Muslim99Muslim99
← Tafsir library

12. Yusuf

Joseph · Meccan · 111 ayahs

سُورَةُ يُوسُفَ

Reading Tafsir Ibn Kathir by Hafiz Ibn Kathir (Tawheed Publication)

Ayahs 101–110 of 111

101

۞ رَبِّ قَدْ ءَاتَيْتَنِى مِنَ ٱلْمُلْكِ وَعَلَّمْتَنِى مِن تَأْوِيلِ ٱلْأَحَادِيثِ ۚ فَاطِرَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضِ أَنتَ وَلِىِّۦ فِى ٱلدُّنْيَا وَٱلْءَاخِرَةِ ۖ تَوَفَّنِى مُسْلِمًۭا وَأَلْحِقْنِى بِٱلصَّٰلِحِينَ

হে পালনকর্তা আপনি আমাকে রাষ্ট্রক্ষমতাও দান করেছেন এবং আমাকে বিভিন্ন তাৎপর্য সহ ব্যাখ্যা করার বিদ্যা শিখিয়ে দিয়েছেন। হে নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডলের স্রষ্টা, আপনিই আমার কার্যনির্বাহী ইহকাল ও পরকালে। আমাকে ইসলামের উপর মৃত্যুদান করুন এবং আমাকে স্বজনদের সাথে মিলিত করুন।

এটা হচ্ছে সত্যবাদী হযরত ইউসুফের (আঃ) তাঁর প্রতিপালক মহামহিমান্বিত আল্লাহর নিকট প্রার্থনা। তিনি নুবওয়াত লাভ করেছেন, তাঁকে রাজত্ব দান করা হয়েছে, বিপদ-আপদ থেকে তিনি মুক্তি পেয়েছেন, পিতা-মাতা এবং ভ্রাতাদের সাথে মিলন ঘটেছে, তাই এখন তিনি আল্লাহ পাকের নিকট প্রার্থনা করছেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! পার্থিব নিয়ামতগুলি যেমন আপনি আমার উপর পরিপূর্ণ করেছেন, অনুরূপভাবে আখেরাতেও এই নিয়ামতগুলি আমাকে পরিপূর্ণভাবে প্রদান করুন। যখন আমার মৃত্যু আসবে তখন যেন তা ইসলাম ও আপনার আনুগত্যের উপরই আসে। আমাকে যেন সৎ লোকদের সাথে মিলিত হওয়ার সুযোগ দেয়া হয়। অন্যান্য নবী ও রাসূলদের সাথে যেন আমার সাক্ষাৎ ঘটে।”খুব সম্ভব হযরত ইউসুফের (আঃ) এই প্রার্থনা ছিল তাঁর মৃত্যুর সময়। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর মৃত্যুর সময় নিজের অঙ্গুলী উত্তোলন করেন এবং প্রার্থনা করেন : (আরবি) অর্থাৎ “হে আল্লাহ্! মহান বন্ধুর সাথে আমার সাক্ষাত করিয়ে দিন!” তিনবার তিনি এই প্রার্থনাই করেন। আবার এটাও হতে পারে যে, তিনি যখনই মারা যাবেন তখনই যেন ইসলামের উপর মারা যান এবং নবীদের সাথে মিলিত হন, এই ছিল তাঁর প্রার্থনার উদ্দেশ্য। এ নয় যে, তখনই তিনি মৃত্যুর জন্যে প্রার্থনা করেছিলেন। এর দৃষ্টান্ত ঠিক এইরূপই যে, যেমন কেউ কাউকেও দুআ’ দিয়ে বলেঃ “আল্লাহ ইসলামের উপর তোমার মৃত্যু দিন।” তখন উদ্দেশ্য এটা থাকে না যে, তখনই আল্লাহ তার মৃত্যু ঘটিয়ে দিন। কিংবা যেমন আমরা প্রার্থনায় বলে থাকিঃ “হে আল্লাহ! আপনার দ্বীনের উপরই যেন আমাদের মৃত্যু হয়।” অথবা আমরা প্রার্থনায় বলিঃ “হে আল্লাহ! ইসলামের উপর আমাদের মৃত্যু ঘটিয়ে দিন এবং সৎ লোকদের সাথে আমাদের সাক্ষাৎ করিয়ে দিন। আর যদি তার উদ্দেশ্য এটাই থেকে থাকে যে, প্রকৃত পক্ষে তৎক্ষণাৎ তিনি মৃত্যুর জন্যে প্রার্থনা করেছিলেন তবে সম্ভবতঃ তাদের শরীয়তে ওটা জায়েয ছিল। যেমন কাতাদা’’র (রঃ) উক্তি রয়েছে যে, যখন হযরত ইউসুফের (আঃ) সমস্ত কাজ সমাপ্ত হয়ে গেল, চক্ষু ঠাণ্ডা হলো এবং রাজত্ব, সম্পদ, মান-সম্মান, বংশ, পরিবার ইত্যাদি সব কিছু মিলে গেল তখন তার সৎকর্মশীলদের সাথে মিলিত হওয়ার আগ্রহ হলো। হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলতেন যে, হযরত ইউসুফের (আঃ) পূর্বে কোন নবী কখনো মৃত্যু কামনা করেন নাই। অনুরূপভাবে ইবনু জারীর (রঃ) এবং সুন্দী (রঃ) হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ইউসুফ (আঃ) প্রথম নবী যিনি মৃত্যুর জন্যে প্রার্থনা করেছিলেন।আর এটা সম্ভব যে, তিনিই প্রথম ইসলামের উপর মৃত্যু বরণের প্রার্থনা জানিয়েছিলেন যেমন (আরবি) (৭১:২৮) এই দুআ’ সর্বপ্রথম হযরত নূহই (আঃ) করেছিলেন। এসব সত্ত্বেও যদি এটাই বলা হয় যে, হযরত ইউসুফ (আঃ) মৃত্যুর জন্যেই প্রার্থনা করেছিলেন তবে আমরা বলবো যে, হয়তো তাঁদের শরীয়তে এটা জায়েয। আমাদের শরীয়তে কিন্তু এটা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ। হযরত আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ যেন তার প্রতি আপতিত কষ্ট ও বিপদের কারণে মৃত্যু কামনা না করে। যদি একান্তই মৃত্যু কামনা করতেই হয় তবে যেন বলেঃ “হে আল্লাহ! আমাকে জীবিত রাখুন যতদিন আমার জীবিত থাকা মঙ্গলজনক হয় এবং আমাকে মৃত্যু দান করুন যদি আমার জন্যে মৃত্যুই কল্যাণকর হয়।” (এ হাদীসটি ইমাম ইবনু হাম্বল (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের এই হাদীসেই রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “তোমাদের কেউ যেন তার উপর আপতিত বিপদ-আপদের কারণে কখনো মৃত্যু কামনা না করে। যদি সে সৎ হয় তবে তার জীবন তার পূণ্য বৃদ্ধি করবে। আর যদি সে দুষ্ট হয় তবে তার জীবনে হয়তো কোন সময় তাওবা করার তাওফীক লাভ হবে। বরং সে যেন বলেঃ হে আল্লাহ! যতদিন আমার জীবিত থাকা কল্যাণকর হয় ততদিন আমাকে জীবিত রাখুন। আর যদি মৃত্যুই আমার জন্যে কল্যাণকর হয় তবে আমাকে মৃত্যু …

