Muslim99Muslim99
← Tafsir library

3. Aal-i-Imraan

The Family of Imraan · Medinan · 200 ayahs

سُورَةُ آلِ عِمۡرَانَ

Reading Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation

Ayahs 111–120 of 200

111

لَن يَضُرُّوكُمْ إِلَّآ أَذًۭى ۖ وَإِن يُقَٰتِلُوكُمْ يُوَلُّوكُمُ ٱلْأَدْبَارَ ثُمَّ لَا يُنصَرُونَ

যৎসামান্য কষ্ট দেয়া ছাড়া তারা তোমাদের কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। আর যদি তারা তোমাদের সাথে লড়াই করে, তাহলে তারা পশ্চাদপসরণ করবে। অতঃপর তাদের সাহায্য করা হবে না।

সামান্য ক্লেশ দেওয়া ছাড়া কদাচ তারা তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। যদি তারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে, তাহলে তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে, অতঃপর তারা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না। [১]

[১]أَذًى (কষ্ট দেওয়া) বলতে মৌখিকভাবে মিথ্যা অপবাদ রটানো। এর দ্বারা সাময়িকভাবে অবশ্যই কষ্ট হয়। তবে যুদ্ধের ময়দানে তোমাদেরকে পরাজিত করতে পারবে না। হলও তা-ই। মদীনা থেকেও ইয়াহুদীদেরকে বের হতে হল। অতঃপর খায়বার জয় করলে সেখান থেকেও বের হল। অনুরূপ শাম (সিরিয়া) অঞ্চলে খ্রিষ্টানদেরকে মুসলিমদের হাতে পরাজিত হতে হয়। ক্রুসেড যুদ্ধে খ্রিষ্টানরা এর প্রতিশোধ গ্রহণ করার প্রচেষ্টা চালায় এবং বায়তুল মুক্বাদ্দাস দখল করে নেয়। কিন্তু সুলতান সালাহুদ্দীন আয়্যূবী ৯০ বছর পর পুনরায় তা ফিরিয়ে আনেন। বর্তমানে মুসলিমদের ঈমানী দুর্বলতার ফল স্বরূপ এবং ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের মিলিত চক্রান্ত ও প্রচেষ্টায় বায়তুল মুক্বাদ্দাস আবারও মুসলিমদের হাতছাড়া হয়েছে। তবে অতি সত্বর এমন সময় আসবে যে, অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে, বিশেষ করে ঈসা (আঃ)-এর অবতরণের পর খ্রিষ্টবাদের পরিসমাপ্তি ঘটবে এবং সহীহ হাদীসসমূহের বর্ণনা অনুযায়ী ইসলামের বিজয় সুনিশ্চিত হবে। (ইবনে কাসীর)

Aal-i-Imraan 3:111Listen in Qur'an →
112

ضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ ٱلذِّلَّةُ أَيْنَ مَا ثُقِفُوٓا۟ إِلَّا بِحَبْلٍۢ مِّنَ ٱللَّهِ وَحَبْلٍۢ مِّنَ ٱلنَّاسِ وَبَآءُو بِغَضَبٍۢ مِّنَ ٱللَّهِ وَضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ ٱلْمَسْكَنَةُ ۚ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ كَانُوا۟ يَكْفُرُونَ بِـَٔايَٰتِ ٱللَّهِ وَيَقْتُلُونَ ٱلْأَنۢبِيَآءَ بِغَيْرِ حَقٍّۢ ۚ ذَٰلِكَ بِمَا عَصَوا۟ وَّكَانُوا۟ يَعْتَدُونَ

আল্লাহর প্রতিশ্রুতি কিংবা মানুষের প্রতিশ্রুতি ব্যতিত ওরা যেখানেই অবস্থান করেছে সেখানেই তাদের ওপর লাঞ্ছনা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। আর ওরা উপার্জন করেছে আল্লাহর গযব। ওদের উপর চাপানো হয়েছে গলগ্রহতা। তা এজন্যে যে, ওরা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অনবরত অস্বীকার করেছে এবং নবীগনকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে। তার কারণ, ওরা নাফরমানী করেছে এবং সীমা লংঘন করেছে।

