Muslim99Muslim99
← Tafsir library

11. Hud

Hud · Meccan · 123 ayahs

سُورَةُ هُودٍ

Reading Tafsir Ibn Kathir by Hafiz Ibn Kathir (Tawheed Publication)

Ayahs 111–120 of 123

111

وَإِنَّ كُلًّۭا لَّمَّا لَيُوَفِّيَنَّهُمْ رَبُّكَ أَعْمَٰلَهُمْ ۚ إِنَّهُۥ بِمَا يَعْمَلُونَ خَبِيرٌۭ

আর যত লোকই হোক না কেন, যখন সময় হবে, তোমার প্রভু তাদের সকলেরই আমলের প্রতিদান পুরোপুরি দান করবেন। নিশ্চয় তিনি তাদের যাবতীয় কার্যকলাপের খবর রাখেন।

১০৯-১১১ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা বলছেনঃ হে নবী (সঃ)! মুশরিকরা যে শরীক স্থাপন করছে তা যে সম্পূর্ণ রূপে বাতিল ও ভিত্তিহীন এ ব্যাপারে তুমি মোটেই সন্দেহ করোনা। তাদের কাছে তাদের বাপ-দাদাদের প্রচলিত রীতি ছাড়া আর কোন দলীল নেই। তাদের সৎ কার্যের বিনিময় তাদেরকে দুনিয়াতেই দিয়ে দেয়া হবে। আখেরাতে তাদের কোনই অংশ নেই। সুতরাং সেখানে তাদের প্রাপ্য হবে কঠিন শাস্তি। নিশ্চয় আমি তাদেরকে তাদের অংশ পূর্ণভাবে দিয়ে দেবো, একটুও কম না করে আল্লাহ পাকের এই উক্তি সম্পর্কে হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছেঃ তাদের সঙ্গে ভাল ও মন্দের যে ওয়াদা করা হয়েছে তা পুরোপুরিভাবে প্রদান করা হবে, একটুও কম করা হবে না। তাদের নির্ধারিত অংশ তারা অবশ্যই পাবে।মহান আল্লাহ বলেনঃ আমি মূসাকে (আঃ) কিতাব দিয়েছিলাম। অনন্তর তাতে মতভেদ সৃষ্টি করা হয়। কেউ স্বীকার করে নেয় এবং কেউ অস্বীকার করে। সুতরাং হে নবী (সঃ)! তোমার অবস্থাও তোমার পুর্ববর্তী নবীদের মতই হবে। কেউ মানবে এবং কেউ প্রত্যাখ্যান করবে। যেহেতু আমি সময় নির্দিষ্ট করে রেখেছি এবং দলীল প্রমাণাদি পূর্ণ করার পূর্বে আমি শাস্তি প্রদান করি না, সেহেতু আমি এদেরকে শাস্তি প্রদানে বিলম্ব করছি। অন্যথায় এখনই এদেরকে আমি শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাতাম। কাফিরদের কাছে আল্লাহ ও তার রাসূলের কথা ভুলই মনে হয়। তাদের সন্দেহ-সংশয় দূর হয় না। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ নিশ্চিতরূপে সকলেই এইরূপ যে, তোমার প্রতিপালক তাদেরকে তাদের কর্মের পূর্ণ অংশ প্রদান করবেন; নিশ্চয়ই তিনি তাদের কার্যকলাপের পূর্ণ খবর রাখেন। অর্থাৎ তিনি তাদের সমুদয় আমল সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল, তা গুরুত্বপূর্ণই হোক বা নগণ্যই হোক এবং ছোটই হোক বা বড়ই হোক। এই আয়াতে বহু পঠন রয়েছে, যে গুলির অর্থ এই দিকেই ফিরে আসে যা আমরা উল্লেখ করেছি। যেমন আল্লাহ তাআ’লার নিম্নের উক্তিতে রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “ (পর লোকে) তাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যাকে সমবেত ভাবে আমার সামনে হাযির করা হবে না।” (৩৬:৩২)

112

فَٱسْتَقِمْ كَمَآ أُمِرْتَ وَمَن تَابَ مَعَكَ وَلَا تَطْغَوْا۟ ۚ إِنَّهُۥ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌۭ

অতএব, তুমি এবং তোমার সাথে যারা তওবা করেছে সবাই সোজা পথে চলে যাও-যেমন তোমায় হুকুম দেয়া হয়েছে এবং সীমা লঙ্ঘন করবে না, তোমরা যা কিছু করছ, নিশ্চয় তিনি তার প্রতি দৃষ্টি রাখেন।

