Muslim99Muslim99
← Tafsir library

5. Al-Maaida

The Table · Medinan · 120 ayahs

سُورَةُ المَائـِدَةِ

Reading Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation

Ayahs 111–120 of 120

111

وَإِذْ أَوْحَيْتُ إِلَى ٱلْحَوَارِيِّۦنَ أَنْ ءَامِنُوا۟ بِى وَبِرَسُولِى قَالُوٓا۟ ءَامَنَّا وَٱشْهَدْ بِأَنَّنَا مُسْلِمُونَ

আর যখন আমি হাওয়ারীদের মনে জাগ্রত করলাম যে, আমার প্রতি এবং আমার রসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর, তখন তারা বলতে লাগল, আমরা বিশ্বাস স্থাপন করলাম এবং আপনি সাক্ষী থাকুন যে, আমরা অনুগত্যশীল।

আরো স্মরণ কর, আমি হাওয়ারী[১] (শিষ্য)দেরকে এ আদেশ দিয়েছিলাম যে, ‘তোমরা আমার প্রতি ও আমার রসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর।’ তারা বলেছিল, ‘আমরা বিশ্বাস করলাম এবং তুমি সাক্ষী থাক যে, আমরা আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)।’

[১] حَوَاريين বলা হয়, ঈসা (আঃ)-এর অনুসারী শিষ্যগণকে; যাঁরা তাঁর প্রতি ঈমান আনয়ন করে তাঁর সহচর ও সাহায্যকারী হিসাবে ছিলেন। তাঁদের সংখ্যা ১২ জন বলা হয়ে থাকে। 'অহী' বলতে এখানে ঐ অহী নয়, যা ফিরিশতা মারফৎ নবীগণের প্রতি অবতীর্ণ হত। এখানে 'অহী' বলতে ইলহামকে বুঝায়; যা আল্লাহর পক্ষ থেকে কিছু লোকের অন্তরে প্রক্ষিপ্ত হয়। যেমন মূসা (আঃ)-এর মাতা ও মারয়্যাম ('আলাইহাস্ সালাম)-কে এই ধরনের ইলহাম করা হয়েছিল, যাকে কুরআন 'অহী' বলে আখ্যায়ন করেছে। এখান থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, যাঁরা 'অহী' শব্দ দ্বারা এ কথার প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, মূসা (আঃ)-এর মাতা ও মারয়্যাম (আলাইহাস সালাম) নবী ছিলেন; কেননা তাঁদের প্রতিও আল্লাহ অহী করেছেন, তাঁদের কথা সঠিক নয়। কারণ সে 'অহী' ইলহামের অহীই ছিল; যেমন হাওয়ারীদের প্রতি কৃত 'অহী' রিসালতের অহী ছিল না।

Al-Maaida 5:111Listen in Qur'an →
112

إِذْ قَالَ ٱلْحَوَارِيُّونَ يَٰعِيسَى ٱبْنَ مَرْيَمَ هَلْ يَسْتَطِيعُ رَبُّكَ أَن يُنَزِّلَ عَلَيْنَا مَآئِدَةًۭ مِّنَ ٱلسَّمَآءِ ۖ قَالَ ٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ

যখন হাওয়ারীরা বললঃ হে মরিয়ম তনয় ঈসা, আপনার পালনকর্তা কি এরূপ করতে পারেন যে, আমাদের জন্যে আকাশ থেকে খাদ্যভর্তি খাঞ্চা অবতরণ করে দেবেন? তিনি বললেনঃ যদি তোমরা ঈমানদার হও, তবে আল্লাহকে ভয় কর।

স্মরণ কর, হাওয়ারীগণ বলেছিল, ‘হে মারয়্যাম-তনয় ঈসা! তোমার প্রতিপালক কি আমাদের জন্য আকাশ থেকে খাদ্য পরিপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ করতে সক্ষম?[১] সে বলেছিল, ‘তোমরা আল্লাহকে ভয় কর; যদি তোমরা বিশ্বাসী হও।’ [২]

