Muslim99Muslim99
← Tafsir library

2. Al-Baqara

The Cow · Medinan · 286 ayahs

سُورَةُ البَقَرَةِ

Reading Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation

Ayahs 141–150 of 286

141

تِلْكَ أُمَّةٌۭ قَدْ خَلَتْ ۖ لَهَا مَا كَسَبَتْ وَلَكُم مَّا كَسَبْتُمْ ۖ وَلَا تُسْـَٔلُونَ عَمَّا كَانُوا۟ يَعْمَلُونَ

তার চাইতে অত্যাচারী কে, যে আল্লাহর পক্ষ থেকে তার কাছে প্রমাণিত সাক্ষ্যকে গোপন করে? আল্লাহ তোমাদের কর্ম সম্পর্কে বেখবর নন। সে সম্প্রদায় অতীত হয়ে গেছে। তারা যা করেছে, তা তাদের জন্যে এবং তোমরা যা করছ, তা তোমাদের জন্যে। তাদের কর্ম সম্পর্কে তোমাদের জিজ্ঞেস করা হবে না।

সে এক উম্মত (দল) ছিল, যা অতীত হয়ে গেছে। তারা যা অর্জন করেছে তা তাদের, তোমরা যা অর্জন করেছ, তা তোমাদের। তারা যা করত, সে সম্বন্ধে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে না। [১]

[১] এই আয়াতে আবারও আমলের গুরুত্ব বর্ণনা করে বলা হয়েছে যে, বুযুর্গদের সাথে সম্পর্ক জুড়ে এবং তাঁদের উপর ভরসা করে কোন লাভ নেই। কারণ, "((وَمَنْ بَطَّأَ بِهِ عَمَلُهُ لَمْ يُسْرِعْ بِهِ نَسَبُهُ )) "যার কার্যকলাপ তাকে পিছিয়ে দেয়, তার বংশমর্যাদা তাকে এগিয়ে দিতে পারবে না।" (মুসলিম, অধ্যায়ঃ যিকর ও দু'আ, পরিচ্ছেদঃ তেলাঅতে কুরআনের জন্য একত্রিত হওয়ার ফযীলত) অর্থাৎ, পূর্বপুরুষদের নেকী দ্বারা তোমাদের কোন লাভ হবে না এবং তাঁদের পাপের কারণে তোমাদেরকে পাকড়াও হবে না। তাঁদের কৃতকর্মের কারণে তোমাদেরকে এবং তোমাদের কৃতকর্মের জন্য তাঁদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না।{وَلا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى} "কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না।" (সূরা ফাত্বির ৩৫:১৮ আয়াত) {وَأَنْ لَيْسَ لِلْإِنْسَانِ إِلَّا مَا سَعَى} "আর মানুষ তাই পায়, যা সে করে।" (সূরা নাজম ৫৩:৩৯ আয়াত)

Al-Baqara 2:141Listen in Qur'an →
142

۞ سَيَقُولُ ٱلسُّفَهَآءُ مِنَ ٱلنَّاسِ مَا وَلَّىٰهُمْ عَن قِبْلَتِهِمُ ٱلَّتِى كَانُوا۟ عَلَيْهَا ۚ قُل لِّلَّهِ ٱلْمَشْرِقُ وَٱلْمَغْرِبُ ۚ يَهْدِى مَن يَشَآءُ إِلَىٰ صِرَٰطٍۢ مُّسْتَقِيمٍۢ

এখন নির্বোধেরা বলবে, কিসে মুসলমানদের ফিরিয়ে দিল তাদের ঐ কেবলা থেকে, যার উপর তারা ছিল? আপনি বলুনঃ পূর্ব ও পশ্চিম আল্লাহরই। তিনি যাকে ইচ্ছা সরল পথে চালান।

নির্বোধ লোকেরা বলবে যে, ‘তারা এ যাবৎ যে ক্বিবলার অনুসরণ করে আসছিল, তা হতে কিসে তাদেরকে ফিরিয়ে দিল?’ বল, ‘পূর্ব ও পশ্চিম আল্লাহরই।[১] তিনি যাকে ইচ্ছা সরল পথে পরিচালিত করেন।’

