Muslim99Muslim99
← Tafsir library

11. Hud

Hud · Meccan · 123 ayahs

سُورَةُ هُودٍ

Reading Tafsir Ibn Kathir by Hafiz Ibn Kathir (Tawheed Publication)

Ayahs 21–30 of 123

21

أُو۟لَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ خَسِرُوٓا۟ أَنفُسَهُمْ وَضَلَّ عَنْهُم مَّا كَانُوا۟ يَفْتَرُونَ

এরা সে লোক, যারা নিজেরাই নিজেদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, আর এরা যা কিছু মিথ্যা মা’বুদ সাব্যস্ত করেছিল, তা সবই তাদের থেকে হারিয়ে গেছে।

১৮-২২ নং আয়াতের তাফসীর যে সব লোক আল্লাহ তাআ’লার উপর মিথ্যা আরোপ করে, পরকালে তাদের ফেরেশতামন্ডলী, রাসূল, নবী এবং সমস্ত মানব ও দানব জাতির সামনে অপমাণিত ও লাঞ্ছিত হওয়ার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। হযরত সফওয়ান ইবনু মুহরিয্‌ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ (একদা) আমি হযরত ইবনু উমারের (রাঃ) হাত ধরেছিলাম, এমন সময় একটি লোক তার কাছে এসে তাকে জিজ্ঞেস করলো: “কিয়ামতের দিন গোপন আলাপ সম্পর্কে আপনি রাসূলুল্লাহকে (সঃ) কিরূপ বলতে শুনেছেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বলতে শুনেছি যে, নিশ্চয়ই মহা মহিমান্বিত আল্লাহ মু’মিন বান্দাকে নিজের নিকটবর্তী করবেন, এমনকি তিনি স্বীয় বাহুটি তার উপর রাখবেন এবং তাকে জনগণের দৃষ্টির অন্তরালে করবেন। অতঃপর তিনি তাকে তার গুনাহগুলির স্বীকারোক্তি করতে গিয়ে বলবেনঃ ‘অমুক পাপকার্য তোমার জানা আছে কি? অমুক শুনাহ তুমি জান কি? অমুক পাপকার্য সম্পর্কে তোমার অবগতি আছে কি?' ঐ মু’মিন বান্দা তার পাপকার্যগুলি স্বীকার করতে থাকবে এবং শেষ পর্যন্ত সে মনে করবে যে, তার ধ্বংস অনিবার্য। ঐ সময় পরম করুণাময় আল্লাহ তাকে বলবেনঃ “হে আমার বান্দা! দুনিয়ায় আমি তোমার এই গুনাহগুলি ঢেকে রেখেছিলাম। জেনে রেখো যে, আজকেও আমি ওগুলি ক্ষমা করে দিলাম। অতঃপর তাকে তার পুণ্যের আমলনামা প্রদান করা হবে। পক্ষান্তরে কাফির ও মুনাফিকদের উপর তো সাক্ষীদেরকে পেশ করা হবে। তারা বলবেঃ “এরা ঐ লোক যারা নিজেদের প্রতিপালকের সম্বন্ধে মিথ্যা কথা আরোপ করেছিল, জেনে রেখো যে, এমন অত্যাচারীদের উপর আল্লাহর লা’নত।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন। ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিমও (রঃ) নিজ নিজ সহীহ গ্রন্থে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)আল্লাহ পাকের উক্তিঃ (আরবি) অর্থাৎ যে লোকগুলি জনগণকে সত্যের অনুসরণ করতে এবং হিদায়াতের পথে চলতে বাধা প্রদান করে থাকে, যে পথ অনুসরণ করলে তারা মহা মহিমান্বিত আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করবে এবং বেহেশতে প্রবেশ করবে। আর তারা কামনা করে থাকে যে, তাদের পথ যেন সোজা না হয়ে বক্র হয় এবং আখেরাতের দিনকেও তারা স্বীকার করে না। অর্থাৎ কিয়ামত যে একদিন সংঘটিত হবে তা তারা বিশ্বাস করে না।আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ (আরবি) তারা ভূ-পৃষ্ঠে আল্লাহকে অক্ষম করতে পারে নাই, আর না তাদের জন্যে আল্লাহ ছাড়া কেউ সহায়ক হলো। অর্থাৎ তাদের স্মরণ রাখা উচিত যে, তারা সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর অধীনস্থ। সব সময় তিনি তাদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করতে সক্ষম। তিনি ইচ্ছা করলে আখেরাতের পূর্বে দুনিয়াতেই তাদেরকে পাকড়াও করতে পারেন। কিন্তু তার পক্ষ থেকে তাদেরকে অল্প দিনের জন্যে অবকাশ দেয়া হয়েছে এবং শাস্তিকে ত্বরান্বিত না করে বিলম্বিত করা হয়েছে। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “কিন্তু তিনি তাদেরকে শুধু অবকাশ দিয়ে রেখেছেন সেইদিন পর্যন্ত, যেইদিন তাদের চক্ষুগুলি বিস্ফোরিত হয়ে থাকবে।” (১৪: ৪২)।সহীহ বুখারী ও সহীহ্ মুসলিমে রয়েছেঃ “নিশ্চয় আল্লাহ তাআ’লা অত্যাচারীকে অবকাশ দিয়ে থাকেন, অবশেষে যখন ধরেন তখন আর ছেড়ে দেন না। এ জন্যেই আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ ‘এরূপ লোকদের জন্যে দ্বিগুণ শাস্তি হবে।’ কারণ তারা আল্লাহর দেয়া শক্তিকে কাজে লাগায় নাই। সত্য কথা শোনা হতে কানকে বধির করে রেখেছে এবং সত্যের অনুসরণ হতে চক্ষুকে অন্ধ করে দিয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআ’লা তাদের জাহান্নামে প্রবেশের সময়ের খবর দিয়েছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা বলবে- যদি আমরা শুনতাম কিংবা বুঝতাম, তবে আমরা দুযখবাসীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম না।” (৬৭: ১০)আর এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যারা কুফরী করেছে ও আল্লাহর পথ হতে বাধা দিয়েছে, আমি তাদের শাস্তির উপর শাস্তি বৃদ্ধি করবো।” (১৬: ৮৮) এ জন্যেই তাদের প্রত্যাখ্যাত প্রতিটি আদেশের উপর ও প্রতিটি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার উপর তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে। সুতরাং সর্বাধিক সঠিক উক্তি এই যে, আখেরাতের সম্পর্কের দিক …

