Muslim99Muslim99
← Tafsir library

12. Yusuf

Joseph · Meccan · 111 ayahs

سُورَةُ يُوسُفَ

Reading Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation

Ayahs 91–100 of 111

91

قَالُوا۟ تَٱللَّهِ لَقَدْ ءَاثَرَكَ ٱللَّهُ عَلَيْنَا وَإِن كُنَّا لَخَٰطِـِٔينَ

তারা বললঃ আল্লাহর কসম, আমাদের চাইতে আল্লাহ তোমাকে পছন্দ করেছেন এবং আমরা অবশ্যই অপরাধী ছিলাম।

তারা বলল, ‘আল্লাহর শপথ! আল্লাহ নিশ্চয় তোমাকে আমাদের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন এবং নিঃসন্দেহে আমরাই ছিলাম অপরাধী।’ [১]

[১] ভায়েরা ইউসুফ (আঃ)-এর এই মহিমা দেখে নিজেদের দোষ-ত্রুটি স্বীকার করে নিলেন।

92

قَالَ لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ ٱلْيَوْمَ ۖ يَغْفِرُ ٱللَّهُ لَكُمْ ۖ وَهُوَ أَرْحَمُ ٱلرَّٰحِمِينَ

বললেন, আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদের কে ক্ষমা করুন। তিনি সব মেহেরবানদের চাইতে অধিক মেহেরবান।

সে বলল, ‘আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই।[১] আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।

[১] ইউসুফ আলাইহিস সালামও নবুঅতী গরিমা দেখিয়ে তাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন এবং বললেন: যা হয়েছে তা হয়ে গেছে, আজ তোমাদেরকে কোন প্রকার ভৎর্সনা ও নিন্দা করা হবে না। মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (সাঃ)ও মক্কার ঐসব কাফির এবং কুরাইশ বংশের নেতাদেরকে যারা তাঁর রক্ত-পিয়াসী ছিল এবং নানাবিধ যাতনা দিয়েছিল উক্ত শব্দগুলিই বলে তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

93

ٱذْهَبُوا۟ بِقَمِيصِى هَٰذَا فَأَلْقُوهُ عَلَىٰ وَجْهِ أَبِى يَأْتِ بَصِيرًۭا وَأْتُونِى بِأَهْلِكُمْ أَجْمَعِينَ

তোমরা আমার এ জামাটি নিয়ে যাও। এটি আমার পিতার মুখমন্ডলের উপর রেখে দিও, এতে তাঁর দৃষ্টি শক্তি ফিরে আসবে। আর তোমাদের পরিবারবর্গের সবাইকে আমার কাছে নিয়ে এস।

তোমরা আমার এ জামাটি নিয়ে যাও এবং এটা আমার পিতার মুখমন্ডলের উপর রাখো; তিনি দৃষ্টি শক্তি ফিরে পাবেন।[১] আর তোমরা তোমাদের পরিবারের সকলকেই আমার নিকট নিয়ে এস।’ [২]

[১] জামা মুখমন্ডলে রাখা মাত্র চোখের জ্যোতি ফিরে আসা একটি অলৌকিক মু'জিযা ও কারামত ছিল।

[২] এই বলে ইউসুফ (আঃ) স্বীয় পরিবারের সকলকে মিসর আসার আহবান জানালেন।

94

وَلَمَّا فَصَلَتِ ٱلْعِيرُ قَالَ أَبُوهُمْ إِنِّى لَأَجِدُ رِيحَ يُوسُفَ ۖ لَوْلَآ أَن تُفَنِّدُونِ

যখন কাফেলা রওয়ানা হল, তখন তাদের পিতা বললেনঃ যদি তোমরা আমাকে অপ্রকৃতিস্থ না বল, তবে বলিঃ আমি নিশ্চিতরূপেই ইউসুফের গন্ধ পাচ্ছি।

অতঃপর যাত্রীদল যখন বের হয়ে পড়ল, তখন তাদের পিতা বলল, ‘তোমরা যদি আমাকে ভারসাম্যহীন মনে না কর, তাহলে বলি, আমি ইউসুফের ঘ্রাণ পাচ্ছি।’ [১]

