Muslim99Muslim99
← Tafsir library

7. Al-A'raaf

The Heights · Meccan · 206 ayahs

سُورَةُ الأَعۡرَافِ

Reading Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation

Ayahs 141–150 of 206

141

وَإِذْ أَنجَيْنَٰكُم مِّنْ ءَالِ فِرْعَوْنَ يَسُومُونَكُمْ سُوٓءَ ٱلْعَذَابِ ۖ يُقَتِّلُونَ أَبْنَآءَكُمْ وَيَسْتَحْيُونَ نِسَآءَكُمْ ۚ وَفِى ذَٰلِكُم بَلَآءٌۭ مِّن رَّبِّكُمْ عَظِيمٌۭ

আর সে সময়ের কথা স্মরণ কর, যখন আমি তোমাদেরকে ফেরাউনের লোকদের কবল থেকে মুক্তি দিয়েছি; তারা তোমাদেরকে দিত নিকৃষ্ট শাস্তি, তোমাদের পুত্র-সন্তানদের মেরে ফেলত এবং মেয়েদের বাঁচিয়ে রাখত। এতে তোমাদের প্রতি তোমাদের পরওয়ারদেগারের বিরাট পরীক্ষা রয়েছে।

আর স্মরণ কর, আমি তোমাদেরকে ফিরআউন বংশীয়দের হাত হতে উদ্ধার করেছি, যারা তোমাদেরকে মর্মান্তিক শাস্তি দিত; তারা তোমাদের পুত্র-সন্তানদেরকে হত্যা করত এবং তোমাদের নারীদেরকে জীবিত রাখত। আর এতে তোমাদের জন্য তোমার প্রতিপালকের মহাপরীক্ষা ছিল।[১]

[১] এসব ঐ সকল পরীক্ষা, যার কথা সূরা বাক্বারাহ ২:৪৯নং আয়াত ও সূরা ইবরাহীম ১৪:৬নং আয়াতে আলোচিত হয়েছে।

Al-A'raaf 7:141Listen in Qur'an →
142

۞ وَوَٰعَدْنَا مُوسَىٰ ثَلَٰثِينَ لَيْلَةًۭ وَأَتْمَمْنَٰهَا بِعَشْرٍۢ فَتَمَّ مِيقَٰتُ رَبِّهِۦٓ أَرْبَعِينَ لَيْلَةًۭ ۚ وَقَالَ مُوسَىٰ لِأَخِيهِ هَٰرُونَ ٱخْلُفْنِى فِى قَوْمِى وَأَصْلِحْ وَلَا تَتَّبِعْ سَبِيلَ ٱلْمُفْسِدِينَ

আর আমি মূসাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি ত্রিশ রাত্রির এবং সেগুলোকে পূর্ন করেছি আরো দশ দ্বারা। বস্তুতঃ এভাবে চল্লিশ রাতের মেয়াদ পূর্ণ হয়ে গেছে। আর মূসা তাঁর ভাই হারুনকে বললেন, আমার সম্প্রদায়ে তুমি আমার প্রতিনিধি হিসাবে থাক। তাদের সংশোধন করতে থাক এবং হাঙ্গামা সৃষ্টিকারীদের পথে চলো না।

আরো স্মরণ কর, মূসার জন্য আমি ত্রিশ রাত্রি নির্ধারিত করি এবং আরো দশ দিয়ে তা পূর্ণ করি। এভাবে তার প্রতিপালকের নির্ধারিত সময় চল্লিশ রাত্রিতে পূর্ণ হয়।[১] আর মূসা তার ভ্রাতা হারূনকে বলল, আমার অনুপস্থিতিতে (চল্লিশ দিন) আমার সম্প্রদায়ের মধ্যে তুমি আমার প্রতিনিধিত্ব করবে, সংশোধন করবে এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের অনুসরণ করবে না। [২]

[১] ফিরআউন ও তার দলবলকে ধ্বংস করার পর প্রয়োজন দেখা দিল যে, বানী ইস্রাঈলদের হিদায়াত ও পথ নির্দেশনার জন্য কোন ধর্মগ্রন্থ তাদেরকে দেওয়া হোক। সেই জন্য মহান আল্লাহ মূসা (আঃ)-কে ত্রিশ রাত্রির জন্য ত্বূর পাহাড়ে আহবান করলেন, পরে আরো দশ রাত্রি যোগ করে পুরো চল্লিশ রাত্রি করা হল। মূসা (আঃ) যাওয়ার সময় তাঁর সহোদর ভাই নবী হারূন (আঃ)-কে নিজের স্থলাভিষিক্ত করলেন; যাতে তিনি বানী ইস্রাঈলদের মধ্যে হিদায়াত ও সংশোধনের কাজ চালিয়ে যান এবং তাদেরকে সকল বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেন। এই আয়াতে এ সব কথাই বর্ণিত হয়েছে।