[১] যখন রসূল (সাঃ) হিজরত করে মক্কা থেকে মদীনায় যান, তখন প্রায় ১৬-১৭ মাস পর্যন্ত বায়তুল মুক্বাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায পড়েন। তবে তাঁর ইচ্ছা এটাই হত যে, কা'বা শরীফের দিকে মুখ করে নামায পড়া হোক যা ইবরাহীম (আঃ)-এর ক্বিবলা। আর এর জন্য তিনি দু'আও করতেন এবং বারবার আসমানের দিকে দৃষ্টিপাত করতেন। শেষ পর্যন্ত মহান আল্লাহ ক্বিবলা পরিবর্তনের নির্দেশ দিলেন। তা দেখে ইয়াহুদী ও মুনাফিকরা হাঙ্গামা শুরু করে দিল। অথচ নামায আল্লাহর এক ইবাদত। আর ইবাদতে আ'বেদ (ইবাদতকারী)-কে যেভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়, সেইভাবে সে করতে বাধ্য। কাজেই যে দিকে আল্লাহ ফিরিয়ে দিয়েছেন, সে দিকে ফিরে যাওয়া তাঁর জন্য জরুরী ছিল। তাছাড়া যে আল্লাহর ইবাদত করা হয়, পূর্ব ও পশ্চিম সব দিকই তাঁর; অতএব দিকের কোন গুরুত্ব নেই। প্রত্যেক দিকেই আল্লাহর ইবাদত হতে পারে। কেবল শর্ত হল, সেই দিকটা নির্বাচন করার নির্দেশ যেন আল্লাহ দিয়ে থাকেন। ক্বিবলা পরিবর্তনের এ নির্দেশ আসরের সময় এসেছিল। ফলে (সর্বপ্রথম) আসরের নামায কা'বা শরীফের দিকে মুখ করে পড়া হয়েছে।

Al-Baqara 2:142Listen in Qur'an →
143

وَكَذَٰلِكَ جَعَلْنَٰكُمْ أُمَّةًۭ وَسَطًۭا لِّتَكُونُوا۟ شُهَدَآءَ عَلَى ٱلنَّاسِ وَيَكُونَ ٱلرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًۭا ۗ وَمَا جَعَلْنَا ٱلْقِبْلَةَ ٱلَّتِى كُنتَ عَلَيْهَآ إِلَّا لِنَعْلَمَ مَن يَتَّبِعُ ٱلرَّسُولَ مِمَّن يَنقَلِبُ عَلَىٰ عَقِبَيْهِ ۚ وَإِن كَانَتْ لَكَبِيرَةً إِلَّا عَلَى ٱلَّذِينَ هَدَى ٱللَّهُ ۗ وَمَا كَانَ ٱللَّهُ لِيُضِيعَ إِيمَٰنَكُمْ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ بِٱلنَّاسِ لَرَءُوفٌۭ رَّحِيمٌۭ

এমনিভাবে আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী সম্প্রদায় করেছি যাতে করে তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানবমন্ডলীর জন্যে এবং যাতে রসূল সাক্ষ্যদাতা হন তোমাদের জন্য। আপনি যে কেবলার উপর ছিলেন, তাকে আমি এজন্যই কেবলা করেছিলাম, যাতে একথা প্রতীয়মান হয় যে, কে রসূলের অনুসারী থাকে আর কে পিঠটান দেয়। নিশ্চিতই এটা কঠোরতর বিষয়, কিন্তু তাদের জন্যে নয়, যাদেরকে আল্লাহ পথপ্রদর্শন করেছেন। আল্লাহ এমন নন যে, তোমাদের ঈমান নষ্ট করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ, মানুষের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল, করুনাময়।