22

لَا جَرَمَ أَنَّهُمْ فِى ٱلْءَاخِرَةِ هُمُ ٱلْأَخْسَرُونَ

আখেরাতে এরাই হবে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্থ কোন সন্দেহ নেই।

১৮-২২ নং আয়াতের তাফসীর যে সব লোক আল্লাহ তাআ’লার উপর মিথ্যা আরোপ করে, পরকালে তাদের ফেরেশতামন্ডলী, রাসূল, নবী এবং সমস্ত মানব ও দানব জাতির সামনে অপমাণিত ও লাঞ্ছিত হওয়ার বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। হযরত সফওয়ান ইবনু মুহরিয্‌ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ (একদা) আমি হযরত ইবনু উমারের (রাঃ) হাত ধরেছিলাম, এমন সময় একটি লোক তার কাছে এসে তাকে জিজ্ঞেস করলো: “কিয়ামতের দিন গোপন আলাপ সম্পর্কে আপনি রাসূলুল্লাহকে (সঃ) কিরূপ বলতে শুনেছেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহকে (সঃ) বলতে শুনেছি যে, নিশ্চয়ই মহা মহিমান্বিত আল্লাহ মু’মিন বান্দাকে নিজের নিকটবর্তী করবেন, এমনকি তিনি স্বীয় বাহুটি তার উপর রাখবেন এবং তাকে জনগণের দৃষ্টির অন্তরালে করবেন। অতঃপর তিনি তাকে তার গুনাহগুলির স্বীকারোক্তি করতে গিয়ে বলবেনঃ ‘অমুক পাপকার্য তোমার জানা আছে কি? অমুক শুনাহ তুমি জান কি? অমুক পাপকার্য সম্পর্কে তোমার অবগতি আছে কি?' ঐ মু’মিন বান্দা তার পাপকার্যগুলি স্বীকার করতে থাকবে এবং শেষ পর্যন্ত সে মনে করবে যে, তার ধ্বংস অনিবার্য। ঐ সময় পরম করুণাময় আল্লাহ তাকে বলবেনঃ “হে আমার বান্দা! দুনিয়ায় আমি তোমার এই গুনাহগুলি ঢেকে রেখেছিলাম। জেনে রেখো যে, আজকেও আমি ওগুলি ক্ষমা করে দিলাম। অতঃপর তাকে তার পুণ্যের আমলনামা প্রদান করা হবে। পক্ষান্তরে কাফির ও মুনাফিকদের উপর তো সাক্ষীদেরকে পেশ করা হবে। তারা বলবেঃ “এরা ঐ লোক যারা নিজেদের প্রতিপালকের সম্বন্ধে মিথ্যা কথা আরোপ করেছিল, জেনে রেখো যে, এমন অত্যাচারীদের উপর আল্লাহর লা’নত।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমদ (রঃ) স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন। ইমাম বুখারী (রঃ) ও ইমাম মুসলিমও (রঃ) নিজ নিজ সহীহ গ্রন্থে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)আল্লাহ পাকের উক্তিঃ (আরবি) অর্থাৎ যে লোকগুলি জনগণকে সত্যের অনুসরণ করতে এবং হিদায়াতের পথে চলতে বাধা প্রদান করে থাকে, যে পথ অনুসরণ করলে তারা মহা মহিমান্বিত আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করবে এবং বেহেশতে প্রবেশ করবে। আর তারা কামনা করে থাকে যে, তাদের পথ যেন সোজা না হয়ে বক্র হয় এবং আখেরাতের দিনকেও তারা স্বীকার করে না। অর্থাৎ কিয়ামত যে একদিন সংঘটিত হবে তা তারা বিশ্বাস করে না।আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ (আরবি) তারা ভূ-পৃষ্ঠে আল্লাহকে অক্ষম করতে পারে নাই, আর না তাদের জন্যে আল্লাহ ছাড়া কেউ সহায়ক হলো। অর্থাৎ তাদের স্মরণ রাখা উচিত যে, তারা সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর অধীনস্থ। সব সময় তিনি তাদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করতে সক্ষম। তিনি ইচ্ছা করলে আখেরাতের পূর্বে দুনিয়াতেই তাদেরকে পাকড়াও করতে পারেন। কিন্তু তার পক্ষ থেকে তাদেরকে অল্প দিনের জন্যে অবকাশ দেয়া হয়েছে এবং শাস্তিকে ত্বরান্বিত না করে বিলম্বিত করা হয়েছে। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “কিন্তু তিনি তাদেরকে শুধু অবকাশ দিয়ে রেখেছেন সেইদিন পর্যন্ত, যেইদিন তাদের চক্ষুগুলি বিস্ফোরিত হয়ে থাকবে।” (১৪: ৪২)।সহীহ বুখারী ও সহীহ্ মুসলিমে রয়েছেঃ “নিশ্চয় আল্লাহ তাআ’লা অত্যাচারীকে অবকাশ দিয়ে থাকেন, অবশেষে যখন ধরেন তখন আর ছেড়ে দেন না। এ জন্যেই আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ ‘এরূপ লোকদের জন্যে দ্বিগুণ শাস্তি হবে।’ কারণ তারা আল্লাহর দেয়া শক্তিকে কাজে লাগায় নাই। সত্য কথা শোনা হতে কানকে বধির করে রেখেছে এবং সত্যের অনুসরণ হতে চক্ষুকে অন্ধ করে দিয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআ’লা তাদের জাহান্নামে প্রবেশের সময়ের খবর দিয়েছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা বলবে- যদি আমরা শুনতাম কিংবা বুঝতাম, তবে আমরা দুযখবাসীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম না।” (৬৭: ১০)আর এক জায়গায় আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “যারা কুফরী করেছে ও আল্লাহর পথ হতে বাধা দিয়েছে, আমি তাদের শাস্তির উপর শাস্তি বৃদ্ধি করবো।” (১৬: ৮৮) এ জন্যেই তাদের প্রত্যাখ্যাত প্রতিটি আদেশের উপর ও প্রতিটি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার উপর তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে। সুতরাং সর্বাধিক সঠিক উক্তি এই যে, আখেরাতের সম্পর্কের দিক …

