Muslim99Muslim99
← Tafsir library

2. Al-Baqara

The Cow · Medinan · 286 ayahs

سُورَةُ البَقَرَةِ

Reading Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation

Ayahs 261–270 of 286

261

مَّثَلُ ٱلَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَٰلَهُمْ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنۢبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِى كُلِّ سُنۢبُلَةٍۢ مِّا۟ئَةُ حَبَّةٍۢ ۗ وَٱللَّهُ يُضَٰعِفُ لِمَن يَشَآءُ ۗ وَٱللَّهُ وَٰسِعٌ عَلِيمٌ

যারা আল্লাহর রাস্তায় স্বীয় ধন সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উদাহরণ একটি বীজের মত, যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায়। প্রত্যেকটি শীষে একশ করে দানা থাকে। আল্লাহ অতি দানশীল, সর্বজ্ঞ।

যারা আল্লাহর পথে ব্যয় করে, তাদের উপমা একটি শস্য-বীজের মত, যা থেকে সাতটি শীষ জন্মে, প্রতিটি শীষে থাকে একশত শস্য-দানা। আর আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেন।[১] আল্লাহ মহাদানশীল, মহাজ্ঞানী।

[১] এটা হল আল্লাহর পথে ব্যয় করার ফযীলত। 'আল্লাহর পথ'-এর উদ্দেশ্য যদি জিহাদ হয়, তাহলে তার অর্থ হবে জিহাদে ব্যয়কৃত টাকা-পয়সার এই নেকী পাওয়া যায়। আর যদি এর উদ্দেশ্য হয় সমস্ত কল্যাণের পথ, তবে এই ফযীলত হবে নফল সাদাকা-খয়রাতের। আর অন্যান্য নেকীসমূহ (একটি নেকীর প্রতিদান দশগুণ)এর আওতাভুক্ত হবে। (ফাতহুল ক্বাদীর) অর্থাৎ, সাদাকা-খয়রাতের সাধারণ প্রতিদান ও নেকী অন্যান্য কল্যাণকর কাজের চেয়ে বেশী। আর আল্লাহর পথে ব্যয় করার গুরুত্ব ও ফযীলত এত বেশী হওয়ার কারণ হল, যতক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধসামগ্রী ও অস্ত্র-শস্ত্রের ব্যবস্থা না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সৈন্যের পারদর্শিতাও শূন্যের কোটায় থাকবে। আর যুদ্ধসামগ্রী ও অস্ত্র-শস্ত্রের ব্যবস্থা টাকা-পয়সা ব্যতীত করা যেতে পারে না।

Al-Baqara 2:261Listen in Qur'an →
262

ٱلَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَٰلَهُمْ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ ثُمَّ لَا يُتْبِعُونَ مَآ أَنفَقُوا۟ مَنًّۭا وَلَآ أَذًۭى ۙ لَّهُمْ أَجْرُهُمْ عِندَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ

যারা স্বীয় ধন সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে, এরপর ব্যয় করার পর সে অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করে না এবং কষ্টও দেয় না, তাদেরই জন্যে তাদের পালনকর্তার কাছে রয়েছে পুরস্কার এবং তাদের কোন আশংকা নেই, তারা চিন্তিতও হবে না।

যারা আল্লাহর পথে আপন ধন ব্যয় করে, অতঃপর যা ব্যয় করে, তার কথা বলে বেড়ায় না এবং (ঐ দানের বদলে কাউকে) কষ্টও দেয় না,[১] তাদের পুরস্কার রয়েছে তাদের প্রতিপালকের নিকট, বস্তুতঃ তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।

[১] আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় বা দান করার উল্লিখিত ফযীলত কেবল সেই ব্যক্তিই লাভ করবে, যে স্বীয় সম্পদ দান করে অনুগ্রহ প্রকাশ করবে না এবং সে মুখ দিয়ে এমন কোন তুচ্ছ বাক্যও বের করবে না, যা কোন গরীব-অভাবীর সম্মানে আঘাত হানে এবং সে তাতে ব্যথা অনুভব করে। কেননা, এটা এত বড় অপরাধ যে, নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, "কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তিন শ্রেণীর মানুষের সাথে কথা বলবেন না। তাদের মধ্যে একজন হল, (দান করে) অনুগ্রহ প্রকাশকারী ব্যক্তি।" (মুসলিম ১০৬নং)