১১২-১১৩ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা স্বীয় রাসুল (সঃ) এবং তাঁর মুমিনমু’মিন বান্দাদেরকে সরল সোজা পথের উপর প্রতিষ্ঠিত ও অটল থাকার নির্দেশ দিচ্ছেন। এটাই সবচেয়ে বড় কথা। সাথে সাথে তিনি তাদেরকে বিরুদ্ধাচরণ ও হঠকারিতা থেকে নিষেধ করছেন। কেননা, এটাই হচ্ছে ধ্বংসকারী বিষয়। যদিও তা কোন মুশরিকের উপরও করা হয়। আর জেনে রেখোঁরেখো যে, আল্লাহ তাআ’লা তাঁর বান্দাদের কার্যকলাপ সম্যকভাবে প্রত্যক্ষ করছেন। তাদের কোন কাজ থেকেই তিনি উদাসীন ও অমনোযোগী নন এবং তার কাছে কোন কিছু গোপনও নেই।(আরবি) হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবি) এর অর্থ হচ্ছে (আরবি) অর্থাৎ তোমরা ধর্মের কাজে অবহেলা প্রদর্শন করো না। তাঁর থেকে আরও বর্ণিত আছে যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ তোমরা শিরকের দিকে ঝুঁকে পড়ো না। আর আবুল আ’লিয়া (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলো: তোমরা তাদের (যালিমদের) কাজে সন্তুষ্ট হয়ো না। ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ তোমরা যালিমদের দিকে ঝুঁকে পড়োনা। এটাই হচ্ছে উত্তম উক্তি। অর্থাৎ তোমরা যালিমদেরকে সাহায্য করো না। তাহলে তোমরা এই রূপ হবে যে, তোমরা তাদের কাজে সম্মত হয়ে গেছে। এরূপ হলে অগ্নি তোমাদের স্পর্শ করবে এবং তখন কে এমন হবে যে, তোমাদের থেকে শাস্তি দূর করতে পারে? এমতাবস্থায় তোমাদেরকে মোটেই সাহায্য করা হবে না।

113

وَلَا تَرْكَنُوٓا۟ إِلَى ٱلَّذِينَ ظَلَمُوا۟ فَتَمَسَّكُمُ ٱلنَّارُ وَمَا لَكُم مِّن دُونِ ٱللَّهِ مِنْ أَوْلِيَآءَ ثُمَّ لَا تُنصَرُونَ

আর পাপিষ্ঠদের প্রতি ঝুঁকবে না। নতুবা তোমাদেরকেও আগুনে ধরবে। আর আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের কোন বন্ধু নাই। অতএব কোথাও সাহায্য পাবে না।

১১২-১১৩ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা স্বীয় রাসুল (সঃ) এবং তাঁর মুমিনমু’মিন বান্দাদেরকে সরল সোজা পথের উপর প্রতিষ্ঠিত ও অটল থাকার নির্দেশ দিচ্ছেন। এটাই সবচেয়ে বড় কথা। সাথে সাথে তিনি তাদেরকে বিরুদ্ধাচরণ ও হঠকারিতা থেকে নিষেধ করছেন। কেননা, এটাই হচ্ছে ধ্বংসকারী বিষয়। যদিও তা কোন মুশরিকের উপরও করা হয়। আর জেনে রেখোঁরেখো যে, আল্লাহ তাআ’লা তাঁর বান্দাদের কার্যকলাপ সম্যকভাবে প্রত্যক্ষ করছেন। তাদের কোন কাজ থেকেই তিনি উদাসীন ও অমনোযোগী নন এবং তার কাছে কোন কিছু গোপনও নেই।(আরবি) হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, (আরবি) এর অর্থ হচ্ছে (আরবি) অর্থাৎ তোমরা ধর্মের কাজে অবহেলা প্রদর্শন করো না। তাঁর থেকে আরও বর্ণিত আছে যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ তোমরা শিরকের দিকে ঝুঁকে পড়ো না। আর আবুল আ’লিয়া (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হলো: তোমরা তাদের (যালিমদের) কাজে সন্তুষ্ট হয়ো না। ইমাম ইবনু জারীর (রঃ) হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, এর অর্থ হচ্ছেঃ তোমরা যালিমদের দিকে ঝুঁকে পড়োনা। এটাই হচ্ছে উত্তম উক্তি। অর্থাৎ তোমরা যালিমদেরকে সাহায্য করো না। তাহলে তোমরা এই রূপ হবে যে, তোমরা তাদের কাজে সম্মত হয়ে গেছে। এরূপ হলে অগ্নি তোমাদের স্পর্শ করবে এবং তখন কে এমন হবে যে, তোমাদের থেকে শাস্তি দূর করতে পারে? এমতাবস্থায় তোমাদেরকে মোটেই সাহায্য করা হবে না।

114

وَأَقِمِ ٱلصَّلَوٰةَ طَرَفَىِ ٱلنَّهَارِ وَزُلَفًۭا مِّنَ ٱلَّيْلِ ۚ إِنَّ ٱلْحَسَنَٰتِ يُذْهِبْنَ ٱلسَّيِّـَٔاتِ ۚ ذَٰلِكَ ذِكْرَىٰ لِلذَّٰكِرِينَ

আর দিনের দুই প্রান্তেই নামায ঠিক রাখবে, এবং রাতের প্রান্তভাগে পূর্ণ কাজ অবশ্যই পাপ দূর করে দেয়, যারা স্মরণ রাখে তাদের জন্য এটি এক মহা স্মারক।