23

إِنَّ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ وَعَمِلُوا۟ ٱلصَّٰلِحَٰتِ وَأَخْبَتُوٓا۟ إِلَىٰ رَبِّهِمْ أُو۟لَٰٓئِكَ أَصْحَٰبُ ٱلْجَنَّةِ ۖ هُمْ فِيهَا خَٰلِدُونَ

নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে এবং স্বীয় পালনকর্তার সমীপে বিনতি প্রকাশ করেছে তারাই বেহেশতবাসী, সেখানেই তারা চিরকাল থাকবে।

২৩-২৪ নং আয়াতের তাফসীর দুষ্ট ও হতভাগ্যদের অবস্থা বর্ণনা করার পর আল্লাহ তা'আলা এখানে সৎ ভাগ্যবানদের অবস্থার বর্ণনা দিচ্ছেন। তারা হচ্ছে ঐ সব লোক যারা ঈমান এনেছে ও ভাল কাজ করেছে। সুতরাং তাদের অন্তরগুলিও মু'মিন হয়েছে এবং অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলিও কথা ও কাজের দিক দিয়ে আনুগত্য বজায় রাখা ও নিকৃষ্ট কাজগুলিকে পরিহার করার মাধ্যমে সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করেছে। এরই মাধ্যমে তারা এমন বেহেশতের উত্তরাধিকারী হয়েছে যার মধ্যে রয়েছে উঁচু উঁচু প্রকোষ্ঠ, সারি সারি সাজানো আসনসমূহ, ঝুঁকে পড়া ফলসমূহ, সুসজ্জিত গালিচাসমূহ, উত্তম স্বভাব সম্পন্ন রূপসীগণ, বিভিন্ন প্রকারের সুস্বাদু ফল, মনের চাহিদা মতো আহাৰ্যবস্তু, সুপেয় পানীয় এবং সর্বোপরি যমীন ও আসমানের সৃষ্টিকর্তার দর্শন। এসব নিয়ামতরাশি তারা চিরদিনের জন্যে ভোগ করবে। সেখানে তাদের মৃত্যু হবে না, বার্ধক্য আসবেনা, রোগ হবে না, পায়খানা-প্রস্রাবের প্রয়োজন হবে না, মুখে থুথু উঠবে না এবং নাকে শ্লেষ্মও দেখা দেবে না। তাদের দেহ হতে যে ঘাম বের হবে তা হবে মেশকে আম্বারের মত সুগন্ধময়।পূর্বে বর্ণিত হতভাগ্য কাফির এবং এখানে বর্ণিত খোদাভীরু মু’মিনের দৃষ্টান্ত ঠিক এমন দু’ব্যক্তির মত, যাদের একজন অন্ধ ও বধির এবং অপরজন দেখতে পায় এবং শুনতেও পায়। সুতরাং কাফির দুনিয়ায় সত্যকে দেখা হতে অন্ধ এবং আখেরাতেও সে কল্যাণের পথ দেখতে পাবেনা। দুনিয়ায় সে সত্যের দলিল প্রমাণাদি শ্রবণ করা থেকে বধির, উপকার দানকারী কথা তারা শুনেই না। তাদের মধ্যে কল্যাণের কিছু জানলে অবশ্যই আল্লাহ তাদেরকে শুনিয়ে দিতেন। পক্ষান্তরে মু’মিন হয় তীক্ষ্ণবুদ্ধি সম্পন্ন, জ্ঞানী, আলিম ও বুদ্ধিমান। সে ভাল মন্দ বুঝে এবং এ দু’য়ের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। সুতরাং সে ভাল ও সত্যকে গ্রহণ করে এবং মন্দ ও বাতিল পরিত্যাগ করে। সে দলিল প্রমাণাদি শ্রবণ করে এবং এর মধ্যে ও সন্দেহের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। সুতরাং সে বাতিল থেকে বেঁচে থাকে এবং সত্যকে মান্য করে। কাজেই ঐ ব্যক্তি ও এই ব্যক্তি কি সমান হতে পারে? বড়ই আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, এর পরেও তোমরা বিপরীতধর্মী। এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “দুযখের অধিবাসী ও বেহেশতের অধিবাসীরা পরস্পর সমান নয়, যারা বেহেশতের অধিবাসী তারাই সফলকাম।” (৫৯: ২০)আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ “অন্ধ ও চক্ষুষ্মন সমান নয়। অন্ধকার ও আলোকও (সমান) নয়। আর ছায়া ও সূর্য কিরণও (সমান) নয়। (অর্থাৎ কাফির ও মু’মিন সমান নয়)। জীবিত এবং মৃত ব্যক্তি সমান হতে পারে না। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা শুনিয়ে থাকেন, আর যেহেতু কাফিররা মৃত বলে সাব্যস্ত হলো, কাজেই হে মুহাম্মদ (সঃ)! তুমি কবরে সমাহিত লোকদেরকে শুনাতে সক্ষম নও। (এরা যদি না মানে, তবে তুমি চিন্তিত হবে না) তুমি তো শুধু ভয় প্রদর্শনকারী। আমিই তোমাকে সত্য (ধর্ম) সহ সুসংবাদ দাতা ও ভয় প্রদর্শকরূপে প্রেরণ করেছি; আর কোন সম্প্রদায় এমন ছিল না যে, তাদের মধ্যে কোন ভয় প্রদর্শনকারী (নবী) অতীত হয় নাই।”

24

۞ مَثَلُ ٱلْفَرِيقَيْنِ كَٱلْأَعْمَىٰ وَٱلْأَصَمِّ وَٱلْبَصِيرِ وَٱلسَّمِيعِ ۚ هَلْ يَسْتَوِيَانِ مَثَلًا ۚ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ

উভয় পক্ষের দৃষ্টান্ত হচ্ছে যেমন অন্ধ ও বধির এবং যে দেখতে পায় ও শুনতে পায় উভয়ের অবস্থা কি এক সমান? তবুও তোমরা কি ভেবে দেখ না?

