Muslim99Muslim99
← Tafsir library

13. Ar-Ra'd

The Thunder · Medinan · 43 ayahs

سُورَةُ الرَّعۡدِ

Reading Tafsir Fathul Majid by AbdulRahman Bin Hasan Al-Alshaikh

Ayahs 11–20 of 43

11

لَهُۥ مُعَقِّبَٰتٌۭ مِّنۢ بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِۦ يَحْفَظُونَهُۥ مِنْ أَمْرِ ٱللَّهِ ۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا۟ مَا بِأَنفُسِهِمْ ۗ وَإِذَآ أَرَادَ ٱللَّهُ بِقَوْمٍۢ سُوٓءًۭا فَلَا مَرَدَّ لَهُۥ ۚ وَمَا لَهُم مِّن دُونِهِۦ مِن وَالٍ

তাঁর পক্ষ থেকে অনুসরণকারী রয়েছে তাদের অগ্রে এবং পশ্চাতে, আল্লাহর নির্দেশে তারা ওদের হেফাযত করে। আল্লাহ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যে পর্যন্ত না তারা তাদের নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। আল্লাহ যখন কোন জাতির উপর বিপদ চান, তখন তা রদ হওয়ার নয় এবং তিনি ব্যতীত তাদের কোন সাহায্যকারী নেই।

১১ নং আয়াতের তাফসীর:

উক্ত আয়াতে বলা হচ্ছে যে, মানুষের সামনে-পিছনে, ডানে-বামে তাকে রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য প্রহরী নিযুক্ত রয়েছে। مُعَقِّبٰتٌ শব্দটি معقبة এর বহুবচন। অর্থ এক জনের পর অপর জন্য আসা। অর্থাৎ একজন ফেরেশতা চলে গেলে অন্য ফেরেশতা আগমন করে পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করে। তারা অনিষ্টকারীর অনিষ্ট থেকে মানুষকে সংরক্ষণ করে। এবং একদলকে নিযুক্ত করা হয়েছে তাদের কার্যকলাপসমূহ লিখে রাখার জন্য। যার উপর ভিত্তি করে তাদেরকে আখিরাতে প্রতিদান দেয়া হবে। এই প্রহরী সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: “তোমাদের কাছে ফেরেশতারা পালাক্রমে আগমণ করে থাকেন দিবসে ও রজনীতে। ফজর ও আসরের সালাতের সময় উভয় দলের মিলন ঘটে। রাত্রে অবস্থানকারী ফেরেশতাগণ রাত্রি শেষে আকাশে উঠে যান। বান্দাদের অবস্থা সম্পর্কে অবগত হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন: তোমরা আমার বান্দাদেরকে কী অবস্থায় ছেড়ে এসেছ? তারা উত্তরে বলেন: আমরা তাদের কাছে আগমণের সময় সালাতের অবস্থায় তাদেরকে পেয়েছি এবং বিদায়ের সময়ও তাদেরকে সালাতের অবস্থায় ছেড়ে এসেছি। (সহীহ বুখারী হা: ৫৫৫)

হেফাযতকারী ফেরেশতাদের কাজ শুধু পার্থিব বিপদাপদ থেকে রক্ষা করাই নয় বরং তারা মানুষকে পাপ কাজ থেকে বাঁচিয়ে রাখারও চেষ্টা করে। মানুষের মনে সাধুতা ও আল্লাহ তা‘আলাভীতির প্রেরণা জাগ্রত করে যাতে সে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে। এরপরও যদি সে ফেরেশতাদের প্রেরণার প্রতি উদাসীন হয়ে পাপ কাজে লিপ্ত হয়, তবে তারা দু‘আ ও চেষ্টা করে যাতে সে শীঘ্র তাওবা করে ক্ষমা করিয়ে নেয়। অগত্যা যদি কোনরূপেই হুশিয়ার না হয় তখন তার আমলনামায় গোনাহ লেখা হয়।