১১৪-১১৫ নং আয়াতের তাফসীর আলী ইবনু আবি তালহা (রঃ), হযরত ইবনু আব্বাস (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, (আরবি) দ্বারা ফজর ও মাগরিবের নামাযকে বুঝানো হয়েছে। হাসান (রঃ) ও আব্দুর রহমান ইবনু যায়েদ ইবনু আসলাম (রঃ) এরূপই বলেছেন। হাসান (রঃ), কাতাদা’, যহহাক (রঃ) প্রভৃতির বর্ণনায় বলেন যে, ওটা হচ্ছে ফজর ও আসরের নামায। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, ওটা হচ্ছে দিনের প্রথম ফজর এবং অন্যবার যুহর ও আসরের নামায। (আরবি) সম্পর্কে হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত হাসান (রঃ) প্রভৃতি গুরুজন বলেন যে, এর দ্বারা ই’শার নামায বুঝানো হয়েছে। ইবনুল মুবারকের (রঃ) বর্ণনায় হাসান (রঃ) বলেন যে, ওটা হচ্ছে মাগরিব ও ই’শার নামায।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন যে, মাগরিব ও ই’শা এ দু’টি হচ্ছে রাত্রির কিছু অংশের নামায। অনুরূপভাবে মুজাহিদ (রঃ), মুহাম্মদ ইবনু কা'ব (রঃ), কাতাদা’ (রঃ) এবং যহ্‌হাক (রঃ) বলেন যে, ওটা হচ্ছে মাগরিব ও ই’শার নামায।সম্ভবতঃ এ আয়াতটি পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয হওয়ার পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছিল এবং এটা অবতীর্ণ হয় মিরাজের রাত্রে। তখন শুধু দুই ওয়াক্ত নামায অবতীর্ণ হয়। এক ওয়াক্ত নামায সূর্যোদয়ের পূর্বে এবং আর এক ওয়াক্ত নামায সূর্যাস্তের পূর্বে এবং রাসূলুল্লাহর (সঃ) উপর এবং তার উম্মতের উপর রাত্রিকালে দাঁড়িয়ে থাকা ওয়াজিব করা হয়। অতঃপর এটা উম্মতের উপর থেকে রহিত করে দেয়া হয় এবং তার উপর বহাল থেকে যায়। অতঃপর তার উপর থেকেও এটা রহিত হয়ে যায়। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআ’লা সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারী।আল্লাহ পাক বলেনঃ “নিশ্চয় সৎ কার্যাবলী মন্দকার্যসমূহকে মুছে ফেলে।” সুনানে হযরত আবু বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে মুসলমান কোন পাপ করে, অতঃপর অযু করে দু'রাকাআত নামায পড়ে, আল্লাহ তাআ’লা তার পাপ ক্ষমা করে দেন।”সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আমিরুল মু'মিনীন হযরত উসমান ইবনু আফফান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (একদা) তিনি অযু করেন রাসূলুল্লাহর (সঃ) অযুর ন্যায়। তারপর বলেনঃ “রাসূলুল্লাহকে (সঃ) আমি এভাবেই অযু করতে দেখেছি। আর তিনি বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আমার এই অযুর ন্যায় অযু করবে, অতঃপর আন্তরিকতার সাথে বা বিশুদ্ধ অন্তরে দু'রাকাআত নামায পড়বে, তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।”হযরত উসমানের (রাঃ) আযাদকৃত গোলাম হা’রিস (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা হযরত উসমান (রাঃ) উপবিষ্ট ছিলেন এবং আমরাও তাঁর সাথে বসেছিলাম। এমন সময় তাঁর কাছে মুআয্‌যিন আসেন। তিনি তাঁর কাছে বরতনে পানি চান। (পানি দেয়া হলে) তিনি অযু করেন। অতঃপর বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহকে (সঃ) আমার এই অযুর মত অযু করতে দেখেছি। (অযুর পরে) তিনি বলেনঃ “যে ব্যক্তি আমার এই অযুর ন্যায় অযু করবে, তার জন্যে যুহর ও ফজরের মধ্যবর্তী সময়ে সমস্ত (সাগীরা) গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। তারপর সে আসরের নামায পড়বে, (এর ফলে) তার জন্যে আসর ও যুহরের মধ্যবর্তী সময়ের (সাগীরা) গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। এরপর সে মাগরিবের নামায পড়বে, এর ফলে তার মাগরিব ও আসরের মধ্যবর্তী সময়ের পাপ ক্ষমা করে দেয়া হবে। তারপর সে শুয়ে পড়বে এবং সকালে উঠে ফজরের নামায পড়বে, এতে তার ফজর ও ই’শার মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। এ গুলিই হচ্ছে সৎ কর্ম, যেগুলি মন্দ কাজগুলিকে মিটিয়ে দেয়।”সহীহ্ হাদীসে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আচ্ছা বলতো, যদি তোমাদের কারো বাড়ীর দরজার ওপর প্রবাহিত নদী থাকে এবং সে প্রত্যহ তাতে পাঁচ বার করে গোসল করে, তবে তার শরীরে কোন ময়লা থাকবে কি? তারা (সাহাবীগণ) উত্তরে বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! না (তার দেহে কোন ময়লা থাকবে না)।” তিনি তখন বললেনঃ “এটাই দৃষ্টান্ত হচ্ছে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের। এগুলির কারণে আল্লাহ তাআ’লা ভুলত্রুটি ও পাপরাশি ক্ষমা করে থাকেন।” সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, …

115

وَٱصْبِرْ فَإِنَّ ٱللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ ٱلْمُحْسِنِينَ

আর ধৈর্য্যধারণ কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ পূণ্যবানদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না।

