Muslim99Muslim99
← Tafsir library

5. Al-Maaida

The Table · Medinan · 120 ayahs

سُورَةُ المَائـِدَةِ

Reading Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation

Ayahs 81–90 of 120

81

وَلَوْ كَانُوا۟ يُؤْمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلنَّبِىِّ وَمَآ أُنزِلَ إِلَيْهِ مَا ٱتَّخَذُوهُمْ أَوْلِيَآءَ وَلَٰكِنَّ كَثِيرًۭا مِّنْهُمْ فَٰسِقُونَ

যদি তারা আল্লাহর প্রতি ও রসূলের প্রতি অবতীর্ণ বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করত, তবে কাফেরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করত না। কিন্তু তাদের মধ্যে অনেকেই দুরাচার।

তারা আল্লাহতে, (মুহাম্মাদ) নবীতে ও তার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তাতে বিশ্বাস করলে, ওদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করত না। কিন্তু তাদের অনেকে সত্যত্যাগী।[১]

[১] এর ভাবার্থ এই যে, যার মধ্যে প্রকৃতার্থে ঈমান আছে, সে কষ্মিনকালেও কাফেরদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করবে না।

Al-Maaida 5:81Listen in Qur'an →
82

۞ لَتَجِدَنَّ أَشَدَّ ٱلنَّاسِ عَدَٰوَةًۭ لِّلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ ٱلْيَهُودَ وَٱلَّذِينَ أَشْرَكُوا۟ ۖ وَلَتَجِدَنَّ أَقْرَبَهُم مَّوَدَّةًۭ لِّلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ ٱلَّذِينَ قَالُوٓا۟ إِنَّا نَصَٰرَىٰ ۚ ذَٰلِكَ بِأَنَّ مِنْهُمْ قِسِّيسِينَ وَرُهْبَانًۭا وَأَنَّهُمْ لَا يَسْتَكْبِرُونَ

আপনি সব মানুষের চাইতে মুসলমানদের অধিক শত্রু ইহুদী ও মুশরেকদেরকে পাবেন এবং আপনি সবার চাইতে মুসলমানদের সাথে বন্ধুত্বে অধিক নিকটবর্তী তাদেরকে পাবেন, যারা নিজেদেরকে খ্রীষ্টান বলে। এর কারণ এই যে, খ্রীষ্টানদের মধ্যে আলেম রয়েছে, দরবেশ রয়েছে এবং তারা অহঙ্কার করে না।

অবশ্যই বিশ্বাসীদের প্রতি শত্রুতায় মানুষের মধ্যে ইয়াহুদী ও অংশীবাদীদেরকেই তুমি সর্বাধিক উগ্র দেখবে[১] এবং মানুষের মধ্যে যারা বলে, ‘আমরা খ্রিষ্টান’, তাদেরকেই তুমি সম্প্রীতির ব্যাপারে বিশ্বাসীদের নিকটতর দেখবে। কারণ, তাদের মধ্যে অনেক পন্ডিত ও সংসার-বিরাগী আছে। আর তারা অহংকারও করে না। [২]

[১] এই জন্য যে, ইয়াহুদীদের মধ্যে একগুঁয়েমি, হঠকারিতা, হক থেকে বিমুখতা, দাম্ভিকতা ও গর্ব এবং জ্ঞানী ও ঈমানদারদের অবজ্ঞা করার প্রবণতা ব্যাপক প্রচলিত। আর এ জন্যেই নবীগণকে হত্যা ও তাঁদেরকে মিথ্যাজ্ঞান করা তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়। এমনকি কয়েক বার তারা মহানবী (সাঃ)-কে হত্যা করার কুচক্রান্ত করে। তাঁকে যাদু করে এবং বিভিন্নভাবে ক্ষতি সাধন করার মত জঘন্য অপচেষ্টাও করে। অনুরূপ কুকীর্তি মুশরিকদেরও।