আল্লাহ ও মানুষের আশ্রয় ছাড়া[১] যেখানেই তারা অবস্থান করুক না কেন, সেখানেই তাদের ভাগ্যে লাঞ্ছনা নির্ধারিত করা হয়েছে, তারা আল্লাহর ক্রোধের পাত্র হয়েছে এবং তাদের জন্য দারিদ্র্য বিধিবদ্ধ করা হয়েছে। এ জন্য যে, তারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহ অস্বীকার করত এবং অন্যায়রূপে নবীগণকে হত্যা করত। আর এ কারণে যে, তারা অবাধ্য হয়েছিল এবং সীমালংঘন করেছিল। [২]

[১] আল্লাহর গযবের ফল স্বরূপ ইয়াহুদীদের উপর যে লাঞ্ছনা ও দরিদ্রতা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা থেকে সাময়িকভাবে বাঁচার দু'টি উপায় বলা হয়েছে। এক হল, তাদেরকে আল্লাহর আশ্রয়ে আসতে হবে। অর্থাৎ, হয় তারা ইসলাম গ্রহণ করবে অথবা ইসলামী দেশে কর বা ট্যাক্স দিয়ে আশ্রিত হয়ে থাকা পছন্দ করবে। দ্বিতীয় হল, তারা মানুষের আশ্রয় লাভ করবে। আর এর দু'টি ব্যাখ্যা করা হয়েছে, (ক) ইসলামী দেশের সরকার নয়, বরং কোন সাধারণ মুসলিম তাদের আশ্রয় দেবে। আর এই অধিকার প্রত্যেক মুসলিমের আছে এবং দেশের সরকারকে তাকীদ করা হয়েছে যে, সে যেন কোন নিম্ন পর্যায়ের মুসলিমের দেওয়া আশ্রয়কেও প্রত্যাখ্যান না করে। (খ) তারা বড় কোন অমুসলিম শক্তির সহায়তা লাভ করবে। কারণ, 'নাস' (মানুষ) সাধারণ শব্দ যা মুসলিম ও অমুসলিম সকলকেই শামিল করে।

[২] এ হল তাদের কুকর্ম, যার প্রতিফল স্বরূপ তাদের উপর লাঞ্ছনা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

Aal-i-Imraan 3:112Listen in Qur'an →
113

۞ لَيْسُوا۟ سَوَآءًۭ ۗ مِّنْ أَهْلِ ٱلْكِتَٰبِ أُمَّةٌۭ قَآئِمَةٌۭ يَتْلُونَ ءَايَٰتِ ٱللَّهِ ءَانَآءَ ٱلَّيْلِ وَهُمْ يَسْجُدُونَ

তারা সবাই সমান নয়। আহলে কিতাবদের মধ্যে কিছু লোক এমনও আছে যারা অবিচলভাবে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করে এবং রাতের গভীরে তারা সেজদা করে।

তারা সকলে সমান নয়।[১] ঐশীগ্রন্থধারীদের মধ্যে একটি হকপন্থী দল আছে; তারা রাত্রিকালে নামাযরত অবস্থায় আল্লাহর আয়াত পাঠ করে।