[১] مَائِدَة এমন পাত্র (যেমন থালা বা প্লেট বা খাঞ্চা ইত্যাদিকে) বলা হয়, যার মধ্যে খাদ্য থাকবে। এই জন্য এর অনুবাদ দস্তরখানাও করা হয়ে থাকে, কেননা তার মধ্যেও খাদ্য থাকে। আর এই উপলক্ষ্যেই সূরার নামকরণও হয়েছে। এখানে এর উল্লেখ আছে যে, হাওয়ারীগণ আন্তরিক প্রশান্তির জন্য আসমান থেকে খানাভর্তি খাঞ্চা অবতীর্ণ করার আবদার জানায়। যেমন ইবরাহীম (আঃ) (আন্তরিক প্রশান্তির জন্য) মৃতকে জীবিত করা স্বচক্ষে দেখার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন।[২] অর্থাৎ তোমরা এমন জিনিস চেয়ো না, যা তোমাদের জন্য ফিতনার কারণ হয়ে যাবে। যেহেতু দাবী অনুসারে অলৌকিক জিনিস প্রকাশ পাওয়ার পর তাদের মধ্যে যদি দুর্বলতা প্রকাশ পায়, তাহলে সেটা তাদের জন্য আযাবের কারণ হয়ে যাবে। এই জন্যই ঈসা (আঃ) এ ধরনের চাওয়া হতে বিরত থাকতে বললেন এবং তাদেরকে আল্লাহর ভয় দেখালেন।

Al-Maaida 5:112Listen in Qur'an →
113

قَالُوا۟ نُرِيدُ أَن نَّأْكُلَ مِنْهَا وَتَطْمَئِنَّ قُلُوبُنَا وَنَعْلَمَ أَن قَدْ صَدَقْتَنَا وَنَكُونَ عَلَيْهَا مِنَ ٱلشَّٰهِدِينَ

তারা বললঃ আমরা তা থেকে খেতে চাই; আমাদের অন্তর পরিতৃপ্ত হবে; আমরা জেনে নেব যে, আপনি সত্য বলেছেন এবং আমরা সাক্ষ্যদাতা হয়ে যাব।

তারা বলেছিল, ‘আমাদের ইচ্ছা করে যে, তা থেকে কিছু আমরা খাব ও আমাদের চিত্ত সান্ত্বনা লাভ করবে। আর আমরা জানব যে, তুমি আমাদেরকে সত্য বলেছ এবং আমরা তার সাক্ষী হয়ে যাব।’

Al-Maaida 5:113Listen in Qur'an →
114

قَالَ عِيسَى ٱبْنُ مَرْيَمَ ٱللَّهُمَّ رَبَّنَآ أَنزِلْ عَلَيْنَا مَآئِدَةًۭ مِّنَ ٱلسَّمَآءِ تَكُونُ لَنَا عِيدًۭا لِّأَوَّلِنَا وَءَاخِرِنَا وَءَايَةًۭ مِّنكَ ۖ وَٱرْزُقْنَا وَأَنتَ خَيْرُ ٱلرَّٰزِقِينَ

ঈসা ইবনে মরিয়ম বললেনঃ হে আল্লাহ আমাদের পালনকর্তা আমাদের প্রতি আকাশ থেকে খাদ্যভর্তি খাঞ্চা অবতরণ করুন। তা আমাদের জন্যে অর্থাৎ, আমাদের প্রথম ও পরবর্তী সবার জন্যে আনন্দোৎসব হবে এবং আপনার পক্ষ থেকে একটি নিদর্শন হবে। আপনি আমাদের রুযী দিন। আপনিই শ্রেষ্ট রুযীদাতা।

মারয়্যাম-তনয় ঈসা বলল, ‘হে আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ! আমাদের জন্য আকাশ থেকে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ কর, এ হবে আমাদের ও আমাদের সকলের জন্য তোমার নিকট থেকে নিদর্শন এবং আনন্দোৎসব স্বরূপ।[১] আর আমাদেরকে জীবিকা দান কর। তুমিই তো শ্রেষ্ঠ জীবিকাদাতা।’