[২] رهبان এর ভাবার্থ; সৎ, আবেদ, সংসার-বিরাগী বা নির্জনবাসী আর قسيسين এর ভাবার্থ; পন্ডিত। অর্থাৎ, এই খ্রিষ্টানদের মধ্যে জ্ঞান ও বিনয় আছে। আর এই জন্যই ইয়াহুদীদের মত তাদের হঠকারিতা ও দাম্ভিকতা ছিল না। এছাড়া খ্রিষ্টান ধর্মে নম্রতা, উদারতা ও ক্ষমাশীলতার শিক্ষার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ মান আছে। এমন কি তাদের ধর্মগ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে যে, কেউ যদি তোমার ডান গালে চড় মারে, তাহলে তার সামনে বাম গাল বাড়িয়ে দাও। অর্থাৎ ঝগড়া-বিবাদ করবে না। এই কারণে ইয়াহুদীদের তুলনায় খ্রিষ্টানরা মুসলিমদের নিকটতর। খ্রিষ্টানদের এই প্রশংসা ইয়াহুদীদের মোকাবেলায় করা হয়েছে। নচেৎ ইসলাম-বিদ্বেষের অভ্যাস কম-বেশী তাদের মধ্যেও আছে। যেমন এ কথা ক্রুস ও ক্রিসেণ্টের বহু শতাব্দী-ব্যাপী যুদ্ধ-বিগ্রহ থেকে স্পষ্ট এবং যা অদ্যাবধি চলে আসছে। আর বর্তমানে ইয়াহুদী-খ্রিষ্টান উভয়ের মিলিত প্রচেষ্টা ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে সরগরম। এই কারণেই কুরআনে উভয় সম্প্রদায়ের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে নিষেধ করা হয়েছে।

Al-Maaida 5:82Listen in Qur'an →
83

وَإِذَا سَمِعُوا۟ مَآ أُنزِلَ إِلَى ٱلرَّسُولِ تَرَىٰٓ أَعْيُنَهُمْ تَفِيضُ مِنَ ٱلدَّمْعِ مِمَّا عَرَفُوا۟ مِنَ ٱلْحَقِّ ۖ يَقُولُونَ رَبَّنَآ ءَامَنَّا فَٱكْتُبْنَا مَعَ ٱلشَّٰهِدِينَ

আর তারা রসূলের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, তা যখন শুনে, তখন আপনি তাদের চোখ অশ্রু সজল দেখতে পাবেন; এ কারণে যে, তারা সত্যকে চিনে নিয়েছে। তারা বলেঃ হে আমাদের প্রতি পালক, আমরা মুসলমান হয়ে গেলাম। অতএব, আমাদেরকেও মান্যকারীদের তালিকাভুক্ত করে নিন।

এবং যখন তারা রসূলের প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা শ্রবণ করে, তখন তারা যে সত্য উপলব্ধি করে তার জন্য তুমি তাদের চক্ষু অশ্রুবিগলিত দেখবে। তারা বলে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা বিশ্বাস করেছি। অতএব তুমি আমাদের (সত্যের) সাক্ষীদের দলভুক্ত কর।

Al-Maaida 5:83Listen in Qur'an →
84

وَمَا لَنَا لَا نُؤْمِنُ بِٱللَّهِ وَمَا جَآءَنَا مِنَ ٱلْحَقِّ وَنَطْمَعُ أَن يُدْخِلَنَا رَبُّنَا مَعَ ٱلْقَوْمِ ٱلصَّٰلِحِينَ

আমাদের কি ওযর থাকতে পারে যে, আমরা আল্লাহর প্রতি এবং যে সত্য আমাদের কাছে এসেছে, তৎপ্রতি বিশ্বাস স্থাপন করব না এবং এ আশা করবো না যে, আমদের প্রতিপালক আমাদেরকে সৎ লোকদের সাথে প্রবিষ্ট করবেন?

আর আমরা যখন প্রত্যাশা করি যে, আল্লাহ আমাদেরকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত করবেন, তখন আল্লাহতে ও আমাদের নিকট আগত সত্যে আমাদের বিশ্বাস স্থাপন না করার কি কারণ থাকতে পারে?’ [১]

