Muslim99Muslim99
← Tafsir library

2. Al-Baqara

The Cow · Medinan · 286 ayahs

سُورَةُ البَقَرَةِ

Reading Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation

Ayahs 81–90 of 286

81

بَلَىٰ مَن كَسَبَ سَيِّئَةًۭ وَأَحَٰطَتْ بِهِۦ خَطِيٓـَٔتُهُۥ فَأُو۟لَٰٓئِكَ أَصْحَٰبُ ٱلنَّارِ ۖ هُمْ فِيهَا خَٰلِدُونَ

হাঁ, যে ব্যক্তি পাপ অর্জন করেছে এবং সে পাপ তাকে পরিবেষ্টিত করে নিয়েছে, তারাই দোযখের অধিবাসী। তারা সেখানেই চিরকাল থাকবে।

অবশ্যই, যে ব্যক্তি পাপ করেছে এবং যার পাপরাশি তাকে পরিবেষ্টন করেছে, তারাই হবে জাহান্নামের অধিবাসী; তারা সেখানে চিরকাল থাকবে।

Al-Baqara 2:81Listen in Qur'an →
82

وَٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ وَعَمِلُوا۟ ٱلصَّٰلِحَٰتِ أُو۟لَٰٓئِكَ أَصْحَٰبُ ٱلْجَنَّةِ ۖ هُمْ فِيهَا خَٰلِدُونَ

পক্ষান্তরে যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তারাই জান্নাতের অধিবাসী। তারা সেখানেই চিরকাল থাকবে।

পক্ষান্তরে যারা বিশ্বাস করেছে (মু’মিন হয়েছে) এবং সৎকাজ করেছে, তারাই হবে জান্নাতের অধিবাসী; তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। [১]

[১] এখানে ইয়াহুদীদের দাবী খন্ডন ক'রে জান্নাত ও জাহান্নামে যাওয়ার মূলনীতির কথা বর্ণনা করা হচ্ছে। যার আমলনামায় কেবল পাপ আর পাপই থাকবে; অর্থাৎ, কুফরী ও শির্ক, (এই কুফরী ও শির্কীয় কর্ম সম্পাদনের কারণে তাদের অনেক ভাল কাজও কোন উপকারে আসবে না) সে তো চিরস্থায়ী জাহান্নামবাসী হবে এবং যে ঈমান ও নেক আমলের ভূষণে ভূষিত হবে, সে জান্নাতবাসী হবে। আর যে মু'মিন পাপী হবে, তার ব্যাপার আল্লাহর ইচ্ছাধীন থাকবে, তিনি ইচ্ছা করলে স্বীয় অনুগ্রহ ও দয়ায় তাকে ক্ষমা করে দেবেন অথবা শাস্তি স্বরূপ কিছু দিন জাহান্নামে রেখে নবী করীম (সাঃ)-এর সুপারিশে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আর এ কথা বহু সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত এবং আহলে সুন্নাহর এটাই আক্বীদা ও বিশ্বাস।

Al-Baqara 2:82Listen in Qur'an →
83

وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَٰقَ بَنِىٓ إِسْرَٰٓءِيلَ لَا تَعْبُدُونَ إِلَّا ٱللَّهَ وَبِٱلْوَٰلِدَيْنِ إِحْسَانًۭا وَذِى ٱلْقُرْبَىٰ وَٱلْيَتَٰمَىٰ وَٱلْمَسَٰكِينِ وَقُولُوا۟ لِلنَّاسِ حُسْنًۭا وَأَقِيمُوا۟ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتُوا۟ ٱلزَّكَوٰةَ ثُمَّ تَوَلَّيْتُمْ إِلَّا قَلِيلًۭا مِّنكُمْ وَأَنتُم مُّعْرِضُونَ

যখন আমি বনী-ইসরাঈলের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলাম যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারও উপাসনা করবে না, পিতা-মাতা, আত্নীয়-স্বজন, এতীম ও দীন-দরিদ্রদের সাথে সদ্ব্যবহার করবে, মানুষকে সৎ কথাবার্তা বলবে, নামায প্রতিষ্ঠা করবে এবং যাকাত দেবে, তখন সামান্য কয়েকজন ছাড়া তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিলে, তোমরাই অগ্রাহ্যকারী।