102

ذَٰلِكَ مِنْ أَنۢبَآءِ ٱلْغَيْبِ نُوحِيهِ إِلَيْكَ ۖ وَمَا كُنتَ لَدَيْهِمْ إِذْ أَجْمَعُوٓا۟ أَمْرَهُمْ وَهُمْ يَمْكُرُونَ

এগুলো অদৃশ্যের খবর, আমি আপনার কাছে প্রেরণ করি। আপনি তাদের কাছে ছিলেন না, যখন তারা স্বীয় কাজ সাব্যস্ত করছিল এবং চক্রান্ত করছিল।

১০২-১০৪ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা হযরত ইউসুফের (আঃ) সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করার পর, কি ভাবে ভ্রাতাগণ তাঁর সাথে দুর্ব্যবহার করে, কিভাবে তার জীবন নাশের চেষ্টা করে, আল্লাহ তাআ’লা এর পর তাঁকে কিভাবে রক্ষা করেন এবং কি ভাবে তাকে উন্নতির উচ্চতর শিখরে আরোহণ করিয়ে দেন, স্বীয় নবীকে (সঃ) বলছেনঃ “এটা এবং এ ধরণের আরো বহু অদৃশ্যের ঘটনা আমার পক্ষ থেকে তোমার কাছে বর্ণনা করা হয়ে থাকে; যাতে মানুষ তার থেকে উপদেশ গ্রহণ করে এবং তোমার বিরুদ্ধবাদীদেরও চক্ষু খুলে যায়। আর যাতে তাদের উপর আমার দলীল প্রমাণ কায়েম হয়ে যায়। যখন ইউসুফের (আঃ) ভ্রাতারা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল এবং কূপে নিক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছিল, তখন তুমি সেখানে উপস্থিত ছিলে না। আমি তোমাকে ওয়াহীর মাধ্যমে জানালাম বলেই তুমি জানতে পারলে।” যেমন হযরত মরিয়মের (আঃ) ঘটনা বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “এটা অদৃশ্য বিষয়ের সংবাদ যা আমি তোমাকে ঐশী বাণী দ্বারা অবহিত করছি। মরিয়মের (আঃ) তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব তাদের মধ্যে কে গ্রহণ করবে এর জন্য যখন তারা তাদের কলমগুলি নিক্ষেপ করছিল তুমি তখন তাদের নিকট ছিলে না এবং তারা যখন বাদানুবাদ করছিল তখনও তুমি তাদের কাছে ছিলে না।” হযরত মুসার (আঃ) ঘটনা প্রসঙ্গেও মহান আল্লাহ বলেনঃ “ (হে নবী সঃ!) ‘জানেবে গারবিয়্যে’ যখন আমি মুসাকে (আঃ) আমার কথা বুঝাচ্ছিলাম তখন তুমি সেখানে বিদ্যমান ছিলে না।” আর এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ “মাদইয়ানবাসীর কার্যাবলীও তোমার কাছে গোপন ছিল (শেষ পর্যন্ত)।” আল্লাহ তাআ’লা আরো বলেনঃ ‘মালায়ে আ’লার পারস্পরিক আলোচনার সময়ও তুমি তথায় বিদ্যমান ছিলে না। এই সব আমার পক্ষ হতে ওয়াহীর মাধ্যমে তোমাকে জানানো হয়েছে। এ হচ্ছে তোমার রিসালাত ও নুবওয়াতের স্পষ্ট দলীল যে, অতীত ঘটনাবলী। তুমি জনগণের সামনে এমনভাবে খুলে খুলে বর্ণনা করছো যে, যেন তুমি ওগুলো স্বচক্ষে দেখেছো এবং তোমার সামনেই সেগুলো সংঘটিত হয়েছে। আবার এই ঘটনাগুলি উপদেশ, শিক্ষা এবং হিকমতে পরিপূর্ণ, যার মাধ্যমে মানুষের দ্বীন ও দুনিয়া সুন্দর হতে পারে। এতদসত্ত্বেও অধিকাংশ মানুষ ঈমান থেকে অজ্ঞ থাকছে। তুমি হাজার চাইলেও এরা ঈমান আনবে না।” এর জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “ (হে নবী (সঃ)! তুমি যদি ভূ-পৃষ্ঠের অধিকাংশ লোকের কথা মত চল তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করে ফেলবে।” প্রত্যেক ঘটনার সাথে সাথে আল্লাহ পাক ঘোষণা করেনঃ “যদিও এতে বড় রকমের নিদর্শন রয়েছে তথাপি অধিকাংশ লোক ঈমান আনে না।” (৬: ১১৬)আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ তুমি তো তাদের কাছে কোন বিনিময় বা পারিশ্রমিক দাবী করছে না। তুমি যে মানুষকে আল্লাহর পথে আহবান করছে এবং এ জন্যে বহু চেষ্টা ও পরিশ্রম করছো এতে পার্থিব কোন লাভ বা উপকার তোমার কাম্য নয়। তোমার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ। এটা সারা বিশ্বজগতের জন্যে উপদেশ ছাড়া কিছু নয়। এর মাধ্যমে দুনিয়াবাসী উপদেশ লাভ করবে, সুপথ প্রাপ্ত হবে এবং পরকালে কঠিন শাস্তি হতে মুক্তি পাবে।

