Muslim99Muslim99
← Tafsir library

5. Al-Maaida

The Table · Medinan · 120 ayahs

سُورَةُ المَائـِدَةِ

Reading Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation

Ayahs 41–50 of 120

41

۞ يَٰٓأَيُّهَا ٱلرَّسُولُ لَا يَحْزُنكَ ٱلَّذِينَ يُسَٰرِعُونَ فِى ٱلْكُفْرِ مِنَ ٱلَّذِينَ قَالُوٓا۟ ءَامَنَّا بِأَفْوَٰهِهِمْ وَلَمْ تُؤْمِن قُلُوبُهُمْ ۛ وَمِنَ ٱلَّذِينَ هَادُوا۟ ۛ سَمَّٰعُونَ لِلْكَذِبِ سَمَّٰعُونَ لِقَوْمٍ ءَاخَرِينَ لَمْ يَأْتُوكَ ۖ يُحَرِّفُونَ ٱلْكَلِمَ مِنۢ بَعْدِ مَوَاضِعِهِۦ ۖ يَقُولُونَ إِنْ أُوتِيتُمْ هَٰذَا فَخُذُوهُ وَإِن لَّمْ تُؤْتَوْهُ فَٱحْذَرُوا۟ ۚ وَمَن يُرِدِ ٱللَّهُ فِتْنَتَهُۥ فَلَن تَمْلِكَ لَهُۥ مِنَ ٱللَّهِ شَيْـًٔا ۚ أُو۟لَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ لَمْ يُرِدِ ٱللَّهُ أَن يُطَهِّرَ قُلُوبَهُمْ ۚ لَهُمْ فِى ٱلدُّنْيَا خِزْىٌۭ ۖ وَلَهُمْ فِى ٱلْءَاخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌۭ

হে রসূল, তাদের জন্যে দুঃখ করবেন না, যারা দৌড়ে গিয়ে কুফরে পতিত হয়; যারা মুখে বলেঃ আমরা মুসলমান, অথচ তাদের অন্তর মুসলমান নয় এবং যারা ইহুদী; মিথ্যাবলার জন্যে তারা গুপ্তচর বৃত্তি করে। তারা অন্যদলের গুপ্তচর, যারা আপনার কাছে আসেনি। তারা বাক্যকে স্বস্থান থেকে পরিবর্তন করে। তারা বলেঃ যদি তোমরা এ নির্দেশ পাও, তবে কবুল করে নিও এবং যদি এ নির্দেশ না পাও, তবে বিরত থেকো। আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করতে চান, তার জন্যে আল্লাহর কাছে আপনি কিছু করতে পারবেন না। এরা এমনিই যে, আল্লাহ এদের অন্তরকে পবিত্র করতে চান না। তাদের জন্যে রয়েছে দুনিয়াতে লাঞ্ছনা এবং পরকালে বিরাট শাস্তি।

হে রসূল! যারা মুখে বলে, ‘বিশ্বাস করেছি’ কিন্তু অন্তরে বিশ্বাসী নয় ও যারা ইয়াহুদী হয়েছে, তাদের মধ্যে যারা অবিশ্বাসে তৎপর, তাদের আচরণ যেন তোমাকে দুঃখ না দেয়।[১] ওরা মিথ্যা শ্রবণে (ও অনুসরণে) অত্যন্ত আগ্রহশীল, যে সম্প্রদায় তোমার নিকট আসেনি, ওরা তাদের জন্য (তোমার কথায়) কান পেতে (গোয়েন্দাগিরি করে) থাকে। (তাওরাতের) বাক্যগুলিকে ওর স্বস্থান হতে পরিবর্তন করে। তারা বলে, ‘এ প্রকার (বিকৃত বিধান) দিলে গ্রহণ কর এবং এ (বিকৃত বিধান) না দিলে বর্জন কর।’[২] আর আল্লাহ যার পথচ্যুতি চান, তার জন্য আল্লাহর নিকট তোমার কিছুই করার নেই। ঐ সকল লোকের হৃদয়কে আল্লাহ বিশুদ্ধ করতে চান না। তাদের জন্য আছে ইহকালে লাঞ্ছনা ও পরকালে মহাশাস্তি।

[১] কাফের ও মুশরিকদের ঈমান গ্রহণ না করা এবং সঠিক পথ অবলম্বন না করার ফলে নবী (সাঃ) যে অস্থিরতা ও আক্ষেপের শিকার হয়েছিলেন, তার জন্য আল্লাহ নিজ নবীকে অধিক চিন্তা না করার নির্দেশ দিয়েছেন। যাতে এ ব্যাপারে তিনি সান্ত্বনা পান যে এই লোকদের ব্যাপারে তিনি আল্লাহর নিকট জিজ্ঞাসিত হবেন না।