আর (স্মরণ কর সেই সময়ের কথা) যখন বনী ইস্রাইলের কাছ থেকে আমি অঙ্গীকার নিয়েছিলাম যে, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উপাসনা করবে না, মাতা-পিতা, আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন ও দরিদ্রের প্রতি সদ্ব্যবহার করবে এবং মানুষের সাথে সদালাপ করবে, নামাযকে যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত করবে এবং যাকাত প্রদান করবে। কিন্তু স্বল্প সংখ্যক লোক ব্যতীত তোমরা সকলে অগ্রাহ্য ক’রে (এ প্রতিজ্ঞা পালনে) পরাঙ্খমুখ হয়ে গেলে।

Al-Baqara 2:83Listen in Qur'an →
84

وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَٰقَكُمْ لَا تَسْفِكُونَ دِمَآءَكُمْ وَلَا تُخْرِجُونَ أَنفُسَكُم مِّن دِيَٰرِكُمْ ثُمَّ أَقْرَرْتُمْ وَأَنتُمْ تَشْهَدُونَ

যখন আমি তোমাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলাম যে, তোমরা পরস্পর খুনাখুনি করবে না এবং নিজেদেরকে দেশ থেকে বহিস্কার করবে না, তখন তোমরা তা স্বীকার করেছিলে এবং তোমরা তার সাক্ষ্য দিচ্ছিলে।

(হে ইয়াহুদী সমাজ! তোমরা নিজেদের অবস্থা স্মরণ করে দেখ,) যখন আমি তোমাদের নিকট থেকে (এই মর্মে) অঙ্গীকার নিয়েছিলাম যে, তোমরা পরস্পর রক্তপাত ঘটাবে না ও নিজেদের লোকজনকে স্বদেশ হতে বহিষ্কার করবে না। অতঃপর তোমরা তা স্বীকার করেছিলে, আর এ বিষয়ে তোমরাই তার সাক্ষী। [১]

[১] এই আয়াতগুলোতে পুনরায় বানী-ইস্রাঈলদের নিকট হতে নেওয়া অঙ্গীকারের কথা আলোচনা হচ্ছে। তবে এ থেকেও তারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এই অঙ্গীকারে প্রথমতঃ তাদেরকে আল্লাহর ইবাদতের তাকীদ করা হয়েছে যা প্রত্যেক নবীর মৌলিক ও প্রাথমিক দাওয়াত ছিল। (যেমন, সূরা আম্বিয়ার ২১:২৫ নং আয়াতে এবং অন্যান্য আয়াতেও এ কথা পরিষ্কার করে বলা হয়েছে।) অতঃপর পিতা-মাতার সাথে ভাল ব্যবহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর ইবাদতের পর দ্বিতীয় নম্বরে পিতা-মাতার আনুগত্য এবং তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করার তাকীদ ক'রে এ কথা পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে, যেমন আল্লাহর ইবাদত করা জরুরী, তেমনি পিতা-মাতার আনুগত্য করাও অত্যাবশ্যক এবং এ ব্যাপারে গড়িমসি করার কোন অবকাশ নেই। ক্বুরআনের বিভিন্ন স্থানে মহান আল্লাহ তাঁর ইবাদতের পর দ্বিতীয় নম্বরে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার কথা বলে এর গুরুত্ব যে অনেক, সেটা পরিষ্কার করে দিয়েছেন। এরপর আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম ও দরিদ্রদের সাথে সদ্ব্যবহার করার ও সুন্দর আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। ইসলামেও এই বিষয়গুলোর অনেক গুরুত্ব রয়েছে। অনুরূপ রসূল (সাঃ)-এর বহু সংখ্যক হাদীসে এগুলোর গুরুত্ব বর্ণিত হয়েছে। এই অঙ্গীকারে নামায পড়া ও যাকাত দেওয়ারও নির্দেশ রয়েছে। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, এই দুই ইবাদত পূর্বের শরীয়তেও বিদ্যমান ছিল এবং এই ইবাদতদ্বয়ের গুরুত্বও এ থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়। ইসলামেও এই ইবাদত দু'টির অনেক গুরুত্ব রয়েছে। এমন কি এই ইবাদতদ্বয়ের কোন একটির অস্বীকার করলে বা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে, তা কুফরী বিবেচিত হবে। যেমন আবূ বাকার সিদ্দীক্ব (রাঃ)-এর খেলাফত কালে যাকাত দিতে অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করার মাধ্যমে এ কথা পরিষ্কার হয়ে যায়।