Al-Baqara 2:262Listen in Qur'an →
263

۞ قَوْلٌۭ مَّعْرُوفٌۭ وَمَغْفِرَةٌ خَيْرٌۭ مِّن صَدَقَةٍۢ يَتْبَعُهَآ أَذًۭى ۗ وَٱللَّهُ غَنِىٌّ حَلِيمٌۭ

নম্র কথা বলে দেয়া এবং ক্ষমা প্রদর্শন করা ঐ দান খয়রাত অপেক্ষা উত্তম, যার পরে কষ্ট দেয়া হয়। আল্লাহ তা’আলা সম্পদশালী, সহিঞ্চু।

যে দানের পশ্চাতে (যাচ্ঞাকারীকে) কষ্ট দেওয়া হয়, তার চেয়ে (তাকে) মিষ্টি কথা বলা এবং ক্ষমা করা উত্তম। [১] আর আল্লাহ অভাবমুক্ত, পরম সহনশীল।

[১] ভিক্ষুকের সাথে নম্রভাবে ও দয়ামাখা স্বরে কথা বলা অথবা দু'আ-বাক্য (আল্লাহ তাআ'লা তোমাকে ও আমাকে তাঁর অনুগ্রহ ও করুণা দানে ধন্য করুন! ইত্যাদি) দ্বারা তাকে উত্তর দেওয়াই হল 'মিষ্টি বা উত্তম কথা'। আর 'ক্ষমা করা'র অর্থ হল, ভিক্ষুকের অভাব-অনটন ও তার প্রয়োজনের কথা মানুষের সামনে প্রকাশ না করে তা গোপন করা। অনুরূপ ভিক্ষুকের মুখ দিয়ে যদি কোন অনুচিত কথা বেরিয়ে যায়, তা ক্ষমা করে দেওয়াও এর আওতাভুক্ত। অর্থাৎ, ভিক্ষুকের সাথে নম্রভাবে দয়ামাখা স্বরে কথা বলা, তাকে ক্ষমা করা এবং তার (ব্যাপার) গোপন করা সেই সাদাকার চেয়ে উত্তম, যে সাদাকা করার পর (যাকে সাদাকা দেওয়া হয়) তাকে মানুষের সামনে অপমানিত করে কষ্ট দেওয়া হয়। এই জন্যই হাদীসে বলা হয়েছে, "উত্তম কথা সাদাকার সমতুল্য।" (মুসলিম ১০০৯নং) অনুরূপ নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, "তুমি কোনও নেকীর কাজকে তুচ্ছ ভেবো না, যদিও তা তোমার কোন ভায়ের সাথে হাসি মুখে সাক্ষাৎ করার মাধ্যমে হয়।" (মুসলিম ২৬২৬নং)

Al-Baqara 2:263Listen in Qur'an →
264

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ لَا تُبْطِلُوا۟ صَدَقَٰتِكُم بِٱلْمَنِّ وَٱلْأَذَىٰ كَٱلَّذِى يُنفِقُ مَالَهُۥ رِئَآءَ ٱلنَّاسِ وَلَا يُؤْمِنُ بِٱللَّهِ وَٱلْيَوْمِ ٱلْءَاخِرِ ۖ فَمَثَلُهُۥ كَمَثَلِ صَفْوَانٍ عَلَيْهِ تُرَابٌۭ فَأَصَابَهُۥ وَابِلٌۭ فَتَرَكَهُۥ صَلْدًۭا ۖ لَّا يَقْدِرُونَ عَلَىٰ شَىْءٍۢ مِّمَّا كَسَبُوا۟ ۗ وَٱللَّهُ لَا يَهْدِى ٱلْقَوْمَ ٱلْكَٰفِرِينَ

হে ঈমানদারগণ!তোমরা অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করে এবং কষ্ট দিয়ে নিজেদের দান খয়রাত বরবাদ করো না সে ব্যক্তির মত যে নিজের ধন-সম্পদ লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ব্যয় করে এবং আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে না। অতএব, এ ব্যাক্তির দৃষ্টান্ত একটি মসৃণ পাথরের মত যার উপর কিছু মাটি পড়েছিল। অতঃপর এর উপর প্রবল বৃষ্টি বর্ষিত হলো, অনন্তর তাকে সম্পূর্ণ পরিষ্কার করে দিল। তারা ঐ বস্তুর কোন সওয়াব পায় না, যা তারা উপার্জন করেছে। আল্লাহ কাফের সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শন করেন না।

