Muslim99Muslim99
← Tafsir library

3. Aal-i-Imraan

The Family of Imraan · Medinan · 200 ayahs

سُورَةُ آلِ عِمۡرَانَ

Reading Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation

Ayahs 71–80 of 200

71

يَٰٓأَهْلَ ٱلْكِتَٰبِ لِمَ تَلْبِسُونَ ٱلْحَقَّ بِٱلْبَٰطِلِ وَتَكْتُمُونَ ٱلْحَقَّ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ

হে আহলে কিতাবগণ, কেন তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে সংমিশ্রণ করছ এবং সত্যকে গোপন করছ, অথচ তোমরা তা জান।

হে আহলে কিতাব (ঐশীগ্রন্থধারীরা)! তোমরা কেন সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত কর এবং জেনে-শুনে সত্য গোপন কর? [১]

[১] এখানে ইয়াহুদীদের দু'টি অতি বড় অপরাধের প্রতি ইঙ্গিত করে তাদেরকে তা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দান করা হচ্ছে। প্রথম অপরাধ হল, ন্যায়-অন্যায় এবং সত্য ও মিথ্যার মধ্যে মিশ্রিত করণ; যাতে মানুষের কাছে সত্য ও মিথ্যা পরিষ্কার না হয়। দ্বিতীয় অপরাধ হল, সত্যকে গোপন করা। অর্থাৎ, নবী করীম (সাঃ)-এর যে নিদর্শন ও গুণাবলী তাওরাতে লিপিবদ্ধ হয়েছে, তা মানুষ থেকে গোপন করা, যাতে কমসে-কম এই নিদর্শনাদির দিক থেকে যেন তাঁর সত্যতা প্রকাশ না হয়ে পড়ে। আর এই উভয় অপরাধ তারা জেনে-শুনেই করত। যার কারণে তারা বড়ই দুর্দশার শিকার হয়েছিল। তাদের অপরাধের কথা সূরা বাক্বারাতেও (২:৪২ আয়াতে) উল্লেখ হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, [وَلا تَلْبِسُوا الْحَقَّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُوا الْحَقَّ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ] অর্থাৎ, "তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশিয়ে দিও না এবং জানা সত্ত্বেও সত্যকে গোপন করো না।" 'আহলে কিতাব' (ঐশীগ্রন্থধারী) শব্দটি কোন কোন মুফাসসিরের নিকট ব্যাপক; যা ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টান উভয়কেই শামিল। অর্থাৎ, তাদের উভয়কেই এই অপরাধ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। আবার কেউ বলেছেন, 'আহলে কিতাব' বলতে ইয়াহুদীদের সেই কয়েকটি গোত্রকে বুঝানো হয়েছে, যারা মদীনায় বসবাস করত। যেমন, বানী ক্বুরাইযা, বানী নায্বীর এবং বানী ক্বাইনুক্বা। আর এই উক্তিকেই সঠিক বলে মনে হচ্ছে। কারণ, (বিভিন্ন কার্যকলাপের তাকীদে) মুসলিমদের সরাসরি সম্পর্ক এদের সাথেই ছিল এবং নবী করীম (সাঃ)-এর সাথে বিরোধিতায় এরাই ছিল অগ্রণী।

Aal-i-Imraan 3:71Listen in Qur'an →
72

وَقَالَت طَّآئِفَةٌۭ مِّنْ أَهْلِ ٱلْكِتَٰبِ ءَامِنُوا۟ بِٱلَّذِىٓ أُنزِلَ عَلَى ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ وَجْهَ ٱلنَّهَارِ وَٱكْفُرُوٓا۟ ءَاخِرَهُۥ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ

আর আহলে-কিতাবগণের একদল বললো, মুসলমানগণের উপর যা কিছু অবর্তীণ হয়েছে তাকে দিনের প্রথম ভাগে মেনে নাও, আর দিনের শেষ ভাগে অস্বীকার ক র, হয়তো তারা মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে।