[১] ইসলামী শরীয়তে ঈদের উদ্দেশ্য এ নয় যে, এটি জাতীয় পরবের একটি দিন। যাতে যাবতীয় নৈতিক বন্ধন ও শরয়ী বাধা-নিষেধকে উল্লংঘন করে উচ্ছৃঙ্খলভাবে আনন্দ ও উল্লাস প্রকাশ করা হবে, ঘর-বাহির আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হবে এবং নানা অনুষ্ঠান উদযাপন করা হবে; যেমন আজকাল এই ধরনেরই কিছু বুঝে মহা উদ্দীপনার সাথে ঈদের পর্ব পালন করা হয়ে থাকে। বরং আসমানী শরীয়তসমূহে ঈদের মর্যাদা একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছাড়া অন্য কিছু নয়। যার আসল উদ্দেশ্য এই হয় যে, সেদিন জাতির সকল মানুষ জামাআতবদ্ধভাবে মহান আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করবে, সকলে (একাকী) তাকবীর ও তাহমীদের আওয়াজ উঁচু করবে। এখানেও ঈসা (আঃ) যে দিনকে ঈদ বানানোর আশা পোষণ করেছেন, তাতে তাঁর উদ্দেশ্য এই যে, আমরা ঐ ঈদে তোমার প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা করব, তাকবীর ও তাহমীদ পাঠ করব। পক্ষান্তরে কিছু বিদআতী এই 'ঈদে মায়েদাহ' দ্বারা 'ঈদে মীলাদ' (জন্মদিন) প্রমাণ করার প্রয়াস পেয়েছে। অথচ প্রথমতঃ এ ঘটনা আমাদের শরীয়তের নয়; বরং পূর্ববর্তী শরীয়তের, যাকে ইসলাম বহাল রাখতে চাইলে তার স্পষ্ট বিবৃতি থাকত। দ্বিতীয়তঃ নবীর মুখে 'ঈদ' বানানোর কামনা প্রকাশ করা হয়েছিল, আর নবীও আল্লাহর নির্দেশে শরয়ী বিধি-বিধান বর্ণনা করার জন্য অনুমতিপ্রাপ্ত হন। (অর্থাৎ, ঈদ একটি শরয়ী বিধান।) তৃতীয়তঃ ঈদের অর্থ ও উদ্দেশ্য তাই হয়, যা উপরে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু 'ঈদে মীলাদ' (জন্মদিন)এ উপরোক্ত কোন কথাই পাওয়া যায় না। এই জন্য এই ঈদের বিদআত হওয়াতে কোন সন্দেহ থাকার কথা নয়। মুসলিমদের কেবল দুটিই ঈদ; যা ইসলামী শরীয়ত কর্তৃক অনুমোদিত; ঈদুল ফিতব্র ও ঈদুল আযহা। এ ছাড়া তৃতীয় কোন ঈদ নেই।

Al-Maaida 5:114Listen in Qur'an →
115

قَالَ ٱللَّهُ إِنِّى مُنَزِّلُهَا عَلَيْكُمْ ۖ فَمَن يَكْفُرْ بَعْدُ مِنكُمْ فَإِنِّىٓ أُعَذِّبُهُۥ عَذَابًۭا لَّآ أُعَذِّبُهُۥٓ أَحَدًۭا مِّنَ ٱلْعَٰلَمِينَ

আল্লাহ বললেনঃ নিশ্চয় আমি সে খাঞ্চা তোমাদের প্রতি অবতরণ করব। অতঃপর যে ব্যাক্তি এর পরেও অকৃতজ্ঞ হবে, আমি তাকে এমন শাস্তি দেব, যে শাস্তি বিশ্বজগতের অপর কাউকে দেব না।

আল্লাহ বললেন, ‘নিশ্চয় আমি তোমাদের নিকট তা প্রেরণ করব, কিন্তু এরপরও তোমাদের মধ্যে কেউ অবিশ্বাস করলে তাকে এমন শাস্তি দেব, যে শাস্তি বিশ্বজগতের কাউকে দেব না।’ [১]