[১] এদিকে উক্ত জামা নিয়ে মিসর থেকে কাফেলা রওনা হল এবং ওদিকে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ইয়াকূব (আঃ)-এর কাছে মু'জিযা স্বরূপ ইউসুফ (আঃ)-এর সুগন্ধি আসতে লাগল। এটা যেন এ কথার ঘোষণা ছিল যে, যতক্ষণ না আল্লাহর পক্ষ থেকে সংবাদ আসে রসূলও অনবগত থাকেন, যদিও পুত্র নিজ শহরের কোন কূপে থাকে (তবুও তিনি জানতে পারেন না)। পক্ষান্তরে মহান আল্লাহ যখন ব্যবস্থা করে দেন, তখন মিসরের মত দূর দূরান্ত এলাকা থেকেও পুত্রের সুগন্ধি চলে আসে।

95

قَالُوا۟ تَٱللَّهِ إِنَّكَ لَفِى ضَلَٰلِكَ ٱلْقَدِيمِ

লোকেরা বললঃ আল্লাহর কসম, আপনি তো সেই পুরানো ভ্রান্তিতেই পড়ে আছেন।

তারা বলল, ‘আল্লাহর শপথ! আপনি তো আপনার পূর্ব বিভ্রান্তিতেই রয়েছেন।’ [১]

[১] ضَلَال এর অর্থ মমতাময় ভালবাসার সেই বিহ্বলতা যা ইয়াকূব (আঃ)-এর স্বীয় পুত্র ইউসুফ (আঃ)-এর সাথে ছিল। পুত্রগণ বলতে লাগলেন, এখনও পর্যন্ত আপনি সেই আগের ভুলে; অর্থাৎ ইউসুফের মহব্বতে বিভোল রয়েছেন। এত দীর্ঘ সময় কেটে যাওয়ার পরও ইউসুফের মহব্বত আপনার মন থেকে দূর হয়নি।

96

فَلَمَّآ أَن جَآءَ ٱلْبَشِيرُ أَلْقَىٰهُ عَلَىٰ وَجْهِهِۦ فَٱرْتَدَّ بَصِيرًۭا ۖ قَالَ أَلَمْ أَقُل لَّكُمْ إِنِّىٓ أَعْلَمُ مِنَ ٱللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ

অতঃপর যখন সুসংবাদদাতা পৌঁছল, সে জামাটি তাঁর মুখে রাখল। অমনি তিনি দৃষ্টি শক্তি ফিরে পেলেন। বললেনঃ আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে যা জানি তোমরা তা জান না?

অতঃপর যখন সুসংবাদবাহক উপস্থিত হল এবং তার মুখমন্ডলের উপর জামাটি রাখল তখন সে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেল।[১] সে বলল, ‘আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, আমি আল্লাহর নিকট হতে তা জানি, যা তোমরা জান না?’ [২]

[১] অর্থাৎ, যখন সুসংবাদদাতা এসে ইয়াকূব (আঃ)-এর চেহারায় উক্ত জামা রাখল, তখন অলৌকিকভাবে তাঁর দৃষ্টিশক্তি ফিরে এল।

[২] কেননা আমার নিকট জ্ঞানের একটি মাধ্যম অহীও আছে, যা তোমাদের মধ্যে কারো কাছে নেই। উক্ত অহীর মাধ্যমে মহান আল্লাহ স্বীয় নবীদেরকে প্রয়োজন ও চাহিদা অনুপাতে অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করে থাকেন।

97

قَالُوا۟ يَٰٓأَبَانَا ٱسْتَغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَآ إِنَّا كُنَّا خَٰطِـِٔينَ

তারা বললঃ পিতা আমাদের অপরাধ ক্ষমা করান। নিশ্চয় আমরা অপরাধী ছিলাম।

তারা বলল, ‘হে আমাদের পিতা! আমাদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন; নিশ্চয়ই আমরা অপরাধী।’

98

قَالَ سَوْفَ أَسْتَغْفِرُ لَكُمْ رَبِّىٓ ۖ إِنَّهُۥ هُوَ ٱلْغَفُورُ ٱلرَّحِيمُ

বললেন, সত্বরই আমি পালনকর্তার কাছে তোমাদের জন্য ক্ষমা চাইব। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, দয়ালূ।

সে বলল, ‘আমি আমার প্রতিপালকের কাছে তোমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব,[১] তিনি অবশ্যই অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’