[২] ৪১ থেকে ৪৪নং আয়াতগুলির অবতীর্ণ হওয়ার কারণ হিসাবে দু'টি ঘটনা উল্লেখ করা হয়; (ক) বিবাহিত ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণী ইয়াহুদীর ঘটনা। এমনিতে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাতের মধ্যে বহু পরিবর্তন সাধন করেছিল, তার উপর তার অনেক বিধান অনুযায়ী আমল করত না। তার মধ্যে (একটি বিধান) রজম বা পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করার দন্ডবিধান; যা তাদের গ্রন্থে বিবাহিত ব্যভিচারী নারী-পুরুষের জন্য বিদ্যমান ছিল এবং যা আজও বিদ্যমান আছে। সুতরাং যেহেতু তারা এই শাস্তি থেকে রক্ষা পেতে চাচ্ছিল, সেহেতু তারা আপোসে সিদ্ধান্ত নিয়ে বলল যে, 'চল, আমরা মুহাম্মাদের নিকট যাই। তিনি যদি আমাদের মনগড়া শাস্তি দানের মতই চাবুক মেরে লাঞ্ছিত করার শাস্তির নির্দেশ দেন, তাহলে আমরা তা মান্য করে নেব। অন্যথা তিনি যদি রজম বা পাথর মেরে হত্যা করার নির্দেশ দেন, তাহলে আমরা তা মান্য করব না।' আব্দুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) বলেন; ইয়াহুদীগণ রসূল (সাঃ)-এর নিকট উপস্থিত হল। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমাদের তাওরাতে রজমের ব্যাপারে কি নির্দেশ রয়েছে?' তারা বলল, 'তাওরাতে ব্যভিচারের শাস্তি হিসাবে তাকে চাবুক মারা ও লাঞ্ছিত করার কথা উল্লেখ আছে।' (এ কথা শুনে) আব্দুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ) বললেন, 'তোমরা মিথ্যা বলছ। তাওরাতে পাথর ছুঁড়ে হত্যার নির্দেশ রয়েছে। যাও, তাওরাত নিয়ে এসো দেখি!' তারা তাওরাত নিয়ে এসে পড়তে শুরু করল বটে; কিন্তু রজমের আয়াতের উপর হাত রেখে দিয়ে পূর্বাপর সমস্ত পড়ে শুনালো। আব্দুল্লাহ বিন সালাম (রাঃ) বললেন, 'হাত সরিয়ে নাও!' হাত সরালে দেখা গেল যে, সেখানে রজমের আয়াত বিদ্যমান রয়েছে। তখন তাদেরকেও স্বীকার করতেই হল যে, মুহাম্মাদ (সাঃ) সত্যই বলছেন, তাওরাতে রজমের আয়াত আছে।(অতঃপর রসূল (সাঃ)-এর নির্দেশক্রমে) ব্যভিচারীদ্বয়কে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করে দেওয়া হল। (বুখারী ও মুসলিম এবং অন্যান্য হাদীসগ্রন্থ দ্রষ্টব্য)

(খ) একটি অন্য ঘটনাও বর্ণনা করা হয় যে, ইয়াহুদীদের একটি গোত্র অন্য গোত্র অপেক্ষা বেশী সম্ভ্রান্ত ও মর্যাদাসম্পন্ন মনে করত। আর এই কারণেই নিজেদের লোক খুন হলে অপর গোত্রের নিকট হতে একশ' অসাক রক্তপণ দাবী করত। পক্ষান্তরে অন্য গোত্রের কেউ খুন হলে পঞ্চাশ অসাক রক্তপণ নির্ধারিত করত। যখন নবী (সাঃ) মদীনায় আগমন করলেন, তখন ইয়াহুদীদের দ্বিতীয় দল যাদের রক্তপণ অর্ধেক ছিল তারা উৎসাহ পেল। (অর্থাৎ তারা ভাবল যে, এবার আমরা ন্যায় বিচার পাব।) এবং তারা একশ' অসাক রক্তপণ দিতে অস্বীকার করল। আর এ নিয়ে তাদের মধ্যে লড়াই শুরু হওয়ার উপক্রম ছিল। কিন্তু তাদের মধ্যে কয়েকজন বুদ্ধিমান লোক রসূল (সাঃ)-এর নিকট বিচার প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারে সন্তুষ্টি প্রকাশ করলে ঐ সময় এই আয়াতগুলি অবতীর্ণ হয়। যার মধ্যে একটি আয়াতে রক্তপণের বিধান সকলের জন্য সমান বলা হয়েছে। (মুসনাদে আহমাদ ১/২৪৬, আহমাদ শাকের …

Al-Maaida 5:41Listen in Qur'an →
42

سَمَّٰعُونَ لِلْكَذِبِ أَكَّٰلُونَ لِلسُّحْتِ ۚ فَإِن جَآءُوكَ فَٱحْكُم بَيْنَهُمْ أَوْ أَعْرِضْ عَنْهُمْ ۖ وَإِن تُعْرِضْ عَنْهُمْ فَلَن يَضُرُّوكَ شَيْـًۭٔا ۖ وَإِنْ حَكَمْتَ فَٱحْكُم بَيْنَهُم بِٱلْقِسْطِ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلْمُقْسِطِينَ

এরা মিথ্যা বলার জন্যে গুপ্তচরবৃত্তি করে, হারাম ভক্ষণ করে। অতএব, তারা যদি আপনার কাছে আসে, তবে হয় তাদের মধ্যে ফয়সালা করে দিন, না হয় তাদের ব্যাপারে নির্লিপ্ত থাকুন। যদি তাদের থেকে নির্লিপ্ত থাকেন, তবে তাদের সাধ্য নেই যে, আপনার বিন্দুমাত্র ক্ষতি করতে পারে। যদি ফয়সালা করেন, তবেন্যায় ভাবে ফয়সালা করুন। নিশ্চয় আল্লাহ সুবিচারকারীদেরকে ভালবাসেন।

তারা মিথ্যা শ্রবণে অত্যন্ত আগ্রহশীল[১] এবং অবৈধ উপায়ে লব্ধ বস্তু ভক্ষণে অত্যন্ত আসক্ত, তারা যদি তোমার নিকট আসে, তাহলে তাদের বিচার-নিষ্পত্তি কর অথবা তাদেরকে উপেক্ষা কর। আর যদি তাদেরকে উপেক্ষা কর, তাহলে তারা তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। পক্ষান্তরে যদি বিচার-নিষ্পত্তি কর, তাহলে তাদের মাঝে ন্যায়পরায়ণতার সাথে বিচার-নিষ্পত্তি কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদেরকে ভালবাসেন।

[১] سماعون শব্দের অর্থ হচ্ছে; অধিক শ্রবণকারী। আর এ কারণেই এর দুটি অর্থ হতে পারে (ক) গোয়েন্দাগিরি বা গুপ্তচরবৃত্তির জন্য শ্রবণ করা অথবা (খ) অন্যের কথা মান্য ও গ্রহণ করার জন্য শ্রবণ করা। কেউ কেউ প্রথম অর্থটি গ্রহণ করেছেন, আবার কেউ দ্বিতীয় অর্থটি।

Al-Maaida 5:42Listen in Qur'an →
43

وَكَيْفَ يُحَكِّمُونَكَ وَعِندَهُمُ ٱلتَّوْرَىٰةُ فِيهَا حُكْمُ ٱللَّهِ ثُمَّ يَتَوَلَّوْنَ مِنۢ بَعْدِ ذَٰلِكَ ۚ وَمَآ أُو۟لَٰٓئِكَ بِٱلْمُؤْمِنِينَ

তারা আপনাকে কেমন করে বিচারক নিয়োগ করবে অথচ তাদের কাছে তওরাত রয়েছে। তাতে আল্লাহর নির্দেশ আছে। অতঃপর এরা পেছন দিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তারা কখনও বিশ্বাসী নয়।

আর তারা তোমার উপর কিরূপে বিচার-ভার ন্যস্ত করছে, যখন তাদের নিকট রয়েছে তওরাত; যাতে আছে আল্লাহর আদেশ? এরপরও তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়। ওরা আসলে বিশ্বাসীই নয়।

Al-Maaida 5:43Listen in Qur'an →
44

إِنَّآ أَنزَلْنَا ٱلتَّوْرَىٰةَ فِيهَا هُدًۭى وَنُورٌۭ ۚ يَحْكُمُ بِهَا ٱلنَّبِيُّونَ ٱلَّذِينَ أَسْلَمُوا۟ لِلَّذِينَ هَادُوا۟ وَٱلرَّبَّٰنِيُّونَ وَٱلْأَحْبَارُ بِمَا ٱسْتُحْفِظُوا۟ مِن كِتَٰبِ ٱللَّهِ وَكَانُوا۟ عَلَيْهِ شُهَدَآءَ ۚ فَلَا تَخْشَوُا۟ ٱلنَّاسَ وَٱخْشَوْنِ وَلَا تَشْتَرُوا۟ بِـَٔايَٰتِى ثَمَنًۭا قَلِيلًۭا ۚ وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُو۟لَٰٓئِكَ هُمُ ٱلْكَٰفِرُونَ

আমি তওরাত অবর্তীর্ন করেছি। এতে হেদায়াত ও আলো রয়েছে। আল্লাহর আজ্ঞাবহ পয়গম্বর, দরবেশ ও আলেমরা এর মাধ্যমে ইহুদীদেরকে ফয়সালা দিতেন। কেননা, তাদেরকে এ খোদায়ী গ্রন্থের দেখাশোনা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল এবং তাঁরা এর রক্ষণাবেক্ষণে নিযুক্ত ছিলেন। অতএব, তোমরা মানুষকে ভয় করো না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্যে গ্রহণ করো না, যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফায়সালা করে না, তারাই কাফের।

নিশ্চয় আমি তাওরাত অবতীর্ণ করেছিলাম, ওতে ছিল পথনির্দেশ ও আলো। আল্লাহর অনুগত নবীগণ,[১] রাব্বানী (আল্লাহ-ভক্ত)গণ এবং পন্ডিতগণও ইয়াহুদীদেরকে[২] তদনুসারে বিধান দিত, কারণ তাদেরকে আল্লাহর কিতাবের রক্ষক করা হয়েছিল[৩] এবং তারা ছিল ওর (সত্যতার) সাক্ষী।[৪] সুতরাং তোমরা মানুষকে ভয় করো না, আমাকেই ভয় কর এবং আমার আয়াত নগণ্য মূল্যে বিক্রয় করো না।[৫] আর আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই অবিশ্বাসী (কাফের)।[৬]