103

وَمَآ أَكْثَرُ ٱلنَّاسِ وَلَوْ حَرَصْتَ بِمُؤْمِنِينَ

আপনি যতই চান, অধিকাংশ লোক বিশ্বাসকারী নয়।

১০২-১০৪ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা হযরত ইউসুফের (আঃ) সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করার পর, কি ভাবে ভ্রাতাগণ তাঁর সাথে দুর্ব্যবহার করে, কিভাবে তার জীবন নাশের চেষ্টা করে, আল্লাহ তাআ’লা এর পর তাঁকে কিভাবে রক্ষা করেন এবং কি ভাবে তাকে উন্নতির উচ্চতর শিখরে আরোহণ করিয়ে দেন, স্বীয় নবীকে (সঃ) বলছেনঃ “এটা এবং এ ধরণের আরো বহু অদৃশ্যের ঘটনা আমার পক্ষ থেকে তোমার কাছে বর্ণনা করা হয়ে থাকে; যাতে মানুষ তার থেকে উপদেশ গ্রহণ করে এবং তোমার বিরুদ্ধবাদীদেরও চক্ষু খুলে যায়। আর যাতে তাদের উপর আমার দলীল প্রমাণ কায়েম হয়ে যায়। যখন ইউসুফের (আঃ) ভ্রাতারা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল এবং কূপে নিক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছিল, তখন তুমি সেখানে উপস্থিত ছিলে না। আমি তোমাকে ওয়াহীর মাধ্যমে জানালাম বলেই তুমি জানতে পারলে।” যেমন হযরত মরিয়মের (আঃ) ঘটনা বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “এটা অদৃশ্য বিষয়ের সংবাদ যা আমি তোমাকে ঐশী বাণী দ্বারা অবহিত করছি। মরিয়মের (আঃ) তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব তাদের মধ্যে কে গ্রহণ করবে এর জন্য যখন তারা তাদের কলমগুলি নিক্ষেপ করছিল তুমি তখন তাদের নিকট ছিলে না এবং তারা যখন বাদানুবাদ করছিল তখনও তুমি তাদের কাছে ছিলে না।” হযরত মুসার (আঃ) ঘটনা প্রসঙ্গেও মহান আল্লাহ বলেনঃ “ (হে নবী সঃ!) ‘জানেবে গারবিয়্যে’ যখন আমি মুসাকে (আঃ) আমার কথা বুঝাচ্ছিলাম তখন তুমি সেখানে বিদ্যমান ছিলে না।” আর এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ “মাদইয়ানবাসীর কার্যাবলীও তোমার কাছে গোপন ছিল (শেষ পর্যন্ত)।” আল্লাহ তাআ’লা আরো বলেনঃ ‘মালায়ে আ’লার পারস্পরিক আলোচনার সময়ও তুমি তথায় বিদ্যমান ছিলে না। এই সব আমার পক্ষ হতে ওয়াহীর মাধ্যমে তোমাকে জানানো হয়েছে। এ হচ্ছে তোমার রিসালাত ও নুবওয়াতের স্পষ্ট দলীল যে, অতীত ঘটনাবলী। তুমি জনগণের সামনে এমনভাবে খুলে খুলে বর্ণনা করছো যে, যেন তুমি ওগুলো স্বচক্ষে দেখেছো এবং তোমার সামনেই সেগুলো সংঘটিত হয়েছে। আবার এই ঘটনাগুলি উপদেশ, শিক্ষা এবং হিকমতে পরিপূর্ণ, যার মাধ্যমে মানুষের দ্বীন ও দুনিয়া সুন্দর হতে পারে। এতদসত্ত্বেও অধিকাংশ মানুষ ঈমান থেকে অজ্ঞ থাকছে। তুমি হাজার চাইলেও এরা ঈমান আনবে না।” এর জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “ (হে নবী (সঃ)! তুমি যদি ভূ-পৃষ্ঠের অধিকাংশ লোকের কথা মত চল তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করে ফেলবে।” প্রত্যেক ঘটনার সাথে সাথে আল্লাহ পাক ঘোষণা করেনঃ “যদিও এতে বড় রকমের নিদর্শন রয়েছে তথাপি অধিকাংশ লোক ঈমান আনে না।” (৬: ১১৬)আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ তুমি তো তাদের কাছে কোন বিনিময় বা পারিশ্রমিক দাবী করছে না। তুমি যে মানুষকে আল্লাহর পথে আহবান করছে এবং এ জন্যে বহু চেষ্টা ও পরিশ্রম করছো এতে পার্থিব কোন লাভ বা উপকার তোমার কাম্য নয়। তোমার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ। এটা সারা বিশ্বজগতের জন্যে উপদেশ ছাড়া কিছু নয়। এর মাধ্যমে দুনিয়াবাসী উপদেশ লাভ করবে, সুপথ প্রাপ্ত হবে এবং পরকালে কঠিন শাস্তি হতে মুক্তি পাবে।

104

وَمَا تَسْـَٔلُهُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ ۚ إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرٌۭ لِّلْعَٰلَمِينَ

আপনি এর জন্যে তাদের কাছে কোন বিনিময় চান না। এটা তো সারা বিশ্বের জন্যে উপদেশ বৈ নয়।

১০২-১০৪ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা হযরত ইউসুফের (আঃ) সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করার পর, কি ভাবে ভ্রাতাগণ তাঁর সাথে দুর্ব্যবহার করে, কিভাবে তার জীবন নাশের চেষ্টা করে, আল্লাহ তাআ’লা এর পর তাঁকে কিভাবে রক্ষা করেন এবং কি ভাবে তাকে উন্নতির উচ্চতর শিখরে আরোহণ করিয়ে দেন, স্বীয় নবীকে (সঃ) বলছেনঃ “এটা এবং এ ধরণের আরো বহু অদৃশ্যের ঘটনা আমার পক্ষ থেকে তোমার কাছে বর্ণনা করা হয়ে থাকে; যাতে মানুষ তার থেকে উপদেশ গ্রহণ করে এবং তোমার বিরুদ্ধবাদীদেরও চক্ষু খুলে যায়। আর যাতে তাদের উপর আমার দলীল প্রমাণ কায়েম হয়ে যায়। যখন ইউসুফের (আঃ) ভ্রাতারা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল এবং কূপে নিক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছিল, তখন তুমি সেখানে উপস্থিত ছিলে না। আমি তোমাকে ওয়াহীর মাধ্যমে জানালাম বলেই তুমি জানতে পারলে।” যেমন হযরত মরিয়মের (আঃ) ঘটনা বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ “এটা অদৃশ্য বিষয়ের সংবাদ যা আমি তোমাকে ঐশী বাণী দ্বারা অবহিত করছি। মরিয়মের (আঃ) তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব তাদের মধ্যে কে গ্রহণ করবে এর জন্য যখন তারা তাদের কলমগুলি নিক্ষেপ করছিল তুমি তখন তাদের নিকট ছিলে না এবং তারা যখন বাদানুবাদ করছিল তখনও তুমি তাদের কাছে ছিলে না।” হযরত মুসার (আঃ) ঘটনা প্রসঙ্গেও মহান আল্লাহ বলেনঃ “ (হে নবী সঃ!) ‘জানেবে গারবিয়্যে’ যখন আমি মুসাকে (আঃ) আমার কথা বুঝাচ্ছিলাম তখন তুমি সেখানে বিদ্যমান ছিলে না।” আর এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ “মাদইয়ানবাসীর কার্যাবলীও তোমার কাছে গোপন ছিল (শেষ পর্যন্ত)।” আল্লাহ তাআ’লা আরো বলেনঃ ‘মালায়ে আ’লার পারস্পরিক আলোচনার সময়ও তুমি তথায় বিদ্যমান ছিলে না। এই সব আমার পক্ষ হতে ওয়াহীর মাধ্যমে তোমাকে জানানো হয়েছে। এ হচ্ছে তোমার রিসালাত ও নুবওয়াতের স্পষ্ট দলীল যে, অতীত ঘটনাবলী। তুমি জনগণের সামনে এমনভাবে খুলে খুলে বর্ণনা করছো যে, যেন তুমি ওগুলো স্বচক্ষে দেখেছো এবং তোমার সামনেই সেগুলো সংঘটিত হয়েছে। আবার এই ঘটনাগুলি উপদেশ, শিক্ষা এবং হিকমতে পরিপূর্ণ, যার মাধ্যমে মানুষের দ্বীন ও দুনিয়া সুন্দর হতে পারে। এতদসত্ত্বেও অধিকাংশ মানুষ ঈমান থেকে অজ্ঞ থাকছে। তুমি হাজার চাইলেও এরা ঈমান আনবে না।” এর জায়গায় রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “ (হে নবী (সঃ)! তুমি যদি ভূ-পৃষ্ঠের অধিকাংশ লোকের কথা মত চল তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করে ফেলবে।” প্রত্যেক ঘটনার সাথে সাথে আল্লাহ পাক ঘোষণা করেনঃ “যদিও এতে বড় রকমের নিদর্শন রয়েছে তথাপি অধিকাংশ লোক ঈমান আনে না।” (৬: ১১৬)আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ তুমি তো তাদের কাছে কোন বিনিময় বা পারিশ্রমিক দাবী করছে না। তুমি যে মানুষকে আল্লাহর পথে আহবান করছে এবং এ জন্যে বহু চেষ্টা ও পরিশ্রম করছো এতে পার্থিব কোন লাভ বা উপকার তোমার কাম্য নয়। তোমার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ। এটা সারা বিশ্বজগতের জন্যে উপদেশ ছাড়া কিছু নয়। এর মাধ্যমে দুনিয়াবাসী উপদেশ লাভ করবে, সুপথ প্রাপ্ত হবে এবং পরকালে কঠিন শাস্তি হতে মুক্তি পাবে।