[১] হাবশা নামক স্থানে, যেখানে মুসলিমগণ মক্কী জীবনে দুইবার হিজরত করেছিলেন, যেখানে আসহামা নাজাশীর শাসন ছিল। এটি খ্রিষ্টান-রাষ্ট্র বলে পরিচিত ছিল। এই আয়াত হাবশায় অবস্থানরত খ্রিষ্টানদের শানেই অবতীর্ণ হয়। যেমন হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, নবী করীম (সাঃ) আমর বিন উমায়ইয়াহ যামরী (রাঃ)-কে লিখিত পত্র সহ নাজাশীর নিকট প্রেরণ করেন এবং তিনি পত্র বহন করে নিয়ে গিয়ে নাজাশীকে পাঠ করে শুনান। নাজাশী উক্ত পত্র শোনার পর হাবশায় অবস্থানরত মুহাজিরগণ ও জা'ফর ইবনে আবু তালেব (রাঃ)-কে ডেকে পাঠান। আর সাথে সাথে তাঁর স্বধর্মীয় আলেম, আবেদ ও পন্ডিতগণকেও একত্রিত করেন। অতঃপর জা'ফর (রাঃ)-কে কুরআন পাঠ করার নির্দেশ দেন এবং তিনি সূরা মারয়্যাম পাঠ করেন; যাতে ঈসা (আঃ)-এর অলৌকিক জন্ম-বৃত্তান্ত ও আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রসূল হওয়ার কথা উল্লেখ হয়েছে। তারা সকলেই তেলাওয়াত শুনে বড় প্রভাবিত হন। তাঁদের চক্ষু দিয়ে অশ্রুধারা প্রবাহিত হয় এবং তাঁরা সকলেই ঈমান আনয়ন করেন। আবার কেউ বলেন, নাজাশী তাঁর কিছু সংখ্যক উলামাকে রসূল (সাঃ)-এর নিকট প্রেরণ করেন। যখন রসূল (সাঃ) তাঁদের সামনে কুরআন পাঠ করে শুনান, তখন তাঁদের চক্ষু দিয়ে অনায়াসে অশ্রুধারা প্রবাহিত হয় এবং তাঁরা সকলেই ঈমান আনয়ন করেন। (ফাতহুল ক্বাদীর) কুরআন শুনে যেভাবে তাঁরা প্রভাবিত হয়েছিলেন, উল্লিখিত আয়াতে তার চিত্রাঙ্কন করা হয়েছে। এই শ্রেণীর খ্রিষ্টানদের ঈমান আনয়নের কথা কুরআনের বেশ কিছু জায়গায় উল্লিখিত রয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন,{وَإِنَّ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَمَن يُؤْمِنُ بِاللّهِ وَمَا أُنزِلَ إِلَيْكُمْ وَمَآ أُنزِلَ إِلَيْهِمْ خَاشِعِينَ لِلّهِ} অর্থাৎ, নিশ্চয় গ্রন্থধারীদের মধ্যে এমন অনেকে রয়েছে যারা আল্লাহতে, তোমাদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং তাদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, তাতে আল্লাহর নিকট বিনয়াবনত হয়ে বিশ্বাস স্থাপন করে---। (সূরা আলে ইমরান ৩:১৯৯) আর হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে, যখন নবী করীম (সাঃ) নাজাশী বাদশাহর মৃত্যুর সংবাদ পেলেন, তখন তিনি সাহাবা কেরাম (রাঃ)-কে বললেন, হাবশাতে তোমাদের ভাই নাজাশীর ইন্তেকাল হয়েছে, তাঁর জানাযার নামায আদায় কর। সুতরাং নবী করীম (সাঃ) মুসাল্লায় তাঁর গায়েবী জানাযার নামায আদায় করলেন। (বুখারী, মুসলিম) অন্য এক হাদীসে আহলে কিতাবদের ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী (সাঃ)-এর নবুঅতের প্রতি যে ঈমান আনয়ন করবে, তাকে দ্বিগুণ সওয়াবের অধিকারী করা হবে। (বুখারীঃ ইলম অধ্যায় ও নিকাহ অধ্যায়)

Al-Maaida 5:84Listen in Qur'an →
85

فَأَثَٰبَهُمُ ٱللَّهُ بِمَا قَالُوا۟ جَنَّٰتٍۢ تَجْرِى مِن تَحْتِهَا ٱلْأَنْهَٰرُ خَٰلِدِينَ فِيهَا ۚ وَذَٰلِكَ جَزَآءُ ٱلْمُحْسِنِينَ

অতঃপর তাদেরকে আল্লাহ এ উক্তির প্রতিদান স্বরূপ এমন উদ্যান দিবেন যার তলদেশে নির্ঝরিণীসমূহ প্রবাহিত হবে। তারা তন্মধ্যে চিরকাল অবস্থান করবে। এটাই সৎকর্মশীলদের প্রতিদান।

