Muslim99Muslim99
← Tafsir library

10. Yunus

Jonas · Meccan · 109 ayahs

سُورَةُ يُونُسَ

Reading Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation

Ayahs 21–30 of 109

21

وَإِذَآ أَذَقْنَا ٱلنَّاسَ رَحْمَةًۭ مِّنۢ بَعْدِ ضَرَّآءَ مَسَّتْهُمْ إِذَا لَهُم مَّكْرٌۭ فِىٓ ءَايَاتِنَا ۚ قُلِ ٱللَّهُ أَسْرَعُ مَكْرًا ۚ إِنَّ رُسُلَنَا يَكْتُبُونَ مَا تَمْكُرُونَ

আর যখন আমি আস্বাদন করাই স্বীয় রহমত সে কষ্টের পর, যা তাদের ভোগ করতে হয়েছিল, তখনই তারা আমার শক্তিমত্তার মাঝে নানা রকম ছলনা তৈরী করতে আরম্ভ করবে। আপনি বলে দিন, আল্লাহ সবচেয়ে দ্রুত কলা-কৌশল তৈরী করতে পারেন। নিশ্চয়ই আমাদের ফেরেশতারা লিখে রাখে তোমাদের ছল-চাতুরী।

মানুষকে কোন বিপদ স্পর্শ করার পর যখন আমি তাদেরকে কোন নিয়ামতের স্বাদ উপভোগ করাই,[১] তখনই তারা আমার আয়াতসমূহ সম্বন্ধে দূরভিসন্ধি (কুমতলব) করতে থাকে।[২] তুমি বলে দাও, ‘আল্লাহ দুরভিসন্ধিতে অধিক তৎপর।’[৩] নিশ্চয়ই আমার ফিরিশতাগণ তোমাদের সকল দুরভিসন্ধি লিপিবদ্ধ করছে।

[১] মসীবতের পর নিয়ামত উপভোগ করার অর্থ হল, অভাব-অনটন, দুর্ভিক্ষ এবং কষ্ট ও মসীবতের পর পর্যাপ্ত পরিমাণে রুযী পাওয়া, জীবন-উপকরণের আতিশয্য ইত্যাদি।

[২] এর অর্থ এই যে, তারা আমার ঐ সকল নিয়ামতের কদর ও তার উপর আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপন করে না; বরং কুফরী ও শিরক করে। অর্থাৎ এটা তাদের নোংরা ষড়যন্ত্র যা তারা আল্লাহর নিয়ামতের পরিবর্তে বেছে নেয়।

[৩] অর্থাৎ, আল্লাহ যে কৌশল অবলম্বন করেন, তা তাদের থেকে অনেক বেশি ত্রিুয়াশীল। আর তা এই যে, তিনি তাদেরকে পাকড়াও করার ক্ষমতা রাখেন, তিনি চাইলে অবিলম্বে তাদেরকে পাকড়াও করতে পারেন। আর যদি তাঁর হিকমতে বিলম্ব করার প্রয়োজন হয়, তবে বিলম্বে পাকড়াও করেন। আরবী ভাষায় مكر গুপ্ত ষড়যন্ত্র ও কৌশলের সাথে কাজ করাকে বলে; তা ভালও হতে পারে, আবার মন্দও হতে পারে। এখানে আল্লাহর (আচমকা) শাস্তি ও পাকড়াওকে 'দুরভিসন্ধি বা ষড়যন্ত্র' বলা হয়েছে।

22

هُوَ ٱلَّذِى يُسَيِّرُكُمْ فِى ٱلْبَرِّ وَٱلْبَحْرِ ۖ حَتَّىٰٓ إِذَا كُنتُمْ فِى ٱلْفُلْكِ وَجَرَيْنَ بِهِم بِرِيحٍۢ طَيِّبَةٍۢ وَفَرِحُوا۟ بِهَا جَآءَتْهَا رِيحٌ عَاصِفٌۭ وَجَآءَهُمُ ٱلْمَوْجُ مِن كُلِّ مَكَانٍۢ وَظَنُّوٓا۟ أَنَّهُمْ أُحِيطَ بِهِمْ ۙ دَعَوُا۟ ٱللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ لَئِنْ أَنجَيْتَنَا مِنْ هَٰذِهِۦ لَنَكُونَنَّ مِنَ ٱلشَّٰكِرِينَ