১১৪-১১৫ নং আয়াতের তাফসীর আলী ইবনু আবি তালহা (রঃ), হযরত ইবনু আব্বাস (রঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, (আরবি) দ্বারা ফজর ও মাগরিবের নামাযকে বুঝানো হয়েছে। হাসান (রঃ) ও আব্দুর রহমান ইবনু যায়েদ ইবনু আসলাম (রঃ) এরূপই বলেছেন। হাসান (রঃ), কাতাদা’, যহহাক (রঃ) প্রভৃতির বর্ণনায় বলেন যে, ওটা হচ্ছে ফজর ও আসরের নামায। মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, ওটা হচ্ছে দিনের প্রথম ফজর এবং অন্যবার যুহর ও আসরের নামায। (আরবি) সম্পর্কে হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রঃ), হযরত হাসান (রঃ) প্রভৃতি গুরুজন বলেন যে, এর দ্বারা ই’শার নামায বুঝানো হয়েছে। ইবনুল মুবারকের (রঃ) বর্ণনায় হাসান (রঃ) বলেন যে, ওটা হচ্ছে মাগরিব ও ই’শার নামায।রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন যে, মাগরিব ও ই’শা এ দু’টি হচ্ছে রাত্রির কিছু অংশের নামায। অনুরূপভাবে মুজাহিদ (রঃ), মুহাম্মদ ইবনু কা'ব (রঃ), কাতাদা’ (রঃ) এবং যহ্‌হাক (রঃ) বলেন যে, ওটা হচ্ছে মাগরিব ও ই’শার নামায।সম্ভবতঃ এ আয়াতটি পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয হওয়ার পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছিল এবং এটা অবতীর্ণ হয় মিরাজের রাত্রে। তখন শুধু দুই ওয়াক্ত নামায অবতীর্ণ হয়। এক ওয়াক্ত নামায সূর্যোদয়ের পূর্বে এবং আর এক ওয়াক্ত নামায সূর্যাস্তের পূর্বে এবং রাসূলুল্লাহর (সঃ) উপর এবং তার উম্মতের উপর রাত্রিকালে দাঁড়িয়ে থাকা ওয়াজিব করা হয়। অতঃপর এটা উম্মতের উপর থেকে রহিত করে দেয়া হয় এবং তার উপর বহাল থেকে যায়। অতঃপর তার উপর থেকেও এটা রহিত হয়ে যায়। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআ’লা সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারী।আল্লাহ পাক বলেনঃ “নিশ্চয় সৎ কার্যাবলী মন্দকার্যসমূহকে মুছে ফেলে।” সুনানে হযরত আবু বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “যে মুসলমান কোন পাপ করে, অতঃপর অযু করে দু'রাকাআত নামায পড়ে, আল্লাহ তাআ’লা তার পাপ ক্ষমা করে দেন।”সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আমিরুল মু'মিনীন হযরত উসমান ইবনু আফফান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, (একদা) তিনি অযু করেন রাসূলুল্লাহর (সঃ) অযুর ন্যায়। তারপর বলেনঃ “রাসূলুল্লাহকে (সঃ) আমি এভাবেই অযু করতে দেখেছি। আর তিনি বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আমার এই অযুর ন্যায় অযু করবে, অতঃপর আন্তরিকতার সাথে বা বিশুদ্ধ অন্তরে দু'রাকাআত নামায পড়বে, তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।”হযরত উসমানের (রাঃ) আযাদকৃত গোলাম হা’রিস (রঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা হযরত উসমান (রাঃ) উপবিষ্ট ছিলেন এবং আমরাও তাঁর সাথে বসেছিলাম। এমন সময় তাঁর কাছে মুআয্‌যিন আসেন। তিনি তাঁর কাছে বরতনে পানি চান। (পানি দেয়া হলে) তিনি অযু করেন। অতঃপর বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহকে (সঃ) আমার এই অযুর মত অযু করতে দেখেছি। (অযুর পরে) তিনি বলেনঃ “যে ব্যক্তি আমার এই অযুর ন্যায় অযু করবে, তার জন্যে যুহর ও ফজরের মধ্যবর্তী সময়ে সমস্ত (সাগীরা) গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। তারপর সে আসরের নামায পড়বে, (এর ফলে) তার জন্যে আসর ও যুহরের মধ্যবর্তী সময়ের (সাগীরা) গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। এরপর সে মাগরিবের নামায পড়বে, এর ফলে তার মাগরিব ও আসরের মধ্যবর্তী সময়ের পাপ ক্ষমা করে দেয়া হবে। তারপর সে শুয়ে পড়বে এবং সকালে উঠে ফজরের নামায পড়বে, এতে তার ফজর ও ই’শার মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। এ গুলিই হচ্ছে সৎ কর্ম, যেগুলি মন্দ কাজগুলিকে মিটিয়ে দেয়।”সহীহ্ হাদীসে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আচ্ছা বলতো, যদি তোমাদের কারো বাড়ীর দরজার ওপর প্রবাহিত নদী থাকে এবং সে প্রত্যহ তাতে পাঁচ বার করে গোসল করে, তবে তার শরীরে কোন ময়লা থাকবে কি? তারা (সাহাবীগণ) উত্তরে বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! না (তার দেহে কোন ময়লা থাকবে না)।” তিনি তখন বললেনঃ “এটাই দৃষ্টান্ত হচ্ছে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের। এগুলির কারণে আল্লাহ তাআ’লা ভুলত্রুটি ও পাপরাশি ক্ষমা করে থাকেন।” সহীহ মুসলিমে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, …