অতঃপর তাদের এ কথার জন্য আল্লাহ তাদের পুরস্কার নির্দিষ্ট করেছেন জান্নাত, যার নিম্নে নদীমালা প্রবাহিত। তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। এ সৎকর্মশীলদের পুরস্কার।

Al-Maaida 5:85Listen in Qur'an →
86

وَٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ وَكَذَّبُوا۟ بِـَٔايَٰتِنَآ أُو۟لَٰٓئِكَ أَصْحَٰبُ ٱلْجَحِيمِ

যারা কাফের হয়েছে এবং আমার নিদর্শনাবলীকে মিথ্যা বলেছে, তারাই দোযখী।

এবং যারা অবিশ্বাস করেছে ও আমার আয়াত (বাক্যসমূহ)কে মিথ্যাজ্ঞান করেছে, তারাই জাহান্নামবাসী।

Al-Maaida 5:86Listen in Qur'an →
87

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ لَا تُحَرِّمُوا۟ طَيِّبَٰتِ مَآ أَحَلَّ ٱللَّهُ لَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوٓا۟ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يُحِبُّ ٱلْمُعْتَدِينَ

হে মুমিনগণ, তোমরা ঐসব সুস্বাদু বস্তু হারাম করো না, যেগুলো আল্লাহ তোমাদের জন্য হালাল করেছেন এবং সীমা অতিক্রম করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমা অতিক্রমকারীদেরকে পছন্দ করেন না।

হে বিশ্বাসীগণ! আল্লাহ তোমাদের জন্য যে সব উৎকৃষ্ট বস্তু বৈধ করেছেন, সে সকলকে তোমরা অবৈধ করো না[১] এবং সীমালংঘন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালংঘনকারীদেরকে ভালবাসেন না।

[১] হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে, এক ব্যক্তি রসূল (সাঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, 'হে আল্লাহর রসূল! আমি যখনই গোশত ভক্ষণ করি, তখনই আমার মধ্যে কামোত্তেজনা অনুভব করি। তাই নিজের জন্য গোশতকে হারাম করে নিয়েছি।' যার ফলে এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। (সহীহ তিরমিযী, আলবানী ৩/৪৬) অনুরূপভাবে অবতীর্ণের এই কারণ ব্যতীত বিভিন্ন বর্ণনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, কিছু সংখ্যক সাহাবা সংসার ত্যাগ এবং ইবাদতের উদ্দেশ্যে কিছু বৈধ জিনিস হতে (যেমন বিবাহ করা হতে, ঘুমিয়ে রাত্রিযাপন করা হতে, দিনে পানাহার করা হতে) নিজেদেরকে দূরে রাখার চেষ্টা করেন। যখন নবী করীম (সাঃ) এ ব্যাপারে অবগত হলেন, তখন তাঁদেরকে এ কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ প্রদান করলেন। এমন কি উসমান বিন মাযঊন (রাঃ) তিনিও নিজের স্ত্রী থেকে দূরে থাকতেন। অতঃপর তাঁর স্ত্রীর অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁকেও তিনি তা করতে নিষেধ করলেন। (হাদীসগ্রন্থসমূহ দ্রষ্টব্য) সুতরাং এই আয়াত ও হাদীস দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ কর্তৃক হালাল যে কোন বস্তুকে নিজের উপর হারাম করে নেওয়া অথবা তা এমনিই বর্জন করা বৈধ নয়। চাহে তা খাদ্যদ্রব্য হোক অথবা পানীয় দ্রব্য, পোষাক-পরিচ্ছদ হোক অথবা আনন্দদায়ক কোন বস্তু, বৈধ কামনা-বাসনা হোক বা অন্য কিছু।

মাসআলাঃ কোন ব্যক্তি যদি নিজের জন্য কোন হালাল জিনিসকে (কসম ছাড়া) হারাম করে নেয়, তবে তা হারাম বলে গণ্য হবে না; একমাত্র স্ত্রী ব্যতীত। অবশ্য এ ব্যাপারে উলামাদের অভিমত হচ্ছে, তাকে কসমের কাফফারা দিতে হবে। আবার কেউ কেউ বলেন, কোন কিছুই লাগবে না। ইমাম শাওকানী বলেন, সহীহ হাদীস দ্বারা এই কথারই প্রমাণ হয় যে, নবী করীম (সাঃ) কোন ব্যক্তিকে এ ধরনের হারাম করাতে কসমের কাফফারা আদায়ের নির্দেশ প্রদান করেননি। ইমাম ইবনে কাসীর বলেন, 'এই আয়াতের পরে আল্লাহ কসমের কাফফারার কথা উল্লেখ করেছেন, যাতে বুঝা যায় যে, কোন হালাল জিনিসকে নিজের উপর হারাম করে নেওয়া কসমেরই অন্তর্ভুক্ত, যা কাফফারা আদায় করার দাবী রাখে।' কিন্তু এই দলীল সহীহ হাদীসের উপস্থিতিতে গ্রহণীয় নয়। সুতরাং সঠিক হল,যা ইমাম শাওকানী বলেছেন। (সউদী আরবের মুফতীগণের মতে কাফফারা দিতে হবে।)

