Muslim99Muslim99
← Tafsir library

5. Al-Maaida

The Table · Medinan · 120 ayahs

سُورَةُ المَائـِدَةِ

Reading Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation

Ayahs 61–70 of 120

61

وَإِذَا جَآءُوكُمْ قَالُوٓا۟ ءَامَنَّا وَقَد دَّخَلُوا۟ بِٱلْكُفْرِ وَهُمْ قَدْ خَرَجُوا۟ بِهِۦ ۚ وَٱللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا كَانُوا۟ يَكْتُمُونَ

যখন তারা তোমাদের কাছে আসে তখন বলে দাওঃ আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি। অথচ তারা কুফর নিয়ে এসেছিল এবং কুফর নিয়েই প্রস্থান করেছে। তারা যা গোপন করত, আল্লাহ তা খুব জানেন।

তারা যখন তোমাদের নিকট আসে তখন বলে, ‘আমরা বিশ্বাস করি’, কিন্তু তারা অবিশ্বাসসহ আসে এবং তা নিয়েই বার হয়ে যায়। আর তারা যা গোপন করে, আল্লাহ তা খুব ভালোভাবে অবহিত।[১]

[১] এখানে মুনাফিকদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, যারা নবী (সাঃ)-এর নিকট কুফরী অবস্থায় উপস্থিত হয় এবং কুফরী অবস্থাতেই প্রস্থান করে, আর নবী (সাঃ)-এর সাহচর্য, তাঁর নসীহত ও উপদেশ কোন কিছুই তাদের উপর প্রভাবশীল হয় না। কেননা তাদের হৃদয় কুফরীর কলুষতায় পরিপূর্ণ। আর নবী (সাঃ)-এর নিকট তাদের উপস্থিতির উদ্দেশ্য হিদায়াত ও উপদেশ গ্রহণ নয়; বরং প্রবঞ্চনা ও প্রতারণাই তাদের উদ্দেশ্য। সুতরাং এরূপ উপস্থিতিতে উপকার কিভাবে সম্ভব?

Al-Maaida 5:61Listen in Qur'an →
62

وَتَرَىٰ كَثِيرًۭا مِّنْهُمْ يُسَٰرِعُونَ فِى ٱلْإِثْمِ وَٱلْعُدْوَٰنِ وَأَكْلِهِمُ ٱلسُّحْتَ ۚ لَبِئْسَ مَا كَانُوا۟ يَعْمَلُونَ

আর আপনি তাদের অনেককে দেখবেন যে, দৌড়ে দৌড়ে পাপে, সীমালঙ্ঘনে এবং হারাম ভক্ষনে পতিত হয়। তারা অত্যন্ত মন্দ কাজ করছে।

আর তাদের অনেককেই তুমি পাপে, সীমালংঘনে ও অবৈধ ভক্ষণে তৎপর দেখবে। তারা যা করে, নিশ্চয় তা নিকৃষ্ট!

Al-Maaida 5:62Listen in Qur'an →
63

لَوْلَا يَنْهَىٰهُمُ ٱلرَّبَّٰنِيُّونَ وَٱلْأَحْبَارُ عَن قَوْلِهِمُ ٱلْإِثْمَ وَأَكْلِهِمُ ٱلسُّحْتَ ۚ لَبِئْسَ مَا كَانُوا۟ يَصْنَعُونَ

দরবেশ ও আলেমরা কেন তাদেরকে পাপ কথা বলতে এবং হারাম ভক্ষণ করতে নিষেধ করে না? তারা খুবই মন্দ কাজ করছে।

রাব্বানী (আল্লাহ-ভক্ত)গণ ও পন্ডিতগণ কেন তাদেরকে পাপ-কথা বলতে ও অবৈধ ভক্ষণ করতে নিষেধ করে না? এরা যা করে নিশ্চয় তা নিকৃষ্ট! [১]

[১] এখানে উলামা, মাশায়েখ, আবেদ ও ধর্মভীরু ব্যক্তিদেরকে ভৎর্সনা করা হয়েছে যে, সাধারণ মানুষদের বেশীর ভাগ লোক তোমাদের সামনে পাপাচার, অপকর্ম এবং হারামখোরীতে লিপ্ত; কিন্তু তোমরা তাদেরকে নিষেধ কর না। এই অবস্থায় তোমাদের নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করা খুব বড় অপরাধ। এর দ্বারা পরিষ্কার হয় যে, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বাধা দান করার কত গুরুত্বপূর্ণ এবং তা পরিত্যাগ করা কত ভয়ানক ও কঠিন শাস্তিযোগ্য। যেমন বহু হাদীসেও এ বিষয়টি বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে।

