Muslim99Muslim99
← Tafsir library

2. Al-Baqara

The Cow · Medinan · 286 ayahs

سُورَةُ البَقَرَةِ

Reading Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation

Ayahs 191–200 of 286

191

وَٱقْتُلُوهُمْ حَيْثُ ثَقِفْتُمُوهُمْ وَأَخْرِجُوهُم مِّنْ حَيْثُ أَخْرَجُوكُمْ ۚ وَٱلْفِتْنَةُ أَشَدُّ مِنَ ٱلْقَتْلِ ۚ وَلَا تُقَٰتِلُوهُمْ عِندَ ٱلْمَسْجِدِ ٱلْحَرَامِ حَتَّىٰ يُقَٰتِلُوكُمْ فِيهِ ۖ فَإِن قَٰتَلُوكُمْ فَٱقْتُلُوهُمْ ۗ كَذَٰلِكَ جَزَآءُ ٱلْكَٰفِرِينَ

আর তাদেরকে হত্যাকর যেখানে পাও সেখানেই এবং তাদেরকে বের করে দাও সেখান থেকে যেখান থেকে তারা বের করেছে তোমাদেরকে। বস্তুতঃ ফেতনা ফ্যাসাদ বা দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করা হত্যার চেয়েও কঠিন অপরাধ। আর তাদের সাথে লড়াই করো না মসজিদুল হারামের নিকটে যতক্ষণ না তারা তোমাদের সাথে সেখানে লড়াই করে। অবশ্য যদি তারা নিজেরাই তোমাদের সাথে লড়াই করে। তাহলে তাদেরকে হত্যা কর। এই হল কাফেরদের শাস্তি।

আর যেখানে পাও, তাদেরকে হত্যা কর এবং যেখান থেকে তোমাদেরকে বহিষ্কার করেছে, তোমরাও সেখান থেকে তাদেরকে বহিষ্কার কর। ফিতনা (অশান্তি, শিরক বা ধর্মদ্রোহিতা) হত্যা অপেক্ষাও গুরুতর।[১] আর মাসজিদুল হারামের (কা’বা শরীফের) নিকট তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করো না; যতক্ষণ না তারা সেখানে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে। যদি তারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তবে তোমরা তাদের হত্যা কর।[২] এটাই তো অবিশ্বাসীদের প্রতিফল।

[১] মক্কায় মুসলিমরা যেহেতু দুর্বল ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল, তাই কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করা নিষেধ ছিল। হিজরতের পর মুসলিমদের সমস্ত শক্তি মদীনায় একত্রিত হলে তাদেরকে জিহাদ করার অনুমতি দেওয়া হয়। প্রথম পর্যায়ে তিনি কেবল তাদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করতেন, যারা অগ্রিম মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আসত। এরপর এটাকে আরো সম্প্রসারিত করা হয় এবং মুসলিমরা প্রয়োজন অনুযায়ী কাফেরদের অঞ্চলে গিয়েও জিহাদ করেন। কুরআন কারীমে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করা হয়েছে। এই জন্য নবী করীম (সাঃ) স্বীয় সৈন্যদের তাকীদ করতেন যে, খিয়ানত ও অঙ্গীকার ভঙ্গ করো না। আঙ্গিক বিকৃতি ঘটায়ো না। শিশু, মহিলা এবং গির্জায় উপাসনায় মগ্ন উপাসক বা পুরোহিতদেরকে হত্যা করো না। অনুরূপ বৃক্ষাদি জ্বালাবে না এবং বিনা উদ্দেশ্যে পশুদের হত্যা করবে না। (ইবনে কাসীর-মুসলিম ইত্যাদি)

{حَيْثُ ثَقِفْتُمُوْهُمْ} "যেখানে পাও তাদেরকে হত্যা কর" এর অর্থ হল, যখনই তাদেরকে হত্যা করতে সক্ষম হবে, তখনই তাদেরকে হত্যা কর। (আইসারুততাফাসীর)

{مِنْ حَيْثُ أَخْرَجُوْكُم} অর্থাৎ, যেভাবে কাফেররা তোমাদেরকে মক্কা থেকে বের করেছিল, সেভাবে তোমরাও তাদেরকে মক্কা থেকে বহিষ্কার কর। তাইতো মক্কা বিজয়ের দিন যারা ইসলাম গ্রহণ করেনি, চুক্তির সময় সীমা শেষ হয়ে যাওয়ার পর তাদেরকে সেখান থেকে বের হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। 'ফিৎনা'র অর্থ, কুফরী ও শিরক। এটা হত্যার চেয়েও কঠিন (বড় অপরাধ)। তাই এর মূলোৎপাটনের উদ্দেশ্যে জিহাদ থেকে বিমুখ হওয়া উচিত নয়।