Al-Baqara 2:84Listen in Qur'an →
85

ثُمَّ أَنتُمْ هَٰٓؤُلَآءِ تَقْتُلُونَ أَنفُسَكُمْ وَتُخْرِجُونَ فَرِيقًۭا مِّنكُم مِّن دِيَٰرِهِمْ تَظَٰهَرُونَ عَلَيْهِم بِٱلْإِثْمِ وَٱلْعُدْوَٰنِ وَإِن يَأْتُوكُمْ أُسَٰرَىٰ تُفَٰدُوهُمْ وَهُوَ مُحَرَّمٌ عَلَيْكُمْ إِخْرَاجُهُمْ ۚ أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ ٱلْكِتَٰبِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍۢ ۚ فَمَا جَزَآءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْىٌۭ فِى ٱلْحَيَوٰةِ ٱلدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ ٱلْقِيَٰمَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰٓ أَشَدِّ ٱلْعَذَابِ ۗ وَمَا ٱللَّهُ بِغَٰفِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

অতঃপর তোমরাই পরস্পর খুনাখুনি করছ এবং তোমাদেরই একদলকে তাদের দেশ থেকে বহিস্কার করছ। তাদের বিরুদ্ধে পাপ ও অন্যায়ের মাধ্যমে আক্রমণ করছ। আর যদি তারাই কারও বন্দী হয়ে তোমাদের কাছে আসে, তবে বিনিময় নিয়ে তাদের মুক্ত করছ। অথচ তাদের বহিস্কার করাও তোমাদের জন্য অবৈধ। তবে কি তোমরা গ্রন্থের কিয়দংশ বিশ্বাস কর এবং কিয়দংশ অবিশ্বাস কর? যারা এরূপ করে পার্থিব জীবনে দূগর্তি ছাড়া তাদের আর কোনই পথ নেই। কিয়ামতের দিন তাদের কঠোরতম শাস্তির দিকে পৌঁছে দেয়া হবে। আল্লাহ তোমাদের কাজ-কর্ম সম্পর্কে বে-খবর নন।

তারপর (সেই তোমরাই তো) একে অন্যকে হত্যা করছ এবং তোমাদের এক দলকে (তাদের) আপন গৃহ হতে বহিষ্কার করে দিচ্ছ, তোমরা তাদের বিরুদ্ধে পাপ ও অন্যায়ের মাধ্যমে পরস্পরের সহযোগিতা করছ এবং তারা যখন বন্দীরূপে তোমাদের কাছে উপস্থিত হচ্ছে, তখন তোমরা মুক্তিপণ দিয়ে তাদেরকে মুক্ত করছ; অথচ তাদের বহিক্ককরণও তোমাদের জন্য অবৈধ ছিল। তবে কি তোমরা ধর্মগ্রন্থের কিছু অংশে বিশ্বাস আর কিছু অংশকে অবিশ্বাস কর? [১] অতএব তোমাদের যেসব লোক এমন কাজ করে, তাদের প্রতিফল পার্থিক জীবনে লাঞ্ছনাভোগ ছাড়া আর কি হতে পারে? আর কিয়ামতের (শেষ বিচারের) দিন কঠিনতম শাস্তির দিকে নিক্ষিপ্ত হবে। তারা যা করে সে সম্বন্ধে আল্লাহ অনবহিত নন।