হে বিশ্বাসিগণ! দানের কথা প্রচার করে এবং কষ্ট দিয়ে তোমরা তোমাদের দানকে নষ্ট করে দিও না; ঐ লোকের মত যে নিজের ধন লোক দেখানোর জন্য ব্যয় করে এবং আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে না। তার উপমা একটি শক্ত পাথরের মত, যার উপর কিছু মাটি থাকে। অতঃপর তার উপর প্রবল বৃষ্টিপাত তাকে মসৃণ করে রেখে দেয়। [১] যা তারা উপার্জন করেছে, তার কিছুই তারা তাদের কাজে লাগাতে পারবে না। বস্তুতঃ আল্লাহ অবিশ্বাসী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।

[১] এখানে প্রথমতঃ বলা হয়েছে যে, সাদাকা-খয়রাত করে অনুগ্রহ প্রকাশ করা (বা বলে বেড়ানো) এবং (খোঁটা মেরে) কষ্টদায়ক বাক্যালাপ ঈমানদারদের অভ্যাস নয়, বরং তা হল মুনাফেক ও তাদের অভ্যাস, যারা লোক প্রদর্শনের জন্য ব্যয় করে। দ্বিতীয়তঃ এ রকম ব্যয় করার দৃষ্টান্ত এমন পরিষ্কার পাথরের মত যার উপর থাকে কিছু মাটি, কোন মানুষ ফসলাদি লাভের আশায় তাতে বীজ ফেলে দেয়, কিন্তু বৃষ্টির এক ঝাপটেই সমস্ত মাটি ধুয়ে নেমে যায় এবং পাথর মাটি থেকে একেবারে পরিষ্কার ও মসৃণ হয়ে যায়। অর্থাৎ, যেমন বৃষ্টি এই পাথরের জন্য কোন ফলপ্রসূ হয় না, অনুরূপ লোকপ্রদর্শনকারীর সাদাকাও তার জন্য কোন লাভ বয়ে আনে না।

Al-Baqara 2:264Listen in Qur'an →
265

وَمَثَلُ ٱلَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَٰلَهُمُ ٱبْتِغَآءَ مَرْضَاتِ ٱللَّهِ وَتَثْبِيتًۭا مِّنْ أَنفُسِهِمْ كَمَثَلِ جَنَّةٍۭ بِرَبْوَةٍ أَصَابَهَا وَابِلٌۭ فَـَٔاتَتْ أُكُلَهَا ضِعْفَيْنِ فَإِن لَّمْ يُصِبْهَا وَابِلٌۭ فَطَلٌّۭ ۗ وَٱللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ

যারা আল্লাহর রাস্তায় স্বীয় ধন-সম্পদ ব্যয় করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে এবং নিজের মনকে সুদৃঢ় করার জন্যে তাদের উদাহরণ টিলায় অবস্থিত বাগানের মত, যাতে প্রবল বৃষ্টিপাত হয়; অতঃপর দ্বিগুণ ফসল দান করে। যদি এমন প্রবল বৃষ্টিপাত নাও হয়, তবে হাল্কা বর্ষণই যথেষ্ট। আল্লাহ তোমাদের কাজকর্ম যথার্থই প্রত্যক্ষ করেন।

পক্ষান্তরে, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং নিজের হৃদয়কে শক্তিশালী করার জন্য তাদের ধন দান করে, তাদের উপমা কোন উঁচু ভূমিতে অবস্থিত একটি বাগান, [১] যাতে মুষলধারে বৃষ্টি হয়, ফলে তার ফল-মূল দ্বিগুণ জন্মে। যদি মুষলধারে বৃষ্টি নাও হয়, তবে হাল্কা বৃষ্টিই যথেষ্ট। বস্তুতঃ তোমরা যা কর, আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।