[১] أسلموا ক্রিয়াপদটি نبيين এর বিশেষণ। অর্থাৎ, মুসলিম বা আল্লাহর অনুগত নবীগণ। যেহেতু সমস্ত নবীগণই ইসলাম ধর্মেরই অনুসারী ছিলেন, যার দিকে মুহাম্মাদ (সাঃ) দাওয়াত দিচ্ছেন। অর্থাৎ, সমস্ত নবীগণের দ্বীন বা ধর্ম এক ও অভিন্ন। আর ইসলামী দাওয়াতের মূল ভিত্তি হলো (তাওহীদ); অর্থাৎ, একমাত্র এক আল্লাহরই ইবাদত করতে হবে আর তাঁর ইবাদতের সাথে অন্য কাউকে শরীক বা অংশীদার করা যাবে না। আর প্রত্যেক নবীই স্ব স্ব গোত্রকে সর্বপ্রথম তাওহীদের এই একনিষ্ঠ বাণীই পেশ করেছেন। আল্লাহ বলেন; {وَمَا أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ} অর্থাৎ, আমি তোমার পূর্বে 'আমি ছাড়া অন্য কোন (সত্য) উপাস্য নেই; সুতরাং তোমরা আমারই উপাসনা কর'-এ প্রত্যাদেশ ছাড়া কোন রসুল প্রেরণ করিনি। (সূরা আম্বিয়া ২১:২৫) আর কুরআনে একে দ্বীনও বলা হয়েছে, যেমন সূরা শু'রার ৪২:১৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, {شَرَعَ لَكُمْ مِنَ الدِّينِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا} যাতে ঐ একই বিষয় বর্ণনা করা হয়েছে যে, তোমার জন্য আমি ঐ জীবন-বিধানই নির্ধারিত করেছি যা তোমার পূর্বে নবীগণের উপর নির্ধারিত করেছিলাম।[২] للذين هادوا এর সম্পর্ক يحكم ক্রিয়াটির সাথে। অর্থাৎ ইয়াহুদীদের ব্যাপারেও ফায়সালা করতেন।[৩] সুতরাং তাঁরা তাওরাতের মধ্যে কোন পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করেননি, যেমনটি তাঁদের পরবর্তী লোকেরা করেছিল।[৪] এই যে, এ গ্রন্থ অর্থাৎ কুরআন কারীম পরিবর্ধন ও হ্রাস থেকে সংরক্ষিত আছে এবং আল্লাহর নিকট থেকে (সর্বশেষ) অবতীর্ণ গ্রন্থ।[৫] অর্থাৎ, লোকের ভয়ে ভীত হয়ে তাওরাতের আসল বিধান গোপন করো না এবং পার্থিব সামান্য সম্পদ লাভের জন্য তাতে কোন প্রকার রদবদল করো না।[৬] সুতরাং কিভাবে তোমরা ঈমানের পরিবর্তে কুফরীর উপর সন্তুষ্ট রয়ে গেলে?

Al-Maaida 5:44Listen in Qur'an →
45

وَكَتَبْنَا عَلَيْهِمْ فِيهَآ أَنَّ ٱلنَّفْسَ بِٱلنَّفْسِ وَٱلْعَيْنَ بِٱلْعَيْنِ وَٱلْأَنفَ بِٱلْأَنفِ وَٱلْأُذُنَ بِٱلْأُذُنِ وَٱلسِّنَّ بِٱلسِّنِّ وَٱلْجُرُوحَ قِصَاصٌۭ ۚ فَمَن تَصَدَّقَ بِهِۦ فَهُوَ كَفَّارَةٌۭ لَّهُۥ ۚ وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُو۟لَٰٓئِكَ هُمُ ٱلظَّٰلِمُونَ

আমি এ গ্রন্থে তাদের প্রতি লিখে দিয়েছি যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চক্ষুর বিনিময়ে চক্ষু, নাকের বিনিময়ে নাক, কানের বিনিময়ে কান, দাঁতের বিনিময়ে দাঁত এবং যখম সমূহের বিনিময়ে সমান যখম। অতঃপর যে ক্ষমা করে, সে গোনাহ থেকে পাক হয়ে যায়। যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না তারাই জালেম।

আর তাদের জন্য ওতে (তওরাতে) বিধান দিয়েছিলাম যে, প্রাণের বদল প্রাণ, চোখের বদল চোখ, নাকের বদল নাক, কানের বদল কান, দাঁতের বদল দাঁত এবং জখমের বদল অনুরূপ জখম।[১] অতঃপর কেউ তা ক্ষমা করলে ওতে তারই পাপ মোচন হবে। আর আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই অত্যাচারী। [২]

[১] যখন তাওরাতে জানের বদলে জান এবং ক্ষতের ব্যাপারে ক্বিসাসের বিধান ছিল; তখন ইয়াহুদীদের এক গোত্র (বানু নাযীর)এর অন্য গোত্র (বানু কুরায়যাহ)এর সাথে তার বিপরীত আচরণ করা এবং স্বগোত্রীয় লোকের রক্তপণ অপর গোত্রের লোকের দ্বিগুণ নেওয়ার বৈধতা কোথায়? যেমন এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা পূর্বে হয়েছে।