[১] সত্ত্বর ক্ষমা-প্রার্থনার দু'আ না করে ভবিষ্যতে দু'আ করার ওয়াদা করলেন। উদ্দেশ্য এই ছিল যে, রাতের শেষ প্রহরে যে সময়টি আল্লাহর ইবাদতের জন্য তাঁর প্রিয় বান্দাদের বিশেষ সময় সেই সময়ে আল্লাহর কাছে তোমাদের জন্য ক্ষমা-প্রার্থনার দু'আ করব। দ্বিতীয় কথা এই যে, ভায়েরা ইউসুফ (আঃ)-এর প্রতি অন্যায় করেছিলেন, সেহেতু তাঁর পরামর্শ নেওয়া জরুরী ছিল। তাই তিনি সত্ত্বর ক্ষমা-প্রার্থনার দু'আ না করে পরে করার ওয়াদা করলেন।

99

فَلَمَّا دَخَلُوا۟ عَلَىٰ يُوسُفَ ءَاوَىٰٓ إِلَيْهِ أَبَوَيْهِ وَقَالَ ٱدْخُلُوا۟ مِصْرَ إِن شَآءَ ٱللَّهُ ءَامِنِينَ

অতঃপর যখন তারা ইউসুফের কাছে পৌঁছল, তখন ইউসুফ পিতা-মাতাকে নিজের কাছে জায়গা দিলেন এবং বললেনঃ আল্লাহ চাহেন তো শান্তি চিত্তে মিসরে প্রবেশ করুন।

অতঃপর তারা যখন ইউসুফের নিকট উপস্থিত হল, তখন সে তার পিতা-মাতাকে নিজের কাছে স্থান দান করল[১] এবং বলল, আপনারা আল্লাহর ইচ্ছায় নিরাপদে মিসরে প্রবেশ করুন।

[১] অর্থাৎ শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে তাঁদেরকে নিজের কাছে স্থান দিলেন এবং ভক্তিপূর্ণ আপ্যায়ন করলেন।

100

وَرَفَعَ أَبَوَيْهِ عَلَى ٱلْعَرْشِ وَخَرُّوا۟ لَهُۥ سُجَّدًۭا ۖ وَقَالَ يَٰٓأَبَتِ هَٰذَا تَأْوِيلُ رُءْيَٰىَ مِن قَبْلُ قَدْ جَعَلَهَا رَبِّى حَقًّۭا ۖ وَقَدْ أَحْسَنَ بِىٓ إِذْ أَخْرَجَنِى مِنَ ٱلسِّجْنِ وَجَآءَ بِكُم مِّنَ ٱلْبَدْوِ مِنۢ بَعْدِ أَن نَّزَغَ ٱلشَّيْطَٰنُ بَيْنِى وَبَيْنَ إِخْوَتِىٓ ۚ إِنَّ رَبِّى لَطِيفٌۭ لِّمَا يَشَآءُ ۚ إِنَّهُۥ هُوَ ٱلْعَلِيمُ ٱلْحَكِيمُ

এবং তিনি পিতা-মাতাকে সিংহাসনের উপর বসালেন এবং তারা সবাই তাঁর সামনে সেজদাবনত হল। তিনি বললেনঃ পিতা এ হচ্ছে আমার ইতিপূর্বেকার স্বপ্নের বর্ণনা আমার পালনকর্তা একে সত্যে পরিণত করেছেন এবং তিনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আমাকে জেল থেকে বের করেছেন এবং আপনাদেরকে গ্রাম থেকে নিয়ে এসেছেন, শয়তান আমার ও আমার ভাইদের মধ্যে কলহ সৃষ্টি করে দেয়ার পর। আমার পালনকর্তা যা চান, কৌশলে সম্পন্ন করেন। নিশ্চয় তিনি বিজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।

আর ইউসুফ তার পিতা-মাতাকে সিংহাসনে বসাল[১] এবং তারা সবাই তার সামনে সিজদায় লুটিয়ে পড়ল।[২] সে বলল, ‘হে আমার পিতা! এটাই আমার পূর্বেকার স্বপ্নের ব্যাখ্যা;[৩] আমার প্রতিপালক তা বাস্তবে পরিণত করেছেন। আর তিনি আমাকে কারাগার হতে মুক্ত করে[৪] এবং শয়তানের আমার ও আমার ভাইদের মাঝে সম্পর্ক নষ্ট করার পরও[৫] আপনাদেরকে মরু অঞ্চল হতে এখানে এনে দিয়ে[৬] আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আমার প্রতিপালক যা ইচ্ছা তা নিপুণতার সাথে করে থাকেন, তিনি তো সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।