[১] এটা সেই ঈমানদারদের দৃষ্টান্ত, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য দান করে থাকে। তাদের দানকৃত সম্পদ সেই বাগানের মত, যা কোন উঁচু জায়গায় অবস্থিত, তাতে প্রবল বৃষ্টি হলে দ্বিগুণ ফসল দেয়। আর প্রবল বৃষ্টি না হলেও হাল্কা বর্ষণ এবং শিশিরও তার জন্য যথেষ্ট হয়। অনুরূপ তাদের সাদাকা-খয়রাত যতই কম হোক না কেন আল্লাহর নিকট তা কয়েক গুণ প্রতিদান ও নেকীর কারণ হবে। 'জান্নাত' বা বাগান এমন ভূমিকে বলা হয়, যাতে এত সংখ্যায় বৃক্ষাদি থাকে যে তা পুরো ভূমিকে ঢেকে নেয়। অথবা 'জান্নাত' এমন বাগান যার চতুর্দিক এমনভাবে ঘেরা-বেড়া থাকে যে, তার ফলে বাগান দৃষ্টিগোচর হয় না। جَنَّة জান্নাত শব্দটি جنّ ধাতু থেকে গঠিত, (যার অর্থ ঢাকা বা অদৃশ্য হওয়া)। এ জন্যই জ্বিন এমন সৃষ্টির নাম যা দেখা যায় না। পেটের শিশুকেও 'জানীন' বলা হয় কারণ তাও দেখা যায় না। পাগলামিকে 'জুনুন' বলে আখ্যায়িত করা হয়, কারণ তার বুদ্ধির উপর পর্দা পড়ে যায়। আর জান্নাতকেও এই জন্যই জান্নাত বলা হয় যে তা রয়েছে দৃষ্টির অগোচরে। رَبوَة উঁচু ভূমিকে বলে। আর وَابِل অর্থ প্রবল বৃষ্টি।

Al-Baqara 2:265Listen in Qur'an →
266

أَيَوَدُّ أَحَدُكُمْ أَن تَكُونَ لَهُۥ جَنَّةٌۭ مِّن نَّخِيلٍۢ وَأَعْنَابٍۢ تَجْرِى مِن تَحْتِهَا ٱلْأَنْهَٰرُ لَهُۥ فِيهَا مِن كُلِّ ٱلثَّمَرَٰتِ وَأَصَابَهُ ٱلْكِبَرُ وَلَهُۥ ذُرِّيَّةٌۭ ضُعَفَآءُ فَأَصَابَهَآ إِعْصَارٌۭ فِيهِ نَارٌۭ فَٱحْتَرَقَتْ ۗ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ ٱللَّهُ لَكُمُ ٱلْءَايَٰتِ لَعَلَّكُمْ تَتَفَكَّرُونَ

তোমাদের কেউ পছন্দ করে যে, তার একটি খেজুর ও আঙ্গুরের বাগান হবে, এর তলদেশ দিয়ে নহর প্রবাহিত হবে, আর এতে সর্বপ্রকার ফল-ফসল থাকবে এবং সে বার্ধক্যে পৌছবে, তার দুর্বল সন্তান সন্ততিও থাকবে, এমতাবস্থায় এ বাগানের একটি ঘূর্ণিবায়ু আসবে, যাতে আগুন রয়েছে, অনন্তর বাগানটি ভষ্মীভূত হয়ে যাবে? এমনিভাবে আল্লাহ তা’আলা তোমাদের জন্যে নিদর্শনসমূহ বর্ননা করেন-যাতে তোমরা চিন্তা-ভাবনা কর।

তোমাদের কেউ কি চায় যে, তার খেজুর ও আঙ্গুরের একটি বাগান থাকুক, যার নিচে নদী প্রবাহিত এবং যাতে সকল প্রকার ফল-মূল আছে, আর সে ব্যক্তি বার্ধক্যে উপনীত হয় এবং তার অসহায় দুর্বল সন্তান-সন্ততি থাকে। (এমন অবস্থায়) ঐ (বাগান)টিকে এক অগ্নিক্ষরা ঘূর্ণিঝড় আক্রমণ করে ও তা জ্বলে (ধ্বংস হয়ে) যায়?[১] এভাবে আল্লাহ তাঁর সকল নিদর্শন তোমাদের জন্য সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করেন, যাতে তোমরা চিন্তা-ভাবনা করতে পার।

