فَلَمَّا سَمِعَتْ بِمَكْرِهِنَّ أَرْسَلَتْ إِلَيْهِنَّ وَأَعْتَدَتْ لَهُنَّ مُتَّكَـًۭٔا وَءَاتَتْ كُلَّ وَٰحِدَةٍۢ مِّنْهُنَّ سِكِّينًۭا وَقَالَتِ ٱخْرُجْ عَلَيْهِنَّ ۖ فَلَمَّا رَأَيْنَهُۥٓ أَكْبَرْنَهُۥ وَقَطَّعْنَ أَيْدِيَهُنَّ وَقُلْنَ حَٰشَ لِلَّهِ مَا هَٰذَا بَشَرًا إِنْ هَٰذَآ إِلَّا مَلَكٌۭ كَرِيمٌۭ
যখন সে তাদের চক্রান্ত শুনল, তখন তাদেরকে ডেকে পাঠাল এবং তাদের জন্যে একটি ভোজ সভার আয়োজন করল। সে তাদের প্রত্যেককে একটি ছুরি দিয়ে বললঃ ইউসুফ এদের সামনে চলে এস। যখন তারা তাকে দেখল, হতভম্ব হয়ে গেল এবং আপন হাত কেটে ফেলল। তারা বললঃ কখনই নয় এ ব্যক্তি মানব নয়। এ তো কোন মহান ফেরেশতা।
৩০-৩৪ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা সংবাদ দিচ্ছেন যে, ইউসুফ (আঃ) ও আযীযের স্ত্রীর খবর শহরময় ছড়িয়ে পড়লো এবং ওটা হচ্ছে মিসর (এর শহর)। কতকগুলি ভদ্র মহিলা অত্যন্ত বিষ্ময় ও ঘৃণার সাথে এই ঘটনার সমালোচনা করতে থাকে। তারা পরস্পর বলাবলি করেঃ ‘যুলাইখার কর্মকান্ডটা দেখো! সে হচ্ছে উযীরের স্ত্রী, অথচ সে তার ক্রীতদাসের সাথে দুস্কার্যে লিপ্ত হতে চাচ্ছে! ক্রীতদাসের প্রেম তার অন্তরকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে।’ যহ্হাক (রঃ) হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, (আরবি) বলা হয় হত্যাকারী প্রেমকে। (আরবি) হচ্ছে এর নিম্নস্তরের প্রেম। আর (আরবি) বলা হয় অন্তরের পর্দাকে। স্ত্রীলোকগুলি বললো: “আমরা যুলাইখাকে স্পষ্ট বিভ্রান্তির মধ্যে দেখছি। শহরের ভদ্রমহিলারা তাকে যে দোষারোপ করছে এ খবর তার কানে পৌঁছে গেল। এখানে ‘মকর’ বা ষড়যন্ত্র শব্দটি আনার কারণ এই যে, কারো কারো মতে এটা প্রকৃতপক্ষে ঐ মহিলাদের ষড়যন্ত্রই ছিল। আসলে তারা হযরত ইউসুফের (আঃ) দর্শন কামনা করছিল। সুতরাং যুলাইখাকে দোষারোপ করা তাদের একটা কৌশল ছিল মাত্র। আযীযের স্ত্রী যুলাইখা তাদের এই চাল বুঝে ফেললো। এতে সে তার ওজর পেশ করার একটা সুযোগ পেয়ে গেল। সে তাদেরকে বলে পাঠালো: ‘অমুক সময় আমার বাড়ীতে আপনাদের দাওয়াত থাকলো।’ ইবনু আব্বাস (রাঃ), সাঈদ ইবনু জুবাইর (রাঃ), মুজাহিদ (রঃ) হাসান (রঃ), সুদ্দী (রঃ) প্রভৃতি গুরুজন বলেন যে, যুলাইখা মহিলাদের জন্যে এমন মজলিসের ব্যবস্থা করলো যেখানে খাদ্য হিসেবে ফল রাখা হয়েছিল। ফলগুলি কেটে কেটে ও ছিলে ছিলে খাওয়ার জন্যে সে প্রত্যেককে একটি করে ধাৱাল চাকু প্রদান করলো। এটাই ছিল মহিলাদের ষড়যন্ত্রের প্রতিফলন। তারা আসলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনয়ন করে ইউসুফের (আঃ) সৌন্দর্য দেখতে চেয়েছিল। যুলাইখা নিজেকে ক্ষমার্হ প্রমাণ এবং তাদের ষড়যন্ত্র প্রকাশ করার জন্যেই তাদেরকে আহত করলো এবং সেটাও আবার তাদের নিজেদের হাতে। যুলাইখা হযরত ইউসুফকে (আঃ) বললো: “তাদের কাছে বেরিয়ে এসো, হযরত ইউসুফ (আঃ) কি করে তার প্রভুপত্নীর আদেশ অমান্য করতে পারেন? তৎক্ষণাৎ তিনি ঐ কামরা থেকে বেরিয়ে আসলেন যেখানে তিনি অবস্থান করছিলেন। মহিলাদের দৃষ্টি তাঁর দিকে পড়া মাত্রই তারা তাঁর গরিমায় অভিভূত হয়ে পড়লো এবং তাঁর সৌন্দর্য দর্শনে একেবারে আত্মহারা হয়ে গেল। ফলে ঐ সূতীক্ষ্ণ চাকু দ্বারা ফল কাটার পরিবর্তে তারা নিজেদের হাতের অঙ্গুলীগুলি কেটে ফেললো।হযরত যায়েদ ইবনু আসলাম (রঃ) বলেন যে, যিয়াফতের খাদ্য ইতিপূর্বেই যথারীতি পরিবেশন করা হয়েছিল এবং তাদের আহারও ছিল সমাপ্তির পথে। শুধুমাত্র ফল দ্বারা আপ্যায়ন অবশিষ্ট ছিল। তাদের হাতে চাকু ছিল এবং তা দ্বারা তারা ফল কাটতে ছিল। এমতাবস্থায় যুলাইখা তাদেরকে বললো: “আপনারা ইউসুফকে (আঃ) দেখতে চান কি?” সবাই সমস্বরে বলে উঠলো: “হ্যাঁ হ্যাঁ।” তখনই হযরত ইউসুফকে (আঃ) ডেকে পাঠানো হয় এবং তিনি তাদের সামনে হাযির হন। এর পরেই তাকে চলে যেতে বলা হয়। সুতরাং তিনি চলে যান। তাঁর এই আগমন ও প্রস্থানের ফলে তারা তার সামনের দিক এবং পিছনের দিক পূর্ণভাবে দেখবার সুযোগ পায়। তাকে দেখা মাত্রই তাদের মুর্ছা যাওয়ার উপক্রম হয় এবং ফল কাটার পরিবর্তে নিজেদের হাত কেটে ফেলে। কিন্তু তারা ব্যথা অনুভব করতে পারলো না। যখন হযরত ইউসুফ (আঃ) তাদের নিকট থেকে বিদায় হয়ে গেলেন তখন তারা ব্যথা অনুভব করলো এবং বুঝতে পারলো যে, ফলের পরিবর্তে তারা নিজেদের হাত কেটে ফেলেছে। ঐ সময় আযীযের স্ত্রী যুলাইখা তাদেরকে বললো: “দেখুন তো, একবার মাত্র তার সৌন্দর্য দর্শনে আপনারা আত্মভোলা হয়ে গেলেন, তাহলে আমার কি অবস্থা হতে পারে?” মহিলারা বলে উঠলো: “আল্লাহর কসম! ইনি তো মানুষ নন, বরং ফেরেশতা! সাধারণ ফেরেশতা নন বরং বড় মর্যাদাবান ফেরেশতা! আজ থেকে আমরা আর আপনাকে ভৎসনা করবো না।” ভদ্র-মহিলারা হযরত ইউসুফের (আঃ) মত তো নয়ই, এমনকি তাঁর কাছাকাছি এবং তাঁর সাথে সাদৃশ্যযুক্ত সুন্দর …