ঐশীগ্রন্থধারীদের এক দল বলে, ‘যারা বিশ্বাস করেছে, তাদের প্রতি (অর্থাৎ, মুসলিমদের প্রতি) যা অবতীর্ণ হয়েছে দিনের প্রথম ভাগে তা বিশ্বাস কর এবং দিনের শেষ ভাগে তা অস্বীকার কর, হয়তো তারা (ইসলাম থেকে) ফিরতে পারে। [১]

[১] এখানে ইয়াহুদীদের আরো একটি এমন চক্রান্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যে চক্রান্তের মাধ্যমে তারা মুসলিমদেরকে বিভ্রান্ত করতে চাইত। তারা আপোসে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, সকালে মুসলিম হয়ে আবার সন্ধ্যায় কাফের হয়ে যাবে। এ থেকে মুসলিমদের অন্তরেও নিজেদের ইসলামের ব্যাপারে সন্দেহ সৃষ্টি হয়ে যাবে। তারা ভাববে, এরা (ইয়াহুদীরা) ইসলাম গ্রহণ করার পর পুনরায় তাদের দ্বীনে ফিরে গেছে, অতএব হতে পারে ইসলামে বহু এমন দোষ-ত্রুটি আছে, যা তারা (ইয়াহুদীরা) জানতে পেরেছে।

Aal-i-Imraan 3:72Listen in Qur'an →
73

وَلَا تُؤْمِنُوٓا۟ إِلَّا لِمَن تَبِعَ دِينَكُمْ قُلْ إِنَّ ٱلْهُدَىٰ هُدَى ٱللَّهِ أَن يُؤْتَىٰٓ أَحَدٌۭ مِّثْلَ مَآ أُوتِيتُمْ أَوْ يُحَآجُّوكُمْ عِندَ رَبِّكُمْ ۗ قُلْ إِنَّ ٱلْفَضْلَ بِيَدِ ٱللَّهِ يُؤْتِيهِ مَن يَشَآءُ ۗ وَٱللَّهُ وَٰسِعٌ عَلِيمٌۭ

যারা তোমাদের ধর্মমতে চলবে, তাদের ছাড়া আর কাউকে বিশ্বাস করবে না। বলে দিন নিঃসন্দেহে হেদায়েত সেটাই, যে হেদায়েত আল্লাহ করেন। আর এসব কিছু এ জন্যে যে, তোমরা যা লাভ করেছিলে তা অন্য কেউ কেন প্রাপ্ত হবে, কিংবা তোমাদের পালনকর্তার সামনে তোমাদের উপর তারা কেন প্রবল হয়ে যাবে! বলে দিন, মর্যাদা আল্লাহরই হাতে; তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন এবং আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও সর্বজ্ঞ।

আর যারা তোমাদের মতাদর্শের অনুসরণ করে, তাকে ব্যতীত আর কাকেও বিশ্বাস করো না।’[১] বল, ‘নিশ্চয় আল্লাহর নির্দেশিত পথই (একমাত্র) পথ।’ [২] (তারা এ কথাও বলে, ‘তোমরা এও বিশ্বাস করো না যে,) তোমাদের যা দেওয়া হয়েছে অনুরূপ অন্য কাউকেও দেওয়া হবে[৩] অথবা তোমাদের প্রতিপালকের সম্মুখে তারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুক্তি উত্থাপন করবে।’ বল, ‘অনুগ্রহ আল্লাহরই হাতে; তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করেন। বস্তুতঃ আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।

[১] এ কথা তারা আপোসে একে অপরকে বলত। অর্থাৎ, তোমরা বাহ্যিকভাবে অবশ্যই ইসলাম প্রকাশ কর, কিন্তু নিজেদের ধর্মাবলম্বি ছাড়া অন্য কারো কথা বিশ্বাস করো না।