[১] লোক প্রদর্শন তথা সুনাম নেওয়ার উদ্দেশ্যে কোন কাজ করার ক্ষতিসমূহের কথা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়ার জন্য এবং তা থেকে মানুষকে দূরে রাখার জন্য এখানে আরো একটি দৃষ্টান্ত পেশ করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, যেমন কোন মানুষের একটি বাগান আছে। সে বাগানে সব রকমের ফল-ফসল হয়। (অর্থাৎ, তাতে সম্পূর্ণ আয় হওয়ার আশা থাকে।) এখন এই লোকটি বার্ধক্যে পৌঁছে গেল। তার আছে ছোট ছোট সন্তান-সন্ততি। (অর্থাৎ, বার্ধক্য এবং বয়সের ভারের কারণে সে মেহনত-পরিশ্রম করা থেকে অক্ষম হয়ে গেছে। এখন এই ছোট ছোট দুর্বল সন্তান দ্বারা তার বার্ধক্যে সহযোগিতা পাওয়া তো দূরের কথা, তারা তো নিজেদের ভারই বহন করার ক্ষমতা রাখে না।) এমতাবস্থায় একটি ঘূর্ণিবায়ু এসে তার বাগানকে ভষ্মীভুত করে দিল। এখন না সে পুনরায় উক্ত বাগানকে আবাদ করার ক্ষমতা রাখে, আর না তার সন্তানরা। কিয়ামতের দিন লোককে দেখানোর জন্য ব্যয়কারীদের অবস্থা ঠিক এই রকমই হবে। মুনাফেক্বী ও কপটতার কারণে তাদের সমস্ত নেক আমল নষ্ট হয়ে যাবে; কোন উপকারে আসবে না। অথচ সেখানে নেকীর বড়ই প্রয়োজন হবে এবং পুনরায় নেকীর কাজ করারও কোন সুযোগ থাকবে না। মহান আল্লাহ বলছেন, তোমরা কি চাও যে, তোমাদের এ রকম অবস্থা হোক? ইবনে আববাস এবং উমার (রাযীআল্লাহু আনহুমা) এমন লোকদেরকেও উক্ত দৃষ্টান্তের আওতাভুক্ত মনে করেন, যারা সারা জীবন নেকী অর্জন করে এবং শেষ জীবনে শয়তানের জালে ফেঁসে গিয়ে আল্লাহর অবাধ্যতা করে সারা জীবনের নেকীকে নষ্ট করে ফেলে। (সহীহ বুখারী, তাফসীর অধ্যায়ঃ ফাতহুল ক্বাদীর ও তাফসীরে ত্বাবারী)

Al-Baqara 2:266Listen in Qur'an →
267

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ أَنفِقُوا۟ مِن طَيِّبَٰتِ مَا كَسَبْتُمْ وَمِمَّآ أَخْرَجْنَا لَكُم مِّنَ ٱلْأَرْضِ ۖ وَلَا تَيَمَّمُوا۟ ٱلْخَبِيثَ مِنْهُ تُنفِقُونَ وَلَسْتُم بِـَٔاخِذِيهِ إِلَّآ أَن تُغْمِضُوا۟ فِيهِ ۚ وَٱعْلَمُوٓا۟ أَنَّ ٱللَّهَ غَنِىٌّ حَمِيدٌ

হে ঈমানদারগণ! তোমরা স্বীয় উপার্জন থেকে এবং যা আমি তোমাদের জন্যে ভূমি থেকে উৎপন্ন করেছি, তা থেকে উৎকৃষ্ট বস্তু ব্যয় কর এবং তা থেকে নিকৃষ্ট জিনিস ব্যয় করতে মনস্থ করো না। কেননা, তা তোমরা কখনও গ্রহণ করবে না; তবে যদি তোমরা চোখ বন্ধ করে নিয়ে নাও। জেনে রেখো, আল্লাহ অভাব মুক্ত, প্রশংসিত।

হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা যা উপার্জন কর এবং আমি জমি হতে তোমাদের জন্য যা উৎপাদন করে থাকি, তা থেকে যা উৎকৃষ্ট, তা দান কর। [১] এমন মন্দ জিনিস দান করার সংকল্প করো না, যা তোমরা মুদিত চক্ষু ব্যতীত গ্রহণ কর না। [২] আর জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসিত।