105

وَكَأَيِّن مِّنْ ءَايَةٍۢ فِى ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضِ يَمُرُّونَ عَلَيْهَا وَهُمْ عَنْهَا مُعْرِضُونَ

অনেক নিদর্শন রয়েছে নভোমন্ডলে ও ভু-মন্ডলে যেগুলোর উপর দিয়ে তারা পথ অতিক্রম করে এবং তারা এসবের দিকে মনোনিবেশ করে না।

১০৫-১০৭ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা সংবাদ দিচ্ছেন যে, ক্ষমতাবান আল্লাহর বহু নিদর্শন, তাঁর একত্বের সাক্ষ্য প্রমাণ রাতদিন মানুষের সামনে রয়েছে। তবুও অধিকাংশ লোক অত্যন্ত বেপরোয়াভাবে এগুলো থেকে উদাসীন ও অমনোযোগী রয়েছে। এই এতবড় ও প্রশস্ত আকাশ, এই বিস্তৃত যমীন, এই উজ্জ্বল নক্ষত্র-রাজি, এই আবর্তনশীল সূর্য ও চন্দ্র, এই গাছ-পালা, পাহাড়-পর্বত, শস্য-ক্ষেত্র, তরঙ্গ পূর্ণ সমুদ্র, প্রবাহিত বাতাস, বিভিন্ন প্রকারের ফল ফলাদি এবং নানা প্রকারের খাদ্য দ্রব্য সর্বশক্তিমান আল্লাহর এই অসংখ্য নিদর্শনাবলী কি জ্ঞানী ব্যক্তির কোন কাজে আসে না যে, এগুলি দ্বারা সে তাঁকে চিনতে পারে, যিনি এক, অমুখাপেক্ষী, অংশীবিহীন, ক্ষমতাবান, চিরঞ্জীব এবং চিরবিদ্যমান? এগুলো দেখে কি-সে তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে না? তাদের অধিকাংশের মাথা এমনভাবে বিগড়ে গেছে যে, তাদের আল্লাহর উপর বিশ্বাস আছে, অথচ তাঁর সাথে শরীক স্থাপন করছে। তারা আসমান ও যমীনের, পাহাড়-পর্বতের এবং দানব ও মানবের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে আল্লাহকেই মানে, অথচ তাঁর সাথে অন্যদেরকেও শরীক করে ফেলে। এই মুশরিকরা হজ্জ করতে আসে এবং ইহরাম বেঁধে ‘লাব্বায়েক' উচ্চারণ করতে করতে বলেঃ “হে আল্লাহ! আপনার কোন শরীক নেই, শরীক যারা আছে তাদেরও মালিক আপনি। তাদের অধিকার ভুক্ত সবকিছুরও মালিক আপনি।”সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, যখন মুশরিকরা বলতো: “হে আল্লাহ! আমরা হাজির আছি, আপনার কোন অংশীদার নেই, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “যথেষ্ট হয়েছে। এর চেয়ে বেশী আর কিছু বলো না।” আল্লাহ তাআ’লা বলেছেন : (আরবি) অর্থাৎ “নিশ্চয় শিরক চরম যুলুম।” (৩১: ১৩) প্রকৃতপক্ষে এটা বড়ই অত্যাচার যে, আল্লাহর সাথে আরো কারো ইবাদত করা হবে। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সবচেয়ে বড় পাপ কোনটি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “তা এই যে, তুমি আল্লাহর জন্যে শরীক স্থাপন করবে, অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।”হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতের মধ্যে মুনাফিকরাও এসে পড়ে। তাদের আমলে একনিষ্ঠতা ও আন্তরিকতা থাকে না। বরং তাদের মধ্যে রিয়াকারী ও লোক দেখানো ভাব থাকে। রিয়াকারীও শির্‌কের অন্তর্ভুক্ত। কুরআন কারীম ঘোষণা করেঃ (আরবি)অর্থাৎ “মুনাফিকরা আল্লাহকে প্রতারিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে তারা নিজেরাই প্রতারিত হয়। তারা যখন নামাযে দাঁড়ায় তখন অত্যন্ত অলসভাবে দাঁড়ায়, তাদের উদ্দেশ্য হয় শুধু লোক দেখানো। তারা আল্লাহর যিকর খুব কমই করে।” (৪: ১৪২) এটাও স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, কতকগুলি শির্‌ক খুবই হালকা ও গোপনীয় হয়। স্বয়ং শির্‌ককারীও ওটা বুঝতে পারে না। হযরত হুযাইফা (রাঃ) একজন রুগ্ন ব্যক্তির নিকট গমন করেন। তার হাতে একটা সূতা বাঁধা ছিল। তিনি ওটা দেখে ছিঁড়ে ফেলেন এবং বলেনঃ “মু'মিন হয়েও শিরক করছো?” অর্থাৎ তিনি এ আয়াতটিই পাঠ করেন। হাদীস শরীফে আছে যে, যে ব্যক্তি গায়রুল্লাহর কসম খেলো সে মুশরিয্‌ক হয়ে গেল। (এ হাদীসটি ইমাম তিরমযী (রঃ) হযরত ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। এবং তিনি এটাকে হাসান বলেছে)হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঝাড়-ফুঁক, সূতা, এবং মিথ্যা তাবীজ শির্‌ক।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) প্রভৃতি গুরুজন বর্ণনা করেছেন) তিনি আরো বলেছেনঃ “বান্দার নির্ভরশীলতার কারণে আল্লাহ তাআ’লা তার সমস্ত বিপদ আপদ দূর করে থাকেন।” হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদের স্ত্রী হযরত যায়নাব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “ (আমার স্বামী) হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) এর অভ্যাস ছিল এই যে, যখন বাইরে থেকে বাড়ীতে প্রবেশ করতেন তখন তিনি গলা খাকড়াতেন এবং থুথু ফেলতেন। যাতে বাড়ীর লোকেরা তাঁর আগমনের ইঙ্গিত পেতে পারে এবং তিনি যেন তাদেরকে এমন অবস্থায় না দেখেন যা তিনি অপছন্দ …

106

وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُم بِٱللَّهِ إِلَّا وَهُم مُّشْرِكُونَ

অনেক মানুষ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, কিন্তু সাথে সাথে শিরকও করে।