[১] অর্থাৎ, পূর্বের আয়াতে যেসব আহলে-কিতাবের নিন্দাবাদ আলোচিত হয়েছে, তাদের সকলে এক রকম ছিল না, বরং তাদের মধ্যে কিছু ভাল মানুষও ছিলেন। যেমন, আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম, উসায়েদ ইবনে উবায়েদ, সা'লাবা ইবনে সা'য়্যাহ এবং উসায়েদ ইবনে সা'য়্যাহ প্রভৃতি যাঁরা আল্লাহর তাওফীকে ইসলাম কবুল করার মর্যাদা লাভে ধন্য হন এবং তাঁদের মধ্যে ঈমান ও আল্লাহভীরুতার গুণ বিদ্যমান ছিল- রাযীআল্লাহু আনহুম অ রাযু আনহু- (আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হন এবং তাঁরাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট।) أمَّة قَائِمَةٌ (হকপন্থী দল) এর অর্থ হল, শরীয়তের এবং নবী করীম (সাঃ)-এর অনুসরণ ও আনুগত্যকারী দল। يَسْجُدُوْنَ (সিজদা বা নামায পড়া)এর অর্থ হল, তারা রাত জেগে তাহাজ্জুদের নামায আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করে এবং নামাযে কুরআন তেলাঅত করে। ভাল কাজের আদেশের অর্থ এখানে কেউ কেউ এই করেছেন যে, তারা নবী করীম (সাঃ)-এর উপর ঈমান আনার নির্দেশ দিতো এবং তাঁর বিরোধিতা করতে নিষেধ করত। এই দলের কথা অন্য আয়াতেও আলোচিত হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, "নিশ্চয় গ্রন্থধারীদের মধ্যে এমন অনেকে রয়েছে যারা আল্লাহতে, তোমাদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং তাদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তাতে আল্লাহর নিকট বিনয়াবনত হয়ে বিশ্বাস করে এবং আল্লাহর আয়াতকে স্বল্পমূল্যে বিক্রয় করে না; এরাই তো সেই সকল লোক যাদের জন্য আল্লাহর নিকট পুরস্কার রয়েছে। নিশ্চয় আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।" (সূরা আলে ইমরান ৩:১৯৯ আয়াত)

Aal-i-Imraan 3:113Listen in Qur'an →
114

يُؤْمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلْيَوْمِ ٱلْءَاخِرِ وَيَأْمُرُونَ بِٱلْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ ٱلْمُنكَرِ وَيُسَٰرِعُونَ فِى ٱلْخَيْرَٰتِ وَأُو۟لَٰٓئِكَ مِنَ ٱلصَّٰلِحِينَ

তারা আল্লাহর প্রতি ও কিয়ামত দিবসের প্রতি ঈমান রাখে এবং কল্যাণকর বিষয়ের নির্দেশ দেয়; অকল্যাণ থেকে বারণ করে এবং সৎকাজের জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করতে থাকে। আর এরাই হল সৎকর্মশীল।

তারা আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সৎকার্যের নির্দেশ দেয়, অসৎ কার্য (করা থেকে) নিষেধ করে এবং তারা সৎকার্যে তৎপর থাকে। তারাই সজ্জনদের অন্তর্ভুক্ত।

Aal-i-Imraan 3:114Listen in Qur'an →
115

وَمَا يَفْعَلُوا۟ مِنْ خَيْرٍۢ فَلَن يُكْفَرُوهُ ۗ وَٱللَّهُ عَلِيمٌۢ بِٱلْمُتَّقِينَ

তারা যেসব সৎকাজ করবে, কোন অবস্থাতেই সেগুলোর প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হবে না। আর আল্লাহ পরহেযগারদের বিষয়ে অবগত।

তারা যা কিছু উত্তম কাজ করে, ফলতঃ তা কখনই ব্যর্থ হবে না। আর আল্লাহ ধর্মভীরুদের সম্বন্ধে সম্যক অবহিত।

Aal-i-Imraan 3:115Listen in Qur'an →
116

إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ لَن تُغْنِىَ عَنْهُمْ أَمْوَٰلُهُمْ وَلَآ أَوْلَٰدُهُم مِّنَ ٱللَّهِ شَيْـًۭٔا ۖ وَأُو۟لَٰٓئِكَ أَصْحَٰبُ ٱلنَّارِ ۚ هُمْ فِيهَا خَٰلِدُونَ

নিশ্চয় যারা কাফের হয়, তাদের ধন সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি আল্লাহর সামনে কখনও কোন কাজে আসবে না। আর তারাই হলো দোযখের আগুনের অধিবাসী। তারা সে আগুনে চিরকাল থাকবে।

নিশ্চয় যারা অবিশ্বাস করে, তাদের ধন-মাল ও সন্তান-সন্ততি আল্লাহর নিকট কখনো কোন কাজে লাগবে না। তারাই অগ্নিবাসী, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে।