Al-Maaida 5:63Listen in Qur'an →
64

وَقَالَتِ ٱلْيَهُودُ يَدُ ٱللَّهِ مَغْلُولَةٌ ۚ غُلَّتْ أَيْدِيهِمْ وَلُعِنُوا۟ بِمَا قَالُوا۟ ۘ بَلْ يَدَاهُ مَبْسُوطَتَانِ يُنفِقُ كَيْفَ يَشَآءُ ۚ وَلَيَزِيدَنَّ كَثِيرًۭا مِّنْهُم مَّآ أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ طُغْيَٰنًۭا وَكُفْرًۭا ۚ وَأَلْقَيْنَا بَيْنَهُمُ ٱلْعَدَٰوَةَ وَٱلْبَغْضَآءَ إِلَىٰ يَوْمِ ٱلْقِيَٰمَةِ ۚ كُلَّمَآ أَوْقَدُوا۟ نَارًۭا لِّلْحَرْبِ أَطْفَأَهَا ٱللَّهُ ۚ وَيَسْعَوْنَ فِى ٱلْأَرْضِ فَسَادًۭا ۚ وَٱللَّهُ لَا يُحِبُّ ٱلْمُفْسِدِينَ

আর ইহুদীরা বলেঃ আল্লাহর হাত বন্ধ হয়ে গেছে। তাদেরই হাত বন্ধ হোক। একথা বলার জন্যে তাদের প্রতি অভিসম্পাত। বরং তাঁর উভয় হস্ত উম্মুক্ত। তিনি যেরূপ ইচ্ছা ব্যয় করেন। আপনার প্রতি পলনকর্তার পক্ষ থেকে যে কালাম অবর্তীণ হয়েছে, তার কারণে তাদের অনেকের অবাধ্যতা ও কুফর পরিবর্ধিত হবে। আমি তাদের পরস্পরের মধ্যে কেয়ামত পর্যন্ত শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চারিত করে দিয়েছি। তারা যখনই যুদ্ধের আগুন প্রজ্জ?482;িত করে, আল্লাহ তা নির্বাপিত করে দেন। তারা দেশে অশান্তি উৎপাদন করে বেড়ায়। আল্লাহ অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদেরকে পছন্দ করেন না।

ইয়াহুদীগণ বলে, ‘আল্লাহর হাত সংকুচিত।’[১] তাদের হাত সংকুচিত হোক এবং তারা যা বলে, তার জন্য তারা অভিশপ্ত হোক। বরং আল্লাহর উভয় হস্তই মুক্ত, যেভাবে ইচ্ছা তিনি দান করে থাকেন। তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে যা তোমার প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে, তা তাদের অনেকের ধর্মদ্রোহিতা ও অবিশ্বাসই বৃদ্ধি করবে। তাদের মধ্যে আমি কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চার করেছি। যতবার তারা যুদ্ধের অগ্নি প্রজ্বলিত করে, ততবার আল্লাহ তা নির্বাপিত করেন[২] এবং তারা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজ করে বেড়ায়।[৩] বস্তুতঃ আল্লাহ ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্তদেরকে ভালবাসেন না।