তিনিই তোমাদের ভ্রমন করান স্থলে ও সাগরে। এমনকি যখন তোমরা নৌকাসমূহে আরোহণ করলে আর তা লোকজনকে অনুকূল হাওয়ায় বয়ে নিয়ে চলল এবং তাতে তারা আনন্দিত হল, নৌকাগুলোর উপর এল তীব্র বাতাস, আর সর্বদিক থেকে সেগুলোর উপর ঢেউ আসতে লাগল এবং তারা জানতে পারল যে, তারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে, তখন ডাকতে লাগল আল্লাহকে তাঁর এবাদতে নিঃস্বার্থ হয়ে যদি তুমি আমাদেরকে এ বিপদ থেকে উদ্ধার করে তোল, তাহলে নিঃসন্দেহে আমরা কৃতজ্ঞ থাকব।

তিনিই (সেই মহান সত্তা), যিনি তোমাদেরকে স্থলভাগে ও জলভাগে ভ্রমণ করান;[১] এমন কি যখন তোমরা নৌকায় অবস্থান কর, আর সেই নৌকাগুলো লোকদের নিয়ে অনুকূল বায়ুর সাহায্যে চলতে থাকে, আর তারা তাতে আনন্দিত হয়। (হঠাৎ) তাদের উপর এক প্রচন্ড (প্রতিকূল) বায়ু এসে পড়ে এবং প্রত্যেক দিক হতে তাদের উপর তরঙ্গমালা ধেয়ে আসে, আর তারা মনে করে যে, তারা (বিপদে) বেষ্টিত হয়ে পড়েছে,[২] (তখন) সকলে আল্লাহর আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে আল্লাহকেই ডাকতে থাকে,[৩] ‘(হে আল্লাহ!) যদি তুমি আমাদেরকে এ হতে রক্ষা কর, তাহলে আমরা অবশ্যই কৃতজ্ঞ হয়ে যাব।’

[১] يُسَيِّرُكُمْ তিনি তোমাদেরকে ভ্রমণ করান বা চলা-ফেরা ও ভ্রমণ করার তওফীক দেন। 'স্থলভাগে' অর্থাৎ তিনি তোমাদেরকে পা দান করেছেন যার দ্বারা তোমরা চলাফেরা কর, যানবাহনের ব্যবস্থা করেছেন, যার উপর অরোহণ করে দূর-দূরান্তে ভ্রমণ কর। 'জলভাগে' অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে নৌকা ও জলজাহাজ তৈরী করার জ্ঞান দান করেছেন, তোমরা তা তৈরী করে তার মাধ্যমে সাগরে ভ্রমণ কর। (যে বস্তু দ্বারা তোমরা নৌযান তৈরী কর, তাকে পানির উপর ভাসার প্রকৃতি দান করেছেন।)

[২] أُحِيْطَ بِهِمْ এর অর্থ হল, যেরূপ শত্রু কোন সম্প্রদায় বা কোন শহরকে বেষ্টন করে বা ঘিরে ফেলে এবং সেই সম্প্রদায় শত্রুর দয়ার উপর নির্ভরশীল থাকে, অনুরূপ যখন তারা তুফান ও বড় বড় তরঙ্গের মাঝে বেষ্টিত হয়, তখন তারা মৃত্যুকে তাদের সম্মুখে দেখতে পায়।