(إِنَّ اللّٰهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ)

-এই আয়াতের তাফসীর ভাল-মন্দ দুদিকেই করা যায়:

(১) কোন জাতি যদি নিজেদের অবস্থানকে ভাল ও উন্নতির দিকে নিয়ে যেতে চায় তাহলে আল্লাহ তা‘আলা সে ভাল ও উন্নতির সুযোগ করে দেন। হাত গুটিয়ে বসে থাকলে আল্লাহ তা‘আলা অবস্থার পরিবর্তন করে দিবেন না।

(২) কোন জাতি যদি পাপ কাজ ও কুফরী করে নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে নেয় তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তাদের থেকে নেয়ামত ছিনিয়ে নেন। মোটকথা মানুষের চিন্তা-চেতনা, কাজ-কর্ম যেদিকে ধাবিত হয় আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে সেদিকে যাওয়ার সুযোগ করে দেন। তারা যদি ভাল ও উন্নতির দিকে যায় আল্লাহ তা‘আলা তাদের উন্নতির পথ খুলে দেন, আর যদি পাপ ও কুফরী করে নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে ঢেলে দেয় তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তাদের থেকে নেয়ামত ছিনিয়ে নিয়ে ধ্বংস করে দেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

(ذٰلِكَ بِأَنَّ اللّٰهَ لَمْ يَكُ مُغَيِّرًا نِّعْمَةً أَنْعَمَهَا عَلٰي قَوْمٍ حَتّٰي يُغَيِّرُوْا مَا بِأَنْفُسِهِمْ)

“এটা এজন্য যে, যদি কোন সম্প্রদায় নিজের অবস্থার পরিবর্তন না করে তবে আল্লাহ তা‘আলা এমন নন যে, তিনি তাদেরকে যে সম্পদ দান করেছেন, সেটা পরিবর্তন করবেন।” (সূরা আনফাল ৮:৫৩)

সুতরাং এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, প্রত্যেক জাতিকে তাদের অবস্থায় উন্নতি এবং নেয়ামতসমূহ পরিপূর্ণ মাত্রায় পেতে হলে সকল প্রকার খারাপ ও নাফরমানীমূলক কাজ পরিত্যাগ করতে হবে। অন্যথায় তা সম্ভব নয়। আর আল্লাহ তা‘আলা যদি কারো অনিষ্ট করতে চান তাহলে এমন কেউ নেই যে, তাঁর অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবে। অতএব সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা, অন্য কেউ নয়।

আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:

১. মানুষকে রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য দিবা-রাত্রিতে ফেরেশতা নিযুক্ত করা হয়েছে, তারা পার্থিব রক্ষা করার পাশাপাশি সকল আমল সংরক্ষণ করে।

২. প্রত্যেক জাতিকে নিজ চেষ্টার মাধ্যমে তার নেয়ামতকে পূর্ণ করে নিতে হবে।

৩. আল্লাহ তা‘আলা কোন জাতিকে ততক্ষণ ধ্বংস করেন না যতক্ষণ না নিজেদের অবস্থাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।

12

هُوَ ٱلَّذِى يُرِيكُمُ ٱلْبَرْقَ خَوْفًۭا وَطَمَعًۭا وَيُنشِئُ ٱلسَّحَابَ ٱلثِّقَالَ

তিনিই তোমাদেরকে বিদ্যুৎ দেখান ভয়ের জন্যে এবং আশার জন্যে এবং উক্ষিত করেন ঘন মেঘমালা।

Explained together with ayah 11

13

وَيُسَبِّحُ ٱلرَّعْدُ بِحَمْدِهِۦ وَٱلْمَلَٰٓئِكَةُ مِنْ خِيفَتِهِۦ وَيُرْسِلُ ٱلصَّوَٰعِقَ فَيُصِيبُ بِهَا مَن يَشَآءُ وَهُمْ يُجَٰدِلُونَ فِى ٱللَّهِ وَهُوَ شَدِيدُ ٱلْمِحَالِ