116

فَلَوْلَا كَانَ مِنَ ٱلْقُرُونِ مِن قَبْلِكُمْ أُو۟لُوا۟ بَقِيَّةٍۢ يَنْهَوْنَ عَنِ ٱلْفَسَادِ فِى ٱلْأَرْضِ إِلَّا قَلِيلًۭا مِّمَّنْ أَنجَيْنَا مِنْهُمْ ۗ وَٱتَّبَعَ ٱلَّذِينَ ظَلَمُوا۟ مَآ أُتْرِفُوا۟ فِيهِ وَكَانُوا۟ مُجْرِمِينَ

কাজেই, তোমাদের পূর্ববতী জাতি গুলির মধ্যে এমন সৎকর্মশীল কেন রইল না, যারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে বাধা দিত; তবে মুষ্টিমেয় লোক ছিল যাদেরকে আমি তাদের মধ্য হতে রক্ষা করেছি। আর পাপিষ্ঠরা তো ভোগ বিলাসে মত্ত ছিল যার সামগ্রী তাদেরকে যথেষ্ট দেয়া হয়েছিল। আসলে তারা ছিল মহা অপরাধী।

১১৬-১১৭ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ অতি অল্প সংখ্যক লোক ছাড়া আমি অতীত যুগের লোকদের মধ্যে এমন লোকদেরকে কেন পাই নাই যারা দুষ্ট ও অবাধ্য লোকদেরকে অন্যায় ও অসৎ কাজ হতে বিরত রাখতো? এই অল্প সংখ্যক লোক ওরাই যাদেরকে আমি নিজের শাস্তি থেকে রক্ষা করে থাকি। এ জন্যেই আল্লাহ তাআ’লা এই উম্মতের মধ্যে এরূপ দলের বিদ্যমানতা অপরিহার্য করে নির্দেশ দিয়েছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমাদের মধ্যে অবশ্যই এমন একটি দল থাকা উচিত যারা মানুষকে মঙ্গল ও কল্যাণের দিকে আহ্‌বান করবে এবং মন্দ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে, আর তারাই হচ্ছে সফলকাম।” (৩: ১০৪) যালিমদের নীতি এটাই যে, তারা তাদের বদ অভ্যাস থেকে ফিরে আসে না। সৎ আলেমদের ফরমানের প্রতি তারা মোটেই ভ্রুক্ষেপ করে না। শেষ পর্যন্ত তাদের প্রতি তাদের অজান্তে আল্লাহর আযাব এসে পড়ে। ভাল বস্তিগুলির উপর আল্লাহ তাআ’লার পক্ষ হতে অত্যাচারমূলক ভাবে কখনো শাস্তি আসে না। বরং তারা নিজেরাই নিজেদের উপর যুলুম করে নিজেদেরকে শাস্তির যোগ্য করে তোলে। আল্লাহ পাক যুলুম থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমি তাদের উপর যুলুম করি নাই বরং তারা নিজেরাই নিজেদের নফ্‌সের উপর যুলুম করেছে; (১১: ১০১) অন্য জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমার প্রতিপালক বান্দাদের উপর অত্যাচারকারী নন।” (৪১: ৪৬)

117

وَمَا كَانَ رَبُّكَ لِيُهْلِكَ ٱلْقُرَىٰ بِظُلْمٍۢ وَأَهْلُهَا مُصْلِحُونَ

আর তোমার পালনকর্তা এমন নন যে, জনবসতিগুলোকে অন্যায়ভাবে ধ্বংস করে দেবেন, সেখানকার লোকেরা সৎকর্মশীল হওয়া সত্ত্বেও।

১১৬-১১৭ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ অতি অল্প সংখ্যক লোক ছাড়া আমি অতীত যুগের লোকদের মধ্যে এমন লোকদেরকে কেন পাই নাই যারা দুষ্ট ও অবাধ্য লোকদেরকে অন্যায় ও অসৎ কাজ হতে বিরত রাখতো? এই অল্প সংখ্যক লোক ওরাই যাদেরকে আমি নিজের শাস্তি থেকে রক্ষা করে থাকি। এ জন্যেই আল্লাহ তাআ’লা এই উম্মতের মধ্যে এরূপ দলের বিদ্যমানতা অপরিহার্য করে নির্দেশ দিয়েছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “তোমাদের মধ্যে অবশ্যই এমন একটি দল থাকা উচিত যারা মানুষকে মঙ্গল ও কল্যাণের দিকে আহ্‌বান করবে এবং মন্দ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে, আর তারাই হচ্ছে সফলকাম।” (৩: ১০৪) যালিমদের নীতি এটাই যে, তারা তাদের বদ অভ্যাস থেকে ফিরে আসে না। সৎ আলেমদের ফরমানের প্রতি তারা মোটেই ভ্রুক্ষেপ করে না। শেষ পর্যন্ত তাদের প্রতি তাদের অজান্তে আল্লাহর আযাব এসে পড়ে। ভাল বস্তিগুলির উপর আল্লাহ তাআ’লার পক্ষ হতে অত্যাচারমূলক ভাবে কখনো শাস্তি আসে না। বরং তারা নিজেরাই নিজেদের উপর যুলুম করে নিজেদেরকে শাস্তির যোগ্য করে তোলে। আল্লাহ পাক যুলুম থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। যেমন তিনি বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমি তাদের উপর যুলুম করি নাই বরং তারা নিজেরাই নিজেদের নফ্‌সের উপর যুলুম করেছে; (১১: ১০১) অন্য জায়গায় তিনি বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমার প্রতিপালক বান্দাদের উপর অত্যাচারকারী নন।” (৪১: ৪৬)