[২] এ আয়াত ইঙ্গিত করে যে, যে গোত্র আল্লাহর নাযিলকৃত বিধানের বিপরীত ফায়সালা করেছিল তারা যুলুম ও স্বেচ্চাচারিতায় লিপ্ত হয়েছিল। আসলে মানুষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, তারা যেন আল্লাহর বিধানের আনুগত্য করে, সেই মোতাবেক বিচার-ফায়সালা করে এবং নিজেদের জীবনের সকল কর্মকান্ডে ঐ বিধান থেকে পথনির্দেশ গ্রহণ করে। আর যদি তারা তা না করে, তাহলে আল্লাহর দরবারে তারা যালেম (অত্যাচারী ও সীমালঙ্ঘনকারী), ফাসেক (পাপী) ও কাফের বিবেচিত হবে। আর এই ধরনের লোকেদের জন্য আল্লাহ তিন রকম শব্দ ব্যবহার করে নিজের ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির কথা পূর্ণরূপে ব্যক্ত করে দিয়েছেন। এর পরেও যদি মানুষ নিজেদের জীবনে নিজসব মনগড়া বিধান এবং নিজেদের ইচ্ছা ও খেয়ালখুশীকে অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে এর থেকে বেশী দুর্ভাগ্য আর কি হতে পারে ?

নোটঃ- উসূল (ফিকহী মৌলনীতির) উলামাগণ লিখেছেন যে, বিগত শরীয়তের বিধান যদি আল্লাহ অব্যাহত রাখেন, তাহলে তার উপর আমল করা আমাদের জন্যও জরুরী। আর উক্ত আয়াতের বিধান রহিত হয়নি। সুতরাং এটাই ইসলামী শরীয়তের একটা বিধান, যা হাদীস থেকেও প্রমাণিত। অনুরূপভাবে হাদীস দ্বারা أَنَّ النَّفْسَ بِالنَّفْسِ জানের বদলে জানের ব্যাপক বিধান থেকে দুটি অবস্থা বহির্ভূত। (ক) যদি কোন মুসলিম কোন কাফেরকে হত্যা করে ফেলে, তাহলে কাফেরের পরিবর্তে মুসলিমকে হত্যা করা যাবে না। (খ) অনুরূপভাবে কোন স্বাধীন ব্যক্তি যদি কোন ক্রীতদাসকে হত্যা করে ফেলে, তাহলে তাকে তার পরিবর্তে হত্যা করা যাবে না। (বিস্তারিত দেখুনঃ ফাতহুল বারী, নায়নূল আওতার ইত্যাদি)

Al-Maaida 5:45Listen in Qur'an →
46

وَقَفَّيْنَا عَلَىٰٓ ءَاثَٰرِهِم بِعِيسَى ٱبْنِ مَرْيَمَ مُصَدِّقًۭا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ ٱلتَّوْرَىٰةِ ۖ وَءَاتَيْنَٰهُ ٱلْإِنجِيلَ فِيهِ هُدًۭى وَنُورٌۭ وَمُصَدِّقًۭا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ ٱلتَّوْرَىٰةِ وَهُدًۭى وَمَوْعِظَةًۭ لِّلْمُتَّقِينَ

আমি তাদের পেছনে মরিয়ম তনয় ঈসাকে প্রেরণ করেছি। তিনি পূর্ববর্তী গ্রন্থ তওরাতের সত্যায়নকারী ছিলেন। আমি তাঁকে ইঞ্জিল প্রদান করেছি। এতে হেদায়াত ও আলো রয়েছে। এটি পূর্ববতী গ্রন্থ তওরাতের সত্যায়ন করে পথ প্রদর্শন করে এবং এটি খোদাভীরুদের জন্যে হেদায়েত উপদেশ বানী।

আমি তাদের (নবীগণের) পরে পরেই মারয়্যাম-তনয় ঈসাকে তার পূর্বে অবতীর্ণ তওরাতের সমর্থকরূপে প্রেরণ করেছিলাম[১] এবং সাবধানীদের জন্য পথের নির্দেশ ও উপদেশরূপে তাকে ইঞ্জীল (ঐশীগ্রন্থ) দিয়েছিলাম, ওতে ছিল পথ-নির্দেশ ও আলো। [২]

