Muslim99Muslim99
← Tafsir library

11. Hud

Hud · Meccan · 123 ayahs

سُورَةُ هُودٍ

Reading Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation

Ayahs 11–20 of 123

11

إِلَّا ٱلَّذِينَ صَبَرُوا۟ وَعَمِلُوا۟ ٱلصَّٰلِحَٰتِ أُو۟لَٰٓئِكَ لَهُم مَّغْفِرَةٌۭ وَأَجْرٌۭ كَبِيرٌۭ

তবে যারা ধৈর্য্যধারণ করেছে এবং সৎকার্য করেছে তাদের জন্য ক্ষমা ও বিরাট প্রতিদান রয়েছে।

কিন্তু যারা ধৈর্য ধরে ও ভাল কাজ করে (তারা এরূপ হয় না); এমন লোকদের জন্য রয়েছে ক্ষমা এবং মহা প্রতিদান। [১]

[১] অর্থাৎ, মু'মিনগণ সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে থাকুক বা দুঃখ-কষ্টে থাকুক উভয় অবস্থাতেই তারা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করেন। যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবী (সাঃ) শপথ করে বলেছেন, "সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ আছে! আল্লাহ তাআলা মু'মিনদের জন্য যে ফায়সালাই করেন, তাদের ভালোর জন্যই করেন। যদি সে সুখ লাভ করে, তাহলে তার উপর সে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, যা তার জন্য মঙ্গলময় (অর্থাৎ, নেকীর কারণ হয়)। আর যদি কোন দুঃখ-কষ্ট পায়, তাহলে ধৈর্য ধারণ করে, আর এটাও তাঁর জন্য মঙ্গলময় (অর্থাৎ, নেকীর কারণ) হয়। এই বৈশিষ্ট্য একজন মু'মিন ব্যতীত অন্য কারো নয়।" (মুসলিম) অন্য আরো একটি হাদীসে বলেন যে, "একজন মু'মিন যখন কোন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয় এবং কষ্ট পায়, এমনকি তার পায়ে কাঁটা প্রবিষ্ট হয়, তখন আল্লাহ তাআলা তার কারণে তাঁর গুনাহ মাফ করে দেন।"(আহমাদ ৩/৪) সূরা মাআরিজের ৭০:১৯-২২ নং আয়াতেও এই বিষয়টি বর্ণনা করা হয়েছে।)

12

فَلَعَلَّكَ تَارِكٌۢ بَعْضَ مَا يُوحَىٰٓ إِلَيْكَ وَضَآئِقٌۢ بِهِۦ صَدْرُكَ أَن يَقُولُوا۟ لَوْلَآ أُنزِلَ عَلَيْهِ كَنزٌ أَوْ جَآءَ مَعَهُۥ مَلَكٌ ۚ إِنَّمَآ أَنتَ نَذِيرٌۭ ۚ وَٱللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَىْءٍۢ وَكِيلٌ

আর সম্ভবতঃ ঐসব আহকাম যা ওহীর মাধ্যমে তোমার নিকট পাঠানো হয়, তার কিছু অংশ বর্জন করবে? এবং এতে মন ছোট করে বসবে? তাদের এ কথায় যে, তাঁর উপর কোন ধন-ভান্ডার কেন অবতীর্ণ হয়নি? অথবা তাঁর সাথে কোন ফেরেশতা আসেনি কেন? তুমিতো শুধু সতর্ককারী মাত্র; আর সব কিছুরই দায়িত্বভার তো আল্লাহই নিয়েছেন।

তোমার নিকট যা অহী (প্রত্যাদেশ) করা হয়, সম্ভবতঃ তুমি হয়তো তার কিছু অংশ বর্জন করবে এবং ‘তার প্রতি কোন ধনভান্ডার অবতীর্ণ করা হয়নি কেন? অথবা তার সাথে কোন ফিরিশতা আসেনি কেন?’ তাদের এই কথায় তোমার মন সঙ্কুচিত হবে। (কিন্তু হে নবী!) তুমি তো শুধুমাত্র একজন সতর্ককারী।[১] আর আল্লাহই হচ্ছেন প্রত্যেক বস্তুর উপর দায়িত্বশীল।