[২] এটা এমন এক স্বতন্ত্র বাক্য যার পূর্ব ও পরের সাথে কোন সম্পর্ক নেই। কেবল তাদের চক্রান্ত ও হিলা-বাহানার প্রকৃতত্ব ব্যাপারে অবহিত করা উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, বল, তোমাদের ছলনা ও প্রতারণায় কিছু হবে না। কারণ, হিদায়াত তো আল্লাহর হাতে। তিনি যাকে হিদায়াত দেবেন অথবা দিতে চাইবেন, তোমাদের হিলা-বাহানা তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না।

[৩] এটাও ইয়াহুদীদের একটি উক্তি। এর সম্পর্ক হল وَلاَ تُؤْمِنُوْا (---কাকেও বিশ্বাস করো না) বাক্যের সাথে। অর্থাৎ, এটাও বিশ্বাস করো না যে, যে নবুঅত ইত্যাদি তোমাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তা অন্য কেউ পেতে পারে এবং ইয়াহুদী ধর্ম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম সত্য হতে পারে।

Aal-i-Imraan 3:73Listen in Qur'an →
74

يَخْتَصُّ بِرَحْمَتِهِۦ مَن يَشَآءُ ۗ وَٱللَّهُ ذُو ٱلْفَضْلِ ٱلْعَظِيمِ

তিনি যাকে ইচ্ছা নিজের বিশেষ অনুগ্রহ দান করেন। আর আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল।

যাকে ইচ্ছা তিনি নিজ করুণা দ্বারা নির্বাচিত করেন। আর আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল।’ [১]

[১] এই আয়াতের দু'টি অর্থ করা হয়। একটি হল, ইয়াহুদীদের বড় বড় পন্ডিতরা যখন তাদের শিষ্যদেরকে শিখাত যে, তোমরা সকালে মুসলিম হয়ে আবার সন্ধ্যায় কাফের হয়ে যেও, যাতে যারা সত্যিকারে মুসলিম হয়ে গেছে, তারাও সন্দিহানে পড়ে ইসলাম থেকে ফিরে যায়, তখন সেই শিষ্যদেরকে অতিরিক্ত তাকীদ এও করত যে, সাবধান! তোমরা কেবল বাহ্যিক মুসলিম হয়ো; সত্যিকারের নয়। বরং সত্যিকারে তোমরা ইয়াহুদীই থাকবে এবং কখনোও এ কথা মনে করো না যে, যে অহী ও শরীয়ত এবং যে জ্ঞান ও মর্যাদা তোমরা লাভ করেছ, তা অন্য কেউ লাভ করতে পারে অথবা তোমরা ব্যতীত অন্য কেউ সত্যের উপর আছে, যে তোমাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে হুজ্জত কায়েম করে তোমাদেরকে মিথ্যা সাব্যস্ত করতে পারবে। এই অর্থের দিক দিয়ে মাঝে স্বতন্ত্র বাক্যটি ছাড়া عِنْدَ رَبِّكُمْ পর্যন্ত সম্পূর্ণটাই ইয়াহুদীদের কথা। দ্বিতীয় অর্থ হল, হে ইয়াহুদ সম্প্রদায়! তোমরা সত্যকে দাবানো ও মিটানোর জন্য যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছ এবং যেসব চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছ, তা কেবল এই জন্যই যে, প্রথমতঃ এ ব্যাপারে তোমরা দুঃখ ও হিংসা-জ্বালায় ভুগছ যে, যে জ্ঞান ও মর্যাদা, অহী ও শরীয়ত এবং যে দ্বীন তোমাদেরকে দেওয়া হয়েছিল, তদ্রূপ জ্ঞান ও মর্যাদা এবং দ্বীন অন্যদেরকে কেন দেওয়া হল? দ্বিতীয়তঃ তোমরা আশঙ্কা কর যে, সত্যের এই দাওয়াত যদি অগ্রগতি লাভ করে এবং তার শিকড় যদি মজবুত হয়ে যায়, তাহলে শুধু যে দুনিয়া থেকে তোমাদের মান-মর্যাদা চলে যাবে তা নয়, বরং যে সত্যকে তোমরা গোপন করে রেখেছ, তাও মানুষের কাছে প্রকাশ হয়ে যাবে। আর এ কারণেই মানুষ আল্লাহর কাছে তোমাদের বিরুদ্ধে হুজ্জত খাড়া করবে। অথচ তোমাদের জানা উচিত যে, দ্বীন ও শরীয়ত হল আল্লাহর অনুগ্রহ। এটা কারো উত্তরাধিকার সূত্রে লব্ধ জিনিস নয়, বরং তিনি তাঁর অনুগ্রহ যাকে ইচ্ছা দান করেন এবং এ অনুগ্রহ কাকে দেওয়া উচিত তাও তিনিই জানেন।