[১] এখানে ঐ কথারই পুনারাবৃত্তি করা হয়েছে, যা সূরা আলে ইমরানের ৩:১৮১ নং আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা যখন নিজের রাস্তায় খরচ করার জন্য উৎসাহিত করলেন এবং এটাকে তিনি 'উত্তম ঋণদান' বলে অভিহিত করলেন, তখন ইয়াহুদীরা বলল, 'আল্লাহ তো ফকীর! লোকদের নিকট ঋণ চাচ্ছে।' প্রকৃতপক্ষে তারা মহান আল্লাহর বাচন-ভঙ্গির নিগূঢ় সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে পারল না। অর্থাৎ, সমস্ত কিছুই আল্লাহর দান এবং আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদ থেকে কিছু অংশ আল্লাহর রাস্তায় খরচ করা কোন ঋণ নয়। কিন্তু তাঁর এটা পরিপূর্ণ অনুগ্রহ যে, তিনি এর বিনিময়ে খুব বেশী প্রতিদান দিয়ে থাকেন। যেমন একটি দানার পরিবর্তে সাত সাতশো দানা পর্যন্ত বৃদ্ধি করে দেন। আর এটাকেই 'উত্তম ঋণ' বলে ভাষায় প্রকাশ করা হয়েছে যে, যত বেশী তোমরা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করবে, তার থেকে অনেক বেশী তোমাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। مغلولة শব্দের অর্থ بخيلة কৃপণ। অর্থাৎ, ইয়াহুদীদের আসল উদ্দেশ্য এটা ছিল না যে, আল্লাহর হাত প্রকৃতপক্ষে বাঁধা; বরং তাদের উদ্দেশ্য ছিল, তাঁর হাত খরচ করা হতে বিরত আছে। (ইবনে কাসীর) আল্লাহ বলেন, আসলে তাদেরই হাত বাঁধা আছে। অর্থাৎ, কৃপণতা তাদেরই অভ্যাস। আর আল্লাহর দুই হাতই বন্ধনমুক্ত; তিনি যেভাবে ইচ্ছা খরচ করেন। তিনি বিশাল অনুগ্রহশীল, মহাদাতা। সমস্ত ধন-ভান্ডার তাঁরই হাতে রয়েছে এবং তিনি সকল সৃষ্টজীবের সমস্ত রকমের অভাব ও প্রয়োজন পূরণ করে থাকেন। আমাদের রাতে-দিনে, ঘরে-সফরে এবং অন্যান্য সকল অবস্থায় সমস্ত রকমের অভাব ও প্রয়োজন পূরণ করেন। আল্লাহ বলেন, {وَآتَاكُم مِّن كُلِّ مَا سَأَلْتُمُوهُ وَإِن تَعُدُّواْ نِعْمَتَ اللّهِ لاَ تُحْصُوهَا إِنَّ الإِنسَانَ لَظَلُومٌ كَفَّارٌ} অর্থাৎ, তিনি তোমাদেরকে প্রত্যেকটি সেই জিনিস দিয়েছেন, যা তোমরা তাঁর নিকট চেয়েছ। তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ গণনা করলে ওর সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবে না; মানুষ অবশ্যই অতি মাত্রায় সীমালংঘনকারী অকৃতজ্ঞ। (সূরা ইবরাহীম ১৪:৩৪) হাদীস শরীফেও বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহর রসূল (সাঃ) বলেন, "আল্লাহর দক্ষিণহস্ত পরিপূর্ণ, তিনি দিবারাত্র খরচ করেন, তাঁর ভান্ডার কোন রকম হ্রাস পায় না। লক্ষ্য কর, যখন থেকে তিনি আসমান-যমীন সৃষ্টি করেছেন, তখন থেকে অদ্যাবধি খরচ করে আসছেন। কিন্তু তাঁর ধনভান্ডারে কোন ঘাটতি হয়নি।" (বুখারী ও মুসলিম)[২] অর্থাৎ, যখন তারা তোমার বিরুদ্ধে কোন ষড়যন্ত্র করে অথবা যুদ্ধ করার জন্য কোন উপায় অনুসন্ধান করে, তখনই আল্লাহ তাদের সেই চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেন এবং তাদের সেই চক্রান্ত তাদের উপরেই পতিত করেন। ফলে তারা পরের জন্য কুয়া খুঁড়ে, কিন্তু নিজেরাই তাতে ডুবে মরে![৩] তাদের দ্বিতীয় অভ্যাস হচ্ছে যে, তারা সব সময় পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করার মত নীচ ও মন্দ প্রচেষ্টায় অব্যাহত থাকে, অথচ আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদেরকে পছন্দ করেন না।

Al-Maaida 5:64Listen in Qur'an →
65

وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ ٱلْكِتَٰبِ ءَامَنُوا۟ وَٱتَّقَوْا۟ لَكَفَّرْنَا عَنْهُمْ سَيِّـَٔاتِهِمْ وَلَأَدْخَلْنَٰهُمْ جَنَّٰتِ ٱلنَّعِيمِ

আর যদি আহলে-কিতাবরা বিশ্বাস স্থাপন করত এবং খোদাভীতি অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের মন্দ বিষয়সমূহ ক্ষমা করে দিতাম এবং তাদেরকে নেয়ামতের উদ্যানসমূহে প্রবিষ্ট করতাম।