তাঁর প্রশংসা পাঠ করে বজ্র এবং সব ফেরেশতা, সভয়ে। তিনি বজ্রপাত করেন, অতঃপর যাকে ইচছা, তাকে তা দ্বারা আঘাত করেন; তথাপি তারা আল্লাহ সম্পর্কে বিতন্ডা করে, অথচ তিনি মহাশক্তিশালী।

Explained together with ayah 11

14

لَهُۥ دَعْوَةُ ٱلْحَقِّ ۖ وَٱلَّذِينَ يَدْعُونَ مِن دُونِهِۦ لَا يَسْتَجِيبُونَ لَهُم بِشَىْءٍ إِلَّا كَبَٰسِطِ كَفَّيْهِ إِلَى ٱلْمَآءِ لِيَبْلُغَ فَاهُ وَمَا هُوَ بِبَٰلِغِهِۦ ۚ وَمَا دُعَآءُ ٱلْكَٰفِرِينَ إِلَّا فِى ضَلَٰلٍۢ

সত্যের আহবান একমাত্র তাঁরই এবং তাকে ছাড়া যাদেরকে ডাকে, তারা তাদের কোন কাজে আসে না; ওদের দৃষ্টান্ত সেরূপ, যেমন কেউ দু’ হাত পানির দিকে প্রসারিত করে যাতে পানি তার মুখে পৌঁছে যায়। অথচ পানি কোন সময় পৌঁছাবে না। কাফেরদের যত আহবান তার সবই পথভ্রষ্টতা।

Explained together with ayah 11

15

وَلِلَّهِ يَسْجُدُ مَن فِى ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضِ طَوْعًۭا وَكَرْهًۭا وَظِلَٰلُهُم بِٱلْغُدُوِّ وَٱلْءَاصَالِ ۩

আল্লাহকে সেজদা করে যা কিছু নভোমন্ডলে ও ভূমন্ডলে আছে ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় এবং তাদের প্রতিচ্ছায়াও সকাল-সন্ধ্যায়।

Explained together with ayah 11

16

قُلْ مَن رَّبُّ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضِ قُلِ ٱللَّهُ ۚ قُلْ أَفَٱتَّخَذْتُم مِّن دُونِهِۦٓ أَوْلِيَآءَ لَا يَمْلِكُونَ لِأَنفُسِهِمْ نَفْعًۭا وَلَا ضَرًّۭا ۚ قُلْ هَلْ يَسْتَوِى ٱلْأَعْمَىٰ وَٱلْبَصِيرُ أَمْ هَلْ تَسْتَوِى ٱلظُّلُمَٰتُ وَٱلنُّورُ ۗ أَمْ جَعَلُوا۟ لِلَّهِ شُرَكَآءَ خَلَقُوا۟ كَخَلْقِهِۦ فَتَشَٰبَهَ ٱلْخَلْقُ عَلَيْهِمْ ۚ قُلِ ٱللَّهُ خَٰلِقُ كُلِّ شَىْءٍۢ وَهُوَ ٱلْوَٰحِدُ ٱلْقَهَّٰرُ

জিজ্ঞেস করুন নভোমন্ডল ও ভুমন্ডলের পালনকর্তা কে? বলে দিনঃ আল্লাহ! বলুনঃ তবে কি তোমরা আল্লাহ ব্যতীত এমন অভিভাবক স্থির করেছ, যারা নিজেদের ভাল-মন্দের ও মালিক নয়? বলুনঃ অন্ধ চক্ষুষ্মান কি সমান হয়? অথবা কোথাও কি অন্ধকার ও আলো সমান হয়। তবে কি তারা আল্লাহর জন্য এমন অংশীদার স্থির করেছে যে, তারা কিছু সৃষ্টি করেছে, যেমন সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ? অতঃপর তাদের সৃষ্টি এরূপ বিভ্রান্তি ঘটিয়েছে? বলুনঃ আল্লাহই প্রত্যেক বস্তুর স্রষ্টা এবং তিনি একক, পরাক্রমশালী।