Aal-i-Imraan 3:74Listen in Qur'an →
75

۞ وَمِنْ أَهْلِ ٱلْكِتَٰبِ مَنْ إِن تَأْمَنْهُ بِقِنطَارٍۢ يُؤَدِّهِۦٓ إِلَيْكَ وَمِنْهُم مَّنْ إِن تَأْمَنْهُ بِدِينَارٍۢ لَّا يُؤَدِّهِۦٓ إِلَيْكَ إِلَّا مَا دُمْتَ عَلَيْهِ قَآئِمًۭا ۗ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا۟ لَيْسَ عَلَيْنَا فِى ٱلْأُمِّيِّۦنَ سَبِيلٌۭ وَيَقُولُونَ عَلَى ٱللَّهِ ٱلْكَذِبَ وَهُمْ يَعْلَمُونَ

কোন কোন আহলে কিতাব এমনও রয়েছে, তোমরা যদি তাদের কাছে বহু ধন-সম্পদ আমানত রাখ, তাহলেও তা তোমাদের যথারীতি পরিশোধ করবে। আর তোদের মধ্যে অনেক এমনও রয়েছে যারা একটি দীনার গচ্ছিত রাখলেও ফেরত দেবে না-যে পর্যন্ত না তুমি তার মাথার উপর দাঁড়াতে পারবে। এটা এজন্য যে, তারা বলে রেখেছে যে, উম্মীদের অধিকার বিনষ্ট করাতে আমাদের কোন পাপ নেই। আর তারা আল্লাহ সম্পর্কে জেনে শুনেই মিথ্যা বলে।

ঐশীগ্রন্থধারীদের মধ্যে এমন লোক রয়েছে যে, তার কাছে বিপুল সম্পদ আমানত রাখলেও (চাওয়া মাত্র) সে ফেরৎ দেবে। পক্ষান্তরে তাদের মধ্যে এমন লোকও আছে, যার নিকট একটি দীনার (স্বর্ণমুদ্রা)ও আমানত রাখলে তার পিছনে লেগে না থাকলে সে ফেরৎ দেবে না। কারণ, তারা বলে যে, ‘এই অশিক্ষিত (অইয়াহুদী)দের অধিকার হরণে আমাদের কোন পাপ নেই।’ বস্তুতঃ তারা জেনে-শুনে আল্লাহর নামে মিথ্যা বলে।[১]

[১] أُمِّيِيْنَ (নিরক্ষর-অশিক্ষিত) বলতে আরবের মুশরিকদেরকে বুঝানো হয়েছে। বিশ্বাসঘাতক ইয়াহুদীরা দাবী করত যে, এরা যেহেতু মুশরিক তাই তাদের সম্পদ আত্মসাৎ করা বৈধ, এতে কোন গুনাহ নেই। মহান আল্লাহ বললেন, এরা আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা বলছে। অপরের সম্পদ আত্মসাৎ করার অনুমতি আল্লাহ কিভাবে দিতে পারেন? কোন কোন তফসীরের বর্ণনায় এসেছে যে, নবী করীম (সাঃ) এ কথা শুনে বললেন, "আল্লাহর শত্রুরা মিথ্যা বলেছে। কেবল আমানত ছাড়া জাহেলী যুগের সমস্ত জিনিস আমার পায়ের নীচে। আমানত সর্বাবস্থায় আদায় করতে হবে, তাতে তা কোন সৎ লোকের হোক বা অসৎ লোকের।" (ইবনে কাসীর-ফাতহুল ক্বাদীর) অনুতাপের বিষয় যে, ইয়াহুদীদের মত বর্তমানেও অনেক মুসলিম মুশরিকদের মাল আত্মসাৎ করার জন্য বলছে যে, 'দারুল হারব' (ইসলামের শত্রু কাফের দেশ)এ সূদ হালাল এবং শত্রুর মালের কোন হিফাযত নেই।