এভাবে আমি তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী জাতিরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছি, [১] যাতে তোমরা মানব জাতির জন্য সাক্ষীস্বরূপ হতে পার এবং রসূল তোমাদের জন্য সাক্ষীস্বরূপ হবে। তুমি এ যাবৎ যে ক্বিবলার অনুসরণ করছিলে, তা এই উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম, যাতে আমি জানতে পারি[২] যে, কে রসূলের অনুসরণ করে এবং কে ফিরে যায়? আল্লাহ যাদেরকে সৎপথে পরিচালিত করেছেন, তারা ছাড়া অন্যের কাছে এ (পরিবর্তন) নিশ্চয় কঠিন ব্যাপার।[৩] আর আল্লাহ এরূপ নন যে, তিনি তোমাদের বিশ্বাস (ঈমান তথা নামায)কে ব্যর্থ করবেন।[৪] নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের প্রতি অতি দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু।

[১] وَسَطٌ শব্দের আভিধানিক অর্থ হল, মধ্যম। কিন্তু তা শ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম অর্থেও ব্যবহার হয়। আর এখানে এই (সর্বোত্তম) অর্থেই ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ, যেমন তোমাদেরকে সর্বোত্তম ক্বিবলা দেওয়া হয়েছে, অনুরূপ তোমাদেরকে সর্বোত্তম উম্মতও করা হয়েছে এবং এর উদ্দেশ্য হল, তোমরা মানুষের জন্য সাক্ষ্য দেবে। যেমন অন্যত্র বলা হয়েছে,

{لِيَكُونَ الرَّسُولُ شَهِيدًا عَلَيْكُمْ وَتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ} "যাতে রসূল তোমাদের জন্যে সাক্ষ্যদাতা এবং তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানবমন্ডলীর জন্যে।" (সূরা হাজ্জ ২২:৭৮ আয়াত) কোন কোন হাদীসে এর বিশ্লেষণ এইভাবে এসেছে যে, যখন মহান আল্লাহ কিয়ামতের দিন নবীদেরকে জিজ্ঞাসা করবেন, 'তোমরা কি আমার আদেশ মানুষদের নিকট পৌঁছে দিয়েছিলে?' তাঁরা বলবেন, 'হ্যাঁ।' আল্লাহ তাআলা বলবেন, 'তোমাদের কি কোন সাক্ষী আছে?' তাঁরা বলবেন, 'হ্যাঁ, মুহাম্মাদ (সাঃ) এবং তাঁর উম্মত।' তখন এই উম্মত সাক্ষ্য দেবে। আর এই জন্য وَسَط এর অনুবাদ ন্যায়পন্থীও করা হয়। (ইবনে কাসীর) এ শব্দের আর একটি অর্থ, মধ্যপন্থীও করা হয়। অর্থাৎ, উম্মতে মুহাম্মাদী হল মধ্যপন্থী অর্থাৎ, অতিরঞ্জন ও অবজ্ঞা থেকে তারা পবিত্র। আর এটাই হল ইসলামের শিক্ষা। এতে অতিরঞ্জন (কোন কিছুকে নিয়ে বাড়াবাড়ি) এবং অবজ্ঞা (কোন জিনিসকে তার উপযুক্ত মর্যাদা থেকে একেবারে নীচে নামানোরও কোন অবকাশ) নেই।

[২] لِنَعْلَمَ (যাতে আমি জানতে পারি) আল্লাহ তো আগে থেকেই জানেন। আসলে এর অর্থ হল, যাতে আমি দৃঢ় প্রত্যয়ীদেরকে সংশয়ীদের থেকে পৃথক করে দি এবং মানুষের সামনেও যেন উক্ত দুই শ্রেণীর লোক স্পষ্ট হয়ে যায়। (ফাতহুল ক্বাদীর)

[৩] এখানে ক্বিবলা পরিবর্তনের একটি উদ্দেশ্যর কথা বলা হচ্ছে। নিষ্ঠাবান মু'মিনরা তো কেবল আল্লাহর রসূল (সাঃ)-এর চোখের ইঙ্গিতের অপেক্ষায় থাকতেন। কাজেই তাঁদের জন্য একদিক থেকে অন্য দিকে ফিরে যাওয়া কোন সমস্যার ব্যাপার ছিল না, বরং একটি মসজিদে তো ক্বিবলা পরিবর্তনের নির্দেশ তখন পৌঁছে, যখন তাঁরা রুকু'তে ছিলেন। তাঁরা রুকু'র অবস্থাতেই নিজেদের মুখমন্ডল কা'বার দিকে ফিরিয়ে নিলেন। এটাকে 'মসজিদে ক্বিবলাতাইন' (অর্থাৎ, সেই মসজিদ যেখানে একটিই নামায দু'টি ক্বিবলার দিকে মুখ করে পড়া হয়েছে।) বলা হয়। অনুরূপ ঘটনা ক্বুবার মসজিদেও ঘটেছে।