১০৫-১০৭ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা সংবাদ দিচ্ছেন যে, ক্ষমতাবান আল্লাহর বহু নিদর্শন, তাঁর একত্বের সাক্ষ্য প্রমাণ রাতদিন মানুষের সামনে রয়েছে। তবুও অধিকাংশ লোক অত্যন্ত বেপরোয়াভাবে এগুলো থেকে উদাসীন ও অমনোযোগী রয়েছে। এই এতবড় ও প্রশস্ত আকাশ, এই বিস্তৃত যমীন, এই উজ্জ্বল নক্ষত্র-রাজি, এই আবর্তনশীল সূর্য ও চন্দ্র, এই গাছ-পালা, পাহাড়-পর্বত, শস্য-ক্ষেত্র, তরঙ্গ পূর্ণ সমুদ্র, প্রবাহিত বাতাস, বিভিন্ন প্রকারের ফল ফলাদি এবং নানা প্রকারের খাদ্য দ্রব্য সর্বশক্তিমান আল্লাহর এই অসংখ্য নিদর্শনাবলী কি জ্ঞানী ব্যক্তির কোন কাজে আসে না যে, এগুলি দ্বারা সে তাঁকে চিনতে পারে, যিনি এক, অমুখাপেক্ষী, অংশীবিহীন, ক্ষমতাবান, চিরঞ্জীব এবং চিরবিদ্যমান? এগুলো দেখে কি-সে তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে না? তাদের অধিকাংশের মাথা এমনভাবে বিগড়ে গেছে যে, তাদের আল্লাহর উপর বিশ্বাস আছে, অথচ তাঁর সাথে শরীক স্থাপন করছে। তারা আসমান ও যমীনের, পাহাড়-পর্বতের এবং দানব ও মানবের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে আল্লাহকেই মানে, অথচ তাঁর সাথে অন্যদেরকেও শরীক করে ফেলে। এই মুশরিকরা হজ্জ করতে আসে এবং ইহরাম বেঁধে ‘লাব্বায়েক' উচ্চারণ করতে করতে বলেঃ “হে আল্লাহ! আপনার কোন শরীক নেই, শরীক যারা আছে তাদেরও মালিক আপনি। তাদের অধিকার ভুক্ত সবকিছুরও মালিক আপনি।”সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, যখন মুশরিকরা বলতো: “হে আল্লাহ! আমরা হাজির আছি, আপনার কোন অংশীদার নেই, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “যথেষ্ট হয়েছে। এর চেয়ে বেশী আর কিছু বলো না।” আল্লাহ তাআ’লা বলেছেন : (আরবি) অর্থাৎ “নিশ্চয় শিরক চরম যুলুম।” (৩১: ১৩) প্রকৃতপক্ষে এটা বড়ই অত্যাচার যে, আল্লাহর সাথে আরো কারো ইবাদত করা হবে। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সবচেয়ে বড় পাপ কোনটি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “তা এই যে, তুমি আল্লাহর জন্যে শরীক স্থাপন করবে, অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।”হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতের মধ্যে মুনাফিকরাও এসে পড়ে। তাদের আমলে একনিষ্ঠতা ও আন্তরিকতা থাকে না। বরং তাদের মধ্যে রিয়াকারী ও লোক দেখানো ভাব থাকে। রিয়াকারীও শির্‌কের অন্তর্ভুক্ত। কুরআন কারীম ঘোষণা করেঃ (আরবি)অর্থাৎ “মুনাফিকরা আল্লাহকে প্রতারিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে তারা নিজেরাই প্রতারিত হয়। তারা যখন নামাযে দাঁড়ায় তখন অত্যন্ত অলসভাবে দাঁড়ায়, তাদের উদ্দেশ্য হয় শুধু লোক দেখানো। তারা আল্লাহর যিকর খুব কমই করে।” (৪: ১৪২) এটাও স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, কতকগুলি শির্‌ক খুবই হালকা ও গোপনীয় হয়। স্বয়ং শির্‌ককারীও ওটা বুঝতে পারে না। হযরত হুযাইফা (রাঃ) একজন রুগ্ন ব্যক্তির নিকট গমন করেন। তার হাতে একটা সূতা বাঁধা ছিল। তিনি ওটা দেখে ছিঁড়ে ফেলেন এবং বলেনঃ “মু'মিন হয়েও শিরক করছো?” অর্থাৎ তিনি এ আয়াতটিই পাঠ করেন। হাদীস শরীফে আছে যে, যে ব্যক্তি গায়রুল্লাহর কসম খেলো সে মুশরিয্‌ক হয়ে গেল। (এ হাদীসটি ইমাম তিরমযী (রঃ) হযরত ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। এবং তিনি এটাকে হাসান বলেছে)হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঝাড়-ফুঁক, সূতা, এবং মিথ্যা তাবীজ শির্‌ক।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) প্রভৃতি গুরুজন বর্ণনা করেছেন) তিনি আরো বলেছেনঃ “বান্দার নির্ভরশীলতার কারণে আল্লাহ তাআ’লা তার সমস্ত বিপদ আপদ দূর করে থাকেন।” হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদের স্ত্রী হযরত যায়নাব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “ (আমার স্বামী) হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) এর অভ্যাস ছিল এই যে, যখন বাইরে থেকে বাড়ীতে প্রবেশ করতেন তখন তিনি গলা খাকড়াতেন এবং থুথু ফেলতেন। যাতে বাড়ীর লোকেরা তাঁর আগমনের ইঙ্গিত পেতে পারে এবং তিনি যেন তাদেরকে এমন অবস্থায় না দেখেন যা তিনি অপছন্দ …

107

أَفَأَمِنُوٓا۟ أَن تَأْتِيَهُمْ غَٰشِيَةٌۭ مِّنْ عَذَابِ ٱللَّهِ أَوْ تَأْتِيَهُمُ ٱلسَّاعَةُ بَغْتَةًۭ وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ

তারা কি নির্ভীক হয়ে গেছে এ বিষয়ে যে, আল্লাহর আযাবের কোন বিপদ তাদেরকে আবৃত করে ফেলবে অথবা তাদের কাছে হঠাৎ কেয়ামত এসে যাবে, অথচ তারা টেরও পাবে না?