Aal-i-Imraan 3:75Listen in Qur'an →
76

بَلَىٰ مَنْ أَوْفَىٰ بِعَهْدِهِۦ وَٱتَّقَىٰ فَإِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلْمُتَّقِينَ

যে লোক নিজ প্রতিজ্ঞা পূর্ন করবে এং পরহেজগার হবে, অবশ্যই আল্লাহ পরহেজগারদেরকে ভালবাসেন।

অবশ্যই যে তার অঙ্গীকার পালন করে এবং সংযত হয়ে চলে, নিশ্চয় আল্লাহ সংযমীদেরকে ভালবাসেন। [১]

[১] 'অঙ্গীকার পালন করা'র অর্থ হল, সেই অঙ্গীকার রক্ষা করা যা আহলে-কিতাব (ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টান) এবং প্রত্যেক নবীর মাধ্যমে তাঁদের নিজ নিজ উম্মতের কাছ থেকে নবী করীম (সাঃ)-এর উপর ঈমান আনার ব্যাপারে নেওয়া হয়েছে। আর 'সংযত হয়ে চলা' (বা আল্লাহভীরুতা অবলম্বন করা)র অর্থ হল, মহান আল্লাহ কর্তৃক হারামকৃত জিনিস থেকে দূরে থাকা এবং রাসূলে করীম (সাঃ) কর্তৃক নির্দেশিত সমস্ত বিষয়ের উপর আমল করা। যারা এ রকম করে, তারা অবশ্যই আল্লাহর পাকড়াও থেকে রক্ষা পাবে এবং তাঁর প্রিয় বান্দা বলেও গণ্য হবে।

Aal-i-Imraan 3:76Listen in Qur'an →
77

إِنَّ ٱلَّذِينَ يَشْتَرُونَ بِعَهْدِ ٱللَّهِ وَأَيْمَٰنِهِمْ ثَمَنًۭا قَلِيلًا أُو۟لَٰٓئِكَ لَا خَلَٰقَ لَهُمْ فِى ٱلْءَاخِرَةِ وَلَا يُكَلِّمُهُمُ ٱللَّهُ وَلَا يَنظُرُ إِلَيْهِمْ يَوْمَ ٱلْقِيَٰمَةِ وَلَا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌۭ

যারা আল্লাহর নামে কৃত অঙ্গীকার এবং প্রতিজ্ঞা সামান্য মুল্যে বিক্রয় করে, আখেরাতে তাদের কেন অংশ নেই। আর তাদের সাথে কেয়ামতের দিন আল্লাহ কথা বলবেন না। তাদের প্রতি (করুণার) দৃষ্টিও দেবেন না। আর তাদেরকে পরিশুদ্ধও করবেন না। বস্তুতঃ তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব।

যারা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি এবং নিজেদের শপথকে স্বল্প মূল্যে বিক্রয় করে, পরকালে তাদের কোন অংশ নেই। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না, আর তাদের দিকে চেয়ে দেখবেন না এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধও করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।[১]