[৪] কোন কোন সাহাবা (রাঃ)-এর মনে এই সমস্যার উদয় হল যে, যে সাহাবাগণ বায়তুল মুক্বাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায পড়ার যুগে মৃত্যুবরণ করেছেন অথবা আমরা যতদিন সেদিকে মুখ করে নামায পড়েছি, সে সবই মনে হয় বিফলে গেছে, তার মনে হয় কোন সওয়াব পাওয়া যাবে না। মহান আল্লাহ বললেন, তোমাদের ঐ নামাযগুলো ব্যর্থ হবে না; বরং তোমরা তার পূর্ণ সওয়াব পাবে। আর এখানে নামাযকে বিশ্বাস বা ঈমান বলে আখ্যায়িত করে এ কথাও পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে, নামায ব্যতীত ঈমানের কোন মূল্য নেই। ঈমান তখনই ঈমান বলে গণ্য হবে, যখন নামায ও আল্লাহর অন্যান্য বিধানসমূহের যত্ন নেওয়া হবে।

Al-Baqara 2:143Listen in Qur'an →
144

قَدْ نَرَىٰ تَقَلُّبَ وَجْهِكَ فِى ٱلسَّمَآءِ ۖ فَلَنُوَلِّيَنَّكَ قِبْلَةًۭ تَرْضَىٰهَا ۚ فَوَلِّ وَجْهَكَ شَطْرَ ٱلْمَسْجِدِ ٱلْحَرَامِ ۚ وَحَيْثُ مَا كُنتُمْ فَوَلُّوا۟ وُجُوهَكُمْ شَطْرَهُۥ ۗ وَإِنَّ ٱلَّذِينَ أُوتُوا۟ ٱلْكِتَٰبَ لَيَعْلَمُونَ أَنَّهُ ٱلْحَقُّ مِن رَّبِّهِمْ ۗ وَمَا ٱللَّهُ بِغَٰفِلٍ عَمَّا يَعْمَلُونَ

নিশ্চয়ই আমি আপনাকে বার বার আকাশের দিকে তাকাতে দেখি। অতএব, অবশ্যই আমি আপনাকে সে কেবলার দিকেই ঘুরিয়ে দেব যাকে আপনি পছন্দ করেন। এখন আপনি মসজিদুল-হারামের দিকে মুখ করুন এবং তোমরা যেখানেই থাক, সেদিকে মুখ কর। যারা আহলে-কিতাব, তারা অবশ্যই জানে যে, এটাই ঠিক পালনকর্তার পক্ষ থেকে। আল্লাহ বেখবর নন, সে সমস্ত কর্ম সম্পর্কে যা তারা করে।

আকাশের দিকে তোমার বারংবার মুখ ফিরানোকে আমি প্রায় লক্ষ্য করি। সুতরাং আমি তোমাকে এমন ক্বিবলার দিকে অবশ্যই ফিরিয়ে দেব, যা তুমি পছন্দ কর। অতএব (নামাযে) তুমি মাসজিদুল হারামের (পবিত্র কা’বাগৃহের) দিকে মুখ ফেরাও। তোমরা যেখানেই থাক না কেন, (নামাযে) সেই (কা’বার) দিকে মুখ ফেরাও। আর যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে, তারা নিশ্চিতভাবে জানে যে, এ (বিধান) তাদের প্রতিপালকের নিকট হতে আগত সত্য। [১] তারা যা করে সে সম্বন্ধে আল্লাহ উদাসীন নন।