[২] 'হারাম' সীমানায় যুদ্ধ করা নিষেধ। কিন্তু কাফেররা যদি 'হারাম'-এর মর্যাদার খেয়াল না রাখে, তাহলে তোমাদেরও তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অনুমতি রয়েছে।

Al-Baqara 2:191Listen in Qur'an →
192

فَإِنِ ٱنتَهَوْا۟ فَإِنَّ ٱللَّهَ غَفُورٌۭ رَّحِيمٌۭ

আর তারা যদি বিরত থাকে, তাহলে আল্লাহ অত্যন্ত দয়ালু।

কিন্তু যদি তারা বিরত হয়, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

Al-Baqara 2:192Listen in Qur'an →
193

وَقَٰتِلُوهُمْ حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتْنَةٌۭ وَيَكُونَ ٱلدِّينُ لِلَّهِ ۖ فَإِنِ ٱنتَهَوْا۟ فَلَا عُدْوَٰنَ إِلَّا عَلَى ٱلظَّٰلِمِينَ

আর তোমরা তাদের সাথে লড়াই কর, যে পর্যন্ত না ফেতনার অবসান হয় এবং আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত হয়। অতঃপর যদি তারা নিবৃত হয়ে যায় তাহলে কারো প্রতি কোন জবরদস্তি নেই, কিন্তু যারা যালেম (তাদের ব্যাপারে আলাদা)।

আর তোমরা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাক, যতক্ষণ না ফিতনা (অশান্তি, শিরক বা ধর্মদ্রোহিতা) দূর হয়ে আল্লাহর দ্বীন (ধর্ম) প্রতিষ্ঠিত না হয়, কিন্তু যদি তারা নিবৃত্ত হয়, তবে অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে ছাড়া (অন্য কারো বিরুদ্ধে) আক্রমণ করা চলবে না।

Al-Baqara 2:193Listen in Qur'an →
194

ٱلشَّهْرُ ٱلْحَرَامُ بِٱلشَّهْرِ ٱلْحَرَامِ وَٱلْحُرُمَٰتُ قِصَاصٌۭ ۚ فَمَنِ ٱعْتَدَىٰ عَلَيْكُمْ فَٱعْتَدُوا۟ عَلَيْهِ بِمِثْلِ مَا ٱعْتَدَىٰ عَلَيْكُمْ ۚ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ وَٱعْلَمُوٓا۟ أَنَّ ٱللَّهَ مَعَ ٱلْمُتَّقِينَ

সম্মানিত মাসই সম্মানিত মাসের বদলা। আর সম্মান রক্ষা করারও বদলা রয়েছে। বস্তুতঃ যারা তোমাদের উপর জবর দস্তি করেছে, তোমরা তাদের উপর জবরদস্তি কর, যেমন জবরদস্তি তারা করেছে তোমাদের উপর। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ, যারা পরহেযগার, আল্লাহ তাদের সাথে রয়েছেন।

নিষিদ্ধ (পবিত্র) মাসের পরিবর্তে নিষিদ্ধ (পবিত্র) মাস এবং সকল নিষিদ্ধ (পবিত্র) জিনিসের জন্য এরূপ বিনিময়।[১] সুতরাং যে তোমাদেরকে (ঐ মাসে) আক্রমণ করবে, তোমরাও তাকে অনুরূপ (মাসে) আক্রমণ কর। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ যে, আল্লাহ সাবধানীদের সাথী।