Aal-i-Imraan 3:116Listen in Qur'an →
117

مَثَلُ مَا يُنفِقُونَ فِى هَٰذِهِ ٱلْحَيَوٰةِ ٱلدُّنْيَا كَمَثَلِ رِيحٍۢ فِيهَا صِرٌّ أَصَابَتْ حَرْثَ قَوْمٍۢ ظَلَمُوٓا۟ أَنفُسَهُمْ فَأَهْلَكَتْهُ ۚ وَمَا ظَلَمَهُمُ ٱللَّهُ وَلَٰكِنْ أَنفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ

এ দুনিয়ার জীবনে যা কিছু ব্যয় করা হয়, তার তুলনা হলো ঝড়ো হাওয়ার মতো, যাতে রয়েছে তুষারের শৈত্য, যা সে জাতির শস্যক্ষেত্রে গিয়ে লেগেছে যারা নিজের জন্য মন্দ করেছে। অতঃপর সেগুলোকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। বস্তুতঃ আল্লাহ তাদের উপর কোন অন্যায় করেননি, কিন্তু তারা নিজেরাই নিজেদের উপর অত্যাচার করছিল।

তারা যা কিছু পার্থিব জীবনে ব্যয় করে, তার দৃষ্টান্ত হিম-শীতল ঝঞ্জা বায়ুর মত, যা যে জাতি নিজেদের প্রতি অত্যাচার করেছে, তাদের শস্যক্ষেত্রকে আঘাত করে ও তা বিনষ্ট করে দেয়।[১] বস্তুতঃ আল্লাহ তাদের প্রতি যুলুম করেন না, বরং তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি যুলুম করে থাকে।

[১] কিয়ামতের দিন কাফেরদের ধন-সম্পদ না কোন উপকারে আসবে, না তাদের সন্তান-সন্তুতি; এমন কি বাহ্যিকভাবে জন-সাধারণের কল্যাণ ও মঙ্গলের কাজে যে সব অর্থ ব্যয় করে, তাও ব্যর্থ হয়ে যাবে। আর এর উদাহরণ হল, সেই প্রচন্ড ঠান্ডা অথবা গরম প্রবল ঝড়ো হাওয়ার মত, যা সবুজ-শ্যামল শস্যক্ষেতকে ধ্বংস করে দেয়। অত্যাচারী তো এই ক্ষেত দেখে বড়ই আনন্দবোধ করে এবং তার লাভের প্রতি চরম আশাবাদী থাকে, কিন্তু হঠাৎ করে তার সমস্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা মাটিতে মিশে যায়। এ থেকে জানা গেল যে, কল্যাণ ও মঙ্গলের কাজে অর্থ ব্যয়কারীদের দুনিয়াতে যতই প্রশংসা হোক না কেন, ঈমান না আনা পর্যন্ত আখেরাতে তারা এ সব কাজের কোনই প্রতিদান পাবে না। সেখানে আছে তাদের জন্য জাহান্নামের চিরন্তন শাস্তি।

Aal-i-Imraan 3:117Listen in Qur'an →
118

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ لَا تَتَّخِذُوا۟ بِطَانَةًۭ مِّن دُونِكُمْ لَا يَأْلُونَكُمْ خَبَالًۭا وَدُّوا۟ مَا عَنِتُّمْ قَدْ بَدَتِ ٱلْبَغْضَآءُ مِنْ أَفْوَٰهِهِمْ وَمَا تُخْفِى صُدُورُهُمْ أَكْبَرُ ۚ قَدْ بَيَّنَّا لَكُمُ ٱلْءَايَٰتِ ۖ إِن كُنتُمْ تَعْقِلُونَ