[১] নবী করীম (সাঃ)-এর যুগে মদীনায় আনসার (যারা ইসলামের পূর্বে মুশরিক ছিল তা)দের আউস ও খাযরাজ নামে দু'টি গোত্র ছিল। ওদের আপোসে সর্বদা যুদ্ধ লেগেই থাকত। মদীনাতে ইয়াহুদীদেরও বানু-ক্বায়নুক্বা', বানু-নাযীর এবং বানু-ক্বুরায়যা নামে তিনটি গোত্র ছিল। এরাও আপোসে সব সময় লড়ত। বানু-ক্বুরায়যা আউসের মিত্র ছিল এবং বানু-ক্বায়নুক্বা' ও বানু-নাযীর খাযরাজের মিত্র ছিল। যুদ্ধে এরা আপন আপন মিত্রদের সাহায্য করত এবং নিজেদেরই জাতভাই ইয়াহুদীদেরকে হত্যা করত, তাদের ঘর-বাড়ী লুণ্ঠন করত এবং তাদেরকে সেখান থেকে বহিষ্কার করত। অথচ তাওরাত অনুযায়ী এ রকম করা তাদের জন্য হারাম ছিল। আবার ওই ইয়াহুদীরাই যখন পরাজিত হয়ে বন্দী হত, তখন তাদেরকে মুক্তিপণ দিয়ে মুক্ত করত এবং বলত যে, তাওরাতে আমাদেরকে এর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই আয়াতগুলোতে ইয়াহুদীদের সেই আচরণের কথাই বর্ণনা করা হয়েছে। তারা তাদের শরীয়তের বিধানকে খেলার পুতুল বানিয়ে নিয়েছিল। কোন কোন জিনিসের উপর ঈমান আনত এবং কোন কোন জিনিসকে উপেক্ষা করত। কোন নির্দেশকে পালন করত, আবার কোন সময় শরীয়তের কোন গুরুত্বই দিত না। হত্যা, বহিষ্কার এবং একে অপরের বিরুদ্ধে সাহায্য করা তাদের শরীয়তেও হারাম ছিল। তা সত্ত্বেও এ কাজগুলো নির্দ্বিধায় তারা করত এবং মুক্তিপণ দিয়ে মুক্তি করার যে বিধান ছিল, তার উপরে আমল করত। অথচ প্রথমের তিনটি নির্দেশ (হত্যা, বহিষ্কার এবং একে অপরের বিরুদ্ধে সাহায্য না করা) যদি তারা পালন করত, তাহলে মুক্তিপণ নিয়ে মুক্ত করার প্রয়োজনই হত না।

Al-Baqara 2:85Listen in Qur'an →
86

أُو۟لَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ ٱشْتَرَوُا۟ ٱلْحَيَوٰةَ ٱلدُّنْيَا بِٱلْءَاخِرَةِ ۖ فَلَا يُخَفَّفُ عَنْهُمُ ٱلْعَذَابُ وَلَا هُمْ يُنصَرُونَ

এরাই পরকালের বিনিময়ে পার্থিব জীবন ক্রয় করেছে। অতএব এদের শাস্তি লঘু হবে না এবং এরা সাহায্যও পাবে না।

তারাই পরকালের বিনিময়ে পার্থিব জীবন ক্রয় করেছে, সুতরাং তাদের শাস্তি লাঘব করা হবে না এবং তারা কোন সাহায্যও পাবে না। [১]

[১] এখানে শরীয়তের কোন বিধানকে মেনে নেওয়া এবং কোন বিধানকে পরিত্যাগ করার শাস্তির কথা বর্ণিত হচ্ছে। আর শাস্তি হল, দুনিয়াতে (পূর্ণ শরীয়তের উপর আমল করলে প্রতিদানে যা পাওয়া যায় সেই) সম্মান ও মর্যাদা লাভের পরিবর্তে লাভ হবে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং আখেরাতে চিরন্তন নিয়ামত ও সুখের পরিবর্তে লাভ হবে কঠিন শাস্তি। এ থেকে এ কথাও সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, আল্লাহর নিকট পূর্ণ আনুগত্যই কেবল গৃহীত হয়। আংশিকভাবে কোন কোন বিধানকে মেনে নেওয়া বা তার উপর আমল করার কোনই মূল্য আল্লাহর নিকট নেই। এই আয়াত মুসলিমদেরকেও চিন্তা-ভাবনা করার প্রতি আহবান জানাচ্ছে যে, মুসলিমরা যে লাঞ্ছনা ও অধঃপতনের শিকার, তার কারণও মুসলিমদের এমন কার্যকলাপ নয় তো, যা ইয়াহুদীদের ব্যাপারে বহু আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে?