[৩] অর্থাৎ তখন তারা দু'আতে গায়রুল্লাহকে শরীক করে না, যেমন তারা স্বাভাবিক অবস্থায় করে থাকে। স্বাভাবিক অবস্থায় তারা বলে যে, এই বুযুর্গ ব্যক্তিরাও আল্লাহর খাস বান্দা, আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকেও এখতিয়ার দিয়ে রেখেছেন এবং তাঁদের দ্বারা আমরা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে চাই। কিন্তু যখন এই রূপ বালা-মসীবতে পড়ে, তখন ঐ সকল শয়তানী যুক্তি ভুলে যায় এবং শুধু আল্লাহকে স্মরণ করে ও একমাত্র তাঁকেই ডাকে। এতে প্রথমতঃ এই কথা বুঝা যায় যে, মানুষের প্রকৃতিতে এক আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। মানুষ পরিবেশে প্রভাবিত হয়ে সেই প্রবণতা বা প্রকৃতিকে চাপা দিয়ে ফেলে; কিন্তু মসীবতের সময় উক্ত প্রবণতা মানব মনে স্বতঃ বিকাশ লাভ করে বা উক্ত তওহীদী প্রকৃতি ফিরে আসে। আরো বুঝা গেল যে, তওহীদ মানুষের প্রকৃতিগত মৌলিক বস্তু, যা থেকে মানুষের বিচ্যুত হওয়া উচিত নয়। কারণ তওহীদ থেকে বিচ্যুত থাকা, সহজাত প্রকৃতি থেকে বিচ্যুত থাকার নামান্তর; যা সরাসরি ভ্রষ্টতা। দ্বিতীয়তঃ এই কথা বুঝা যায় যে, মুশরিকরা যখন এরূপ মসীবতের সম্মুখীন হত, তখন তারা তাদের তৈরী করা উপাস্যদেরকে ছেড়ে একমাত্র আল্লাহকেই ডাকত। সুতরাং ইকরামা বিন আবু জাহল সর্ম্পকে পাওয়া যায় যে, মক্কা বিজয়ের পর তিনি মক্কা থেকে (কাফের অবস্থায়) পালিয়ে যান। তিনি হাবশাহ যাওয়ার জন্য এক নৌকায় বসেন। নৌকা সামুদ্রিক ঝড়ের মুখে পড়লে নৌকার মাঝি যাত্রীগণকে বলল যে, এখন এক আল্লাহর নিকট দু'আ কর, কারণ তোমাদেরকে তিনি ছাড়া এই তুফান থেকে পরিত্রাণ দানকারী আর কেউ নেই। ইকরামা বলেন, আমি মনে মনে ভাবলাম, যদি সমুদ্রের মাঝে পরিত্রাণ দাতা একমাত্র আল্লাহ হন, তাহলে অবশ্যই স্থলভাগেও পরিত্রাণ দাতা একমাত্র তিনিই হবেন। আর মুহাম্মাদ তো সেই কথাই বলেন। সুতরাং তিনি স্থির করে নিলেন, যদি আমি এখান থেকে বেঁচে জীবিত ফিরে যেতে পারি, তাহলে মক্কা ফিরে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করব। সুতরাং তিনি নবী (সাঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে মুসলমান হয়ে যান। (নাসাঈ, আবু দাউদ ২৬৮৩নং) কিন্তু পরিতাপের বিষয়! উম্মতে মুহাম্মাদীর কিছু মানুষ এমনভাবে শির্কে ফেঁসে আছে যে, বালা-মসীবত ও কষ্টের সময়েও তারা আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া বাদ দিয়ে মৃত বুযুর্গ ব্যক্তিদেরকেই ত্রাণকর্তা মনে করে এবং তাঁদেরকেই সাহায্যের জন্য আহবান করে! সুতরাং ইন্না লিল্লাহি অইন্না ইলাইহি রা-জিঊন। فليبك على الإسلام من كان باكيًا।

23

فَلَمَّآ أَنجَىٰهُمْ إِذَا هُمْ يَبْغُونَ فِى ٱلْأَرْضِ بِغَيْرِ ٱلْحَقِّ ۗ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ إِنَّمَا بَغْيُكُمْ عَلَىٰٓ أَنفُسِكُم ۖ مَّتَٰعَ ٱلْحَيَوٰةِ ٱلدُّنْيَا ۖ ثُمَّ إِلَيْنَا مَرْجِعُكُمْ فَنُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ

তারপর যখন তাদেরকে আল্লাহ বাঁচিয়ে দিলেন, তখনই তারা পৃথিবীতে অনাচার করতে লাগল অন্যায় ভাবে। হে মানুষ! শোন, তোমাদের অনাচার তোমাদেরই উপর পড়বে। পার্থিব জীবনের সুফল ভোগ করে নাও-অতঃপর আমার নিকট প্রত্যাবর্তন করতে হবে। তখন আমি বাতলে দেব, যা কিছু তোমরা করতে।

অতঃপর যখনই আল্লাহ তাদেরকে উদ্ধার করেন, তখনই তারা ভূ-পৃষ্ঠে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহাচরণ করতে থাকে।[১] হে লোক সকল! (শুনে রাখ) তোমাদের বিদ্রোহাচরণ তোমাদেরই (জন্য ক্ষতিকর) হবে,[২] (এ হল) পার্থিব জীবনের উপভোগ্য, তারপর আমারই দিকে তোমাদেরকে ফিরে আসতে হবে। অতঃপর আমি তোমাদেরকে তোমাদের যাবতীয় কৃতকর্ম জানিয়ে দেব।

[১] এটা মানুষের সেই অকৃতজ্ঞ (নিমকহারাম) স্বভাবের বর্ণনা, যা ১২নং আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে। তাছাড়া কুরআনের আরো বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ তাআলা এর বর্ণনা দিয়েছেন।

[২] আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা অকৃতজ্ঞতা ও বিদ্রোহাচরণ করে নাও। তোমরা ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর জীবন উপভোগ করে পরিশেষে তোমাদেরকে আমার নিকটেই ফিরে আসতে হবে, তখন আমি তোমাদেরকে তোমাদের কৃতকর্মের দস্ত্তরমত শাস্তি দেব।

24

إِنَّمَا مَثَلُ ٱلْحَيَوٰةِ ٱلدُّنْيَا كَمَآءٍ أَنزَلْنَٰهُ مِنَ ٱلسَّمَآءِ فَٱخْتَلَطَ بِهِۦ نَبَاتُ ٱلْأَرْضِ مِمَّا يَأْكُلُ ٱلنَّاسُ وَٱلْأَنْعَٰمُ حَتَّىٰٓ إِذَآ أَخَذَتِ ٱلْأَرْضُ زُخْرُفَهَا وَٱزَّيَّنَتْ وَظَنَّ أَهْلُهَآ أَنَّهُمْ قَٰدِرُونَ عَلَيْهَآ أَتَىٰهَآ أَمْرُنَا لَيْلًا أَوْ نَهَارًۭا فَجَعَلْنَٰهَا حَصِيدًۭا كَأَن لَّمْ تَغْنَ بِٱلْأَمْسِ ۚ كَذَٰلِكَ نُفَصِّلُ ٱلْءَايَٰتِ لِقَوْمٍۢ يَتَفَكَّرُونَ

পার্থিব জীবনের উদাহরণ তেমনি, যেমনি আমি আসমান থেকে পানি বর্ষন করলাম, পরে তা মিলিত সংমিশ্রিত হয়ে তা থেকে যমীনের শ্যামল উদ্ভিদ বেরিয়ে এল যা মানুষ ও জীব-জন্তুরা খেয়ে থাকে। এমনকি যমীন যখন সৌন্দর্য সুষমায় ভরে উঠলো আর যমীনের অধিকর্তারা ভাবতে লাগল, এগুলো আমাদের হাতে আসবে, হঠাৎ করে তার উপর আমার নির্দেশ এল রাত্রে কিংবা দিনে, তখন সেগুলোকে কেটে স্তুপাকার করে দিল যেন কাল ও এখানে কোন আবাদ ছিল না। এমনিভাবে আমি খোলাখুলি বর্ণনা করে থাকি নিদর্শণসমূহ সে সমস্ত লোকদের জন্য যারা লক্ষ্য করে।