ঐশীগ্রন্থধারিগণ যদি বিশ্বাস করত ও সংযমী হত,[১] তাহলে আমি তাদের দোষ অপনোদন করতাম এবং তাদেরকে সুখদায়ক উদ্যানে প্রবেশাধিকার দান করতাম।

[১] অর্থাৎ আল্লাহর নিকট যে ঈমান বাঞ্ছনীয়, তার মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হল, মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর রিসালাতের প্রতি ঈমান আনয়ন করা। যেমনটি ইতিপূর্বে সমস্ত নাযিলকৃত গ্রন্থে এই একই নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ-ভীতি অবলম্বন করা ও তাঁর অবাধ্যাচরণ থেকে দূরে থাকার মধ্যে সব থেকে বড় কুকর্ম হল সেই শিরক, যাতে তারা পুরোপুরি ডুবে আছে এবং সেই অস্বীকার, যা শেষ রসূলের সাথে তারা অবলম্বন করেছে।

Al-Maaida 5:65Listen in Qur'an →
66

وَلَوْ أَنَّهُمْ أَقَامُوا۟ ٱلتَّوْرَىٰةَ وَٱلْإِنجِيلَ وَمَآ أُنزِلَ إِلَيْهِم مِّن رَّبِّهِمْ لَأَكَلُوا۟ مِن فَوْقِهِمْ وَمِن تَحْتِ أَرْجُلِهِم ۚ مِّنْهُمْ أُمَّةٌۭ مُّقْتَصِدَةٌۭ ۖ وَكَثِيرٌۭ مِّنْهُمْ سَآءَ مَا يَعْمَلُونَ

যদি তারা তওরাত, ইঞ্জিল এবং যা প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তাদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে, পুরোপুরি পালন করত, তবে তারা উপর থেকে এবং পায়ের নীচ থেকে ভক্ষণ করত। তাদের কিছুসংখ্যক লোক সৎপথের অনুগামী এবং অনেকেই মন্দ কাজ করে যাচ্ছে।

আর যদি তারা তওরাত, ইঞ্জীল ও যা তাদের প্রতিপালকের নিকট হতে তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে তাতে প্রতিষ্ঠিত থাকত,[১] তাহলে তারা তাদের উপর দিক (আকাশ) ও পায়ের নিচের দিক (পৃথিবী) হতে খাদ্য লাভ করত।[২] তাদের মধ্যে এক দল রয়েছে যারা মধ্যপন্থী, কিন্তু তাদের অধিকাংশ যা করে, তা নিকৃষ্ট! [৩]

[১] তাওরাত ও ইঞ্জীলের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার উদ্দেশ্য হচ্ছে, তার বিধানের অনুসরণ করা, যা তাদেরকে প্রদান করা হয়েছে। আর সেই বিধানের মধ্যে একটা এও ছিল যে, শেষ নবীর প্রতি তারা ঈমান আনয়ন করবে। وما أنزل এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে, সমস্ত আসমানী গ্রন্থের উপর ঈমান আনয়ন করা; আর এর মধ্যে কুরআন কারীমও শামিল। সুতরাং আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে, তারা যেন ইসলাম গ্রহণ করে।[২] 'উপর-নীচের' কথা অতিশয়োক্তি রূপে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, বেশী বেশী এবং বিভিন্ন ধরনের রুযী আল্লাহ তাদেরকে দান করতেন। অথবা 'উপর' বলতে আসমানকে বুঝানো হয়েছে, আর তার অর্থ হচ্ছে, সময় মত আসমান হতে বৃষ্টি বর্ষণ করতেন। আর 'পায়ের নিচে' বলতে যমীনকে বুঝানো হয়েছে, আর তার অর্থ হচ্ছে; যমীন এই পানি নিজের মধ্যে শোষণ করে বিভিন্ন ধরনের ফসলাদি উৎপাদন করত। পরিণামে তাদের জীবন সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে পরিপূর্ণ হয়ে যেত। যেমন মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেন, {وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُواْ وَاتَّقَواْ لَفَتَحْنَا عَلَيْهِم بَرَكَاتٍ مِّنَ السَّمَاء وَالأَرْضِ} অর্থাৎ, জনপদবাসীরা যদি ঈমান আনত ও তাকওয়া অবলম্বন করত, তাহলে অবশ্যই আমি তাদের উপর আসমান ও যমীনের বরকত নাযিল করতাম। (সূরা আ'রাফ ৭:৯৬ আয়াত)[৩] কিন্তু তাদের বেশীর ভাগ মানুষ ঈমানের রাস্তা অবলম্বন করল না এবং তারা কুফরীর উপরেই অটল থাকল, আর রিসালাতে মুহাম্মাদীকে অস্বীকার করার ব্যাপারে অবিচল থাকল। এই অটল থাকা ও অস্বীকার করাকে 'নিকৃষ্ট কর্ম' বলে আখ্যায়ন করা হয়েছে। মধ্যপন্থী দল থেকে উদ্দেশ্য হচ্ছে, আব্দুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ) এর মত ৮-৯ জন সাহাবা, যাঁরা মদীনার ইয়াহুদীদের মধ্য হতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