[১] সাদাকা কবুল হওয়ার জন্য যেমন জরুরী হল যে, তা অনুগ্রহ প্রকাশ, কষ্ট দেওয়া এবং কপটতা থেকে পাক হতে হবে, (যেমন পূর্বের আয়াতে বলা হয়েছে) অনুরূপ এটাও জরুরী যে, তা হালাল ও পবিত্র উপার্জন থেকে হতে হবে। তাতে তা ব্যবসা-বাণ্যিজের মাধ্যমে হোক অথবা জমি ও বাগান থেকে উৎপন্ন ফসল ও ফলাদির মাধ্যমে হোক। আর "মন্দ জিনিস--" কথার প্রথম অর্থ হল, এমন জিনিস যা অবৈধ পথে উপার্জন করা হয়েছে। মহান আল্লাহ তা কবুল করেন না। হাদীসে এসেছে, "আল্লাহ পবিত্র। তাই তিনি কেবল পবিত্র জিনিসই কবুল করেন।" এর দ্বিতীয় অর্থ হল, খারাপ ও অতি নিম্নমানের জিনিস। নষ্ট হয়ে যাওয়া খারাপ জিনিসও যেন আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় না করা হয়। আর {لَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّى تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ} আয়াতের দাবীও তা-ই। এই আয়াত নাযিল হওয়ার কারণ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, মদীনার কোন কোন আনসার সাহাবী খারাপ হয়ে যাওয়া নিম্নমানের খেজুরগুলো সাদাকা স্বরূপ মসজিদে দিয়ে যেতেন। যার ফলে এই আয়াত নাযিল হয়। (ফাতহুল ক্বাদীরঃ তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ ইত্যাদি)

[২] অর্থাৎ, যেমন তুমি নিজের জন্য নষ্ট হয়ে যাওয়া খারাপ জিনিস নিতে পছন্দ করো না, অনুরূপ আল্লাহর পথেও ভাল ছাড়া খারাপ জিনিস ব্যয় করো না।

Al-Baqara 2:267Listen in Qur'an →
268

ٱلشَّيْطَٰنُ يَعِدُكُمُ ٱلْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُم بِٱلْفَحْشَآءِ ۖ وَٱللَّهُ يَعِدُكُم مَّغْفِرَةًۭ مِّنْهُ وَفَضْلًۭا ۗ وَٱللَّهُ وَٰسِعٌ عَلِيمٌۭ

শয়তান তোমাদেরকে অভাব অনটনের ভীতি প্রদর্শন করে এবং অশ্লীলতার আদেশ দেয়। পক্ষান্তরে আল্লাহ তোমাদেরকে নিজের পক্ষ থেকে ক্ষমা ও বেশী অনুগ্রহের ওয়াদা করেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সুবিজ্ঞ।

শয়তান তোমাদেরকে দারিদ্রে্র ভয় দেখায় এবং জঘন্য কাজে উৎসাহ দেয়,[১] পক্ষান্তরে আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। আল্লাহ বিপুল দাতা, সর্বজ্ঞ।

[১] অর্থাৎ, সৎ পথে মাল ব্যয় করতে চাইলে শয়তান নিঃসব ও কাঙ্গাল হয়ে যাওয়ার ভয় দেখায়। কিন্তু অন্যায় পথে ব্যয় করার সময় এই ধরনের কোন আশঙ্কা মনে আসতেই দেয় না; বরং মন্দ কাজগুলোকে এত সুন্দর করে সাজিয়ে পেশ করে এবং নিদ্রিত আশা-আকাঙ্ক্ষাকে এমনভাবে জাগিয়ে তোলে যে, মানুষ তার জন্য বিশাল পরিমাণ অর্থ অনায়াসে ব্যয় করে ফেলে। তাইতো দেখা যায় যে, যখন কোন মসজিদ, মাদ্রাসা অথবা কল্যাণকর কাজের জন্য কেউ চাঁদার জন্য যায়, তখন বিত্তশালী টাকা-পয়সার মালিক এক-দু'শ টাকা দেওয়ার জন্য বার বার হিসাবের খাতা যাচাই করে এবং চাঁদা আদায়কারীদেরকে অনেক সময় বহুবার আনাগোনা করতে বাধ্য করা হয়। পক্ষান্তরে এই মানুষটাই সিনেমা, টিভি, মদপান, প্রেম-ব্যভিচার এবং মামলা-মকদ্দমার জালে ফেঁসে গিয়ে বেহিসাব মাল ব্যয় করে। এ সব কাজে অর্থ ব্যয় করার সময় তার মধ্যে কোন প্রকারের উৎকণ্ঠা ও দ্বিধা-দন্ধ প্রকাশ পায় না!