২৩-২৪ নং আয়াতের তাফসীর দুষ্ট ও হতভাগ্যদের অবস্থা বর্ণনা করার পর আল্লাহ তা'আলা এখানে সৎ ভাগ্যবানদের অবস্থার বর্ণনা দিচ্ছেন। তারা হচ্ছে ঐ সব লোক যারা ঈমান এনেছে ও ভাল কাজ করেছে। সুতরাং তাদের অন্তরগুলিও মু'মিন হয়েছে এবং অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলিও কথা ও কাজের দিক দিয়ে আনুগত্য বজায় রাখা ও নিকৃষ্ট কাজগুলিকে পরিহার করার মাধ্যমে সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করেছে। এরই মাধ্যমে তারা এমন বেহেশতের উত্তরাধিকারী হয়েছে যার মধ্যে রয়েছে উঁচু উঁচু প্রকোষ্ঠ, সারি সারি সাজানো আসনসমূহ, ঝুঁকে পড়া ফলসমূহ, সুসজ্জিত গালিচাসমূহ, উত্তম স্বভাব সম্পন্ন রূপসীগণ, বিভিন্ন প্রকারের সুস্বাদু ফল, মনের চাহিদা মতো আহাৰ্যবস্তু, সুপেয় পানীয় এবং সর্বোপরি যমীন ও আসমানের সৃষ্টিকর্তার দর্শন। এসব নিয়ামতরাশি তারা চিরদিনের জন্যে ভোগ করবে। সেখানে তাদের মৃত্যু হবে না, বার্ধক্য আসবেনা, রোগ হবে না, পায়খানা-প্রস্রাবের প্রয়োজন হবে না, মুখে থুথু উঠবে না এবং নাকে শ্লেষ্মও দেখা দেবে না। তাদের দেহ হতে যে ঘাম বের হবে তা হবে মেশকে আম্বারের মত সুগন্ধময়।পূর্বে বর্ণিত হতভাগ্য কাফির এবং এখানে বর্ণিত খোদাভীরু মু’মিনের দৃষ্টান্ত ঠিক এমন দু’ব্যক্তির মত, যাদের একজন অন্ধ ও বধির এবং অপরজন দেখতে পায় এবং শুনতেও পায়। সুতরাং কাফির দুনিয়ায় সত্যকে দেখা হতে অন্ধ এবং আখেরাতেও সে কল্যাণের পথ দেখতে পাবেনা। দুনিয়ায় সে সত্যের দলিল প্রমাণাদি শ্রবণ করা থেকে বধির, উপকার দানকারী কথা তারা শুনেই না। তাদের মধ্যে কল্যাণের কিছু জানলে অবশ্যই আল্লাহ তাদেরকে শুনিয়ে দিতেন। পক্ষান্তরে মু’মিন হয় তীক্ষ্ণবুদ্ধি সম্পন্ন, জ্ঞানী, আলিম ও বুদ্ধিমান। সে ভাল মন্দ বুঝে এবং এ দু’য়ের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। সুতরাং সে ভাল ও সত্যকে গ্রহণ করে এবং মন্দ ও বাতিল পরিত্যাগ করে। সে দলিল প্রমাণাদি শ্রবণ করে এবং এর মধ্যে ও সন্দেহের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। সুতরাং সে বাতিল থেকে বেঁচে থাকে এবং সত্যকে মান্য করে। কাজেই ঐ ব্যক্তি ও এই ব্যক্তি কি সমান হতে পারে? বড়ই আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, এর পরেও তোমরা বিপরীতধর্মী। এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “দুযখের অধিবাসী ও বেহেশতের অধিবাসীরা পরস্পর সমান নয়, যারা বেহেশতের অধিবাসী তারাই সফলকাম।” (৫৯: ২০)আর এক জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ “অন্ধ ও চক্ষুষ্মন সমান নয়। অন্ধকার ও আলোকও (সমান) নয়। আর ছায়া ও সূর্য কিরণও (সমান) নয়। (অর্থাৎ কাফির ও মু’মিন সমান নয়)। জীবিত এবং মৃত ব্যক্তি সমান হতে পারে না। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা শুনিয়ে থাকেন, আর যেহেতু কাফিররা মৃত বলে সাব্যস্ত হলো, কাজেই হে মুহাম্মদ (সঃ)! তুমি কবরে সমাহিত লোকদেরকে শুনাতে সক্ষম নও। (এরা যদি না মানে, তবে তুমি চিন্তিত হবে না) তুমি তো শুধু ভয় প্রদর্শনকারী। আমিই তোমাকে সত্য (ধর্ম) সহ সুসংবাদ দাতা ও ভয় প্রদর্শকরূপে প্রেরণ করেছি; আর কোন সম্প্রদায় এমন ছিল না যে, তাদের মধ্যে কোন ভয় প্রদর্শনকারী (নবী) অতীত হয় নাই।”

25

وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوحًا إِلَىٰ قَوْمِهِۦٓ إِنِّى لَكُمْ نَذِيرٌۭ مُّبِينٌ

আর অবশ্যই আমি নূহ (আঃ) কে তাঁর জাতির প্রতি প্রেরণ করেছি, (তিনি বললেন) নিশ্চয় আমি তোমাদের জন্য প্রকাশ্য সতর্ককারী।