বস্তুতঃ পার্থিব জীবনের দৃষ্টান্ত তো বৃষ্টির মত, যা আমি আসমান হতে বর্ষণ করি। অতঃপর তার দ্বারা উৎপন্ন হয় ভূপৃষ্ঠের উদ্ভিদগুলো অতিশয় ঘন হয়ে, যা হতে মানুষ ও পশুরা ভক্ষণ করে। অতঃপর যখন ভূমি তার শোভা ধারণ করে ও নয়নাভিরাম হয়ে ওঠে এবং তার মালিকরা মনে করে যে, তারা এখন তার পূর্ণ অধিকারী, তখন দিনে অথবা রাতে তার উপর আমার (আযাবের) আদেশ এসে পড়ে, সুতরাং আমি তা এমনভাবে নিশ্চিহ্ন করে দিই,[১] যেন গতকাল তার অস্তিত্বই ছিল না। এরূপেই আয়াতগুলোকে আমি চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য বিশদরূপে বর্ণনা করে থাকি।

[১] حَصِيدًا - فعيل - مفعول অর্থে। أي محصودًا অর্থাৎ এমন ফসল যা কেটে এক জায়গায় স্তূপ করে রাখা হয় এবং ক্ষেত পরিষ্কার হয়ে যায়। পার্থিব্য জীবনকে এইরূপ ক্ষেতের সাথে তুলনা করে তা যে ক্ষণস্থায়ী; চিরস্থায়ী নয়, তা পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে। ফসলও বৃষ্টির পানি দ্বারা বড় এবং সবুজ ও সতেজ হয়, কিন্তু পরে তা কেটে-শুকিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়।

25

وَٱللَّهُ يَدْعُوٓا۟ إِلَىٰ دَارِ ٱلسَّلَٰمِ وَيَهْدِى مَن يَشَآءُ إِلَىٰ صِرَٰطٍۢ مُّسْتَقِيمٍۢ

আর আল্লাহ শান্তি-নিরাপত্তার আলয়ের প্রতি আহবান জানান এবং যাকে ইচ্ছা সরলপথ প্রদর্শন করেন।

আল্লাহ (মানুষ)কে শান্তির আবাসের দিকে আহবান করেন এবং যাকে ইচ্ছা সরল পথ প্রদর্শন করেন।

26

۞ لِّلَّذِينَ أَحْسَنُوا۟ ٱلْحُسْنَىٰ وَزِيَادَةٌۭ ۖ وَلَا يَرْهَقُ وُجُوهَهُمْ قَتَرٌۭ وَلَا ذِلَّةٌ ۚ أُو۟لَٰٓئِكَ أَصْحَٰبُ ٱلْجَنَّةِ ۖ هُمْ فِيهَا خَٰلِدُونَ

যারা সৎকর্ম করেছে তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ এবং তারও চেয়ে বেশী। আর তাদের মুখমন্ডলকে আবৃত করবে না মলিনতা কিংবা অপমান। তারাই হল জান্নাতবাসী, এতেই তারা বসবাস করতে থাকবে অনন্তকাল।

যারা কল্যাণকর কাজ করে, তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ (জান্নাত) এবং আরো অধিক (আল্লাহর দীদার)।[১] তাদের মুখমন্ডলকে মলিনতা আচ্ছন্ন করবে না এবং লাঞ্ছনাও না; তারাই হচ্ছে জান্নাতের অধিবাসী, তারা ওর মধ্যে অনন্তকাল বাস করবে।

[১] এই زِيَادَةٌ -'অধিক'এর কয়েকটি অর্থ বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু হাদীসে এর ব্যাখ্যা আল্লাহ তাআলার দীদার বা দর্শনসুখ বর্ণনা করা হয়েছে। জান্নাতীদেরকে জান্নাত ও জান্নাতের সকল নিয়ামত দান করার পর এই দীদার দ্বারা সম্মানিত করা হবে। (মুসলিম)