Al-Baqara 2:86Listen in Qur'an →
87

وَلَقَدْ ءَاتَيْنَا مُوسَى ٱلْكِتَٰبَ وَقَفَّيْنَا مِنۢ بَعْدِهِۦ بِٱلرُّسُلِ ۖ وَءَاتَيْنَا عِيسَى ٱبْنَ مَرْيَمَ ٱلْبَيِّنَٰتِ وَأَيَّدْنَٰهُ بِرُوحِ ٱلْقُدُسِ ۗ أَفَكُلَّمَا جَآءَكُمْ رَسُولٌۢ بِمَا لَا تَهْوَىٰٓ أَنفُسُكُمُ ٱسْتَكْبَرْتُمْ فَفَرِيقًۭا كَذَّبْتُمْ وَفَرِيقًۭا تَقْتُلُونَ

অবশ্যই আমি মূসাকে কিতাব দিয়েছি। এবং তার পরে পর্যায়ক্রমে রসূল পাঠিয়েছি। আমি মরিয়ম তনয় ঈসাকে সুস্পষ্ট মোজেযা দান করেছি এবং পবিত্র রূহের মাধ্যমে তাকে শক্তিদান করেছি। অতঃপর যখনই কোন রসূল এমন নির্দেশ নিয়ে তোমাদের কাছে এসেছে, যা তোমাদের মনে ভাল লাগেনি, তখনই তোমরা অহংকার করেছ। শেষ পর্যন্ত তোমরা একদলকে মিথ্যাবাদী বলেছ এবং একদলকে হত্যা করেছ।

অবশ্যই আমি মূসাকে কিতাব (তওরাত গ্রন্থ) দিয়েছি এবং তার পরে পর্যায়ক্রমে রসূলগণকে প্রেরণ করেছি, মারয়্যাম-তনয় ঈসাকে সুস্পষ্ট প্রমাণ (মু’জিযা) দিয়েছি এবং পবিত্র আত্মা (বা জিবরীল ফিরিশ্তা) দ্বারা তার শক্তি বৃদ্ধি করেছি। [১] অতঃপর যখনই কোন রসূল এমন কিছু নির্দেশ নিয়ে তোমাদের কাছে এসেছে যা তোমাদের মনঃপূত নয়, তখনই তোমরা অহংকার করেছ। পরিশেষে একদলকে মিথ্যাজ্ঞান করেছ এবং একদলকে করেছ হত্যা। [২]

[১] {وَقَفَّيْنَا مِنْ بَعْدِهِ بِالرُّسُلِ} এর অর্থ হল, মূসা (আঃ)-এর পর ক্রমাগতভাবে নবী ও রসূল এসেছিলেন। বানী-ইস্রাঈলের মধ্যে নবী আসার এই ধরাবাহিকতা ঈসা (আঃ) পর্যন্ত শেষ হয়। (بيِّنَاتٌ) বলতে সেই মু'জিযাসমূহকে বুঝানো হয়েছে যা ঈসা (আঃ)-কে দান করা হয়েছিল। যেমন, মৃতকে জীবিত করা এবং কুষ্ঠরোগী ও জন্মান্ধকে সুস্থ করে তোলা ইত্যাদি, যা সূরা আলে-ইমরানের ৩:৪৯ নং আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে। (رُوْحُ الْقُدُسِ) (রূহুল ক্বুদুস বা পবিত্রের আত্মা) বলে জিবরীল (আঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। তাঁকে 'পবিত্রের আত্মা' এই জন্য বলা হয়েছে যে, তিনি আল্লাহর ('কুন' শব্দের মাধ্যমে) নির্দেশক্রমে অস্তিত্বে এসেছিলেন। অনুরূপ ঈসা (আঃ)-কেও 'রূহ' বলা হয়েছে। আর 'ক্বুদুস' থেকে আল্লাহকে বুঝানো হয়েছে। আর আল্লাহর সাথে উক্ত 'রূহ'বা আত্মার সম্বন্ধ সম্মানসূচক। ইবনে জারীর এ (রূহুল ক্বুদুস বলতে জিবরীল উদ্দিষ্ট হওয়ার) মতটাকেই সর্বাধিক সঠিক বলেছেন। কারণ সূরা মায়েদার ৫:১১০ নং আয়াতে 'রূহুল ক্বুদুস' এবং ইঞ্জীল পৃথক পৃথক উল্লিখিত হয়েছে। (কাজেই রূহুল ক্বুদুস অর্থ ইঞ্জীল হতে পারে না।) অন্য আর এক আয়াতে জিবরীল (আঃ)-কে 'রূহুল আমীন' বলা হয়েছে। অনুরূপ রসূল (সাঃ) হাসসান (রাঃ) সম্পর্কে বলেছিলেন, اللَّهُمَّ أَيِّدْهُ برُوْحِ الْقُدُسِ)) "হে আল্লাহ! 'রূহুল ক্বুদুস' দ্বারা ওকে শক্তিশালী কর।" অপর আর এক হাদীসে এসেছে, وَجِبْرِيْلُ مَعَكَ)) "জিবরীল তোমার সাথে রয়েছেন।" জানা গেল যে, 'রূহুল ক্বুদুস' বলে জিবরীল (আঃ)-কেই বুঝানো হয়েছে। (ফাতহুল বায়ান, ইবনে কাসীর, বরাতে আশরাফুল হাওয়াশী)[২] যেমন, মুহাম্মাদ (সাঃ) ও ঈসা (আঃ)-কে মিথ্যাবাদী বলেছে এবং যাকারিয়া ও ইয়াহ্ইয়া (আলাইহিমাস্ সালাম)-কে হত্যা করেছে।