২৫-২৭ নং আয়াতের তাফসীর এখানে আল্লাহ তাআ’লা হযরত নূহের (আঃ) সম্পর্কে সংবাদ দিচ্ছেন। সর্বপ্রথম ভূ-পৃষ্ঠে মুশরিকদেরকে মূর্তি পূজা হতে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে যাঁকে তাদের কাছে রাসূলরূপে প্রেরণ করা হয়েছিল তিনিই ছিলেন হযরত নূহ (আঃ)। তিনি তাঁর কওমের কাছে এসে বলেনঃ “তোমরা যদি গায়রুল্লাহর ইবাদত পরিত্যাগ না কর তবে আল্লাহর শাস্তি তোমাদের উপর পতিত হবে। দেখো, তোমরা শুধু আল্লাহ তাআ’লার ইবাদত করতে থাকো। যদি তোমরা এর বিরুদ্ধাচরণ কর তবে আমি তোমাদের উপর কিয়ামতের দিনের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির আশঙ্কা করছি।” তাঁর এ কথার উত্তরে তাঁর কওমের নেতৃস্থানীয় কাফিররা তাকে বললো: “হে নূহ (আঃ)! তুমি কোন ফেরেশতা তো নও। তুমি তো আমাদের মতোই একজন মানুষ। সুতরাং এটা কিরূপে সম্ভব যে, আমাদের সবকে বাদ দিয়ে তোমার মতো শুধু একজন লোকের কাছে আল্লাহর ওয়াহী আসবে? আর আমরা তো স্বচক্ষে দেখছি যে, ইতর শ্রেণীর লোকেরাই শুধু তোমার দলে যোগ দিচ্ছে। কোন ভদ্র ও সম্ভ্রান্ত লোক তোমার দলভুক্ত নয়। যারা তোমার দলে যোগ দিচ্ছে তারা কিছু না বুঝেসুঝে তোমার মজলিসে উঠাবসা করছে। এবং তোমার কথায় ‘হাঁ’ বলে দিচ্ছে। তা ছাড়া আমরা লক্ষ্য করছি যে, এই নতুন ধর্ম তোমাদের কোন উপকারেই আসছে না। না এর ফলে তোমাদের আর্থিক কোন উন্নতি হচ্ছে, না চরিত্র ও সৃষ্টির দিক দিয়ে তোমরা আমাদের ওপর কোন মর্যাদা লাভ করছ। বরং আমাদের ধারণায় তোমরা সব মিথ্যাবাদী, তুমি আমাদেরকে যে ওয়াদা দিচ্ছ যে, ভাল কাজ করলে এবং আল্লাহর উপাসনায় লেগে থাকলে পরকালে উত্তম বিনিময় লাভ করা যাবে, আমাদের ধারণায় এ সব কিছুই মিথ্যা। হযরত নূহের (আঃ) উপর কাফিরদের এটাই ছিল আপত্তি। কিন্তু এটা তাদের অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতারই পরিচায়ক। যদি নিম্ন শ্রেণীর লোকেরাই হক ও সত্যকে কবুল করে নেয় তবে কি সত্যের মর্যাদা কমে যাবে? সত্য সত্যই থাকবে, তা গ্রহণকারী বড় লোকই হোক বা ছোট লোকই হোক। বরং সত্য কথা তো এটাই যে, সত্যের অনুসরণকারীরাই হচ্ছে ভদ্র লোক। হোক না তারা দরিদ্র ও মিসকীন। পক্ষান্তরে সত্য থেকে যারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তারাই হচ্ছে ইতর ও অভদ্র। হোক না তারা সম্পদশালী ও শাসকগোষ্ঠী। হা, সত্য ঘটনা এটাই যে, প্রথমে দরিদ্র ও মিসকীন লোকেরাই সত্যের ডাকে সাড়া দিয়ে থাকে। আর সম্পদশালী ও নেতৃস্থানীয় লোকেরা এর বিরোধিতা করে। আল্লাহ তাআ’লা স্বীয় পাক কালামে বলেনঃ “(হে নবী (সঃ)! এইরূপই তোমার পূর্বে যে কোন বস্তী বা এলাকাতেই আমি রাসূল পাঠিয়েছি, সেই বস্তীর বড় ও নেতৃস্থানীয় লোকেরা বলেছে আমাদের পূর্ব পুরুষদেরকে আমরা এই দ্বীনের উপরই পেয়েছি এবং আমরা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণকারী।” রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াস যখন আবু সুফিয়ানকে জিজ্ঞাস করেনঃ “নুবওয়াতের দাবিদার লোকটির অনুসরণ করছে সম্ভ্রান্ত লোকেরা, না দরিদ্র ও দুর্বল লোকেরা?” উত্তরে তিনি বলেন যে, দুর্বল ও দরিদ্র লোকেরাই তাঁর অনুসরণ করছে। এর উপর হিরাক্লিয়াস মন্তব্য করেন যে, রাসূলদের অনুসারী এরূপ লোকেরাই হয়ে থাকে। সত্যকে তাড়াতাড়ি কবুল করলে কোন দোষ নেই। সত্য স্পষ্ট প্রতীয়মান হওয়ার পর তা গ্রহণ করার ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজনই বা কি? বরং প্রত্যেক বুদ্ধিমানের কাজ তো এটাই হওয়া উচিত যে, সে সর্বাগ্রে ও তাড়াতাড়ি হককে কবুল করে নেবে। এ ব্যাপারে বিলম্ব করা মুখতা ও নির্বুদ্ধিতাই বটে। আল্লাহ তাআ’লার প্রত্যেক নবীই খুবই স্পষ্ট ও খোলাখুলী দলিল প্রমাণাদি নিয়ে আগমন করেছিলেন। হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যাকেই আমি ইসলামের দিকে আহবান করেছি সে-ই ঐ ব্যাপারে কিছু না কিছু সঙ্কোচ বোধ করেছে। শুধু আবু বকর (রাঃ) ছিলেন এর ব্যতিক্রম। তিনি এই ব্যাপারে মোটেই কোন সঙ্কোচ বোধ করেননি।” অর্থাৎ হযরত আবু বকর (রাঃ) ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে কোনই সন্দেহ পোষণ করেননি। বরং ইসলামের দাওয়াত পাওয়া মাত্রই তিনি তা কবুল করে নিয়েছিলেন। কারণ, তিনি সুস্পষ্ট বিষয় অবলোকন করেছিলেন। তাই তিনি …

26

أَن لَّا تَعْبُدُوٓا۟ إِلَّا ٱللَّهَ ۖ إِنِّىٓ أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ أَلِيمٍۢ

তোমরা আল্লাহ ব্যতীত কারো এবাদত করবে না। নিশ্চয় আমি তোমাদের ব্যাপারে এক যন্ত্রণাদায়ক দিনের আযাবের ভয় করছি।