[১] এই খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা আসমান থেকে অবতীর্ণ হয়েছিল কি না, সে ব্যাপারে কোন সহীহ মারফু হাদীস বর্ণিত হয়নি। কিন্তু অধিকাংশ উলামাগণ সহ ইমাম শাওকানী ও ইমাম জারীর তাবারী (রঃ)গণের উক্তি হচ্ছে; তা আসমান থেকে অবতীর্ণ হয়েছিল। এর প্রমাণে কুরআনের এই আয়াত পেশ করেন, (إنِّي مُنَزِّلُهَا عَلَيْكُم) (নিশ্চয় আমি তোমাদের নিকট তা প্রেরণ করব)। এটা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি যা অবশ্যই সত্য। কিন্তু এটাকে আল্লাহর নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি বলে ধরে নেওয়া সঠিক নয়, কেননা তার পরে (فَمَنْ يَّكْفُر) (কিন্তু এরপরও তোমাদের মধ্যে কেউ অবিশ্বাস করলে) শব্দ দ্বারা উক্ত প্রতিশ্রুতিকে শর্ত-সাপেক্ষ করা হয়। আর এ জন্যই অন্যান্য উলামাগণ বলেন যে, আল্লাহর নিকট এই শর্ত শোনার পর তারা বলেছিল, আমাদের এর কোন প্রয়োজন নেই, ফলে তা আর অবতীর্ণ হয়নি। ইমাম ইবনে কাসীর এ মর্মে ইমাম মুজাহিদ ও হাসান বাসরী কর্তৃক যে উক্তি বর্ণিত হয়েছে, সেই আসার (সলফদের উক্তি)গুলির সনদসমূহকে শুদ্ধ বলে মন্তব্য করেন। তারপর তিনি বলেন যে, এই আসার (উক্তি)গুলির সমর্থন এ কথা থেকেও পাওয়া যায় যে, খাঞ্চা অবতীর্ণ হওয়ার ব্যাপারটা খ্রিষ্টানদের মাঝে প্রসিদ্ধ নয় এবং তাদের কোন কিতাবেও তা উল্লেখ নেই। সুতরাং তা যদি অবতীর্ণ হত, তাহলে অবশ্যই তাদের মধ্যে তা প্রসিদ্ধ থাকা দরকার ছিল, আর সেই সাথে তাদের কিতাবেও একক অথবা বহুধাসূত্রে তা উল্লেখ থাকা প্রয়োজন ছিল।

Al-Maaida 5:115Listen in Qur'an →
116

وَإِذْ قَالَ ٱللَّهُ يَٰعِيسَى ٱبْنَ مَرْيَمَ ءَأَنتَ قُلْتَ لِلنَّاسِ ٱتَّخِذُونِى وَأُمِّىَ إِلَٰهَيْنِ مِن دُونِ ٱللَّهِ ۖ قَالَ سُبْحَٰنَكَ مَا يَكُونُ لِىٓ أَنْ أَقُولَ مَا لَيْسَ لِى بِحَقٍّ ۚ إِن كُنتُ قُلْتُهُۥ فَقَدْ عَلِمْتَهُۥ ۚ تَعْلَمُ مَا فِى نَفْسِى وَلَآ أَعْلَمُ مَا فِى نَفْسِكَ ۚ إِنَّكَ أَنتَ عَلَّٰمُ ٱلْغُيُوبِ

যখন আল্লাহ বললেনঃ হে ঈসা ইবনে মরিয়ম! তুমি কি লোকদেরকে বলে দিয়েছিলে যে, আল্লাহকে ছেড়ে আমাকে ও আমার মাতাকে উপাস্য সাব্যস্ত কর? ঈসা বলবেন; আপনি পবিত্র! আমার জন্যে শোভা পায় না যে, আমি এমন কথা বলি, যা বলার কোন অধিকার আমার নেই। যদি আমি বলে থাকি, তবে আপনি অবশ্যই পরিজ্ঞাত; আপনি তো আমার মনের কথা ও জানেন এবং আমি জানি না যা আপনার মনে আছে। নিশ্চয় আপনিই অদৃশ্য বিষয়ে জ্ঞাত।