[১] মুশরিকরা নবী (সাঃ) সম্পর্কে বলত যে, তাঁর উপর কোন ফিরিশতা অবতীর্ণ করা হয় না কেন? কিংবা তাঁর নিকট কোন ধনভান্ডার অবতীর্ণ করা হয় না কেন। (সূরা ফুরক্বান ২৫:৭-৮) অন্য এক স্থানে বলা হয়েছে "আমি জানি যে, তারা তোমার ব্যাপারে যে কথা বলে, তাতে তোমার হৃদয় সংকুচিত হয়।" (সূরা হিজর ১৫:৯৭) এই আয়াতে ঐ সকল উক্তি সম্পর্কে বলা হচ্ছে যে, সম্ভবতঃ তাতে তোমার হৃদয় সংকুচিত হয়, আর কিছু কথা যা তোমার নিকট অহী করা হয়, তা মুশরিকদের উপর কষ্টকর মনে হয়, হতে পারে যে, তুমি তা তাদেরকে শুনাতে পছন্দ করবে না। কিন্তু তোমার কাজ শুধু সতর্ক ও তবলীগ করা, তা তুমি সর্বাবস্থায় চালিয়ে যাও।

13

أَمْ يَقُولُونَ ٱفْتَرَىٰهُ ۖ قُلْ فَأْتُوا۟ بِعَشْرِ سُوَرٍۢ مِّثْلِهِۦ مُفْتَرَيَٰتٍۢ وَٱدْعُوا۟ مَنِ ٱسْتَطَعْتُم مِّن دُونِ ٱللَّهِ إِن كُنتُمْ صَٰدِقِينَ

তারা কি বলে? কোরআন তুমি তৈরী করেছ? তুমি বল, তবে তোমরাও অনুরূপ দশটি সূরা তৈরী করে নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া যাকে পার ডেকে নাও, যদি তোমাদের কথা সত্য হয়ে থাকে।

তবে কি তারা বলে যে, ওটা সে নিজে রচনা করেছে? বল, ‘তাহলে তোমরাও ওর অনুরূপ স্বরচিত দশটি সূরা আনয়ন কর এবং (সাহায্যার্থে) আল্লাহ ছাড়া যাকে ডাকতে পার ডেকে নাও; যদি তোমরা সত্যবাদী হও।’ [১]

[১] ইমাম ইবনে কাসীর লিখেছেন যে, প্রথমে আল্লাহ তাআলা চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন যে, যদি তোমরা তোমাদের এই দাবীতে সত্যবাদী হও যে, এই কুরআন মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর সবরচিত, তাহলে তোমরা তার মত কুরআন রচনা করে দেখাও; তাতে তোমরা যার ইচ্ছা সাহায্য নিতে পার। কিন্তু তোমরা এরূপ কক্ষনো করতে সক্ষম হবে না। মহান আল্লাহ বলেন, (قُلْ لَئِنِ اجْتَمَعَتِ الْأِنْسُ وَالْجِنُّ عَلَى أَنْ يَأْتُوا بِمِثْلِ هَذَا الْقُرْآنِ لا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيرًا) অর্থাৎ, বল, যদি এই কুরআনের অনুরূপ কুরআন আনয়নের জন্য মানুষ ও জীন সমবেত হয় এবং তারা পরস্পরকে সাহায্য করে, তবুও তারা এর অনুরূপ কুরআন আনয়ন করতে পারবে না।" (সূরা বনী ইস্রাঈল ১৭:৮৮) তারপর আল্লাহ তাআলা এই চ্যালেঞ্জ দিলেন যে, পূর্ণ কুরআন রচনা করে পেশ করতে না পারলে, দশটি সূরাই রচনা করে পেশ কর। যেমন এই আয়াতে বলা হয়েছে। পুনরায় তৃতীয় চ্যালেঞ্জ দিলেন যে, একটি সূরাই রচনা করে পেশ কর। যেমন সূরা ইউনুসের ১০:৩৮ নং আয়াতে এবং সূরা বাক্বারার শুরুতে এ কথা বলেছেন। (তাফসীর ইবনে কাসীর) এর পরিপ্রেক্ষিতে শেষ চ্যালেঞ্জ এ হতে পারে যে, অনুরূপ একটি কথাই তৈরী করে পেশ কর। যেমন আল্লাহ বলেন, (فَلْيَأْتُوا بِحَدِيثٍ مِثْلِهِ إِنْ كَانُوا صَادِقِين) অর্থাৎ, তারা যদি সত্যবাদী হয়, তাহলে এর সদৃশ কোন কথা উপস্থিত করুক না। (সূরা ত্বুর ৫২:৩৪) কিন্তু অবতীর্ণ হওয়ার পর্যায়ক্রম অনুসারে পর্যায়ক্রম এই চ্যালেঞ্জের সমর্থন পাওয়া যায় না। আর আল্লাহই ভালো জানেন।