[১] অর্থাৎ, পূর্ববর্তী নবীগণের পর পরই ঈসা (আঃ)-কে (আল্লাহ রসূল রূপে) তাওরাতের সত্যায়ন করার জন্য প্রেরণ করেন, মিথ্যায়ন করার জন্য নয়। যা এই কথাই প্রমাণ করে যে, ঈসা (আঃ)ও সত্য রসূল ছিলেন এবং ঐ আল্লাহরই প্রেরিত ছিলেন, যিনি মূসা (আঃ)-এর উপর তাওরাত অবতীর্ণ করেছিলেন। তা সত্ত্বেও ইয়াহুদীরা ঈসা (আঃ)-কে মিথ্যাবাদী মনে করে; এমনকি তাঁকে কাফের মনে করে, তাঁকে অবজ্ঞা ও তুচ্ছজ্ঞান করে![২] অর্থাৎ, যেমন তাওরাত তার সময়ের লোকদের জন্য পথ প্রদর্শকরূপে ছিল অনুরূপভাবে ইঞ্জীল অবতীর্ণ হওয়ার পর সেই মর্যাদার অধিকারী ইঞ্জীল হয়ে যায় এবং তারপর কুরআন অবতীর্ণ হলে তাওরাত ইঞ্জীল ও অন্যান্য আসমানী গ্রন্থের বিধান রহিত হয়ে যায় এবং হিদায়াত ও মুক্তির পথ নির্দেশনা রূপে শুধুমাত্র কুরআন কারীম বিদ্যমান থাকে। আর এর পরই মহান আল্লাহ আসমানী গ্রন্থের ধারাবাহিকতা বন্ধ করে দেন। সুতরাং এ যেন এ কথারই ঘোষণা যে, কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের কল্যাণ ও মুক্তি শুধুমাত্র কুরআনের অনুসরণেই বিদ্যমান। যে এ গ্রন্থের সাথে সম্পর্ক রাখে, সে সফলকাম ও বিজয়ী হবে। আর যে এর সাথে সম্পর্ক ছেদন করে, সে অকৃতকার্য ও হতভাগায় পরিণত হবে। অতএব বুঝা গেল যে, 'সব ধর্ম সমান'-এর দর্শন নিতান্তই ভুল। কেননা হক (সত্য) সমস্ত যুগে একটাই হয়; একাধিক নয়। আর হক ব্যতীত সবই বাতিল (ভ্রষ্ট)। তাওরাত তার যুগে সঠিক বা হক ছিল এবং তারপর ইঞ্জীলও তার যুগে সঠিক ও হক ছিল। ইঞ্জীল অবতীর্ণ হওয়ার পর তাওরাতের উপর আমল বৈধ ছিল না। অতঃপর যখন কুরআন অবতীর্ণ হল, তখন ইঞ্জীল রহিত হয়ে গেল; তার উপর আমল করা বৈধ নয়। বলা বাহুল্য, একমাত্র বিধান ও (ইহ-পরকালে) মানুষের মুক্তির উপায় কুরআনই। কুরআনের উপর ঈমান ও আমল ব্যতীত মুক্তি লাভ সম্ভব নয়। (বিস্তারিত সূরা বাক্বারার ২:৬২ নম্বর আয়াতের টীকায় দেখুন।)

Al-Maaida 5:46Listen in Qur'an →
47

وَلْيَحْكُمْ أَهْلُ ٱلْإِنجِيلِ بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فِيهِ ۚ وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُو۟لَٰٓئِكَ هُمُ ٱلْفَٰسِقُونَ

ইঞ্জিলের অধিকারীদের উচিত, আল্লাহ তাতে যা অবতীর্ণ করেছেন। তদানুযায়ী ফয়সালা করা। যারা আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই পাপাচারী।

ইঞ্জীল-ওয়ালাদের উচিত, আল্লাহ ওতে (ইঞ্জীলে) যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুসারে বিধান দেওয়া।[১] আর যারা আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুসারে বিধান দেয় না, তারাই পাপাচারী।

[১] ঈসা (আঃ)-এর নবুঅত কালে আহলে ইঞ্জীলদেরকে এই নির্দেশ প্রদান করা হয়েছিল। কিন্তু মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর নবুঅত প্রাপ্তির পর ঈসা (আঃ)-এর নবুঅতের যুগ শেষ হয়ে যায়; অনুরূপ ইঞ্জীলের অনুসরণের নির্দেশও। বর্তমানে ঐ ব্যক্তি ঈমানদার বা মু'মিন বলে বিবেচিত হবে, যে মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর রিসালাতের উপর ঈমান আনবে এবং কুরআনের অনুসরণ করবে।

Al-Maaida 5:47Listen in Qur'an →
48

وَأَنزَلْنَآ إِلَيْكَ ٱلْكِتَٰبَ بِٱلْحَقِّ مُصَدِّقًۭا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ ٱلْكِتَٰبِ وَمُهَيْمِنًا عَلَيْهِ ۖ فَٱحْكُم بَيْنَهُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَآءَهُمْ عَمَّا جَآءَكَ مِنَ ٱلْحَقِّ ۚ لِكُلٍّۢ جَعَلْنَا مِنكُمْ شِرْعَةًۭ وَمِنْهَاجًۭا ۚ وَلَوْ شَآءَ ٱللَّهُ لَجَعَلَكُمْ أُمَّةًۭ وَٰحِدَةًۭ وَلَٰكِن لِّيَبْلُوَكُمْ فِى مَآ ءَاتَىٰكُمْ ۖ فَٱسْتَبِقُوا۟ ٱلْخَيْرَٰتِ ۚ إِلَى ٱللَّهِ مَرْجِعُكُمْ جَمِيعًۭا فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ فِيهِ تَخْتَلِفُونَ