আরও (স্মরণ কর) যখন আল্লাহ বলবেন, ‘হে মারয়্যাম-তনয় ঈসা! তুমি কি লোকদেরকে বলেছিলে যে, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত আমাকে ও আমার জননীকে উপাস্যরূপে গ্রহণ কর?’[১] সে বলবে, ‘তুমিই মহিমান্বিত! যা বলার অধিকার আমার নেই, তা বলা আমার জন্য আদৌ শোভনীয় নয়। যদি আমি বলে থাকি, তাহলে তা তো তুমি অবশ্যই জানো। আমার মনে কি আছে, তা তুমি অবগত আছ। কিন্তু তোমার মনে যা আছে, তা আমি অবগত নই,[২] নিশ্চয় তুমি অদৃশ্য সম্বন্ধে পরিজ্ঞাত।

[১] এই প্রশ্ন কিয়ামতের দিন হবে। এর উদ্দেশ্য হল, আল্লাহকে ছেড়ে অন্য কাউকে উপাস্য হিসাবে গ্রহণকারীর জন্য ধমক ও ভীতি প্রদর্শন যে, তোমরা যাকে উপাস্য ও সাহায্যকারী হিসাবে মনে করতে তারা তো নিজেরাই আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করবে। দ্বিতীয়তঃ প্রতীয়মান হয় যে, খ্রিষ্টানরা ঈসা (আঃ) সহ তাঁর মাতা মারয়্যাম ('আলাইহাস্ সালাম)-কেও উপাস্য বানিয়ে নিয়েছিল। তৃতীয়তঃ বুঝা যায় যে, (مِنْ دُوْنِ الله) (আল্লাহ ব্যতীত) উপাস্য কেবল তারাই নয়, যাদেরকে মুশরিকরা পাথর অথবা কাঠের মূর্তি বা প্রতিমা তৈরী করে পূজা করত; যেমন বর্তমানের কবরপূজারী উলামাগণ নিজেদের সাধারণ মানুষদেরকে এই ধারণা দিয়ে ধোঁকায় ফেলে রেখেছেন। বরং আল্লাহর সেই নেক বান্দাগণও 'আল্লাহ ব্যতীত' উপাস্যের মধ্যে শামিল, লোকেরা কোনও পদ্ধতিতে যাঁদের ইবাদত (উপাসনা) করে থাকে। যেমনটি ঈসা (আঃ) ও তাঁর মাতা মারয়্যাম ('আলাইহাস্ সালাম)এর উপাসনা খ্রিষ্টানরা করে।

[২] ঈসা (আঃ) কত স্পষ্ট শব্দে নিজের জন্য গায়বী খবর (অদৃশ্যের জ্ঞান) জানার কথা খন্ডন করছেন।

Al-Maaida 5:116Listen in Qur'an →
117

مَا قُلْتُ لَهُمْ إِلَّا مَآ أَمَرْتَنِى بِهِۦٓ أَنِ ٱعْبُدُوا۟ ٱللَّهَ رَبِّى وَرَبَّكُمْ ۚ وَكُنتُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًۭا مَّا دُمْتُ فِيهِمْ ۖ فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِى كُنتَ أَنتَ ٱلرَّقِيبَ عَلَيْهِمْ ۚ وَأَنتَ عَلَىٰ كُلِّ شَىْءٍۢ شَهِيدٌ

আমি তো তাদেরকে কিছুই বলিনি, শুধু সে কথাই বলেছি যা আপনি বলতে আদেশ করেছিলেন যে, তোমরা আল্লাহর দাসত্ব অবলম্বন কর যিনি আমার ও তোমাদের পালনকর্তা আমি তাদের সম্পর্কে অবগত ছিলাম যতদিন তাদের মধ্যে ছিলাম। অতঃপর যখন আপনি আমাকে লোকান্তরিত করলেন, তখন থেকে আপনিই তাদের সম্পর্কে অবগত রয়েছেন। আপনি সর্ববিষয়ে পূর্ণ পরিজ্ঞাত।