[২] হারূন (আঃ) নিজেও নবী ছিলেন, সংশোধনের দায়িত্বভার তাঁর উপরও ছিল। মূসা (আঃ) শুধুমাত্র উপদেশ ও সতর্কতা স্বরূপ এ কথাগুলো বলেছিলেন। ميقات অর্থাৎ, নির্ধারিত সময়, মেয়াদ।

Al-A'raaf 7:142Listen in Qur'an →
143

وَلَمَّا جَآءَ مُوسَىٰ لِمِيقَٰتِنَا وَكَلَّمَهُۥ رَبُّهُۥ قَالَ رَبِّ أَرِنِىٓ أَنظُرْ إِلَيْكَ ۚ قَالَ لَن تَرَىٰنِى وَلَٰكِنِ ٱنظُرْ إِلَى ٱلْجَبَلِ فَإِنِ ٱسْتَقَرَّ مَكَانَهُۥ فَسَوْفَ تَرَىٰنِى ۚ فَلَمَّا تَجَلَّىٰ رَبُّهُۥ لِلْجَبَلِ جَعَلَهُۥ دَكًّۭا وَخَرَّ مُوسَىٰ صَعِقًۭا ۚ فَلَمَّآ أَفَاقَ قَالَ سُبْحَٰنَكَ تُبْتُ إِلَيْكَ وَأَنَا۠ أَوَّلُ ٱلْمُؤْمِنِينَ

তারপর মূসা যখন আমার প্রতিশ্রুত সময় অনুযায়ী এসে হাযির হলেন এবং তাঁর সাথে তার পরওয়ারদেগার কথা বললেন, তখন তিনি বললেন, হে আমার প্রভু, তোমার দীদার আমাকে দাও, যেন আমি তোমাকে দেখতে পাই। তিনি বললেন, তুমি আমাকে কস্মিনকালেও দেখতে পাবে না, তবে তুমি পাহাড়ের দিকে দেখতে থাক, সেটি যদি স্বস্থানে দঁড়িয়ে থাকে তবে তুমিও আমাকে দেখতে পাবে। তারপর যখন তার পরওয়ারদগার পাহাড়ের উপর আপন জ্যোতির বিকিরণ ঘটালেন, সেটিকে বিধ্বস্ত করে দিলেন এবং মূসা অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। অতঃপর যখন তাঁর জ্ঞান ফিরে এল; বললেন, হে প্রভু! তোমার সত্তা পবিত্র, তোমার দরবারে আমি তওবা করছি এবং আমিই সর্বপ্রথম বিশ্বাস স্থাপন করছি।

মূসা যখন আমার নির্ধারিত স্থানে উপস্থিত হল এবং তার প্রতিপালক তার সঙ্গে কথা বললেন, তখন সে বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে দর্শন দাও, আমি তোমাকে দেখব।’ তিনি বললেন, ‘তুমি আমাকে কখনই দেখবে না।[১] তুমি বরং পাহাড়ের প্রতি লক্ষ্য কর, যদি তা স্ব-স্থানে স্থির থাকে, তাহলে তুমি আমাকে দেখবে।’ সুতরাং যখন তার প্রতিপালক পাহাড়ে জ্যোতিষ্মান হলেন, তখন তা পাহাড়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করল আর মূসা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে গেল।[২] অতঃপর যখন সে জ্ঞান ফিরে পেল, তখন বলল, ‘মহিমময় তুমি! আমি অনুতপ্ত হয়ে তোমাতেই প্রত্যাবর্তন করলাম এবং বিশ্বাসীদের মধ্যে আমিই প্রথম।’[৩]