২৫-২৭ নং আয়াতের তাফসীর এখানে আল্লাহ তাআ’লা হযরত নূহের (আঃ) সম্পর্কে সংবাদ দিচ্ছেন। সর্বপ্রথম ভূ-পৃষ্ঠে মুশরিকদেরকে মূর্তি পূজা হতে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে যাঁকে তাদের কাছে রাসূলরূপে প্রেরণ করা হয়েছিল তিনিই ছিলেন হযরত নূহ (আঃ)। তিনি তাঁর কওমের কাছে এসে বলেনঃ “তোমরা যদি গায়রুল্লাহর ইবাদত পরিত্যাগ না কর তবে আল্লাহর শাস্তি তোমাদের উপর পতিত হবে। দেখো, তোমরা শুধু আল্লাহ তাআ’লার ইবাদত করতে থাকো। যদি তোমরা এর বিরুদ্ধাচরণ কর তবে আমি তোমাদের উপর কিয়ামতের দিনের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির আশঙ্কা করছি।” তাঁর এ কথার উত্তরে তাঁর কওমের নেতৃস্থানীয় কাফিররা তাকে বললো: “হে নূহ (আঃ)! তুমি কোন ফেরেশতা তো নও। তুমি তো আমাদের মতোই একজন মানুষ। সুতরাং এটা কিরূপে সম্ভব যে, আমাদের সবকে বাদ দিয়ে তোমার মতো শুধু একজন লোকের কাছে আল্লাহর ওয়াহী আসবে? আর আমরা তো স্বচক্ষে দেখছি যে, ইতর শ্রেণীর লোকেরাই শুধু তোমার দলে যোগ দিচ্ছে। কোন ভদ্র ও সম্ভ্রান্ত লোক তোমার দলভুক্ত নয়। যারা তোমার দলে যোগ দিচ্ছে তারা কিছু না বুঝেসুঝে তোমার মজলিসে উঠাবসা করছে। এবং তোমার কথায় ‘হাঁ’ বলে দিচ্ছে। তা ছাড়া আমরা লক্ষ্য করছি যে, এই নতুন ধর্ম তোমাদের কোন উপকারেই আসছে না। না এর ফলে তোমাদের আর্থিক কোন উন্নতি হচ্ছে, না চরিত্র ও সৃষ্টির দিক দিয়ে তোমরা আমাদের ওপর কোন মর্যাদা লাভ করছ। বরং আমাদের ধারণায় তোমরা সব মিথ্যাবাদী, তুমি আমাদেরকে যে ওয়াদা দিচ্ছ যে, ভাল কাজ করলে এবং আল্লাহর উপাসনায় লেগে থাকলে পরকালে উত্তম বিনিময় লাভ করা যাবে, আমাদের ধারণায় এ সব কিছুই মিথ্যা। হযরত নূহের (আঃ) উপর কাফিরদের এটাই ছিল আপত্তি। কিন্তু এটা তাদের অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতারই পরিচায়ক। যদি নিম্ন শ্রেণীর লোকেরাই হক ও সত্যকে কবুল করে নেয় তবে কি সত্যের মর্যাদা কমে যাবে? সত্য সত্যই থাকবে, তা গ্রহণকারী বড় লোকই হোক বা ছোট লোকই হোক। বরং সত্য কথা তো এটাই যে, সত্যের অনুসরণকারীরাই হচ্ছে ভদ্র লোক। হোক না তারা দরিদ্র ও মিসকীন। পক্ষান্তরে সত্য থেকে যারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তারাই হচ্ছে ইতর ও অভদ্র। হোক না তারা সম্পদশালী ও শাসকগোষ্ঠী। হা, সত্য ঘটনা এটাই যে, প্রথমে দরিদ্র ও মিসকীন লোকেরাই সত্যের ডাকে সাড়া দিয়ে থাকে। আর সম্পদশালী ও নেতৃস্থানীয় লোকেরা এর বিরোধিতা করে। আল্লাহ তাআ’লা স্বীয় পাক কালামে বলেনঃ “(হে নবী (সঃ)! এইরূপই তোমার পূর্বে যে কোন বস্তী বা এলাকাতেই আমি রাসূল পাঠিয়েছি, সেই বস্তীর বড় ও নেতৃস্থানীয় লোকেরা বলেছে আমাদের পূর্ব পুরুষদেরকে আমরা এই দ্বীনের উপরই পেয়েছি এবং আমরা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণকারী।” রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াস যখন আবু সুফিয়ানকে জিজ্ঞাস করেনঃ “নুবওয়াতের দাবিদার লোকটির অনুসরণ করছে সম্ভ্রান্ত লোকেরা, না দরিদ্র ও দুর্বল লোকেরা?” উত্তরে তিনি বলেন যে, দুর্বল ও দরিদ্র লোকেরাই তাঁর অনুসরণ করছে। এর উপর হিরাক্লিয়াস মন্তব্য করেন যে, রাসূলদের অনুসারী এরূপ লোকেরাই হয়ে থাকে। সত্যকে তাড়াতাড়ি কবুল করলে কোন দোষ নেই। সত্য স্পষ্ট প্রতীয়মান হওয়ার পর তা গ্রহণ করার ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজনই বা কি? বরং প্রত্যেক বুদ্ধিমানের কাজ তো এটাই হওয়া উচিত যে, সে সর্বাগ্রে ও তাড়াতাড়ি হককে কবুল করে নেবে। এ ব্যাপারে বিলম্ব করা মুখতা ও নির্বুদ্ধিতাই বটে। আল্লাহ তাআ’লার প্রত্যেক নবীই খুবই স্পষ্ট ও খোলাখুলী দলিল প্রমাণাদি নিয়ে আগমন করেছিলেন। হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যাকেই আমি ইসলামের দিকে আহবান করেছি সে-ই ঐ ব্যাপারে কিছু না কিছু সঙ্কোচ বোধ করেছে। শুধু আবু বকর (রাঃ) ছিলেন এর ব্যতিক্রম। তিনি এই ব্যাপারে মোটেই কোন সঙ্কোচ বোধ করেননি।” অর্থাৎ হযরত আবু বকর (রাঃ) ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে কোনই সন্দেহ পোষণ করেননি। বরং ইসলামের দাওয়াত পাওয়া মাত্রই তিনি তা কবুল করে নিয়েছিলেন। কারণ, তিনি সুস্পষ্ট বিষয় অবলোকন করেছিলেন। তাই তিনি …

27

فَقَالَ ٱلْمَلَأُ ٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ مِن قَوْمِهِۦ مَا نَرَىٰكَ إِلَّا بَشَرًۭا مِّثْلَنَا وَمَا نَرَىٰكَ ٱتَّبَعَكَ إِلَّا ٱلَّذِينَ هُمْ أَرَاذِلُنَا بَادِىَ ٱلرَّأْىِ وَمَا نَرَىٰ لَكُمْ عَلَيْنَا مِن فَضْلٍۭ بَلْ نَظُنُّكُمْ كَٰذِبِينَ

তখন তাঁর কওমের কাফের প্রধানরা বলল আমরা তো আপনাকে আমাদের মত একজন মানুষ ব্যতীত আর কিছু মনে করি না; আর আমাদের মধ্যে যারা ইতর ও স্থুল-বুদ্ধিসম্পন্ন তারা ব্যতীত কাউকে তো আপনার আনুগত্য করতে দেখি না এবং আমাদের উপর আপনাদের কেন প্রাধান্য দেখি না, বরং আপনারা সবাই মিথ্যাবাদী বলে আমারা মনে করি।