হে ঈমানদারগণ! তোমরা মুমিন ব্যতীত অন্য কাউকে অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করো না, তারা তোমাদের অমঙ্গল সাধনে কোন ক্রটি করে না-তোমরা কষ্টে থাক, তাতেই তাদের আনন্দ। শত্রুতাপ্রসুত বিদ্বেষ তাদের মুখেই ফুটে বেরোয়। আর যা কিছু তাদের মনে লুকিয়ে রয়েছে, তা আরো অনেকগুণ বেশী জঘন্য। তোমাদের জন্যে নিদর্শন বিশদভাবে বর্ণনা করে দেয়া হলো, যদি তোমরা তা অনুধাবন করতে সমর্থ হও।

হে বিশ্বাসিগণ! তোমাদের আপনজন ব্যতীত অন্য (অবিশ্বাসী) কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। [১] তারা তোমাদের অনিষ্ট সাধনে কোন ত্রুটি করবে না। যাতে তোমরা বিপন্ন হও, তাই তারা কামনা করে।[২] তাদের মুখে বিদ্বেষ প্রকাশ পায় এবং যা তাদের অন্তর গোপন রাখে, তা আরও গুরুতর। তোমাদের জন্য নিদর্শনসমূহ বিশদভাবে বিবৃত করছি, যদি তোমরা অনুধাবন কর।

[১] এই বিষয়টা পূর্বেও আলোচিত হয়েছে। বিষয়টা যেহেতু অতীব গুরুত্বপূর্ণ তাই এখানে তার পুনরাবৃত্তি করা হচ্ছে। بِطَانَة বলা হয় অন্তরঙ্গ ও বিশ্বস্ত বন্ধু এবং রহস্যবিদকে। মুসলিমদের বিরুদ্ধে কাফের ও মুশরিকরা যে সব অসদিচ্ছা ও দুরভিসন্ধি রাখে এবং তার মধ্যে যা তারা প্রকাশ করে আর যা নিজেদের অন্তরে গোপন রাখে, তার সব কিছুকেই মহান আল্লাহ (কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে) চিহ্নিত করে দিয়েছেন। এই আয়াত এবং এই ধরনের অন্য আয়াতসমূহের ভিত্তিতে উলামা ও ফক্বীহগণ লিখেছেন যে, কোন ইসলামী দেশে অমুসলিমদেরকে গুরুত্বপূর্ণ কোন (নেতৃত্ব) পদে নিযুক্ত করা জায়েয নয়। বর্ণিত হয়েছে যে, আবূ মুসা আশআরী (রাঃ) একজন অমুসলিমকে সেক্রেটারী (কর্মসচিব) নিযুক্ত করেন। উমার (রাঃ) এ ব্যাপার জানতে পারলে তাঁকে কঠোর ধমক দিয়ে বলেন, 'তুমি ওদেরকে তোমার কাছে টেনে নিও না, যখন আল্লাহ ওদেরকে দূর করে দিয়েছেন। তুমি ওদের সম্মান দান করো না, যখন আল্লাহ ওদেরকে লাঞ্ছিত করেছেন। আর তুমি ওদেরকে বিশ্বস্ত ও গোপন তথ্যের ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য মনে করো না, কারণ আল্লাহ ওদেরকে বিশ্বাসঘাতক সাব্যস্ত করেছেন।' উমার (রাঃ) এই আয়াতের ভিত্তিতেই এই ধরনের কথা বলেছেন। ইমাম ক্বুরত্বুবী বলেন, 'এই যুগে আহলে-কিতাবকে সেক্রেটারী নিযুক্ত এবং বিশ্বস্ত মনে করার কারণে অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে এবং এই কারণেই নির্বোধ ও বোকা প্রকৃতির লোকেরা নেতা ও আমীর হয়ে বসে আছে।' (তাফসীর ক্বুরত্বুবী) দুর্ভাগ্যবশতঃ বর্তমানে বহু মুসলিম দেশেও কুরআন কারীমের অতীব গুরুত্বপূর্ণ এই নির্দেশের কোনই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। তাই তো অমুসলিমরা মুসলিম দেশেও বড় বড় পদে এবং বিশেষ বিশেষ দায়িত্বে বহাল রয়েছে। আর এর অনিষ্টকারিতা যে কত বড় তা সকলের কাছে পরিষ্কার। যদি মুসলিম দেশগুলো স্বীয় দেশের সবরাষ্ট্রীয় ও পররাষ্ট্রীয় নীতির ব্যাপারে কুরআনের নির্দেশকে গুরুত্ব দিত, তাহলে নিঃসন্দেহে তারা বহু ফিতনা-ফাসাদ ও ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেত।