[১] হিজরী সনের ৬ষ্ঠ বছরে যুলহজ্জ মাসে রসূল (সাঃ) চৌদ্দশ সাহাবীদেরকে সাথে নিয়ে উমরাহ করার জন্য গিয়েছিলেন। কিন্তু মক্কার কাফেররা তাঁদেরকে প্রবেশ করতে বাধা দিল এবং আপোসে ফায়সালা এই হল যে, আগামী বছর মুসলিমরা তিন দিনের জন্য উমরাহ করার উদ্দেশ্যে মক্কায় প্রবেশ করতে পারবে। মাসটা ছিল 'হারাম' (যুদ্ধবিগ্রহ নিষিদ্ধ) মাসসমূহের একটি মাস। পরের বছরে চুক্তি অনুযায়ী মুসলিমরা যখন উক্ত মাসেই উমরা করার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন, তখন মহান আল্লাহ এই আয়াত অবতীর্ণ করলেন। উদ্দেশ্য এই যে, এবারও যদি মক্কার কাফেররা এই মাসের সম্মান রক্ষা না করে (গতবারের মত) তোমাদেরকে মক্কায় প্রবেশ করতে বাধা দেয়, তবে তোমরাও এর মর্যাদার কোন খেয়াল না করে তাদের সাথে পূর্ণ উদ্যমে মোকাবেলা কর। 'সকল নিষিদ্ধ (পবিত্র) জিনিসের জন্য এরূপ বিনিময়' অর্থাৎ, তারা যদি নিষিদ্ধ মাসের সম্মান রক্ষা করে, তাহলে তোমরাও তার সম্মান রক্ষা কর। অন্যথা তোমরাও এই সম্মানকে দৃষ্টিচ্যুত করে কাফেরদেরকে উপদেশমূলক শিক্ষা দাও। (ইবনে কাসীর)

Al-Baqara 2:194Listen in Qur'an →
195

وَأَنفِقُوا۟ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ وَلَا تُلْقُوا۟ بِأَيْدِيكُمْ إِلَى ٱلتَّهْلُكَةِ ۛ وَأَحْسِنُوٓا۟ ۛ إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلْمُحْسِنِينَ

আর ব্যয় কর আল্লাহর পথে, তবে নিজের জীবনকে ধ্বংসের সম্মুখীন করো না। আর মানুষের প্রতি অনুগ্রহ কর। আল্লাহ অনুগ্রহকারীদেরকে ভালবাসেন।

তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় কর এবং (ব্যয় না করে) নিজেরা নিজেদের সর্বনাশ করো না।[১] আর তোমরা সৎকর্ম কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদেরকে ভালবাসেন।

[১] কারো নিকট এর অর্থ হল, (আল্লাহর পথে) ব্যয় না করা। কেউ বলেছেন, জিহাদ না করা। আবার কেউ বলেছেন, অব্যাহতভাবে পাপ করা। আর এ সবগুলোই ধ্বংস ডেকে আনে। যদি জিহাদ ত্যাগ কর অথবা জিহাদে সম্পদ ব্যয় করা থেকে বিরত থাকো, তাহলে শত্রুরা শক্তিশালী হবে এবং তোমরা হবে দুর্বল, ফলে ধ্বংস হতে হবে।

Al-Baqara 2:195Listen in Qur'an →
196

وَأَتِمُّوا۟ ٱلْحَجَّ وَٱلْعُمْرَةَ لِلَّهِ ۚ فَإِنْ أُحْصِرْتُمْ فَمَا ٱسْتَيْسَرَ مِنَ ٱلْهَدْىِ ۖ وَلَا تَحْلِقُوا۟ رُءُوسَكُمْ حَتَّىٰ يَبْلُغَ ٱلْهَدْىُ مَحِلَّهُۥ ۚ فَمَن كَانَ مِنكُم مَّرِيضًا أَوْ بِهِۦٓ أَذًۭى مِّن رَّأْسِهِۦ فَفِدْيَةٌۭ مِّن صِيَامٍ أَوْ صَدَقَةٍ أَوْ نُسُكٍۢ ۚ فَإِذَآ أَمِنتُمْ فَمَن تَمَتَّعَ بِٱلْعُمْرَةِ إِلَى ٱلْحَجِّ فَمَا ٱسْتَيْسَرَ مِنَ ٱلْهَدْىِ ۚ فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلَٰثَةِ أَيَّامٍۢ فِى ٱلْحَجِّ وَسَبْعَةٍ إِذَا رَجَعْتُمْ ۗ تِلْكَ عَشَرَةٌۭ كَامِلَةٌۭ ۗ ذَٰلِكَ لِمَن لَّمْ يَكُنْ أَهْلُهُۥ حَاضِرِى ٱلْمَسْجِدِ ٱلْحَرَامِ ۚ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ وَٱعْلَمُوٓا۟ أَنَّ ٱللَّهَ شَدِيدُ ٱلْعِقَابِ