আমি আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি সত্যগ্রন্থ, যা পূর্ববতী গ্রন্থ সমূহের সত্যায়নকারী এবং সেগুলোর বিষয়বস্তুর রক্ষণাবেক্ষণকারী। অতএব, আপনি তাদের পারস্পারিক ব্যাপারাদিতে আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করুন এবং আপনার কাছে যে সৎপথ এসেছে, তা ছেড়ে তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না। আমি তোমাদের প্রত্যেককে একটি আইন ও পথ দিয়েছি। যদি আল্লাহ চাইতেন, তবে তোমাদের সবাইকে এক উম্মত করে দিতেন, কিন্তু এরূপ করেননি-যাতে তোমাদেরকে যে ধর্ম দিয়েছেন, তাতে তোমাদের পরীক্ষা নেন। অতএব, দৌড়ে কল্যাণকর বিষয়াদি অর্জন কর। তোমাদের সবাইকে আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। অতঃপর তিনি অবহিত করবেন সে বিষয়, যাতে তোমরা মতবিরোধ করতে।

এর পূর্বে অবতীর্ণ কিতাবের সমর্থক ও সংরক্ষকরূপে[১] আমি তোমার প্রতি সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করেছি। সুতরাং আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুসারে তুমি তাদের বিচার-নিষ্পত্তি কর[২] এবং যে সত্য তোমার নিকট এসেছে, তা ত্যাগ করে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করো না।[৩] তোমাদের প্রত্যেকের জন্য এক একটি শরীয়ত (আইন) ও স্পষ্ট পথ নির্ধারণ করেছি।[৪] ইচ্ছা করলে আল্লাহ তোমাদেরকে এক জাতি করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তোমাদেরকে যা দিয়েছেন, তা দিয়ে তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য (তিনি তা করেননি)।[৫] অতএব সৎকর্মে তোমরা প্রতিযোগিতা কর, আল্লাহর দিকেই সকলের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করছিলে, সে সম্বন্ধে তিনি তোমাদেরকে অবহিত করবেন।

[১] প্রত্যেক আসমানী গ্রন্থ তার পূর্বোক্ত গ্রন্থের সত্যায়ন করে। অনুরূপ কুরআনও পূর্বোক্ত সমস্ত (আসমানী) গ্রন্থের সত্যায়ন করে। আর সত্যায়নের অর্থ হচ্ছে; সমস্ত গ্রন্থ আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু কুরআন সত্যের সাক্ষ্যপ্রদানকারী হওয়ার সাথে সাথে সংরক্ষক, বিশ্বস্ত ও প্রভাবশালী গ্রন্থ। অর্থাৎ পূর্বোক্ত গ্রন্থগুলিতে পরিবর্তন-পরিবর্ধন হয়েছে; কিন্তু কুরআন এ থেকে সুরক্ষিত আছে। আর এই জন্যই কুরআনের ফায়সালাই সত্য বিবেচিত হবে; কুরআন যাকে সঠিক বলে বিবেচনা করবে, সেটাই সঠিক হিসাবে গণ্য হবে। আর বাকী সবই বাতিল বলে বিবেচিত হবে।

[২] ইতিপূর্বে ৪২নং আয়াতে নবী (সাঃ)-কে এখতিয়ার প্রদান করা হয়েছিল যে, তুমি ওদের ব্যাপারে বিচার-ফায়সালা কর অথবা না কর, সেটা তোমার ইচ্ছার উপর নির্ভর। কিন্তু এখন সে ক্ষেত্রে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে যে, তাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-কলহের ব্যাপারে তুমি কুরআনের বিধান মোতাবেক ফায়সালা প্রদান কর।

[৩] এখানে আসলে উম্মতকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য অবগত করানো হচ্ছে যে, আল্লাহর নাযিলকৃত গ্রন্থ হতে বিমুখ হয়ে মানুষের খেয়াল-খুশী এবং মনগড়া মতবাদ ও আইন-কানুন অনুযায়ী ফায়সালা করা ভ্রষ্টতা। যার অনুমতি নবী (সাঃ)-কে প্রদান করা হয়নি, তাহলে অন্যরা কি করে এ কর্ম সম্পাদন করতে পারে ?

[৪] এর অর্থ হলো; পূর্বোক্ত শরীয়তসমূহ, যার মধ্যে গৌণ বিষয়ে (আংশিক) কিছু একে অপর থেকে পার্থক্য ছিল। এক শরীয়তে কোন জিনিস বৈধ (হালাল) ছিল; কিন্তু অন্য শরীয়তে তা অবৈধ (হারাম) ছিল। কোন শরীয়তে কোন বিষয় বড় কষ্টকর ছিল, পক্ষান্তরে অন্য শরীয়তে তা সহজ ছিল। কিন্তু দ্বীন সকলের একই ছিল। অর্থাৎ, তাওহীদের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। আর এই কারণেই সকলের দাওয়াতও এক ও অভিন্ন ছিল। এ বিষয়টি হাদীসে এভাবে বর্ণিত হয়েছে, "আমরা নবীগণ বৈমাত্রেয় ভাই ভাই; আমাদের সকলের দ্বীন অভিন্ন।" বৈমাত্রেয় ভাই বলা হয়; যাদের বাপ এক; কিন্তু মা ভিন্ন ভিন্ন। অর্থ হল, দ্বীন সকলের এক (তাওহীদ) ছিল; কিন্তু আইন ও পদ্ধতিগত কিছু পার্থক্য ছিল। শেষ পর্যন্ত মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী সমস্ত শরীয়ত রহিত হয়ে যায়। সুতরাং এখন শুধু একটাই দ্বীন ও একটাই শরীয়ত (যা কিয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষের জন্য মান্য ও অপরিহার্য)।