[১] যখন মূসা (আঃ) ত্বূর পাহাড়ে গেলেন। সেখানে মহান আল্লাহ তাঁর সাথে সরাসরি কথা বললেন। মূসা (আঃ)-এর অন্তরে আল্লাহকে দেখার আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হল এবং নিজের মনের কথা رَبِّ أرِني (হে আমার প্রতিপালক! আমাকে দর্শন দাও) বলে প্রকাশ করলেন। যার উত্তরে মহান আল্লাহ বললেন, لَن تَراني (তুমি আমাকে কখনই দেখবে না)। মু'তাযিলা ফির্কা এখান থেকে প্রমাণ করতে চায় যে, لن শব্দটি নাবাচক অর্থে সর্বকালের জন্য ব্যবহার হয়। সেই জন্য মহান আল্লাহর সাক্ষাৎ না পৃথিবীতে সম্ভব, আর না পরকালে। কিন্তু মু'তাযিলাদের এই মত সহীহ হাদীসসমূহের বিপরীত। বলা বাহুল্য, সহীহ ও শক্তিশালী হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, কিয়ামত দিবসে মু'মিনরা আল্লাহ তাআলাকে দেখবেন এবং জান্নাতেও আল্লাহর মুখমন্ডল দর্শন লাভে ধন্য হবেন। সকল আহলে সুন্নাহর এই আকীদাহ বা বিশ্বাস। এখানে যে ('তুমি আমাকে কখনই দেখবে না' বলে) দর্শনের কথা খন্ডন করা হয়েছে, তা শুধুমাত্র পৃথিবীর ক্ষেত্রে। পৃথিবীর মানুষের কোন চোখ মহান আল্লাহকে দেখতে সক্ষম নয়। কিন্তু পরকালে মহান আল্লাহ এই চোখে এমন দৃষ্টিশক্তি দান করবেন, যা আল্লাহর নূরকে সহ্য করতে পারবে।

[২] অর্থাৎ, ঐ পাহাড়ও মহান আল্লাহর প্রকাশ হওয়াকে সহ্য করতে পারল না এবং মূসা (আঃ)ও সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে গেলেন। হাদীসে বর্ণিত যে, নবী (সাঃ) বলেছেন, "কিয়ামত দিবসে সবাই সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়বে। (এই জ্ঞানশূন্যতা ইবনে কাসীরের মতে ঐ সময় হবে যখন হাশরের ময়দানে মহান আল্লাহ বিচারের জন্য আবির্ভূত হবেন।) অতঃপর যখন সবাই জ্ঞান ফিরে পাবে, তখন আমিই সর্বপ্রথম জ্ঞানপ্রাপ্ত হব এবং দেখব যে, মূসা (আঃ) আরশের পায়া ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু আমি জানি না যে, তিনি আমার আগেই জ্ঞান ফিরে পেয়েছেন, নাকি ত্বূর পাহাড়ে সংজ্ঞাহীন হয়ে যাওয়ার কারণে তাঁকে হাশরের ময়দানে সংজ্ঞাহীন হওয়া থেকে নিষ্কৃতি দেওয়া হয়েছে।" (বুখারীঃ তাফসীর সূরাতুল আরাফ, মুসলিমঃ মূসা (আঃ)-এর ফযীলত)

[৩] 'বিশ্বাসীদের মধ্যে আমিই প্রথম' তোমার মর্যাদা ও মাহাত্ম্যে এবং সেই সাথে এ কথায় যে, আমি তোমার অসহায় ও দুর্বল বান্দা; পৃথিবীতে তোমার দর্শনলাভে অক্ষম।

Al-A'raaf 7:143Listen in Qur'an →
144

قَالَ يَٰمُوسَىٰٓ إِنِّى ٱصْطَفَيْتُكَ عَلَى ٱلنَّاسِ بِرِسَٰلَٰتِى وَبِكَلَٰمِى فَخُذْ مَآ ءَاتَيْتُكَ وَكُن مِّنَ ٱلشَّٰكِرِينَ

(পরওয়ারদেগার) বললেন, হে মূসা, আমি তোমাকে আমার বার্তা পাঠানোর এবং কথা বলার মাধ্যমে লোকদের উপর বিশিষ্টতা দান করেছি। সুতরাং যা কিছু আমি তোমাকে দান করলাম, গ্রহণ কর এবং কৃতজ্ঞ থাক।

তিনি বললেন, হে মূসা! আমি আমার রিসালাত ও বাক্য দ্বারা লোকের মধ্যে তোমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি, সুতরাং আমি যা দিলাম, তা গ্রহণ কর এবং কৃতজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হও। [১]