২৫-২৭ নং আয়াতের তাফসীর এখানে আল্লাহ তাআ’লা হযরত নূহের (আঃ) সম্পর্কে সংবাদ দিচ্ছেন। সর্বপ্রথম ভূ-পৃষ্ঠে মুশরিকদেরকে মূর্তি পূজা হতে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে যাঁকে তাদের কাছে রাসূলরূপে প্রেরণ করা হয়েছিল তিনিই ছিলেন হযরত নূহ (আঃ)। তিনি তাঁর কওমের কাছে এসে বলেনঃ “তোমরা যদি গায়রুল্লাহর ইবাদত পরিত্যাগ না কর তবে আল্লাহর শাস্তি তোমাদের উপর পতিত হবে। দেখো, তোমরা শুধু আল্লাহ তাআ’লার ইবাদত করতে থাকো। যদি তোমরা এর বিরুদ্ধাচরণ কর তবে আমি তোমাদের উপর কিয়ামতের দিনের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির আশঙ্কা করছি।” তাঁর এ কথার উত্তরে তাঁর কওমের নেতৃস্থানীয় কাফিররা তাকে বললো: “হে নূহ (আঃ)! তুমি কোন ফেরেশতা তো নও। তুমি তো আমাদের মতোই একজন মানুষ। সুতরাং এটা কিরূপে সম্ভব যে, আমাদের সবকে বাদ দিয়ে তোমার মতো শুধু একজন লোকের কাছে আল্লাহর ওয়াহী আসবে? আর আমরা তো স্বচক্ষে দেখছি যে, ইতর শ্রেণীর লোকেরাই শুধু তোমার দলে যোগ দিচ্ছে। কোন ভদ্র ও সম্ভ্রান্ত লোক তোমার দলভুক্ত নয়। যারা তোমার দলে যোগ দিচ্ছে তারা কিছু না বুঝেসুঝে তোমার মজলিসে উঠাবসা করছে। এবং তোমার কথায় ‘হাঁ’ বলে দিচ্ছে। তা ছাড়া আমরা লক্ষ্য করছি যে, এই নতুন ধর্ম তোমাদের কোন উপকারেই আসছে না। না এর ফলে তোমাদের আর্থিক কোন উন্নতি হচ্ছে, না চরিত্র ও সৃষ্টির দিক দিয়ে তোমরা আমাদের ওপর কোন মর্যাদা লাভ করছ। বরং আমাদের ধারণায় তোমরা সব মিথ্যাবাদী, তুমি আমাদেরকে যে ওয়াদা দিচ্ছ যে, ভাল কাজ করলে এবং আল্লাহর উপাসনায় লেগে থাকলে পরকালে উত্তম বিনিময় লাভ করা যাবে, আমাদের ধারণায় এ সব কিছুই মিথ্যা। হযরত নূহের (আঃ) উপর কাফিরদের এটাই ছিল আপত্তি। কিন্তু এটা তাদের অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতারই পরিচায়ক। যদি নিম্ন শ্রেণীর লোকেরাই হক ও সত্যকে কবুল করে নেয় তবে কি সত্যের মর্যাদা কমে যাবে? সত্য সত্যই থাকবে, তা গ্রহণকারী বড় লোকই হোক বা ছোট লোকই হোক। বরং সত্য কথা তো এটাই যে, সত্যের অনুসরণকারীরাই হচ্ছে ভদ্র লোক। হোক না তারা দরিদ্র ও মিসকীন। পক্ষান্তরে সত্য থেকে যারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তারাই হচ্ছে ইতর ও অভদ্র। হোক না তারা সম্পদশালী ও শাসকগোষ্ঠী। হা, সত্য ঘটনা এটাই যে, প্রথমে দরিদ্র ও মিসকীন লোকেরাই সত্যের ডাকে সাড়া দিয়ে থাকে। আর সম্পদশালী ও নেতৃস্থানীয় লোকেরা এর বিরোধিতা করে। আল্লাহ তাআ’লা স্বীয় পাক কালামে বলেনঃ “(হে নবী (সঃ)! এইরূপই তোমার পূর্বে যে কোন বস্তী বা এলাকাতেই আমি রাসূল পাঠিয়েছি, সেই বস্তীর বড় ও নেতৃস্থানীয় লোকেরা বলেছে আমাদের পূর্ব পুরুষদেরকে আমরা এই দ্বীনের উপরই পেয়েছি এবং আমরা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণকারী।” রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াস যখন আবু সুফিয়ানকে জিজ্ঞাস করেনঃ “নুবওয়াতের দাবিদার লোকটির অনুসরণ করছে সম্ভ্রান্ত লোকেরা, না দরিদ্র ও দুর্বল লোকেরা?” উত্তরে তিনি বলেন যে, দুর্বল ও দরিদ্র লোকেরাই তাঁর অনুসরণ করছে। এর উপর হিরাক্লিয়াস মন্তব্য করেন যে, রাসূলদের অনুসারী এরূপ লোকেরাই হয়ে থাকে। সত্যকে তাড়াতাড়ি কবুল করলে কোন দোষ নেই। সত্য স্পষ্ট প্রতীয়মান হওয়ার পর তা গ্রহণ করার ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজনই বা কি? বরং প্রত্যেক বুদ্ধিমানের কাজ তো এটাই হওয়া উচিত যে, সে সর্বাগ্রে ও তাড়াতাড়ি হককে কবুল করে নেবে। এ ব্যাপারে বিলম্ব করা মুখতা ও নির্বুদ্ধিতাই বটে। আল্লাহ তাআ’লার প্রত্যেক নবীই খুবই স্পষ্ট ও খোলাখুলী দলিল প্রমাণাদি নিয়ে আগমন করেছিলেন। হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যাকেই আমি ইসলামের দিকে আহবান করেছি সে-ই ঐ ব্যাপারে কিছু না কিছু সঙ্কোচ বোধ করেছে। শুধু আবু বকর (রাঃ) ছিলেন এর ব্যতিক্রম। তিনি এই ব্যাপারে মোটেই কোন সঙ্কোচ বোধ করেননি।” অর্থাৎ হযরত আবু বকর (রাঃ) ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে কোনই সন্দেহ পোষণ করেননি। বরং ইসলামের দাওয়াত পাওয়া মাত্রই তিনি তা কবুল করে নিয়েছিলেন। কারণ, তিনি সুস্পষ্ট বিষয় অবলোকন করেছিলেন। তাই তিনি …

28

قَالَ يَٰقَوْمِ أَرَءَيْتُمْ إِن كُنتُ عَلَىٰ بَيِّنَةٍۢ مِّن رَّبِّى وَءَاتَىٰنِى رَحْمَةًۭ مِّنْ عِندِهِۦ فَعُمِّيَتْ عَلَيْكُمْ أَنُلْزِمُكُمُوهَا وَأَنتُمْ لَهَا كَٰرِهُونَ

নূহ (আঃ) বললেন-হে আমার জাতি! দেখ তো আমি যদি আমার পালনকর্তার পক্ষ হতে স্পষ্ট দলীলের উপর থাক, আর তিনি যদি তাঁর পক্ষ হতে আমাকে রহমত দান করে থাকেন, তারপরেও তা তোমাদের চোখে না পড়ে, তাহলে আমি কি উহা তোমাদের উপর তোমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই চাপিয়ে দিতে পারি ?