14

فَإِلَّمْ يَسْتَجِيبُوا۟ لَكُمْ فَٱعْلَمُوٓا۟ أَنَّمَآ أُنزِلَ بِعِلْمِ ٱللَّهِ وَأَن لَّآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۖ فَهَلْ أَنتُم مُّسْلِمُونَ

অতঃপর তারা যদি তোমাদের কথা পুরণ করতে অপারগ হয়; তবে জেনে রাখ, এটি আল্লাহর এলম দ্বারা অবতীর্ণ হয়েছে; আরো একীন করে নাও যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন মাবুদ নেই। অতএব, এখন কি তোমরা আত্নসমর্পন করবে?

অতঃপর যদি তারা তোমাদের আহবানে সাড়া না দেয়, তাহলে তোমরা জেনে রাখ যে, এই কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে আল্লাহরই জ্ঞান দ্বারা। আর এও যে, তিনি ছাড়া আর কোন (সত্য) উপাস্য নেই। তাহলে এখন তোমরা মুসলমান হবে কি? [১]

[১] অর্থাৎ, এই চ্যালেঞ্জের জবাব দিতে অক্ষম হওয়ার পরেও কি 'কুরআন আল্লাহরই অবতীর্ণকৃত কিতাব' এই কথা স্বীকার করার জন্য এবং মুসলমান হওয়ার জন্য প্রস্ত্তত হবে না?

15

مَن كَانَ يُرِيدُ ٱلْحَيَوٰةَ ٱلدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَٰلَهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لَا يُبْخَسُونَ

যে ব্যক্তি পার্থিবজীবন ও তার চাকচিক্যই কামনা করে, হয় আমি তাদের দুনিয়াতেই তাদের আমলের প্রতিফল ভোগ করিয়ে দেব এবং তাতে তাদের প্রতি কিছুমাত্র কমতি করা হয় না।

যারা শুধু পার্থিব জীবন ও তার সৌন্দর্য কামনা করে, আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মসমূহ (এর ফল) পৃথিবীতেই পরিপূর্ণরূপে প্রদান করে দিই এবং সেখানে তাদের জন্য কিছুই কম করা হয় না।

16

أُو۟لَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ فِى ٱلْءَاخِرَةِ إِلَّا ٱلنَّارُ ۖ وَحَبِطَ مَا صَنَعُوا۟ فِيهَا وَبَٰطِلٌۭ مَّا كَانُوا۟ يَعْمَلُونَ

এরাই হল সেসব লোক আখেরাতে যাদের জন্য আগুন ছাড়া নেই। তারা এখানে যা কিছু করেছিল সবই বরবাদ করেছে; আর যা কিছু উপার্জন করেছিল, সবই বিনষ্ট হল।

এরা এমন লোক যে, তাদের জন্য পরকালে জাহান্নাম ছাড়া আর কিছুই নেই, আর তারা যা কিছু করেছে, তা সবই পরকালে নিষ্ফল হবে এবং যা কিছু করে থাকে, তাও নিরর্থক হবে। [১]

[১] উক্ত আয়াত দু'টি সম্পর্কে অনেকের ধারণা যে, তাতে যাদের কথা বর্ণনা করা হয়েছে, তারা হল রিয়াকারী (লোক দেখানো বা সুনাম নেওয়ার জন্য আমলকারী)। অনেকের নিকট তারা হল ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টান। আবার কেউ কেউ বলেন, এখানে দুনিয়াদারদের কথা বলা হয়েছে। কারণ অনেক দুনিয়াদার, যারা নেক আমল করে, আল্লাহ তাআলা তাদের প্রাপ্য তাদেরকে দুনিয়াতেই দিয়ে দেন, আখেরাতে তাদের জন্য শাস্তি ব্যতীত আর কিছুই থাকবে না। উক্ত বিষয়টি কুরআন মাজীদের সূরা বনী ইস্রাঈলের ১৭:১৮ নং আয়াত ও সূরা শূরার ৪২:২০ নং আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে।