Al-Baqara 2:268Listen in Qur'an →
269

يُؤْتِى ٱلْحِكْمَةَ مَن يَشَآءُ ۚ وَمَن يُؤْتَ ٱلْحِكْمَةَ فَقَدْ أُوتِىَ خَيْرًۭا كَثِيرًۭا ۗ وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّآ أُو۟لُوا۟ ٱلْأَلْبَٰبِ

তিনি যাকে ইচ্ছা বিশেষ জ্ঞান দান করেন এবং যাকে বিশেষ জ্ঞান দান করা হয়, সে প্রভুত কল্যাণকর বস্তু প্রাপ্ত হয়। উপদেশ তারাই গ্রহণ করে, যারা জ্ঞানবান।

তিনি যাকে ইচ্ছা প্রজ্ঞা দান করেন, আর যাকে প্রজ্ঞা [১] প্রদান করা হয়, তাকে নিশ্চয় প্রভূত কল্যাণ দান করা হয়। বস্তুতঃ শুধু জ্ঞানীরাই উপদেশ গ্রহণ করে থাকে।

[১] حِكمَة 'হিকমত'এর অর্থ কেউ করেছেন, জ্ঞান-বুদ্ধি-প্রজ্ঞা। কেউ করেছেন, সঠিক মত বা সিদ্ধান্ত, কুরআনের 'নাসেখ-মানসুখ' এর জ্ঞান এবং বিচার শক্তি। আবার কারো নিকট 'হিকমত' হল, কেবল সুন্নাতের জ্ঞান অথবা কিতাব ও সুন্নাতের জ্ঞান। অথবা উপরোক্ত সব অর্থই 'হিকমত'-এর আওতাভুক্ত। সহীহ বুখারী ও মুসলিম ও অন্যান্য হাদীস গ্রন্থে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, "দুই ব্যক্তির প্রতি ঈর্ষা করা বৈধ। এক ব্যক্তি হল সেই, যাকে আল্লাহ সম্পদ দান করেছেন এবং সে তা সৎপথে ব্যয় করে। আর দ্বিতীয় ব্যক্তি হল সে, যাকে আল্লাহ হিকমত দান করেছেন যার দ্বারা সে বিচার-ফয়সালা করে এবং মানুষদেরকেও তা শিক্ষা দেয়।" (বুখারী, অধ্যায়ঃ ইলম, মুসলিম, অধ্যায়ঃ সালাতুল মুসাফেরীন)

Al-Baqara 2:269Listen in Qur'an →
270

وَمَآ أَنفَقْتُم مِّن نَّفَقَةٍ أَوْ نَذَرْتُم مِّن نَّذْرٍۢ فَإِنَّ ٱللَّهَ يَعْلَمُهُۥ ۗ وَمَا لِلظَّٰلِمِينَ مِنْ أَنصَارٍ

তোমরা যে খয়রাত বা সদ্ব্যয় কর কিংবা কোন মানত কর, আল্লাহ নিশ্চয়ই সেসব কিছুই জানেন। অন্যায়কারীদের কোন সাহায্যকারী নেই।

যা তোমরা দান কর অথবা যা কিছু তোমরা নযর-মানত কর,[১] আল্লাহ তা অবশ্যই জানেন এবং অত্যাচারীদের কোন সাহায্যকারী নেই।

[১] نَذر 'নযর' তথা মানত করা বলতে এই নিয়ত করা যে, আমার অমুক কাজটা যদি হয়ে যায় অথবা অমুক বিপদ থেকে যদি আমি মুক্তি পাই, তাহলে আল্লাহর রাস্তায় এতটা পরিমাণ আমি সাদাকা করব। এই মানত পূরণ করা জরুরী। তবে কোন অবাধ্যতা অথবা অবৈধ কাজের মানত করে থাকলে তা পূরণ করা বৈধ নয়। মানত করাও নামায-রোযার মত একটি ইবাদত। কাজেই আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে মানত করলে সেটা তারই ইবাদত বলে গণ্য হবে, আর তা হবে শিরক। যেমন বর্তমানে অনেক প্রসিদ্ধ কবরসমূহে গিয়ে মানত করে সেখানে ব্যাপকহারে নযরানা পেশ করা হয়। মহান আল্লাহ এই ধরনের শিরক থেকে আমাদেরকে রক্ষা করুন। আমীন!

Al-Baqara 2:270Listen in Qur'an →

Commentary: Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation. Qur'an text and translation via AlQuran Cloud.