[৫] অর্থাৎ, কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার পর মুক্তির পথ তো শুধুমাত্র কুরআনেই আছে। কিন্তু এই মুক্তির পথ অনুসরণ করার জন্য আল্লাহ মানুষকে বাধ্য করেননি; অথচ তিনি ইচ্ছা করলে তা করতে পারতেন। কেননা তাতে পরীক্ষা করা সম্ভব ছিল না, অথচ তিনি মানুষকে পরীক্ষা করতে চান।

Al-Maaida 5:48Listen in Qur'an →
49

وَأَنِ ٱحْكُم بَيْنَهُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَآءَهُمْ وَٱحْذَرْهُمْ أَن يَفْتِنُوكَ عَنۢ بَعْضِ مَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ إِلَيْكَ ۖ فَإِن تَوَلَّوْا۟ فَٱعْلَمْ أَنَّمَا يُرِيدُ ٱللَّهُ أَن يُصِيبَهُم بِبَعْضِ ذُنُوبِهِمْ ۗ وَإِنَّ كَثِيرًۭا مِّنَ ٱلنَّاسِ لَفَٰسِقُونَ

আর আমি আদেশ করছি যে, আপনি তাদের পারস্পরিক ব্যাপারাদিতে আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তদনুযায়ী ফয়সালা করুন; তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না এবং তাদের থেকে সতর্ক থাকুন-যেন তারা আপনাকে এমন কোন নির্দেশ থেকে বিচ্যুত না করে, যা আল্লাহ আপনার প্রতি নাযিল করেছেন। অনন্তর যদি তার মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে জেনে নিন, আল্লাহ তাদেরকে তাদের গোনাহের কিছু শাস্তি দিতেই চেয়েছেন। মানুষের মধ্যে অনেকেই নাফরমান।

এবং (পুনঃ বলছি) আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তুমি তদনুযায়ী তাদের মধ্যে বিচার-নিষ্পত্তি কর এবং তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করো না। আর এ সম্বন্ধে সতর্ক থাক, যাতে আল্লাহ যা তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছেন, ওরা তার কিছু থেকে তোমাকে বিচ্যুত করতে না পারে। যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে জেনে রাখ যে, তাদের কোন কোন পাপের জন্য আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি দিতে চান এবং মানুষের মধ্যে অনেকেই তো সত্যত্যাগী।

Al-Maaida 5:49Listen in Qur'an →
50

أَفَحُكْمَ ٱلْجَٰهِلِيَّةِ يَبْغُونَ ۚ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ ٱللَّهِ حُكْمًۭا لِّقَوْمٍۢ يُوقِنُونَ

তারা কি জাহেলিয়াত আমলের ফয়সালা কামনা করে? আল্লাহ অপেক্ষা বিশ্বাসীদের জন্যে উত্তম ফয়সালাকারী কে?

তবে কি তারা প্রাগ-ইসলামী (জাহেলী) যুগের বিচার-ব্যবস্থা পেতে চায়?[১] খাঁটি বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য বিচারে আল্লাহ অপেক্ষা কে শ্রেষ্ঠতর? [২]

[১] কুরআন ও ইসলাম ব্যতীত সবই জাহেলিয়াত বা অন্ধকার। এরা কি ইসলামের আলো ও হিদায়াতকে ছেড়ে এখনও জাহেলিয়াত অনুসন্ধান করে? এখানে প্রশ্ন অস্বীকৃতি এবং ধমকের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। আর (ف) অব্যয়টি একটি ঊহ্য বাক্যের সাথে সংযোজকরূপে ব্যবহার হয়েছে; আসলে বাক্য হচ্ছে; أيعرضون عن حكمك بما أنزل الله عليك ويتولون عنه ويبتغون حكم الجاهلية অর্থাৎ, আল্লাহ তোমার উপর যা অবতীর্ণ করেছেন তার দ্বারা তোমার বিচার হতে তারা কি বিমুখ হতে চায় এবং পৃষ্ঠ-প্রদর্শন করে, আর জাহেলী যুগের বিচার-পদ্ধতি অনুসন্ধান করে? (ফাতহুল ক্বাদীর)

[২] হাদীস শরীফে এসেছে, আল্লাহর রসূল (সাঃ) বলেছেন; তিন ব্যক্তি আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বেশী অপছন্দনীয়; যে (মক্কার) হারামে পাপাচার করে, যে ইসলামে জাহেলী (অজ্ঞতা) যুগের চাল-চলন ও নিয়ম-কানুন অনুসন্ধান করে এবং যে অকারণে কারো নিকট থেকে খুনের দাবী করে। (বুখারী, দিয়াত অধ্যায় )

Al-Maaida 5:50Listen in Qur'an →

Commentary: Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation. Qur'an text and translation via AlQuran Cloud.