118

وَلَوْ شَآءَ رَبُّكَ لَجَعَلَ ٱلنَّاسَ أُمَّةًۭ وَٰحِدَةًۭ ۖ وَلَا يَزَالُونَ مُخْتَلِفِينَ

আর তোমার পালনকর্তা যদি ইচ্ছা করতেন, তবে অবশ্যই সব মানুষকে একই জাতিসত্তায় পরিনত করতে পারতেন আর তারা বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হতো না।

১১৮-১১৯ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা খবর দিচ্ছেন যে, তাঁর ক্ষমতা কোন কাজ থেকে অপারগ নয়। তিনি ইচ্ছা করলে সবকেই ইসলামের উপর বা কুফরীর উপর একত্রিত করতে পারতেন। কিন্তু মানুষের মত, দ্বীন, মাযহাব সব সময় যে পৃথক পৃথক ও ভিন্ন ভিন্ন হবে এতে তাঁর বড়ই নিপূণতা রয়েছে। তাদের পন্থা হবে ভিন্ন এবং আর্থিক অবস্থাও হবে পৃথক পৃথক। এক অপরের অধীনে থাকবে। এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে দ্বীন ও মাযহাবের বিভিন্নতা। হা, তবে যাদের উপর আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ হয়, তারা সব সময় রাসূলদের অনুসরণ ও আল্লাহ তাআ’লার হুকুম পালনের কার্যে লেগে থাকে। এখন তারা শেষ নবীর (সঃ) অনুগত। এরাই হচ্ছে মুক্তিপ্রাপ্ত ও সফলকাম। মুসনাদ ও সুনানে হাদীস রয়েছে, যার প্রতিটি সনদ অন্য সনদকে শক্তিশালী করে থাকে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ইয়াহুদীদের একাত্তরটি দল হয়েছে এবং খৃষ্টানরা বাহাত্তরটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। আর আমার উম্মতের তেহাত্তরটি দল হয়ে যাবে। একটি দল ছাড়া সব দলই জাহান্নামী। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ একটি দল কারা?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “তারা হচ্ছে ওরাই যারা ওরই উপর রয়েছে যার উপর আমি রয়েছি এবং আমার সাহাবীগণ রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম হাকিম (রঃ) তার মুসতাদরাক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)আতা’র (রঃ) উক্তি অনুযায়ী দ্বারা (আরবি) এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে ইয়াহুদী, খৃষ্টান ও মাজুসী। আর আল্লাহর রহমতপ্রাপ্ত দল দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে একনিষ্ঠ ধর্ম ইসলামের অনুগত লোকেরা। কাতাদা’ (রঃ) বলেন যে, এই দলই হচ্ছে আল্লাহ তাআ’লার রহমত প্রাপ্ত ও সংঘবদ্ধ দল, যদিও তাদের দেশ ও দেহ পৃথক। আর অবাধ্য লোকেরাই হচ্ছে বিচ্ছিন্ন দল, যদিও তাদের দেশ ও দেহ এক হয়ে যায়। স্বাভাবিক ভাবেই তাদের জন্য এ জন্যেই হয়েছে। দুর্ভাগা ও ভাগ্যবান এ দু'টো হচ্ছে আদি কালের বন্টন। হযরত তাউসের (রাঃ) নিকট দু’জন লোক তাদের ঝগড়া নিয়ে হাযির হয়। তারা তাদের পারস্পরিক মতানৈক্যে খুবই বেড়ে যায়। তখন তিনি তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা খুবই ঝগড়া করলে এবং তোমাদের পারস্পরিক মতানৈক্য অত্যন্ত বেড়ে গেছে।” তখন তাদের একজন বললো: “আমাদেরকে এ জন্যেই সৃষ্টি করা হয়েছে।” তার এ কথা শুনে তিনি বললেনঃ “তুমি ভুল কথা বললে।” লোকটি তার উক্তির অনুকূলে এই আয়াতটিই পাঠ করলো। তখন হযরত আতা’ (রাঃ) বললেনঃ “তোমাদেরকে এজন্যে সৃষ্টি করা হয় নাই যে, তোমরা পরস্পর মতভেদ সৃষ্টি করবে। বরং তোমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে দলবদ্ধভাবে ও একমতে থাকার জন্যে এবং রহমত লাভ করার উদ্দেশ্যে।” যেমন হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রহমতের জন্যে তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে, আযাবের জন্যে নয়। অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমি দানব ও মানবকে আমার ইবাদতের জন্যেই সৃষ্টি করেছি।” (৫১ :৫৬) তৃতীয় উক্তি এ-ও আছে যে, তাদের রহমত ও মতভেদের জন্যে সৃষ্টি করা হয়েছে। যেমন মা’লিক (রঃ) এর তাফসীরে বলেন যে, একটিদল জান্নাতী এবং একটি দল জাহান্নামী। এদেরকে রহমত লাভ করার জন্যে এবং ওদেরকে মতভেদ সৃষ্টি করার জন্যে সৃষ্টি করা হয়েছে।আল্লাহ পাক বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তোমার প্রতিপালকের এই ফায়সালা হয়ে আছে যে, তাঁর সৃষ্টির মধ্যে এই দু’প্রকারের লোক থাকবে এবং এই দু’প্রকারের লোক দ্বারা জান্নাত ও জাহান্নাম পূর্ণ করা হবে। এর পূর্ণ হিকমত একমাত্র তিনিই জানেন।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যে একবার তর্ক বিতর্ক হয়। জান্নাত বলে, আমার মধ্যে তো শুধুমাত্র দুর্বল লোকেরাই প্রবেশ করে থাকে। আর জাহান্নাম বলেঃ “আমাকে অহংকারী লোকদের জন্যে নির্দিষ্ট করা হয়েছে।” তখন মহা মহিমান্বিত আল্লাহ জান্নাতকে বলেনঃ “তুমি আমার রহমত বা করুণা। আমি যাদেরকে ইচ্ছা করবো তোমার দ্বারা আরাম ও শান্তি দান করবো।” আর জাহান্নামকে বলেনঃ “তুমি আমার শাস্তি। আমি যাদেরকে চাইবো তোমার শাস্তি দ্বারা প্রতিশোধ গ্রহণ করবো। …