[১] এটি সরাসরি কথা বলার দ্বিতীয় সুযোগ, মহান আল্লাহ যে সুযোগ মূসা (আঃ)-কে দিয়ে ধন্য করলেন। এর পূর্বে যখন মূসা (আঃ) আগুন নেওয়ার উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন, তখনও তিনি সরাসরি কথা বলে তাঁকে সম্মানিত করেছিলেন এবং নবুঅত দান করেছিলেন।

Al-A'raaf 7:144Listen in Qur'an →
145

وَكَتَبْنَا لَهُۥ فِى ٱلْأَلْوَاحِ مِن كُلِّ شَىْءٍۢ مَّوْعِظَةًۭ وَتَفْصِيلًۭا لِّكُلِّ شَىْءٍۢ فَخُذْهَا بِقُوَّةٍۢ وَأْمُرْ قَوْمَكَ يَأْخُذُوا۟ بِأَحْسَنِهَا ۚ سَأُو۟رِيكُمْ دَارَ ٱلْفَٰسِقِينَ

আর আমি তোমাকে পটে লিখে দিয়েছি সর্বপ্রকার উপদেশ ও বিস্তারিত সব বিষয়। অতএব, এগুলোকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং স্বজাতিকে এর কল্যাণকর বিষয়সমূহ দৃঢ়তার সাথে পালনের নির্দেশ দাও।

আর আমি তোমার জন্য ফলকসমূহের উপর সর্ব বিষয়ের উপদেশ ও সকল বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যা লিখে দিয়েছি,[১] সুতরাং এগুলিকে শক্তভাবে ধর এবং তোমার সম্প্রদায়কে ঐগুলির মধ্যে যা শ্রেষ্ঠ তা গ্রহণ করতে নির্দেশ দাও।[২] আমি শীঘ্রই সত্যত্যাগীদের বাসস্থান তোমাদেরকে দেখাব।’[৩]

[১] তাওরাত কাষ্ঠফলক বা তক্তি রূপে দান করা হয়েছিল। যাতে তাদের ধর্মীয় আহকাম, আদেশ-নিষেধ, অনুপ্রেরণা দান, ভীতি প্রদর্শন ইত্যাদি সকল কিছুর বিস্তারিত আলোচনা বিদ্যমান ছিল।

[২] অর্থাৎ, তারা যেন তাই গ্রহণ করে যা উত্তম ও শ্রেষ্ঠ। যাতে অনুমতি আছে তা নয়; যেমন সুবিধাবাদী ও সুযোগ-সন্ধানীরা করে থাকে; যারা আমলে ফাঁকি দেওয়ার জন্য কেবল ফাঁক ও অনুমতি খুঁজে বেড়ায়।

[৩] বাসস্থান বলতে তাদের পরিণাম, অর্থাৎ, ধ্বংস। অথবা এর অর্থ ফাসেক (সত্যত্যাগী)-দের দেশে তোমাদেরকে শাসনক্ষমতা দান করব। আর তা হল শাম দেশ। যেখানে আমালেকাদের আধিপত্য ছিল; যারা ছিল আল্লাহর অবাধ্য। (ইবনে কাসীর)

Al-A'raaf 7:145Listen in Qur'an →
146

سَأَصْرِفُ عَنْ ءَايَٰتِىَ ٱلَّذِينَ يَتَكَبَّرُونَ فِى ٱلْأَرْضِ بِغَيْرِ ٱلْحَقِّ وَإِن يَرَوْا۟ كُلَّ ءَايَةٍۢ لَّا يُؤْمِنُوا۟ بِهَا وَإِن يَرَوْا۟ سَبِيلَ ٱلرُّشْدِ لَا يَتَّخِذُوهُ سَبِيلًۭا وَإِن يَرَوْا۟ سَبِيلَ ٱلْغَىِّ يَتَّخِذُوهُ سَبِيلًۭا ۚ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ كَذَّبُوا۟ بِـَٔايَٰتِنَا وَكَانُوا۟ عَنْهَا غَٰفِلِينَ