[১] আহলে-কিতাবদের বিভিন্ন সহীফা (ধর্মগ্রন্থ)সমূহে কা'বা শরীফ যে শেষ নবীর ক্বিবলা হবে তার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বিদ্যমান। কাজেই এর সত্যতা সম্পর্কে তাদের নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল, কিন্তু তাদের জাতিগত হিংসা ও বিদ্বেষ সত্য গ্রহণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।

Al-Baqara 2:144Listen in Qur'an →
145

وَلَئِنْ أَتَيْتَ ٱلَّذِينَ أُوتُوا۟ ٱلْكِتَٰبَ بِكُلِّ ءَايَةٍۢ مَّا تَبِعُوا۟ قِبْلَتَكَ ۚ وَمَآ أَنتَ بِتَابِعٍۢ قِبْلَتَهُمْ ۚ وَمَا بَعْضُهُم بِتَابِعٍۢ قِبْلَةَ بَعْضٍۢ ۚ وَلَئِنِ ٱتَّبَعْتَ أَهْوَآءَهُم مِّنۢ بَعْدِ مَا جَآءَكَ مِنَ ٱلْعِلْمِ ۙ إِنَّكَ إِذًۭا لَّمِنَ ٱلظَّٰلِمِينَ

যদি আপনি আহলে কিতাবদের কাছে সমুদয় নিদর্শন উপস্থাপন করেন, তবুও তারা আপনার কেবলা মেনে নেবে না এবং আপনিও তাদের কেবলা মানেন না। তারাও একে অন্যের কেবলা মানে না। যদি আপনি তাদের বাসনার অনুসরণ করেন, সে জ্ঞানলাভের পর, যা আপনার কাছে পৌঁছেছে, তবে নিশ্চয় আপনি অবিচারকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।

যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে, তুমি যদি তাদের নিকট সমস্ত নিদর্শন পেশ কর, তবুও তারা তোমার ক্বিবলার অনুসরণ করবে না[১] এবং তুমিও তাদের ক্বিবলার অনুসারী নও।[২] তারাও একে অন্যের ক্বিবলার অনুসারী নয়।[৩] তোমার নিকট জ্ঞান আসার পর তুমি যদি তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ কর, তাহলে নিশ্চয়ই তুমি সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে। [৪]

[১] কারণ, ইয়াহুদীদের বিরোধিতা তো হিংসা ও বিদ্বেষের ভিত্তিতে। যার কারণে প্রমাণাদির কোন প্রভাব তাদের উপর পড়বে না। প্রভাব সৃষ্টি হওয়ার জন্য অন্তর পরিষ্কার হওয়া অত্যাবশ্যক।

[২] কারণ, আপনি আল্লাহর অহীর অনুসারী। আল্লাহর নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত আপনি তাদের ক্বিবলা গ্রহণ করতে পারেন না।

[৩] ইয়াহুদীদের ক্বিবলা হল, বায়তুল মুক্বাদ্দাসের পাথর (যার উপর গম্বুজ নির্মিত আছে)। আর খ্রিষ্টানদের ক্বিবলা হল, বায়তুল মুক্বাদ্দাসের পূর্বদিক। আহলে-কিতাদের এই দু'টি দল যখন আপোসে একটি ক্বিবলার উপর ঐক্যবদ্ধ নয়, তখন তারা মুসলিমদের নিকট থেকে কিভাবে আশা করে যে, তারা (মুসলিমরা) এ ব্যাপারে তাদের সাথে একমত হবে?

[৪] এ রকম ধমক পূর্বেও দেওয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য হল, উম্মতকে সতর্ক করা যে, কুরআন ও হাদীসের জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও বিজাতি ও বিদআতীদের অনুকরণ করা যুলুম, সীমালংঘন ও ভ্রষ্টতা বৈ কিছুই নয়।

Al-Baqara 2:145Listen in Qur'an →
146

ٱلَّذِينَ ءَاتَيْنَٰهُمُ ٱلْكِتَٰبَ يَعْرِفُونَهُۥ كَمَا يَعْرِفُونَ أَبْنَآءَهُمْ ۖ وَإِنَّ فَرِيقًۭا مِّنْهُمْ لَيَكْتُمُونَ ٱلْحَقَّ وَهُمْ يَعْلَمُونَ