[২]لاَ يَألُوْنَ ত্রুটি ও কসুর করবে না। خَبَالًا এর অর্থঃ বিশৃঙ্খলা, অনিষ্ট ও কষ্ট। مَا عَنِتُّمْ (যাতে তোমরা বিপন্ন হও, কষ্টে পতিত হও) عَنَتٌ মানে কষ্ট, বিপদ।

Aal-i-Imraan 3:118Listen in Qur'an →
119

هَٰٓأَنتُمْ أُو۟لَآءِ تُحِبُّونَهُمْ وَلَا يُحِبُّونَكُمْ وَتُؤْمِنُونَ بِٱلْكِتَٰبِ كُلِّهِۦ وَإِذَا لَقُوكُمْ قَالُوٓا۟ ءَامَنَّا وَإِذَا خَلَوْا۟ عَضُّوا۟ عَلَيْكُمُ ٱلْأَنَامِلَ مِنَ ٱلْغَيْظِ ۚ قُلْ مُوتُوا۟ بِغَيْظِكُمْ ۗ إِنَّ ٱللَّهَ عَلِيمٌۢ بِذَاتِ ٱلصُّدُورِ

দেখ! তোমরাই তাদের ভালবাস, কিন্তু তারা তোমাদের প্রতি মোটেও সদভাব পোষণ করে না। আর তোমরা সমস্ত কিতাবেই বিশ্বাস কর। অথচ তারা যখন তোমাদের সাথে এসে মিশে, বলে, আমরা ঈমান এনেছি। পক্ষান্তরে তারা যখন পৃথক হয়ে যায়, তখন তোমাদের উপর রোষবশতঃ আঙ্গুল কামড়াতে থাকে। বলুন, তোমরা আক্রোশে মরতে থাক। আর আল্লাহ মনের কথা ভালই জানেন।

ভেবে দেখ! তোমরা (বন্ধু ভেবে) তাদেরকে ভালবাস;[১] কিন্তু তারা তোমাদেরকে ভালবাসে না। আর তোমরা সমস্ত কিতাবে বিশ্বাস কর, (কিন্তু তারা তোমাদের কিতাবে বিশ্বাস করে না) এবং যখন তারা তোমাদের সাক্ষাতে আসে, তখন তারা বলে, ‘আমরা বিশ্বাস করি।’ কিন্তু যখন তারা একা হয়, তখন তোমাদের প্রতি আক্রোশে তারা নিজেদের আঙ্গুল দাঁতে কাটে।[২] বল, আক্রোশেই মর তোমরা। নিশ্চয় আল্লাহ অন্তরে যা রয়েছে, সে সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত।

[১] অর্থাৎ, তোমরা ঐ মুনাফিকদের নামায এবং (মৌখিকভাবে) তাদের ঈমান প্রকাশ করার কারণে ধোঁকায় পড়ে তাদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন কর।

[২] عَضَّ يَعُضُّ এর অর্থ হল দাঁত দিয়ে কাটা। এই শব্দ দ্বারা তাদের রোষ ও ক্রোধের ভীষণতা বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন পরের [اِنْ تَمْسَسْكُمْ] আয়াতেও তাদের ক্রোধের ধরন প্রকাশ করা হয়েছে।

Aal-i-Imraan 3:119Listen in Qur'an →
120

إِن تَمْسَسْكُمْ حَسَنَةٌۭ تَسُؤْهُمْ وَإِن تُصِبْكُمْ سَيِّئَةٌۭ يَفْرَحُوا۟ بِهَا ۖ وَإِن تَصْبِرُوا۟ وَتَتَّقُوا۟ لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْـًٔا ۗ إِنَّ ٱللَّهَ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطٌۭ

তোমাদের যদি কোন মঙ্গল হয়; তাহলে তাদের খারাপ লাগে। আর তোমাদের যদি অমঙ্গল হয় তাহলে আনন্দিত হয় আর তাতে যদি তোমরা ধৈর্য্যধারণ কর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে তাদের প্রতারণায় তোমাদের কোনই ক্ষতি হবে না। নিশ্চয়ই তারা যা কিছু করে সে সমস্তই আল্লাহর আয়ত্তে রয়েছে।

যদি তোমাদের কোন মঙ্গল হয়, তাহলে তারা নাখোশ হয়, আর তোমাদের অমঙ্গল হলে তারা খোশ হয়।[১] যদি তোমরা ধৈর্য ধর এবং সাবধান হয়ে চল, তাহলে তাদের ষড়যন্ত্র তোমাদের কিছুই ক্ষতি করতে পারবে না। [২] তারা যা করে, নিশ্চয় তা আল্লাহর জ্ঞানায়ত্তে।

[১] মুনাফিকরা মু'মিনদের সাথে যে কঠোর শত্রুতা পোষণ করত, সে কথা এখানে তুলে ধরে বলা হচ্ছে যে, যখন মুসলিমরা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য লাভ করত, আল্লাহর পক্ষ হতে যখন তারা সমর্থন ও সাহায্য পেত এবং তাদের সংখ্যা ও শক্তি বৃদ্ধি লাভ করত, তখন মুনাফিকদেরকে বড়ই খারাপ লাগত। আর যখন মুসলিমরা অনাবৃষ্টি ও সংকীর্ণতার শিকার হত অথবা আল্লাহর ইচ্ছা ও কৌশলের ভিত্তিতে শত্রু সাময়িকভাবে তাদের উপর জয়লাভ করত (যেমন উহুদ যুদ্ধে হয়েছিল), তখন এরা বড়ই খুশী হত। বলার উদ্দেশ্য হল, যাদের অবস্থা হল এই, তারা কি এই যোগ্যতার অধিকারী যে, মুসলিমরা তাদের প্রতি সম্প্রীতির হাত বাড়াবে এবং তাদেরকে রহস্যবিদ্ ও অন্তরঙ্গ বন্ধু বানিয়ে নেবে? এই কারণেই মহান আল্লাহ ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের সাথেও বন্ধুত্ব স্থাপন করতে নিষেধ করেছেন (যেমন কুরআনের অন্যত্র এসেছে)। কেননা, তারাও মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ ও শত্রুতা পোষণ করে। মুসলিমদের সফলতায় তারা নিরানন্দ এবং তাদের অসফলতায় তারা আনন্দ বোধ করে।

[২] এটা হল তাদের প্রবঞ্চনা ও প্রতারণা থেকে বাঁচার পথ ও চিকিৎসা। অর্থাৎ, মুনাফিক এবং ইসলাম ও মুসলিমদের অন্যান্য সকল শক্রর চক্রান্ত থেকে বাঁচার জন্য ধৈর্য ও আল্লাহভীরুতার প্রয়োজন অত্যধিক। মুসলিমদের মাঝে এই ধৈর্য ও তাকওয়া না থাকার ফলেই অমুসলিমদের যাবতীয় চক্রান্ত সাফল্যমন্ডিত হয়েছে। মানুষ মনে করে যে, কাফেরদের সফলতার কারণ হল, আর্থিক উপায়-উপকরণের প্রাচুর্য এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যায় তাদের উন্নতি। অথচ প্রকৃত ব্যাপার হল, মুসলিমদের অবনতির মূল কারণ তাদের দ্বীনের উপর ধৈর্যের সাথে প্রতিষ্ঠিত না থাকা এবং তাকওয়া-শূন্যতা। পক্ষান্তরে এই দু'টি জিনিসই হল মুসলিমদের উন্নতির চাবিকাঠি এবং আল্লাহর বিজয় লাভের অসীলা।

Aal-i-Imraan 3:120Listen in Qur'an →

Commentary: Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation. Qur'an text and translation via AlQuran Cloud.