119

إِلَّا مَن رَّحِمَ رَبُّكَ ۚ وَلِذَٰلِكَ خَلَقَهُمْ ۗ وَتَمَّتْ كَلِمَةُ رَبِّكَ لَأَمْلَأَنَّ جَهَنَّمَ مِنَ ٱلْجِنَّةِ وَٱلنَّاسِ أَجْمَعِينَ

তোমার পালনকর্তা যাদের উপর রহমত করেছেন, তারা ব্যতীত সবাই চিরদিন মতভেদ করতেই থাকবে এবং এজন্যই তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। আর তোমার আল্লাহর কথাই পূর্ণ হল যে, অবশ্যই আমি জাহান্নামকে জ্বিন ও মানুষ দ্বারা একযোগে ভর্তি করব।

১১৮-১১৯ নং আয়াতের তাফসীর আল্লাহ তাআ’লা খবর দিচ্ছেন যে, তাঁর ক্ষমতা কোন কাজ থেকে অপারগ নয়। তিনি ইচ্ছা করলে সবকেই ইসলামের উপর বা কুফরীর উপর একত্রিত করতে পারতেন। কিন্তু মানুষের মত, দ্বীন, মাযহাব সব সময় যে পৃথক পৃথক ও ভিন্ন ভিন্ন হবে এতে তাঁর বড়ই নিপূণতা রয়েছে। তাদের পন্থা হবে ভিন্ন এবং আর্থিক অবস্থাও হবে পৃথক পৃথক। এক অপরের অধীনে থাকবে। এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে দ্বীন ও মাযহাবের বিভিন্নতা। হা, তবে যাদের উপর আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ হয়, তারা সব সময় রাসূলদের অনুসরণ ও আল্লাহ তাআ’লার হুকুম পালনের কার্যে লেগে থাকে। এখন তারা শেষ নবীর (সঃ) অনুগত। এরাই হচ্ছে মুক্তিপ্রাপ্ত ও সফলকাম। মুসনাদ ও সুনানে হাদীস রয়েছে, যার প্রতিটি সনদ অন্য সনদকে শক্তিশালী করে থাকে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “ইয়াহুদীদের একাত্তরটি দল হয়েছে এবং খৃষ্টানরা বাহাত্তরটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। আর আমার উম্মতের তেহাত্তরটি দল হয়ে যাবে। একটি দল ছাড়া সব দলই জাহান্নামী। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! ঐ একটি দল কারা?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “তারা হচ্ছে ওরাই যারা ওরই উপর রয়েছে যার উপর আমি রয়েছি এবং আমার সাহাবীগণ রয়েছে।” (এ হাদীসটি ইমাম হাকিম (রঃ) তার মুসতাদরাক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন)আতা’র (রঃ) উক্তি অনুযায়ী দ্বারা (আরবি) এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে ইয়াহুদী, খৃষ্টান ও মাজুসী। আর আল্লাহর রহমতপ্রাপ্ত দল দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে একনিষ্ঠ ধর্ম ইসলামের অনুগত লোকেরা। কাতাদা’ (রঃ) বলেন যে, এই দলই হচ্ছে আল্লাহ তাআ’লার রহমত প্রাপ্ত ও সংঘবদ্ধ দল, যদিও তাদের দেশ ও দেহ পৃথক। আর অবাধ্য লোকেরাই হচ্ছে বিচ্ছিন্ন দল, যদিও তাদের দেশ ও দেহ এক হয়ে যায়। স্বাভাবিক ভাবেই তাদের জন্য এ জন্যেই হয়েছে। দুর্ভাগা ও ভাগ্যবান এ দু'টো হচ্ছে আদি কালের বন্টন। হযরত তাউসের (রাঃ) নিকট দু’জন লোক তাদের ঝগড়া নিয়ে হাযির হয়। তারা তাদের পারস্পরিক মতানৈক্যে খুবই বেড়ে যায়। তখন তিনি তাদেরকে বলেনঃ “তোমরা খুবই ঝগড়া করলে এবং তোমাদের পারস্পরিক মতানৈক্য অত্যন্ত বেড়ে গেছে।” তখন তাদের একজন বললো: “আমাদেরকে এ জন্যেই সৃষ্টি করা হয়েছে।” তার এ কথা শুনে তিনি বললেনঃ “তুমি ভুল