17

أَفَمَن كَانَ عَلَىٰ بَيِّنَةٍۢ مِّن رَّبِّهِۦ وَيَتْلُوهُ شَاهِدٌۭ مِّنْهُ وَمِن قَبْلِهِۦ كِتَٰبُ مُوسَىٰٓ إِمَامًۭا وَرَحْمَةً ۚ أُو۟لَٰٓئِكَ يُؤْمِنُونَ بِهِۦ ۚ وَمَن يَكْفُرْ بِهِۦ مِنَ ٱلْأَحْزَابِ فَٱلنَّارُ مَوْعِدُهُۥ ۚ فَلَا تَكُ فِى مِرْيَةٍۢ مِّنْهُ ۚ إِنَّهُ ٱلْحَقُّ مِن رَّبِّكَ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَ ٱلنَّاسِ لَا يُؤْمِنُونَ

আচ্ছা বল তো, যে ব্যক্তি তার প্রভুর সুস্পষ্ট পথে রয়েছে, আর সাথে সাথে আল্লাহর তরফ থেকে একটি সাক্ষীও বর্তমান রয়েছে এবং তার পূর্ববর্তী মূসা (আঃ) এর কিতাবও সাক্ষী যা ছিল পথনির্দেশক ও রহমত স্বরূপ, (তিনি কি অন্যান্যের সমান) অতএব তাঁরা কোরআনের প্রতি ঈমান আনেন। আর ঐসব দলগুলি যে কেউ তা অস্বীকার করে, দোযখই হবে তার ঠিকানা। অতএব, আপনি তাতে কোন সন্দেহে থাকবেন না। নিঃসন্দেহে তা আপনার পালনকর্তার পক্ষ হতে ধ্রুব সত্য; তথাপি অনেকেই তা বিশ্বাস করে না।

যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে আগত স্পষ্ট প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং ওর সঙ্গে তাঁর পক্ষ হতে এক সাক্ষীও বিদ্যমান, আর ওর পূর্বে (সাক্ষী) ছিল আদর্শ ও করুণা স্বরূপ মূসার গ্রন্থ; (সে কি তার মত যে অনুরূপ নয়)?[১] এমন লোকেরাই এ (কুরআন)-এর প্রতি বিশ্বাস রাখে।[২] আর সমস্ত দলের মধ্য হতে যে ব্যক্তি এই (কুরআন) অমান্য করবে, তার প্রতিশ্রুত স্থান হবে দোযখ।[৩] অতএব তুমি এ (কুরআন) সম্পর্কে সন্দেহে পড়ো না। নিঃসন্দেহে তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে এটা সত্য (গ্রন্থ); কিন্তু অধিকাংশ লোক বিশ্বাস করে না। [৪]