Al-Maaida 5:66Listen in Qur'an →
67

۞ يَٰٓأَيُّهَا ٱلرَّسُولُ بَلِّغْ مَآ أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ ۖ وَإِن لَّمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُۥ ۚ وَٱللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ ٱلنَّاسِ ۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهْدِى ٱلْقَوْمَ ٱلْكَٰفِرِينَ

হে রসূল, পৌছে দিন আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে। আর যদি আপনি এরূপ না করেন, তবে আপনি তাঁর পয়গাম কিছুই পৌছালেন না। আল্লাহ আপনাকে মানুষের কাছ থেকে রক্ষা করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ কাফেরদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না।

হে রসূল! তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তা প্রচার কর। যদি তা না কর, তবে তো তুমি তাঁর বার্তা প্রচার করলে না।[১] আল্লাহ তোমাকে মানুষ হতে রক্ষা করবেন।[২] বস্তুতঃ আল্লাহ অবিশ্বাসী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।

[১] এই আদেশের উদ্দেশ্য হচ্ছে যে, যা কিছু তোমার উপর অবতীর্ণ হয়েছে, তাতে কম-বেশী (সংযোজন-বিয়োজন) না করে এবং কোন নিন্দুকের নিন্দাকে পরোয়া না করে, তুমি মানুষের নিকট পৌঁছে দাও। সুতরাং তিনি এমনটিই করেছিলেন। আয়েশা (রাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি এই ধারণা পোষণ করে যে, নবী (সাঃ) কিছু জিনিস গোপন রেখেছেন, (প্রকাশ বা প্রচার করেননি), সে ব্যক্তি নিঃসন্দেহে মিথ্যাবাদী। (বুখারী ৪৮৫৫নং) একদা আলী (রাঃ)-কে প্রশ্ন করা হল যে, আপনাদের নিকট কুরআন ব্যতীত অহীর মাধ্যমে অবতীর্ণকৃত কোন জিনিস আছে কি? উত্তরে তিনি কসম করে বললেন, না। তবে কুরআন উপলব্ধি করার জ্ঞান, আল্লাহ যাকে দান করেন। (বুখারী) বিদায় হজ্জের সময় এক লক্ষ অথবা এক লক্ষ চল্লিশ হাজার সাহাবার সামনে মহানবী (সাঃ) বলেছিলেন, "তোমরা আমার ব্যাপারে কি বলবে?" তাঁরা সকলেই বলেছিলেন যে,'আমরা সাক্ষ্য দেব যে, (আপনার উপর যে গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয়েছিল তা) পৌঁছে দিয়েছেন, (আমানত) আদায় করে দিয়েছেন এবং (উম্মতের জন্য) হিতাকাঙ্ক্ষা ও নসীহত করেছেন।' মহানবী (সাঃ) আসমানের দিকে আঙ্গুল তুলে ইঙ্গিত করে তিনবার বললেন, "হে আল্লাহ! আমি কি পৌঁছে দিয়েছি?" অথবা তিনি তিনবার বললেন, "আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাকো।" (মুসলিম) অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমি তোমার বাণী পৌঁছে দিয়েছি। তুমি সাক্ষী থাকো, তুমি সাক্ষী থাকো, তুমি সাক্ষী থাকো। (এখান থেকে তাদের কথাও মিথ্যা প্রমাণিত হয়, যারা বলে কুরআন ৪০, ৬০ অথবা ৯০ পারা; সেগুলো কারো কলবে গুপ্ত আছে। অথবা শরীয়তের ইলম ছাড়া গুপ্ত ইলম বলে কিছু আছে। -সম্পাদক)