Al-Baqara 2:87Listen in Qur'an →
88

وَقَالُوا۟ قُلُوبُنَا غُلْفٌۢ ۚ بَل لَّعَنَهُمُ ٱللَّهُ بِكُفْرِهِمْ فَقَلِيلًۭا مَّا يُؤْمِنُونَ

তারা বলে, আমাদের হৃদয় অর্ধাবৃত। এবং তাদের কুফরের কারণে আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন। ফলে তারা অল্পই ঈমান আনে।

তারা বলেছিল, আমাদের হৃদয় আচ্ছাদিত। [১] বরং (কুফরী) সত্য প্রত্যাখ্যানের জন্য আল্লাহ তাদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন। সুতরাং তাদের অল্প সংখ্যকই বিশ্বাস করে (ঈমান আনে)। [২]

[১] অর্থাৎ, হে মুহাম্মাদ! আমাদের উপর তোমার কথার কোনই প্রভাব পড়বে না। যেমন, অন্যত্র আছে,{وَقَالُوا قُلُوبُنَا فِي أَكِنَّةٍ مِمَّا تَدْعُونَا إِلَيْهِ} অর্থাৎ, "তারা বলে, তুমি যার প্রতি আমাদেরকে আহবান করছ, সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আবরণে আচ্ছাদিত।" (সূরা হা-মীম সিজদা ৪১:৫ আয়াত)[২] অন্তরে কথার প্রভাব সৃষ্টি না হওয়াটা কোন গর্বের ব্যাপার নয়, বরং এটা অভিশপ্ত হওয়ার নিদর্শন। অতএব তাদের ঈমান অতি অল্প (যা আল্লাহর নিকট গ্রহণীয় নয়) অথবা তাদের মধ্যে ঈমান আনার মত লোক খুব কম সংখ্যকই হবে।

Al-Baqara 2:88Listen in Qur'an →
89

وَلَمَّا جَآءَهُمْ كِتَٰبٌۭ مِّنْ عِندِ ٱللَّهِ مُصَدِّقٌۭ لِّمَا مَعَهُمْ وَكَانُوا۟ مِن قَبْلُ يَسْتَفْتِحُونَ عَلَى ٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ فَلَمَّا جَآءَهُم مَّا عَرَفُوا۟ كَفَرُوا۟ بِهِۦ ۚ فَلَعْنَةُ ٱللَّهِ عَلَى ٱلْكَٰفِرِينَ

যখন তাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে কিতাব এসে পৌঁছাল, যা সে বিষয়ের সত্যায়ন করে, যা তাদের কাছে রয়েছে এবং তারা পূর্বে করত। অবশেষে যখন তাদের কাছে পৌঁছল যাকে তারা চিনে রেখেছিল, তখন তারা তা অস্বীকার করে বসল। অতএব, অস্বীকারকারীদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত।

তাদের নিকট যা আছে আল্লাহর নিকট হতে তার সমর্থক কিতাব এল; যদিও পূর্বে অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে তারা এর (এই কিতাব সহ নবীর) সাহায্যে[১] বিজয় কামনা করত তবুও তারা যা জ্ঞাত ছিল তা (সেই কিতাব নিয়ে নবী) যখন তাদের নিকট এল, তখন তারা তা অস্বীকার করে বসল। সুতরাং অবিশ্বাসীদের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ হোক।