Al-Maaida 5:87Listen in Qur'an →
88

وَكُلُوا۟ مِمَّا رَزَقَكُمُ ٱللَّهُ حَلَٰلًۭا طَيِّبًۭا ۚ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ ٱلَّذِىٓ أَنتُم بِهِۦ مُؤْمِنُونَ

আল্লাহ তা’য়ালা যেসব বস্তু তোমাদেরকে দিয়েছেন, তন্মধ্য থেকে হালাল ও পবিত্র বস্তু খাও এবং আল্লাহকে ভয় কর, যার প্রতি তোমরা বিশ্বাসী।

আল্লাহ তোমাদেরকে যে জীবিকা দান করেছেন তা হতে বৈধ ও উৎকৃষ্ট বস্তু ভক্ষণ কর এবং আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর প্রতি তোমরা সকলে বিশ্বাসী।

Al-Maaida 5:88Listen in Qur'an →
89

لَا يُؤَاخِذُكُمُ ٱللَّهُ بِٱللَّغْوِ فِىٓ أَيْمَٰنِكُمْ وَلَٰكِن يُؤَاخِذُكُم بِمَا عَقَّدتُّمُ ٱلْأَيْمَٰنَ ۖ فَكَفَّٰرَتُهُۥٓ إِطْعَامُ عَشَرَةِ مَسَٰكِينَ مِنْ أَوْسَطِ مَا تُطْعِمُونَ أَهْلِيكُمْ أَوْ كِسْوَتُهُمْ أَوْ تَحْرِيرُ رَقَبَةٍۢ ۖ فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلَٰثَةِ أَيَّامٍۢ ۚ ذَٰلِكَ كَفَّٰرَةُ أَيْمَٰنِكُمْ إِذَا حَلَفْتُمْ ۚ وَٱحْفَظُوٓا۟ أَيْمَٰنَكُمْ ۚ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ ٱللَّهُ لَكُمْ ءَايَٰتِهِۦ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ

আল্লাহ তোমাদেরকে পাকড়াও করেন না তোমাদের অনর্থক শপথের জন্যে; কিন্তু পাকড়াও করেন ঐ শপথের জন্যে যা তোমরা মজবুত করে বাধ। অতএব, এর কাফফরা এই যে, দশজন দরিদ্রকে খাদ্য প্রদান করবে; মধ্যম শ্রেনীর খাদ্য যা তোমরা স্বীয় পরিবারকে দিয়ে থাক। অথবা, তাদেরকে বস্তু প্রদান করবে অথবা, একজন ক্রীতদাস কিংবা দাসী মুক্ত করে দিবে। যে ব্যক্তি সামর্থ্য রাখে না, সে তিন দিন রোযা রাখবে। এটা কাফফরা তোমাদের শপথের, যখন শপথ করবে। তোমরা স্বীয় শপথসমূহ রক্ষা কর এমনিভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য স্বীয় নির্দেশ বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর।

আল্লাহ তোমাদেরকে দায়ী করবেন না তোমাদের নিরর্থক শপথের জন্য, কিন্তু যে সব শপথ তোমরা ইচ্ছাকৃতভাবে কর সেই সকলের জন্য তিনি তোমাদেরকে দায়ী করবেন।[১] অতঃপর এর কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত) হল, দশজন দরিদ্রকে মধ্যম ধরনের খাদ্য দান করা; যা তোমরা তোমাদের পরিজনদেরকে খেতে দাও,[২] অথবা তাদেরকে বস্ত্র দান করা,[৩] কিংবা একটি দাস মুক্ত করা।[৪] কিন্তু যার (এ সবে) সামর্থ্য নেই, তার জন্য তিন দিন রোযা পালন করা।[৫] তোমরা শপথ করলে এটিই হল তোমাদের শপথের প্রায়শ্চিত্ত। তোমরা তোমাদের শপথ রক্ষা কর। এভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর নিদর্শন বিশদভাবে বর্ণনা করেন, যেন তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর।