আর তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্জ্ব ওমরাহ পরিপূর্ণ ভাবে পালন কর। যদি তোমরা বাধা প্রাপ্ত হও, তাহলে কোরবানীর জন্য যাকিছু সহজলভ্য, তাই তোমাদের উপর ধার্য। আর তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত মাথা মুন্ডন করবে না, যতক্ষণ না কোরবাণী যথাস্থানে পৌছে যাবে। যারা তোমাদের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়বে কিংবা মাথায় যদি কোন কষ্ট থাকে, তাহলে তার পরিবর্তে রোজা করবে কিংবা খয়রাত দেবে অথবা কুরবানী করবে। আর তোমাদের মধ্যে যারা হজ্জ্ব ওমরাহ একত্রে একই সাথে পালন করতে চাও, তবে যাকিছু সহজলভ্য, তা দিয়ে কুরবানী করাই তার উপর কর্তব্য। বস্তুতঃ যারা কোরবানীর পশু পাবে না, তারা হজ্জ্বের দিনগুলোর মধ্যে রোজা রাখবে তিনটি আর সাতটি রোযা রাখবে ফিরে যাবার পর। এভাবে দশটি রোযা পূর্ণ হয়ে যাবে। এ নির্দেশটি তাদের জন্য, যাদের পরিবার পরিজন মসজিদুল হারামের আশে-পাশে বসবাস করে না। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক। সন্দেহাতীতভাবে জেনো যে, আল্লাহর আযাব বড়ই কঠিন।

আর আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্জ্ব ও উমরাহ পূর্ণভাবে সম্পাদন কর,[১] কিন্তু (ইহরাম বাঁধার পর) যদি তোমরা বাধাপ্রাপ্ত হও, তাহলে সহজলভ্য (পশু) কুরবানী কর[২] এবং যে পর্যন্ত কুরবানীর (পশু) তার যবেহস্থলে উপস্থিত না হয়, তোমরা মস্তক মুন্ডন করো না (হালাল হয়ো না)।[৩] অতএব তোমাদের মধ্যে কেউ পীড়িত হলে, অথবা মাথায় কোন ব্যাধি থাকলে (এবং তার জন্য মস্তক মুন্ডন করতে হলে তার পরিবর্তে) সে রোযা রাখবে কিংবা সাদকাহ করবে, কিংবা কুরবানী দ্বারা তার ফিদ্ইয়া (বিনিময়) দেবে।[৪] অতঃপর যখন তোমরা নিরাপদ হবে, তখন তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি হজ্জ্বের পূর্বে উমরাহ দ্বারা লাভবান হতে চায়, সে সহজলভ্য কুরবানী করবে। কিন্তু যদি কেউ কুরবানী না পায় (বা দিতে অক্ষম হয়), তাহলে তাকে হজ্জের সময় তিন দিন এবং গৃহে প্রত্যাবর্তনের পর সাত দিন [৫] -- এই পূর্ণ দশ দিন রোযা পালন করতে হবে। এই নিয়ম সেই ব্যক্তির জন্য, যার পরিবার-পরিজন পবিত্র কা’বার নিকটে (মক্কায়) বাস করে না।[৬] আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ যে, আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা।

[১] হজ্জ ও উমরার ইহরাম বেঁধে নেওয়ার পর তা পূর্ণ করা ওয়াজিব, যদিও তা (হজ্জ ও উমরাহ) নফল হয়। (আইসারুত তাফাসীর)

[২] অর্থাৎ, যদি পথে শত্রু অথবা কঠিন অসুস্থতার কারণে বাধাপ্রাপ্ত হও, তাহলে একটি পশু, উট অথবা গরু (গোটা অথবা এক সপ্তমাংশ) অথবা ছাগল বা ভেড়া সেখানেই যবেহ করে মাথা নেড়া করে হালাল হয়ে যাও। যেমন, নবী করীম (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবীগণ হুদাইবিয়্যাতে কুরবানী যবেহ করেছিলেন। আর হুদাইবিয়্যা হারাম সীমানার বাইরে। (ফাতহুল ক্বাদীর) অতঃপর আগামী বছরে তার কাযা কর। যেমন, নবী করীম (সাঃ) সন ৬ হিজরীর উমরার কাযা সন ৭ হিজরীতে করেছিলেন।