[১] উল্লিখিত লোকদের বিপরীত যারা, তাদের অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে। এরা হল দুই শ্রেণীর লোক। এক শ্রেণীর লোক এমন যারা আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার এবং নিজেদের কসমের কোন পরোয়া না করে দুনিয়ার সামান্য স্বার্থের খাতিরে নবী করীম (সাঃ)-এর উপর ঈমান আনেনি। আর দ্বিতীয় শ্রেণীর লোক হল এমন যারা মিথ্যা কসম খেয়ে নিজেদের মাল বিক্রি করে অথবা কারো মাল আত্মসাৎ করে। যেমন, হাদীসে নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, "যে ব্যক্তি কারো সম্পদ আত্মসাৎ করার জন্য মিথ্যা কসম খায়, সে আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করবে যে, তিনি তার উপর ক্রোধান্বিত থাকবেন।" (বুখারী ৭৪৪৫, মুসলিম ১৩৭নং) অনুরূপ তিনি বলেছেন, "তিন ব্যক্তির সাথে মহান আল্লাহ কথা বলবেন না, তাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করবেন না, তাদেরকে পবিত্র করবেন না এবং তাদের জন্য হবে কঠিন শাস্তি। তাদের মধ্যে একজন হল এমন ব্যক্তি যে মিথ্যা কসম দ্বারা নিজের পণ্যসামগ্রী বিক্রি করে।" (মুসলিম ১০৬নং) আরো বিভিন্ন হাদীসে এ কথা বর্ণিত হয়েছে। (ইবনে কাসীর-ফাতহুল ক্বাদীর)

Aal-i-Imraan 3:77Listen in Qur'an →
78

وَإِنَّ مِنْهُمْ لَفَرِيقًۭا يَلْوُۥنَ أَلْسِنَتَهُم بِٱلْكِتَٰبِ لِتَحْسَبُوهُ مِنَ ٱلْكِتَٰبِ وَمَا هُوَ مِنَ ٱلْكِتَٰبِ وَيَقُولُونَ هُوَ مِنْ عِندِ ٱللَّهِ وَمَا هُوَ مِنْ عِندِ ٱللَّهِ وَيَقُولُونَ عَلَى ٱللَّهِ ٱلْكَذِبَ وَهُمْ يَعْلَمُونَ

আর তাদের মধ্যে একদল রয়েছে, যারা বিকৃত উচ্চারণে মুখ বাঁকিয়ে কিতাব পাঠ করে, যাতে তোমরা মনে কর যে, তার কিতাব থেকেই পাঠ করছে। অথচ তারা যা আবৃত্তি করছে তা আদৌ কিতাব নয়। এবং তারা বলে যে, এসব কথা আল্লাহর তরফ থেকে আগত। অথচ এসব আল্লাহর তরফ থেকে প্রেরিত নয়। তারা বলে যে, এটি আল্লাহর কথা অথচ এসব আল্লাহর কথা নয়। আর তারা জেনে শুনে আল্লাহরই প্রতি মিথ্যারোপ করে।

নিশ্চয় তাদের মধ্যে একদল লোক এমনও আছে যারা এরূপভাবে জিহ্বা বাঁকিয়ে কিতাব পাঠ করে, যাতে তোমরা মনে কর, তা আল্লাহর কিতাব; কিন্তু তা কিতাবের অংশ নয়। আর তারা বলে, ‘তা আল্লাহর নিকট থেকে (সমাগত)’; কিন্তু তা আল্লাহর নিকট থেকে (সমাগত) নয় এবং তারা জেনে-শুনে আল্লাহর নামে মিথ্যা বলে। [১]