হযরত নূহ (আঃ) তাঁর কওমের আপত্তির জবাবে তাদেরকে যে কথা বলেছিলেন, আল্লাহ তাআ’লা এখানে ওরই খবর দিচ্ছেন। তিনি তাঁর কওমকে বললেন, হে আমার কওম! সত্য নুবওয়াত, নিশ্চিত ও সুস্পষ্ট জিনিষ তো আমার কাছে আমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে এসেই গেছে। এটা আমার উপর প্রতিপালকের একটি বড় নিয়ামত। কিন্তু এটা যদি তোমাদের বোধগম্য না হয় এবং তোমরা এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন না কর তবে কি আমি তোমাদের এই অবজ্ঞার অবস্থায় এটা তোমাদের গলায় জড়িয়ে দিতে পারি? এটা কি করে সম্ভব?

29

وَيَٰقَوْمِ لَآ أَسْـَٔلُكُمْ عَلَيْهِ مَالًا ۖ إِنْ أَجْرِىَ إِلَّا عَلَى ٱللَّهِ ۚ وَمَآ أَنَا۠ بِطَارِدِ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ ۚ إِنَّهُم مُّلَٰقُوا۟ رَبِّهِمْ وَلَٰكِنِّىٓ أَرَىٰكُمْ قَوْمًۭا تَجْهَلُونَ

আর হে আমার জাতি! আমি তো এজন্য তোমাদের কাছে কোন অর্থ চাই না; আমার পারিশ্রমিক তো আল্লাহর জিম্মায় রয়েছে। আমি কিন্তু ঈমানদারদের তাড়িয়ে দিতে পারি না। তারা অবশ্যই তাদের পালনকর্তার সাক্ষাত লাভ করবে। বরঞ্চ তোমাদেরই আমি অজ্ঞ সম্প্রদায় দেখছি।

২৯-৩০ নং আয়াতের তাফসীর হযরত নূহ (আঃ) তাঁর কওমকে বললেন- “হে আমার কওম! আমি তোমাদেরকে যে উপদেশ দিচ্ছি, অর্থাৎ তোমাদের যে মঙ্গল কামনা করছি, এর বিনিময়ে তোমাদের কাছে কিছুই চাচ্ছি না। আমার এ কাজের বিনিময় আল্লাহ তাআ’লার যিম্মায় রয়েছে। তোমাদের কথামত আমি যে দরিদ্র মু’মিনদেরকে আমার নিকট থেকে তাড়িয়ে দেবো এটা আমার দ্বারা সম্ভব নয়। রাসূলুল্লাহকেও (সঃ) এ কথাই বলা হয়েছিল, যার উত্তরে নিম্নের আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছিলঃ (আরবি) অর্থাৎ “(হে নবী (সঃ)! সকাল-সন্ধ্যায় যারা তাদের প্রতিপালককে ডেকে থাকে ঐসব (দরিদ্র মু'মিন) লোকদেরকে তুমি তোমার নিকট থেকে তাড়িয়ে দিয়ো না।” (৬: ৎ৫২) অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এভাবেই আমি তাদের এককে অপরের দ্বারা পরীক্ষা করেছি, যেন তারা বলে- এদের উপরই কি আল্লাহ আমাদের মধ্য থেকে অনুগ্রহ করেছেন? আল্লাহ কি কৃতজ্ঞদের সম্পর্কে অবহিত নন?” (৬:৫৩)

30

وَيَٰقَوْمِ مَن يَنصُرُنِى مِنَ ٱللَّهِ إِن طَرَدتُّهُمْ ۚ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ

আর হে আমার জাতি! আমি যদি তাদের তাড়িয়ে দেই তাহলে আমাকে আল্লাহ হতে রেহাই দেবে কে? তোমরা কি চিন্তা করে দেখ না?

২৯-৩০ নং আয়াতের তাফসীর হযরত নূহ (আঃ) তাঁর কওমকে বললেন- “হে আমার কওম! আমি তোমাদেরকে যে উপদেশ দিচ্ছি, অর্থাৎ তোমাদের যে মঙ্গল কামনা করছি, এর বিনিময়ে তোমাদের কাছে কিছুই চাচ্ছি না। আমার এ কাজের বিনিময় আল্লাহ তাআ’লার যিম্মায় রয়েছে। তোমাদের কথামত আমি যে দরিদ্র মু’মিনদেরকে আমার নিকট থেকে তাড়িয়ে দেবো এটা আমার দ্বারা সম্ভব নয়। রাসূলুল্লাহকেও (সঃ) এ কথাই বলা হয়েছিল, যার উত্তরে নিম্নের আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছিলঃ (আরবি) অর্থাৎ “(হে নবী (সঃ)! সকাল-সন্ধ্যায় যারা তাদের প্রতিপালককে ডেকে থাকে ঐসব (দরিদ্র মু'মিন) লোকদেরকে তুমি তোমার নিকট থেকে তাড়িয়ে দিয়ো না।” (৬: ৎ৫২) অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “এভাবেই আমি তাদের এককে অপরের দ্বারা পরীক্ষা করেছি, যেন তারা বলে- এদের উপরই কি আল্লাহ আমাদের মধ্য থেকে অনুগ্রহ করেছেন? আল্লাহ কি কৃতজ্ঞদের সম্পর্কে অবহিত নন?” (৬:৫৩)

Commentary: Tafsir Ibn Kathir by Hafiz Ibn Kathir (Tawheed Publication). Qur'an text and translation via AlQuran Cloud.