আমি আমার নিদর্শনসমূহ হতে তাদেরকে ফিরিয়ে রাখি, যারা পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে গর্ব করে। যদি তারা সমস্ত নিদর্শন প্রত্যক্ষ করে ফেলে, তবুও তা বিশ্বাস করবে না। আর যদি হেদায়েতের পথ দেখে, তবে সে পথ গ্রহণ করে না। অথচ গোমরাহীর পথ দেখলে তাই গ্রহণ করে নেয়। এর কারণ, তারা আমার নিদর্শনসমূহকে মিথ্যা বলে মনে করেছে এবং তা থেকে বেখবর রয়ে গেছে।

পৃথিবীতে যারা অন্যায়ভাবে গর্ব করে বেড়ায়, তাদেরকে আমার নিদর্শনাবলী হতে ফিরিয়ে দেব; তারা আমার প্রত্যেকটি নিদর্শন দেখলেও ওতে বিশ্বাস করবে না।[১] তারা সৎপথ দেখলেও ওকে পথ বলে গ্রহণ করবে না, কিন্তু তারা ভ্রান্ত পথ দেখলে, তাকেই পথ হিসাবে গ্রহণ করবে।[২] এটি এ কারণে যে, তারা আমার নিদর্শনসমূহকে মিথ্যা মনে করেছে এবং সে সম্বন্ধে তারা উদাসীন ছিল।[৩]

[১] এখানে গর্ব বা অহংকারের অর্থ হল, মহান আল্লাহর আয়াত ও আহকামের মোকাবেলায় নিজেকে বড় মনে করা এবং অন্য লোকদের তুচ্ছ মনে করা। এই শ্রেণীর অহংকার মানুষের জন্য মোটেই শোভনীয় নয়। কারণ আল্লাহ সৃষ্টিকর্তা আর মানুষ সৃষ্ট। সৃষ্ট হয়ে সৃষ্টিকর্তার মোকাবেলা বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা, তার আহকাম ও হিদায়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া বা উদাসীন হওয়া কোন মতেই বৈধ নয়। সেই কারণে অহংকার মহান আল্লাহর নিকট অত্যন্ত ঘৃণ্য জিনিস। এই আয়াতে অহংকারের পরিণতিও ব্যক্ত করা হয়েছে। আর তা এই যে, মহান আল্লাহ নিজ আয়াত (নিদর্শন) হতে দূরে রাখেন এবং সে এত দূরে সরে যায় যে, কোন প্রকার নিদর্শন তাকে হকের (সত্যের) পথে আনতে সফল হয় না। যেমন, অন্যত্র বলা হয়েছে, {إِنَّ الَّذِينَ حَقَّتْ عَلَيْهِمْ كَلِمَتُ رَبِّكَ لاَ يُؤْمِنُونَ، وَلَوْ جَاءتْهُمْ كُلُّ آيَةٍ حَتَّى يَرَوُاْ الْعَذَابَ الأَلِيمَ} অর্থাৎ, নিঃসন্দেহে যাদের সম্বন্ধে তোমার প্রতিপালকের বাক্য সত্য হয়েছে, তারা বিশ্বাস করবে না; যদিও তাদের নিকট সমস্ত নিদর্শন আগত হয়, যে পর্যন্ত না তারা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রত্যক্ষ করেছে। (সূরা ইউনুস ১০:৯৬-৯৭ আয়াত)

[২] এখানে আল্লাহর বিধি-বিধান থেকে যারা মুখ ফিরিয়ে রাখে তাদের আরো একটি আচরণ ও অভ্যাসের কথা বর্ণিত হয়েছে। আর তা এই যে, হিদায়াতের কোন কথা তাদের সামনে এলে তারা তা মেনে নেয় না; কিন্তু ভ্রষ্টতার কোন জিনিস দেখলেই তারা তা সাদরে গ্রহণ করে। কুরআন কারীমের বর্ণিত এই বাস্তবতা সকল যুগেই লক্ষণীয়। আজ আমরাও সকল স্থানে ও সব সমাজেই এমন কি মুসলিম সমাজেও দেখতে পাচ্ছি যে, নেকী মুখ ঢেকে বেড়াচ্ছে। আর পাপকে প্রত্যেকেই লুফে লুফে গ্রহণ করছে।

[৩] এখানে এই কথার কারণ ব্যক্ত করা হয়েছে যে, মানুষ নেকীর পরিবর্তে গোনাহ ও হকের তুলনায় বাতিলকে কেন বেশি গ্রহণ করে? কারণ হল, আল্লাহর আয়াতকে মিথ্যাজ্ঞান এবং তা হতে ঔদাস্য ও বৈমুখ্য প্রকাশ করা। আর এ আচরণ প্রত্যেক যুগে ও প্রত্যেক সমাজেই প্রচলিত।