[৩] এর সংযোগ {وَاَتِمُّوا الْحَجَّ} (আর তোমরা হজ্জ--- সম্পাদন কর)এর সাথে। আর এর সম্পর্ক হল নিরাপদ পরিস্থিতির সাথে। অর্থাৎ, নিরাপদ অবস্থায় ততক্ষণ পর্যন্ত মাথা নেড়া করবে না (ইহরাম খুলে হালাল হবে না), যতক্ষণ না হজ্জের সমস্ত কার্যাদি পূরণ করেছ।

[৪] অর্থাৎ, সে যদি এমন কষ্টে পতিত হয়ে পড়ে যে, তাকে মাথার চুল কাটতেই হবে, তাহলে তাকে ফিদ্ইয়া (বিনিময়) অবশ্যই দিতে হবে। হাদীস অনুযায়ী এ রকম (অসুবিধাগ্রস্ত) ব্যক্তি ছ'জন মিসকীনকে খাদ্য দান করবে অথবা একটি ছাগল যবেহ করবে কিংবা তিন দিন রোযা রাখবে। রোযা ব্যতীত অন্য দু'টি ফিদ্ইয়ার স্থানের ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন, খাদ্য দান ও ছাগল যবেহ করার কাজ মক্কাতে করতে হবে। আবার কেউ বলেছেন, রোযার মতই এর জন্য কোন নির্দিষ্ট স্থান নেই। ইমাম শাওকানী এই মতেরই সমর্থন করেছেন। (ফাতহুল ক্বাদীর)

[৫] হজ্জ তিন প্রকার; ইফরাদঃ কেবল হজ্জের নিয়তে ইহরাম বাঁধা। ক্বিরানঃ হজ্জ ও উমরার এক সাথে নিয়ত করে ইহরাম বাঁধা। এই উভয় অবস্থায় হজ্জের সমস্ত কার্যাদি সুসম্পন্ন না করে ইহরাম খোলা বৈধ নয়। তামাত্তুঃ এতেও হজ্জ ও উমরার নিয়ত হয়। তবে প্রথমে উমরার নিয়তে ইহরাম বাঁধা হয় এবং উমরাহ সম্পূর্ণ করে ইহরাম খুলে দেওয়া হয় এবং যুল-হজ্জ মাসের ৮ তারীখে হজ্জের জন্য মক্কা থেকেই দ্বিতীয়বার ইহরাম বাঁধা হয়। 'তামাত্তু'র অর্থ লাভবান হওয়া। অর্থাৎ, উমরাহ ও হজ্জের মাঝে ইহরাম খুলে লাভবান হওয়া হয়। হজ্জে ক্বিরান এবং হজ্জে তামাত্তু'তে একটি হাদ্ই (অর্থাৎ, একটি ছাগল বা ভেড়া কিংবা উট বা গরুর এক সপ্তমাংশ) কুরবানী দিতে হবে। যদি কেউ কুরবানী দিতে না পারে, তাহলে সে হজ্জের দিনগুলোতে তিনটি এবং বাড়ি ফিরে সাতটি রোযা রাখবে। হজ্জের দিনগুলোতে যে রোযা রাখবে, তা হয় ৯ই যুল-হজ্জের (আরাফার দিনের) আগে রাখবে অথবা তাশরীকের দিনগুলোতে রাখবে।

[৬] অর্থাৎ, তামাত্তু' হজ্জ ও কুরবানী বা রোযা রাখা কেবল তাদের জন্য বিধেয়, যারা মসজিদে হারামের বাসিন্দা নয়। অর্থাৎ, হারাম সীমানার অথবা তার এত কাছের বাসিন্দা নয় যে, তাদের সফরে নামায কসর করা যায়। (ইবনে কাসীর, ইবনে জারীর)

Al-Baqara 2:196Listen in Qur'an →
197

ٱلْحَجُّ أَشْهُرٌۭ مَّعْلُومَٰتٌۭ ۚ فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ ٱلْحَجَّ فَلَا رَفَثَ وَلَا فُسُوقَ وَلَا جِدَالَ فِى ٱلْحَجِّ ۗ وَمَا تَفْعَلُوا۟ مِنْ خَيْرٍۢ يَعْلَمْهُ ٱللَّهُ ۗ وَتَزَوَّدُوا۟ فَإِنَّ خَيْرَ ٱلزَّادِ ٱلتَّقْوَىٰ ۚ وَٱتَّقُونِ يَٰٓأُو۟لِى ٱلْأَلْبَٰبِ

