১০৬-১০৯ নং আয়াতের তাফসীর মহান আল্লাহ বর্ণনা করছেন যে, যারা ঈমান এবং কুফরীর জন্যে হৃদয় উন্মুক্ত রাখে, তাদের উপর আল্লাহর গজব আপতিত হবে। কারণ এই যে, ঈমানের জ্ঞান লাভ করার পর তা থেকে তারা ফিরে গেছে। আর আখেরাতে তাদের জন্যে রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। কারণ, তারা আখেরাত নষ্ট করে দুনিয়ার প্রেমে পড়ে গেছে এবং ইসলামের উপর ধর্মত্যাগী হওয়াকে প্রাধান্য দিয়েছে, একমাত্র দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার কারণে।তাদের অন্তর হিদায়াত হতে শূন্য ছিল বলে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার তাওফীক তারা লাভ করে নি।তাদের অন্তরে মোহর লেগে গেছে, তাই উপকারী কোন কথা তারা বুঝতে পারে না। তাদের চক্ষু ও কর্ণ অকেজো হয়ে গেছে। না তারা হক দেখতে পায়, না শুনতে পায়। সুতরাং কোন জিনিসই তাদের কোন উপকার করে নাই এবং তারা নিজেদের পরিণাম সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন রয়েছে। এটা নিশ্চিত যে, তারা নিজেদেরও ক্ষতি করছে এবং পরিবারেরও ক্ষতি করছে।প্রথম আয়াতের মাঝে যাদেরকে স্বতন্ত্র করা হয়েছে, অর্থাৎ ওরাই, যাদের উপর জোর-জবরদস্তি করা হয়েছে, অথচ তাদের অন্তরে পূর্ণ ঈমান রয়েছে, তাদের দ্বারা ঐ লোকদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা মারপিট ও অসহনীয় উৎপীড়নের কারণে বাধ্য হয়ে মৌখিক ভাবে মুশরিকদেরকে সমর্থন করে থাকে। কিন্তু তাদের অন্তর তাদেরকে মোটেই সমর্থন করে না। বরং অন্তরে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সঃ) প্রতি পূর্ণ ঈমান বিদ্যমান থাকে।হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এই আয়াতটি হযরত আম্মার ইবনু ইয়াসিরের (রাঃ) ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। ঘটনা এই যে, মুশরিকরা তাঁকে কঠিন শাস্তি দিতে থাকে, যে পর্যন্ত না রাসূলুল্লাহকে (সঃ) অস্বীকার করেন। তখন তিনি অত্যন্ত নিরুপায় ও বাধ্য হয়ে তাদেরকে সমর্থন করেন। অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট গমন করে ওজর পেশ করেন। এ সময় আল্লাহ তাআলার এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। শাবী (রঃ) কাতাদা (রঃ) এবং আবু মালিকও এ কথাই বলেন।তাফসীরে ইবনু জারীরে রয়েছে যে, মুশরিকরা হযরত আম্মার ইবনু ইয়াসিরকে (রাঃ) ধরে ফেলে। অতঃপর তারা তাঁকে কষ্ট দিতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত তিনি তাদের কথাকে সমর্থন করে নেন। তারপর তিনি রাসূলুল্লাহর (সঃ) নিকট এসে নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। তখন তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ “তোমার অন্তরকে তুমি কিরূপ পাচ্ছ?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “অন্তর তো ঈমানে পরিপূর্ণ রয়েছে। তিনি তখন বলেনঃ “তারা যদি তাদের কাজের পুনরাবৃত্তি করে তবে তুমিও তোমার একথার পুনরাবৃত্তি করবে।” ইমাম বায়হাকী (রঃ) এ ঘটনাটিকে আরো বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করেছেন। তার বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আম্মার তাদের সামনে নবীকে (সঃ) গালমন্দ দেন এবং তাদের মা'বুদ সম্পর্কে ভাল মন্তব্য করেন। অতঃপর তিনি নবীর (সঃ) কাছে নিজের দুঃখের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি মুশরিকদের সামনে আপনাকে গাল-মন্দ দেয়া এবং তাদের মা’বৃদের সুনাম করার পূর্ব পর্যন্ত তারা আমাকে শাস্তি দেয়া হতে রেহাই দেয় নাই।” তখন তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমার অন্তরকে তুমি কেমন পাচ্ছ।” উত্তরে তিনি বললেনঃ “আমার অন্তরকে আমি ঈমানে অবিচলিত পেয়েছি।” তাঁর একথা শুনে তিনি তাঁকে বললেনঃ “তারা যদি পুনরায় তোমার সাথে এরূপ ব্যবহার করে, তবে তুমিও আবার এই ব্যবস্থাই অবলম্বন করবে।” এ ব্যাপারেই এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।উলামায়ে কিরাম এ বিষয়ে একমত যে, যার উপর জোর-যবরদস্তি করাহবে, প্রাণ বাঁচানোর জন্যে কাফিরদের পক্ষ সমর্থন করা তার জন্যে জায়েয। আবার এরূপ পরিস্থিতিতেও তাদের কথা অমান্য করা জায়েয। যেমন হযরত বিলাল (রাঃ) এরূপ করে দেখিয়েছেন। তিনি কোন অবস্থাতেই মুশরিকদের কথা মান্য করেন নাই। এমনকি কঠিন গরমের দিনে প্রখর রৌদ্রের সময় তারা তাকে মাটির উপর শুয়ে যেতে বাধ্য করেছিল এবং ঐ অবস্থায় তার বক্ষের উপর একটা ভারী ওজনের পাথর চাপিয়ে দিয়েছিল এবং বলেছিলঃ “এখনও যদি তুমি শিরক কর তবে তোমাকে মুক্তি …