[১] কতিপয় ব্যাখ্যাকরীদের মত যে, ইউসুফ (আঃ)-এর মাতা বলতে বিমাতা এবং আপন খালা ছিলেন। কেননা তাঁর আপন মাতা বিনয়্যামীনের জন্মের পর মারা গিয়েছিলেন। ইয়াকূব (আঃ) তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বোনকে বিবাহ করেছিলেন। উক্ত খালাই ইয়াকূব (আঃ)-এর সাথে মিসর গিয়েছিলেন। (ফাতহুল কাদীর) কিন্তু ইমাম ইবনে জারীর ত্বাবারী এর বিপরীত বলেছেন যে, ইউসুফ (আঃ)-এর নিজস্ব মাতা মারা যাননি, তিনিই ইয়াকূব (আঃ)-এর সঙ্গে ছিলেন।

[২] কেউ কেউ এর তরজমা করেছেন যে, তারা সবাই আদব ও সম্মান করতঃ তার সামনে অবনত হল। কিন্তু ﴿وَخَرُّوْا لَهُ سُجَّدًا﴾ এর শব্দগুলো প্রমাণ করছে যে, তারা ইউসুফ (আঃ)-এর সামনে মাটিতে সিজদাবনত হয়েছিলেন। অর্থাৎ সিজদার অর্থ এখানে সিজদাই। তবে এই সিজদা সম্মানের সিজদা, ইবাদতের সিজদা নয়। আর সম্মানের (তা'যীমী) সিজদা ইয়াকূব (আঃ)-এর শরীয়তে জায়েয ছিল। ইসলামে শিরকের দরজা বন্ধ করার জন্য সম্মানসূচক সিজদাকেও হারাম ঘোষণা করা হয়েছে, সুতরাং এখন সম্মানসূচক সিজদাও কারো জন্য বৈধ নয়। ("মুআয যখন শাম (দেশ) থেকে ফিরে এলেন তখন নবী (সাঃ)-কে সিজদা করলেন। আল্লাহর রসূল (সাঃ) বললেন, "একি মুআয?" মুআয বললেন, 'আমি শাম গিয়ে দেখলাম, সে দেশের লোকেরা তাদের যাজক ও পাদ্রীগণকে সিজদা করছে। তাই আমি মনে মনে চাইলাম যে, আমরাও আপনার জন্য সিজদা করব।' তা শুনে তিনি বললেন "খবরদার! তা করো না। কারণ, আমি যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য সিজদা করতে কাউকে আদেশ করতাম, তাহলে মহিলাকে আদেশ করতাম, সে যেন তার স্বামীকে সিজদা করে।) (ইবনে মাজাহ ১৮৫৩ নং, আহমাদ ৪/৩৮১, ইবনে হিব্বান ৪১৭১ নং, হাকেম ৪/১৭২, বায্যার ১৪৬১নং, সিলসিলাহ সহীহাহ ১২০৩নং)

[৩] অর্থাৎ ইউসুফ (আঃ) যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, এসব পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত তার এই তা'বীর (ব্যাখ্যা) সামনে এল যে, মহান আল্লাহ তাঁকে রাজ সিংহাসনে বসালেন এবং পিতা-মাতা সহ সকল ভায়েরা তাঁকে সিজদা করলেন।

[৪] আল্লাহর অনুগ্রহসমূহের মধ্যে কূপ থেকে বের করার কথা উল্লেখ করলেন না, যেন তাতে তাঁর ভায়েরা লজ্জিত না হন, এ হল নববী চরিত্র।

[৫] এটাও উদার চরিত্রের একটি নমুনা যে, ভাইদেরকে একটুও দোষারোপ না করে শয়তানকে উক্ত কীর্তিকলাপের কারণ বানালেন।

[৬] মিসরের মত সভ্য এলাকার তুলনায় কানআন একটি মরুভূমির মত এলাকা, তাই তিনি بَدْو (মরু অঞ্চল) শব্দ ব্যবহার করলেন।

Commentary: Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation. Qur'an text and translation via AlQuran Cloud.