হজ্জ্বে কয়েকটি মাস আছে সুবিদিত। এসব মাসে যে লোক হজ্জ্বের পরিপূর্ণ নিয়ত করবে, তার পক্ষে স্ত্রীও সাথে নিরাভরণ হওয়া জায়েজ নয়। না অশোভন কোন কাজ করা, না ঝাগড়া-বিবাদ করা হজ্জ্বের সেই সময় জায়েজ নয়। আর তোমরা যাকিছু সৎকাজ কর, আল্লাহ তো জানেন। আর তোমরা পাথেয় সাথে নিয়ে নাও। নিঃসন্দেহে সর্বোত্তম পাথেয় হচ্ছে আল্লাহর ভয়। আর আমাকে ভয় করতে থাক, হে বুদ্ধিমানগন! তোমাদের উপর তোমাদের পালনকর্তার অনুগ্রহ অন্বেষণ করায় কোন পাপ নেই।

সুবিদিত মাসে (যথাঃ শওয়াল, যিলকদ ও যিলহজ্জে) হজ্জ্ব হয়।[১] সুতরাং যে কেউ এই মাসগুলিতে হজ্জ করার সংকল্প করে, সে যেন হজ্জের সময় স্ত্রী-সহবাস (কোন প্রকার যৌনাচার), পাপ কাজ এবং ঝগড়া-বিবাদ না করে।[২] তোমরা যে সৎকাজ কর, আল্লাহ তা জানেন। আর তোমরা (পরকালের) পাথেয় সংগ্রহ কর এবং আত্মসংযমই শ্রেষ্ঠ পাথেয়।[৩] হে জ্ঞানিগণ! তোমরা আমাকেই ভয় কর।

[১] আর তা হল, শাওয়াল, যুল-ক্বা'দাহ এবং যুল-হাজ্জাহ মাসের প্রথম তেরো দিন। অর্থাৎ, উমরাহ তো বছরে সব সময় জায়েয, কিন্তু হজ্জ কেবল নির্দিষ্ট দিনে হয়, তাই হজ্জের ইহরাম হজ্জের মাস ছাড়া অন্য মাসে বাঁধা বৈধ নয়। (ইবনে কাসীর)

মাসআলাঃ হজ্জে ক্বিরান অথবা ইফরাদের ইহরাম মক্কাবাসীরা মক্কার ভিতর থেকেই বাঁধবে। তবে হজ্জে তামাত্তু'র উদ্দেশ্যে উমরার ইহরাম বাঁধার জন্য হারাম সীমানার বাইরে যাওয়া অত্যাবশ্যক। (ফাতহুল বারী, হজ্জ অধ্যায়ঃ উমরাহ পরিচ্ছেদ, মুঅত্তা ইমাম মালিক) অনুরূপ দুনিয়ার অন্যান্য স্থান থেকে আগত লোকেরা ৮ই যুলহজ্জ হজ্জে তামাত্তু'র জন্য মক্কা (নিজের বাসা) থেকেই ইহরাম বাঁধবে। আবার কোন কোন আলেমের নিকট মক্কাবাসীদেরকে উমরার ইহরাম বাঁধার জন্য হারাম সীমানার বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। সুতরাং তারা সর্বপ্রকারের হজ্জ এবং উমরার জন্য নিজ নিজ স্থান থেকেই ইহরাম বাঁধতে পারে।

সতর্কতাঃ হাফেয ইবনুল ক্বাইয়্যেম লিখেছেন যে, রসূল (সাঃ)-এর কথা ও কাজ দ্বারা কেবল দু'প্রকারের উমরাহ প্রমাণিত, এক যা হজ্জে তামাত্তু'র সাথে করা যেতে পারে। আর দ্বিতীয় হল, এমন উমরাহ যা হজ্জের মাস ব্যতীত অন্য দিনে কেবল উমরাহ করার নিয়তে সফর করে করা হয়। এ ছাড়া হারাম সীমানার বাইরে গিয়ে (হারামের নিকটস্থ কোন স্থান থেকে) ইহরাম বেঁধে এসে (একই সফরে একাধিক) উমরা করা বিধেয় নয়। (অবশ্য তার ব্যাপার ভিন্ন, যে আয়েশা রাযিআল্লাহু আনহার মত সমস্যায় পড়ে আগে উমরাহ না করতে পারবে।) (যাদুল মাআ'দ ২খন্ড নতুন ছাপা)