[১] কাফের ও অস্বীকারকারীদের বিপরীত মু'মিন ও দ্বীনদারদের কথা বর্ণনা করা হচ্ছে। "প্রতিপালকের পক্ষ হতে স্পষ্ট প্রমাণ"এর অর্থ হল, সেই 'প্রকৃতি' যার উপর আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আর তা হল এক আল্লাহকে স্বীকার ও একমাত্র তাঁরই ইবাদত করার প্রকৃতি। যেমন নবী (সাঃ) বলেছেন, সকল শিশু প্রকৃতির উপর জন্ম গ্রহণ করে, অতঃপর তার পিতা-মাতা তাকে ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান অথবা অগ্নিপূজক বানিয়ে দেয়।" (বুখারী) يَتْلُوْهُ এর অর্থ হল, ওর পিছনে বা ওর সঙ্গে। অর্থাৎ, তার সাথে আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন সাক্ষীও বিদ্যমান। সে সাক্ষী হল কুরআন অথবা মুহাম্মাদ (সাঃ), যিনি সেই সুস্থ মানব-প্রকৃতির দিকে আহবান করেন। আর এর পূর্বে মূসা (আঃ)-এর কিতাব তাওরাতও সাক্ষী; যা পথনির্দেশক ও রহমতের কারণও বটে। অর্থাৎ, মূসা (আঃ)-এর কিতাবও কুরআনের উপর ঈমান আনার জন্য পথ দেখায়। উদ্দেশ্য এই যে, একজন সেই ব্যক্তি, যে অস্বীকারকারী ও কাফের এবং তার বিপরীত অন্য আর এক ব্যক্তি, যে আল্লাহর সুস্পষ্ট প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত, তার এক সাক্ষী হল কুরআন বা নবী (সাঃ), অনুরূপ পূর্বে অবতীর্ণ কিতাব তাওরাতেও তার পথনির্দেশনার সুব্যবস্থা করা হয়েছে। সুতরাং সে বিশ্বাসী। এরা উভয়ে কি সমান হতে পারে? অর্থাৎ, উভয়ে সমান হতে পারে না। কারণ একজন মু'মিন আর দ্বিতীয়জন কাফের। একজন সর্বপ্রকার দলীল দ্বারা সমৃদ্ধ। আর অন্যজন একেবারে দলীলশূন্য।[২] অর্থাৎ, যাদের মাঝে উক্ত গুণ পাওয়া যায়, তারা কুরআন কারীম ও নবী (সাঃ) এর প্রতি ঈমান রাখে।[৩] 'সমস্ত দল' থেকে উদ্দেশ্য হল, সারা পৃথিবীতে যে সকল ধর্ম বা মতবাদ পাওয়া যায়। অর্থাৎ, ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান, পারসীক, বৌদ্ধ, অগ্নিপূজক, পৌত্তলিক ও অবিশ্বাসী ইত্যাদি থেকে যে কেউ মুহাম্মাদ (সাঃ) এর প্রতি ঈমান না আনবে, তার স্থান হবে জাহান্নাম। উক্ত বিষয়টি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, "সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার জান আছে! এই উম্মতের যে ইয়াহুদী অথবা খ্রিষ্টান আমার নবুঅত সম্পর্কে শ্রবণ করবে অথচ আমার প্রতি ঈমান আনবে না, সে জাহান্নামে যাবে।" (মুসলিম) এ বিষয়টি এর পূর্বে সূরা বাক্বারার ২:৬২ নং ও সূরা নিসার ৪:১৫০-১৫২ নং আয়াতে আলোচিত হয়েছে।[৪] এ বিষয়টিকে কুরআন মাজীদের বিভিন্ন স্থানে বর্ণিত হয়েছে, যেমন (وَمَا أَكْثَرُ النَّاسِ وَلَوْ حَرَصْتَ بِمُؤْمِنِينَ) অর্থাৎ, তুমি যতই চাও না কেন, অধিকাংশ লোকই বিশ্বাস করবার নয়। (সূরা ইউসুফ ১২:১০৩ আয়াত) (وَلَقَدْ صَدَّقَ عَلَيْهِمْ إِبْلِيسُ ظَنَّهُ فَاتَّبَعُوهُ إِلَّا فَرِيقًا مِنَ الْمُؤْمِنِينَ) অর্থাৎ, তাদের সম্বন্ধে ইবলীস তার ধারণা সত্য প্রমাণ করল, ফলে তাদের মধ্যে একটি মু'মিন দল ব্যতীত সবাই তার অনুসরণ করল। (সূরা সাবা' ৩৪:২০ আয়াত)

18

وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ ٱفْتَرَىٰ عَلَى ٱللَّهِ كَذِبًا ۚ أُو۟لَٰٓئِكَ يُعْرَضُونَ عَلَىٰ رَبِّهِمْ وَيَقُولُ ٱلْأَشْهَٰدُ هَٰٓؤُلَآءِ ٱلَّذِينَ كَذَبُوا۟ عَلَىٰ رَبِّهِمْ ۚ أَلَا لَعْنَةُ ٱللَّهِ عَلَى ٱلظَّٰلِمِينَ

আর তাদের চেয়ে বড় যালেম কে হতে পারে, যারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করে। এসব লোককে তাদের পালনকর্তার সাক্ষাত সম্মূখীন করা হবে আর সাক্ষিগণ বলতে থাকবে, এরাই ঐসব লোক, যারা তাদের পালনকর্তার প্রতি মিথ্যারোপ করেছিল। শুনে রাখ, যালেমদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত রয়েছে।

আর ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক অত্যাচারী কে হবে, যে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে?[১] ঐ লোকদেরকে তাদের প্রতিপালকের সামনে পেশ করা হবে এবং সাক্ষী (ফিরিশতা)গণ বলবে, ‘এরা ঐ লোক যারা নিজেদের প্রতিপালক সম্বন্ধে মিথ্যা বলেছিল। জেনে রেখো, এমন অত্যাচারীদের উপর আল্লাহর অভিশাপ।’[২]

[১] অর্থাৎ, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা ইহজগৎ পরিচালনা বা পরজগতে সুপারিশ করার ক্ষমতা দেননি, তাদের সম্পর্কে বলা যে, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে এই ক্ষমতা বা এখতিয়ার দিয়েছেন।