১৬ নং আয়াতের তাফসীর:

অত্র আয়াতের ১ম অংশে নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জবান থেকে আকাশ-জমিনের প্রতিপালক আল্লাহ তা‘আলা এ স্বীকারোক্তি নিচ্ছেন। অন্যত্র বলা হয়েছে মুশরিকরাও আল্লাহ তা‘আলার এ প্রকার তাওহীদ স্বীকার করত। কিন্তু তারা তাওহীদে রুবুবিয়্যাহ স্বীকার করলেও ইবাদত করত আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্যান্য প্রতিমার। আল্লাহ তা‘আলাকে ছেড়ে এমন সৃষ্টিদেরকে অভিভাবক, বন্ধু ও পৃষ্ঠপোষক মনে করত যারা নিজেদের লাভ-ক্ষতিরও ক্ষমতা রাখে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

(قُلْ أَتَعْبُدُوْنَ مِنْ دُوْنِ اللّٰهِ مَا لَا يَمْلِكُ لَكُمْ ضَرًّا وَّلَا نَفْعًا)

“বল: তোমরা কি আল্লাহ ব্যতীত এমন কিছুর ইবাদত কর, যারা তোমাদের ক্ষতি বা উপকার করার কোন ক্ষমতা রাখে না?” (সূরা মায়েদা ৫:৭৬)

সুতরাং আল্লাহ তা‘আলাকে সব কিছুর মালিক মনে করা সত্ত্বেও তাঁকে বাদ দিয়ে অন্যের ইবাদত করা এটা বোকামি ছাড়া কিছুই নয়।

পরবর্তীতে আল্লাহ তা‘আলা দৃষ্টান্ত পেশ করছেন, যেমনভাবে দৃষ্টিহীন ও দৃষ্টিমান এবং অন্ধকার ও আলো সমান হতে পারে না তেমনি তাওহীদপন্থী ও মুশরিক সমান হতে পারে না। কেননা তাওহীদপন্থীর হৃদয় তাওহীদের জ্যোতিতে আলোকিত থাকে, আর মুশরিক অর্থাৎ যারা আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অন্যের উপাসনা করে তারা তা হতে বঞ্চিত। ফলে সে তাওহীদের আলো দেখতে পায় না। কেননা সে এ ব্যাপারে অন্ধ। অনুরূপভাবে আলো ও অন্ধকার যেমন সমান নয় তেমনি এক আল্লাহ তা‘আলার ইবাদতকারী যার হৃদয় ঈমানী জ্যোতিতে পরিপূর্ণ এবং মুশরিক, যার হৃদয় অজ্ঞতা ও কুসংস্কার দ্বারা পরিপূর্ণ তারা কক্ষনো এক হতে পারে না।

(أَمْ جَعَلُوْا لِلّٰهِ شُرَكَا۬ءَ خَلَقُوْا كَخَلْقِه)

অর্থাৎ মুশরিকরা যাদেরকে আল্লাহ তা‘আলার অংশীদার স্থির করছে তারা আল্লাহর সৃষ্টির মত কোন কিছু সৃষ্টি করেছে কি? ফলে তাদের কাছে বিষয়টি সাদৃশ্যপূর্ণ লাগছে যে, কে সৃষ্টিকর্তা আর সৃষ্টিকর্তা নয় তা আলাদা করা যাচ্ছে না, তাই তারা সবার ইবাদত করছে। বিষয়টি তো এমন নয়। বরং মুশরিকরাও স্বীকার করে যে, আল্লাহ তা‘আলাই একমাত্র স্রষ্টা। তাহলে কেন তাদের ইবাদত কর এবং তাদের মাধ্যম ধরে আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্য অর্জন করতে চাও। তাদের কথা আল্লাহ তুলে ধরে বলেন:

(مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَي اللّٰهِ زُلْفٰي)

“আমরা তো এদের উপাসনা এজন্য করি, যেন তারা আমাদেরকে আল্লাহ তা‘আলার নৈকট্যে পৌঁছে দেয়।” (সূরা যুমার ৩৯:৩)

সুতরাং সব কিছুর মালিক, স্রষ্টা ও অধিপতি একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা এ কথা জানার পরেও যারা আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করে তাহলে তাদের জন্য অপমানকর শাস্তি রয়েছে।

আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:

১. মক্কার মুশরিকরা স্বীকার করত ও বিশ্বাস করত যে, সব কিছুর মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা কিন্তু ইবাদত করার ক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্যের পূজা করত।

২. ঈমানদার আর মুশরিক সমান হতে পারে না যেমনিভাবে আলো ও অন্ধকার সমান নয়।

৩. কোন ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলাকে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে বিশ্বাস করলেই মুমিন হবে না যতক্ষণ না সকল ইবাদত আল্লাহ তা‘আলার জন্য করে।

17

أَنزَلَ مِنَ ٱلسَّمَآءِ مَآءًۭ فَسَالَتْ أَوْدِيَةٌۢ بِقَدَرِهَا فَٱحْتَمَلَ ٱلسَّيْلُ زَبَدًۭا رَّابِيًۭا ۚ وَمِمَّا يُوقِدُونَ عَلَيْهِ فِى ٱلنَّارِ ٱبْتِغَآءَ حِلْيَةٍ أَوْ مَتَٰعٍۢ زَبَدٌۭ مِّثْلُهُۥ ۚ كَذَٰلِكَ يَضْرِبُ ٱللَّهُ ٱلْحَقَّ وَٱلْبَٰطِلَ ۚ فَأَمَّا ٱلزَّبَدُ فَيَذْهَبُ جُفَآءًۭ ۖ وَأَمَّا مَا يَنفَعُ ٱلنَّاسَ فَيَمْكُثُ فِى ٱلْأَرْضِ ۚ كَذَٰلِكَ يَضْرِبُ ٱللَّهُ ٱلْأَمْثَالَ

তিনি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন। অতঃপর স্রোতধারা প্রবাহিত হতে থাকে নিজ নিজ পরিমাণ অনুযায়ী। অতঃপর স্রোতধারা স্ফীত ফেনারাশি উপরে নিয়ে আসে। এবং অলঙ্কার অথবা তৈজসপত্রের জন্যে যে বস্তুকে আগুনে উত্তপ্ত করে, তাতেও তেমনি ফেনারাশি থাকে। এমনি ভাবে আল্লাহ সত্য ও অসত্যের দৃষ্টান্ত প্রদান করেন। অতএব, ফেনা তো শুকিয়ে খতম হয়ে যায় এবং যা মানুষের উপকারে আসে, তা জমিতে অবশিষ্ট থাকে। আল্লাহ এমনিভাবে দৃষ্টান্তসমূহ বর্ণনা করেন।

১৭ নং আয়াতের তাফসীর:

উক্ত আয়াতে সত্য-মিথ্যা, আসল-নকল, আসলের স্থায়ীত্ব ও নকলের অস্থায়ীত্বের দু‘টো দৃষ্টান্ত বর্ণনা করা হয়েছে। পথের দিশারী ও জীবন সংবিধান সম্বলিত কুরআনকে বৃষ্টির সাথে তুলনা করা হয়েছে। কেননা কুরআনের উপকারিতা বৃষ্টির উপকারিতার মতই ব্যাপক। আর উপত্যকাকে তুলনা করেছেন হৃদয়ের সঙ্গে। কেননা উপত্যকায় পানি গিয়ে স্থির হয়ে যায়, যেমন কুরআনের মাধ্যমে ঈমান মু’মিনের হৃদয়ে স্থির হয়ে যায়। ফলে তার হৃদয়ে ভাল জিনিসগুলো স্থান পায় এবং কুফরী বিশ্বাস তার থেকে দূরে সরে যায়, যেমন পানির উপরের ফেনা তার উপর থেকে আস্তে আস্তে বিলীন হয়ে যায়, অথবা বাতাস তা শেষ করে দেয়। ফলে আসল জিনিসটাই টিকে থাকে আর বাতিল যেগুলো ছিল তা দূরীভূত হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: আল্লাহ তা‘আলা আমাকে যে হিদায়াত ও ইলম দিয়ে প্রেরণ করেছেন তার উদাহরণ হল জমিনের উপর পতিত প্রবল বৃষ্টির ন্যায়। কোন কোন ভূমি থাকে উর্বর যা পানি চুষে নিয়ে প্রচুর পরিমাণে ঘাসপাতা ও সবুজ তরুলতা উৎপন্ন করে। আর কোন কোন ভূমি আছে যা কঠিন, পানি আটকে রাখে, পরে আল্লাহ তা‘আলা তা দিয়ে মানুষের উপকার করেন। তারা নিজেরা পান করে, পশুপাখিকে পান করায় এবং চাষাবাদের কাজে লাগায়। কোন কোন জমি আছে মসৃণ সমতল তা পানি আটকে রাখে না এবং কোন ঘাসপাতা উৎপন্নও করে না। এ হল সে ব্যক্তির দৃষ্টান্ত যে দীনের জ্ঞান লাভ করে এবং আল্লাহ তা‘আলা আমাকে যা দিয়ে প্রেরণ করেছেন তা থেকে উপকৃত হয়। ফলে সে নিজে শিক্ষা গ্রহণ করে অপরকে শিক্ষা দেয়। (সহীহ বুখারী হা: ৭৯)

দ্বিতীয় একটি দৃষ্টান্ত হল, সোনা-রূপা, লৌহ ও তামা। এগুলোকে আগুনে তাপ দেয়া হয়। আগুনে তাপ দেয়ার সময় এগুলিতেও ফেনা জাতীয় জিনিস উত্থিত হয়। যেমন দুটো জিনিসে ফেনা উত্থিত হবার পর তা দূর হয়ে যায় তেমনি হক্বের উপরও কখনো কখনো বাতিল ছেয়ে যায়। অবশেষে বাতিল দূর হয়ে যায় এবং হক্ব পৃথকভাবেই থেকে যায়। যেমন পানির উপর থেকে ফেনা চলে গেলে তা পরিষ্কারভাবে থেকে যায়। সুতরাং বাতিল জিনিস কখনো কখনো প্রাধান্য বিস্তার লাভ করলেও তা চিরস্থায়ী হয় না। তা অবশেষে বিদায় নিয়ে চলে যায় এবং সত্যই টিকে থাকে। এভাবে আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনের অনেক জায়গায় হক্ব ও বাতিলের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণী:

“যারা কুফরী করে তাদের কর্ম মরুভূমির মরীচিকা সদৃশ, পিপাসার্ত যাকে পানি মনে করে থাকে, কিন্তু সে যখন সেখানে উপস্থিত হয় তখন কিছুই দেখতে পায় না। এবং সে পাবে সেথায় আল্লাহকে, অতঃপর তিনি তার কর্মফল পূর্ণ মাত্রায় দিবেন। আল্লাহ হিসেব গ্রহণে তৎপর। অথবা তাদের কর্ম গভীর সমুদ্র তলের অন্ধকার সদৃশ, যাকে আচ্ছন্ন করে তরঙ্গের উপর তরঙ্গ, যার ঊর্ধ্বে মেঘপুঞ্জ, অন্ধকারপুঞ্জ স্তরের উপর স্তর, এমনকি সে হাত বের করলে তা আদৌ দেখতে পাবে না। আল্লাহ যাকে জ্যোতি দান করেন না তার জন্য কোন জ্যোতিই নেই।” (সূরা নূর ২৪:৩৯-৪০) এখানে কুফরকে বাতিল এর সাথে উপমা দেয়া হয়েছে। أَوْدِيَةٌ শব্দটি واد-এর বহুবচন, অর্থ উপত্যকা।