[২] সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীসে এসেছে যে, "যে ব্যক্তি এই ঘরের হজ্জ করে এবং অশ্লীল ও শরীয়ত বিরোধী কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখে, সে ব্যক্তি পাপ থেকে এমন পবিত্র হয়ে বেড়িয়ে আসে, যেন সেই দিনই তার মা তাকে নবজাত শিশুরূপে প্রসব করছে।" (বুখারী ১৮১৯-মুসলিম ১৩৫০)

[৩] এখানে 'তাকওয়া' বা আত্মসংযমের অর্থঃ চাওয়া থেকে বেঁচে থাকা। অনেক মানুষ হজ্জের পাথেয় না নিয়েই বাড়ী থেকে বের হত এবং বলত যে, আমাদের আল্লাহর উপর ভরসা আছে। (অতঃপর তারা লোকের কাছে ভিক্ষা করত।) মহান আল্লাহ 'তাওয়াক্কুল' বা ভরসার ঐ অর্থকে ভ্রান্ত প্রমাণ করে পাথেয় নেওয়ার উপর তাকীদ করলেন।

Al-Baqara 2:197Listen in Qur'an →
198

لَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَن تَبْتَغُوا۟ فَضْلًۭا مِّن رَّبِّكُمْ ۚ فَإِذَآ أَفَضْتُم مِّنْ عَرَفَٰتٍۢ فَٱذْكُرُوا۟ ٱللَّهَ عِندَ ٱلْمَشْعَرِ ٱلْحَرَامِ ۖ وَٱذْكُرُوهُ كَمَا هَدَىٰكُمْ وَإِن كُنتُم مِّن قَبْلِهِۦ لَمِنَ ٱلضَّآلِّينَ

তোমাদের উপর তোমাদের পালনকর্তার অনুগ্রহ অন্বেষন করায় কোন পাপ নেই। অতঃপর যখন তওয়াফের জন্য ফিরে আসবে আরাফাত থেকে, তখন মাশ‘ আরে-হারামের নিকটে আল্লাহকে স্মরণ কর। আর তাঁকে স্মরণ কর তেমনি করে, যেমন তোমাদিগকে হেদায়েত করা হয়েছে। আর নিশ্চয়ই ইতিপূর্বে তোমরা ছিলে অজ্ঞ।

(হজ্জের সময়) তোমাদের জন্য তোমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ কামনায় (ব্যবসা-বাণিজ্যে) কোন দোষ নেই।[১] যখন তোমরা আরাফাত (প্রান্তর) হতে প্রত্যাবর্তন করবে, তখন (মুযদালিফায়) মাশআরুল হারামের নিকটে পৌঁছে আল্লাহকে স্মরণ কর এবং তিনি যেভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, ঠিক সেইভাবে তাঁকে স্মরণ কর; যদিও পূর্বে তোমরা বিভ্রান্তদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে।[২]

[১] فَضل (অনুগ্রহ)এর অর্থ ব্যবসা-বাণিজ্য। অর্থাৎ, হজ্জের সফরে ব্যবসা-বাণিজ্য করাতে কোন দোষ নেই। (অবশ্য আসল উদ্দেশ্য হজ্জই হতে হবে; ব্যবসা যেন আসল উদ্দেশ্য না হয়; তাহলে হজ্জ হবে না।)

[২] ৯ই যুলহজ্জ সূর্য ঢলে যাওয়ার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফায় অবস্থান করা হজ্জের সবচেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ রুকন (অঙ্গ)। এ সম্পর্কে হাদীসে বলা হয়েছে যে, "আরাফায় অবস্থানই হল হজ্জ।" এখানে মাগরিবের নামায পড়া হবে না, বরং মুযদালিফায় পৌঁছে মাগরিবের তিন রাকআত এবং এশার দু' রাকআত (কসর করে) এক সাথে জমা করে একবার আযান ও দু'বার ইক্বামত দিয়ে পড়তে হবে। মুযদালিফাকেই 'মাশআরে হারাম' বলা হয়। কেননা, এটা হারামেরই অন্তর্ভুক্ত। এখানে হাজীদেরকে আল্লাহর যিকরের প্রতি যত্ন নিতে বলা হয়েছে। এখানে রাত্রিবাস করতে হয়। ফজরের নামায 'গালাস' (অন্ধকারে) অর্থাৎ, প্রথম অক্তে পড়ে সূর্যোদয় পর্যন্ত যিকরে ব্যস্ত থাকতে হয় এবং সূর্যোদয়ের পর মিনা অভিমুখে যাত্রা করতে হয়।

