোমাদের সকলের প্রতি রসূলরূপে প্রেরিত হয়েছি।' এভাবে তিনি বিশ্বের সকল মানব জাতির জন্য ত্রাণকর্তা ও রসূল। এখন পরিত্রাণ ও সুপথ না খ্রিষ্টধর্মে আছে, আর না ইয়াহুদী বা অন্য কোন ধর্মে। পরিত্রাণ ও সুপথ যদি থাকে, তাহলে কেবল ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা ও তাকে নিজ দ্বীন বলে স্বীকার করার মাঝে আছে। এই আয়াতে এবং এর পূর্বের আয়াতেও নবী (সাঃ)-কে নিরক্ষর বলা হয়েছে। এটি তাঁর একটি বিশেষ গুণ। যার অর্থ (তিনি লিখাপড়া জানতেন না, তাঁর অক্ষরজ্ঞান ছিল না) তিনি কোন গুরুর নিকট শিষ্যত্ব গ্রহণ করেননি। কোন শিক্ষকের নিকট হতে কোন শিক্ষাও তিনি অর্জন করেননি। তা সত্ত্বেও তিনি এমন এক কুরআন পেশ করলেন যে, তার অলৌকিকতা ও সাহিত্য-অলংকারের সামনে পৃথিবীর সকল সাহিত্যিক ও পন্ডিত তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে অক্ষম রয়ে গেল। আর তিনি যে শিক্ষা পেশ করলেন, যার সত্যতা ও যথার্থতা পৃথিবীর মানুষের কাছে স্বীকৃত। আর তা এ কথারই প্রমাণ যে, তিনি সত্যিই আল্লাহর রসূল। তাছাড়া একজন নিরক্ষর, না এ রকম গ্রন্থ পেশ করতে পারে, আর না এমন শিক্ষার বর্ণনা দিতে পারে, যা ন্যায় ও ইনসাফের এক সুন্দর নমুনা এবং বিশ্ব-মানবতার পরিত্রাণ ও সাফল্যের জন্য অপরিহার্য। এ শিক্ষা গ্রহণ বিনা পৃথিবীর মানুষ সত্যিকার সুখ-শান্তি পেতে পারে না।

Al-A'raaf 7:158Listen in Qur'an →
159

وَمِن قَوْمِ مُوسَىٰٓ أُمَّةٌۭ يَهْدُونَ بِٱلْحَقِّ وَبِهِۦ يَعْدِلُونَ

বস্তুতঃ মূসার সম্প্রদায়ে একটি দল রয়েছে যারা সত্যপথ নির্দেশ করে এবং সে মতেই বিচার করে থাকে।

মূসার সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন একদল রয়েছে যারা (অন্যকে) ন্যায় পথ দেখায় ও ন্যায় বিচার করে। [১]

[১] এই দল থেকে ঐ কয়েকজন মানুষকে বুঝানো হয়েছে, যাঁরা মুসলমান হয়ে গিয়েছিলেন। যেমন, আব্দুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ) প্রমুখ।

Al-A'raaf 7:159Listen in Qur'an →
160

وَقَطَّعْنَٰهُمُ ٱثْنَتَىْ عَشْرَةَ أَسْبَاطًا أُمَمًۭا ۚ وَأَوْحَيْنَآ إِلَىٰ مُوسَىٰٓ إِذِ ٱسْتَسْقَىٰهُ قَوْمُهُۥٓ أَنِ ٱضْرِب بِّعَصَاكَ ٱلْحَجَرَ ۖ فَٱنۢبَجَسَتْ مِنْهُ ٱثْنَتَا عَشْرَةَ عَيْنًۭا ۖ قَدْ عَلِمَ كُلُّ أُنَاسٍۢ مَّشْرَبَهُمْ ۚ وَظَلَّلْنَا عَلَيْهِمُ ٱلْغَمَٰمَ وَأَنزَلْنَا عَلَيْهِمُ ٱلْمَنَّ وَٱلسَّلْوَىٰ ۖ كُلُوا۟ مِن طَيِّبَٰتِ مَا رَزَقْنَٰكُمْ ۚ وَمَا ظَلَمُونَا وَلَٰكِن كَانُوٓا۟ أَنفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ

আর আমি পৃথক পৃথক করে দিয়েছি তাদের বার জন পিতামহের সন্তানদেরকে বিরাট বিরাট দলে, এবং নির্দেশ দিয়েছি মুসাকে, যখন তার কাছে তার সম্প্রদায় পানি চাইল যে, স্বীয় যষ্টির দ্বারা আঘাত কর এ পাথরের উপর। অতঃপর এর ভেতর থেকে ফুটে বের হল বারটি প্রস্রবণ। প্রতিটি গোত্র চিনে নিল নিজ নিজ ঘাঁটি। আর আমি ছায়া দান করলাম তাদের উপর মেঘের এবং তাদের জন্য অবতীর্ন করলাম মান্না ও সালওয়া। যে পরিচ্ছন্ন বস্তুত জীবিকারূপে আমি তোমাদের দিয়েছি, তা থেকে তোমরা ভক্ষণ কর। বস্তুতঃ তারা আমার কোন ক্ষতি করেনি, বরং ক্ষতি করেছে নিজেদেরই।

আর তাদেরকে আমি বারটি গোত্রে তথা দলে বিভক্ত করেছিলাম।[১] মূসার সম্প্রদায় যখন তার নিকট পানি প্রার্থনা করল, তখন তার প্রতি প্রত্যাদেশ করলাম, ‘তোমার লাঠি দ্বারা পাথরে আঘাত কর।’ ফলে তা থেকে বারটি প্রস্রবণ উৎসারিত হল, প্রত্যেক গোত্র নিজ নিজ পানস্থান চিনে নিল। এবং মেঘ দ্বারা তাদের উপর ছায়া বিস্তার করলাম, তাদের নিকট ‘মান্ন্’ ও ‘সালওয়া’ পাঠালাম; (বললাম,) ‘তোমাদের যা পবিত্র রুযী দিয়েছি তা আহার কর।’ (কিন্তু তারা নির্দেশ অমান্য করল। আর তাতে) তারা আমার প্রতি কোন অত্যাচার করেনি; আসলে তারা নিজেদের প্রতিই অত্যাচার করেছিল।

[১] أسباط শব্দটি سِبط এর বহুবচন, অর্থ পৌত্র। এখানে গোত্রের অর্থে ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ, ইয়াক্বূব (আঃ)-এর ১২টি সন্তান থেকে ১২টি গোত্র আবির্ভূত হল। মহান আল্লাহ প্রত্যেক গোত্রের জন্য এক একটি দলপতি (পর্যবেক্ষক) নিযুক্ত করে দিয়েছিলেন। আল্লাহর বাণী "আমি তাদেরই মধ্য হতে ১২ জন নেতা প্রেরণ করেছিলাম।" (সূরা মাইদাহ ৫:১২ আয়াত) ঐ ১২টি গোত্রের কোন কোন গুণে একটি অপরটির তুলনায় উৎকৃষ্ট হওয়ার কারণে পৃথক পৃথক দল হওয়াকে এক অনুগ্রহ বলে বর্ণনা করেছেন।

Al-A'raaf 7:160Listen in Qur'an →

Commentary: Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation. Qur'an text and translation via AlQuran Cloud.