তুমি আমাকে যে আদেশ করেছ, তা ব্যতীত তাদেরকে আমি কিছুই বলিনি। (এবং) তা এই যে, তোমরা আমার ও তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহর উপাসনা কর।[১] আর যতদিন আমি তাদের মধ্যে ছিলাম, ততদিন আমি ছিলাম তাদের ক্রিয়াকলাপের সাক্ষী। কিন্তু যখন তুমি আমাকে তুলে নিলে, তখন তুমিই তো ছিলে তাদের ক্রিয়াকলাপের পর্যবেক্ষক।[২] আর তুমি সর্ব বস্তুর উপর সাক্ষী।

[১] ঈসা (আঃ) তাওহীদ ও এক আল্লাহর ইবাদতের এই দাওয়াত দুধপান কালে দিয়েছিলেন, যেমনটি সূরা মারয়্যামে বলা হয়েছে। অনুরূপ যুবক ও পরিণত বয়সেও (নবুঅত লাভের পরও) এই একই দাওয়াত দিয়েছেন।[২] (تَوَفَّيْتَنِي) এর ভাবার্থ হচ্ছে, যখন তুমি আমাকে পৃথিবী হতে তুলে নিলে, যেমন এর ব্যাখ্যা সূরা আল ইমরানের ৩:৫৫ নং আয়াতে পরিবেশিত হয়েছে। এখান থেকে এ কথাও জানা যায় যে, নবীগণ ততটুকুই (গায়বী খবর) জানতেন, যতটুকুর জ্ঞান আল্লাহ কর্তৃক তাঁদেরকে জানানো হত অথবা নিজের জীবদ্দশায় স্বচক্ষে যা দর্শন করে অর্জন করেছিলেন, এ ছাড়া তাঁদের অন্য কোন (অদেখা) কথার জ্ঞান ছিল না। পক্ষান্তরে অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা তিনিই হন, যিনি অন্যের অবহিত করা ব্যতীত নিজে নিজেই প্রত্যেক জিনিস সম্পর্কে সম্যক অবগত হন এবং যাঁর জ্ঞান আদি ও অন্ত পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত। এই গুণের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ; তিনি ব্যতীত অন্য কারও মধ্যে এই গুণ নেই। আর এ কারণেই একমাত্র তিনিই হচ্ছেন 'আলেমুল গায়ব'। আর তিনি ব্যতীত গায়েব বা অদৃশ্য সম্পর্কে কেউ অবগত নয়। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন নবী করীম (সাঃ)-এর দিকে কিছু উম্মতী আসার চেষ্টা করবে; কিন্তু ফিরিশতাগণ তাদেরকে ধরে অন্য দিকে নিয়ে যাবেন। তখন নবী করীম (সাঃ) তাঁদেরকে বলবেন, 'ওদেরকে আসতে দিন, ওরা তো আমার উম্মত!' কিন্তু ফিরিশতাগণ বলবেন, 'আপনি জানেন না যে, ওরা আপনার তিরোধানের পর আপনার দ্বীনের মধ্যে কি কি বিদআত রচনা করেছিল।' যখন এই কথা শুনবেন, তখন তিনি সেই কথাই বলবেন যা আল্লাহর নেক বান্দা ঈসা (আঃ) বলেছেন, (وَكُنتُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا مَّا دُمْتُ فِيهِمْ فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي كُنتَ أَنتَ الرَّقِيبَ عَلَيْهِمْ) অর্থাৎ, যতদিন আমি তাদের মধ্যে ছিলাম ততদিন আমি ছিলাম তাদের ক্রিয়াকলাপের সাক্ষী। কিন্তু যখন তুমি আমাকে তুলে নিলে তখন তুমিই তো ছিলে তাদের ক্রিয়াকলাপের পর্যবেক্ষক। (বুখারী, মুসলিম)

Al-Maaida 5:117Listen in Qur'an →
118

إِن تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ ۖ وَإِن تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنتَ ٱلْعَزِيزُ ٱلْحَكِيمُ

যদি আপনি তাদেরকে শাস্তি দেন, তবে তারা আপনার দাস এবং যদি আপনি তাদেরকে ক্ষমা করেন, তবে আপনিই পরাক্রান্ত, মহাবিজ্ঞ।

তুমি যদি তাদেরকে শাস্তি দাও, তবে তারা তোমারই বান্দা। আর যদি তাদেরকে ক্ষমা কর, তবে তুমি তো পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।’[১]