27

وَٱلَّذِينَ كَسَبُوا۟ ٱلسَّيِّـَٔاتِ جَزَآءُ سَيِّئَةٍۭ بِمِثْلِهَا وَتَرْهَقُهُمْ ذِلَّةٌۭ ۖ مَّا لَهُم مِّنَ ٱللَّهِ مِنْ عَاصِمٍۢ ۖ كَأَنَّمَآ أُغْشِيَتْ وُجُوهُهُمْ قِطَعًۭا مِّنَ ٱلَّيْلِ مُظْلِمًا ۚ أُو۟لَٰٓئِكَ أَصْحَٰبُ ٱلنَّارِ ۖ هُمْ فِيهَا خَٰلِدُونَ

আর যারা সঞ্চয় করেছে অকল্যাণ অসৎ কর্মের বদলায় সে পরিমাণ অপমান তাদের চেহারাকে আবৃত করে ফেলবে। কেউ নেই তাদেরকে বাঁচাতে পারে আল্লাহর হাত থেকে। তাদের মুখমন্ডল যেন ঢেকে দেয়া হয়েছে আধাঁর রাতের টুকরো দিয়ে। এরা হল দোযখবাসী। এরা এতেই থাকবে অনন্তকাল।

পক্ষান্তরে যারা মন্দ কাজ করে, তারা তাদের মন্দ কাজের শাস্তি পাবে ওর অনুরূপ মন্দ।[১] আর লাঞ্ছনা তাদেরকে আচ্ছাদিত করে নেবে। আল্লাহ (এর শাস্তি) হতে তাদের রক্ষাকর্তা কেউই থাকবে না।[২] তাদের মুখমন্ডল যেন অন্ধকার রাত্রির আস্তরণে আচ্ছাদিত।[৩] এরা হচ্ছে জাহান্নামের অধিবাসী, তারা ওর মধ্যে অনন্তকাল থাকবে।

[১] পূর্ব আয়াতে জান্নাতীদের আলোচনা ছিল, তাতে বলা হয়েছিল যে, তাদেরকে তাদের নেক আমলের কয়েকগুণ বদলা দেওয়া হবে এবং পরে আল্লাহর দীদার লাভে ধন্য হবে। এই আয়াতে বলা হচ্ছে যে, অসৎ কর্মের বদলা তার সমপরিমাণ দেওয়া হবে। سَيِّئَاتٌ (মন্দ)এর অর্থ হলঃ কুফর, শিরক এবং অন্যান্য গুনাহের কাজ।[২] যেমন আল্লাহ তাআলা মু'মিনদেরকে রক্ষা করবেন, অনুরূপ সেদিন তাদেরকে তাঁর বিশেষ অনুগ্রহ প্রদান করবেন, এ ছাড়া তাদের জন্য আল্লাহ তাআলা তাঁর বিশিষ্ট ব্যক্তিদেরকে সুপারিশ করার অনুমতিও দেবেন, তাঁদের সুপারিশও তিনি গ্রহণ করবেন।[৩] এটা এ কথার অতিশয়োক্তি যে, তাদের মুখমন্ডল খুবই কালো হবে। এর বিপরীত মু'মিনদের মুখমন্ডল সতেজ ও উজ্জ্বল হবে; যেমন সূরা আলে ইমরানের ৩:১০৬ নং আয়াত (يَوْمَ تَبْيَضُّ وُجُوهٌ وَتَسْوَدُّ وُجُوه), সূরা আবাসার ৮০:৩৮-৪১ নং আয়াত এবং সূরা কিয়ামাহ ৭৫:২২ নং আয়াতে এ কথা বর্ণিত হয়েছে।