Al-A'raaf 7:146Listen in Qur'an →
147

وَٱلَّذِينَ كَذَّبُوا۟ بِـَٔايَٰتِنَا وَلِقَآءِ ٱلْءَاخِرَةِ حَبِطَتْ أَعْمَٰلُهُمْ ۚ هَلْ يُجْزَوْنَ إِلَّا مَا كَانُوا۟ يَعْمَلُونَ

বস্তুতঃ যারা মিথ্যা জেনেছে আমার আয়াতসমূকে এবং আখেরাতের সাক্ষাতকে, তাদের যাবতীয় কাজকর্ম ধ্বংস হয়ে গেছে। তেমন বদলাই সে পাবে যেমন আমল করত।

যারা আমার নিদর্শনসমূহ ও পরকালের সাক্ষাতকে মিথ্যা বলে, তাদের কার্য নিষ্ফল হবে। তারা যা করবে সেই অনুযায়ীই তাদেরকে প্রতিফল দেওয়া হবে।[১]

[১] এই আয়াতে যারা আল্লাহর আয়াতকে মিথ্যা ভাবে ও পরকালকে অবিশ্বাস করে তাদের পরিণাম ব্যক্ত করা হয়েছে। যেহেতু তাদের কর্মের বুনিয়াদ ন্যায় ও হক নয় বরং অন্যায় ও বাতিলের উপর, সেই জন্য তাদের (কর্ম আপাতদৃষ্টিতে ভালো হলেও) আমলনামায় কেবল পাপই লিখিত হবে; যার কোন মূল্যই মহান আল্লাহর নিকট নেই। পরন্তু তাদের অন্যায়ের প্রতিফল সেখানে অবশ্যই দেওয়া হবে।

Al-A'raaf 7:147Listen in Qur'an →
148

وَٱتَّخَذَ قَوْمُ مُوسَىٰ مِنۢ بَعْدِهِۦ مِنْ حُلِيِّهِمْ عِجْلًۭا جَسَدًۭا لَّهُۥ خُوَارٌ ۚ أَلَمْ يَرَوْا۟ أَنَّهُۥ لَا يُكَلِّمُهُمْ وَلَا يَهْدِيهِمْ سَبِيلًا ۘ ٱتَّخَذُوهُ وَكَانُوا۟ ظَٰلِمِينَ

আর বানিয়ে নিল মূসার সম্প্রদায় তার অনুপস্থিতিতে নিজেদের অলংকারাদির দ্বারা একটি বাছুর তা থেকে বেরুচ্ছিল ‘হাম্বা হাম্বা’ শব্দ। তারা কি একথাও লক্ষ্য করল না যে, সেটি তাদের সাথে কথাও বলছে না এবং তাদেরকে কোন পথও বাতলে দিচ্ছে না! তারা সেটিকে উপাস্য বানিয়ে নিল। বস্তুতঃ তারা ছিল জালেম।

(আরও স্মরণ কর) মূসার লোকেরা তার অনুপস্থিতিতে নিজেদের অলংকার দিয়ে একটি বাছুরের মূর্তি তৈরী করল, যার শব্দ ছিল গরুর মতই। তারা কি দেখল না যে, ঐটি তাদের সাথে কথা বলে না এবং তাদেরকে পথও দেখায় না। তারা ঐটিকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করল। আর তারা ছিল অত্যাচারী।[১]

[১] মূসা (আঃ) যখন চল্লিশ রাত্রির জন্য ত্বূর পাহাড়ে গেলেন, তখন সামেরী নামক এক ব্যক্তি সম্প্রদায়ের সোনার অলংকার জমা করে তা থেকে একটি বাছুর তৈরী করল। যার মধ্যে জিবরীল (আঃ)-এর ঘোড়ার পায়ের নীচের কিছু মাটি মিশিয়ে দিল যা তার কাছে রাখা ছিল এবং যার মধ্যে মহান আল্লাহ প্রাণ-প্রতিষ্ঠার শক্তি রেখেছিলেন। যার কারণে বাছুরটি গরুর মত শব্দ করত। (যদিও পরিষ্কার কথা বলতে ও পথ-নির্দেশ করতে অক্ষম ছিল; যেমন কুরআনের ভাষায় স্পষ্ট।) এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে যে, সেটি সত্যি সত্যি রক্ত-মাংসের বাছুরে পরিণত হয়ে গিয়েছিল, নাকি সেটি ছিল সোনারই, কিন্তু কোন প্রকারে তাতে হাওয়া প্রবেশ করার ফলে গরুর মত শব্দ বের হত। (ইবনে কাসীর) এই শব্দ দ্বারাই সামেরী বানী ইস্রাঈলকে এই বলে পথভ্রষ্ট করল যে, এটিই তোমাদের মাবূদ (উপাস্য)। মূসা (আঃ) ভুলে গেছেন এবং তিনি উপাস্যের খোঁজে ত্বূর পাহাড়ে গেছেন। এই ঘটনা সূরা ত্বাহা ২০:৮৮-৮৯নং আয়াতেও বর্ণিত হবে।