[১] {يَسْتَفْتِحُوْنَ} এর একটি অর্থ হল, বিজয় লাভ ও সাহায্যের জন্য প্রার্থনা করা। অর্থাৎ, এই ইয়াহুদীরা যখন মুশরিকদল কর্তৃক পরাজিত হত, তখন তারা আল্লাহর নিকট এই বলে দুআ করত যে, হে আল্লাহ! সত্বর শেষ নবী প্রেরিত কর! যাতে আমরা তাঁর সাথে মিলে এই মুশরিকদের উপর বিজয় লাভ করতে পারি। অর্থাৎ, 'ইস্তিফতাহ'র অর্থ হল, সাহায্য কামনা করা। দ্বিতীয় অর্থ হল, সংবাদ দেওয়া। অর্থাৎ, ইয়াহুদীরা মুশরিকদেরকে সংবাদ দিত যে, অতি সত্বর নবী প্রেরিত হবেন। (ফাতহুল ক্বাদীর) নবী প্রেরিত হবেন এ জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও কেবল হিংসাবশতঃ মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর নবুঅতের উপর ঈমান আনেনি; যেমন পরবর্তী আয়াতে বলা হয়েছে।

Al-Baqara 2:89Listen in Qur'an →
90

بِئْسَمَا ٱشْتَرَوْا۟ بِهِۦٓ أَنفُسَهُمْ أَن يَكْفُرُوا۟ بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ بَغْيًا أَن يُنَزِّلَ ٱللَّهُ مِن فَضْلِهِۦ عَلَىٰ مَن يَشَآءُ مِنْ عِبَادِهِۦ ۖ فَبَآءُو بِغَضَبٍ عَلَىٰ غَضَبٍۢ ۚ وَلِلْكَٰفِرِينَ عَذَابٌۭ مُّهِينٌۭ

যার বিনিময়ে তারা নিজেদের বিক্রি করেছে, তা খুবই মন্দ; যেহেতু তারা আল্লাহ যা নযিল করেছেন, তা অস্বীকার করেছে এই হঠকারিতার দরুন যে, আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছা অনুগ্রহ নাযিল করেন। অতএব, তারা ক্রোধের উপর ক্রোধ অর্জন করেছে। আর কাফেরদের জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি।

তা কত নিকৃষ্ট যার বিনিময়ে তারা তাদের আত্মাকে বিক্রয় করেছে; তা এই যে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তা তারা অবিশ্বাস করছে শুধু এই হঠকারিতার দরুন[১] যে, আল্লাহ তাঁর দাসদের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছা অনুগ্রহ করেন। সুতরাং তারা ক্রোধের[২] উপর ক্রোধের পাত্র হল। আর (কাফের) অবিশ্বাসীদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।

[১] অর্থাৎ, এ কথা জানা সত্ত্বেও যে, মুহাম্মাদ (সাঃ) সেই শেষ নবী, যাঁর গুণাবলীর কথা তাওরাত ও ইঞ্জীলে উল্লিখিত হয়েছে এবং আহলে কিতাব তাদের এক মুক্তিদাতা হিসেবে তাঁর আগমনের অপেক্ষাও করছিল, কিন্তু কেবল এই জ্বালায় ও হিংসায় তাঁর উপর ঈমান আনেনি যে, নবী আমাদের মধ্য থেকে কেন হল না, যেমন আমাদের ধারণা ছিল। অর্থাৎ, তারা (নবীর নবুঅতকে) অস্বীকার করেছিল জাতিগত বিদ্বেষ ও হিংসার ভিত্তিতে, দলীল ও প্রমাণের ভিত্তিতে নয়।

[২] ক্রোধের উপর ক্রোধের অর্থ হল, অত্যধিক ক্রোধ। কারণ, তারা বারবার ক্রোধ উদ্রেককর কাজ করতে থাকে; যেমন পূর্বে (৬১নং আয়াতের টীকায়) এর বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এখন শুধুমাত্র হিংসার কারণে ক্বুরআন ও মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে অস্বীকার করল।

Al-Baqara 2:90Listen in Qur'an →

Commentary: Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation. Qur'an text and translation via AlQuran Cloud.