আমি যাদেরকে কিতাব দান করেছি, তারা তাকে চেনে, যেমন করে চেনে নিজেদের পুত্রদেরকে। আর নিশ্চয়ই তাদের একটি সম্প্রদায় জেনে শুনে সত্যকে গোপন করে।

আমি যাদেরকে কিতাব দিয়েছি, তারা তাকে (মুহাম্মাদকে) তেমনই চেনে, যেমন তাদের পুত্রগণকে চেনে; কিন্তু তাদের একদল জেনেশুনে সত্য গোপন করে থাকে। [১]

[১] এখানে আহলে-কিতাবের একটি দলের সত্যকে গোপন করার অপরাধ সাব্যস্ত করা হচ্ছে। কারণ, তাদের মধ্যে একটি দল আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ)-এর মত লোকেদেরও ছিল। যাঁরা স্বীয় সততা এবং অভ্যন্তরীণ নির্মলতার কারণে ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হোন।

Al-Baqara 2:146Listen in Qur'an →
147

ٱلْحَقُّ مِن رَّبِّكَ ۖ فَلَا تَكُونَنَّ مِنَ ٱلْمُمْتَرِينَ

বাস্তব সত্য সেটাই যা তোমার পালনকর্তা বলেন। কাজেই তুমি সন্দিহান হয়ো না।

সত্য তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে সমাগত। সুতরাং তুমি সংশয়ীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। [১]

[১] নবীর উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে যে বিধানই অবতীর্ণ হয়, তা অবশ্যই সত্য। সে ব্যাপারে সন্দেহ-সংশয়ের কোন অবকাশ নেই।

Al-Baqara 2:147Listen in Qur'an →
148

وَلِكُلٍّۢ وِجْهَةٌ هُوَ مُوَلِّيهَا ۖ فَٱسْتَبِقُوا۟ ٱلْخَيْرَٰتِ ۚ أَيْنَ مَا تَكُونُوا۟ يَأْتِ بِكُمُ ٱللَّهُ جَمِيعًا ۚ إِنَّ ٱللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَىْءٍۢ قَدِيرٌۭ

আর সবার জন্যই রয়েছে কেবলা একেক দিকে, যে দিকে সে মুখ করে (এবাদত করবে)। কাজেই সৎকাজে প্রতিযোগিতামূলকভাবে এগিয়ে যাও। যেখানেই তোমরা থাকবে, আল্লাহ অবশ্যই তোমাদেরকে সমবেত করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাশীল।

প্রত্যেকের (নির্দিষ্ট) একটি দিক আছে, যার দিকে সে মুখ করে দাঁড়ায়। [১] অতএব তোমরা সৎকর্মে প্রতিযোগিতা কর। তোমরা যেখানেই থাক না কেন, আল্লাহ তোমাদের সকলকে একত্র করবেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে পূর্ণ ক্ষমতাবান।