[২] এর ব্যাখ্যা হাদীসে এইভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, "কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা একজন মু'মিন ব্যক্তিকে তার পাপের কথা স্বীকার করাবেন, তিনি বলবেন, তুমি জান, তুমি অমুক অমুক পাপকাজ করেছ? সে ব্যক্তি তা স্বীকার করে বলবে, হ্যাঁ, আমি করেছি। আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমি সেই পাপসমূহকে পৃথিবীতেও প্রকাশ করিনি। যাও আজও তা ক্ষমা করে দিলাম। কিন্তু অন্য লোক বা কাফেরদের ব্যাপার এমন হবে যে তাদেরকে সাক্ষীদের সম্মুখে ডাকা হবে এবং সাক্ষী এই সাক্ষ্য দেবে যে, এরাই ঐ সমস্ত লোক, যারা নিজেদের প্রতিপালকের প্রতি মিথ্যারোপ করেছিল।" (বুখারীঃ তফসীর সূরা হূদ)

19

ٱلَّذِينَ يَصُدُّونَ عَن سَبِيلِ ٱللَّهِ وَيَبْغُونَهَا عِوَجًۭا وَهُم بِٱلْءَاخِرَةِ هُمْ كَٰفِرُونَ

যারা আল্লাহর পথে বাধা দেয়, আর তাতে বক্রতা খুজে বেড়ায়, এরাই আখরাতকে অস্বীকার করে।

যারা আল্লাহর পথে (মানুষকে) বাধা প্রদান করে এবং তাতে বক্রতা অন্বেষণ করার চেষ্টায় লিপ্ত থাকে।[১] আর তারাই পরকাল সম্বন্ধেও অবিশ্বাসী।

[১] অর্থাৎ, মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিরত রাখার জন্য তাতে বক্রতা ও দোষ বের করার চেষ্টা করত এবং লোকদেরকে সে ব্যাপারে বীতশ্রদ্ধ করত।

20

أُو۟لَٰٓئِكَ لَمْ يَكُونُوا۟ مُعْجِزِينَ فِى ٱلْأَرْضِ وَمَا كَانَ لَهُم مِّن دُونِ ٱللَّهِ مِنْ أَوْلِيَآءَ ۘ يُضَٰعَفُ لَهُمُ ٱلْعَذَابُ ۚ مَا كَانُوا۟ يَسْتَطِيعُونَ ٱلسَّمْعَ وَمَا كَانُوا۟ يُبْصِرُونَ

তারা পৃথিবীতেও আল্লাহকে অপারগ করতে পারবে না এবং আল্লাহ ব্যতীত তাদের কোন সাহায্যকারীও নেই, তাদের জন্য দ্বিগুণ শাস্তি রয়েছে; তারা শুনতে পারত না এবং দেখতেও পেত না।

তারা (সমগ্র) ভূ-পৃষ্ঠে আল্লাহকে ব্যর্থ করতে পারত না, আর তাদের জন্য আল্লাহ ছাড়া কোন সাহায্যকারীও ছিল না। ওদের শাস্তি দ্বিগুণ করা হবে। ওরা শুনতে সক্ষম ছিল না এবং দেখতও না। [১]

[১] অর্থাৎ, তাদের সত্যকে অস্বীকার ও অপছন্দ করার ব্যাপার এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, তারা তা শুনতে ও দেখতে সক্ষম ছিল না। অথবা এর অর্থ এই যে, আল্লাহ তাআলা তো তাদেরকে কর্ণ ও চক্ষু দিয়েছিলেন; কিন্তু তার দ্বারা তারা হক কথা না শ্রবণ করেছে আর না হক দর্শন করেছে। ঠিক যেন (فَمَا أَغْنَى عَنْهُمْ سَمْعُهُمْ وَلا أَبْصَارُهُمْ وَلا أَفْئِدَتُهُمْ مِنْ شَيْء) "তাদের কর্ণ, তাদের চক্ষু ও তাদের হৃদয় তাদের কোন কাজে আসেনি।" (সূরা আহক্বাফ ৪৬:২৬) কারণ তারা হক শ্রবণে বধির ও হক দর্শনে অন্ধ হয়ে ছিল। যেমন তারা জাহান্নামে প্রবেশ করার সময় (আফসোস) করে বলবে, (لَوْ كُنَّا نَسْمَعُ أَوْ نَعْقِلُ مَا كُنَّا فِي أَصْحَابِ السَّعِير) অর্থাৎ, যদি আমরা শুনতাম অথবা বিবেক-বুদ্ধি প্রয়োগ করতাম, তাহলে আমরা জাহান্নামবাসী হতাম না।" (সূরা মুলক ৬৭:১০)

Commentary: Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation. Qur'an text and translation via AlQuran Cloud.