[১] এখানে ইয়াহুদীদের সেই লোকদের কথা তুলে ধরা হয়েছে, যারা আল্লাহর কিতাবের (তাওরাতের) মধ্যে কেবল হেরফের ও পরিবর্তন সাধনই করেনি, বরং আরো দু'টি অপরাধ করেছে। তার একটি হল, বিকৃত উচ্চারণে মুখ বাঁকিয়ে কিতাব পাঠ করে এবং এ থেকে তারা সাধারণের মধ্যে বাস্তব পরিপন্থী প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়। দ্বিতীয়টি হল, তারা তাদের মনগড়া কথাগুলোকে আল্লাহর কথা বলে চালিয়ে দেয়। দুর্ভাগ্যবশতঃ উম্মাতে মুহাম্মাদিয়ার মযহাবধারী উলামাদের মধ্যেও নবী করীম (সাঃ)-এর এই উক্তি "তোমরা পূর্ববর্তীদের তরীকার অনুসরণ করবে" অনুযায়ী অনেক এমন লোকও বিদ্যমান রয়েছে, যারা দুনিয়ার স্বার্থে অথবা মযহাবী পক্ষপাতিত্ব কিংবা ফিক্বাহকে বেশী শক্ত করে ধরে থাকার ফলে কুরআন কারীমের সাথেও অনুরূপ আচরণ করে থাকে। তারা কুরআনের আয়াত তো পড়ে; কিন্তু মাসআলা বয়ান করে নিজেদের মনগড়া। সাধারণ লোক মনে করে যে, মৌলভী সাহেব মাসআলা কুরআন থেকেই বলছেন। অথচ বর্ণিত মাসআলার কুরআনের সাথে কোন সম্পর্ক থাকে না। আবার কখনো অর্থের পরিবর্তন ঘটিয়ে অতি চমৎকার ভঙ্গিমায় পরিবেশন করে এটাই বুঝাতে চেষ্টা করে যে, এ নির্দেশ আল্লাহর পক্ষ হতে! এ থেকে আল্লাহ আমাদেরকে পানাহ দিন। আমীন।

Aal-i-Imraan 3:78Listen in Qur'an →
79

مَا كَانَ لِبَشَرٍ أَن يُؤْتِيَهُ ٱللَّهُ ٱلْكِتَٰبَ وَٱلْحُكْمَ وَٱلنُّبُوَّةَ ثُمَّ يَقُولَ لِلنَّاسِ كُونُوا۟ عِبَادًۭا لِّى مِن دُونِ ٱللَّهِ وَلَٰكِن كُونُوا۟ رَبَّٰنِيِّۦنَ بِمَا كُنتُمْ تُعَلِّمُونَ ٱلْكِتَٰبَ وَبِمَا كُنتُمْ تَدْرُسُونَ

কোন মানুষকে আল্লাহ কিতাব, হেকমত ও নবুওয়ত দান করার পর সে বলবে যে, ‘তোমরা আল্লাহকে পরিহার করে আমার বান্দা হয়ে যাও’-এটা সম্ভব নয়। বরং তারা বলবে, ‘তোমরা আল্লাহওয়ালা হয়ে যাও, যেমন, তোমরা কিতাব শিখাতে এবং যেমন তোমরা নিজেরা ও পড়তে।

(হে ঐশীগ্রন্থধারিগণ!) কোন মানুষের পক্ষে এ হতে পারে না যে, আল্লাহ তাকে কিতাব, প্রজ্ঞা ও নবুঅত দান করেন, তারপর সে লোকদেরকে বলে, ‘তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে আমার দাস হয়ে যাও।’ বরং সে বলে, ‘তোমরা রাব্বানী (আল্লাহ-ভক্ত) হও’;[১] যেহেতু তোমরা কিতাব শিক্ষা দাও এবং যেহেতু তোমরা অধ্যয়ন কর। [২]

[১] এখানে খ্রিষ্টানদের ব্যাপারে বলা হচ্ছে। তারা ঈসা (আঃ)-কে প্রভু বানিয়ে রেখেছে। অথচ তিনি হলেন একজন মানুষ। তাঁকে কিতাব, হিকমত এবং নবুঅত দানে ধন্য করা হয়েছিল। আর এ দাবী কেউ করতে পারে না যে, আল্লাহকে বাদ দিয়ে আমার পূজারী ও দাস হয়ে যাও, বরং তিনি তো এ কথাই বলেন যে, তোমরা আল্লাহ ওয়ালা হয়ে যাও। 'রব্বানী' রব্ব শব্দের সাথে সম্বন্ধ। 'মুবালাগা' তথা আধিক্য বুঝানোর জন্য 'আলিফ' ও 'নুন'কে বৃদ্ধি করা হয়েছে। (ফাতহুল ক্বাদীর)