(فَسَالَتْ أَوْدِيَةٌم بِقَدَرِهَا)

অর্থাৎ প্রত্যেক উপত্যকার যেটুকু পরিমাণ পানি দরকার তা ধারণ করে নেয়। زَبَدً অর্থ ময়লা আর্বজনা।

আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:

১. সত্য সর্বদা সমাগত, মিথ্যা সর্বদা বিতাড়িত। মিথ্যা কখনো চূড়ান্তভাবে জয় লাভ করতে পারে না।

২. ঈমান হল হক্ব আর কুফর হল বাতিল।

18

لِلَّذِينَ ٱسْتَجَابُوا۟ لِرَبِّهِمُ ٱلْحُسْنَىٰ ۚ وَٱلَّذِينَ لَمْ يَسْتَجِيبُوا۟ لَهُۥ لَوْ أَنَّ لَهُم مَّا فِى ٱلْأَرْضِ جَمِيعًۭا وَمِثْلَهُۥ مَعَهُۥ لَٱفْتَدَوْا۟ بِهِۦٓ ۚ أُو۟لَٰٓئِكَ لَهُمْ سُوٓءُ ٱلْحِسَابِ وَمَأْوَىٰهُمْ جَهَنَّمُ ۖ وَبِئْسَ ٱلْمِهَادُ

যারা পালনকর্তার আদেশ পালন করে, তাদের জন্য উত্তম প্রতিদান রয়েছে এবং যারা আদেশ পালন করে না, যদি তাদের কাছে জগতের সবকিছু থাকে এবং তার সাথে তার সমপরিমাণ আরও থাকে, তবে সবই নিজেদের মুক্তিপণ স্বরূপ দিয়ে দেবে। তাদের জন্যে রয়েছে কঠোর হিসাব। তাদের আবাস হবে জাহান্নাম। সেটা কতইনা নিকৃষ্ট অবস্থান।

১৮ নং আয়াতের তাফসীর:

উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা তাদের প্রতিদানের কথা বর্ণনা করছেন যারা তাঁর ডাকে সাড়া দেয় আর যারা তাঁর ডাকে সাড়া দেয়া না। যারা আল্লাহ তা‘আলার ডাকে সাড়া দেয় তথা আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ঈমান আনে ও সৎ আমল করে তারা উভয়কালে শান্তিতে থাকবে। তাদের কোন ভয় থাকবে না এবং তারা দুশ্চিন্তা গ্রস্তও হবে না। আল্লাহ তা‘আলার বাণী:

(إنَّ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ وَأَقَامُوا الصَّلوٰةَ وَاٰتَوُا الزَّكوٰةَ لَهُمْ أَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ ج وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُوْنَ)

“নিশ্চয়ই যারা ঈমান আনে, সৎকাজ করে, সালাত কায়েম করে এবং যাকাত আদায় করে তাদের রবের কাছে এসব আমলের প্রতিদান মওজুদ রয়েছে। আর তাদের কোন ভয় নেই, চিন্তাও নেই।” (সূরা বাক্বারা ২:২৭৭)

الْحُسْنٰي অর্থ দুনিয়াতে সহযোগিতা করা এবং আখিরাতে চিরস্থায়ী নেয়ামত ভোগ করা।

আর যারা আল্লাহ তা‘আলার ডাকে সাড়া দেয়া না তথা আল্লাহ তা‘আলার সাথে কুফরী করে, রাসূলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। তাদের অবস্থা এমন হবে যে, যদি তারা সমস্ত পৃথিবী ও তার সমপরিমাণ সম্পদের মালিক হত, তাহলে তা বিনিময়স্বরূপ দিয়ে শাস্তি থেকে মুক্তি পেতে চায়তো। বস্তুত কিয়ামতের দিন কারো নিকট থেকে কোন কিছুই গ্রহণ করা হবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