28

وَيَوْمَ نَحْشُرُهُمْ جَمِيعًۭا ثُمَّ نَقُولُ لِلَّذِينَ أَشْرَكُوا۟ مَكَانَكُمْ أَنتُمْ وَشُرَكَآؤُكُمْ ۚ فَزَيَّلْنَا بَيْنَهُمْ ۖ وَقَالَ شُرَكَآؤُهُم مَّا كُنتُمْ إِيَّانَا تَعْبُدُونَ

আর যেদিন আমি তাদের সবাইকে সমবেত করব; আর যারা শেরক করত তাদেরকে বলবঃ তোমরা এবং তোমাদের শরীকরা নিজ নিজ জায়গায় দাঁড়িয়ে যাও-অতঃপর তাদেরকে পারস্পরিক বিচ্ছিন্ন করে দেব, তখন তাদের শরীকরা বলবে, তোমরা তো আমাদের উপাসনা-বন্দেগী করনি।

আর স্মরণ কর, যেদিন আমি তাদের সকলকে একত্রিত করব।[১] অতঃপর অংশীবাদীদেরকে বলব, ‘তোমরা ও তোমাদের নিরূপিত অংশীরা স্ব-স্ব স্থানে অবস্থান কর।’[২] অতঃপর আমি তাদের পরস্পরকে পৃথক করে দেব[৩] এবং তাদের সেই অংশীরা বলবে, ‘তোমরা তো আমাদের উপাসনা করতে না।

[১] جَمِيْعًا(সকল) এর অর্থ হল শুরু থেকে শেষ অবধি পৃথিবীবাসী সমস্ত মানুষ ও জীন, আল্লাহ তাআলা সকলকে একত্রিত করবেন। যেমন অন্য স্থানে বলেছেন (وَحَشَرْنَاهُمْ فَلَمْ نُغَادِرْ مِنْهُمْ أَحَدًا) অর্থ "আমি মানুষকে একত্রিত করব অতঃপর তাদের কাউকে ছাড়ব না।" (সূরা কাহ্ফ ১৮:৪৭ আয়াত)[২] তাদের বিপরীত মু'মিনদেরকে অন্য দিকে স্থান দেওয়া হবে, অর্থাৎ মু'মিন এবং কাফের ও মুশরিকদেরকে আলাদা আলাদা করে এক অপর থেকে পৃথক করে দেওয়া হবে। যেমন আল্লাহ বলেন, (وَامْتَازُوا الْيَوْمَ أَيُّهَا الْمُجْرِمُونَ)"(বলা হবে) হে অপরাধীগণ! তোমরা আজ পৃথক হয়ে যাও।" (সূরা ইয়াসীন ৩৬:৫৯ আয়াত) (يَوْمَئِذٍ يَصَّدَّعُونَ) "সেই দিন মানুষ দলে দলে বিভক্ত হয়ে যাবে।" (সূরা রূম ৩০:৪৩ আয়াত) অর্থাৎ দুই দলে। (ইবনে কাসীর)[৩] অর্থাৎ, পৃথিবীতে তাদের পরস্পর যে বিশেষ সম্পর্ক ছিল, তা শেষ করে দেওয়া হবে, এরা এক অপরের শত্রু হয়ে যাবে এবং তাদের তথাকথিত উপাস্য তাদের ইবাদতের কথা, তাদেরকে সাহায্যের জন্য ডাকার কথা, তাদের নামে নযর-নিয়ায পেশ করার কথা অস্বীকার করবে।

29

فَكَفَىٰ بِٱللَّهِ شَهِيدًۢا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ إِن كُنَّا عَنْ عِبَادَتِكُمْ لَغَٰفِلِينَ

বস্তুতঃ আল্লাহ আমাদের ও তোমাদের মাঝে সাক্ষী হিসাবে যথেষ্ট। আমরা তোমাদের বন্দেগী সম্পর্কে জানতাম না।

বস্তুতঃ আমাদের ও তোমাদের মধ্যে আল্লাহই সাক্ষী হিসাবে যথেষ্ট যে, আমরা অবশ্যই তোমাদের উপাসনা সম্বন্ধে উদাসীন ছিলাম।’ [১]