[২] অর্থাৎ, আল্লাহর কিতাব শিখানো ও নিজেদের পড়ার ফলস্বরূপ প্রতিপালককে চেনা এবং তাঁর সাথে বিশেষ সম্পর্ক কায়েম হওয়া উচিত। অনুরূপ আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে জ্ঞাত ব্যক্তিদের জন্য অত্যাবশ্যক হল, তারা অন্য লোকদেরকেও তার শিক্ষা দেবে। এই আয়াত দ্বারা এ কথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, যখন আল্লাহর পয়গম্বরদের এ অধিকার নেই যে, তাঁরা লোকদেরকে তাঁদের ইবাদত করার নির্দেশ দেবে, তখন অন্য আর কারো এ অধিকার কিভাবে থাকতে পারে? (তফসীর ইবনে কাসীর)

Aal-i-Imraan 3:79Listen in Qur'an →
80

وَلَا يَأْمُرَكُمْ أَن تَتَّخِذُوا۟ ٱلْمَلَٰٓئِكَةَ وَٱلنَّبِيِّۦنَ أَرْبَابًا ۗ أَيَأْمُرُكُم بِٱلْكُفْرِ بَعْدَ إِذْ أَنتُم مُّسْلِمُونَ

তাছাড়া তোমাদেরকে একথা বলাও সম্ভব নয় যে, তোমরা ফেরেশতা ও নবীগনকে নিজেদের পালনকর্তা সাব্যস্ত করে নাও। তোমাদের মুসলমান হবার পর তারা কি তোমাদেরকে কুফরী শেখাবে?

আর তোমাদেরকে এও নির্দেশ দেবে না যে, ‘ফিরিশতাগণ ও নবীগণকে প্রতিপালকরূপে গ্রহণ কর।’ তোমাদের ইসলাম গ্রহণ করার পর সে কি তোমাদেরকে কুফরী করার আদেশ দেবে? [১]

[১] অর্থাৎ, নবী, ফিরিশতা অথবা অন্য কাউকে আল্লাহর গুণাবলীর অধিকারী বিশ্বাস করানো কুফরী। তোমাদের ইসলাম গ্রহণ করার পর একজন নবী এ কাজ কি করে করতে পারে? কারণ, একজন নবীর কাজ তো ঈমানের প্রতি আহবান করা। আর ঈমান হল সেই শরীকবিহীন এক আল্লাহর ইবাদত করার নাম। কোন কোন মুফাসসির এই আয়াতের শানে নুযুল (পটভূমিকা) সম্পর্কে বলেছেন যে, কিছু মুসলিম নবী করীম (সাঃ)-এর নিকট তাঁকে সিজদা করার অনুমতি চাইলে এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। (ফাতহুল ক্বাদীর) আবার কেউ কেউ এর শানে নুযুল সম্পর্কে বলেছেন, ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানরা একত্রিত হয়ে নবী করীম (সাঃ)-কে বলল, 'তুমি কি চাও যে, আমরা তোমার ঐভাবেই ইবাদত করি, যেভাবে খ্রিষ্টানরা ঈসার করে থাকে?' তখন তিনি বললেন, 'আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কারো ইবাদত করা থেকে অথবা কাউকে এর নির্দেশ দেওয়া থেকে আমি তাঁর আশ্রয় কামনা করছি। মহান আল্লাহ না আমাকে এর জন্য পাঠিছেন, আর না এর নির্দেশ দিয়েছেন।' এই কথারই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াত নাযিল হয়। (ইবনে কাসীর-সীরাতে ইবনে হিশাম)

Aal-i-Imraan 3:80Listen in Qur'an →

Commentary: Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation. Qur'an text and translation via AlQuran Cloud.