[২] এই নিরাপত্তা বিধান ও রক্ষণাবেক্ষণ আল্লাহ তাআলা অলৌকিক পদ্ধতি দ্বারা ও পার্থিব কিছু উপায়-উপকরণ দ্বারাও করেছেন। পার্থিব বাহ্যিক উপকরণের মধ্যে এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার বহু পূর্বে আল্লাহ তাআলা রসূল (সাঃ)-এর চাচা আবু তালেবের অন্তরে প্রকৃতি ও স্বভাবগত ভালোবাসা দান করেন এবং তিনি তাঁর নিরাপত্তা বিধান ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে থাকেন। তাঁর কুফরীর উপর প্রতিষ্ঠিত থাকাটাও সম্ভবতঃ উক্ত উপকরণের একটি অংশ। কেননা, তিনি যদি মুসলমান হয়ে যেতেন, তাহলে সম্ভবতঃ কুরাইশদের নেতৃবর্গের অন্তরে তাঁর প্রতি সেই সমীহ ও সম্মান অবশিষ্ট থাকত না, যা তাঁর স্বধর্মাবলম্বী থাকার কারণে শেষ পর্যন্ত ছিল। অতঃপর তাঁর মৃত্যুর পর আল্লাহ তাআলা কিছু কুরাইশদের কিছু নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে এবং পরবর্তীতে মদীনার আনসারগণের মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করেন। তারপর যখন এই আয়াত অবতীর্ণ হয়, তখন তিনি বাহ্যিক সুরক্ষা ব্যবস্থা (দেহরক্ষী বা পাহারাদার ইত্যাদি) উঠিয়ে দেন। যার ফলশ্রুতিতে তাঁকে কঠিন বিপদের সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁকে রক্ষা করেন ও নিরাপত্তা দেন। সুতরাং অহী দ্বারা আল্লাহ তাআলা তাঁকে ইয়াহুদীদের বিভিন্ন কুচক্রান্তের কথা যথাসময়ে অবহিত করেন। এমনিভাবে কঠিন বিপদ ও তুমুল যুদ্ধের সময় কাফেরদের ভয়ঙ্কর আক্রমণ হতে রক্ষা করেন। এ হল আল্লাহর কুদরত। তিনি যা ইচ্ছা তকদীর নির্ধারিত করেন। তাঁর তকদীর ও ফায়সালা রদ্দ করার মত ক্ষমতা কারো নেই। তাঁর বিরুদ্ধে বিজয়ী কেউ নেই। তিনিই পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ।

Al-Maaida 5:67Listen in Qur'an →
68

قُلْ يَٰٓأَهْلَ ٱلْكِتَٰبِ لَسْتُمْ عَلَىٰ شَىْءٍ حَتَّىٰ تُقِيمُوا۟ ٱلتَّوْرَىٰةَ وَٱلْإِنجِيلَ وَمَآ أُنزِلَ إِلَيْكُم مِّن رَّبِّكُمْ ۗ وَلَيَزِيدَنَّ كَثِيرًۭا مِّنْهُم مَّآ أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ طُغْيَٰنًۭا وَكُفْرًۭا ۖ فَلَا تَأْسَ عَلَى ٱلْقَوْمِ ٱلْكَٰفِرِينَ

বলে দিনঃ হে আহলে কিতাবগণ, তোমরা কোন পথেই নও, যে পর্যন্ত না তোমরা তওরাত, ইঞ্জিল এবং যে গ্রন্থ তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে তাও পুরোপুরি পালন না কর। আপনার পালনকর্তার কাছ থেকে আপনার প্রতি যা অবর্তীণ হয়েছে, তার কারণে তাদের অনেকের অবাধ্যতা ও কুফর বৃদ্ধি পাবে। অতএব, এ কাফের সম্প্রদায়ের জন্যে দুঃখ করবেন না।

বল, ‘হে ঐশীগ্রন্থধারিগণ! তওরাত, ইঞ্জীল ও যা তোমার প্রতিপলাকের নিকট হতে তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে, তোমরা তা প্রতিষ্ঠিত না করা পর্যন্ত তোমাদের কোন ভিত্তি নেই।’ তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তা তাদের অনেকের ধর্মদ্রোহিতা ও অবিশ্বাসই বৃদ্ধি করবে।[১] সুতরাং তুমি অবিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য দুঃখ করো না।