১০৫-১০৭ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা সংবাদ দিচ্ছেন যে, ক্ষমতাবান আল্লাহর বহু নিদর্শন, তাঁর একত্বের সাক্ষ্য প্রমাণ রাতদিন মানুষের সামনে রয়েছে। তবুও অধিকাংশ লোক অত্যন্ত বেপরোয়াভাবে এগুলো থেকে উদাসীন ও অমনোযোগী রয়েছে। এই এতবড় ও প্রশস্ত আকাশ, এই বিস্তৃত যমীন, এই উজ্জ্বল নক্ষত্র-রাজি, এই আবর্তনশীল সূর্য ও চন্দ্র, এই গাছ-পালা, পাহাড়-পর্বত, শস্য-ক্ষেত্র, তরঙ্গ পূর্ণ সমুদ্র, প্রবাহিত বাতাস, বিভিন্ন প্রকারের ফল ফলাদি এবং নানা প্রকারের খাদ্য দ্রব্য সর্বশক্তিমান আল্লাহর এই অসংখ্য নিদর্শনাবলী কি জ্ঞানী ব্যক্তির কোন কাজে আসে না যে, এগুলি দ্বারা সে তাঁকে চিনতে পারে, যিনি এক, অমুখাপেক্ষী, অংশীবিহীন, ক্ষমতাবান, চিরঞ্জীব এবং চিরবিদ্যমান? এগুলো দেখে কি-সে তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে না? তাদের অধিকাংশের মাথা এমনভাবে বিগড়ে গেছে যে, তাদের আল্লাহর উপর বিশ্বাস আছে, অথচ তাঁর সাথে শরীক স্থাপন করছে। তারা আসমান ও যমীনের, পাহাড়-পর্বতের এবং দানব ও মানবের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে আল্লাহকেই মানে, অথচ তাঁর সাথে অন্যদেরকেও শরীক করে ফেলে। এই মুশরিকরা হজ্জ করতে আসে এবং ইহরাম বেঁধে ‘লাব্বায়েক' উচ্চারণ করতে করতে বলেঃ “হে আল্লাহ! আপনার কোন শরীক নেই, শরীক যারা আছে তাদেরও মালিক আপনি। তাদের অধিকার ভুক্ত সবকিছুরও মালিক আপনি।”সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, যখন মুশরিকরা বলতো: “হে আল্লাহ! আমরা হাজির আছি, আপনার কোন অংশীদার নেই, তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলতেনঃ “যথেষ্ট হয়েছে। এর চেয়ে বেশী আর কিছু বলো না।” আল্লাহ তাআ’লা বলেছেন : (আরবি) অর্থাৎ “নিশ্চয় শিরক চরম যুলুম।” (৩১: ১৩) প্রকৃতপক্ষে এটা বড়ই অত্যাচার যে, আল্লাহর সাথে আরো কারো ইবাদত করা হবে। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! সবচেয়ে বড় পাপ কোনটি?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “তা এই যে, তুমি আল্লাহর জন্যে শরীক স্থাপন করবে, অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।”হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এই আয়াতের মধ্যে মুনাফিকরাও এসে পড়ে। তাদের আমলে একনিষ্ঠতা ও আন্তরিকতা থাকে না। বরং তাদের মধ্যে রিয়াকারী ও লোক দেখানো ভাব থাকে। রিয়াকারীও শির্‌কের অন্তর্ভুক্ত। কুরআন কারীম ঘোষণা করেঃ (আরবি)অর্থাৎ “মুনাফিকরা আল্লাহকে প্রতারিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে তারা নিজেরাই প্রতারিত হয়। তারা যখন নামাযে দাঁড়ায় তখন অত্যন্ত অলসভাবে দাঁড়ায়, তাদের উদ্দেশ্য হয় শুধু লোক দেখানো। তারা আল্লাহর যিকর খুব কমই করে।” (৪: ১৪২) এটাও স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, কতকগুলি শির্‌ক খুবই হালকা ও গোপনীয় হয়। স্বয়ং শির্‌ককারীও ওটা বুঝতে পারে না। হযরত হুযাইফা (রাঃ) একজন রুগ্ন ব্যক্তির নিকট গমন করেন। তার হাতে একটা সূতা বাঁধা ছিল। তিনি ওটা দেখে ছিঁড়ে ফেলেন এবং বলেনঃ “মু'মিন হয়েও শিরক করছো?” অর্থাৎ তিনি এ আয়াতটিই পাঠ করেন। হাদীস শরীফে আছে যে, যে ব্যক্তি গায়রুল্লাহর কসম খেলো সে মুশরিয্‌ক হয়ে গেল। (এ হাদীসটি ইমাম তিরমযী (রঃ) হযরত ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। এবং তিনি এটাকে হাসান বলেছে)হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ঝাড়-ফুঁক, সূতা, এবং মিথ্যা তাবীজ শির্‌ক।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) ও ইমাম আবু দাউদ (রঃ) প্রভৃতি গুরুজন বর্ণনা করেছেন) তিনি আরো বলেছেনঃ “বান্দার নির্ভরশীলতার কারণে আল্লাহ তাআ’লা তার সমস্ত বিপদ আপদ দূর করে থাকেন।” হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদের স্ত্রী হযরত যায়নাব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “ (আমার স্বামী) হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) এর অভ্যাস ছিল এই যে, যখন বাইরে থেকে বাড়ীতে প্রবেশ করতেন তখন তিনি গলা খাকড়াতেন এবং থুথু ফেলতেন। যাতে বাড়ীর লোকেরা তাঁর আগমনের ইঙ্গিত পেতে পারে এবং তিনি যেন তাদেরকে এমন অবস্থায় না দেখেন যা তিনি অপছন্দ …

108

قُلْ هَٰذِهِۦ سَبِيلِىٓ أَدْعُوٓا۟ إِلَى ٱللَّهِ ۚ عَلَىٰ بَصِيرَةٍ أَنَا۠ وَمَنِ ٱتَّبَعَنِى ۖ وَسُبْحَٰنَ ٱللَّهِ وَمَآ أَنَا۠ مِنَ ٱلْمُشْرِكِينَ

বলে দিনঃ এই আমার পথ। আমি আল্লাহর দিকে বুঝে সুঝে দাওয়াত দেই আমি এবং আমার অনুসারীরা। আল্লাহ পবিত্র। আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই।

সমস্ত দানব ও মানবের প্রতি প্রেরিত রাসূলকে (সঃ) আল্লাহ তাআ’লা নির্দেশ দিচ্ছেনঃ জনগণকে তুমি খবর দিয়ে দাওঃ আমার নীতি, আমার পন্থা এবং আমার সুন্নাত এই যে, আমি সাধারণভাবে আল্লাহর একত্ববাদ প্রচার করবো। পরিপূর্ণ বিশ্বাস, দলীল প্রমাণ এবং বিচক্ষণতার সাথে আমি সকলকে ঐ দিকে আহবান করছি। আমার যতগুলি অনুসারী রয়েছে তারাও সবাই ঐ দিকেই আহবান করছে। তারা সবাই মিলে শরীয়ত সম্মত ও জ্ঞান সম্মত দলীল প্রমাণের মাধ্যমে ঐ দিকে ডাক দিচ্ছে। আমরা আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করি। আমরা তারই মর্যাদা, পবিত্রতা এবং গুণগান বর্ণনা করে থাকি। আমরা তাকে শরীক, তুলনীয়, সমকক্ষ, উযীর, পরামর্শদাতা এবং সর্বপ্রকারের দুর্বলতা ও ক্রটি থেকে পবিত্র বলে বিশ্বাস করি। আমরা বিশ্বাস করি যে, তার কোন সন্তান নেই, স্ত্রী নেই এবং কোন সমকক্ষ নেই। তিনি এসব জঘন্য বিষয় থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও পবিত্র। আসমান ও যমীন এবং এতোদুভয়ের সমস্ত মাখলুক তার প্রশংসা ও গুণ কীর্তন করে থাকে। কিন্তু মানুষ এ গুলি বুঝতে পারে না। আল্লাহ অত্যন্ত সহনশীল ও ক্ষমাশীল।