Al-Baqara 2:198Listen in Qur'an →
199

ثُمَّ أَفِيضُوا۟ مِنْ حَيْثُ أَفَاضَ ٱلنَّاسُ وَٱسْتَغْفِرُوا۟ ٱللَّهَ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ غَفُورٌۭ رَّحِيمٌۭ

অতঃপর তওয়াফের জন্যে দ্রুতগতিতে সেখান থেকে ফিরে আস, যেখান থেকে সবাই ফিরে। আর আল্লাহর কাছেই মাগফেরাত কামনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাকারী, করুনাময়।

অতঃপর (কুরাইশের মত আরাফাত না গিয়েই কেবল মুযদালিফা থেকে না ফিরে অন্য) লোকেরা যেখান থেকে ফিরে, সেখান থেকেই (আরাফাত থেকে মুযদালিফায়) ফিরে চল।[১] আর আল্লাহর কাছে মার্জনা চাও; বস্তুতঃ আল্লাহ চরম মার্জনাকারী, পরম দয়ালু।

[১] উল্লিখিত ক্রমানুসারে আরাফায় যাওয়া এবং সেখানে অবস্থান করে ফিরে আসা জরুরী। কিন্তু আরাফা যেহেতু হারামের বাইরে তাই মক্কার কুরাইশরা আরাফা পর্যন্ত যেতো না, বরং মুযদালিফা থেকেই ফিরে আসতো। তাই নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে যে, যেখান থেকে সবাই ফিরে আসে, সেখান থেকে তোমরাও ফিরে এসো। অর্থাৎ, আরাফাত থেকে।

Al-Baqara 2:199Listen in Qur'an →
200

فَإِذَا قَضَيْتُم مَّنَٰسِكَكُمْ فَٱذْكُرُوا۟ ٱللَّهَ كَذِكْرِكُمْ ءَابَآءَكُمْ أَوْ أَشَدَّ ذِكْرًۭا ۗ فَمِنَ ٱلنَّاسِ مَن يَقُولُ رَبَّنَآ ءَاتِنَا فِى ٱلدُّنْيَا وَمَا لَهُۥ فِى ٱلْءَاخِرَةِ مِنْ خَلَٰقٍۢ

আর অতঃপর যখন হজ্জ্বের যাবতীয় অনুষ্ঠানক্রিয়াদি সমাপ্ত করে সারবে, তখন স্মরণ করবে আল্লাহকে, যেমন করে তোমরা স্মরণ করতে নিজেদের বাপ-দাদাদেরকে; বরং তার চেয়েও বেশী স্মরণ করবে। তারপর অনেকে তো বলে যে পরওয়াদেগার! আমাদিগকে দুনিয়াতে দান কর। অথচ তার জন্যে পরকালে কোন অংশ নেই।

অতঃপর যখন তোমরা (হজ্জের) যাবতীয় কার্যাদি সম্পন্ন করে নেবে, তখন (মিনায়) আল্লাহকে এমনভাবে স্মরণ করবে, যেমন (জাহেলী যুগে) তোমরা তোমাদের পিতৃপুরুষগণকে স্মরণ করতে, অথবা তদপেক্ষা গভীরভাবে।[১] এমন কিছু লোক আছে যারা বলে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে পৃথিবীতে (সওয়াব) দান কর।’ বস্তুতঃ তাদের জন্য পরকালে কোন অংশ নেই।

[১] আরবের লোক হজ্জ সমাপ্ত করে মিনায় মেলা বসাতো এবং পূর্বপুরুষদের কৃতিত্ব স্মরণ করত। মুসলিমদেরকে বলা হচ্ছে যে, ১০ই যুলহজ্জ কাঁকর মেরে, মাথা নেড়া করে এবং কা'বার তাওয়াফ ও স্বাফা-মারওয়ার সাঈ করে হজ্জ সমাপ্ত করে নেওয়ার পর তোমরা যে তিনদিন মিনায় অবস্থান করবে, সে দিনগুলিতে সেখানে খুব বেশী বেশী আল্লাহর যিকর কর। যেমন, জাহেলী যুগে তোমরা তোমাদের পূর্বপুরুষদের স্মরণ করতে।

Al-Baqara 2:200Listen in Qur'an →

Commentary: Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation. Qur'an text and translation via AlQuran Cloud.