[১] অর্থাৎ, হে আল্লাহ! তাদের ব্যাপার তোমার ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। কেননা, তোমার যা ইচ্ছা তাই করতে পার। আর তোমাকে কেউই প্রশ্ন করার ক্ষমতা রাখে না, কেউ প্রতিবাদও করতে পারে না। {لَا يُسْأَلُ عَمَّا يَفْعَلُ وَهُمْ يُسْأَلُونَ}তিনি যা করেন, সে বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা যাবে না, বরং তাদেরকেই প্রশ্ন করা হবে। (আম্বিয়া ২৩) সুতরাং এ আয়াতে আল্লাহর সামনে বান্দাদের অক্ষমতা ও অসহায়তার বহিঃপ্রকাশ হয় এবং আল্লাহর বড়ত্ব ও মহত্ত্ব এবং তাঁর সর্বশক্তিমান ও সকল এখতিয়ারের একচ্ছত্র অধিকারী হওয়ার বিবরণ পাওয়া যায়। আর উক্ত উভয় কথার বরাতে ক্ষমা ও মার্জনার আবেদনও প্রকাশ হয়। সুবহানাল্লাহ! একি বিস্ময়কর ও ভাষালঙ্কারসমৃদ্ধ আয়াত! (আর এ কথার বক্তাও কত বড় দয়াবান!) একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী করীম (সাঃ) এক রাতে এই আয়াত পাঠ করতে করতে তাঁর এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় যে, তিনি এই আয়াত বার বার পড়তেই থাকেন। এমন কি পরিশেষে ফজর হয়ে যায়! (আহমাদ ৫/১৪৯)

Al-Maaida 5:118Listen in Qur'an →
119

قَالَ ٱللَّهُ هَٰذَا يَوْمُ يَنفَعُ ٱلصَّٰدِقِينَ صِدْقُهُمْ ۚ لَهُمْ جَنَّٰتٌۭ تَجْرِى مِن تَحْتِهَا ٱلْأَنْهَٰرُ خَٰلِدِينَ فِيهَآ أَبَدًۭا ۚ رَّضِىَ ٱللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا۟ عَنْهُ ۚ ذَٰلِكَ ٱلْفَوْزُ ٱلْعَظِيمُ

আল্লাহ বললেনঃ আজকের দিনে সত্যবাদীদের সত্যবাদিতা তাদের উপকারে আসবে। তাদের জন্যে উদ্যান রয়েছে, যার তলদেশে নির্ঝরিনী প্রবাহিত হবে; তারা তাতেই চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট। এটিই মহান সফলতা।

আল্লাহ বলবেন, ‘এ সেই (শেষ বিচারের) দিন; যেদিন সত্যবাদিগণকে তাদের সত্যবাদিতা উপকৃত করবে,[১] তাদের জন্য আছে বেহেশত্ যার পাদদেশে নদীমালা প্রবাহিত, তারা সেখানে চিরদিন থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি প্রসন্ন এবং তারাও তাতে সন্তুষ্ট। এটি হল মহাসাফল্য।’

[১] ইবনে আববাস (রাঃ) এর ব্যাখ্যায় বলেন, 'যেদিন তওহীদবাদিগণকে তাঁদের তওহীদ উপকৃত করবে।' অর্থাৎ, মুশরিকদের ক্ষমা ও পরিত্রাণের কোন রাস্তাই থাকবে না।

Al-Maaida 5:119Listen in Qur'an →
120

لِلَّهِ مُلْكُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضِ وَمَا فِيهِنَّ ۚ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَىْءٍۢ قَدِيرٌۢ

নভোমন্ডল, ভূমন্ডল এবং এতদুভয়ে অবস্থিত সবকিছুর আধিপত্য আল্লাহরই। তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।

আকাশ ও ভূমন্ডলে এবং তাদের মধ্যে যা কিছু আছে, তার সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই এবং তিনি সর্ব বিষয়ে শক্তিমান।

Al-Maaida 5:120Listen in Qur'an →

Commentary: Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation. Qur'an text and translation via AlQuran Cloud.