109

وَمَآ أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ إِلَّا رِجَالًۭا نُّوحِىٓ إِلَيْهِم مِّنْ أَهْلِ ٱلْقُرَىٰٓ ۗ أَفَلَمْ يَسِيرُوا۟ فِى ٱلْأَرْضِ فَيَنظُرُوا۟ كَيْفَ كَانَ عَٰقِبَةُ ٱلَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ ۗ وَلَدَارُ ٱلْءَاخِرَةِ خَيْرٌۭ لِّلَّذِينَ ٱتَّقَوْا۟ ۗ أَفَلَا تَعْقِلُونَ

আপনার পূর্বে আমি যতজনকে রসূল করে পাঠিয়েছি, তারা সবাই পুরুষই ছিল জনপদবাসীদের মধ্য থেকে। আমি তাঁদের কাছে ওহী প্রেরণ করতাম। তারা কি দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করে না, যাতে দেখে নিত কিরূপ পরিণতি হয়েছে তাদের যারা পূর্বে ছিল ? সংযমকারীদের জন্যে পরকালের আবাসই উত্তম। তারা কি এখনও বোঝে না?

আল্লাহ তাআ’লা খবর দিচ্ছেন যে, তিনি রাসূল ও নবী হিসেবে দুনিয়ায় পুরুষ লোককেই পাঠিয়েছেন। স্ত্রীলোকদেরকে নয়। জমহুর আলেমদের উক্তি এটাই যে, নুবওয়াত কখনো নারীদেরকে দান করা হয় নাই। এই আয়াতের ধরণেও এটাই প্রমাণিত হয়। কিন্তু কোন কোন আলেমের উক্তি এই যে, হযরত ইবরাহীমের (আঃ) স্ত্রী হযরত সারা (আঃ) হযরত মূসার (আঃ) মাতা এবং হযরত ঈসার (আঃ) মাতা মারইয়ামও (আঃ) নবী ছিলেন। ফেরেশতাগণ হযরত সারা (আঃ) কে তার পুত্র হযরত ইসহাক (আঃ) এবং পৌত্র হযরত ইয়াকুবের (আঃ) সুসংবাদ দিয়েছিলেন। হযরত মূসার (আঃ) মাতার নিকট তাঁকে দুধ পান করাবার ওয়াহী করা হয়। হযরত মারইয়ামকে (আঃ) ফেরেশতাগণ তাঁর পুত্র হযরত ঈসার (আঃ) সুসংবাদ দিয়েছিলেন। ফেরেশতাগণ তাকে বলেছিলেনঃ “হে মারইয়াম (আঃ)! আল্লাহ তোমাকে মনোনীত ও পবিত্র করেছেন এবং বিশ্বের নারীদের মধ্যে তোমাকে মনোনীত করেছেন। হে মারইয়াম (আঃ) তোমার প্রতিপালকের অনুগত হও ও সিজদা কর, এবং যারা রুকু করে তাদের সাথে রুকু’ কর।” এর উত্তর এই যে, কুরআন কারীমে যেটুকু বর্ণনা রয়েছে তা আমরা বিনা বাক্য ব্যয়ে স্বীকার করে নিচ্ছি। কিন্তু এর দ্বারা তাদের নুবওয়াত প্রমাণিত হয় না। শুধু এইটুকু ফরমান বা এইটুকু শুভ সংবাদ অথবা এইটুকু হুকুম কারো নুবওয়াতের জন্যে দলীল নয়। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সবারই মাযহাব এটাই যে, নারীদের মধ্যে কেউই নবী হন নাই। হ্যাঁ তবে তাঁদের মধ্যে সিদ্দিকা বা সত্যবাদিণী রয়েছেন। যেমন সর্বাপেক্ষা সম্ভ্রান্ত বংশীয়া ও মর্যাদা সম্পন্না স্ত্রীলোক মারইয়াম (আঃ) সম্পর্কে কুরআন কারীমে ঘোষিত হয়েছেঃ (আরবি) অর্থাৎ “তার (হযরত ঈসার (আঃ) মা হচ্ছে সিদ্দীকা বা চরম সত্যবাদিনী।” সুতরাং যদি তিনি নবী হতেন তবে এই জায়গায় তাকে এটাই বলা হতো।আয়াতটির ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, যমীনে বসবাসকারী মানুষই নবী হয়ে থাকেন, এটা নয় যে, আকাশ হতে কোন ফেরেশতা অবতীর্ণ হন। যেমন এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “(হে নবী সঃ)! তোমার পূর্বে আমি যে রাসূলদেরকে প্রেরণ করেছিলাম তারা অবশ্যই খাদ্য খেতো এবং বাজারে চলাফেরা করতো।” (২৫: ২০) তারা এইরূপ দেহ বিশিষ্ট ছিলেন না যে, খাদ্য গ্রহণ থেকে পবিত্র থাকবেন। তারা এমনও ছিলেন না যে, মৃত্যু তাদেরকে পেয়ে বসবে না। তারা বাজারেও চলাফেরা করতেন। আল্লাহ তাদের সাথে কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেছেন। তিনি তাঁদের সাথে যাদেরকে ইচ্ছা মুক্তি দিয়েছেন এবং সীমালংঘনকারী লোকদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। এক আয়াতে আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “ (হে নবী (সঃ)! তুমি বলঃ আমি তো প্রথম রাসূল নই।” (৪৬: ৯) এ কথা জেনে রাখা প্রয়োজন যে, এখানে ‘গ্রামবাসী’ দ্বারা শহরবাসী উদ্দেশ্য। কেননা, গ্রামবাসী বড়ই বক্র স্বভাব ও দুশ্চরিত্র হয়ে থাকে। এটা সর্বজন বিদিত যে, শহরবাসী হয় কোমল অন্তর ও মহৎ চরিত্রের অধিকারী। অনুরূপভাবে জনপদ হতে দূরে তাঁবুতে বসবাসকারী বেদুঈনরাও অত্যন্ত কঠোর স্বভাবের হয়ে থাকে। এ জন্যেই আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “মরুবাসী বেদুঈনরা কুফরী ও নিফাকে খুবই কঠিন।” (৯: ৯৭) কাতাদা’'ও (রঃ) এই ভাবার্থ বর্ণনা করেছেন। কেননা, শহরের লোকদের মধ্যে বিদ্যা ও ধৈর্য বেশি থাকে।একটি হাদীসে এসেছে যে, এক মরুবাসী বেদুঈন রাসূলুল্লাহর (সঃ) সমিনে কিছু হাদিয়া পেশ করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে ওর বিনিময় প্রদান করেন। সে কিন্তু ওটাকে খুবই কম মনে করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে আরো দেন এবং শেষ পর্যন্ত তাকে খুশী করেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ “আমি ইচ্ছা করছি যে, আমি কুরায়েশ, আনসারী, সাকাথী এবং দাওসী গোত্রের লোক ছাড়া আর কারো উপঢৌকন গ্রহণ করবো না।”হযরত আ’মাশ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “যে মুমিনমু’মিন লোকদের সাথে মেলামেশা করে এবং তাদের দেয়া কষ্টের উপর ধৈর্য ধারণ করে সে ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা উত্তম যে লোকদের সাথে মেলামেশা করে না এবং তাদের দেয়া কষ্টের উপর ধৈর্য ধারণও করে না।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ …

110

حَتَّىٰٓ إِذَا ٱسْتَيْـَٔسَ ٱلرُّسُلُ وَظَنُّوٓا۟ أَنَّهُمْ قَدْ كُذِبُوا۟ جَآءَهُمْ نَصْرُنَا فَنُجِّىَ مَن نَّشَآءُ ۖ وَلَا يُرَدُّ بَأْسُنَا عَنِ ٱلْقَوْمِ ٱلْمُجْرِمِينَ

এমনকি যখন পয়গম্বরগণ নৈরাশ্যে পতিত হয়ে যেতেন, এমনকি এরূপ ধারণা করতে শুরু করতেন যে, তাদের অনুমান বুঝি মিথ্যায় পরিণত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তখন তাদের কাছে আমার সাহায্য পৌছে। অতঃপর আমি যাদের চেয়েছি তারা উদ্ধার পেয়েছে। আমার শাস্তি অপরাধী সম্প্রদায় থেকে প্রতিহত হয় না।

আল্লাহ তাআ’লা বর্ণনা করছেন যে, সংকীর্ণ অবস্থায় রাসূলদের উপর তার সাহায্য অবতীর্ণ হয়। যখন আল্লাহর নবীদেরকে চতুর্দিক থেকে পরিবেষ্টন করে ফেলা হয় তখন তাদের উপর আল্লাহর সাহায্য এসে পড়ে (আরবি) এবং (আরবি) এই দু’টি কিরআত রয়েছে। হযরত আয়েশার (রাঃ) কিরআত '(আরবি)' অক্ষরে তাশদীদ দিয়ে রয়েছে। হযরত উরওয়া ইবনু যুবাইর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি হযরত আয়েশাকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “এই শব্দটি” (আরবি) না (আরবি)? হযরত আয়েশা (রাঃ) উত্তরে বলেনঃ (আরবি) পড়তে হবে।” তিনি পুনরায় বলেনঃ “তা হলে তো এর অর্থ দাঁড়ায়ঃ রাসূলগণ ধারণা করেন যে, তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হয়েছে। তবে এই ধারণা করার অর্থ কি হতে পারে? এটা তো নিশ্চিত কথা যে, তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হচ্ছিল।” উত্তরে হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “অবশ্যই এটা নিশ্চিত কথা যে, কাফিরদের পক্ষ থেকে তাঁদেরকে মিথ্যাবাদী মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু এমন সময়ও এসে গেল যে, ঈমানদার উম্মতগণও সন্দেহের মধ্যে পতিত হয়ে গেল এবং সাহায্য আসতে এতো বিলম্ব হলো যে, স্বাভাবিকভাবে রাসূলগণও মনে করতে লাগলেন যে, তাঁদের মুমিনমু’মিন দলগুলিও হয়তো তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে শুরু করেছে। এমতাবস্থায় আল্লাহ তাআ’লার সাহায্য এসে পড়লো এবং তাঁরা বিজয় লাভ করলেন। তুমি একটু চিন্তা করে দেখ তো যে, (আরবি) কি করে ঠিক হতে পারে? রাসূলদের মনে কি কখনো এ ধারণা জাগতে পারে যে, তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে মিথ্যা কথা বলা হয়েছে? আমরা এর থেকে আল্লাহ তাআ’লার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) এটাকে (আরবি) পড়তেন এবং এর দলীল হিসেবে নিম্নের আয়াতটি পাঠ করতেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “(পরিস্থিতি এইরূপ দাঁড়ালো যে,) শেষ পর্যন্ত রাসূল ও তার সঙ্গীয় মুমিনমু’মিনরা বলে উঠলো: কখন আল্লাহর সাহায্য আসবে? (তখন আল্লাহ তাআ’লা বললেনঃ) জেনে রেখোঁরেখো যে, আল্লাহর সাহায্য অতি নিকটবর্তী।” (২৪: ২১৬) হযরত আয়েশা (রাঃ) এটাকে কঠোরভাবে অস্বীকার করতেন এবং বলতেনঃ “আল্লাহ তাআ’লা রাসূলুল্লাহর (সঃ) সাথে যতগুলি অঙ্গীকার করেছিলেন, তার দৃঢ় প্রত্যয় ও বিশ্বাস ছিল ঐ সবগুলিই নিশ্চিত রূপে পরিপূর্ণ হবে। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তার অন্তরে এরূপ ধারণা জাগ্রত হয় নাই যে, না জানি হয়তো আল্লাহ তাআ’লার কোন ওয়াদা ভুল প্রমাণিত হবে বা হয়তো পূর্ণ হবে না। হ্যাঁ, তবে নবীদের উপর বিপদ-আপদ আসতে থেকেছে এবং শেষ পর্যন্ত তারা আশঙ্কা করে বসেছেন যে, না জানি হয়তো তাঁদের অনুসারীরাও তাদের উপর বদ-ধারণা করে তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে বসবে।” ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি লোক কাসিম ইবনু মুহাম্মদের (রঃ) কাছে এসে তাঁকে বলেঃ “মুহাম্মদ ইবনু কা'ব কারাযী (রঃ) (আরবি) পড়ে থাকেন।” তখন তিনি লোকটিকে বলেনঃ “তাঁকে তুমি বলবেঃ আমি (কাসিম ইবনু মুহাম্মদ) রাসূলুল্লাহর (সঃ) সহধর্মিনী হযরত আয়েশাকে (রাঃ) (আরবি) পড়তে শুনেছি। অর্থাৎ তাঁদের অনুসারীরা তাঁদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে।” (এটা ইবনু আবি হা’তিম (রাঃ) বর্ণনা করেছেন)সুতরাং একটি কিরআত আছে তাশদীদের সঙ্গে এবং একটি কিরআত আছে তাফীফের সঙ্গে (অর্থাৎ "(আরবি)" অক্ষরের নীচে শুধু যের, উপরে তাব্দীদ নয়)। তাশদীদ বিহীন অবস্থায় যে তাফসীর হযরত ইবনু আব্বাস। (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে তা তো উপরে উল্লেখিত হয়েছে। হযরত ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি এই আয়াতটিকে এভাবেই পড়তেন অর্থাৎ (আরবি) পড়তেন। আর তিনি এটা এভাবে পাঠ করে বলেনঃ “কারণ এটাই যা তুমি অপছন্দ কর।” এই রিওয়াইয়াতটি ঐ রিওয়াইয়াতের বিপরীত যা এই দুই মহান ব্যক্তি হতে অন্যেরা রিওয়াইয়াত করেছেন। তাতে রয়েছে যে, হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ যখন রাসুলগণ তাঁদের সম্প্রদায়ের লোকদের আনুগত্য হতে নিরাশ হয়ে যান এবং তাদের সম্প্রদায়ের লোকেরা মনে করে নেয় যে, নবীরা তাদেরকে মিথ্যা কথা বলেছেন, তখনই আল্লাহর সাহায্য এসে …

Commentary: Tafsir Ibn Kathir by Hafiz Ibn Kathir (Tawheed Publication). Qur'an text and translation via AlQuran Cloud.