কথা বললে।” লোকটি তার উক্তির অনুকূলে এই আয়াতটিই পাঠ করলো। তখন হযরত আতা’ (রাঃ) বললেনঃ “তোমাদেরকে এজন্যে সৃষ্টি করা হয় নাই যে, তোমরা পরস্পর মতভেদ সৃষ্টি করবে। বরং তোমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে দলবদ্ধভাবে ও একমতে থাকার জন্যে এবং রহমত লাভ করার উদ্দেশ্যে।” যেমন হযরত ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রহমতের জন্যে তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে, আযাবের জন্যে নয়। অন্য আয়াতে রয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ “আমি দানব ও মানবকে আমার ইবাদতের জন্যেই সৃষ্টি করেছি।” (৫১ :৫৬) তৃতীয় উক্তি এ-ও আছে যে, তাদের রহমত ও মতভেদের জন্যে সৃষ্টি করা হয়েছে। যেমন মা’লিক (রঃ) এর তাফসীরে বলেন যে, একটিদল জান্নাতী এবং একটি দল জাহান্নামী। এদেরকে রহমত লাভ করার জন্যে এবং ওদেরকে মতভেদ সৃষ্টি করার জন্যে সৃষ্টি করা হয়েছে।আল্লাহ পাক বলেনঃ হে নবী (সঃ)! তোমার প্রতিপালকের এই ফায়সালা হয়ে আছে যে, তাঁর সৃষ্টির মধ্যে এই দু’প্রকারের লোক থাকবে এবং এই দু’প্রকারের লোক দ্বারা জান্নাত ও জাহান্নাম পূর্ণ করা হবে। এর পূর্ণ হিকমত একমাত্র তিনিই জানেন।সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যে একবার তর্ক বিতর্ক হয়। জান্নাত বলে, আমার মধ্যে তো শুধুমাত্র দুর্বল লোকেরাই প্রবেশ করে থাকে। আর জাহান্নাম বলেঃ “আমাকে অহংকারী লোকদের জন্যে নির্দিষ্ট করা হয়েছে।” তখন মহা মহিমান্বিত আল্লাহ জান্নাতকে বলেনঃ “তুমি আমার রহমত বা করুণা। আমি যাদেরকে ইচ্ছা করবো তোমার দ্বারা আরাম ও শান্তি দান করবো।” আর জাহান্নামকে বলেনঃ “তুমি আমার শাস্তি। আমি যাদেরকে চাইবো তোমার শাস্তি দ্বারা প্রতিশোধ গ্রহণ করবো। …

120

وَكُلًّۭا نَّقُصُّ عَلَيْكَ مِنْ أَنۢبَآءِ ٱلرُّسُلِ مَا نُثَبِّتُ بِهِۦ فُؤَادَكَ ۚ وَجَآءَكَ فِى هَٰذِهِ ٱلْحَقُّ وَمَوْعِظَةٌۭ وَذِكْرَىٰ لِلْمُؤْمِنِينَ

আর আমি রসূলগণের সব বৃত্তান্তই তোমাকে বলছি, যদ্দ্বারা তোমার অন্তরকে মজবুত করছি। আর এভাবে তোমার নিকট মহাসত্য এবং ঈমানদারদের জন্য নসীহত ও স্বরণীয় বিষয়বস্তু এসেছে।

আল্লাহ তাআ’লা স্বীয় রাসূলকে (সঃ) বলছেনঃ পূর্ববর্তী উম্মতদের তাদের নবীদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা, নবীদের তাদের দেয়া কষ্ট সহ্য করা, শেষে আল্লাহর শাস্তি এসে পড়া, কাফিরদের ধ্বংস হয়ে যাওয়া এবং নবী, রাসূল ও মুমিনমু’মিনদের মুক্তি পাওয়া ইত্যাদি ঘটনাবলী আমি তোমাকে শুনাচ্ছি, যেন তোমার মনকে আমি আরো দৃঢ় করি এবং তোমার অন্তরে যেন পূর্ণ প্রশান্তি নেমে আসে। এই দুনিয়ায় তোমার উপর সত্য প্রকাশিত হয়ে পড়েছে এবং তোমার সামনে সত্য ঘটনাবলী বর্ণিত হয়েছে। এটা কাফিরদের জন্যে শিক্ষণীয় বিষয় এবং মুমিনমু’মিনদের জন্যে উপদেশ। তারা এর দ্বারা উপকার লাভ করবে।

Commentary: Tafsir Ibn Kathir by Hafiz Ibn Kathir (Tawheed Publication). Qur'an text and translation via AlQuran Cloud.