৩০ নং আয়াতের তাফসীর:
এখান থেকে মানব জাতির পিতা আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি ও তাঁর মর্যাদার আলোচনা সূচনা করা হয়েছে-
خليفة (খলীফাহ) শব্দটি خلف থেকে গৃহীত। অর্থ: একজনের পর অপরজন আসা, একে অপরের স্থলাভিষিক্ত হওয়া। যেমন আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন:
(هُوَ الَّذِيْ جَعَلَكُمْ خَلَا۬ئِفَ فِي الْأَرْضِ)
“তিনিই তোমাদেরকে পৃথিবীতে স্থলাভিষিক্ত বানিয়েছেন।”(সূরা ফাতির ৩৫:৩৯)
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
(فَخَلَفَ مِنْۭ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ)
“অতঃপর একের পর এক তাদের স্থলাভিষিক্তরূপে উত্তরাধিকারী হয়।”(সূরা আ‘রাফ ৭:১৬৯, ইবনে কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর )
মুফাসসিরগণ خليفة (খলীফাহ) শব্দের দু’টি ব্যখ্যা দিয়েছেন:
১. খলীফা দ্বারা উদ্দেশ্য আদম (আঃ)। কেননা তিনি পৃথিবীতে আল্লাহ তা‘আলার আদেশ বাস্তবায়নে তাঁর খলীফা। আবার বলা হয় পূর্বে যে সকল জিন জমিনে বসবাস করত তিনি তাদের খলীফা। এ দৃষ্টিকোণ থেকে খলীফা দ্বারা আদম (আঃ) উদ্দেশ্য।
২. خليفة (খলীফাহ) শব্দটি একবচন হলেও এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল বহুবচন অর্থাৎ সমগ্র মানব জাতি। এ মতটি ইমাম ইবনু কাসীর (রহঃ) প্রাধান্য দিয়েছেন।
যদিও খলীফা শব্দটি উভয় তাফসীরের সম্ভাবনা রাখে, কিন্তু কুরআনের অন্যান্য আয়াত দ্বিতীয় তাফসীরের মতকে সমর্থন করে। অর্থাৎ খলীফা দ্বারা উদ্দেশ্য আদম ও তাঁর বংশধর, শুধু আদম (আঃ) নয়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
(أَتَجْعَلُ فِيهَا مَنْ يُّفْسِدُ فِيهَا وَيَسْفِكُ الدِّمَا۬ءَ)
আপনি কি এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন যে, তারা সেখানে বিবাদ করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে?
এটা জানা কথা যে, আদম (আঃ) ফাসাদকারী নন এবং রক্তপাতকারীও নন। যেমন পূর্বের আয়াতগুলো দ্বারা প্রমাণিত হয়। (আযওয়াউল বায়ান, ১ম খণ্ড, পৃ: ৭০)
আল্লাহ তা‘আলা যখন ফেরেশতাদের কাছে খলীফা সৃষ্টির কথা বললেন তখন ফেরেশতাগণ বলল-
আপনি এমন ব্যক্তিদের সৃষ্টি করবেন যারা ফাসাদ সৃষ্টি করবে, রক্তপাত ঘটাবে?
তাদের এ প্রশ্নের অর্থ এটা নয় যে, তারা গায়েব জানে। বরং তাদেরকে বলে দেয়া হয়েছিল যে, তাদেরকে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করা হবে। এজন্য তারা ঐ মন্তব্য করেছিল।
অথবা খলীফা শব্দের অর্থ জেনেই তারা এটা বুঝেছিল যে, মানুষ হবে ন্যায়-অন্যায়ের ফায়সালাকারী, অনাচার প্রতিহতকারী, অবৈধ ও পাপ কাজের বাধাদানকারী; ফলে তাদের মাঝে ফাসাদ সৃষ্টি হবে এবং রক্তপাত ঘটবে।
অথবা পূর্বে যারা পৃথিবীতে বসবাস করেছিল তাদের ক্রিয়াকলাপ দেখেই তারা মানুষের ব্যাপারেও এ মন্তব্য করেছিল।
উল্লেখ্য যে, ফেরেশতাদের এ আরয প্রতিবাদমূলক ছিল না এবং আদম (আঃ)-এর প্রতি হিংসার বশবর্তী হয়ে বলেছিল তাও নয়। কারণ ফেরেশতাগণ এরূপ চরিত্র থেকে পবিত্র।
ফেরেশতাদের আনুগত্য সম্পর্কে কুরআনে এসেছে-
(لَّا يَعْصُوْنَ اللّٰهَ مَآ أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُوْنَ مَا يُؤْمَرُوْنَ)
“তারা অমান্য করে না আল্লাহ যা তাদেরকে আদেশ করেন তা এবং তাঁরা যা করতে আদিষ্ট হন তাই করেন।”(সূরা আত-তাহরীম ৬৬:৬)
আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ হতে তাদের সামনে বিষয়টি উত্থাপনের উদ্দেশ্য হল, শুধু এর হিকমত জানাবার ও এর রহস্য প্রকাশ করার, যা ছিল তাদের বোধশক্তির ঊর্ধ্বে।
আল্লাহ তা‘আলা তো ভালভাবেই জানেন যে, এরা বিবাদ ও ঝগড়াটে হবে, কাজেই তারা আল্লাহ তা‘আলাকে জিজ্ঞাসা করলেন, খলীফাসৃষ্টি করার পিছনে আপনার হিকমাত কী? যদি ইবাদত-ই একমাত্র উদ্দেশ্য হয় তবে আমরা তো আপনার ইবাদত করছি, আপনার প্রশংসা ও তাসবীহ পাঠে সর্বদা রত রয়েছি এবং আমরা ঝগড়া-বিবাদ হতেও পূতপবিত্র, তারপরও আল্লাহ তা‘আলার খলীফা সৃষ্টি করার পেছনে কী হিকমত রয়েছে?
আল্লাহ তা‘আলা তাদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন: আমি যা জানি তোমরা তা জান না। অর্থাৎ প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সবই আমি জানি যা তোমরা জানো না। আমি জানি তাদের মধ্যে নাবী-রাসূল, সত্যবাদী, শহীদ, সৎ বান্দা ইত্যাদি হবে। তারা এমন ইবাদত করবে যা তারা ছাড়া অন্যরা করবে না। যেমন জিহাদ ও অন্যান্য ইবাদত। হাদীসে এসেছে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) …