[১] তারা বলবে, আমাদের অস্বীকার করার কারণ হল যে, তোমরা কি করতে আমরা তো তার কিছুই জানতাম না। আর আমরা যদি মিথ্যা বলি, তাহলে আমাদের মাঝে আল্লাহ সাক্ষী আছেন এবং সাক্ষ্যের জন্য তিনি যথেষ্ট। তাঁর সাক্ষ্য দানের পর আর কোন প্রমাণের কোন প্রয়োজনই নেই। উক্ত আয়াত এই কথার স্পষ্ট দলীল যে, মুশরিকরা যাদেরকে সাহায্যের জন্য ডাকত, তা শুধু পাথরের মূর্তিই ছিল না (যেমন বর্তমান যুগের কবর পূজারীরা তাদের কবর পূজাকে বৈধ প্রমাণ করার জন্য বলে থাকে যে, এই ধরনের আয়াত মূর্তিপূজা সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে); বরং তাদের জ্ঞান ও বুঝার শক্তি ছিল। তাদের মৃত্যুর পর মানুষ তাদের আকার ও মূর্তি বানিয়ে পূজা আরম্ভ করেছিল; যেমন নূহ (আঃ)-এর জাতির কর্ম-পদ্ধতি প্রমাণ করে এবং সহীহ বুখারীতে যার বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। দ্বিতীয়তঃ এটাও বুঝা যাচ্ছে যে, মানুষ যতই নেক হোক, এমনকি নবী বা রসূল হোক, মৃত্যুর পর সে পৃথিবীর অবস্থা সম্পর্কে বেখবর। তার অনুসারী ও বিশ্বাসীরা তাকে সাহায্যের জন্য ডাকে, তার নামে নযর-নিয়ায পেশ করে, তার কবরে মেলা-খেলার ব্যবস্থা করে, অথবা অন্য কিছু করে, সে কিন্তু এসব কর্ম থেকে বেখবর থাকে। এই শ্রেণীর সকল ব্যক্তিরা কিয়ামতের দিন সব অস্বীকার করবে। এই কথাই সূরা আহক্বাফের ৪৬:৫-৬নং আয়াতেও বর্ণনা করা হয়েছে।

30

هُنَالِكَ تَبْلُوا۟ كُلُّ نَفْسٍۢ مَّآ أَسْلَفَتْ ۚ وَرُدُّوٓا۟ إِلَى ٱللَّهِ مَوْلَىٰهُمُ ٱلْحَقِّ ۖ وَضَلَّ عَنْهُم مَّا كَانُوا۟ يَفْتَرُونَ

সেখানে প্রত্যেকে যাচাই করে নিতে পারবে যা কিছু সে ইতিপূর্বে করেছিল এবং আল্লাহর প্রতি প্রত্যাবর্তন করবে যিনি তাদের প্রকৃত মালিক, আর তাদের কাছ থেকে দূরে যেতে থাকবে যারা মিথ্যা বলত।

সেদিন প্রত্যেক ব্যক্তিই স্বীয় পূর্ব কৃতকর্মগুলো যাচাই করে নেবে[১] এবং তাদেরকে তাদের প্রকৃত অভিভাবক (আল্লাহর) দিকে প্রত্যাবর্তিত করা হবে। আর যেসব মিথ্যা (উপাস্য) তারা বানিয়ে নিয়েছিল সেসব তাদের নিকট থেকে অদৃশ্য হয়ে যাবে। [২]

[১] অর্থাৎ জেনে নেবে বা স্বাদ গ্রহণ করবে।

[২] অর্থাৎ তথাকথিত কোন উপাস্য বা ত্রাণকর্তা সেখানে কোন কাজে আসবে না, কেউ কারোর কোন কষ্ট দূর করার ক্ষমতা রাখবে না।

Commentary: Tafsir Ahsanul Bayaan by Bayaan Foundation. Qur'an text and translation via AlQuran Cloud.