[১] قسم (কসম) এর আরবী প্রতিশব্দ حلف বা يمين আর বহুবচন أحلاف বা أيمان যা শপথ অর্থে ব্যবহার হয়। এই কসম বা শপথ তিন ভাগে বিভক্ত; (ক) لغو (খ) غموس (গ) مُعقَّدة (ক) لغو (নিরর্থক বা নিরুদ্দেশ) এমন কসম, যা মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে এবং কথায় কথায় ইচ্ছা, উদ্দেশ্য ও প্রয়োজন ছাড়াই ব্যবহার করে। (এমন কসম খাওয়া তার মুদ্রাদোষে পরিণত হয়।) এই ধরনের কসমের কোন কাফফারা বা ধর-পাকড় নেই। (খ) غموس (মিথ্যা কসম) যা মানুষ ধোঁকা দেওয়া ও প্রতারণা করার জন্য করে থাকে। এটা মহাপাপ; বরং অতি মহাপাপ। কিন্তু এ ধরনের কসমের কোন কাফফারা নেই। (গ) معقَّدة ঐ কসমকে বলা হয়, যা মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে এবং নিয়ত সহকারে নিজের কথার সত্যতার তাকীদ ও তা পাকা করার জন্য ব্যবহার করে। যদি কেউ এ ধরনের কসম ভঙ্গ করে, তাহলে তাকে কাফফারা আদায় করতে হবে। এই কাফফারার কথা এই আয়াতের পরের অংশে উল্লেখ করা হয়েছে।

[২] (কসমের কাফফারায়) প্রদেয় খাদ্যের পরিমাণ সম্বন্ধে কোন সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়নি। আর এই জন্য উলামাদের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়েছে। অবশ্য ইমাম শাফেয়ী (রঃ) রমযান মাসের রোযা অবস্থায় স্ত্রী-সহবাস করার ফলে যে পরিমাণ কাফফারা দেওয়ার কথা হাদীসে উল্লিখিত হয়েছে তা দলীলরূপে পেশ করে বলেন, প্রত্যেক মিসকীনকে এক 'মুদ' (প্রায় ৬২৫ গ্রাম) খাদ্য দান করতে হবে। কেননা নবী করীম (সাঃ) ঐ ব্যক্তিকে সহবাসের কাফফারা আদায় করার জন্য ১৫ সা' (সাড়ে ৩৭ কিলো) খেজুর দিয়েছিলেন, যা ৬০ জন মিসকীনের মাঝে বণ্টন করতে বলা হয়েছিল। আর এক সা' সমান চার মুদ (আড়াই কিলো) হয়। এই হিসাবে ১০ মিসকীনকে ১০ মুদ করে (অর্থাৎ প্রায় সওয়া ৬ কিলো) খাদ্যদ্রব্য কাফফারা হিসাবে প্রদান করতে হবে। ((মতান্তরে মাথাপিছু দু মুদ (সওয়া এক কিলো) খাদ্য দান করতে হবে। যেহেতু কা'ব বিন উজরার ইহরাম অবস্থায় মাথায় উকুন হলে মহানবী (সাঃ) তাঁকে বলেন, "তোমার মাথা মুন্ডন করে ফেল এবং তিন দিন রোযা রাখ, কিংবা প্রত্যেক মিসকীনকে মাথাপিছু অর্ধ সা' (মোটামুটি সওয়া এক কিলো) করে ছয়টি মিসকীনকে খাদ্য দান কর, কিংবা একটি ছাগল কুরবানী কর।" (বুখারী ১৮১৬, মুসলিম ১২০১নং))

[৩] পোশাক বা বস্ত্রদানের ব্যাপারেও মতানৈক্য রয়েছে। বাহ্যতঃ এর ভাবার্থ এক জোড়া এমন কাপড়, যা পরিধান করে মানুষ নামায আদায় করতে পারে। আবার কোন কোন উলামা খাদ্য ও বস্ত্রদান উভয় ক্ষেত্রেই সমাজের প্রচলিত নিয়ম-নীতিকে অনুসরণীয় মনে করেন।