[১] প্রত্যেক ধর্মাবলম্বিরা নিজেরদের পছন্দ মত ক্বিবলা বানিয়ে রেখেছে যেদিকে তারা মুখ করে থাকে। এর দ্বিতীয় অর্থ হল, প্রত্যেক ধর্মাবলম্বিরা নিজেদের জন্য একটি নির্দিষ্ট পন্থা ও তরীকা বানিয়ে রেখেছে। যেমন, কুরআনের অন্য স্থানে এসেছে,{لِكُلٍّ جَعَلْنَا مِنْكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ لَجَعَلَكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَلَكِنْ لِيَبْلُوَكُمْ فِي مَا آتَاكُمْ} "তোমাদের প্রত্যেকের জন্য এক একটি শরীয়ত (আইন) ও স্পষ্ট পথ নির্ধারণ করেছি। ইচ্ছা করলে আল্লাহ তোমাদেরকে এক জাতি করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তোমাদেরকে যা দিয়েছেন, তা দিয়ে তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য (তিনি তা করেননি)।" (সূরা মাইদাহ ৫:৪৮ আয়াত) অর্থাৎ, মহান আল্লাহ হিদায়াত ও গুমরাহী উভয় পথকে পরিষ্কার করে দিয়ে মানুষকে দু'টি পথের মধ্যে কোন একটি নির্বাচন করার যে স্বাধীনতা দিয়েছেন এরই ফলে মানুষ ভিন্ন ভিন্ন এমন পথ ও মত অবলম্বন করেছে, যা একে অপরের বিপরীত। যদি আল্লাহ চাইতেন, তাহলে সবাইকে একই পথের পথিক অর্থাৎ, সবাইকে হিদায়াতের পথে পরিচালিত করতে পারতেন। কিন্তু এটা স্বাধীনতা ছিনিয়ে না নিয়ে সম্ভব ছিল না। আর স্বাধীনতা দেওয়ার উদ্দেশ্য, পরীক্ষাকরণ। অতএব হে মুসলিমগণ! তোমরা সৎকাজে প্রতিযোগিতামূলকভাবে অগ্রসর হও! অর্থাৎ, নেকী ও সৎ পথে প্রতিষ্ঠিত থাকো। এটাই হল, আল্লাহর অহী এবং রসূল (সাঃ)-এর অনুসরণের পথ, যা থেকে অন্য ধর্মাবলম্বিরা বঞ্চিত।

Al-Baqara 2:148Listen in Qur'an →
149

وَمِنْ حَيْثُ خَرَجْتَ فَوَلِّ وَجْهَكَ شَطْرَ ٱلْمَسْجِدِ ٱلْحَرَامِ ۖ وَإِنَّهُۥ لَلْحَقُّ مِن رَّبِّكَ ۗ وَمَا ٱللَّهُ بِغَٰفِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

আর যে স্থান থেকে তুমি বের হও, নিজের মুখ মসজিদে হারামের দিকে ফেরাও-নিঃসন্দেহে এটাই হলো তোমার পালনকর্তার পক্ষ থেকে নির্ধারিত বাস্তব সত্য। বস্তুতঃ তোমার পালনকর্তা তোমাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অনবহিত নন।

আর যে স্থান হতেই তুমি বের হও না কেন, মাসজিদুল হারামের (কা’বা শরীফের) দিকে মুখ ফেরাও। নিশ্চয় তা তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে (প্রেরিত) সত্য। তোমরা যা করছ, তার ব্যাপারে আল্লাহ উদাসীন নন।

Al-Baqara 2:149Listen in Qur'an →
150

وَمِنْ حَيْثُ خَرَجْتَ فَوَلِّ وَجْهَكَ شَطْرَ ٱلْمَسْجِدِ ٱلْحَرَامِ ۚ وَحَيْثُ مَا كُنتُمْ فَوَلُّوا۟ وُجُوهَكُمْ شَطْرَهُۥ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَيْكُمْ حُجَّةٌ إِلَّا ٱلَّذِينَ ظَلَمُوا۟ مِنْهُمْ فَلَا تَخْشَوْهُمْ وَٱخْشَوْنِى وَلِأُتِمَّ نِعْمَتِى عَلَيْكُمْ وَلَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ

আর তোমরা যেখান থেকেই বেরিয়ে আস এবং যেখানেই অবস্থান কর, সেদিকেই মুখ ফেরাও, যাতে করে মানুষের জন্য তোমাদের সাথে ঝগড়া করার অবকাশ না থাকে। অবশ্য যারা অবিবেচক, তাদের কথা আলাদা। কাজেই তাদের আপত্তিতে ভীত হয়ো না। আমাকেই ভয় কর। যাতে আমি তোমাদের জন্যে আমার অনুগ্রহ সমূহ পূর্ণ করে দেই এবং তাতে যেন তোমরা সরলপথ প্রাপ্ত হও।