[১] এই হিদায়াত ও ভ্রষ্টতা সেই নিয়ম মোতাবেক হয়ে থাকে যা আল্লাহর ব্যাপক নিয়ম। অর্থাৎ, যেমন কিছু জিনিস ও কর্মের ফলে ঈমানদারদের ঈমান, সত্যায়ন, নেক আমল ও উপকারী ইলম বৃদ্ধি পায়, অনুরূপ পাপ এবং তার উপর অটল থাকার ফলে কুফরী ও অবাধ্যতা বৃদ্ধি পায়। আর এই বিষয়টিকেই মহান আল্লাহ কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় উল্লেখ করেছেন, যেমন {قُلْ هُوَ لِلَّذِينَ آمَنُوا هُدًى وَشِفَاء وَالَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ فِي آذَانِهِمْ وَقْرٌ وَهُوَ عَلَيْهِمْ عَمًى أُوْلٰئِكَ يُنَادَوْنَ مِن مَّكَانٍ بَعِيدٍ} অর্থাৎ, (হে নবী) বল, বিশ্বাসীদের জন্য এ পথনির্দেশক ও ব্যাধির প্রতিকার। কিন্তু যারা অবিশ্বাসী তাদের কর্ণে রয়েছে বধিরতা এবং কুরআন হবে এদের জন্য অন্ধকারস্বরূপ। এরা এমন যে, যেন এদেরকে বহু দূর হতে আহবান করা হয়। (সূরা হা-মীম সাজদাহ ৪১:৪৪) তিনি অন্যত্র বলেন, {وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاء وَرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ وَلاَ يَزِيدُ الظَّالِمِينَ إَلاَّ خَسَارًا} অর্থাৎ, আমি কুরআন অবতীর্ণ করি, যা মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও দয়া; কিন্তু তা যালেমদের ক্ষতিই বৃদ্ধি করে। (সূরা বানী ইসরাঈল ১৭:৮২)

Al-Maaida 5:68Listen in Qur'an →
69

إِنَّ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ وَٱلَّذِينَ هَادُوا۟ وَٱلصَّٰبِـُٔونَ وَٱلنَّصَٰرَىٰ مَنْ ءَامَنَ بِٱللَّهِ وَٱلْيَوْمِ ٱلْءَاخِرِ وَعَمِلَ صَٰلِحًۭا فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ

নিশ্চয় যারা মুসলমান, যারা ইহুদী, ছাবেয়ী বা খ্রীষ্টান, তাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে আল্লাহর প্রতি, কিয়ামতের প্রতি এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে, তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিত হবে না।

নিশ্চয় যারা বিশ্বাসী, ইয়াহুদী, স্বাবেয়ী ও খ্রিষ্টান; তাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করবে এবং সৎকাজ করবে, তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।[১]

[১] এটা ঐ বিষয়ই যা সূরা বাক্বারার ২:৬২ নং আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে, সেখানে দেখুন।

Al-Maaida 5:69Listen in Qur'an →
70

لَقَدْ أَخَذْنَا مِيثَٰقَ بَنِىٓ إِسْرَٰٓءِيلَ وَأَرْسَلْنَآ إِلَيْهِمْ رُسُلًۭا ۖ كُلَّمَا جَآءَهُمْ رَسُولٌۢ بِمَا لَا تَهْوَىٰٓ أَنفُسُهُمْ فَرِيقًۭا كَذَّبُوا۟ وَفَرِيقًۭا يَقْتُلُونَ

আমি বনী-ইসরাঈলের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম এবং তাদের কাছে অনেক পয়গম্বর প্রেরণ করে ছিলাম। যখনই তাদের কাছে কোন পয়গম্বর এমন নির্দেশ নিয়ে আসত যা তাদের মনে চাইত না, তখন তাদের অনেকের প্রতি তারা মিথ্যারোপ করত এবংঅনেককে হত্যা করে ফেলত।

বনী ইস্রাঈলের নিকট হতে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম ও তাদের নিকট বহু রসূল প্রেরণ করেছিলাম। যখনই কোন রসূল তাদের নিকট এমন কিছু নিয়ে আগমন করে, যা তাদের মনঃপূত নয়, তখনই তারা (তাদের) কতককে মিথ্যাবাদী বলে ও কতককে হত্যা করে।

Al-Maaida 5:70Listen in Qur'an →

Commentary: Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation. Qur'an text and translation via AlQuran Cloud.