[৪] কোন কোন উলামা ভুল করে হত্যা করার ফলে যে রক্তপণ দিতে হয় তার উপর অনুমান করে মুক্তিযোগ্য দাস-দাসীর ক্ষেত্রে ঈমানের শর্তারোপ করেছেন। কিন্তু ইমাম শওকানী বলেন, আয়াতটি ব্যাপক, আর এর মধ্যে মুমিন ও কাফের উভয়ই শামিল।

[৫] অর্থাৎ, উল্লিখিত তিনটি এখতিয়ারের মধ্যে একটি কেউ যদি পালন করতে না পারে, তাহলে তাকে তিন দিন রোযা রাখতে হবে। আর এটাই তার কসমের কাফফারা হয়ে যাবে। (উক্ত তিনটির মধ্যে একটিতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও রোযা রাখলে তা গ্রহণযোগ্য নয়।) আবার রোযা রাখার ব্যাপারেও উলামাদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে; কেউ বলেন, ধারাবাহিকভাবে পরপর তিনদিন রোযা রাখতে হবে। আবার কেউ বলেন; একদিন পর পর বা বিলম্ব করে (অর্থাৎ একটি রাখার পর বিলম্ব করে তারপর আরেকটি রাখতে পারে।) উভয় অবস্থা জায়েয বা বৈধ।

Al-Maaida 5:89Listen in Qur'an →
90

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ إِنَّمَا ٱلْخَمْرُ وَٱلْمَيْسِرُ وَٱلْأَنصَابُ وَٱلْأَزْلَٰمُ رِجْسٌۭ مِّنْ عَمَلِ ٱلشَّيْطَٰنِ فَٱجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

হে মুমিনগণ, এই যে মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য-নির্ধারক শরসমূহ এসব শয়তানের অপবিত্র কার্য বৈ তো নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাক-যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও।

হে বিশ্বাসীগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্যনির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।[১]

[১] এটি মদের ব্যাপারে তৃতীয় নির্দেশ। প্রথম ও দ্বিতীয় নির্দেশে পরিষ্কারভাবে নিষেধ করা হয়নি। কিন্তু এখানে মদ ও তার সাথে জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্যনির্ণায়ক তীরকে অপবিত্র বা ঘৃণ্য বস্তু ও শয়তানী বিষয় বলে স্পষ্ট ভাষায় তা থেকে দূরে থাকার আদেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এ আয়াতে মদ ও জুয়ার অতিরিক্ত অপকারিতা বর্ণনা করে প্রশ্ন করা হয়েছে, তবুও কি তোমরা বিরত হবে না? এ থেকে উদ্দেশ্য ঈমানদারকে পরীক্ষা করা। সুতরাং যাঁরা মু'মিন ছিলেন, তাঁরা আল্লাহর উদ্দেশ্য বুঝে গেলেন এবং তা যে নিশ্চিত হারাম, তা মেনে নিয়ে বললেন, 'আমরা বিরত হলাম, হে আমাদের প্রতিপালক!' (আহমাদ ২/৩৫১) কিন্তু সাম্প্রতিক কালের তথাকথিত কিছু 'চিন্তাবিদ' বলেন যে, 'মদ হারাম কোথায় বলা হয়েছে?!' এমন চিন্তা-বুদ্ধির জন্য তো রোদন করতে হয়। মদকে অপবিত্র বা ঘৃণ্য বস্তু ও শয়তানী বিষয় গণ্য করে তা হতে দূরে থাকতে আদেশ দেওয়া এবং দূরে থাকাকে সফলতার কারণ গণ্য করা ঐ 'মুজতাহিদ'দের নিকট হারাম হওয়ার জন্য (দলীল হিসাবে) যথেষ্ট নয়! যার মতলব হল, আল্লাহর নিকট অপবিত্র বস্তুও বৈধ, শয়তানী কাজও বৈধ। যে জিনিস থেকে আল্লাহ দূরে থাকতে বলেন, সে জিনিসও হালাল। যে কাজ সম্পাদন করাকে অসফলতা ও বর্জন করাকে সফলতার কারণ গণ্য করা হয়, তাও বৈধ! সুতরাং 'ইন্না লিল্লাহি অইন্না ইলাইহি রাজিঊন।'

Al-Maaida 5:90Listen in Qur'an →

Commentary: Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation. Qur'an text and translation via AlQuran Cloud.