Al-A'raaf 7:148Listen in Qur'an →
149

وَلَمَّا سُقِطَ فِىٓ أَيْدِيهِمْ وَرَأَوْا۟ أَنَّهُمْ قَدْ ضَلُّوا۟ قَالُوا۟ لَئِن لَّمْ يَرْحَمْنَا رَبُّنَا وَيَغْفِرْ لَنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ ٱلْخَٰسِرِينَ

অতঃপর যখন তারা অনুতপ্ত হল এবং বুঝতে পারল যে, আমরা নিশ্চিতই গোমরাহ হয়ে পড়েছি, তখন বলতে লাগল, আমাদের প্রতি যদি আমাদের পরওয়ারদেগার করুণা না করেন, তবে অবশ্যই আমরা ধবংস হয়ে যাব।

তারা যখন অনুতপ্ত হল[১] ও দেখল যে, তারা বিপথগামী হয়ে গেছে, তখন তারা বলল, ‘আমাদের প্রতিপালক যদি আমাদের প্রতি দয়া না করেন ও আমাদেরকে ক্ষমা না করেন, তাহলে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হব।’

[১] سُقط في أيديهم এটি একটি পরিভাষা, যার অর্থঃ লজ্জিত বা অনুতপ্ত হওয়া। তাদের এ অনুতাপ মূসা (আঃ)-এর ফিরে আসার পর হল, যখন তিনি তাদেরকে এর উপর তিরস্কার করলেন ও ধমক দিলেন; যেমন সূরা ত্বাহা ২০:৯৭নং আয়াতে আছে। এখানে আগে এই জন্যই উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে তাদের কাজ ও কথার বর্ণনা একত্রে হয়ে যায়। (ফাতহুল কাদীর)

Al-A'raaf 7:149Listen in Qur'an →
150

وَلَمَّا رَجَعَ مُوسَىٰٓ إِلَىٰ قَوْمِهِۦ غَضْبَٰنَ أَسِفًۭا قَالَ بِئْسَمَا خَلَفْتُمُونِى مِنۢ بَعْدِىٓ ۖ أَعَجِلْتُمْ أَمْرَ رَبِّكُمْ ۖ وَأَلْقَى ٱلْأَلْوَاحَ وَأَخَذَ بِرَأْسِ أَخِيهِ يَجُرُّهُۥٓ إِلَيْهِ ۚ قَالَ ٱبْنَ أُمَّ إِنَّ ٱلْقَوْمَ ٱسْتَضْعَفُونِى وَكَادُوا۟ يَقْتُلُونَنِى فَلَا تُشْمِتْ بِىَ ٱلْأَعْدَآءَ وَلَا تَجْعَلْنِى مَعَ ٱلْقَوْمِ ٱلظَّٰلِمِينَ

তারপর যখন মূসা নিজ সম্প্রদায়ে ফিরে এলেন রাগাম্বিত ও অনুতপ্ত অবস্থায়, তখন বললেন, আমার অনুপস্থিতিতে তোমরা আমার কি নিকৃষ্ট প্রতিনিধিত্বটাই না করেছ। তোমরা নিজ পরওয়ারদেগারের হুকুম থেকে কি তাড়াহুড়া করে ফেললে এবং সে তখতীগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিলেন এবং নিজের ভাইয়ের মাথার চুল চেপে ধরে নিজের দিকে টানতে লাগলেন। ভাই বললেন, হে আমার মায়ের পুত্র, লোকগুলো যে আমাকে দুর্বল মনে করল এবং আমাকে যে মেরে ফেলার উপক্রম করেছিল। সুতরাং আমার উপর আর শত্রুদের হাসিও না। আর আমাকে জালিমদের সারিতে গন্য করো না।