(إِنَّ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا وَمَاتُوْا وَهُمْ كُفَّارٌ فَلَنْ يُّقْبَلَ مِنْ أَحَدِهِمْ مِّلْءُ الْأَرْضِ ذَهَبًا وَّلَوِ افْتَدٰي بِه۪)

“নিশ্চয়ই যারা কুফরী করেছে এবং কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে তাদের পক্ষ থেকে পৃথিবী ভরা স্বর্ণও বিনিময় স্বরূপ প্রদান করতে চাইলে তা কখনো গ্রহণ করা হবে না।” (সূরা আলি ইমরান ৩:৯১)

আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন,

(إِنَّ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا لَوْ أَنَّ لَهُمْ مَّا فِي الْأَرْضِ جَمِيْعًا وَّمِثْلَه۫ مَعَه۫ لِيَفْتَدُوْا بِه۪ مِنْ عَذَابِ يَوْمِ الْقِيٰمَةِ مَا تُقُبِّلَ مِنْهُمْ ج وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيْمٌ)‏

“নিশ্চয়ই যারা কুফরী করেছে, যদি তাদের কাছে পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ থাকে এবং তার সাথে সমপরিমাণ আরও থাকে আর এগুলোর বিনিময়ে কিয়ামাতের দিন শাস্তি থেকে রেহাই পেতে চায়, তবুও তাদের নিতট হতে তা কবূল করা হবে না। আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” (সূরা মায়েদা ৫:৩৬)

তাদের হিসাব হবে খুবই কঠিন। তাদের ছোট-বড় প্রত্যেকটি কর্মের হিসাব নেয়া হবে। আর যাদের হিসাব চাওয়া হবে তারা মুক্তি পাবে না। যেমন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: যার হিসাব চাওয়া হবে, সে ধ্বংস হয়ে যাবে। (সহীহ বুখারী হা: ১০৩, সহীহ মুসলিম হা: ৭৪০৮)

সুতরাং যারা আল্লাহ তা‘আলার ডাকে সাড়া দিবে না তারা দুনিয়াতেও লাঞ্ছিত হবে এবং আখিরাতেও কঠিন শাস্তি ভোগ করবে।

আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়:

(১) যারা মু’মিন তারা আখিরাতে নিষ্কৃতি লাভ করবে আর যারা কাফির তারা কঠিন শাস্তি ভোগ করবে।

(২) আল্লাহ তা‘আলা যার হিসাব নিবেন সে শাস্তি থেকে রেহাই পাবে না।

(৩) জাহান্নাম বড় কষ্টের জায়গা, সেখানে আরামে থাকা যাবে না।

19

۞ أَفَمَن يَعْلَمُ أَنَّمَآ أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ ٱلْحَقُّ كَمَنْ هُوَ أَعْمَىٰٓ ۚ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُو۟لُوا۟ ٱلْأَلْبَٰبِ

যে ব্যক্তি জানে যে, যা কিছু পালনকর্তার পক্ষ থেকে আপনার প্রতি অবর্তীর্ণ হয়েছে তা সত্য সে কি ঐ ব্যক্তির সমান, যে অন্ধ? তারাই বোঝে, যারা বোধশক্তি সম্পন্ন।

Explained together with ayah 18

20

ٱلَّذِينَ يُوفُونَ بِعَهْدِ ٱللَّهِ وَلَا يَنقُضُونَ ٱلْمِيثَٰقَ

এরা এমন লোক, যারা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করে এবং অঙ্গীকার ভঙ্গ করে না।

Explained together with ayah 18

Commentary: Tafsir Fathul Majid by AbdulRahman Bin Hasan Al-Alshaikh. Qur'an text and translation via AlQuran Cloud.