আর তুমি যেখান হতেই বের হও না কেন, মাসজিদুল হারামের (কা’বা শরীফের) দিকে মুখ ফেরাও এবং যেখানেই থাক না কেন, সেই (কা’বার) দিকেই মুখ ফেরাও।[১] যাতে তাদের মধ্যে সীমালঘংনকারিগণ[২] ছাড়া অন্য কোন লোক তোমাদের সাথে বিতর্ক না করতে পারে।[৩] সুতরাং তোমরা তাদের ভয় করো না,[৪] বরং একমাত্র আমাকেই ভয় কর, যাতে আমি আমার অনুগ্রহ তোমাদেরকে পরিপূর্ণরূপে দান করতে পারি এবং যাতে তোমরা সৎপথ পেতে পার।

[১] ক্বিবলার দিকে মুখ ফিরানোর নির্দেশের তিনবার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। হয় এর উপর তাকীদ ও এর গুরুত্ব বর্ণনা করার জন্য অথবা এই জন্য যে, এটা কোন বিধানকে রহিত ঘোষণা করার প্রথম পরীক্ষা ছিল। তাই মনের মধ্যেকার সন্দেহ-সংশয় ও খুঁতখুঁতে ভাবকে দূর করার জন্য জরুরী ছিল যে, তার বারবার পুনরাবৃত্তি করে মানুষের অন্তরে সুদৃঢ় করে দেওয়া হোক। আবার এও হতে পারে যে, একাধিক কারণের জন্য এ রকম করা হয়েছে। এক কারণ তো এই ছিল যে, নবী করীম (সাঃ)-এর এটা আন্তরিক ইচ্ছা ও আশা ছিল। তা বর্ণনা করার জন্য এ কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় কারণ, প্রত্যেক ধর্মাবলম্বি ও দাওয়াতদাতার নিজস্ব পৃথক কেন্দ্র (ক্বিবলা) ছিল, তা বর্ণনা করে এ কথার পুনরাবৃত্তি হয়। তৃতীয় কারণ, বিরোধীপক্ষের অভিযোগসমূহের খন্ডনের জন্য তৃতীয়বার তা পুনরুক্ত হয়। (ফাতহুল ক্বাদীর)

[২] এখানে {ظَلَمُوْا} (সীমালংঘনকারী যালেম) থেকে বিদ্বেষ পোষণকারীদেরকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, আহলে-কিতাবদের মধ্যে যারা কট্টর বিদ্বেষী, তারা জানে যে, শেষ নবীর ক্বিবলা কা'বাগৃহ হবে, তা সত্ত্বেও শুধুমাত্র শত্রুতাবশতঃ বলবে যে, 'বায়তুল মুক্বাদ্দাসের পরিবর্তে কা'বাকে ক্বিবলা বানিয়ে মুহাম্মাদ শেষ পর্যন্ত স্বীয় বাপ-দাদার ধর্মের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে।' আবার কারো কাছে সীমালংঘনকারী বলে উদ্দেশ্য হল মক্কার মুশরিকগণ।

[৩] অর্থাৎ, যাতে আহলে-কিতাব বলতে না পারে যে, আমাদের কিতাবে তো ওদের ক্বিবলা কা'বা শরীফ বলা হয়েছে, অথচ ওরা বায়তুল মুক্বাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায পড়ছে।

[৪] 'তাদেরকে ভয় করো না' অর্থাৎ, মুশরিকদের কথার পরোয়া করো না। তারা বলেছিল যে, মুহাম্মাদ তো আমাদের ক্বিবলা গ্রহণ করে নিয়েছে, এবার অতি সত্বর দেখবে সে আমাদের দ্বীনও গ্রহণ করে নেবে। 'আমাকেই ভয় কর' অর্থাৎ, যে নির্দেশ আমি দিতে থাকব, তার উপর নির্ভয়ে আমল করতে থাকো। ক্বিবলার পরিবর্তনকে অনুগ্রহ পরিপূর্ণতা ও পথপ্রাপ্তি বলে আখ্যায়িত করে এ কথা পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে, অবশ্যই আল্লাহর নির্দেশের উপর আমল মানুষকে অনুগ্রহ, পুরস্কার ও সম্মানের অধিকারী বানায় এবং সে সুপথপ্রাপ্তি তথা হিদায়াতের তওফীক লাভ করে।

Al-Baqara 2:150Listen in Qur'an →

Commentary: Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation. Qur'an text and translation via AlQuran Cloud.