আর মূসা যখন ক্রুদ্ধ ও দুঃখিত অবস্থায় স্বীয় সম্প্রদায়ের নিকট প্রত্যাবর্তন করল, তখন বলল, ‘আমার অনুপস্থিতিতে তোমরা কিই না জঘন্য কাজ করেছ! তোমাদের প্রতিপালকের আদেশের পূর্বেই কেন তোমরা তাড়াহুড়া করতে গেলে?’ সে ফলকগুলি ফেলে দিল[১] এবং তার ভাইকে মাথায় ধরে নিজের দিকে টেনে আনল। হারূন বলল, ‘হে আমার মায়ের পুত্র (সহোদর)![২] লোকেরা তো আমাকে দুর্বল মনে করেছিল এবং আমাকে মেরে ফেলতে উদ্যত হয়েছিল।[৩] সুতরাং তুমি আমাকে নিয়ে শত্রু হাসায়ো না[৪] এবং আমাকে অনাচারীদের দলভুক্ত গণ্য করো না।’ [৫]

[১] মূসা (আঃ) যখন এসে দেখলেন যে, তারা বাছুরের পূজা শুরু করেছে, তখন অত্যন্ত রাগান্বিত হলেন। আর তাড়াহুড়োয় কাষ্ঠফলকগুলো -- যা তিনি ত্বূর পাহাড় হতে এনেছিলেন -- এমনভাবে রাখলেন যাতে দর্শকের মনে হল, যেন তিনি তা নীচে ফেলে দিলেন; যেটাকে কুরআন 'ফেলে দিল' বলে ব্যক্ত করেছে। তা সত্ত্বেও যদি তিনি ফেলেও থাকেন, তাহলেও এটি বেআদবী নয়। কারণ তাঁর উদ্দেশ্য ফলকের অসম্মান ছিল না; বরং দ্বীনী আত্মসম্মানবোধে আত্মহারা হয়ে বিনা ইচ্ছায় তিনি এ রকমটি করে ফেলেছিলেন।

[২] (মাথায় ধরে অথবা চুলে ধরে।) হারূন (আঃ) এখানে (মূসা (আঃ)-কে ভাই না বলে) মায়ের পুত্র বললেন। কারণ এ শব্দে মমতা বোধ ও ভালবাসা বেশি পাওয়া যায়।

[৩] হারূন (আঃ)-এর এই ওযর ছিল; যার কারণে তিনি জাতিকে শিরকের মত ভয়ানক পাপ থেকে বাধা দিতে সক্ষম হননি। এক তো নিজের দুর্বলতা, আর দুই বানী ইস্রাঈলের বিরোধিতা ও ঔদ্ধত্য; এমনকি (বারণ করার ফলে) তারা তাঁকে হত্যা পর্যন্ত করতে উদ্যত হয়। ফলে তাঁকে নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য চুপ থাকতে হয়। আর এ মত ক্ষেত্রে চুপ থাকার অনুমতি মহান আল্লাহও দিয়ে রেখেছেন।

[৪] আমাকে বকা-ঝকা করলে শত্রুরাই আনন্দিত হবে। অথচ এ সময় শত্রুদেরকে শায়েস্তা করা এবং তাদের প্রভাব থেকে জাতিকে বাঁচানোর সময়।

[৫] আর এমনিতেই আমাকে আকীদা ও আমলের দিক দিয়ে তাদের দলভুক্ত কিভাবে করা যেতে পারে? আমি না শিরক করেছি, না তাদেরকে শিরকের অনুমতি দিয়েছি, আর না আমি তাতে সন্তুষ্ট। শুধু মাত্র চুপ থেকেছি, তার জন্য আমার কাছে গ্রহণযোগ্য ওজরও রয়েছে। সুতরাং আমার গণনা যালেম (মুশরিক)-দের মধ্যে কিভাবে হতে পারে? সেই জন্য মূসা (আঃ) নিজের জন্য ও ভাই হারূনের জন্য ক্ষমা ও দয়া চেয়ে দু'আ করলেন।

Al-A'raaf 7:150Listen in Qur'an →

Commentary: Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation. Qur'an text and translation via AlQuran Cloud.